20/09/2021
৫৫. ডেথ ভ্যালি
(পৃষ্ঠা ২২-২৫)
২২
আহমদ মুসা যে জায়গাটায় যেতে চায় সেটা নূর ইউসুফরা যেখানে থাকে তার পাশেই। রক ক্রিক নদী থেকে যে ছড়াটা পশ্চিম দিকে ঢুকেছে, তার শেষ মাথার ডান পাশে মানে উত্তর পাশে থাকে নুর ইউসুফরা। আহমদ মুসা যে জায়গটা দেখতে চায় সেটা নূর ইউসুফদের বাসস্থান থেকে শুরু হয়ে ছড়াটার মাথা হয়ে দক্ষিণ দিকে একশাে গজের মত এগিয়ে পাহাড়ের দেয়ালে গিয়ে শেষ হয়েছে। ছড়ার দক্ষিণ ধার ঘেষে মাথা পর্যন্ত এসে পাহাড়ের দেয়ালটা দক্ষিণ দিকে বেঁকে গিয়ে অর্ধবৃত্তাকার প্রায় সমতল একটা পকেট সৃষ্টি করেছে। ছড়ার মাথার সামনে দিয়ে যাওয়া প্যাসেজটা এই কারণেই একশাে গজের মত দীর্ঘ হতে পেরেছে। প্যাসেজটার দক্ষিণ মাথাটা ঢুকে গেছে পাহাড়ের ঐ পকেটে। এই পকেটের শেষ মাথাটা পর্যন্ত দেখতে চায় আহমদ মুসা। | ছােটখাটো আগাছা, লতা-গুল্ম মাড়িয়ে চলছে আহমদ মুসারা । পায়ের নিচে শক্ত পাথরের উপরে মাটির পাতলা লেয়ার । পুরু লেয়ার সম্ভবত গড়ে উঠতে পারেনি বৃষ্টির কারণে। বৃষ্টির পানিতে অব্যাহত ভাবেই কিছু কিছু করে মাটি ধুয়ে নিচের ছড়ায় নেমে যায়। মাটির পাতলা লেয়ারেই জন্মেছে ঘাস, গুল্ম জাতীয় আগাছা। পাথরের জোড়াগুলােতে মাটির লেয়ার পুরু। এসব জায়গাতেই জন্মেছে ছােট ছােট গাছ, লতা-পাতার ঝােপ। এসব মাড়িয়ে, কখনও পাশ কাটিয়ে সামনে এগােতে হচ্ছে আহমদ মুসাদের ।
সামনে এগােবার এ প্যাসেজটা আড়াই থেকে তিন গজের মত প্রশস্ত । পশ্চিম পাশ বরাবর খাড়া পাহাড়ের দেয়াল। পাহাড়ের গা একেবারেই নগ্ন । খাড়া বলেই গায়ে ধুলা-বালি জমতে পারে না, তার উপর রয়েছে। বৃষ্টির আঘাত। আর পুব পাশেও পাহাড়ের খাড়া দেয়াল নেমে গেছে। নচের গভীর খাড়িতে। ভীতিকর এক দৃশ্য। সে দৃশ্য এড়াতেই যেন। সবাই হাঁটছে প্যাসেজের পশ্চিম পাশের পাহাড়ের গা ঘেষে ।
আহমদ মুসার সন্ধানী দৃষ্টি পায়ের তলার রাস্তার গঠন, পাশের পাহাড়ের গা, পাথরের রকম ইত্যাদি সব বিষয়েই চোখ বুলাচ্ছিল ।
পাহাড়ের সামনের দেয়াল পর্যন্ত পৌছল তারা।
প্যাসেজের মাথা যেখানে শেষ হয়েছে সে দেয়ালটাও খুঁটে খুঁটে দখল আহমদ মুসা। আনন্দিত হবার মত কিছুই পেল না।
২৩
পেছন ফিরে চারদিকে তাকাল আহমদ মুসা। তার মন বলছে, দিব্য দৃষ্টিতে যেন সে দেখতেও পাচ্ছে, এ যেন চলাচলের একটা পথ ।
স্যার, আপনি যেন কিছু খুঁজছেন।' বলল মরিয়ম মারুফা।
‘হ্যা মারুফা, খুঁজতেই তাে এসেছি। কিন্তু পাচ্ছি না কিছু।' আহমদ
মুসা বলল। |
‘কি খুঁজতে এসেছেন স্যার?' বলল দাউদ ইব্রাহিম।
‘কি খুঁজছি আমি নিজেও জানি না। কিন্তু কেন জানি আমার মনে। হচ্ছে, এটা চলাচলের একটা পথের মত।’ আহমদ মুসা বলল।
সবাই আহমদ মুসার দিকে তাকাল। সবার চোখেই বিস্ময় দৃষ্টি।
বলল নূর ইউসুফ, ‘একে আপনার চলাচলের পথ মনে হলাে কেন? আমরা ছাড়া তাে এখানে কেউ বাস করে না। আর সামনেও দেখুন। পাহাড়ের দেয়ালে, ঐ দিকের পথটা যে একেবারেই বন্ধ সেটা আপনিও। দেখেছেন। এটা চলাচলের পথ হতে পারে কেমন করে?'
আহমদ মুসা পশ্চিম পাশের পাহাড়ের দেয়ালের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল । ঐভাবে থেকেই বলল, ‘এর উত্তর আমিও জানি না। আমার মনে হয়েছে তাই বললাম।’
আহমদ মুসার দু'চোখের দৃষ্টি হঠাৎ তীক্ষ হয়ে উঠল। আহমদ মুসা। এগিয়ে গেল পশ্চিম পাশের পাহাড়ের দেয়ালের দিকে। দাঁড়াল তুলনামূলকভাবে মসৃণ একটা পাথরের সামনে। আরও ভালােভাবে তার চোখে পড়ল, পাথরের গায়ের সমান্তরালে কিছু জায়গা জুড়ে আঁকা-বাঁকা। রেখায় পাথরের গায়ে ধুলা-মাটি যেন বেশি জমেছে। আহমদ মুসা। পকেট থেকে চাকু বের করে চাকুর আগা দিয়ে আঁকা-বাঁকা গােটা রেখা। থেকে ধুলা-মাটি সরিয়ে দিল । | সবাই আহমদ মুসার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। সবাই দেখছে। আহমদ মুসার কাজ। | ধুলা-মাটি সরানাের পর রেখাগুলাে স্পষ্ট হয়ে উঠল ।।
রেখাগুলাের ঢেউ খেলানাে রূপ দেখে ভ্র-কুঞ্চিত হলাে আহমদ মুসার । চোখ তার উজ্জ্বল হয়ে উঠল ।।
পেছন ফিরে সবার দিকে তাকিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘রেখাগুলাে। দেখে আপনাদের কি মনে হচ্ছে বলুন তাে?”
২৪
সবাই ভালাে করে তাকাল।
আপনি কি মনে করছেন রেখাগুলাে প্রাকৃতিক নয়, মানুষের তৈরী? বলল নুর ইউসুফ।
‘আমার তাই মনে হচ্ছে, আপনাদের মত জানতে চাচ্ছি । মুসা বলল ।।
নুর ইউসুফদের সবার চোখে-মুখে বিস্ময়! দ্রুত কথা বলে উঠল মরিয়ম মারুফা, ‘মানুষের তৈরি? মানুষ আসবে কোথেকে এখানে? কেনই বা পাথরে আঁকবে ওসব?'
‘কেন আঁকবে এটাই তাে খোঁজার বিষয়। তার আগে কি একেছে এটা জানার বিষয়।’ আহমদ মুসা বলল।
“কিন্তু রেখাগুলাের কোন অর্থ আছে বলে মনে হচ্ছে না।' বলে দাউদ ইব্রাহিম।
দাউদ ইব্রাহিম, মরিয়ম মারুফা, তােমরা ছােটবেলায় এ রকম কি একেছ কি না, স্মরণ কর ।’ আহমদ মুসা বলল ।
দু’জনের চোখে-মুখে ভাবনার চিহ্ন ফুটে উঠেছে। ভাবছে দু’জনেই ।
মরিয়ম মারুফাই প্রথম আনন্দে চিৎকার করে উঠল। বলল, মেঘের ছবি আমরা এভাবে আঁকতাম।
‘ঠিক মারুফা।’ দাউদ ইব্রাহিম বলল ।
‘হা, তােমরা ঠিকই বলেছ, এটা মেঘের সিম্বলিক ছবি ।’ বলল আহমদ মুসা।
কিন্তু কে আঁকবে? কেন আঁকবে?’ নূর ইউসুফ বলল ।
‘কেন একেছে, আমি বােধ হয় বুঝেছি জনাব।' বলল আহমদ মুসা ।
‘কোন উদ্দেশ্য নিয়ে এঁকেছে? সেটা কি?' বলল নুর ইউসুফই ।।
আহমদ মুসা শূন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে চাইল। ভাবল একটু। তাকাল আবার সেই আঁকা-বাঁকা রেখাগুলাের দিকে। চোখ নামিয়ে আরও একটু নিচে তাকাল গরুর দুই শিং দিয়ে তৈরি অস্পষ্ট একটা সার্কেলের দিকে । বলল, ‘মেঘের সিম্বল একে উপরের দিকে ইংগিত করা হয়েছে। আর এটা একেছে এই এলাকার পিসকাটাওয়ে রেড ইন্ডিয়ান ট্রাইব। | ‘পিসকাটাওয়ে রেড ইন্ডিয়ান ট্রাইব?’ নুর ইউসফরা প্রায় একসাথে বলে উঠল ।
২৫
‘হ্যা, পিসকাটাওয়ে রেড ইন্ডিয়ান ট্রাইব।’ বলল আহমদ মুসা।
তা অনেক আগের কথা। ওরা এখানে আসবে কেন? কেনইবা আকবে এই মেঘের সিম্বল? আর এটা বুঝা গেল কি করে যে, ওটা পিসকাটাওয়ে রেড ইন্ডিয়ানদের কাজ?' বলল নূর ইউসুফ।
আহমদ মুসা রেখাগুলাের নিচে গরুর দুই শিং-এর সার্কেলের দিকে ইংগিত করে বলল, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য পূর্ব উপকলের রেড ইন্ডিয়ান, বিশেষ করে পিসকাটাওয়ে রেড ইন্ডিয়ানরা এই সিম্বল ব্যবহার
করে থাকে।’
মূহুর্তের জন্যে থেমেই আবার শুরু করল আহমদ মুসা, ‘পিসকাটাওয়ে রেড ইন্ডিয়ান পটোম্যাক নদীর তীরসহ রক ক্রিক নদীর এই এলাকাতেই বাস করতাে। পিসকাটাওয়ে একটা গ্রামের নাম ছিল । পিসকাটাওয়ে থেকেই পটোম্যাক নদীর নাম হয়েছে ।
পটোম্যাককে এক সময় বলা হতাে পাটাওমেক, সেখান থেকেই পটোম্যাক। পটোম্যাক থেকে এই রক ক্রিক হয়ে পশ্চিম-উত্তরে ওয়াশিংটন ডিসি ও মেরিল্যান্ডের ওকোমা পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে পিসকাটাওয়ে রেড ইন্ডিয়ান ট্রাইবের বাস ছিল । তারা প্রধানত বাস করত নদীর তীর এলাকায়। এই রক ক্রিক নদীর তীর এলাকাতেও । আমার নিশ্চিতই মনে হচ্ছে এই সংকীর্ণ প্যাসেজটা এক সময় সংকীর্ণ ছিল না। চলাচলের একটা প্রশস্ত পথ ছিল। পাহাড়ের দেয়ালে পাথরের গায়ে তাদের সিম্বল ও মেঘের ড্রইং এটাই প্রমাণ করছে।’
‘কিন্তু পথ কোথায়? পাহাড়ের দেয়ালে প্যাসেজটা তাে থেমে গেছে?’ বলল নূর ইউসুফ।
মরিয়ম মারুফাদের চোখে বিস্ময় দৃষ্টি! নূর ইউসুফ থামতেই মরিয়ম মারুফা বলে উঠল, 'স্যার, আমাদের এলাকা ও এলাকার। ইতিহাস সম্পর্কে আপনি যা বললেন তার কিছুই আমরা জানি না। পিসকাটাওয়ে রেড ইন্ডিয়ানরা ওয়াশিংটন ডিসি এলাকায় বাস করত, এটুকুই মাত্র জানি ।
‘জানার সময় শেষ হয়ে যায়নি মারুফা । আর মানুষের আবাল্য পরিচয়ের জায়গা সম্পর্কে জানার আগ্রহ কম থাকাটাই স্বাভাবিক।’
আহমদ মুসা থামল ।

09/09/2021
18/03/2020
27/02/2020
14/12/2019