Hello
Online books store - বাংলা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,কাজী নজরুল ইসলাম,হ?
11/10/2014
ইয়াদের বাড়ি একটা হুলস্থুল
ব্যাপার।বাইরে থেকে মনে হয়
জেলখানা। গেটটাও এমন
যে বাইরে থেকে কিছূই দেখা যায় না।
বড় গেট কখনো খোলা হয় না।বড়
গেটের
সঙ্গে আছে একটা খোকা গেট।
অনেক ধাক্কাধাক্কির পর
সেটা খোলা হয়। বাড়িতে ঢুকতে হয়
মাথা নিচু করে। একবার ঢোকার পর
সঙ্গে সঙ্গে ছুটে বের
হয়ে যেতে ইচ্ছা করে—কারণ তীব্র
বেগে দু’টা অ্যালসেশিয়ান ছুটে আসে।
এদের একজন কুচকুচে কালো,
অন্যজন ধবধবে শাদা। রঙ ভিন্ন
হলেও এদের স্বভাব অভিন্ন, দু’জন
ভয়ংকর হিংস্র, এদের একজনের
নাম টুর্টি, অন্যজনের নাম ফুর্টি।
দারোয়ান বলে—চুপ টুর্টি-ফুর্টি।
এরা চুপ করে, তবে এমনভাবে তাকায়
যাতে মনে হয় যে-
কোনো সুযোগে এরা ঘাড়
কামড়ে ধরবে।
গেট থেকে বাড়ি পর্যন্ত
যেতে খানিকক্ষণ বাগানের ভেতর
দিয়ে হাঁটতে হয়। সেই বাগানও দারুন
বাগান। এদের বাড়ি দোতলা—
সিড়ি মার্বেল পাথরের।বাড়ির
বারান্দায় ইউ আকৃতিতে কিছু বেতের
চেয়ার বসানো। মনে হয় প্রতিদিন
চেয়ারগুলিতে রঙ করা হয়, কারণ
যখনি আমি দেখি—ঝকঝক করছে।
চেয়ারের গদিগুলির রঙ হালকা সবুজ।
শাদা ও সবুজে যে এত সুন্দর
কম্বিনেশন হয় তা ইয়াদদের
বাড়িতে না এলে কখনো জানতে পারতাম
না।
ঠিক মাঝখানের বেতের চেয়ারে নীতু
বসে ছিল।নীতু হল নায়িকা-স্বভাবের
মেয়ে। সব সময়
সেজেগুজে থাকে এবং নায়িকাদের
মতো চোখে থাকে সানগ্লাস। দিন-
রাত সব সময়ই সানগ্লাস।
তাকে যখনি দেখি তখনি মনে হয়—
সে পার্টিতে যাচ্ছে,
কিংবা পার্টি থেকে ফিরেছে।
স্বাভাবিক ভঙ্গিতে এই
মেয়েটিকে একবার আমার
দেখতে ইচ্ছা করে। সেটা বোধহয়
সম্ভব না।
আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল,
হাসিমুখে বলল—যাক,
আপনাকে তাহলে পাওয়া গেল! ও খুব
ব্যাকুল হয়ে আপনাকে খুঁজছে।
‘ব্যাপার কি খোঁজ নিতে এলাম।’
‘ব্যাপার কি আমি জানি না, ভিক্ষুক
সম্পর্কিত কিছু হবে। আমি জানতেও
চাইনি। আপনাকে এমন লাগছে কেন?
‘কেমন লাগছে?’
‘মনে হচ্ছে ম্যানহোলের গর্তের
কাজ করছিলেন—কাজ বন্ধ
করে বেড়াতে এসেছেন।
ফিরে গিয়ে আবার কাজ শুরু করবেন।’
‘এতটা খারাপ?’
‘হ্যাঁ, এতটাই খারাপ।
আপনি কি গোসল করেন, না করেন
না?’
‘শীতের সময় কম করি—।’
‘বাথটাবো গরম
পানি দিলে আপনি কি গোসল
করবেন?’
‘আমার প্রয়োজন নেই।
নোংরা থাকতে ভাল লাগছে।’
‘নোংরা থাকতে ভাল লাগছে মানে!
এটা কোন ধরণের কথা?’
‘রসিকতা করার চেষ্টা করছি।’
নীতু ঠোট বাঁকিয়ে বলল,
রসিকতা বলে আমার
কাছে মনে হচ্ছে না। আপনি আসলেই
নোংরা থাকতে ভালবাসেন। যাই
হোক—আমার জন্যে হলেও
দয়া করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন
হয়ে আসুন। আপনার
সঙ্গে খানিকক্ষণ কথা বলি।
আপনাক নতুন একসেট কাপড় দিচ্ছি।
গায়ের কাপড়
বাথটাবে রেখে আসবেন।
ইস্ত্রি করে আপনার
কাছে পাঠিয়ে দেয়া হবে।’
আমি হাসলাম। নীতু বলল, হাসবেন
না। হাসির কোনো কথা বলিনি। যান,
বাথরুমে ঢুকে পড়ুন। কুইক।
একদল মানুষ আছে—বাথরুম
প্রেমিক। তারা অন্য কিছুতেই মুগ্ধ
হয় না, বাথরুম দেখে মুগ্ধ হয়।
আমি সেই দলে পড়ি না, কিন্তু
ইয়াদের বাড়ির
বাথরুমে ঢুকে খানিকক্ষণ চুপচাপ
থেকে মনে-মনে বলি—‘এ কী!’ আজ
আবার বললাম। বাথটাব ভর্তি পানি।
সেই বাথটাব এতবড়
যে ইচ্ছা করলে সাঁতার কাটা যায়। ডুব
দেয়া যায়। গোসল করতে-
করতে ‘সংগীত শ্রবণের’
ব্যবস্থা আছে। সংগীতের কন্ট্রোল
অবশ্যি বাইরে। যে-রেকর্ড
বাজানো হবে, স্পীকারের
মাধ্যমে তা চলে আসবে বাথরুমে।
এখন গান হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ
বেঁচে থাকলে আহত হতেন, কারণ
বাথটাবে শুয়ে আমি শুনছি তাঁর মায়ার
খেলা। সখী বলছে,
ওগো কেন, ওগো কেন মিছে এ
পিপাসা।
আপনি যে আছে আপনার কাছে
নিখিল জগতে কী অভাব আছে—
আছে মন্দ সমীরণ, পুষ্পভূষণ,
কোকিল, কুজিত কুঞ্জ।
প্রায় ঘণ্টাখানিক
বাথরুমে কাটিয়ে বের হয়ে এলাম।
গায়ে ধবধবে শাদা পায়জামা-
পাঞ্জাবি, একটা হালকা নীল উলের
চাদর। পায়ে দিয়েছি চটিজুতো।
সেগুলিও নতুন। আয়নায়
নিজেকে দেখে নিজেরই
লজ্জা লাগছে। নীতু বলল, বাহ,
আপনাকে ভাল দেখাচ্ছে! আসুন,
চা খেতে আসুন।
বিভিন্ন খাবারের জন্যে এদের
বিভিন্ন ঘর আছে। চা খাবার
জন্যে আছে টী-রুম। আমরা দু’জন টী-
রুমে বসলাম। পটভর্তি চা।
সঙ্গে অ্যাশট্রে এবং টিনভর্তি সিগারেট।
নীতু বলল, চা নিন। সিগারেট নিন।
যাবার সময় টিনটা নিয়ে যাবেন।
এটা আপনার জন্যে।
‘আচ্ছা, নিয়ে যাব।’
‘এখন আপনার সঙ্গে আমি কিছুক্ষণ
খোলামেলা কথা বলব।
যা জানতে চাইব
আপনি দয়া করে উত্তর দেবেন।’
‘দেব।’
‘ইয়াদ আপনার কি রকম বন্ধু?’
‘ভাল বন্ধু।’
‘ভাল বন্ধু যদি হয়
তাহলে ওকে আপনি গাধা বলেছিলেন
কেন?’
‘গাধা একধরণের আদরের ডাক।
অপরিচিত বা অর্ধ-পরিচিতদের
গাধা বলা যাবে না।
বললে মেরে তক্তা বানিয়ে দেবে।
প্রিয় বন্ধুদেরেই গাধা বলা যায়।
এতে প্রিয় বন্ধুরা রাগ করে না।
বরং খুশি হয়।’
‘আপনি কি জানেন ইয়াদ অন্য
দশজনের মতো নয়? সে সবকিছু
সিরিয়াসলি নেয়। আপনি গাধা বলায়
সে সারা রাত ঘুমায়নি—
জেগে বসে ছিল—একটা খাতায় নোট
করছিল কেন
তাকে গাধা বলা যাবে না।’
‘আমি হাসতে-হাসতে বললাম,
সে যা করছিল গাধা বলার
জন্যে তা কি যথেষ্ট নয়?’
‘না, যথেষ্ট নয়।
ভবিষ্যতে কখনো তাকে গাধা বলবেন
না এবং তার মাথায় কোন অদ্ভুদ
আইডিয়া ঢুকিয়ে দেবেন না।’
‘আমি ওর মাথায় কোনো অদ্ভুদ
আইডিয়া ঢোকাইনি।’
‘ঢুকিয়েছেন—আপনি ওকে বলেছেন
ভিক্ষুকদের জানতে হলে ভিক্ষুক
হতে হবে। ওদের সঙ্গে থাকতে হবে।
ওদের মতো ভিক্ষা করতে হবে।
বলেননি এমন কথা?’
‘বলেছি?’
‘আপনি তা বিশ্বাস করেন?’
‘করি।’
‘তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন,
কেউ যদি পিঁপড়াদের
সম্পর্কে গবেষণা করতে চায়,
তা হলে তাকে পিঁপড়া হতে হবে,
এবং পিঁপড়াদের সঙ্গে থাকতে হবে,
পিঁপড়াদের খাবার খেতে হবে?’
‘ওদের ভালমতো জানতে হলে তাই
করতে হবে, কিন্তু সে উপায় নেই।
ভিক্ষুকদের ব্যাপারে উপায় আছে।
তা ছাড়া পিঁপড়া মানুষ না,
ভিক্ষুকরা মানুষ।’
‘আমি যে আপনাকে কী পরিমাণ
অপছন্দ করি তা কি আপনি জানেন?’
‘না, জানি না।’
‘মাকড়সা আমি যতটা অপছন্দ
করি আপনাকে তারচেয়ে বেশি অপছন্দ
করি।আজ আমি বারান্দায়
বসে ছিলাম। আপনি যখন আসছিলেন
তখন ইচ্ছা করছিল—টুর্টি-
ফুর্টিকে বলি—ধর্ ঐ লোকটাকে,
ছিঁড়ে টুকরো-টুকরো করে ফেল।
বলেই ফেলতাম। নিজেকে সামলেছি।
আমি নিজেকে কনট্রোল করেছি।
আজ যা করেছি অন্য একদিন
যে তা করতে পারব তা তো না।
একদিন হয়তো সত্যি কুকুর
লেলিয়ে দেব। নিন, আরেক কাপ
চা খান।
02/10/2014
ধুম-ধুম করে দরজায় কিল পড়ছে।
আমি ঘুমের ঘোরে বললাম, কে? কেউ
জবাব দিল না। দরজায় শব্দ
হতে থাকল। আমার সমস্যা হচ্ছে—
শীতের ভোরে একবার লেপের ভেতর
থেকে বের হলে আবার
ঢুকতে পারি না।
এখনো ঠিকমতো ভোর হয়নি—
চারদিক আঁধার হয়ে আছে। কাঁচের
জানালায় গাঢ় কুয়াশা দেখা যাচ্ছে।
এত ভোরে আমার কাছে আসার
মতো কে আছে ভাবতে-
ভাবতে দরজা খুলে দেখি—ইয়াদ। এই
প্রচণ্ড শীতে তার
গায়ে একটা ট্রাকিং স্যুট।
পায়ে কেড্স জুতা। নিশ্চয়
দৌড়ে এসেছে। চোখ-মুখ লাল। বড়-
বড় করে শ্বাস নিচ্ছে। ইয়াদ বলল,
জগিং করতে বের হয়েছিলাম।
ভাবলাম, একটা চান্স
নিয়ে দেখি তোকে পাওয়া যায় কিনা।
কতবার যে এসেছি তোর খোঁজে।
এই ক’দিন কোথায় ছিলি?
আমি জবাব
না দিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলাম।
বাথরুমের দরজা ঠেলে ইয়াদও
ঢুকে গেল। আমি মুখে পানি দিচ্ছি।
ইয়াদ পাশে। সে বলল, ছিলি কোথায়
তুই?
ইয়াদের স্বভাব-চরিত্রের একটি ভাল
দিক হচ্ছে অধিকাংশ প্রশ্নেরই
সে কোনো জবাব শুনতে চায় না।
প্রশ্ন করা প্রয়োজন বলেই প্রশ্ন
করে। জবাব দিলে ভাল, না দিলেও
ক্ষতি নেই। সে প্রশ্ন করে যাবে তার
মনের আনন্দে।
‘হিমু।’
‘কি?’
‘কাল রাতে আমার বউকে তুই
খামোকা ভয় দেখালি কেন?’
‘ভয় দেখিয়েছে?’
‘অফকোর্স ভয় দেখিয়েছিস—তুই
তাকে বললি আমি নাকি রাতে ফিরব
না। এদিকে আমি সত্যি-
সত্যি আটকা পড়ে গেলাম
ছোটখালার বাসায়।
ফিরতে ফিরতে রাত দু’টা বেজে গেছে।
এসে দেখি নীতুর মাথায়
পানি ঢালা হচ্ছে—পরিচিত-অপরিচিত
সব জায়গায় টেলিফোন করা হয়েছে।
ম্যানেজারকে পাঠানো হয়েছে সব
হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে আসতে।
ম্যানেজার ব্যাটা গাড়ি নিয়ে বের
হয়ে সেই গাড়ি ড্রেনে ফেলে দিয়েছে।
‘এই অবস্থা?’
‘হ্যাঁ, এই অবস্থা। নীতুর
হাইপারটেনশান আছে। অল্পতেই
এমন নার্ভাস হয়। ওর একজন
পোষা সাইকিয়াট্রিস্ট আছে।দু’দিন
পরপর তার কাছে যায়।
একগাদা করে টাকা নিয়ে আসে।’
‘তোর তো টাকা খরচ করার পথ নেই
—কিছু খরচ হচ্ছে, মন্দ কি?’
‘টাকা কোনো সমস্যা না, নীতুই
সমস্যা। অল্পতেই এত আপসেট হয়
—এই কারণেই তোকে খুঁজছি।
নীতুকে সামলানোর
ব্যাপারে কী করা যায়?’
‘সামলানোর দরকার কী?’
‘দরকার আছে। তোর প্রস্তাব
আমি গ্রহণ করেছি।
ভিখিরি হয়ে যাব। সাত দিনের ক্র্যাশ
প্রোগ্রাম। সাত দিন
ভিখিরি হয়ে ওদের
সঙ্গে সঙ্গে ঘুরব। ভিক্ষা করব।’
‘সাত দিনে কিছু হবে না।’
‘কত দিন লাগবে?’
‘দু’ বছর।’
‘বলিস কী!’
‘ঠিকমতো ওদের জানতে হলে ওদের
একজন হতে হবে। ওদের একজন
হতে সময় লাগবে।’
‘নীতুকে সামলাবো কী করে?’
‘যারা ছোটখাট ঘটনাতে আপসেট হয়
তারা বড় ঘটনায় সাধারণত আপসেট
হয় না। নীতু সামলে উঠবে।
আরো বেশি-
বেশি করে সাইকিয়াট্রিস্টের
কাছে যাবে। তুই ঘর ছাড়ছিস কবে?’
ইয়াদ বিরক্ত গলায় বলল,
আমাকে জিজ্ঞেস করছিস কেন?
এটা তো তোর উপর নির্ভর করছে।
আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত।তুই
বললেই শুরু করব—তুই একটা ডেট
বল। আমি নীতুকে বলি।
‘আমি ডেট বলব কেন?’
‘তুইও তো যাবি আমার সঙ্গে।
আমি একা-একা পথে-
পথে ভিক্ষা করব?’
‘হ্যাঁ, করবি। তোরই ভিক্ষুকদের
জীবনচর্চা দরকার। আমার না।’
‘তুই আমার সঙ্গে যাচ্ছিস না?’
‘না।’
‘ও মাই গড! আমি তো ধরেই
রেখেছি তুই যাচ্ছিস। সেইভাবেই
প্রস্তুতি নিয়েছি।’
সকালবেলা খালিপেটে আমি সিগারেট
খেতে পারি না। শুধুমাত্র
বিরক্তিতে আমি সিগারেট ধরালাম।
বিরক্তি ভাব গলার স্বরে যথাসম্ভব
ফুটিয়ে তুলে বললাম—তুই
ভিক্ষা করতে যাবি, সেখানেও
একজন ম্যানেজার নিয়ে যেতে চাস?
তুই ভিক্ষা করবি। তোর ম্যানেজার
টাকাপয়সার হিসাব রাখবে।
খাওয়াদাওয়া দেখবে। ইট
বিছিয়ে আগুন
করে পানি ফোটাবে যাতে তুই ফুটন্ত
পানি খেতে পারিস। যা ব্যাটা গাধা!
ইয়াদ আহত গলায় বলল,
গাধা বলছিস কেন?
‘যে যা তাকে তাই বলতে হয়। তুই
গাধা, তোকে আমি হাতি বলব?
যা বলছি, বিদেয় হ।’
‘চলে যেতে বলছিস?’
‘হ্যাঁ, চলে যেতে বলছি—আর আসিস
না।’
‘আর আসব না?’
‘না। তোকে দেখলেই বিরক্তি লাগে।’
‘বিরক্তি লাগে কেন?’
‘বেকুবদের
সঙ্গে কথা বললে বিরক্তি লাগবে না?’
‘গাধা বলছিস ভাল কথা, বেকুব
বলছিস কেন?’
‘বাথরুমে ঢুকে পড়েছিস-এই
জন্যে বেকুব বলছি।’
ইয়াদ বলল, ভুল
করে বাথরুমে ঢুকে পড়েছি, খেয়াল
করিনি। যাই।
আমি ওর দিকে না তাকিয়ে বললাম,
আচ্ছা যা, আর আসিস না।’
ইয়াদ বের হয়ে গেল। আমার মনে হল
এতটা কঠিন না হলেও বোধহয় হত।
তবে আমার কাছ থেকে এ ধরণের
ব্যবহার পেয়ে সে অভ্যস্ত। তার খুব
খারাপ লাগবে না।লাগলেও
সামলে উঠবে। ইয়াদকে আমার
পছন্দ হয়। শুধু পছন্দ না, বেশ
পছন্দ। রুঢ় ব্যবহার করতে হয়
পছন্দের মানুষদের সঙ্গে। আমার
বাবার উপদেশনামার একটি উপদেশ
হল—
হে মানব সন্তান, তুমি তোমার
ভালবাসা লু্কাইয়া রাখিও। তোমার
পছন্দের
মানুষদের সহিত তুমি রুঢ় আচরণ
করিও, যেন সে তোমার স্বরুপ
কখনো
বুঝিতে না পারে। মধুর আচরণ
করিবে দুজনের সঙ্গে।
নিজেকে অপ্রকাশ্য
রাখার ইহাই প্রথম পাঠ।
01/10/2014
‘পারছি।’
‘আপনার কোনো ক্ষমতা নেই
তা বলছি না। একটা ক্ষমতা আছে।
ভালই আছে। সেটা হল—সুন্দর
করে কথা বলা। আপনি যা বলেন তা-ই
সত্যি বলে মনে হয়। বিশ্বাস
করতে ইচ্ছা করে। এই
ক্ষমতা নিম্নশ্রেণীর ক্ষমতা।
রাস্তায়-রাস্তায় যারা অষুধ
বিক্রি করে তাদেরও এই
ক্ষমতা আছে। আপনি যদি দাঁতের
মাজন কিংবা সর্বব্যথানিবারণী অষুধ
বিক্রি করেন তাহলে বেশ ভাল
বিক্রি করবেন।’
নীতুর সঙ্গে অন্যদের এক জায়গায়
বেশ ভাল অমিল আছে। রাগের
কথা বলতে-বলতে অন্যদের রাগ
পড়ে যায়। তার রাগ বাড়তেই থাকে।
আস্তে-আস্তে মুখ লাল হতে থাকে।
একসময়-সারা মুখ লাল
টকটকে হয়ে যায়।এখন যেমন
হয়েছে। নীতু বলল, আমি অনেক
কথা বললাম, আপনি তার
উত্তরে কিছু
বলতে চাইলে বলতে পারেন।
‘আমি কিছু বলতে চাচ্ছি না।’
‘তা হলে আপনি কি স্বীকার
করে নিলেন, আমি যা বললাম সবই
সত্যি?’
‘হ্যাঁ।’
‘ইন দ্যাট কেইস আপনি কি আমার
পরামর্শ শুনবেন?’
‘হ্যাঁ, শুনব।
‘আপনি একজন সাইকিয়াট্রিস্টের
সঙ্গে কথা বলুন। আপনার
মধ্যে যেসব অস্বাভাবিকতা আছে—
একজন ভাল সাইকিয়াট্রিস্ট তা দূর
করতে পারবে। আপনি অনেক দিন
থেকেই মহাপুরুষের ভূমিকায় অভিনয়
করছেন। অভিনয় করতে-
করতে আপনার
ধারণা হয়েছে আপনি একজন
মহাপুরুষ।’
‘এরকম কোনো ধারণা আমার হয়নি।’
‘হয়েছে।ইয়াদের
কাছে শুনেছি আপনি মজনু মিয়ার
মাছ-ভাতের হোটেল
নামে একটা হোটেলে ভাত খান।
সেখানে এক রাতে বললেন—
হোটেলের মালিক দু’ দিন
হোটেলে আসবে না।এবং এই
বলে কর্মচারীদের প্ররোচিত
করলেন রোস্ট, পোলাওটোলাও
রাঁধার জন্যে। করেননি?’
‘হ্যাঁ, করেছি।’
‘এগুলি হচ্ছে মহাপুরুষ সিনড্রম।
নিজেকে আপনি অলৌকিক
ক্ষমতাসম্পন্ন ভাবতে শুরু
করেছেন।’
‘মজনু মিয়া কিন্তু দু’ দিন ঠিকই
হোটেলে আসেনি।’
‘তা আসেনি। কাকতালীয় ব্যাপার।
মাঝে-মাঝে কাকতালীয় ব্যপার ঘটে।
কেউ-কেউ সেসব ব্যাপার
কাজে লাগাতে চেষ্টা করে, যেমন
আপনি করেছেন। আপনি একজন
অসুস্থ্ মানুষ। আপনার
চিকিৎসা হওয়া দরকার।’
আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম,
আমি চিকিৎসা করাব।
আপনি সাইকিয়াট্রিস্টের
ঠিকানা দিন।’
‘সত্যি করাবেন?’
‘হ্যাঁ, সত্যি।
‘আমার কাছে কার্ড আছে। কার্ড
দিয়ে দিচ্ছি। আমি টেলিফোনেও
উনার সঙ্গে কথা বলে রাখব।’
‘আচ্ছা। আজ তা হলে উঠি?’
‘আপনার বন্ধুর
জন্যে অপেক্ষা করবেন না?’
আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম,ও
আজ রাতে বাসায় ফিরবে না।নীতু
তীক্ষ্ণ গলায় বলল, তার মানে কি?
আপনি কী বলতে চাচ্ছেন?
আপনি কি আপনার তথাকথিত
অলৌকিক ক্ষমতার
নমুনা আমাকে দেখাতে চাচ্ছেন?
আমাকে ভড়কে দিতে চাচ্ছেন?
‘তা না। আপনি শুধুশুধু রাগ করছেন।
আমার মনে হচ্ছে ইয়াদ আজ
রাতে বাসায় ফিরবে না। বললাম।’
‘শুনুন হিমু সাহেব, আমার
সঙ্গে চালাকি করতে যাবেন না।
আমি চালাকি পছন্দ করি না।’
নীতু বারান্দা পর্যন্ত
এগিয়ে দিতে এল। টির্টি-
ফুর্টি বারান্দায় বসে ছিল।
নীতুকে দেখেই উঠে দাঁড়াল। লেজ
নাড়তে লাগল।লেজ নাড়া দিয়ে কুকুর
কী বোঝাতে চেষ্টা করে? লেজ
নেড়ে সে কি বলে—
আমি তোমাকে ভালবাসি? ভালবাসার
পরিমাণও কি সে লেজ নেড়ে প্রকাশ
করে? কেউ কি এই
বিষয়টি নিয়ে রিসার্চ করেছে?
ইয়াদের মতো কেউ একজন
এসে ব্যাপারটা নিয়ে রিসার্চ করলেই
পারে। ‘কুকুরের লেজ এবং ভালবাস।’
আমি মেসে ফিরলাম না।এত সকাল-
সকাল ফেরা ঠিক হবে না। ইয়াদ
হয়তো বসে আছে। রাস্তায় হাঁটতেও
ইচ্ছা করছে না। ক্লান্তি লাগছে।
কেন জানি মাথায় ভোঁতা ধরণের
যন্ত্রনা হচ্ছে। মেসে ফিরে যাওয়াই
ভাল। মাথার
যন্ত্রনা ইদানীং আমাকে কাবু
করে ফেলছে। হালকাভাবে শুরু হয়—
শেষের দিকে ভয়াবহ অবস্থা। এক
সময় ইচ্ছা করে কাউকে ডেকে বলি,
ভাই, আপনি আমার
মাথাটা ছুরি দিয়ে কেটে শরীর
থেকে আলাদা করে দিতে পারেন?
রুপার চিঠি এখনো পড়া হয়নি।
বিছানায় শুয়ে-শুয়ে চিঠিটা পড়া যায়।
আমি একটা রিকশা নিয়ে নিলাম।
ইয়াদ আমার জন্যে মেসে বসে নেই।
এটা একটা সুসংবাদ। আগের
মতো টাইপ করা ইংরেজি নোট
রেখে গেছে—
‘খুঁজে পাচ্ছি না। জরুরি প্রয়োজন।
দয়া করে যোগাযোগ কর। ভিডিও
ক্যামেরা কিনেছি।
ইয়াদ।’
দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ার সময়
মনে হল রুপার চিঠি আমার
সঙ্গে নেই।
নীতুদের বাসায় পুরানো কাপড়ের
সঙ্গে ফেলে এসেছি।
কাপড়গুলি ইতমধ্যে নিশ্চয়ই ধোপার
বাড়িতে চলে গেছে।
মাথার যন্ত্রনা বাড়ছে। এই অসহ্য
তীব্র যন্ত্রনার উৎস কি? তীব্র
আনন্দ যিনি দেন, তীব্র ব্যথাও
কি তাঁরই দেয়া? কিন্তু তা তো হবার
কথা না। যিনি পরম মঙ্গলময়,
ব্যথা তাঁর সৃষ্টি হতে পারে না।
পাশের ঘরে হৈচৈ হচ্ছে।
তাসখেলা হচ্ছে নিশ্চয়ই। আজ
বৃহস্পতিবার। সপ্তাহে এই
একটা দিন মেসে তাস খেলা হয়। শুধু
তাস না, অতি সস্তার বাংলা মদ
আনা হয়। যারা এই জিনিস খান না,
তাঁরাও দু’-এক চুমুক খান। সারা রাতই
তাঁদের আনন্দিত
কথাবার্তা শোনা যায়। এই আনন্দও
কি তাঁর দেয়া?
30/09/2014
ইয়াদের বাড়ি একটা হুলস্থুল
ব্যাপার।বাইরে থেকে মনে হয়
জেলখানা। গেটটাও এমন
যে বাইরে থেকে কিছূই দেখা যায় না।
বড় গেট কখনো খোলা হয় না।বড়
গেটের
সঙ্গে আছে একটা খোকা গেট।
অনেক ধাক্কাধাক্কির পর
সেটা খোলা হয়। বাড়িতে ঢুকতে হয়
মাথা নিচু করে। একবার ঢোকার পর
সঙ্গে সঙ্গে ছুটে বের
হয়ে যেতে ইচ্ছা করে—কারণ তীব্র
বেগে দু’টা অ্যালসেশিয়ান ছুটে আসে।
এদের একজন কুচকুচে কালো,
অন্যজন ধবধবে শাদা। রঙ ভিন্ন
হলেও এদের স্বভাব অভিন্ন, দু’জন
ভয়ংকর হিংস্র, এদের একজনের
নাম টুর্টি, অন্যজনের নাম ফুর্টি।
দারোয়ান বলে—চুপ টুর্টি-ফুর্টি।
এরা চুপ করে, তবে এমনভাবে তাকায়
যাতে মনে হয় যে-
কোনো সুযোগে এরা ঘাড়
কামড়ে ধরবে।
গেট থেকে বাড়ি পর্যন্ত
যেতে খানিকক্ষণ বাগানের ভেতর
দিয়ে হাঁটতে হয়। সেই বাগানও দারুন
বাগান। এদের বাড়ি দোতলা—
সিড়ি মার্বেল পাথরের।বাড়ির
বারান্দায় ইউ আকৃতিতে কিছু বেতের
চেয়ার বসানো। মনে হয় প্রতিদিন
চেয়ারগুলিতে রঙ করা হয়, কারণ
যখনি আমি দেখি—ঝকঝক করছে।
চেয়ারের গদিগুলির রঙ হালকা সবুজ।
শাদা ও সবুজে যে এত সুন্দর
কম্বিনেশন হয় তা ইয়াদদের
বাড়িতে না এলে কখনো জানতে পারতাম
না।
ঠিক মাঝখানের বেতের চেয়ারে নীতু
বসে ছিল।নীতু হল নায়িকা-স্বভাবের
মেয়ে। সব সময়
সেজেগুজে থাকে এবং নায়িকাদের
মতো চোখে থাকে সানগ্লাস। দিন-
রাত সব সময়ই সানগ্লাস।
তাকে যখনি দেখি তখনি মনে হয়—
সে পার্টিতে যাচ্ছে,
কিংবা পার্টি থেকে ফিরেছে।
স্বাভাবিক ভঙ্গিতে এই
মেয়েটিকে একবার আমার
দেখতে ইচ্ছা করে। সেটা বোধহয়
সম্ভব না।
আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল,
হাসিমুখে বলল—যাক,
আপনাকে তাহলে পাওয়া গেল! ও খুব
ব্যাকুল হয়ে আপনাকে খুঁজছে।
‘ব্যাপার কি খোঁজ নিতে এলাম।’
‘ব্যাপার কি আমি জানি না, ভিক্ষুক
সম্পর্কিত কিছু হবে। আমি জানতেও
চাইনি। আপনাকে এমন লাগছে কেন?
‘কেমন লাগছে?’
‘মনে হচ্ছে ম্যানহোলের গর্তের
কাজ করছিলেন—কাজ বন্ধ
করে বেড়াতে এসেছেন।
ফিরে গিয়ে আবার কাজ শুরু করবেন।’
‘এতটা খারাপ?’
‘হ্যাঁ, এতটাই খারাপ।
আপনি কি গোসল করেন, না করেন
না?’
‘শীতের সময় কম করি—।’
‘বাথটাবো গরম
পানি দিলে আপনি কি গোসল
করবেন?’
‘আমার প্রয়োজন নেই।
নোংরা থাকতে ভাল লাগছে।’
‘নোংরা থাকতে ভাল লাগছে মানে!
এটা কোন ধরণের কথা?’
‘রসিকতা করার চেষ্টা করছি।’
নীতু ঠোট বাঁকিয়ে বলল,
রসিকতা বলে আমার
কাছে মনে হচ্ছে না। আপনি আসলেই
নোংরা থাকতে ভালবাসেন। যাই
হোক—আমার জন্যে হলেও
দয়া করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন
হয়ে আসুন। আপনার
সঙ্গে খানিকক্ষণ কথা বলি।
আপনাক নতুন একসেট কাপড় দিচ্ছি।
গায়ের কাপড়
বাথটাবে রেখে আসবেন।
ইস্ত্রি করে আপনার
কাছে পাঠিয়ে দেয়া হবে।’
আমি হাসলাম। নীতু বলল, হাসবেন
না। হাসির কোনো কথা বলিনি। যান,
বাথরুমে ঢুকে পড়ুন। কুইক।
একদল মানুষ আছে—বাথরুম
প্রেমিক। তারা অন্য কিছুতেই মুগ্ধ
হয় না, বাথরুম দেখে মুগ্ধ হয়।
আমি সেই দলে পড়ি না, কিন্তু
ইয়াদের বাড়ির
বাথরুমে ঢুকে খানিকক্ষণ চুপচাপ
থেকে মনে-মনে বলি—‘এ কী!’ আজ
আবার বললাম। বাথটাব ভর্তি পানি।
সেই বাথটাব এতবড়
যে ইচ্ছা করলে সাঁতার কাটা যায়। ডুব
দেয়া যায়। গোসল করতে-
করতে ‘সংগীত শ্রবণের’
ব্যবস্থা আছে। সংগীতের কন্ট্রোল
অবশ্যি বাইরে। যে-রেকর্ড
বাজানো হবে, স্পীকারের
মাধ্যমে তা চলে আসবে বাথরুমে।
এখন গান হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ
বেঁচে থাকলে আহত হতেন, কারণ
বাথটাবে শুয়ে আমি শুনছি তাঁর মায়ার
খেলা। সখী বলছে,
ওগো কেন, ওগো কেন মিছে এ
পিপাসা।
আপনি যে আছে আপনার কাছে
নিখিল জগতে কী অভাব আছে—
আছে মন্দ সমীরণ, পুষ্পভূষণ,
কোকিল, কুজিত কুঞ্জ।
প্রায় ঘণ্টাখানিক
বাথরুমে কাটিয়ে বের হয়ে এলাম।
গায়ে ধবধবে শাদা পায়জামা-
পাঞ্জাবি, একটা হালকা নীল উলের
চাদর। পায়ে দিয়েছি চটিজুতো।
সেগুলিও নতুন। আয়নায়
নিজেকে দেখে নিজেরই
লজ্জা লাগছে। নীতু বলল, বাহ,
আপনাকে ভাল দেখাচ্ছে! আসুন,
চা খেতে আসুন।
বিভিন্ন খাবারের জন্যে এদের
বিভিন্ন ঘর আছে। চা খাবার
জন্যে আছে টী-রুম। আমরা দু’জন টী-
রুমে বসলাম। পটভর্তি চা।
সঙ্গে অ্যাশট্রে এবং টিনভর্তি সিগারেট।
নীতু বলল, চা নিন। সিগারেট নিন।
যাবার সময় টিনটা নিয়ে যাবেন।
এটা আপনার জন্যে।
‘আচ্ছা, নিয়ে যাব।’
‘এখন আপনার সঙ্গে আমি কিছুক্ষণ
খোলামেলা কথা বলব।
যা জানতে চাইব
আপনি দয়া করে উত্তর দেবেন।’
‘দেব।’
‘ইয়াদ আপনার কি রকম বন্ধু?’
‘ভাল বন্ধু।’
‘ভাল বন্ধু যদি হয়
তাহলে ওকে আপনি গাধা বলেছিলেন
কেন?’
‘গাধা একধরণের আদরের ডাক।
অপরিচিত বা অর্ধ-পরিচিতদের
গাধা বলা যাবে না।
বললে মেরে তক্তা বানিয়ে দেবে।
প্রিয় বন্ধুদেরেই গাধা বলা যায়।
এতে প্রিয় বন্ধুরা রাগ করে না।
বরং খুশি হয়।’
‘আপনি কি জানেন ইয়াদ অন্য
দশজনের মতো নয়? সে সবকিছু
সিরিয়াসলি নেয়। আপনি গাধা বলায়
সে সারা রাত ঘুমায়নি—
জেগে বসে ছিল—একটা খাতায় নোট
করছিল কেন
তাকে গাধা বলা যাবে না।’
‘আমি হাসতে-হাসতে বললাম,
সে যা করছিল গাধা বলার
জন্যে তা কি যথেষ্ট নয়?’
‘না, যথেষ্ট নয়।
ভবিষ্যতে কখনো তাকে গাধা বলবেন
না এবং তার মাথায় কোন অদ্ভুদ
আইডিয়া ঢুকিয়ে দেবেন না।’
‘আমি ওর মাথায় কোনো অদ্ভুদ
আইডিয়া ঢোকাইনি।’
‘ঢুকিয়েছেন—আপনি ওকে বলেছেন
ভিক্ষুকদের জানতে হলে ভিক্ষুক
হতে হবে। ওদের সঙ্গে থাকতে হবে।
ওদের মতো ভিক্ষা করতে হবে।
বলেননি এমন কথা?’
‘বলেছি?’
‘আপনি তা বিশ্বাস করেন?’
‘করি।’
‘তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন,
কেউ যদি পিঁপড়াদের
সম্পর্কে গবেষণা করতে চায়,
তা হলে তাকে পিঁপড়া হতে হবে,
এবং পিঁপড়াদের সঙ্গে থাকতে হবে,
পিঁপড়াদের খাবার খেতে হবে?’
‘ওদের ভালমতো জানতে হলে তাই
করতে হবে, কিন্তু সে উপায় নেই।
ভিক্ষুকদের ব্যাপারে উপায় আছে।
তা ছাড়া পিঁপড়া মানুষ না,
ভিক্ষুকরা মানুষ।’
‘আমি যে আপনাকে কী পরিমাণ
অপছন্দ করি তা কি আপনি জানেন?’
‘না, জানি না।’
‘মাকড়সা আমি যতটা অপছন্দ
করি আপনাকে তারচেয়ে বেশি অপছন্দ
করি।আজ আমি বারান্দায়
বসে ছিলাম। আপনি যখন আসছিলেন
তখন ইচ্ছা করছিল—টুর্টি-
ফুর্টিকে বলি—ধর্ ঐ লোকটাকে,
ছিঁড়ে টুকরো-টুকরো করে ফেল।
বলেই ফেলতাম। নিজেকে সামলেছি।
আমি নিজেকে কনট্রোল করেছি।
আজ যা করেছি অন্য একদিন
যে তা করতে পারব তা তো না।
একদিন হয়তো সত্যি কুকুর
লেলিয়ে দেব। নিন, আরেক কাপ
চা খান।’
আমি আরেক কাপ চা নিলাম। নীতু
বলল, আপনার সম্পর্কে অনেক
গল্প প্রচলিত আছে।
আপনি নাকি মহাপুরষজাতীয় মানুষ।
মানুষের ভবিষ্যৎ বলতে পারেন।
আমি তার একবিন্দুও বিশ্বাস
করি না।
‘আমি নিজেও করি না।’
‘কিন্তু কেউ-কেউ করে।আপনার
অদ্ভুদ জীবনযাপন প্রণালীর
জন্যেই করে। নোংরা কাপড়
পরে রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরে বেড়ালেই
মানুষ মহাপুরুষ হয় না। যদি হত,
তা হলে ঢাকা শহরে তিন লক্ষ
মহাপুরুষ থাকত। এই শহরে রাস্তায়
ঘুরে-বেড়ানো মানুষের সংখ্যা তিন
লক্ষ। বুঝতে পারছেন?’
29/09/2014
ঘরের ভেতর দু’টা চিঠি। একটির খাম
দেখেই বোঝা যাচ্ছে রুপার
কাছে থেকে এসেছে। কার্টিস
পেপারে ধবধবে সাদা খাম। খামের
এক মাথায় রুপালি কালিতে এমবস
করা রুপার নাম। সাদার উপর
রুপালি ফোটে না, তবুও এটাই রুপার
স্টাইল। অন্য চিঠিটি ব্রাউন
কাগজের। ঠিকানা ইংরেজিতে টাইপ
করা। দু’টা চিঠির কোনোটিতেই
স্ট্যাম্প নেই—
হাতে হাতে পৌছে দেয়া। আমি রুপার
চিঠি পকেটে রেখে অন্যটা খুললাম।
যা ভেবেছি তাই—ইয়াদের লেখা।
টাইপ করা চিঠি ।ইংরেজি ভাষায়—
টেলিগ্রাফের ধরণে লেখা।
হিমু, খুঁজে পাচ্ছি না। কোথায় আছ?
ভিডিও ক্যামেরা কিনেছি। সব ভিডিও
হবে।
ইয়াদ।
ঘরে থাকলেই ইয়াদের
হাতে পড়তে হবে। সারা দিনের
জন্যে আটকে যেতে হবে। আমার
কাজ হবে তার
পেটমোটা কালো ব্যাগ নিয়ে ঘুরে বেড়ানো—
এখন যেহেতু ভিডিও
ক্যামেরা কেনা হয়েছে—ভিক্ষুকদের
ইন্টারভ্যু হবে ভিডিওতে। এতদিন
ক্যাসেট রেকর্ডারে হচ্ছিল। ইয়াদের
কাজকর্ম পরিষ্কার।
তৈরি প্রশ্নমালা আছে—ইন্টারভ্যুর
সময় তৈরি প্রশ্নমালার বাইরে কোন
প্রশ্ন করা যাবে না।
প্রশ্নের নমুনা হল—
নাম?
স্ত্রী না পুরুষ?
বয়স?
শিক্ষা?
পিতার নাম?
ঠিকানা ক) স্থায়ী?
খ) অস্থায়ী?
কতদিন ধরে ভিক্ষা করছেন?
দৈনিক গড় আয় কত?
পরিবারের সদস্য সংখ্যা?
সদস্যদের মধ্যে কতজন ভিক্ষুক?
খাবার রান্না করে খান,
না ভিক্ষালব্ধ খাবার খান?
এরকম মোট পঞ্চাশটা প্রশ্ন।
একেকজনের উত্তর
দিতে ঘণ্টাখানিক লাগে। এক ঘণ্টার
জন্যে তাকে পাঁচ টাকা দেয়া হয়। পাঁচ
টাকার চকচকে একটা নোট
হাতে নিয়ে অধিকাংশ ভিক্ষুকই চোখ
কপালে তুলে বলেন, অতক্ষণ
খাটনি করাইয়া এইডা কী দিলেন?
আফনের বিচার নাই?
আমি ইয়াদকে বলার চেষ্টা করেছি,
এ-জাতীয় প্রশ্ন অর্থহীন।ইয়াদ
মানতে রাজি নয়। সে নাকি তিন মাস
দিনরাত খেটে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
প্রশ্ন তৈরির আগে স্ট্যাটিসটিক্যাল
মডেল দাঁড়া করিয়েছে। কম্প্যুটার
সফটওয়্যরে পরিবর্তন করেছে—
ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি তার
বকবকানি শুনে বিরক্ত হয়ে বলেছি,
চুপ কর্ গাধা। সে খুবই অবাক
হয়ে বলেছে—গাধা বলছিস কেন?
আমাকে গাধা বলার পেছনে তোর
কি কি যুক্তি আছে তুই পয়েন্ট
ওয়াইজ কাগজে লিখে আমাকে দে।
আমি ঠাণ্ডা মাথায় অ্যানালাইসিস
করব। যদি দেখি তোর যুক্তি ঠিক
না, তা হলে আমাকে গাধা বলার
জন্যে তোকে লিখিতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।
এ-জাতীয় মানুষদের কাছ থেকে যত
দূরে থাকা যায় ততই মঙ্গল।
আমি সবসময় দূরে থাকার চেষ্টাই
করি। আমি পালিয়ে-পালিয়ে বেড়াই।
গাধাটা আমাকে খুঁজে খুঁজে বের করে।
একধরণের চোর-পুলিশ খেলা।
আমি চোর—সে পুলিশ। যেহেতু
চোরের বুদ্ধি সবসময়ই পুলিশের
বুদ্ধির চেয়ে বেশি, সেহেতু সে গত
এক সপ্তাহ আমার দেখা পায় নি।
আজো পাবে না। আমি আবার বের
হয়ে পড়লাম। আমার কোনো রকম
পরিকল্পনা নেই। প্রথমে রুপার
কাছে যাওয়া যায়। ওর
সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয় না। প্রিয়
মুখ কিছুদিন পরপর দেখতে হয়।
মানুষের মস্তিষ্ক অপ্রিয়জনদের
ছবি সুন্দর করে সাজিয়ে রাখে।
প্রিয়জনদের ছবি কোনো এক
বিচিত্র কারণে কখনো সাজায় না।
যে জন্যে চোখ বন্ধ
করে প্রিয়জনদের চেহারা কখনোই
মনে করা যায় না।
রুপাকে পাওয়া গেল না। রুপার বাবার
সঙ্গে দেখা হল। তিনি ভুরু
কুঁচকে বললেন
—ও তো ঢাকায় নেই।
এই ভদ্রলোক সহজ গলায়
মিথ্যা বলেন। রুপা ঢাকায়
আছে তা তাঁর কথা থেকেই
আমি বুঝতে পারছি।
আমি বললাম, কোথায় গেছে?
‘সেটা জানার কি খুব প্রয়োজন
আছে?’
‘না, জানার প্রয়োজন নেই—তবু
জানতে ইচ্ছা করছে।’
‘ও যশোর গিয়েছে।’
‘ঠিকানাটা বলবেন?’
ভদ্রলোক শুকনো গলায় বললেন,
ঠিকানা দিতে চাচ্ছি না। ও অসুস্থ্।
আমরা চাই না অসুস্থ অবস্থায় কেউ
ওকে বিরক্ত করে।
‘অসুস্থ্ অবস্থায় মানুষের
বন্ধুবান্ধবের প্রয়োজন পড়ে।
আমি ওর খুব ভাল ব্ন্ধু।
‘ওর ঠিকানা দেয়া যাবে না।’
‘ও কোথায় গেছে বললেন যেন?’
‘যশোর।’
‘খুব শিগ্গির ফেরার সম্ভাবনা নেই—
তাই না?’
‘দেরি হবে।’
আমি খুব চিন্তিত মুখে বললাম,
একটা ঝামেলা হয়ে গেল যে! আজই
প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তায়
রুপার সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গেল।
সে-ই আমাকে বাসায় আসতে বলেছে।
ব্যাপারটা আমি কিছুই
বুঝতে পারছি না, আপনি বলছেন
রুপা যশোরে। আপনার মত বয়স্ক,
দায়িত্ববান একজন মানুষে আমার
সঙ্গে নিশ্চয়ই মিথ্যাকথা বলবেন
না। তাহলে রুপার সঙ্গে দেখা হল
কী ভাবে?
ভদ্রলোক তাকিয়ে আছেন। কিছু
বললেন না। তাঁকে মোক্ষম আঘাত
করা হয়েছে। সামলে উঠতে সময়
লাগবে। তাঁর মুখের ভাবের পরিবর্তন
দেখতে ভাল লাগছে।
‘তোমার নাম হিমু না?’
‘জ্বি।’
‘মিথ্যা যা বলার তুমি বলেছ। রুপার
সঙ্গে তোমার দেখা হয়নি, ও
যশোরে আছে। আমার
সঙ্গে তুমি যে ক্ষুদ্র রসিকতা করার
চেষ্টা করলে তা আর করবে না।
মনে থাকবে?’
‘জ্বি স্যার, থাকবে।’
‘গেট আউট।’
‘থ্যাংক ইউ স্যার।’
আমি চলে এলাম। এমন কঠিন ধরণের
একজন মানুষ রুপার মতো মেয়ের
বাবা কী করে হলেন ভাবতে-
ভাবতে আমি হাঁটছি—রুপার
চিঠি এখনো পড়া হয়নি।
পড়লে তো ফুরিয়ে গেল। চিঠির এই
হল ম্যাজিক। যতক্ষণ পড়া হয় না,
ততক্ষণ ম্যাজিক থাকে। পড়ামাত্রই
ম্যাজিক ফু্রিয়ে যায়।
কোথায় যাওয়া যায়?
মেসে ফিরে যাবার প্রশ্নই ওঠে না।
ইয়াদ সেখানে নিশ্চয়ই বসে আছে।
আমি মোরশেদ সাহেবের বাসার
দিকে রওনা হলাম। খিলগাঁ—দূর
আছে। অনেকক্ষণ হাঁটতে হবে।
কোনো-একটা উদ্দেশ্য
সামনে রেখে হাঁটতে ভাল লাগে। যদিও
জানি মোরশেদ সাহেব
কে পাওয়া যাবে না। কোনো-
কোনো দিন এমন যায় যে কাউকেই
পাওয়া যায় না। আজ বোধহয়
সেরকম একটা দিন।
মোরশেদ সাহেব কে পাওয়া গেল না।
দরজা তালাবন্ধ। তবে একটা মজার
ব্যাপার লক্ষ করলাম। বাসার
ঠিকানা বলার সমকয়
তিনি বলেছিলেন—১৩২ নং খিলগাঁ,
একতলা বাড়ি, সামনে বিরাট আমগাছ।
সবই ঠিক আছে, শুধু আমগাছ নেই।
শুধু এই বাড়ি না, আশেপাশের
কোনো বাড়ির সামনেই আমগাছ
নেই। মোরশেদ সাহেবের
বাড়িতে দারোয়ান জাতীয় একজন
কে পাওয়া গেল। তাকে জিজ্ঞেস
করলাম—এখানে কি আমগাছ
কখনো ছিল? সে বিরক্ত হয়ে বলল,
আমগাছ কেন থাকবে?
যেন আমগাছ থাকাটা অপরাধ।
আমি খুবই বিনয়ের সঙ্গে বললাম,
আপনি এ বাড়িতে কতদিন
ধরে আছেন?
‘ছোটবেলা থাইক্যা আছি।’
‘এটা কি মোরশেদ সাহেবের
কেনা বাড়ি?’
‘জ্বে না, ভাড়া বাসা। তয় বেশিদিন
থাকব না। বাড়িওয়ালা নোটিশ দিছে।’
‘আচ্ছা ভাই, যাই।’
‘উনারে কিছু বলা লাগব?’
‘না।’
আমি আবার হাঁটা ধরলাম।রাত
একটা পর্যন্ত পথে-
পথে থাকতে হবে। ইয়াদ
একটা পর্যন্ত আমার
জন্যে বসে থাকবে না।তাকে রাত রাত
বারোটার মধ্যে বাড়ি ফিরতে হবে।
নীতুর কঠিন নির্দেশ। নীতুর
মতো মেয়ের নির্দেশ অগ্রাহ্য
করা ইয়াদের পক্ষে সম্ভব না।
নীতুর সঙ্গে দেখা করে এলে কেমন
হয়? ইয়াদের হাত থেকে বাঁচার সবচে’
ভাল উপায় হচ্ছে ইয়াদের বাসায়
গিয়ে বসে থাকা।
সে বসে থাকবে আমার মেসে,
আমি বসে থাকব তার বাড়িতে। চো-
পুলিশ খেলার এরচে’ ভাল
স্ট্রাটিজি আর হয় না। ফুল প্রুফ।
‘কি নাম বললেন আপনার, হিমু?’
‘জ্বি, হিমু।’
‘হিম থেকে হিমু?’
‘জ্বি-না, হিমালয় থেকে হিমু।
আমার ভাল নাম হিমালয়।
‘ঠাট্টা করছেন?’
‘না, ঠাট্টা করছি না।’
আমি পাঞ্জাবির পকেট
থেকে ম্যাট্রিক
সার্টিফিকেট বের
করে এগিয়ে দিলাম।
হাসিমুখে বললাম,
সার্টিফিকেটে লেখা আছে।
দেখুন।
এষা হতভম্ব হয়ে বলল,
আপনি কি সার্টিফিকেট
পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ান?
‘জ্বি,
সার্টিফিকেটটা পকেটেই
রাখি।হিমালয় নাম
বললে অনেকেই বিশ্বাস
করে না, তখন সার্টিফিকেট
দেখাই। ওরা তখন বড় ধরণের
ঝাঁকি খায়।’
আমি উঠে দাড়ালাম।
এষা বলল,
আপনি কি চলে যাচ্ছেন?
‘হুঁ।’
‘এখন যাবেন না। একটু বসুন।’
আমার যেহেতু কখনোই
কোনো তাড়া থাকে না—
আমি বসলাম। রাত ন’টার
মতো বাজে। এমন কিছু রাত
হয়নি—কিন্তু এ
বাড়িতে মনে হচ্ছে নিশুতি।
কারো কোনো সাড়াশব্দ নেই।
বুড়ো মনে হয় এই ফ্ল্যাটের নয়।
পাশের ফ্ল্যাটের।
এষা আমার সামনে বসে আছে।
তার চোখে অবিশ্বাস
এবং কৌতুহল
একসঙ্গে খেলা করছে।
সে অনেক কিছুই জিজ্ঞেস
করতে চাচ্ছে, আবার
জিজ্ঞেস
করতে ভরসা পাচ্ছে না।
আমি তাদের কাছে নিতান্তই
অপরিচিত একজন। তার
দাদীমা রিকসা থেকে পড়ে
মাথা ফাটিয়েছেন।
আমি ভদ্রমহিলাকে
হাসপাতালে নিয়ে মাথা
ব্যান্ডেজ
করে বাসায়ে পৌঁছে বেতের
সোফায় বসে আছি।এদের
কাছে এই হচ্ছে আমার পরিচয়।
আমি খানিকটা উপকার
করেছি। উপকারের প্রতিদান
দিতে না পেরে পরিবারটা
একটু অস্বস্তির মধ্যে পড়েছে।
ঘরে বোধহয় চা-পাতা নেই।
চা-
পাতা থাকলে এতক্ষণে চা
চলে আসত। প্রায়
আধঘণ্টা হয়েছে। এর
মধ্যে চা চলে আসার কথা।
আমি বললাম, আপনাদের
বাসায় চা-পাতা নেই, তাই
না?
এষা আবারো হকচকিয়ে গেল।
বিস্ময় গোপন করতে পারল না।
গলায় অনেকখানি বিস্ময়
নিয়ে বলল, না, নেই। আমাদের
কাজের
মেয়েটা দেশে গেছে। ওই
বাজার-টাজার করে। চা-
পাতা না থাকায় আজ
বিকেলে আমি চা খেতে
পারিনি।
‘আমি কি চা-
পাতা এনে দেব?’
‘না না,
আপনাকে আনতে হবে না।
আপনি বসুন। আপনি কী করেন?’
‘আমি একজন পরিব্রাজক।’
‘আপনার
কথা বুঝতে পারছি না।’
‘আমি রাস্তায় রাস্তায়
ঘুরে বেড়াই।’
এষা তীক্ষ্ণ গলায় বলল,
আপনি কি ইচ্ছা করে আমার
প্রশ্নের উদ্ভট উদ্ভট জবাব
দিচ্ছেন?’
আমি হাসিমুখে বললাম,
যা সত্যি তাই বলছি।সত্যিকার
বিপদ হল—সত্যি কথার
গ্রহণযোগ্যতা কম। যদি বলতাম,
আমি একজন বেকার, পথে-
পথে ঘুরি,
তা হলে আপনি আমার
কথা সহজে বিশ্বাস করতেন।’
‘আপনি বেকার নন?’
‘জ্বি-না। ঘুরে বেড়ানোই
আমার কাজ।
তবে চাকরিবাকরি কিছু
করি না। আজ বরং উঠি?’
‘দাদীমা আপনাকে বসতে
বলেছে।’
‘উনি কী করছেন?’
‘শুয়ে আছেন। মনে হয়
ঘুমিয়ে পড়েছেন।
আপনি যদি চলে যান
তা হলে দাদীমা খুব রাগ
করবেন।’
‘তা হলে বরং অপেক্ষাই করি।’
আমি বেতে সোফায়
বসে অপেক্ষা করছি। আমার
সামনে বিব্রত
ভঙ্গিতে এষা বসে আছে।
বসে থাকতে ভাল
লাগছে না তা বোঝা যাচ্ছে।
বারবার তাকাচ্ছে ভেতরের
দরজার দিকে।এর মধ্যে দু’বার
হাতঘড়ির দিকে তাকাল।
উপকারী অতিথীকে একা
ফেলে রেখে চলে যেতেও
পারছে না। আজকালকার
মেয়েরা অনেক স্মার্ট হয়।
এষা ফট করে বলে বসে—
আপনি বসে-বসে পত্রিকা পড়ুন,
আমার কাজ আছে! এ
তা বলতে পারছে না। আবার
বসে থাকতেও ইচ্ছা করছে না।
তার গায়ে ছেলেদের চাদর।
বয়স কত হবে—চব্বিশ-পঁচিশ? কমও
হতে পারে।
চোখে মোটা ফ্রেমের চশমার
জন্যে হয়তো বয়স
বেশি লাগছে। গায়ের রঙ
শ্যামলা। রঙটা আরেকটু ভাল
হলে মেয়েটিকে দারুণ
রুপবতী বলা যেত। শীতের
দিনে ঠান্ডা মেঝেতে
মেয়েটা খালিপায়ে
এসেছে। এটা ইন্টারেস্টিং।
যেসব মেয়ে বাসায়
খালিপায়ে হাঁটাহাঁটি করে
তারা খুব নরম স্বভাবের হয়
বলে আমি জানি।
এষা অস্বস্তির সঙ্গে বলল,
আমার পরীক্ষা আছে।
আমি পড়তে যাব।
একা একা বসে থাকতে কি
আপনার খারাপ লাগবে?
‘খারাপ লাগবে না।
পত্রিকা থাকলে দিন,
বসে বসে পত্রিকা পড়ি।’
‘আমাদের বাসায় কোন
পত্রিকা রাখা হয় না।’
‘ও আচ্ছা।’
‘টিভি দেখবেন,
টিভি ছেড়ে দি?’
‘আচ্ছা দিন।’
এষা টিভি ছাড়ল। ছবি ঠিকমত
আসছে না।
ঝাপসা ঝাপসা ছবি।
এষা বলল, অ্যান্টেনার তার
ছিড়ে গেছে বলে এই অবস্থা।
‘আমার অসুবিধা হচ্ছে না।’
‘আমি খুব লজ্জিত
যে আপনাকে একা বসিয়ে
রেখে চলে যেতে হচ্ছে।’
‘লজ্জিত হবার কিছু নেই।’
‘আপনি কাইন্ডলি পাশের
চেয়ারটায় বসুন। এই
চেয়ারটা ভাঙা। হেলান
দিয়ে পড়ে যেতে পারেন।’
আমি পাশের
চেয়ারে বসলাম। কিছু-কিছু
বাড়ি আছে-যার
কোনো কিছুই ঠিক
থাকে না। এটা বোধহয় সেরকম
একটা বাড়ি।
দেয়ালে বাঁকাভাবে
ক্যালেন্ডার ঝুলছে, যার
পাতা ওল্টানো হয়নি।
ডিসেম্বর মাস চলছে—
ধুলা জমে আছে।
আমি ক্যালেন্ডার
থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে
তাকালাম টিভির দিকে।
নাটক হচ্ছে।
মাঝখান থেকে একটা নাটক
দেখতে শুরু করলাম। এটা মন্দ না।
পেছনে কি ঘটে গেছে
আন্দাজ
করতে করতে সামনে এগিয়ে
যাওয়া—নাটকে একটি মধ্যবয়স্ক
লোক তার স্ত্রীকে বলছে—
এ তুমি কি বলছ সীমা?
না না না। তোমার এ
কথা আমি গ্রহণ
করতে পারি না। বলেই ভেউ
ভেউ করে মুখ
বাঁকিয়ে কান্না।
সীমা তখন কঠিন মুখে বলছে—
চোখের জলের কোনো মূল্য
নেই ফরিদ। এ পৃথিবীতে অশ্রু
মূল্যহীন।
কিছুদুর নাটক দেখার পর মনে হল
এরা স্বামী-স্ত্রী নয়। নাটকের
স্ত্রীরা স্বামীদের নাম
ধরে ডাকে না।
সহপাঠী প্রেমিক-
প্রেমিকা হতে পারে।
মাঝবয়েসী প্রেমিক-
প্রেমিকা। ব্যাপারটায় একটু
খটকা লাগছে। যথেষ্ট আগ্রহ
নিয়ে নাটক দেখছি। মাঝখান
থেকে নাটক দেখার এত
মজা আগে জানতাম না। জিগ-
স পাজল-এর মত। পাজল শেষ
করার আনন্দ পাওয়া যাচ্ছে।
নাটক শেষ হল।
মিলনান্তক ব্যাপার। শেষ
দৃশ্যে সীমা জড়িয়ে ধরেছে
ফরিদকে। ফরিদ বলছে—
জীবনের
কাছে আমরা পরাজিত
হতে পারি না সীমা।
ব্যাকগ্রাউন্ডে রবীন্দ্রসংগীত
হচ্ছে—পাখি আমার নীড়ের
পাখি। নাটকের শেষ
দৃশ্যে রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহার
করার একটা নতুন স্টাইল শুরু
হয়ে হয়েছে—যার
ফলে গানটা ভাল লাগে,
নাটক ভাল লাগে না।
আমি টিভি বন্ধ করে চুপচাপ
বসে আছি। েএ বাড়ির
ড্রয়িংরুমে সময় কাটাবার
মতো কিছু নেই। একটি মাত্র
ক্যালেন্ডারের দিকে কতক্ষণ
আর তাকিয়ে থাকা যায়!
দরজার কড়া নড়ছে।
আমি দরজা খুললাম। স্যুট-টাই
পরা এক ভদ্রলোক।
ছেলেমানুষি চেহারা।
মাথাভর্তি চুল।এত চুল
আমি কারো মাথায়
আগে দেখিনি।
হাত
বুলিয়ে দেখতে ইচ্ছা করছে।
ভদ্রলোককে দেখে মনে হল
দরজার কড়া নেড়ে তিনি খুবই
বিব্রত বোধ করছেন।
আমি বললাম, কি চাই?
ভদ্রলোক ক্ষীণ গলায় বললেন,
এষা কি আছে?
‘আছে। ওর পরীক্ষা।
পড়াশোনা করছে।’
‘ও, আচ্ছা।’
ভদ্রলোক মনে হল আরো বিব্রত
হলেন। আরো সংকুচিত
হয়ে গেলেন। আগের
চেয়ে ক্ষীণ গলায় বললেন,
আমি ওকে একটা কথা বলে চলে
যাব।
‘কথা বলতে রাজি হবে কিনা
জানি না।’
‘কাইন্ডলি একটু আমার কথা বলুন।
বলুন মোরশেদ।’
‘মোরশেদ বললেই চিনবে?’
‘জ্বি।’
‘ভেতরে এসে বসুন, আমি বলছি।’
‘আমি ভেতরে যাব না।
এখানেই দাঁড়াচ্ছি।’
‘আচ্ছা দাঁড়ান—কি নাম যেন
বললেন আপনার—মোরশেদ?’
‘জ্বি, মোরশেদ।’
আমি কয়েক মুহুর্ত
চিন্তা করলাম। কি করা যায়?
এখান
থেকে এষা এষা করে ডাকা
যায়। ডাকতে ইচ্ছা করছে না।
সরাসরি বাড়ির ভেতর
ঢুকে গেলে কেমন হয়?
এষা কোথায়
পড়াশোনা করছে তা আমি
জানি। ভেতরের বারান্দার
এক কোণায় তার পড়ার
টেবিল।
দাদীমাকে ধরাধরি করে
ভেতরের বারান্দায়
ইজিচেয়ারে শুইয়ে দিতে
গিয়ে আমি এষার পড়ার
টেবিলে দেখেছি।
আগে যেহেতু একবার
ভেতরে যেতে পেরেছি, এখন
কেন পারব না?
এষা রেগে যেতে পারে।
রাগুক না! মাঝে-
মাঝে রেগে যাওয়া ভাল।
প্রচণ্ড রেগে গেলে শরীরের
রোগজীবাণু মরে যায়।
যারা ঘন ঘন রাগে তাদের
অসুখবিসুখ হয় না বললেই চলে।
আর যারা একেবারেই
রাগে না, তারাই দু’দিন পরপর
অসুখে ভোগে। সবচে’ বড় কথা,
এষাকে খানিকটা ভড়কে
দিতে ইচ্ছা করছে।
আমাকে চুপচাপ
বসিয়ে সে দিব্যি পড়াশোনা
করবে তা হয় না। একটু
হকচকিয়ে দেয়া যাক।
আমি পর্দা সরিয়ে নিতান্ত
পরিচিত জনের
মতো ভেতরে ঢুকে গেলাম।
এষা চেয়ারে পা তুলে
বসেছে। বইয়ের উপর ঝুঁকে আছে।
তার মনোযোগ এতই
বেশি যে আমার বারান্দায়
আসা সে টের পেল না।
মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে
বাচ্চা মেয়েদের মত পড়তেই
থাকল। আমি ঠিক তার
পেছনে দাঁড়িয়ে খুব সহ গলায়
বললাম, এষা, মোরশেদ সাহেব
এসেছেন।
বাইরে দাঁড়িয়ে আছ্নে।
তোমার
সঙ্গে একটা কথা বলেই
চলে যাবেন।
এষা ভূত দেখার
মতো চমকে আমার
দিকে তাকাল। আমি বললাম,
ভদ্রলোককে কী চলে যেতে
বলব? ভেতরে এসে বসতে
বলেছিলাম, উনি রাজি হলেন
না।
এষা কঠিন গলায় বলল,
আপনি দয়া করে বসার ঘরে বসুন।
আপনি হুট
করে ঘরে ঢুকে গেলেন
কী মনে করে?
আমি নিতান্তই স্বাভাবিক
গলায় বললাম,
ভদ্রলোককে কি বসতে বলব?
‘তাঁকে যা বলার আমি বলব।
প্লীজ, আপনি বসার ঘরে যান।
আশ্চর্য,
আপনি কী মনে করে ভেতরে
চলে এলেন?’
আমি এষাকে হতচকিত অবস্থায়
রেখে চলে এলাম। ভদ্রলোক
বাইরে।সিগারেট
ধরিয়েছেন।
আমাকে দেখে আস্ত
সিগারেট ফেলে অপ্রস্তুত
ভঙ্গিতে হাসলেন।
আমি বললাম,
ভেতরে গিয়ে বসুন,
এষা আসছে।
‘আমাকে বসতে বলেছে?’
‘তা বলেনি, তবে আমার
মনে হচ্ছে আপনি ভেতরে
গিয়ে বসলে খুব রাগ
করবে না।’
‘আমি বরং এখানেই থাকি?’
‘আচ্ছা, থাকুন।’
আমি লম্বা লম্বা পা ফেলে
রাস্তায় চলে এলাম। আপাতত
রাস্তার দোকানগুলির কোন-
একটিতে বসে চা খাব।
ইতিমধ্যে ভদ্রলোকের
সঙ্গে এষার কথাবার্তা শেষ
হবে—আমি আবার ফিরে যাব।
ফিরে নাও যেতে পারি। এই
জগৎ
সংসারে আগেভাগে কিছুই
বলা যায় না।
শীতের
রাতে ফাঁকা রাস্তায়
দাঁড়িয়ে চা খাবার অন্যরকম
আনন্দ আছে। চা খেতে-
খেতে মাঝে-
মাঝে আকাশের
দিকে তাকিয়ে আকাশের
তারা দেখতে হয়।
সারা শরীরে লাগবে কনকনে
শীতের হাওয়া,
হাতে থাকবে চায়ের কাপ।
দৃষ্টি আকাশের তারার দিকে।
তারাগুলিকে তখন
মনে হবে সাদা বরফের ছোট-
ছোট খণ্ড। হাত
দিয়ে ছুঁতে ইচ্ছা করবে, কিন্তু
ছোঁয়া যাবে না।
পরপর দু’কাপ চা খেয়ে তৃতীয়
কাপের অর্ডার দিয়েছি, তখন
দেখি মোরশেদ সাহেব হনহন
করে যাচ্ছেন। মাটির
দিকে তাকিয়ে এত দ্রুত
আমি কাউকে হাঁটতে
দেখিনি। আমি ডাকলাম—এই
যে ভাই মোরশেদ সাহেব!
ভদ্রলোক থমকে দাঁড়ালেন। খুবই
অবাক হয়ে তাকালেন।
নিতান্তই অপরিচিত কেউ নাম
ধরে ডাকলে আমরা যেরকম
অবাক হই—সেরকম অবাক।
ভদ্রলোক
আমাকে চিনতে পারছেন না।
আশ্চর্য আত্মভোলা মানুষ তো!
আমি বললাম, চা খাবেন
মোরশেদ সাহেব?
‘আমাকে বলছেন?’
‘হ্যাঁ, আপনাকেই বলছি।
আপনি কি আমাকে চিনতে
পারছেন না?’
‘জ্বি-না।’
‘একটু আগেই দেখা হয়েছে।’
ভদ্রলোক আরো বিস্মিত হলেন।
আমি বললাম, এখন
কি চিনতে পেরেছেন?
তিনি মাথা নেড়ে বললেন,
জ্বি জ্বি। মাথা নাড়ার
ভঙ্গি দেখেই
বুঝতে পারছি তিনি মোটেই
চেনেননি। আমি বললাম—
এষার সঙ্গে কথা হয়েছে?
‘জ্বি, হয়েছে। এখন
আপনাকে চিনতে পেরেছি।
আপনি এষার ছোটমামা।
এষাকে ডেকে দিয়েছেন।’
‘আপনার স্মৃতিশক্তি খুবই ভাল।
আমি অবশ্যি এষার
ছোটমামা না।
সেটা কোনো বড় কথা না।
এষা আপনার
সঙ্গে কথা বলেছে। এটাই বড়
কথা।’
‘এষা কথা বলেনি।’
‘কথা বলেনি?’
‘জ্বি-না।
আমাকে দেখে প্রচণ্ড রাগ
করল। আপনি তো জানেন ও রাগ
করলে কেঁদে ফেলে—
কেঁদে ফেলল। তারপর বলল, বের
হয়ে যাও।এক্ষুণি বের হও।
আমি চলে এসেছি।’
‘ভাল করেছেন। আসুন
চা খাওয়া যাক।’
‘আমি চা খাই না।
চা খেলে রাতে ঘুম হয় না।’
‘তা হলে চা না খাওয়াই
ভাল। এষা আপনার কে হয়?’
‘ও আমার স্ত্রী।’
‘আমি তাই আন্দাজ করছিলাম।
চলুন যাওয়া যাক।’
‘চলুন।’
বড় রাস্তায় গিয়ে ভদ্রলোক
রিকসা নিলেন।
খিলগাঁ যাবেন।
রিকসাওয়ালাকে বললেন, ১৩২
নম্বর খিলগাঁ, একতলা বাড়ি।
সামনে একটা বড় আমগাছ আছে।
রিকসাওয়ালাকে এইভাবে
বাড়ির
ঠিকানা দিতে আমি কখনো
শুনিনি। তিনি রিকসায়
উঠে বসে আমার
দিকে তাকিয়ে বললেন,
ছোটমামা,
আপনি কোনদিকে যাবেন?
আসুন আপনাকে নামিয়ে দি।
আমি এষার ছোট মামা নই।
কিন্তু
মনে হচ্ছে ভদ্রলোককে এইসব
বলা অর্থহীন। তাঁর মাথায়
ছোটমামার
কাঁটা ঢুকে গেছে। সেই
কাঁটা দূর করা এত সহজে সম্ভব
না।
আমি বললাম, মোরশেদ সাহেব
আমি উল্টোদিকে যাব।
‘আপনি এষাকে একটু বলবেন
যে আমি সরি। একটা ভুল
হয়ে গেছে।এরকম ভুল আর
হবে না।’
‘যদি দেখা হয় বলব। অবশ্যই বলব।’
‘যাই ছোটমামা?’
‘আচ্ছা, আবার দেখা হবে।’
আমি উল্টোদিকে হাঁটা
ধরলাম। এষাদের
বাড়িতে আবার
ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে না।
কি করব এখনো ঠিক করিনি।
ঘণ্টাখানিক রাস্তায়
হেঁটে মেসে গিয়ে ঘুমিয়ে
পড়ব। রাতের
খাওয়া এখনো হয়নি—কোথায়
খাওয়া যায়? কুড়ি টাকার
একটা নোট পকেটে আছে।
অনেক টাকা। কুড়ি কাপ
চা পাওয়া যাবে। একজন
ভিখিরির দু’দিনের রোজগার।
ঢাকা শহরে ভিখিরিদের গড়
রোজগার দশ টাকা। এই তথ্য
ইয়াদের কাছ থেকে পাওয়া।
সে হল আমার বোকা বন্ধুদের
একজন। ইয়াদের অঢেল টাকা।
টাকা বোকা মানুষকেও
বুদ্ধিমান বানিয়ে দেয়।
ইয়াদকে বুদ্ধিমান
বানাতে পারেনি।ইয়াদদের
পরিবারের যতই টাকা হচ্ছে,
সে ততই বোকা হচ্ছে।
ইয়াদ ভিখিরিদের উপর
গবেষণা করছে। তার
পিএইচি.ডি. ডি থিসিসের
বিষয় হল‘ভাসমান
জনগোষ্ঠীঃ আর্থ-সামাজিক
নিরীক্ষার আলোকে’।
ইয়াদকে অনেক
ডাটা কালেক্ট করতে হচ্ছে।
আমি তাকে সাহায্য করছি।
সাহায্য করার মানে হল—তার
একটা বিশাল
পেটমোটা কালো ব্যাগ
হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো।
তার
কালো ব্যাগে পাওয়া যাবে
না এমন জিনিস নেই। কাগজপত্র
ছাড়াও ছোট একটা টাইপ
রাইটার।
বোতলে ভর্তি চিড়া-গুড়।
ইনসটেন্ট কফি, চিনি, ফার্স্ট
এইডের জিনিসপত্র।
একগাদা লম্বা নাইলনের দড়িও
আছে। আমি জিজ্ঞেস
করেছিলাম—
দড়ি কি জন্যে রে ইয়াদ?
সে মুখ শুকনো করে বলেছে—কখন
কাজে লাগে বলা তো যায়
না। রেখে দিলাম। ভাল
করিনি? ভাল করিনি—
বলাটা ইয়াদের মুদ্রাদোষ!
কিছু বলেই খানিকক্ষণ চুপচাপ
থেকে বলবে—ভাল করিনি?’
রাত একটার দিকে মজনুর
দোকানে ভাত
খেতে গেলাম। ভাতের
হোটেলের সাধারণত
কোনো নাম থাকে না। এটার
নাম আছে। নাম হল—‘‘মজনু
মিয়ার ভাত মাছের হোটেল।’’
বিরাট সাইনবোর্ড।
সাইনবোর্ডের এক মাথায়
একটা মুরগির ছবি, আরেক
মাথায় ছাগলের ছবি। ভাত-
মাছের ছবি নেই। মজনুর
দোকানে ভাত
খেতে যাওয়ার আদর্শ সময় হল
রাত একটা।
কাস্টমাররা চলে যায়।
কর্মচারীরা দু’টা টেবিল একত্র
করে গোল হয়ে খেতে বসে।
ওদের সঙ্গে বসে পড়লেই হল।
মজনুর ‘ভাত-মাছের
হোটেলে’র ঝাঁপ
ফেলে দেয়া হয়েছে। বয়-
বাবুর্চি একসঙ্গে খেতে
বসেছে। খাবার
যা বাঁচে তাই শেষ
সময়ে খাওয়া হয়। আজ ওদের
ভাগ্য ভাল—রুই মাছ।
খাসি দু’টাই বেঁচে গেছে।
প্রচুর বেঁচেছে। শুধু ভাত নেই।
অল্পকটা আছে, তাই
একটা টিনের থালায়
রাখা আছে। তরকারির
চামচে এক চামচ করেও সবার
হবে না।
আমাকে দেখে এরা জায়গা
করে দিল।মজনু
মিয়া বিরসমুখে বললেন, হিমু
ভাই রোজ দেরি করেন।
আপনার মতো কাস্টমার
না থাকা ভাল। বড়ই যন্ত্রণা।
আমি বললাম, ভাত নেই নাকি?
‘যা আছে আপনার হয়ে যাবে।
আপনে খান। ওরা মাছ, গোছ
খাবে। এতবড়
পেটি একটা খেলে পেট
ভরে যায়।’
‘খানিকটা ভাত
রান্না করে ফেললে কেমন
হয়?’
‘হিমু ভাই, আপনি আর
যন্ত্রণা করবেন না তো! রাত
একটার সময় ভাত রানবে?’
‘অসুবিধা কি?’
‘অসুবিধা আছে। চাল নাই।
পোলাওয়ের চাল সামান্য
আছে—সকালে বিরানী হবে।
এই, তোরা খা। আমি চললাম।
আর শুনেন হিমু ভাই, আপনার ঐ
পাগলা বন্ধু ইয়াদ
সাহেবকে আমার
এখানে আসতে নিষেধ
করে দিবেন। আজ
একদিনে দুইবার দুইবার
এসেছে আপনার খোঁজে।
দুইবারেই খুব যন্ত্রণা করেছে।
বলে, চা দিন। দিলাম চা।
বলে কাপ পরিষ্কার হয়নি। গরম
পানি দিয়ে ধুয়ে নিন,
আমি ডাবল দাম দিব। দিলাম
গরম পানি দিয়ে ধুয়ে।
চা মুখে দিয়ে থু
করে ফেলে দিয়ে বলে-
চিনি কম দিয়ে আরেক কাপ
দিতে বলুন, আমি ডবল দাম দিব।
কথায় কথায় ডবল দাম। আরে ডবল
দাম চায় কে তার কাছে?
এতগুলো কাস্টমারের
সামনে যে থু করে চা ফেলল,
আমার অপমান হয় না?
আপনি আপনার
বন্ধুকে বলে দিবেন।
‘ইয়াদকে আমি বলে দেব।’
‘আজেবাজে লোককে হোটেল
চিনায়ে দিয়েছেন,
এরা জান শেষ করে দেয়।’
মজনু মিয়া ক্যাশ
নিয়ে চলে গেল। টিনের
থালায় এক থালা ভাত
নিয়ে আমরা ছ’জন মানুষ চুপচাপ
বসে আছি। বাবুর্চির নাম
মোস্তফা।
মোস্তফা বসেছে আমার
পাশে। সে ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত।
মোস্তফা বলল, হিমু ভাই,
আফনে খান। রুই মাছটা ভাল
ছিল। আরিচার মাছ।
খেয়ে আরাম পাইবেন।
‘আমি একা ভাত খাব,
আপনারা শুধু তরকারি?’
‘অসুবিধা কিছু নাই ভাইজান।’
‘অসুবিধা আছে। চুলা ধরান,
পোলাওয়ের চাল
বসিয়ে দিন। পোলাও
রান্না করে ফেলুন। ভাল মাছ
আছে, পোলাও দিয়ে আরাম
করে খাই।
বাবুর্চি অন্যদের
দিকে তাকাল। সবার চোখই
চকচক করছে।আমি বললাম,
মাছের
তরকারি ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।
গরম করতে হবে।
চুলা তো ধরাতেই হবে।
মোস্তফা ক্ষীণ গলায় বলল,
মালিক শুনলে খুবই রাগ হইব।
‘শুনবে কেন? শুনবে না।
তা ছাড়া আগামী দু’ দিন
মালিক দোকানে আসবে না।’
‘পোলাও বসাইয়া দিমু?’
‘দিন।’
‘সকালের
জইন্যে মুরগি কাটা আছে।
মোরগ-পোলাও বসাইয়া দিমু
ভাইজান?’
‘আইডিয়া মন্দ না।
যাহা বাহান্ন তাহা পঁয়ষট্টি।
পোলাও যখন হচ্ছে মোরগ
পোলাওয়ে অসুবিধা কি!
কতক্ষণ লাগবে?’
‘ডাবল আগুন
দিয়া রানলে আধা ঘণ্টার
মামলা ভাইজান।’
‘দিন ডাবল আগুন। সিঙ্গেল
আগুনে আজকাল কিছু হয় না।’
মজনু মিয়ার ভাত-মাছের
দোকানের কর্মচারীদের
চোখ-মুখ আনন্দে ঝলমল
করতে লাগল। আমি বললাম,
রান্নাবান্না হোক, আমি আধ
ঘণ্টা পর আসব।
‘চা বানাইয়া দেই ভাইজান?
বইসা বইসা গরম চা খান।’
‘চা খেয়ে খিদে নষ্ট করব না।
ভাল-ভাল জিনিস
রান্না হচ্ছে।’
আমি চলে গেলাম
তরঙ্গিণী ডিপার্টমেন্টাল
ষ্টোরে।
ডাকাডাকি করে মুহিব
সাহেবের ঘুম ভাঙালাম।
তিনি ষ্টোরের ভেতরেই
ঘুমান। মুহিব সাহেব
দরজা খুলে সহজ গলায় বললেন,
কি দরকার হিমুবাবু?
‘ছ’ বোতল ঠাণ্ডা কোক দিন
তো!’
মুহিব সাহেব ছ’টা বোতল
পলিথিনের
ব্যাগে করে নিয়ে এলেন।
একবারও জিজ্ঞেস করলেন না,
রাত দেড়টায় কোক কি জন্যে।
‘মুহিব সাহেব,
সঙ্গে টাকা নেই।
টাকা পরে দিয়ে যাব।’
‘জ্বি আচ্ছা। আপনি আমার
জন্যে একটু দোয়া করবেন হিমু
ভাই।
খাসদিলে দোয়া করবেন।’
‘আবার কি হল?’
‘কিছু হয় নি।এম্নি বললাম। আজ
আপনার জন্মদিন। একটা শুভদিন।’
‘জন্মদিন আপনি জানতেন?’
‘জানব না কেন? জানি।
সকালবেলা একবার আপনার
কাছে যাব ভেবেছিলাম—
যেতে পারিনি।ছুটি পেলাম
না। যাক, তবু শুভদিনে শেষ
পর্যন্ত দেখা হল।’
‘শুভ দিনে দেখা হয়নি মুহিব
সাহেব—এখন প্রায়
দু’টা বাজতে চলল।জন্মদিনের
মেয়াদ শেষ। যাই—’
মুহিব সাহেব দুঃখিত
চোখে তাকিয়ে রইলেন। ছ’
বোতল কোক নিয়ে আমি বের
হয়ে এলাম। মজনু মিয়ার ভাত-
মাছের হোটেলের লোকজন
নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে আমার
জন্যে। ভাল শীত পড়েছে।
শীতের সময় সবাই খুব দ্রুত হাঁটে।
আমি ধীরে-ধীরে এগুচ্ছি।
গায়ে শীত
মাখিয়ে হাঁটতে ভাল
লাগছে। রাতে হাঁটার সময়
আপনাতেই আকাশের
দিকে চোখ যায়। প্রাচীণ
কালে মানুষ আকাশের তারার
দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ
ভ্রমণে বেরুত। সব মানুষই বোধহয়
সেই প্রাচীণ স্মৃতি তার
‘জীনে’ বহন করে।
next
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Telephone
Website
Address
ONLINEBOOKSTOR-বাংলা
