09/09/2026
ঋণখেলাপির জন্য পুরস্কার, সৎ উদ্যোক্তার জন্য শাস্তি!
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় এক হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণ থাকা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সর্বোচ্চ ১৫ বছরের ঋণ পরিশোধের সুযোগ পাবে, যার মধ্যে দুই বছর কোনো কিস্তি না দেওয়ার অবকাশ থাকবে। আগের সুবিধার মেয়াদ ছিল ১০ বছর। বিশেষ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সময় বাড়ানো হয়েছে এবং যারা আগে সুবিধা নিয়েছে, তারাও আবার আবেদন করতে পারবে। অর্থাৎ একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কয়েকটি কিস্তি দিতে না পারলে মামলা, নিলাম ও ব্যবসা বন্ধের মুখে পড়বেন; কিন্তু হাজার কোটি টাকার ঋণগ্রহীতার জন্য রাষ্ট্র নতুন সার্কুলার তৈরি করবে।
এই নীতির ভয়াবহতা বুঝতে পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। ২০২৬ সালের জুনে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩২.৭৮ শতাংশ। মাত্র তিন মাসে এর সঙ্গে আরও ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা যোগ হয়েছে। একই সময়ে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৪.৪৭ শতাংশে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ঋণ প্রথম প্রান্তিকে ৫.১৫ শতাংশ কমেছে এবং মোট ব্যাংকঋণে তাদের অংশ মাত্র ১৫.৮৭ শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্য ২৫.৫ শতাংশ।
অর্থনীতির ভাষায় এটি সমাধান নয়, regulatory forbearance বা হিসাবের খাতায় রোগ লুকিয়ে রাখার চেষ্টা। ঋণ পুনঃতফসিল করলেই ব্যাংক অর্থ দিয়ে আয় করে না, প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনক্ষমতা বাড়ে না এবং খেলাপি সম্পদ উদ্ধার হয় না। শুধু একটি মন্দ ঋণের গায়ে সাময়িকভাবে “নিয়মিত” তকমা লাগানো হয়। এর ফলে তৈরি হয় ভয়াবহ moral hazard: বাজারকে শেখানো হয়, চুক্তি মানার চেয়ে ঋণ বড় করা অধিক লাভজনক। বরং এক হাজার কোটি টাকার সীমার ওপরে গেলেই বাড়তি সুবিধা পাওয়ার ব্যবস্থা ঋণকে আরও বড় করার একটি বিকৃত প্রণোদনা সৃষ্টি করে।
এর মূল্য পরিশোধ করেন সৎ উদ্যোক্তা, আমানতকারী এবং শেষ পর্যন্ত করদাতা। ব্যাংকের মূলধন বহু বছর অনুৎপাদনশীল ঋণে আটকে থাকলে নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হয়। লোকসান গোপন রেখে ব্যাংক টিকিয়ে রাখলে ভবিষ্যতে সেই ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণের দায় রাষ্ট্রের ওপর পড়ে। অর্থাৎ লাভ ব্যক্তিগত থাকে, কিন্তু ক্ষতি সামাজিকীকরণ করা হয়। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের ব্যাংকিং সংকটের পেছনে দুর্বল কর্পোরেট সুশাসন, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান দখল এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার প্রবণতাকে দায়ী করেছে; ২০২৫ সালের শেষে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মূলধন অনুপাত ছিল ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশ।
অবশ্যই যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদ এবং রপ্তানি মন্দায় কিছু ভালো প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বিপদে পড়তে পারে। তাদের জন্য সহায়তা প্রয়োজন, তবে প্রতিষ্ঠানের আকার দেখে নয়, স্বাধীন forensic audit ও ভবিষ্যৎ cash flow যাচাই করে। মালিককে নতুন মূলধন দিতে হবে, নগদ প্রবাহ escrow হিসাবে রাখতে হবে, লভ্যাংশ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অর্থ স্থানান্তর বন্ধ করতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কিস্তি ব্যর্থ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জামানত ও ব্যক্তিগত গ্যারান্টি কার্যকর করতে হবে। ইচ্ছাকৃত খেলাপির ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা ও মালিকানা ধরে রেখে পুনঃতফসিলের কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়।
বর্তমান সরকার বলতে পারে যে এই সংকট তারা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। সেটি আংশিক সত্য। কিন্তু একই খেলাপিদিবান্ধব নীতি আরও সম্প্রসারণ করার পর উত্তরাধিকারের আর অজুহাত হতে পারে না। আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান সরকার যদি একই গোষ্ঠীর জন্য একই ধরনের ছাড় অব্যাহত রাখে, তাহলে বোঝা যায় সরকার বদলেছে, কিন্তু ব্যাংকিং অলিগার্কির ক্ষমতা বদলায়নি। এটি মুক্তবাজার অর্থনীতি নয়; এটি প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের জন্য রাষ্ট্রীয় বীমা।
সরকারের উচিত অবিলম্বে এই নির্বিচার সুবিধা স্থগিত করে সুবিধাভোগীদের নাম, মালিকানা, ঋণের ব্যবহার, জামানত, পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য ও ত্রৈমাসিক অগ্রগতি প্রকাশ করা। একই সঙ্গে অর্থঋণ আদালত ও distressed asset management সংক্রান্ত সংস্কার দ্রুত কার্যকর করতে হবে। খেলাপি ঋণকে নতুন নামে সাজিয়ে অনুপাত কমানো কোনো সংস্কার নয়। প্রকৃত সংস্কার হলো অর্থ উদ্ধার, দায়ী ব্যক্তির সম্পদ জব্দ, ব্যাংক পরিচালকদের জবাবদিহি এবং সৎ ঋণগ্রহীতার জন্য ঋণের পথ খুলে দেওয়া।
অন্যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কথিত ১৮ মাসের রোডম্যাপ খেলাপি ঋণ কমানোর পথ নয়, বরং হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপিদের নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার পথ হিসেবেই ইতিহাসে লেখা থাকবে।
শামীম হায়দার | মহাসচিব, জাকের পার্টি
Shamim Haider | Zaker Party