বই পড়ুয়াদের জন্য ৩০টি টিপস
১) বইপড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো পড়ার জন্য বসা! অধিকাংশ মানুষের এই সুযোগটাই হয় না।
২) পড়ার মজা বাড়ানোর একটি কার্যকরী উপায় হলো, বোরিং টপিকের বইগুলো আগে না পড়া।
৩) একটি বই পড়লেই জীবন হয়ত পাল্টে যাবে না। কিন্তু প্রতিদিন বই পড়লে একদিন না একদিন জীবন পাল্টাবে ইনশাআল্লাহ।
৪) নতুন বইয়ের চাইতে সেসব বই বেশি পড়ুন, যেগুলো যুগ যুগ ধরে মানুষ পড়ছে।
৫) জীবনে আপনি কয়টা বই পড়েছেন, সেটা দেখার বিষয় না। দেখুন কয়টা বই আপনার ভিতরে রেখাপাত করতে পেরেছে।
৬) পড়ার সময় মনোযোগ থাকে না? মোবাইল অন্য রুমে রেখে আসুন। মনোযোগ আসতে বাধ্য।
৭) একটি ভালো বই যদি একবার পড়তে হয়, তাহলে সেরা বইগুলো বার বার পড়তে হবে।
৮) বই পড়া শুরু করতে চাইলে 'পড়ুয়া' হওয়া জরুরী না। বরং বই পড়তে পড়তেই একদিন আপনি পড়ুয়া হয়ে উঠবেন।
৯) পড়ার অভ্যাস হারিয়ে ফেলার চেয়ে একটা খারাপ বই ছেড়ে দেওয়া ভালো।
১০) কোনো বই যদি আপনার জীবনে সামান্য পরিবর্তনও এনে থাকে, তাহলে বছরে সেটা একবার হলেও পুনরায় পড়ুন।
১১) যে বই আপনার ভালো লাগেনি, সেটা নিজের কাছে না রেখে অন্যকে গিফট করে দেওয়া ভালো।
১২) বই পড়ার মোক্ষম সময় হলো, যখন আপনি মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকেন।
১৩) সব পাঠককেই এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যখন সে বুঝে উঠতে পারে না তার জন্য কোন বইটি ভালো হবে।
১৪) ওপরের সমস্যাটার সমাধান হলো, সঙ্কোচ না করে বড়দের সহায়তা নেওয়া। তাহলে অনেক সময়, শ্রম দুটোই বেঁচে যাবে।
১৫) একটি সেরা বইয়ের বৈশিষ্ট্য হলো, আপনি চাইলেও সেটা দ্রুত পড়ে ফেলতে পারবেন না। কারণ, সে আপনাকে বার বার থামিয়ে দেবে, ভাবাবে।
১৬) বই পড়ার মূল উদ্দেশ্য হলো কাজে পরিণত করা। মুখস্থ নয়। সুতরাং তথ্য-উপাত্ত মনে রাখার বদলে কাজেকর্মে বাস্তবায়নে বেশি মনোযোগ দিন।
১৭) বই পড়ার অভ্যাস গড়তে চান? তাহলে প্রতিদিন ২ মিনিট করে পড়ার টার্গেট নিন। জি এত ছোট টার্গেট, যাতে আপনার মন অজুহাত দেখানোর সুযোগই না পায়।
১৮) একটি ভালো বইয়ের সারাংশ যে পড়ে, তার চাইতে ১০ গুণ বেশি উপকার পায় সেই ব্যক্তি, যে সারাংশটা লিখে। কাজেই বই পড়া শেষে সারাংশ লিখতে ভুলবেন না।
১৯) কোনো বই পড়ার পর যদি আপনার আচার-ব্যবহারে, চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন না আসে, তাহলে বুঝে নিবেন হয় বইটি ভালো নয় অথবা আপনি কিছুই শিখতে পারেন নি।
২০) প্রচুর বই কিনলেই পাঠক হওয়া যায় না। কথা সত্য। তবে অল্প বই নিয়ম করে প্রতিদিন পড়লে একদিন ঠিকই ভালো পাঠক হয়ে যাবেন।
২১) বই কেনা মানে বিনিয়োগ করা, খরচ নয়। হতে পারে একটি ভালো বই ভবিষ্যতে আপনাকে লক্ষকোটি টাকা আয়ের রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছে।
২২) পড়ার জন্য মোটিভেশন নয়, বেশি দরকার পড়ার পরিবেশ তৈরি করা। একটা সাধারণ বই আপনি লাইব্রেরীতে বসে যত সহজে পড়ে ফেলতে পারবেন, একটি অসাধারণ বই কোলাহল পরিবেশে পড়া ততটাই কঠিন হবে, যদিও বইটা অসাধারণ।
২৩) যেখানেই যান, একটি বই সঙ্গে রাখুন। কারণ, আপনি জানেন না, কখন আপনি বই পড়ার জন্য বাড়তি সময় পেতে যাচ্ছেন।
২৪) একটি বইকে সর্বোচ্চ ৩বার সুযোগ দিতে পারেন (৩টি অধ্যায় পড়ার মাধ্যমে)। এরপরও যদি বইটি ভালো না লাগে, তাহলে অন্য বই ধরুন।
২৫) একজন লেখকের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশংসার বিষয় হলো, যখন সে দেখে পাঠক তার বইটি দাগিয়ে দাগিয়ে পড়েছে, হাইলাইট করেছে, নোট টুকে রেখেছে।
২৬) ছোট বইকে কখনো তুচ্ছজ্ঞান করবেন না। কখনো কখনো ছোট মরীচে ঝাল বেশি হয়।
২৭) আপনার সমস্যা যদি অসংখ্য হয়, তাহলে বইও অসংখ্য পড়ুন। প্রত্যেক নতুন সমস্যারই নতুন বই আছে।
২৮) বই হলো শিক্ষা নেবার সবচেয়ে শর্টকাট রাস্তা। মাত্র ১০০ টাকা খরচ করে আপনি ১০০ দিনের শিক্ষা পেয়ে যেতে পারেন, কিংবা কয়েক বছরের!
২৯) অতীতের ফেলে আসা সময়গুলো যদি বই জন্য পড়ার ভালো সময় হয়ে থাকে, তাহলে আজকে থেকেই পড়া শুরু করলে সেটা হবে সর্বোত্তম সময়।
৩০) একটি ভালো বইয়ের নাম ভুলে যেতে পারেন, বইয়ের আলোচনাও ভুলে যেতে পারেন। কিন্তু শিক্ষাটা আজীবন আপনার মনে গেঁথে থাকবে।
©
Whykong Central Library
“চলুন বিচরণ করি জ্ঞানের রাজ্যে
নাফ সীমান্তে জ্ঞানের বাতিঘরে ”
17/05/2023
জনপ্রিয় লেখক ও ঔপন্যাসিক আহমদ ছফার আত্মজৈবনিক উপন্যাস হচ্ছে ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী। ব্যক্তিগত জীবনে লেখক অবিবাহিত হলেও কিছু নারীর সাথে তাঁর প্রণয়সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সেইসব সম্পর্কের উপর ভিত্তি করেই তিনি এই উপন্যাসের কাহিনী দাঁড় করিয়েছেন। অনেক সাহিত্যিকের মতে, মীর মোশাররফ হোসেন এবং কাজী নজরুল ইসলামের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি মুসলমান লেখক হলেন ছফা।
পুরো উপন্যাস জুড়ে কথক ‘জাহিদ’ তার প্রেয়সীর কাছে অতীত স্মৃতির ভান্ডার উন্মোচন করেন। তার প্রেয়সীকে ‘সোহিনী’ নামে সম্বোধন করেন। সোহিনী সম্পর্কে উপন্যাসে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি৷ তবে সোহিনী তার কাছে অর্ধেক আনন্দ অর্ধেক বেদনা, অর্ধেক কষ্ট অর্ধেক সুখ, অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী। তিনি প্রেয়সী সোহিনীর কাছে মূলত দুইজন নারীর কথা বয়ান করেন। প্রথমজনের নাম ‘দুরদানা আফরাসিয়াব’ যে অত্যন্ত দূরন্ত গতিতে জীবন অতিবাহিত করে। নারী হিসেবে তাকে চেনা দায়! অদ্ভূত তার বেশভূষা! নারীত্ব নিয়ে তার কোনো মাথা ব্যাথা নেই। এই অদ্ভূত চরিত্রের নারীর সাথেই একসময় জাহিদের সুপ্ত প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। দুরদানার দ্বিচক্রযানের পেছনে চড়ে জাহিদ সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। পাশাপাশি অনেকেরই চক্ষুশুল হয়ে উঠে সে। একটা সময় হঠাৎ জাহিদের সামনে দুরদানার নারীত্ব প্রকাশ পেলে তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে সে। দুরদানার ভাই, যিনি রাজনৈতিক নেতা, ইউসুফ জোয়ারদার খুন হয়। ধীরে ধীরে দুজন বিপরীতদিকে চলে যায়।
এরপর জাহিদের জীবনে আসে ‘শামারোখ’। সদ্য স্বামী-সন্তান ছেড়ে আসা অপরূপ সৌন্দর্য্যের অধিকারিণী শামারোখ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকুরীটি পেয়েও হারাতে বসেছেন বিভাগীয় প্রধানের চক্রান্তের শিকার হয়ে। বিচিত্র সব কাহিনীর মধ্য দিয়ে এই জীবন্ত সৌন্দর্য্যের প্রতীক শামারোখের সাথে জড়িয়ে যায় জাহিদ। নিজের নারীত্ব আর অসাধারণ সৌন্দর্য্য দিয়ে যেনো পৃথিবী জয় করতে চায় সে। অল্পকিছুদিনের পথ চলায় জাহিদ এই নারীর বিচিত্র সব রূপ প্রত্যক্ষ করেছিলো, কিন্তু তার সৌন্দর্য্যের আকর্ষণ উপেক্ষা করতে পারেনি সে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও যথাসাধ্য সাহায্য করেছিলো শামারোখকে। কিন্তু একটা সময় এই শামারোখ যুক্তরাষ্ট্র ফেরত কবি শাহরিয়ারের মধ্যে সুখ খুঁজে নেয়। তবে এখানেই দুরদানা ও শামারোখের পরিণতি সমাপ্ত নয়। পরিপূর্ণ উপলব্ধিকরণে পড়তে হবে বইটি।
কিছু রূপক নামের আড়ালে লিখা এই প্রেমকাহিনী শুরুর দিকে চরম মাত্রার বিভ্রান্তি সৃষ্টি করলেও ধীরে ধীরে তাতে আকর্ষণ খুঁজে পাওয়া যায়। তবে বইটি পড়ে আরাম পাইনি। কিছু জায়গায় বিরক্তি জন্ম নিয়েছিলো। কাহিনীর পাশাপাশি প্রচুর জিজ্ঞাসা ও উৎকণ্ঠা নিয়ে চলতে হয়েছে। তবে যুদ্ধ পরবর্তী ঢাকার স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে বইতে। আর আহমদ ছফার কিছু মতবাদ ও উক্তি সত্যিই মনে রাখার মতো ছিলো।
‘নারী আসলে যা, তার বদলে যখন সে অন্যকিছুর প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়, তখন তার আকর্ষণ করার শক্তি হাজার গুণ বেড়ে যায়।’ ‘মনস্তত্ত্বের কারবারিরা নিজেরাই মানসিক রোগী। তাদের সঙ্গে বেশি ঘাটাপিটা করলে অন্যকেও তারা রোগীতে পরিণত না করে ছাড়ে না।’ ‘একজন তরুণ কবি রসিকতা করে বলেছিলেন ঢাকা শহরের কাকের সংখ্যা যতো, কবির সংখ্যা তার চাইতে কম হবে না।’
লেখক: আনিকা তাসনিম সুপ্তিশিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
16/05/2023
পাঠক জীবনের একটা পর্যায়ে সবারই মনে মনে একটা ইচ্ছা জাগে যে আমিও একদিন লেখক হব, এমনি করে লিখব। কিন্তু বেশির ভাগেরই অবস্থা বোধহয় “I wanna a be a writer but I don’t know what to write about!” তুলনামূলক ভাবে বলতে গেলে আমার পাঠক জীবনে এই লেখালেখির ইচ্ছাটা বরাবরই অনুপস্থিত। একটা ভাল লেখার প্রশংসা করতে আমার ভাল লেগেছে, কোন লেখার ব্যাপারে অন্যদের কি মতামত এসব শুনতে ভাল লেগেছে মানে সর্বোপরি একজন তুখোড় পড়ুয়া হয়ে ওঠার ইচ্ছা মনের মধ্যে তো সবসময়ই আছে কিন্তু কেন জানি কোনদিন লেখক হতে ইচ্ছা করেনি । “যদ্যপি আমার গুরু” -এই প্রথম একটি বই কিছুটা আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে যে খুব আটপৌরে বিষয়বস্তুকেও রিপ্রেজেন্টেবল করে লিখলে সেটা থেকেই দারুন এক সৃষ্টি সম্ভব। এর মানে কিন্তু এই না যে বইটি এতটাই পলকা যে পড়ে মনে হয়, “এ আর এমন কি?! আমিও তো এরকম কতই লিখতে পারি?” বরং ঠিক উল্টো। বইটির বিষয়বস্তু দুই গুরু-শিষ্যের দীর্ঘ সময়ব্যাপী আলাপচারিতার নানান দিক। কিন্তু নেহাত ঘোরোয়া আলোচনায় ইতিহাস-সংস্কৃতি, অর্থশাস্ত্র, রাজনীতি, ধর্ম কি যে উঠে আসেনি তাই ভাবতে হয়!
আহমদ ছফা আবদুর রাজ্জাকের সান্নিধ্যে ছিলেন প্রায় সাতাশ বছর। সুদীর্ঘ একটা সময়। সম্পর্কে ছাত্র-শিক্ষক হলেও মনে হয়নি তাদের সম্পর্কটায় আদৌ কোন ফর্ম্যালিটি ছিল। এত দীর্ঘ সময় ধরে কাউকে গুনমুদ্ধ করে রাখা কিন্তু খুব কঠিন ব্যাপার। কিন্তু আবদুর রাজ্জাক পেরেছিলেন, শুধু ছফা নয়, সমসাময়িক অনেক প্রতিভাবানেরাই তাকে গুরুর আসনে আসীন করেছেন। এই মানুষটিকে বিশ্বকোষ বললে বাড়িয়ে বলা হয় না, জ্ঞানের শাখায় শাখায় তার অবাধ বিচরণ। ছাত্রের মনের জানালা খুলে দেয়া শিক্ষক বুঝে এমন কাউকেই বলে। অথচ বিস্তর পড়াশোনা, অগাধ জ্ঞানী এই মানুষটি কখনও নিজে কিছু লেখেননি । আবদুর রাজ্জাক স্যার কেন লেখেননি এই ব্যাপারে ছফা ব্যাখা দিয়েছেন এভাবে, এই মানুষটি তার সমকালীনদের গন্ডি পেরিয়ে এতখানিই উপরে উঠেছিলেন যে তাদের কাতারে নেমে আসা হয়ত একটু মুশকিল হত তাঁর জন্য। আবদুর রাজ্জাক স্যারকে সমালোচনাও কিন্তু তাকে কম শুনতে হয়নি। তৎকালীন বহু বিখ্যাত ও বিশ্বনন্দিত ব্যক্তিদের নাম উঠে এসেছে ভাল মন্দ নানা প্রসংগে। উজ্জল একটি নক্ষত্রের মত এই মানুষটির ব্যক্তিজীবন ছিল খুব অদ্ভূত। খাঁটি ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলতেন, কাপড়-চোপড়ের নেই কোন আড়ম্বর, খেতেও ভালবাসেন যা কিছু বাঙালী। অথচ তিনি কতটা বিশ্বজনীন প্রখর দৃষ্টির অধিকারী এই ব্যাপারে ছফা মন্তব্য করেছেন, “নিজেস্ব সামাজিক অবস্থানের ওপর দাঁড়িয়ে এবং নিজের সামাজিক পরিচিতির আদি বৈশিষ্ট্যসমূহ গৌরবের সাথে ধারণ করে একটি বিশ্বদৃষ্টির অধিকারী হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়।”
আমি বইটি পড়ার সময় আবদুর রাজ্জাক স্যারকে যতটা না লক্ষ্য করেছি মনের অজান্তেই আহমদ ছফার উপর নজর রেখেছি তার চেয়ে বেশি। সাতাশ বছর – এত দীর্ঘ সময়ের নানা কখনপোকথন থেকে আহমদ ছফা যে বিষয় গুলোকে আঁজলা ভরে তুলে নিয়েছেন সেগুলো আসলে আমার মনে হয় আবদুর রাজ্জাক নয়, আহমদ ছফাকেই বেশি সংজ্ঞায়িত করেছে। যে বিষয় গুলোতে তার মুগ্ধতা বেশি ছিল, স্যারের যে কথা গুলো তিনি ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন সেগুলোই তুলে এনেছেন তার বইতে। ভূমিকায় তিনি বলেছেন আবদুর রাজ্জাক স্যারের অনেক কথায় হয়ত অতি সংবেদনশীলেরা নিতে পারবে না, আবার অনেক কথার ভুল ইন্টারপ্রিটেশনে স্যারও রুষ্ঠ হবেন। তাই দুটো ব্যাপারে ছফাকে লক্ষ্য রাখতে হয়েছে। আবদুর রাজ্জাকের “Wit” গুলোও জায়গা বিশেষে সুন্দর করে খাপে মিলিয়েছেন যাতে করে নেহাত দুটি অচেনা-অজানা মানুষের কখনপোকখন পড়ে আমরা বিরক্ত না হয়ে যায়! অগাধ জ্ঞানের পাশাপাশি কাঁঠালের এঁচোড় বিষয়ক ঘটনার অবতারণা আবদুর রাজ্জাক স্যারের মানবীয় গুনাবলি প্রকাশ করেছে তো বটেই। হেনরী কিসিঞ্জারের সাথে দেখা করতে যাওয়ার ঘটনাও এক মজার ব্যাপার। আহমদ ছফার মুন্সীয়ানায় তাই আমি মুগ্ধ – ঠিক কতটুকু সিরিয়াসনেসের সাথে কতটুকু কৌতুক জুড়ে দিলে আমরাও আবদুর রাজ্জাক স্যারকে ভালবেসে ফেলব উনি তা মাথায় রেখেই এই বই লিখেছেন। অনেকে অনেক প্রশ্ন হয়ত তুলেছেন আহমদ ছফার উদ্দেশ্য কি ছিল এই বইটি লেখার পিছনে, নিজের গুরুর মহত্ব তুলে ধরা নাকি আবদুর রাজ্জাক স্যারের নানান বক্তব্যের ব্যাখ্যা প্রদান ইত্যাদি। আমার কাছে মনে হয়েছে আহমদ ছফা এই অসাধারন মানুষটির সান্নিধ্যের স্বাদ কিছুটা হলেও আমাদের কাছে পৌছে দিতে চেয়েছেন এই বইটির মধ্য দিয়ে। দুজন অসম বয়সী বন্ধুর টুকরো টুকরো আলাপচারিতার স্মৃতিচারণ বলে একে মেনে নিতেও আমার আপত্তি নেই।
বইটি আরেকটি কারনে প্রশংসার দাবি রাখে তা হল এর অসংখ্য রেফারেন্স। ইতিহাস, ধর্ম, অর্থনীতি, রাজনীতি, সাহিত্য এত এত বিষয় দুজনের আলাপচারিতায় উঠে এসেছে যে কেউ যদি এসব বিষয়ে আরও পড়াশোনা করতে চান তাহলে রেফারেন্স হিসাবে কি পড়বেন আমাদের আলোচ্য গুরুর কাছ থেকে তা ভালই জেনে নিতে পারবেন। বাংলার সুলতান থেকে শুরু করে জিন্নাহ, বঙ্কিম থেকে শুরু করে টলস্টয়, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত থেকে বিথোভেনের মুনলিট সোনাটা, মার্ক্স-এঙ্গেলস থেকে অ্যাডাম স্মিথ, ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্র কিংবা সেক্যুলারিজম সবই তাদের আলোচনায় একে একে উঠে এসেছে। এমন নয় যে আপনি এসব সম্পর্কে বিস্তর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ পাবেন এ বইয়ে, কিন্তু জ্ঞানের নানা শাখার সূত্র ধরিয়ে দিতে অবশ্যই সক্ষম হবে বলে আশা রাখছি। আবদুর রাজ্জাক স্যার নিজেই একবার আহমদ ছফাকে বলেছিলেন, “ প্রথম লাইব্রেরীতে ঢুইক্যাই আপনার টপিকের কাছাকাছি যে যে বই পাওন যায় পয়লা একচোটে পইড়া ফেলাইবেন। তারপর একটা সময় আইব আপনে নিজেই খুইজ্যা পাইবেন আপনার আগাইবার পথ।” আর আমার মনে হয়েছে “টপিক” টা কি বেছে নেব সেটারই নানান পথ বাতলে দিয়েছেন লেখক এই বইটিতে।
আবদুর রাজ্জাক স্যার বই পড়া প্রসঙ্গে খুব দারুন একটা কথা বলেছেন, “পড়ার কাজটি অইল অন্যরকম। আপনে যখন মনে করলেন, কোনো বই পইড়্যা ফেলাইলেন, নিজেরে জিগাইবেন যে বইটা পড়ছেন, নিজের ভাষায় বইটা আবার লিখতে পারবেন কিনা। আপনের ভাষার জোর লেখকের মতো শক্তিশালী না অইতে পারে, আপনের শব্দভান্ডার সামান্য অইতে পারে, তথাপি যদি মনে মনে আসল জিনিসটা রিপ্রোডিউস না করবার পারেন, ধইর্যা নিবেন , আপনের পড়া অয় নাই।” এই কথাটার সাথে নিজের মিল খুঁজে পেলাম। কারন আমার মনে হয় আমিও রিভিউ লিখি ঠিক একই কারনেই – যতটা না অন্য পাঠকদের বইটির কথা জানানোর জন্য তার চেয়েও বেশি আমি নিজের মধ্যে বইটা নিতে পেরেছি কিনা উপলব্ধি করার জন্য। দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল আহমদ ছফার এই বইটি পড়ার। সত্যি বলতে এই প্রথম তার লিখা পড়লাম। তাই হালখাতা খুলতে “যদ্যপি আমার গুরু”ই বেছে নিয়েছি। দুটো মানুষের দৈনন্দিন সম্পর্ক আর আটপৌরে আলাপও যেন সাগর থেকে তুলে আনা মণি-মুক্তোর মত অমূল্য রত্ন। এই সুন্দর বইটা আসলে চমৎকার একটা অভিজ্ঞতার মত মনে হল।
©Manzila
23/04/2023
বই দিবসের শুভেচ্ছা সকলকেই
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Contact the business
Telephone
Website
Address
৪৭৫০
Opening Hours
| Monday | 09:00 - 17:00 |
| Tuesday | 09:00 - 17:00 |
| Wednesday | 09:00 - 17:00 |
| Thursday | 09:00 - 17:00 |
| Saturday | 09:00 - 17:00 |
| Sunday | 09:00 - 17:00 |
