10/04/2026
২৬ মার্চ ২০২৬|| ১২টা দিন—প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে আতঙ্কে, ভয় আর কান্নায়।
৬ এপ্রিল ২০২৬, রাত ১:৩০।
আমি আর শেহজানের মা তাহাজ্জুদ নামাজে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ উপরে থেকে ডাক আসছে—
PICU-13! PICU-13! PICU-13-এর বাবা-মা কেউ আছেন?
কিছুক্ষণ আগেই দেখে আসলাম শেহজানকে—১২ দিন পর চোখ খুলেছে। আমি যেতে চাইনি, শেহজানের আম্মু জোর করে নিয়ে গেলো। বললো, “আসো, শেহজান চোখ খুলেছে ১২ দিন পর। আর দেখতে পারবো কিনা জানি না…”
এপ্রোন পরে এক পা, দুই পা করে ভয়ে ভয়ে গেলাম আমার পাপার কাছে। গিয়ে দেখি—চোখ খুলে একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। দেখে খুশি হলাম, আবার মনে ভয়ও লাগছিলো—এটাই কি শেষ দেখা?
কিছুক্ষণ ডাকলাম—“এই পাপা! পাপা!”
কিন্তু কোনো সাড়া নেই… শুধু দুই চোখ মেলে তাকিয়ে রইলো।
সেই তাকানো আমি কোনোদিন ভুলতে পারবো না 😭
কিছুক্ষণ পর নিচে নেমে আসলাম তাহাজ্জুদ নামাজ পড়বো বলে।
হঠাৎ মেজো ভাই ইতালি থেকে ফোন দিলো। সেখানে সে মসজিদে সবার সাথে দোয়া করছিলো—আমরাও শরিক হলাম।
দোয়া শেষে আমি, আম্মা আর শেহজানের আম্মু নামাজে দাঁড়ালাম।
রাত ১:৩০।
হঠাৎ আবার ডাক—
PICU-13! PICU-13! PICU-13-এর বাবা-মা কেউ আছেন?
আম্মা নামাজ শেষ করে দৌড়ে গেলেন। আমি আর শেহজানের আম্মু তখনো নামাজে…
মাত্রই তো দেখে আসলাম! এখন কেন ডাকছে?
নামাজ শেষ করেই বুঝে গেলাম—আমাদের শেহজানকে আল্লাহ খুব ভালোবেসে নিয়েছেন। তাকে জান্নাতের পাখি বানিয়ে নিয়েছেন।
নামাজ শেষে আমরা দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললাম—
“আল্লাহ শেহজানকে কবুল করেছেন…”
উপরে গেলাম—এবার আর হাত-পা কাঁপছিলো না।
ভিতরে গিয়ে দেখি, ছোট্ট শেহজানের চেহারা আর আগের মতো নেই…
ডাক্তার বললেন—ও আর রেসপন্স করছে না।
আমরা তো নামাজেই বুঝে গিয়েছিলাম—আল্লাহর ডাকে শেহজান চলে গেছে।
পিতা-মাতার নামাজের মাঝেই আল্লাহ সন্তানকে নিয়ে গেছেন—এর চেয়ে ভালো মৃত্যু আর কী হতে পারে?
আমি সময় নষ্ট না করে গাড়ি নিয়ে শেহজানকে তার দাদার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
১৮ বছর ধরে ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরেছি, কিন্তু এইবারের যাত্রা একেবারেই আলাদা…
এই তো ৩ মাস আগে প্রথমবার তাকে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম।
আর আজ—শেষবারের মতো বাড়ি ফিরলো…
জীবন বড়ই অদ্ভুত।
৬ তারিখের রাতের ঝড় যেন সবকিছু একেবারে স্তব্ধ করে দিয়ে গেছে…
আজ আমি মানুষ হিসেবে খুবই সৌভাগ্যবান।
২ বছর আগে আমি নিজ হাতে আমার বাবার জানাজা পড়িয়েছি।
আর ঠিক ২ বছর পর—
নিজের সন্তানকে নিজ হাতে গোসল করিয়ে দাদার ইহরামের কাফনের কাপড় পরিয়ে, কোলে করে জানাজায় নিয়ে গেলাম।
নিজেই জানাজা পড়ালাম।
তাকে দাফন করার আগে গালে শেষ চুমু দিয়ে বললাম—
“ইনশাআল্লাহ শেহজান, দেখা হবে জান্নাতে, বাবা…”
১ বছরের এই সম্পূর্ণ জীবনযাত্রার সমাপ্তি।
নিজ হাতে তাকে শেষ ঘুম পাড়িয়ে দিলাম—তার দাদার পাশে।
এটাই ছিল দাদা আর নাতির প্রথম দেখা…
আব্বা চলে যাওয়ার পর সবসময় দোয়ায় বলতাম—
“হে আল্লাহ, আমার বাবার কবরকে জান্নাতের বাগিচা বানিয়ে দিন।”
হয়তো আল্লাহ সেই দোয়াটা কবুল করেছেন…
আলহামদুলিল্লাহ।
বাবা হিসেবে সন্তানের জন্য প্রতিটি দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি—এর জন্য আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া।
নিশ্চয়ই আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী।
তিনি যা করেন, আমাদের বোঝার বাইরে হলেও—তার ভেতরে বরকত রয়েছে।
আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহ অবশ্যই উত্তম কিছুই নির্ধারণ করে রেখেছেন।
দুনিয়ায় থেকেও পরকালের সুসংবাদ পাওয়া সবার ভাগ্যে হয় না।
আল্লাহর দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া।
আল্লাহর কাছে একটাই চাওয়া—
আমাকে এবং আমার পরিবারকে এই কঠিন পরীক্ষায় ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দান করুন।
আমিন

24/03/2026