04/09/2025
জিরো রিটার্নের ফাঁদে করদাতারা
বাংলাদেশে আয়কর রিটার্ন দাখিলের সংস্কৃতি ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক। তবে এর পাশাপাশি এক ধরনের অস্বাস্থ্যকর প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে—যথাযথ তথ্য গোপন করে বা বুঝে না নিয়ে ‘জিরো রিটার্ন’ দাখিল করা। এর ফলে হাজার হাজার করদাতা আজ নানারকম জটিল সমস্যায় জড়িয়ে পড়ছেন।
কিছু বাস্তব ঘটনা
🔹 সম্প্রতি একজন করদাতা আমার কাছে এসে একটি নোটিশের কপি দেখালেন। নোটিশে ৩০ হাজার টাকা ট্যাক্স ডিমান্ড করা হয়েছে। তিনি হতভম্ব—“আমি তো জিরো রিটার্ন দিয়েছি, তবুও কেন ট্যাক্স চাইছে?”
🔹 দুই বছর আগে এক ব্যাংক কর্মকর্তা এক ভদ্রমহিলাকে আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন। তাঁর নগদ টাকা ছিল প্রায় ১ কোটি, কিন্তু তিনি ‘জিরো রিটার্ন’ দিতে চান। আমি বিনয়ের সাথে অপারগতা প্রকাশ করি। আজ সেই মহিলার হাতে ৩০ লাখ টাকার ডিমান্ড নোটিশ। তিনি জানতে এসেছেন আমাদের সেই সময়ের পরামর্শ মতে এখন সমাধান করার সুযোগ আছে কিনা ।
🔹 একজন করদাতা, যার নামে দুটি গাড়ি আছে, সারচার্জ প্রযোজ্য হয় তাই অনলাইনে জিরো রিটার্ন সাবমিট করে দিয়েছেন। ট্যাক্স অফিস থেকে নোটিশ এসেছে —“আপনার নামে গাড়ি থাকা সত্ত্বেও রিটার্নে প্রদর্শন করেননি। আগামী -- --- --- তারিখে শুনানিতে হাজির হোন।”
🔹 একজন করদাতা রিটার্নে শুধুমাত্র চলতি বছরের বিনিয়োগ ৩.৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ট্যাক্স রিটার্নে প্রদর্শন করেছেন । সঞ্চয় পত্রের উৎস কর থাকা সত্ত্বেও রিটার্নে কর পরিশোধ এবং আয় জিরো । ট্যাক্স অফিস থেকে নোটিশ এসেছে — আপনার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ ৪৫ লাখ টাকা। অপ্রদর্শিত বিনিয়োগের কি হবে ?
🔹 অভিজাত অফিসে গিয়েছি । গম্ভীর ভি আই পি করদাতা, মুখে দুশ্চিন্তা । সাম্প্রতিক ডেটা এনালাইস করে সুস্পষ্ট ভাবে বিগত ১০ বছরের ট্যাক্স ফাইল পুনঃ উম্মোচন হয়েছে। সাম্প্রতিক টেকনোলজি বেইজ ডেটা সিস্টেম বা বিশ্লেষণ উনার কোন ভাবেই পছন্দ নয় ।
কেন ঘটছে এমন পরিস্থিতি?
অনলাইনে ট্যাক্স রিটার্ন জমার পদ্ধতি সহজ হয়েছে । সহজ সাবমিট এবং ডকুমেন্টস প্রাপ্তির কারনে আপাতত জবাবদিহিতার কোন সুযোগ নেই কিন্তু সরকারি তথ্য ভান্ডারে ভুল তথ্য বা তথ্য ফাঁকি দেয়া হলে তার সংশোধন কতটা তিক্ত হতে পারে ভুক্তভোগী মাত্রই হয়তো জানেন । অনেকে ভাবছেন —“রিটার্ন জমা দিলেই হলো, সরকার সন্তুষ্ট।” তাই অনেকে তথ্য না বুঝেই জিরো রিটার্ন বা ভুল তথ্য সমেবেত রিটার্ণ দিয়ে দিচ্ছেন। অথচ এনবিআর এখন ব্যাংক, গাড়ি, সঞ্চয়পত্র, জমি—সব তথ্যই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে। ফলে আজ গোপন থাকলেও ভুল রিটার্ণ জমার তারিখে আপনার অন্যান্য ডিজিটাল রেকর্ড কোন ভাবেই মুছে ফেলতে পারবেন না ।
১. রিটার্ন জমা হয়ে গেলেই সব দায় শেষ নয়
২. ভুল পরামর্শ – অনেক সময় অপেশাদার বা অনভিজ্ঞ পরামর্শকরা করদাতাদের ভুল পথে পরিচালিত করছেন।
৩.ডেটার স্বচ্ছতা – সরকারের বিভিন্ন ডাটাবেজ একীভূত হওয়ায় তথ্য গোপন করা তথ্য উদ্ঘাটন পর্যায়ক্রমে আরো সক্রিয় হবে।
রিটার্ন মানে শুধু ফরম পূরণ নয় – এটি আপনার আয়, ব্যয় ও সম্পদের সঠিক প্রতিবেদন।
রিটার্ন জমা করাই সমাধান নয় – আপনার আয় বা সম্পদ থাকলে তা গোপন করলে ভবিষ্যতে নোটিশ, জরিমানা ও সুদ নিশ্চিত।
প্রফেশনাল সাহায্য নিন – অভিজ্ঞ ট্যাক্স কনসালট্যান্ট বা আইনজীবীর সহায়তা ছাড়া জটিল ক্ষেত্রে ভুল করার সম্ভাবনা বেশি।
বাংলাদেশে জিরো রিটার্ন এখন এক ধরনের “শিল্পে” পরিণত হয়েছে। কম্পিউটার দোকান বা ফার্মেসির কর্মীরা অল্প টাকায় রিটার্ন জমা দিচ্ছেন, কিন্তু এর ফলে সাধারণ করদাতারা পরবর্তীতে নোটিশ, জরিমানা ও আইনি জটিলতায় পড়ছেন।
কর প্রশাসন যেমন তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও শক্তিশালী হচ্ছে, তেমনি করদাতাদেরও বুঝতে হবে—রিটার্ন জমা দেওয়া শুধু দায়সারা কাজ নয়, বরং এটি আপনার আর্থিক জীবনের বৈধ সুরক্ষা।