11/07/2026
আলোর পথে গ্রন্থাগারের ডাক
বর্তমান সমাজ যেন এক অদৃশ্য অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে। মাদকাসক্তি, নৈতিক অবক্ষয় আর মূল্যবোধের অবনতি—সব মিলিয়ে এক ধরনের নীরব সংকট আমাদের ঘিরে ধরেছে। তরুণদের চোখে যে স্বপ্ন থাকার কথা, সেখানে আজ অনেক সময় বিভ্রান্তি আর শূন্যতা দেখা যায়। কিন্তু এই অবস্থার দায় শুধু তাদের নয়; আমাদেরও, আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মেরও। আমরা সময়মতো তাদের হাতে আলো তুলে দিতে পারিনি, তাই তারা অন্ধকারে পথ খুঁজতে গিয়ে ভুল পথে চলে যাচ্ছে।
সমাজে যখন খারাপের ঢেউ ওঠে, তখন তার বিপরীতে ভালো কিছুর শক্ত দেয়াল গড়ে তোলা জরুরি। শুধু “খারাপ থেকে দূরে থাকো” বললে হবে না—“ভালো কী”, সেটাও দেখাতে হবে, অনুভব করাতে হবে। আর এই ভালোকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে ছড়িয়ে দিতে পারে একটি গ্রন্থাগার—নিঃশব্দে, অথচ গভীর শক্তিতে।
প্রমথ চৌধুরী তাঁর “বই পড়া” প্রবন্ধে যেন আলোর দিশা দেখিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, বই পড়া মানে শুধু সময় কাটানো নয়; এটি চিন্তার দরজা খুলে দেয়, মানুষকে ভেতর থেকে বড় করে তোলে। যে তরুণ বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, সে সহজে বিপথে যায় না—কারণ তার ভেতরে তখন একটি আলোকিত জগৎ গড়ে ওঠে।
একইভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রন্থাগারকে কল্পনা করেছিলেন এক জীবন্ত সাধনার জায়গা হিসেবে। তাঁর ভাবনায়, লাইব্রেরি মানে শুধু বইয়ের তাক নয়; এটি এমন এক প্রাঙ্গণ, যেখানে মন চিন্তা করে, হৃদয় প্রসারিত হয়, আর মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করে। যদি আমাদের প্রতিটি এলাকায় এমন একটি প্রাণবন্ত গ্রন্থাগার গড়ে ওঠে, তবে সেটি হবে তরুণদের জন্য আশ্রয়—একটি নির্মল, সৃজনশীল আশ্রয়।
আর সৈয়দ মুজতবা আলী আমাদের মনে করিয়ে দেন—শুধু দেখা বা শোনা যথেষ্ট নয়; ভালোকে জীবনে ধারণ করতে হয়। তাই গ্রন্থাগার শুধু বই পড়ার জায়গা হলেই চলবে না; সেখানে থাকতে হবে পাঠচক্র, আলোচনা, গল্প, সংস্কৃতি—যেখানে তরুণরা অংশ নেবে, ভাববে, নিজের ভিত গড়ে তুলবে।
আজকের সমাজে অনেক তরুণের কাছে সময় কাটানোর ভালো জায়গা নেই, ভালো সঙ্গ নেই, ভালো চিন্তার সুযোগ নেই। ফলে তারা খুব সহজেই ভুল পথে পা বাড়ায়। তাই আমাদের দায়িত্ব শুধু নিষেধ করা নয়; তাদের জন্য এমন এক জগৎ তৈরি করা, যেখানে তারা আনন্দ পাবে, শিখবে, বড় হবে—মানুষ হিসেবে।
সবশেষে, এই কথাটাই সবচেয়ে বেশি সত্য—অন্ধকারকে দূর করতে অন্ধকারের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয় না; একটি প্রদীপই যথেষ্ট। সেই প্রদীপ হতে পারে একটি গ্রন্থাগার, একটি বই, একটি সুন্দর চিন্তা। যদি আমরা আজ সেই আলো জ্বালাতে পারি, তবে আগামী প্রজন্ম আর পথ হারাবে না—বরং নিজেরাই আলো হয়ে উঠবে।

11/07/2026
23/04/2026
14/03/2026