14/07/2026
সম্প্রতি নরওয়ের ফুটবল দল তাদের পূর্বপুরুষ ভাইকিং যোদ্ধাদের বীরত্ব, শৌর্যবীর্য আর রূপকথাকে মাঠের লড়াইয়ে নতুন করে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সেই সমুদ্রচারী যোদ্ধারা—যাদের নামে একসময় কাঁপত পুরো ইউরোপ, যাদের কুঠার আর লং-শিপগুলো ছিল মূর্তিমান আতঙ্ক।
কিন্তু ইতিহাস সব সময় একরকম থাকে না। পপ-কালচার আর সিনেমার পর্দায় ভাইকিংদের যতই অপরাজেয় হিসেবে দেখানো হোক না কেন, ইতিহাসের পাতায় এমন এক নির্মম পরাজয়ের গল্পও আছে, যেখানে আন্দালুসের মুসলিম অশ্বারোহীদের সামনে তাদের সব অহংকার আর রূপকথা ধুলোয় মিশে গিয়েছিল।
সেই মহাকাব্যিক লড়াইয়ের নাম—গুয়াদেলকুইভিরের যুদ্ধ বা দ্য ব্যাটল অব গুয়াদেলকুইভির।
সময়টা ৮৪৪ খ্রিস্টাব্দ। কর্ডোবার উমাইয়া খিলাফতের তখন স্বর্ণযুগ, আমির দ্বিতীয় আবদুর রহমানের শাসনকাল। আচমকাই স্পেনের উপকূলে এসে ভিড় করে প্রায় ৮০টি ভাইকিং জাহাজের এক বিশাল বহর। লিসবন এবং কাদিজ লুণ্ঠন করার পর, তাদের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় মুসলিম স্পেনের অন্যতম সমৃদ্ধ শহর সেভিল।
সেভিলে প্রবেশ করে ভাইকিংরা তাদের স্বভাবসুলভ নৃশংসতা শুরু করে। নির্বিচারে সাধারণ মানুষকে হত্যা, মসজিদ পুড়িয়ে দেওয়া এবং সম্পদ লুটপাটে মেতে ওঠে তারা। সেভিলের গভর্নর আমির আবদুর রহমানের কাছে জরুরি সাহায্যের বার্তা পাঠান। আমির বুঝতে পেরেছিলেন, এই বর্বর আক্রমণকারীদের থামাতে হলে সাধারণ প্রতিরোধ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন এক বিধ্বংসী ও সুপরিকল্পিত পাল্টা আঘাত।
আমির আবদুর রহমান তাঁর সেরা সেনাপতি ঈসা ইবনে শুহাইদ-এর নেতৃত্বে এক বিশাল বাহিনী প্রেরণ করেন। এই বাহিনীর মূল চালিকাশক্তি ছিল আন্দালুসের দুর্ধর্ষ ও ক্ষীপ্রগতির হালকা অশ্বারোহী দল বা ক্যাভালরি। তারা শুধু তরবারি চালনাতেই পারদর্শী ছিল না, বরং তাদের গতি আর রণকৌশল ছিল ভাইকিংদের ভারী বর্ম ও কুঠার-নির্ভর পদাতিক বাহিনীর সম্পূর্ণ বিপরীত।
মুসলিম বাহিনী রণক্ষেত্রে পৌঁছানোর পর ভাইকিংদের ফাঁদে ফেলার জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে।
সেভিলের কাছে গুয়াদেলকুইভির নদীর অববাহিকায় দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। ভাইকিংরা অভ্যস্ত ছিল তাদের বিখ্যাত শিল্ড ওয়াল বা ঢালের প্রাচীর তৈরি করে লড়াই করতে। কিন্তু আন্দালুসের মুসলিম অশ্বারোহীরা তাদের সেই সুযোগই দেয়নি।
আন্দালুসের বাহিনী হিট অ্যান্ড রান কৌশল অবলম্বন করে। অশ্বারোহীরা তীব্র গতিতে ভাইকিংদের ওপর চড়াও হতো, তীর বৃষ্টি বর্ষণ করত এবং ভাইকিংরা পাল্টা আক্রমণ করার আগেই আবার পিছিয়ে যেত। এই ক্রমাগত আক্রমণে ভাইকিংদের শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে।
অন্যদিকে কর্ডোবার নৌবাহিনী এবং পদাতিক দল ভাইকিংদের লং-শিপগুলোর ওপর ‘নাফথ’ বা এক ধরণের প্রাচীন অগ্নিবোমা নিক্ষেপ করতে। ফলে নদী তীরেই দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করে ভাইকিংদের অহংকারের জাহাজগুলো।
মুসলিম বাহিনী চূড়ান্ত আঘাত হানে , ভাইকিংরা যখন জাহাজ পুড়তে দেখে দিকবিদিকজ্ঞান হারিয়ে পেছনে হটতে শুরু করে। ঠিক তখনই ঈসা ইবনে শুহাইদের মূল অশ্বারোহী দল চারপাশ থেকে তাদের ঘিরে ফেলে।
আন্দালুসের মুসলিম অশ্বারোহীদের ক্ষীপ্রতা আর তরবারির ঝিলিকের সামনে ভাইকিংদের ভারী কুঠারগুলো বাতাস কাটারও সময় পায়নি। সমুদ্রের যে দানবেরা পুরো ইউরোপকে কাঁপাত, গুয়াদেলকুইভিরের তীরে তারা স্রেফ কচুকাটা হয়েছিল।
এই যুদ্ধটি ভাইকিংদের জন্য কতটা বিপর্যয়কর ছিল, তা ইতিহাসের কিছু পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায়।
ভাইকিংদের প্রায় ৩০টিরও বেশি লং-শিপ সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয় এবং হাজার হাজার ভাইকিং যোদ্ধা নিহত হয়। ওদের কুখ্যাত কমান্ডার কিং এই যুদ্ধেই মুসলিম অশ্বারোহীদের হাতে নিহত হন।
যুদ্ধে বেঁচে থাকা ভাইকিংদের অনেককেই সেভিলের খেজুর গাছে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়, যা বাকি ভাইকিংদের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা ছিল।