18/08/2026
জাপানি কোম্পানির লোকাল পার্টনার হয়ে ৪০ হাজার কোটি টাকার দুটি মেগা ব্রিজ প্রজেক্টের কাজ পেতে যাচ্ছে সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রভাবশালীর সন্তান সাইদ ইব্রাহিমের প্রতিষ্ঠান 'স্টালিয়ন ক্যাপিটাল'। সম্প্রতি উঠে আসা কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট (স্বার্থের দ্বন্দ্ব) ও রাজনৈতিক প্রভাবের নানা অভিযোগের জবাবে সাইদ ইব্রাহিম একটি ফেসবুক পোস্ট দেন। তবে সেই জবাবে মূল অভিযোগগুলোর স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে বিষয়টিকে অন্য খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠে এসেছে।
অভিযোগের মূল জায়গা ও সাইদ ইব্রাহিমের জবাব
উত্থাপিত অভিযোগগুলোর মূল কথা ছিল—অবকাঠামো বা বড় কোনো ফিজিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচারে কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একটি দুই বছর বয়সী প্রতিষ্ঠান এত বড় প্রজেক্টের 'লোকাল পার্টনার' হয়ে গেল?
এর জবাবে সাইদ ইব্রাহিম তাঁর ফেসবুক পোস্টে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ এবং এনসিপির সমালোচনা করলেও নিজের প্রতিষ্ঠানের ইনফ্রাস্ট্রাকচার সংক্রান্ত কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতার উদাহরণ দিতে পারেননি। তিনি দাবি করেন, তিনি ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজে ১০০ কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক পোর্টফোলিও বিনিয়োগ (FPI) এনেছেন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট (FPI) এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। FPI মূলত শেয়ার বা বন্ডে স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ, যেখানে ব্যবসার বা প্রজেক্টের সরাসরি পরিচালনায় অংশ নিতে হয় না। অন্যদিকে, সেতুর মতো মেগা প্রকল্পে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI), যার জন্য অবকাঠামোগত ও কারিগরি অভিজ্ঞতা অপরিহার্য।
জাপানি কোম্পানি 'মিয়াগাওয়া কেনসেতসু' ও এর অস্পষ্টতা
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই প্রকল্পের মূল জাপানি কোম্পানি Miyagawa Kensetsu-এর ক্যাপিটাল মাত্র ৮০ মিলিয়ন ইয়েন (প্রায় ০.৫ মিলিয়ন ডলার) এবং তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে তারা মূলত পোর্ট ও কোস্টাল প্রজেক্টের কথা উল্লেখ করেছে। এখন পর্যন্ত তাদের বড় কোনো ব্রিজ নির্মাণের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। ২০০৮ সালে সম্পন্ন করা তাদের সর্বোচ্চ বড় কাজটি ছিল ২.৫ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রজেক্ট, যেখানে তারা যৌথভাবে যুক্ত ছিল।
জাপানি প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটিকে মূলত একটি ছোট ও মাঝারি (SME) আকারের কোম্পানি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার কর্মী সংখ্যা মাত্র ৩৪ জন। এমনকি ২০২০ সালে এই কোম্পানিটি যখন বরিশাল অঞ্চলে ব্রিজ তৈরির প্রস্তাব নিয়ে মন্ত্রিসভার অর্থনৈতিক সংক্রান্ত কমিটিতে যায়, তখন কোনো অগ্রগতি হয়নি। অথচ, সেই কোম্পানিটিকেই এখন ৩.৪ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা) মেগা প্রজেক্টের যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
'কনসালটেন্ট' নাকি 'লোকাল পার্টনার'?
সাইদ ইব্রাহিম পোস্টে দাবি করেছেন, স্টালিয়ন ক্যাপিটাল মূলত কন্সাল্টেন্সি এবং বিনিয়োগ আনার কাজে যুক্ত থাকবে, সেতু নির্মাণে নয়। কিন্তু তাদের নিজেদের ওয়েবসাইটের তথ্য ও সম্প্রতি প্রকাশিত সংবাদের তথ্য বলছে ভিন্ন কথা।
স্টালিয়ন ক্যাপিটালের ওয়েবসাইটে স্পষ্ট বলা আছে, তারা এই প্রজেক্টের "Key local partner and investment consultant"। কেবল পরামর্শক নয়, ওয়েবসাইটটিতে তারা ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রোকিউরমেন্ট ও কনস্ট্রাকশন (EPC) এবং টার্নকি সার্ভিসেস প্রদানের কথাও গর্বভরে উল্লেখ করেছে। এক মেগা প্রজেক্টের কনসালটেন্সি করা প্রতিষ্ঠান নিজেদের McKinsey বা BCG-এর মতো গ্লোবাল কনসালটেন্সি ফার্মের সাথে তুলনা করলেও, ওয়েবসাইটে তারা অবকাঠামো খাতে নিজেদের "প্রুভেন ট্র্যাক রেকর্ড" দাবি করছে—যা বাস্তবে অনুপস্থিত।
কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্টের প্রশ্ন সাইদ ইব্রাহিমের পিতা সালাহউদ্দিন আহমেদ বর্তমানে সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন ব্যক্তিত্ব। সাইদ ইব্রাহিম দাবি করেছেন, তাঁর পিতা সেতু বিভাগের দায়িত্বে না থাকায় এখানে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা স্বার্থের দ্বন্দ্ব (Conflict of Interest) নেই। কিন্তু নিরপেক্ষ মহলের মতে, সরকারি উচ্চপর্যায়ে পরিবারের সদস্য থাকা অবস্থায় অনভিজ্ঞ কোনো প্রতিষ্ঠানের এত বড় মেগা প্রজেক্টের আলোচনায় যুক্ত হওয়া স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
বর্তমানে অর্থনৈতিক অবস্থা ও বৈদেশিক বিনিয়োগ সংক্রান্ত আলোচনা যখন তুঙ্গে, তখন ৪০ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রজেক্টে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও সঠিক যাচাই-বাছাই (Diligence) নিশ্চিত করা না হলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।