অফিসে যাওয়ার জন্য যখন তৈরি হচ্ছিলাম তখন আমার স্ত্রী শ্রাবণী রান্নাঘর থেক কড়াই এনে আমার সামনে রেখে বললো,
-"বলো তো কড়াইয়ের মধ্যে কি আছে? "
আমি শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে কড়াইয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম,
-- পানিই তো মনে হচ্ছে।
শ্রাবণী আমার চোখে চোখ রেখে বললো,
-" হয় নি, এটা পানি না।এটা বসুন্ধরা সয়াবিন তেল। আমি ৩০মিনিট ধরে আগুনে রেখে গরম করে এনেছি। আমার কথার যদি সোজাসাপ্টা জবাব না দাও, তাহলে এই গরম তেল আমি তোমার শরীরে ঢেলে দিবো।"
শ্রাবণীর কথা শুনে আমি ওর সামনে থেকে দুইহাত সরে গিয়ে বললাম,
-- কি সব পাগলে মতো কথা বলছো!
শ্রাবণী বললো,
-"আমি সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের মতোই কথা বলছি। অর্পিতা কে?"
-- কোন অর্পিতা?
-" যাকে নিয়ে ফেসবুকে আজকাল খুব লেখালেখি করছো?"
আমি মুচকি হেঁসে শ্রাবণীকে বললাম,
-- আরে এই নামতো আমি এমনি ব্যবহার করেছি। তাছাড়া তুমিই তো সেদিন বলেছিলে আমার ছাইপাঁশ গল্পে তোমার নামটা যেন ব্যবহার না করি। তাই তো আর তোমার নাম দেই না
শ্রাবণী মুখটা মলিন করে বললো,
-"তোমারা স্বামীরা এমন কেন? স্ত্রীদের মন বুঝতে চাও না। আরে আমি মুখে না করেছি ঠিকিই কিন্তু মনে মনে চাই তুমি আমার নামটাই সব সময় ব্যবহার করো। শুনো আমি যদি কখনো মুখে না করি অথচ মাথা নিচু করে মিটমিট করে হাসি তাহলে ধরে নিবে আমি মনে মনে হ্যাঁ বলছি। মনে থাকবে কথাটা?"
আমি হেঁসে বললাম,
-- মনে থাকবে শাহজাদী গুলবাহার।
আমার কথা শুনে শ্রাবণী বললো,
-"তোমায় না বলেছি আমায় এই নামে না ডাকতে.."
খেয়াল করে দেখি শ্রাবণী মুখে না করেছে ঠিকিই কিন্তু মাথা নিচু করে মিটমিট করে হাঁসছে। আমি বুঝেগেছি আমার বউয়ের মনের কথা। তার মানে সে মনে মনে চাচ্ছে আমি যেন তাকে এই নামে বেশি করে ডাকি। আমি সমানে শাহজাদী গুলবাহার, শাহজাদী গুলবাহার বলে ডাকতে লাগলাম। আর শ্রাবণী হাঁসতে লাগলো। এমন সময় কলিংবেলের শব্দ হলো। শ্রাবণী আমায় বললো,
-" তুমি তৈরি হও, আমি দেখছি কে এসেছে।"
আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শার্টের কলার ঠিক করতে লাগলাম। শ্রাবণী দরজা খুলে বললো,
-"কাকে খুঁজছেন?"
বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা বললো,
~"আসসালামু আলাইকুম ভাবী। আমি অর্পিতা, স্যারের অফিসে কাজ করি। পাশেই আমার ফুফুর বাসা। কাল একটা দরকারে এইখানে এসেছিলাম। আজ যখন অফিসে যাবো তাই ভাবলাম স্যারের সাথেই যাই। তা স্যার কি আছেন, নাকি অফিসে চলে গিয়েছেন?"
শ্রাবণী তখন উত্তর দিলো,
-" আপনার স্যার বাসায় নেই। কিছুক্ষণ আগে গরম তেল উনার শরীরে পড়ে গেছে। উনি এখন হাসপাতালে ভর্তি।"
শ্রাবণীর কথা শুনে আমার গলা শুকিয়ে গেলো। শ্রাবণী যখন রুমের দিকে আসতে লাগলো আমি তখন দৌড়ে ওয়াশরুমে গিয়ে দরজা লক করে বসে রইলাম। বাহির থেকে শ্রাবণী দরজা ধাক্কাতে লাগলো আর বলতে লাগলো,
-"তুমি দরজা খুলো বলছি, তা না হলে আমি কিন্তুু পুরো বাসায় আগুন লাগিয়ে দিবো।"
আমি তাড়াতাড়ি পকেট থেকে ফোনটা বের করে আমার বন্ধু মামুনকে ফোন করে বললাম,
--তুই তাড়াতাড়ি এম্বুলেন্স নিয়ে আমাদের বাসার সামনে আয়। আর আসার সময় হাসপাতালে বার্ন ইউনিটে একটা সিট বুকিং দিয়ে আসিস....।
|
|
কয়েকদিন পর আমি আর শ্রাবণী আমার বন্ধু মামুনের বাসায় দাওয়াত খেতে গেলাম। খাওয়া-দাওয়ার এক পর্যায়ে মামুন শ্রাবণীকে বললো,
~"ভাবী আরো একপিস রোস্ট দেই?"
শ্রাবণী মুচকি হেসে বললো,
--না ভাই, আমি আর খাবো না।
তাকিয়ে দেখি শ্রাবণী মুখে না করছে ঠিকিই কিন্তু মিটমিট করে হাঁসছে। তারমনে শ্রাবণী আরো রোস্ট খেতে চায়। আমি তখন মামুনকে বললাম,
-- আরে বেটা, জিজ্ঞেস করার করার কি আছে? একপিস না আরো দুইপিস রোস্ট দে...
আমার কথা শুনে মামুন শ্রাবণীকে দুইপিস রোস্ট দিলো। শ্রাবণী তখন আমার দিকে কেমন করে জানি তাকালো। একটু পর মামুন আবার শ্রাবণীকে বললো,
~"ভাবী, রোস্ট খেতে মনে হয় আপনার ভালো লাগছে না। আপনি একটু গরুর গোশত নেন
শ্রাবণী আবারও হেঁসে জবাব দিলো,
-" না ভাই, আমার পেট ভরে গেছে।"
খেয়াল করে দেখি শ্রাবণী আবার মুখে না করছে ঠিকিই কিন্তু ঠোঁটে হাঁসি লেগে আছে। আমি বউয়ের মনের কথা বুঝে গেছি। আমি মামুনকে তখন বললাম,
--আরে বেটা, এতো জিজ্ঞেস করার কি আছে? তুই তরকারি দে। আমার বউয়ের খেতে ইচ্ছে করছে ঠিকিই কিন্তু লজ্জায় না করছে কিন্তু আমি হলাম আমার বউয়ের আদর্শ স্বামী। আমি ঠিকিই আমার বউয়ের মনের কথা বুঝতে পেরেছি।
এই কথা বলে আমি মামুনের হাত থেকে তারকারির বাটিটা নিয়ে পুরোটা শ্রাবণীর প্লেটে ঢেলে দিলাম।
শ্রাবণী রাগে টেবিল থেকে উঠে বললো,
-"তুই আজ বাসায় আয়। বউয়ের মনের কথা কিভাবে বুঝতে হয় সেটা তোকে আমি নতুন করে শিখাবো।"
এইকথা বলে শ্রাবণী চলে গেলো। আমি মামুনকে বললাম,
-- বন্ধু খাবারটা নষ্ট করে লাভ নেই। তুই প্যাকিং করে আমায় দিয়ে দে। অবস্থা যা দেখছি বাসায় দুইদিন ভাত-পানি পাবো না। এইগুলো খেয়েই বেঁচে থাকতে হবে....
বাসায় আসার পর শ্রাবণী রাগে লাল হয়ে বললো,
-"ছিঃ শেষে কি না নিজের বউকে বন্ধুর চোখে রাক্ষস বানালে। আমি খেতে পারছিলাম না দেখেও জোর করে আমার প্লেটে কেনো খাবার দিলে?"
আমি মাথা নিচু করে বললাম,
-- আমার কি দোষ! তুমিতো সেদিন বললে তুমি যদি মুখে না করো কিন্তু ঠোঁটে মিটমিট হাসি থাকে তাহলে বুঝে নিতে হবে তুমি মনে মনে হ্যাঁ বলছো।
শ্রাবণী তখন শান্ত হয়ে বললো,
-"আরে হাঁদারাম, এটা শুধু স্বামী -স্ত্রীর ক্ষেত্রে। অন্যদের বেলায় যদি আমি মুখে না বলি মানে না, আর যদি হ্যাঁ বলি মনে হ্যাঁ। মনে থাকবে এখন?"
আমি মাথা নেড়ে বললাম,
-- মনে থাকবে শাহজাদী গুলবাহার....।
|
|
মা অসুস্থ থাকার জন্য আমরা দুই ভাই স্ত্রীদের সাথে নিয়ে মাকে দেখতে যাই। শ্রাবণী মাকে বললো,
-" মা, আপনার শরীরটা এখন ভালো নেই। আপনি নাহয় এখন আমাদের সাথেই থাকবেন।"
মা হেঁসে বললো,
~"না বউমা, আমি শহরে থাকলে দম বন্ধ হয়ে এমনিতেই মরে যাবো।"
তারপর মা আলমারি থেকে একটা সোনার হার বের করে শ্রাবণীর হাতে দিয়ে বললো,
~"বউমা, আমার বয়স হয়েছে। কখন কি হয় কি জানি! তুমি আমার প্রথম ছেলের বউ। এই গলার হারটা তুমি রাখো।"
শ্রাবণী মাথা নিচু করে হেঁসে বললো,
-" না মা, আপনার জিনিস আপনার কাছেই রাখুন। আমি নিয়ে কি করবো?"
মা বারবার জোর করছিলো আর শ্রাবণী বার বার না করছিলো। আমি আমার স্ত্রীর মনের কথা বুঝতে পারি। শ্রাবণী বলেছিলো, স্বামী স্ত্রী বাদে অন্য কারো কাছে স্ত্রীর না মানে না আর হ্যাঁ মানে হ্যাঁ। তারমানে শ্রাবণী সত্যিই মন থেকে নিতে চায় না। আমি তো আর্দশ স্বামী স্ত্রীর মন বুঝি। আমি তখন মাকে বললাম,
-- মা, বাদ দাও তো। শ্রাবণী যেহেতু নিতে চাচ্ছে না শুধু শুধু ওকে জোর করো না। তোমার এতই যদি দেওয়ার ইচ্ছে থাকে তোমার ছোট ছেলের বউকে দিয়ে দাও।
আমার কথা শুনে মুহূর্তের মধ্যে শ্রাবণীর মুখটা কেমন জানি হয়ে গেলো। বুঝতে পারছিলাম না ও রাগ করেছে নাকি খুশি হয়েছে....।
পরদিন যখন ঢাকায় ফিরি শ্রাবণী পুরো রাস্তা আমার সাথে একটা কথাও বলে নি। বাসায় যখন ঢুকতে যাবো শ্রাবণী রেগে বললো,
-- তুমি বাসায় ঢুকবে না। তোমার এই গাধা টাইপের মুখটা আমি দুইদিন দেখতে চাই না....।
---
-----
রাত ১১টা বাজে। মামুন আমার কাঁধে হাত রেখে বললো,
~" তুই ভাবীর সাথে কেন সংসার করছিস বল তো? প্রতিদিন তোদের ঝগড়া হয়। দুইদিন পর পর তোকে বাসা থেকে বের করে দেয়। এইসবের কোন মানে হয়?
আমি হেসে মামুনকে উত্তর দিলাম,
-- কেন সংসার করি বলবো? তাহলে শোন, আমি যদি কখনো অসুস্থ থাকি রাত ৩টার সময়ও যদি আমার ঘুম ভেঙে যায় চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি শ্রাবণী জেগে থেকে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে শ্রাবণী। বিয়ের আগে রান্না করবে তো দূরের কথা নিজের ভাত কখনো বেড়ে খায় নি।অথচ সেই মেয়েটা বিয়ের এত বছর পরেও আমাকে একবেলা না খাইয়ে রাখে নি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা একটা মেয়ে। চাইলেই নিজের মেধা খাটিয়ে জব করতে পারতো। কিন্তু সে জব করে নি। সংসারটা মন দিয়ে করছে।
এখন তুই বল, যে মেয়েটা আমার জন্য এতোটা সেক্রিফাইজ করছে তার সাথে সংসার না করে উপায় আছে?
আমার কথা শুনে মামুন তখন বললো,
~"তাহলে তুই কেন ভাবীকে বুঝতে পারিস না?"
আমি আবারও মুচকি হেসে বললাম,
-- কে বলেছে আমি আমার স্ত্রীকে বুঝতে পারি না! আমি সব বুঝি। তবুও আমি ইচ্ছে করে গাধামি করি কারণ আমি চাই না আমি শ্রাবণীর চোখে পরিবর্তন হই। ভার্সিটি জীবনে শ্রাবণী আমাকে ভালোই ভেসেছিলো আমার বোকা বোকা কাজ দেখে।
মামুনের সাথে কথা বলে হাঁটতে হাঁটতে বাসার সামনে এসে গেলাম। মামুনকে তখন বললাম,
-- একটা সিগারেট দে তো
মামুন সিগারেটের প্যাকেটটা আমার হাতে দিয়ে অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
~" তুই তো সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলি। আবার ধরলি নাকি?"
আমি সিগারেটে আগুন ধরিয়ে বললাম,
--উপরে বেলকনিতে তাকিয়ে দেখ শ্রাবণী আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। আমি সিগারেট খেয়ে বাসায় যাবো। ও রেগে যাবে। আমায় প্রচন্ডরকম বকাঝকা করবে। ওর রাগী চেহারা আর ওর শাসনটা আমার খুব ভালো লাগে। তাই একটা সিগারেট খাচ্ছি আর কি....।
---
------
পিয়াস বাসার ভিতর ঢুকে গেছে আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে মামুন ভাবছে,
সময়ের বিপরীতে পিয়াস, শ্রাবণী হাঁটছে। যে সময়ে স্বামী- স্ত্রী টুকটাক কথা কাটাকাটি হলেই ডিভোর্স হয়ে যায়। সেখানে ওরা দিনের পর দিন রাগারাগি ঝগড়া করে ভালোবাসা খুঁজে বেড়াচ্ছে....
©আবুল বাশার পিয়াস*
গল্প নাম্বার ২
This is a real page for reading a romantic story. Everyone can like & share this page. [email protected]
If you want to post your story on this page, u should post your story at this Email.
বাসরঘরে ঢুকতেই বউ আমাকে সালাম করে জিজ্ঞেস করল, " কেমন আছেন ভাইয়া? "
ভাইয়া শব্দটা শুনে অবাক না হয়ে পারলাম না, ইচ্ছে করছিল দেয়ালে মাথা ঠুকে সুইসাইড খাই।
বিয়েটা করেছি পারিবারিকভাবে। বর্তমান যুগে বিয়ে করতে গেলে সবাই অল্পবয়সী মেয়ে খুঁজে, আমার বেলায়ও অন্যটা হয়নি। পারিবারিক মতামতে বিয়ে করলাম ক্লাস নাইনে পড়ুয়া এক সুন্দরী মেয়েকে। বাসর রাতে বউ আমাকে ভাই বলাতে একদম থ হয়ে গেলাম৷ প্রশ্ন করলাম, " আমাকে ভাই বলছো কেন? "
সে স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিল, " আপনার আম্মু আমাকে বলেছে, আজ থেকে উনাকে 'মা' বলে ডাকতে। "
" হ্যাঁ, এটাই তো স্বাভাবিক। মা'ই তো ডাকবে! "
বউ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, " তো আপনার মা যদি আমারও মা হয়, তাহলে তো আমরা ভাই-বোন তাইনা? "
বউয়ের যুক্তি দেখে দু-চোখ থেকে আবেগে আধা ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল৷ অধিক শোকে পাথর হয়ে খাটের এক কোণে বসে রইলাম।
" এই যে ভাইয়া, শোনেন! "
'ভাইয়া' ডাকটা শুনে দুঃখে আমার কলিজা ফেটে কিডনিতে গিয়ে লাগল। জন্ম থেকে এই পর্যন্ত যতটা মেয়ের প্রতি ক্রাশ খেয়েছি, সবগুলো মেয়েই আমাকে 'ভাইয়' ডেকে আমার প্রপোজ করাতে পানি ঢেলে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আমার বউও ভাইয়া ডাকাটা বাদ দিলো না৷ এ জীবন রেখে কী লাভ! ইচ্ছে হচ্ছে মেয়েটাকে বিষ খাইয়ে আমি সুইসাইড করি৷ নিজেকে সামলে সাড়া দিয়ে বললাম, " হ্যাঁ, বলো বইনা৷ "
" একটা বিড়াল এনে দিবেন? "
বউয়ের মুখে এমন কথা শুনে অবাক হয়ে ওর দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে বললাম, " বিড়াল দিয়ে কী করবে শুনি? "
" ভাবী বলেছিল বাসর রাতে বিড়াল মারতে যেন ভুল না করি। "
একটা মানুষ কী করে এতোটা গাধীরাম হতে পারে চিন্তা করতে লাগলাম। চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে আমার হাতে একটা ধাক্কা দিয়ে মাইশা বলল, " এনে দিন না একটা বিড়াল৷ "
ছলছল নয়নে ওর দিকে তাকালাম৷ মেয়েটার চেহারা বেশ মনোমুগ্ধকর, মায়া-মায়া ভাব আছে৷ কিন্তু মাথায় যে ঘিলু বলতে কিছু নেই সেটা আমার আর বুঝার বাকি রইল না। বললাম, " আচ্ছা ঠিক আছে, কালকে বাজার থেকে একটা বিড়ালের বাচ্চা এনে দিব তোমাকে। "
" কিন্তু ভাবি তো বলল, প্রথম রাতে বিড়াল মারতে৷ "
রেগে গিয়ে বললাম, " তো ভাবির বাড়ী থেকে একটা বিড়াল নিয়ে আসলেই পারতা, আমার মতো সাদাসিধে ছেলেটার সাথে কেন এমন করছো? "
বউ চুপচাপ শুয়ে পড়ল বিছানায়৷ বউয়ের কার্যকলাপ দেখে মনে হচ্ছে আজও আমাকে ব্যাচেলারদের মতো রাত কাটাতে হবে। সব ইচ্ছে মনের মধ্যে ধামাচাপা দিয়ে মাঝখানে একটা কোলবালিশ দিয়ে আমিও শুয়ে পড়লাম৷
মাঝরাতে বউ আমাদের মাঝের কোলবালিশটা সরিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, " ভাইয়া, আমার না খুব ভয় লাগছে। "
আমি কথা না বাড়িয়ে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাম, " মাঝরাতে এখানে ভূত আসে, আলাদা কাউকে দেখলেই ঝাপটে ধরে৷ ভালো করে জড়িয়ে ধরো আমাকে। "
আহ, কী রোমান্টিক অনুভূতি! মনে হচ্ছে এই বুঝি ব্যাচেলর লাইফটা কেটে গেল আমার।
বউয়ের মুখে ভাইয়া ডাক শুনতে শুনতে কান আমার ঝালাপালা। ছুটি থাকা সত্ত্বেও বেরিয়ে গেলাম অফিসের উদ্দেশ্যে। কিছুক্ষণ পরপর মাইশা আমাকে কল দিচ্ছে। রিসিভ করতেই বলছে, " বাসায় কখন আসবেন ভাইয়া? বাসার ফেরার পথে বিড়াল আনতে ভুলবেন না কিন্তু! আজকে যে করেই হোক বিড়াল মারতে হবে। "
কথায় কথায় ভাইয়া বলাটা বোধহয় মাইশার একটা বদ অভ্যাস৷ কিছু বলার সাহস হচ্ছিলো না কোনোবারই। শুধুমাত্র "হ্যাঁ" বলেই কল কেটে দিচ্ছি প্রতিবার।
বিকেলে যখন ক্যান্টিনে খাওয়াদাওয়া করে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম তখন আম্মুর কল। রিসিভ করতেই বললেন, " বাবা, মাইশা আমাকে শুধুশুধু প্রশ্ন করছে, ভাইয়া আসবে কখন? আসার পথে মাইশার ভাইয়াকে কল দিয়ে নিয়ে আসিস তো। "
আবেগে দুচোখ বেয়ে আঁড়াই ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল। " ঠিক আছে৷ " বলে কল কেটে দিলাম।
একটা খাঁচাতে বিড়ালের বাচ্চা নিয়ে বাসার কলিংবেলে হাত চাপলাম৷ দেখলাম মাইশা দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই মাইশা জোরে বলতে লাগল, " আম্মু, দেখো ভাইয়া এসেছে৷ "
হাত থেকে বিড়ালের খাঁচাটা রেখে ওর মুখ চেপে ধরলাম। সে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে চোখগুলো এদিক-সেদিক ঘুরাছে৷ কিছু বলার চেষ্টাও করছে। মুখ চেপে ধরে টেনেহিঁচড়ে আমার রুমে নিয়ে গেলাম৷ বললাম, " তুমি আম্মুর সামনে আমাকে ভাইয়া ডাকবে না। "
" কেন! কী হয়েছে? আজ সারাদিন তো 'ভাইয়া' বলে আপনার কথাই বললাম৷ "
আবারও বললাম, " ঠিক আছে, কারোর সামনে আমাকে ভাইয়া ডাকবে না বুঝেছো? "
" আচ্ছা ঠিক আছে। "
শান্তভাবে আমার পাশে মাইশা বসে বিড়ালটা নিয়ে খেলা করছে। কিছুক্ষণ পর মাইশা বলল, " বিড়ালটা খুব কিউট, এটাকে আমি আর মারবো না। আদর করবো। "
আমি আর কিছু বললাম না।
প্রথমবার যখন শশুরবাড়িতে গেলাম। লক্ষ্য করলাম ভাবির সাথে বসে মাইশা কী যেন গুঁজুর-গুঁজুর করছে। আঁড়ি পেতে শোনার চেষ্টা করলাম। ভাবি বলছে, " কিরে! বিড়াল মারলি? "
মাইশা উত্তর দিলো, " উনি বিড়াল কিনে এনে দিয়েছিলেন, কিন্তু বিড়ালের বাচ্চাটা দেখে খুব মায়া হলো তাই এটাকে বাসাতেই রেখে দিয়েছি। "
দুঃখে আমার মরে যেতে ইচ্ছে হলো। লক্ষ্য করলাম ভাবি মিটিমিটি হাসছে।
অল্প কিছুদিনের মধ্যে আমাদের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠতায় পৌঁছালো৷ কিন্তু মাইশার মুখের ভাইয়া ডাকটা সরাতে পারলাম না আর৷ যাইহোক, ব্যাচেলর লাইফ থেকে তো মুক্তি পেলাম। তবে মেয়েটা আমাকে ছাড়া কিছু বুঝেনা কিন্তু, সবসময় পিঁছু পড়েই থাকে।
বিয়ের পাঁচ মাস যেতেই লক্ষ্য করলাম মাইশা ঘনঘন বমি করছে৷ আম্মুও কেমন জানি দুষ্টূমির নজরে আমার দিকে তাকায়৷ বেশ হাসিখুশি পরিবারের সবাই, কিন্তু কেমন জানি সবাই এড়িয়ে চলছে আমাকে৷ রাত হতে মাইশাকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলাম, " আচ্ছা, সবাই আমাকে এভাবে এড়িয়ে চলছে কেন? "
বিশ্বাস করেন রাসেল ভাই, এরপর যা শুনলাম আমি তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। মাইশা মিটিমিটি হাসলো, আমার বুকে মুখ লোকালো। আস্তে করে বলল, " আপনি মামা হতে চলেছেন।
09/04/2023
❤️ Love this weather 🌧️🌧️
01/08/2021
কিছু তিতা কথা বলি আজকে। চাইলে সামনে চিনির পট রেখে দিতে পারেন। একটু পর পর চিমটি দিয়া মুখে দিবেন। ইন্টারনেটের কল্যাণে আমাদের বাসা-বাড়িগুলোতে এক জাতীয় পঙ্গু প্রজন্ম গড়ে উঠছে। এরা সারারাত ইউটিউব, ফেইসবুক ইত্যাদিতে পড়ে থাকে৷ ফজরের খানিক আগে ঘুমোতে যায়৷ সূর্য যখন মাথার উপর থেকে পশ্চিমে হেলতে থাকে, সেই সময় তাদের চোখের পাঁপড়ি নড়ে ওঠে। এক সময় তারা নাস্তা খাবে। এই নাস্তাটা কোত্থেকে এলো সেই খবর কিন্তু তাদের নেই। সাত সকাল থেকে যে মা রান্নাঘরে পড়ে আছেন, তাকে একবার জিজ্ঞেসও করবে না - মা, তুমি খেয়েছো?, বরং তাদের ভাবটা এমন, নাস্তা খেয়ে উদ্ধার করে দিলাম! দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলে চেঁচিয়ে উঠে, মা! দুপুরে কী রান্না করেছো?, কখনো নিজেই উঠে একটু পাতিল নেড়েচেড়ে দেখবে, এরপর পছন্দ না হলে 'এই জিনিস মানুষে খায়' টাইপের মুখ বাঁকিয়ে আবার বিছানায়। প্রাকৃতিক ডাক ছাড়া অথবা অত্যাবশ্যকীয় কোন জরুরত ছাড়া এদের দিন,রাত সব বিছানাতেই কাটে। বাসায় কোন মেহমান এলো, কে বাইরে গেলো, মায়ের উপর দিয়ে কী ঝামেলা যাচ্ছে - এইসবের কোন খোঁজ খবর তাদের থাকে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশিরভাগ সময় পড়ে থাকা এই 'সন্তানগুলো' যখন আবার পোস্ট দেয়, 'আমি ঘুমিয়ে থাকি, আমার খবর থাকে না', তখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই প্রজাতির অন্যান্য প্রাণীরা 'হা হা' 'হু হু' করে তাকে উৎসাহ দেয়। তারা আবার বাবা-মা'দের নিয়েও ট্রল করে। মা বকা দিলে তা নিয়েও ফেইসবুকে মজা লুটে। মা হলো তাদের কাছে কাজের লোক আর বাবা টাকার মেশিন। চাহিদামত কিছু একটা না পেলে খানা বন্ধ করে গুম হয়ে পড়ে থাকবে। এর নাম তারা দেয়, অভিমান! তাদের মন-পসন্দ খাবার তৈরি করতে গিয়ে বয়স্কা মা অথবা মেহমানের আয়োজন করতে গিয়ে ঘর্মাক্ত বৃদ্ধা - তাদের অন্তরে কোন অনুভূতি তৈরি করে না। পঙ্গুর মত তারা চেয়ে চেয়ে দেখে। বাহির থেকে আসা শ্রান্ত বাবার পানে তাদের একটাই প্রশ্ন, 'এনেছো?', অথচ এক গ্লাস পানি তাদের হাতে উঠে না। অসুস্থ এক প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে। এই প্রজন্মই আবার ভুল-ঠিকের বিচার করে! সভ্যতা আর ভদ্রতা শেখায়! বাবা-মাকে ন্যূনতম হিসেব না করা এই প্রজন্মের ফলাফলটা কী? একটু ভালোভাবে তাকিয়ে দেখুন, আপনার হাসিখুশি ফ্রেন্ডে ভরা লিস্টেও এই পঙ্গু প্রজন্মের দৃষ্টান্ত পাবেন অঢেল!
(সংগৃহীত)
#হিরক_রাজার_দেশে।
রাজাঃ মন্ত্রী রাজ্যে ঘোষনা করে দাও আমার রাজ্যে জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে। এখন থেকে আমার রাজ্যে বিয়ে নিষিদ্ধ।
মন্ত্রীঃ রাজা সাহেব। তিনদিন পর আপনার বড় পুত্রের বিয়ে এখন বন্ধ করলে আপনার ছেলের বিয়ে কিভাবে হবে।
খুস খুস করে কেশে উঠে রাজা।
রাজাঃ তাহলে তিনদিন পরেই ঘোষনা করলে সমস্যা কি?
মন্ত্রীঃ জ্বি আজ্ঞে জাহাপানা।
রাজাঃ শুনেছি আমার রাজ্যর শিক্ষার্থীরা খুব তাড়াতাড়ি অনার্স শেষ করে বের হচ্ছে?
মন্ত্রীঃ জ্বি জাহাপানা। কিন্তু রাজ্যে তো চাকরি নেই জাহাপানা।
রাজাঃ তাহলে শালাদেরকে উদ্দোক্তা হতে বলো। শালারা চাকরি ছাড়া কিছুই বুঝে না। আরে বেটা নিজের টাকায় ব্যবসা করবি আরেকজনরে চাকরি দিবি তা না চাকরির পেছনে কুত্তার মতো দৌড়াবি।
মন্ত্রীঃ জাহাপানা শালাদের সরি শিক্ষার্থীদের মুলধন ই তো নেই ব্যাবসা করবে কিভাবে।
রাজাঃ তাহলে একটা কাজ কর। ওদের অনার্স দেরি করে শেষ হওয়ার ব্যবস্থা কর। চাকরির বয়সই না থাকলে চাকরির টেনশন কিসের?
মন্ত্রীঃ জ্বি আজ্ঞে।
রাজাঃ রাজ্যে নাকি মানুষ মরছে নতুন রোগে?
মন্ত্রীঃ জ্বি জাহাপানা।
রাজাঃ তাহলে উপায়?
মন্ত্রীঃ কোন উপায় নেই।
রাজাঃ তাহলে কালকে থেকে সবার সাটার ডাউন করে দে।
মন্ত্রীঃ সাটার ডাউন মানে?
রাজাঃ আরে ঘরের সাটার ডাউন করে দে। ঘর থেকে যাতে বের হতে না পারে।
মন্ত্রীঃ বাহিরে না বের হলে রাজ্যের মানুষ খাবে কি? ইনকাম না করলে বিদ্যুৎ বিল,গ্যাস বিল সামনে বাজেটের জন্য কর দিবে কিভাবে?
রাজাঃ এতো দরদ কেনো তোমার? বেতন কি তোমাকে আমি দিই নাকি জনগনে দেয়? টাকা না থাকলে রক্ত বেচে টাকা দিবে রক্ত না থাকলে জমি বেচে দিবে জমি না থাকলে কিডনি বেচে দিবে। বাজেট তো পাশ হতেই হবে। সামনে আবার আমার পোলার বিয়ে, বৌয়ের জন্ম দিন খরচ আছে না!
মন্ত্রীঃ বাজেট পাশ করতে তো ৭দিন লাগবে। কালকে সাটার ডাউন করবো কিভাবে?
আবারো খুশ খুশ করে কেশে উঠে রাজা।
রাজাঃ তাহলে ৭ দিন পরেই দে সাটার ডাউন। সমস্যা আছে?
মন্ত্রী মুচকি হেসে মাথা নাড়ে
মন্ত্রীঃ আপনার আদেশ শিরোধার্য। সেটাতে আবার সমস্যা কি?
রাজাঃ দেশে শুনছি অটো রিকশা বেড়ে গেছে। সবগুলারে বুলডোজারের নিচে ফেলো।
মন্ত্রীঃ কিন্তু বেচারারা গরীব। অটো না ভেঙে আমদানী বন্ধ করে দিই জাহাপানা?
রাজাঃ তোমাকে মন্ত্রী বানাইছে কোন বুদ্ধু? হাদারাম আমদানী শুল্কের টাকা কি তোমার বাপে দিবে? এমন ভাবে কাজ করো যাতে আমার কোন লোকসান না হয়। বুঝতে পারছো? এদিকে আবার আমার যোদ্ধাদের ভাতা বাড়াতে হবে। সেদিকে খেয়াল আছে?
মন্ত্রীঃ এভাবে মানুষ তো বেশিদিন টিকবে না।
রাজাঃ টেকার দরকার নেই। আমার চামচাদের নিয়ে বেঁচে থাকতে পারলেই লাভের উপর লাভ। বাকিদের বাঁচিয়ে রেখে কি লাভ? তোমার কোন সমস্যা?
মন্ত্রী মাথা নাড়ে আর হাসে। বুঝা যাচ্ছে তার কোন সমস্যা নেই।
এভাবেই অনন্তকাল ধরে চলতে থাকলো হিরক রাজার দেশের রাজসভা।
অনিক
16/12/2019
সবাইকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা।
ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে বোনা গল্প
আনিসুল হক
দুই ইঞ্চি হিলের সাদা রঙের স্যান্ডেল পরে তিনি হাঁটছেন। ফাঁকা করিডরে শব্দ উঠছে খটখট আর দূরের সাদা দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে ফিরে আসছে। এত সুন্দরও হয় একজন মানুষ! হতে পারে! আমার প্রাণের পরে চলে যাচ্ছেন তিনি।
আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি। আমার নাম শহীদুর রহমান তাপস। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিস্ট্রিতে মাস্টার্স করেছি। ঢাকা শহরে থাকি কলাবাগান এলাকায়, একটা বাসায় তিনজন ব্যাচেলর। দুটো টিউশনি করি। মেসে যে চৌকিটাতে আমি ঘুমাই, সেটা আজিমপুর থেকে কিনেছি, আট শ টাকায়। আমার কাঁথাটায় মায়ের শাড়ি আছে। কিছুটা ছেঁড়া। অঘ্রানের শীতে সেটা গায়ে জড়িয়ে থাকি। ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে আমি হাজার পঁচিশেক বেতনের একটা চাকরির স্বপ্ন দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ি।
আজ এসেছি চাকরির ইন্টারভিউ দিতে। ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট প্রজেক্টের জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে লোক নেওয়া হবে। এই ১৪ তলা ভবনের ১২ তলায় ১২০৯ নম্বর কক্ষে যেতে হবে আমাকে।
আমার গায়ে সাদা শার্ট। এটা আমার নয়। পাশের রুমের নেহালের। ও শার্টটা ঢাকা কলেজের উল্টো দিক থেকে কিনেছে চাকরির ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য। আমি আজকের জন্য শার্টটা ধার নিয়ে এসেছি। আমার গলায় একটা টাইও ঝুলছে। এটা আবার আবুল কাশেমের। সে আমাদের আরেকজন মেসমেট। আবুল কাশেম একটা রেস্টুরেন্টে ওয়েটারের চাকরি করে। তাকে নিয়মিত টাই পরতে হয়। আমার গলায় টাইয়ের নট সে বেঁধে দিয়েছে।
আমি টেম্পো থেকে নেমে খানিকটা পথ হেঁটে আগারগাঁওয়ের এই ভবনে এসেছি। বাইরে তীব্র রোদ। যদিও আসন্ন শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে উত্তুরে বাতাস বইছে বাইরে, তবু আমার কপালে ঘাম। শার্টটা পিঠের কাছে চেপে বসছে।
দুটো সিঁড়ি ভেঙে এই বহুতল ভবনের নিচতলায় আসতেই একটা শীতল ছায়া আমাকে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু সামনে তাকিয়ে দেখি সাদা শাড়ি পরা এক অপ্সরী দুই ইঞ্চি হিলের সাদা স্যান্ডেল পরে গটগট করে হেঁটে যাচ্ছেন।
‘দারুণ সুন্দর কিছু দেখলে আমার একটু একটু কান্না আসে’—সুনীলের কবিতাটা আমি আমার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের রুমমেটকে দিবস–রাত্রি বিরামহীনভাবে আবৃত্তি করতে শুনেছিলাম। তখন খুব বিরক্ত লাগত। এখন কবিতার লাইনটাই আমাকে পেয়ে বসেছে। আমার কান্না পাচ্ছে, গোপনে।
আমি অবশ্য এই নারীর মুখ এখনো দেখিনি। এখনো তাঁরে চোখে দেখিনি, শুধু স্যান্ডেলের খটখট আওয়াজ শুনেছি।
তিনি লিফটের সামনে দাঁড়ালেন। আমিও।
লিফট জিনিসটা আমি ভয় পাই। আমাদের গোবিন্দগঞ্জের কোথাও কোনো লিফট ছিল না। ওখানেই স্কুল-কলেজ সেরে আমি রাজশাহী যাই। রাজশাহীতে দু-চারটা ভবনে লিফট ব্যবহার করতে হতো, ভয়ে পারতপক্ষে আমি সেসব ভবনেও সিঁড়ি ব্যবহার করতাম।
আমার সামনে তিনি। তাঁর পেছনে আমি। পারফিউমের গন্ধে আমার সমস্ত অস্তিত্ব আচ্ছন্ন হয়ে আসছে।
লিফটের দরজা খুলে গেল।
এই মেয়ের সঙ্গে আমাকে এই লিফটে উঠতে হবে। ত্রিভুবনে আর কেউ নেই। শুধু তিনি আর আমি।
লিফটের ভেতরে আয়না। আয়নায় আমি তাকে দেখতে পাচ্ছি। এ যে সোনালি বেন্দ্রে! আমি হিন্দি ছবি দেখি না। কিন্তু সোনালি বেন্দ্রের খবর আমি রাখি। ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’তে তিনি এসেছিলেন। তখন আমি ক্লাস এইট–নাইনে পড়ি। যতক্ষণ ওই অনুষ্ঠান হচ্ছিল, সারাটিক্ষণ সোনালি বেন্দ্রের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সোনালি যখন হাসছিলেন, প্রতিবার আমার হৃৎস্পন্দন একবার করে থেমে যাচ্ছিল। সোনালির ক্যানসার হয়েছে, নিউইয়র্কে চিকিৎসা নিয়ে তিনি ভারতে ফিরে এসেছেন, এসব খবর আমি রাখি। চাকরির সন্ধানে ঢাকায় আসা যুবকদের দেশ-বিদেশের কত খবরই তো রাখতে হয়।
আমার সামনে একজন অল্প বয়সী সোনালি বেন্দ্রে। তাঁর শাড়ির রং সাদা। সাদা শাড়িতে রুপালি পাড়। ইস্তিরি করা নিপাট শাড়ির আঁচল। চুল বেণি করা। কপালের একপাশে সিঁথি। তাঁর শুকচঞ্চু নাসার ওপরে দুই টানা ভুরুর মাঝে একটা সাদা টিপ। উফ্। হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ে পড়ে নারীদের মাত্র একটা উপমা আমি জানি। মেয়েটা দেখতে পরির মতো। আর চোখ দুটো তাঁর ভীষণ মায়াকাড়া।
আমরা একই লিফটে উঠেছি। তিনি বিড়বিড় করলেন, ‘টুয়েলভ।’
আমিও বিড়বিড় করলাম, ‘আমিও টুয়েলভ।’
লিফটের দরজা বন্ধ হলো। এইবার পারফিউমের সঙ্গে খানিকটা ঘামের গন্ধও পাচ্ছি। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছি। আমার নারীবর্জিত পৃথিবীতে এই রকম অপরূপার ঘামের গন্ধও যে ফুসফুস ভরে নেওয়ার মতো, এই কথা তো কাউকে বলাও যায় না।
লিফট উঠছে। দুই, তিন, চার...
একটা ছয় ফুট বাই চার ফুট পরিসরে আমার সঙ্গে একজন পরিমানবী। তাঁর গায়ে নাম না–জানা সুগন্ধি আর রুপালি দেহে সোনালি ঘামের অনির্বচনীয় গন্ধ।
ধপাস। একটা ঝাঁকুনি। লিফট অন্ধকার হয়ে এল। হাত দুয়েক নিচে নেমে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল লিফট। আমি একটা আওয়াজ শুনলাম, আউচ, আর তিনি সোজা এসে দু-হাতে আমার দু-বাহু খামচে ধরলেন।
ঠিক আলিঙ্গন নয়। কনুইয়ের ওপরে আমার দুই হাতে তাঁর খামচিটা খানিকক্ষণ রইল।
আমার নিজেরই ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া।
লিফট অন্ধকার হয়েই আছে। বুক ধকধক করে কাঁপছে আমার। তিনি বললেন, ‘মা গো! আমি এই জন্যই লিফট খুব ভয় পাই!’
আমি বললাম, ‘আমিও লিফট খুব ভয় পাই।’
‘এখন কী হবে?’
আমি বললাম, ‘নিশ্চয়ই কারেন্ট গেছে। আসবে। জেনারেটর চলবে নিশ্চয়ই।’
পকেটের মোবাইল ফোন হাতে নিলাম আমি। মোবাইল সেটের টর্চ লাইট জ্বালালাম। অন্ধকার বেশি ভয়ের ব্যাপার। আলো তবু সান্ত্বনাদায়ক।
একটু পরে আলো জ্বলে উঠল।
তিনি আকুল হয়ে আছেন। আমিও। আমাকে খামচিমুক্ত করেছেন আগেই। আমি লিফটের নবে অ্যালার্মের ছবি খুঁজতে লাগলাম।
একটু পরে ভেতরের লেখাগুলো জ্বলে উঠল। তারপর ফের চলতে শুরু করল লিফট। টুয়েলভে এসে লিফট থামল। আমরা দুজনেই লিফট থেকে নামলাম। এদিক-ওদিক তাকালাম। তারপর সাইন দেখে এগিয়ে গেলাম। গেটে সার্চ করা হলো। স্বাক্ষর করতে হলো। ভিজিটর কার্ড গলায় ঝুলিয়ে আমরা ভেতরে এগোতে লাগলাম। পুরো অফিসটাই খুব নির্জন। অল্পসংখ্যক লোক বোধ হয় কাজ করে। আমাদের একটা কাচঘেরা ঘরে সোফায় বসতে বলা হলো।
দুজন বসে আছি।
তিনিই মুখ খুললেন। বললেন, ‘আমার নাম নাতাশা। নাতাশা হাবিব।’
‘আমার নাম শহীদুর রহমান তাপস।’
‘আমি এসেছি জবের ইন্টারভিউ দিতে।’
‘আমিও।’
‘আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড কী? কোন সাবজেক্ট?’
‘হিস্ট্রি। আপনি?’
‘আমি আর্কিয়োলজি। জাহাঙ্গীরনগর। এরা তো বোধ হয় একজন নেবে।’ তিনি বললেন।
আমি বললাম, ‘তাহলে আপনাকে নেবে। ইউএন জবের পলিসি হলো নারীদের অগ্রাধিকার।’
‘না না। এমন কোনো কথা নেই। এদের কাজে প্রচুর ঢাকার বাইরে থাকতে হবে। কাজেই ছেলেদের এরা পছন্দ করতে পারে।’
আমার ইন্টারভিউ খারাপ হয়নি। সাইফুরসে স্পোকেন ইংলিশের কোর্স করছি। ইন্টারনেটে রোজ এক ঘণ্টা ইংরেজি শেখার কোর্স করি নিজে নিজে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগল। মেক্সিকোর রাজধানীর নাম কী, পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব কত জাতীয় প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেনি। একজন দেশি, একজন বিদেশি ছিলেন। দুজনেই পুরুষ। আমি কোথায় পড়েছি, কী পড়েছি, কী নিয়ে আগ্রহ—এসব বিষয়ে তাঁরা গল্প করলেন।
তাঁরা বললেন, ‘আপনার সঙ্গে যে ভদ্রমহিলা এসেছেন, তাঁকে কি একটু অনুগ্রহ করে আসতে বলতে পারবেন? আপনার কাজ শেষ। আপনি যেতে পারেন।’
আমি বাইরে এলাম। আমার ফুরফুরে লাগছে। ওয়েটিং রুমে এসে বললাম, ‘নাতাশা, আপনার কল। ওই যে দুই নম্বর দরজাটা, ওইটায় যেতে হবে।’
আমি বেরিয়ে এলাম। লিফটের দরজার সামনে দাঁড়ালাম। দরজা খুলল। আয়নায় নিজের চেহারা দেখতে দেখতে গ্রাউন্ড ফ্লোরে যাওয়ার জন্য জি চাপলাম আমি।
রাত্রিবেলা নিজের ঘরে বসে আবার ইংরেজি শেখার প্র্যাকটিস করছি মোবাইল ফোনে ইউটিউবে। কিন্তু বারবার মনে পড়ছে নাতাশা হাবিবের মুখখানি। তিনি অন্ধকারে আমাকে খামচে ধরেছিলেন।
অন্ধকারে মশারির ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতার ভেতরে শুয়ে নানা কিছু ভাবি। আকাশকুসুম চয়ন করি। আমার গায়ে ছেঁড়া কাঁথা। ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে আমি লাখ টাকা দামি স্বপ্ন রচনা করে যাই।
আমাদের দুজনেরই জব হয়ে গেছে। একই অফিসে চাকরি করি আমরা। দুপুরে একই ক্যানটিনে বসে খাই। নাতাশা ছোট্ট টিফিন বক্সে রান্না করা খাবার আনেন। আমার প্লেটে হলুদ খিচুড়ি আর সাদা ডিম তুলে দেন। আমি তাঁর চাপাকলির মতো আঙুলের দিকে তাকাই। তিনি ডান হাতের কনিষ্ঠায় লেগে থাকা একটা হলুদ ভাত নিজের লাল জিব বের করে চেটে নেন। তাঁর ঘামের গন্ধে টেবিলটার আশপাশ বুঁদ হয়ে থাকে।
রিগ্রেট লেটার আসে। ই–মেইলে। আমার ওই চাকরি হয়নি। আমি দমে যাই। মরমে মরে যাই। এই চাকরি হলে ভালো হতো। অবশ্য শুধু আমার হলে হতো না। নাতাশারও হতে হতো।
আমি ফেসবুকে নাতাশা হাবিব সার্চ দিই। তিনজনকে পাই। যাঁকে খুঁজছি, তাঁকেও পাওয়া যায়। রাতের বেলা বসে বসে মোবাইল ফোনে নাতাশার ছবি দেখি।
দুদিন পরে নাতাশা পোস্ট দেন ইউনেসকোর প্রজেক্টে তিনি যোগ দিয়েছেন।
একসময় নাতাশাকে আমি ভুলে যাই। টিউশনি, মেসের বাজার, চাকরির ইন্টারভিউয়ের চক্করে দিন কাটে। ছেঁড়া কাঁথাটা ভালোভাবে জড়িয়ে রাখি। এই কাঁথায় আমার মায়ের শাড়ি আছে। এটাতে আমি মাকে পাই।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে লেকচারার হিসেবে জয়েন করেছি। ছাত্র পড়াই, পরীক্ষা নিই, ক্লাবে যাই, শিক্ষক পলিটিকস করি। কিন্তু বেশি করে যা করি তা হলো, আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্কলারশিপের খবর সংগ্রহ।
দিন চলে যায়। গোবিন্দগঞ্জ থেকে মা ডেকে পাঠান। ‘বাবা, আয় বাড়িতে একবার। তোর জন্য মেয়ে খুঁজছি। কেমন মেয়ে চাস? বল।’
আমি বলি, ‘মা, আমি এখন বিয়ে করব না। আমি আগে পিএইচডি করব। তারপর...’
নাতাশাকে আবার খুঁজি ফেসবুকে।
পেয়ে যাই। নাতাশা লিখেছেন, ‘আমার আম্মুসোনার আজকে বার্থডে। সারা দিন মেয়েটার সঙ্গে কাটিয়েছি।’ একটা বছর দুয়েকের বাচ্চার সঙ্গে হুটোপুটি লুটোপুটির ছবি।
মাকে ফোন দিই। বলি, ‘মা, পাত্রী দেখো। পাত্রী শিক্ষিত হতে হবে মা।’
মা বলেন, ‘শিক্ষিত, সুন্দরী আর মার্জিত। আমার রাজপুত্রের মতো দেখতে ছেলে।’
আমি হাসি, ‘মা, রাজপুত্র তুমি কোথায় দেখেছ যে বলছ তোমার ছেলে দেখতে রাজপুত্রের মতো?’
প্যারিসে একটা সেমিনারের দাওয়াত পেয়েছি। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কনজারভেশনের ওপরে। তক্কে তক্কে ছিলাম। সারাক্ষণ ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে দেখি, কোথায় কী হয়। এটা হয়ে গেল। টিকিট অর্গানাইজাররা পাঠিয়েছে।
প্লেনে বসে আছি। বাঁ দিকে দুটো সিট। আমি পেয়েছি আইল। আমার বাঁ পাশে জানালার সিটটা ফাঁকা। যেন ফাঁকা থাকে। তাহলে হাত-পা ছড়িয়ে বসা যাবে। কোনো মোটা মানুষ যদি এই সিটে বসে আর মধ্যখানের কমন হাতলে যদি হাত রাখে, আমি মারাই যাব।
মাঝখানে একটা রোমশ হাত, মোটা মানুষটার থলথলে পা আমার পায়ে ঠেলছে, তার গায়ে বদবু...ভাবতে ভাবতে চোখ বন্ধ করে আছি। ঘুম পাচ্ছে।
এই সময় মধুক্ষরা কণ্ঠ, ‘এক্সকিউজ মি...আপনার পাশের সিটটা আমার...’
এইবার আমার অক্কা পাওয়ার পালা। নাতাশা হাবিব...বিড়বিড় করে বললাম, ‘নাতাশা হাবিব...’
‘আপনি আমাকে চেনেন?’
‘হ্যাঁ। আপনি ইউনেসকোর প্রজেক্টে আছেন।’
‘কীভাবে জানলেন?’
‘আপনি ঠিকঠাকভাবে বসেন। বলছি।’
নাতাশা হাঁপাচ্ছেন। বললেন, ‘জ্যামে পড়েছিলাম। অল্পের জন্য ফ্লাইট মিস করিনি।’
তিনি তাঁর হাতের ট্রলি মাথার ওপরে রেখে বসলেন আমার পাশে।
আমি বললাম, ‘আপনার মেয়ে কেমন আছে? সুকন্যা?’
‘ও আসলে আমার বোনের মেয়ে, কিন্তু ও আমার জানটুস...আছে ভালো।’
‘কার কাছে থাকবে?’
‘ওর মায়ের কাছে থাকবে। আমাকে মিস করবে। কারণ, মায়ের চেয়ে মাসির দরদ তো সব সময় বেশি হয়। ’
প্লেন আকাশে। বেশ রাত এখন দেশে। প্লেনের ভেতরের বাতিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমি ঘুমুতে পারছি না। আমার পাশে একটা বুনো গন্ধ। আর পারফিউমের মিষ্টি গন্ধ। দুটো মিলে আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছি। তারপর ঘুম ভাঙল। দেখি, নাতাশা আমার হাতের ওপরে হাত রেখে খামচে ধরে আছেন। ঘুমুচ্ছেন। বিড়বিড় করছেন।
একসময় আলো জ্বলে উঠল। বিমানসেবিকারা স্ন্যাকস দিচ্ছেন। নাতাশাও জাগলেন।
‘ইশ্, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।’ এরপর বললেন, ‘আপনি কই যাচ্ছেন?’
‘প্যারিস।’
‘ওমা, আমিও তো প্যারিস। প্যারিসে কী?’
‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কনফারেন্সে।’
‘ওমা আমিও তো...আপনার সঙ্গে কোথায় দেখা হয়েছিল বলুন তো।’
‘না। বলব না। আপনি কেন মনে রাখেননি। আমি তো একটি দিনের জন্যও ভুলিনি।’
প্যারিসে আমরা একই ট্যাক্সিতে একই হোটেলের লবিতে নামলাম। হোটেলটা একটা হেরিটেজ হোটেল। এর লিফটায় একসঙ্গে দুজন ওঠা যায় কি যায় না। কেচি গেট। মানে কলাপসিবল। নিজে টেনে গেট লাগাতে হয়। আর নিজের লাগেজ নিজেকেই টানতে হচ্ছে। একই লিফটে উঠলাম আমরা দুজন।
আমি বললাম, ‘আমি কিন্তু লিফট ভয় পাই।’
নাতাশা বললেন, ‘ওহ, মনে পড়েছে, আমরা একটা লিফটে আটকে পড়েছিলাম।’
আমাদের রুম পাশাপাশি। নাতাশা তাঁর ঘরে ঢুকলেন। আমি আমার ঘরে। দুপুরে একসঙ্গে খেতে যাব। এক ঘণ্টা পরে আমরা নিচে নামব...
আমার রুমের দরজায় নক।
‘কামিং...’আমি বললাম।
‘আমার ঘরে একটা মাকড়সা...আমি ভয়ে মারা যাচ্ছি...মাকড়সাটা একটু...’
‘আচ্ছা আমি আসছি...’
এর গায়ের এই বুনো গন্ধই আমাকে পাগল করে ফেলবে!
তিনি বললেন, ‘আমি আর ওই রুমে যাব না। আমি এই রুমেই রাত কাটাব।’
আমি বললাম, ‘তা কী করে হয়।’
বললাম কারণ, এই ঘরে বিছানায় একটা ছেঁড়া কাঁথা আছে। আমি সেটা সুটকেসে ভরে নিয়ে এসেছি। এই কাঁথায় আমার মায়ের শাড়ি আছে। আর ওই ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে আমি যে স্বপ্ন বুনে চলেছি...এই মেয়েটি ঘরে ঢুকলেই যদি আমার স্বপ্নটা ভেঙেচুরে যায়!
বই: প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ।
লেখক: আরিফ আজাদ।।
গল্প: কোরআন কি মুহাম্মদ (স.) এর বানানো গ্রন্থ!
" লোকটি বললো,- 'সাজিদ, আমি মনে করি, তোমাদের ধর্মগ্রন্থ, আই মিন আল কোরান, সেটা কোন ঐশী গ্রন্থ নয়। এটা মুহাম্মদের নিজের লেখা একটি বই।মুহাম্মদ করেছে কি, এটাকে জাষ্ট স্রষ্টার বাণী বলে চালিয়ে দিয়েছে।'
এইটুকু বলে লোকটা আমাদের দু'জনের দিকে তাকালো। হয়তো বোঝার চেষ্টা করলো আমাদের রিএ্যাকশান কি হয়।
আমরাকিছু বলার আগেই লোকটি আবার বললো, - 'হয়তো বলবে, মুহাম্মদ লিখতে-পড়তে জানতো না। সে কিভাবে এরকম একটি গ্রন্থ লিখবে? ওয়েল! এটি খুবই লেইম লজিক। মুহাম্মদ লিখতে পড়তে না জানলে কি হবে, তার ফলোয়ারদের অনেকে লিখতে-পড়তে পারতো।উচ্চ শিক্ষিত ছিলো। তারা করেছে কাজটা।মুহাম্মদের ইশারায়।'
সাজিদ তার কাপে শেষ চুমুক দিলো। তখনও সে চুপচাপ।
লোকটা বললো,- 'কিছু মনে না করলে আমি একটি সিগারেট ধরাতে পারি? অবশ্য, কাজটি ঠিক হবে না জানি।'
আমি বললাম,- 'শিওর!'
এতক্ষণ পরে লোকটি আমার দিকে ভালোমতো তাকালো। একটি মুচকি হাসি দিয়ে বললো,- 'Thank You...'
-
সাজিদ বললো,- 'খালু, আপনি খুবই লজিক্যাল কথা বলেছেন। কোরান মুহাম্মদ সাঃ এর নিজের বানানো হতেও পারে। কারন, কোরান যে ফেরেস্তা নিয়ে আসতো বলে দাবি করা হয়, সেই জিব্রাঈল আঃ কে মুহাম্মদ সাঃ ছাড়া কেউই কোনদিন দেখেনি।'
লোকটা বলে উঠলো,- 'এক্সাক্টলি, মাই সান।'
- 'তাহলে, কোরানকে আমরা টেষ্ট করতে পারি, কি বলেন খালু?'
- 'হ্যাঁ হ্যাঁ, করা যায়.......'
সাজিদ বললো,- 'কোরান মুহাম্মদ সাঃ এর বানানো কি না, তা বুঝতে হলে আমাদের ধরে নিতে হবে যে, মুহাম্মদ সাঃ স্রষ্টার কোন দূত নন।তিনি খুবই সাধারন, অশিক্ষিত একজন প্রাচীন মানুষ।'
লোকটা বললো,- 'সত্যিকার অর্থেই মুহাম্মদ অসাধারণ কোন লোক ছিলো না। স্রষ্টার দূত তো পুরোটাই ভূয়া।'
সাজিদ মুচকি হাসলো। বললো,- 'তাহলে এটাই ধরে নিই?'
- 'হুম'- লোকটার সম্মতি।
সাজিদ বলতে লাগলো,- 'খালু, ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি, হজরত ঈউসুফ আঃ এর জন্ম হয়েছিলো বর্তমান ফিলিস্তিনে। ঈউসুফ আঃ ছিলেন হজরত ঈয়াকুব আঃ এর কনিষ্ঠতম পুত্র। ঈয়াকুব আঃ এর কাছে ঈউসুফ আঃ ছিলেন প্রাণাধিক প্রিয়।কিন্তু, ঈয়াকুব আঃ এর এই ভালোবাসা ঈউসুফ আঃ এর জন্য কাল হলো। তার ভাইয়েরা ষড়যন্ত্র করে ঈউসুফ আঃ কে কূপে নিক্ষেপ করে দেয়। এরপর, কিছু বণিকদল কূপ থেকে ঈউসুফ আঃ কে উদ্ধার করে তাকে মিশরে নিয়ে আসে। তিনি মিশরের রাজ পরিবারে বড় হন।ইতিহাস মতে, এটি ঘটে- খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্দশ শতকের আমেনহোটেপের রাজত্বকালের আরো তিন'শ বছর পূর্বে। খালু, এই বিষয়ে আপনার কোন দ্বিমত আছে?'
লোকটা বললো,- 'নাহ। কিন্তু, এগুলো দিয়ে তুমি কি বোঝাতে চাও?'
সাজিদ বললো,- 'খালু, ইতিহাস থেকে আমরা আরো জানতে পারি, খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্দশ শতকে চতুর্থ আমেনহোটেপের আগে যেসকল শাসকেরা মিশরকে শাসন করেছে, তাদের সবাইকেই 'রাজা' বলে ডাকা হতো। কিন্তু, খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে চতুর্থ আমেনহোটেপের পরে যেসকল শাসকেরা মিশরকে শাসন করেছিলো, তাদের সবাইকে 'ফেরাঊন' বলে ডাকা হতো। ঈউসুফ আঃ মিশরকে শাসন করেছিলেন খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্দশ শতকের চতুর্থ আমেনহোটেপের আগে।আর, মূসা আঃ মিশরে জন্মলাভ করেছিলেন চতুর্থ আমেনহোটেপের কমপক্ষে আরো দু'শো বছর পরে।অর্থাৎ, মূসা আঃ যখন মিশরে জন্মগ্রহন করেন, তখন মিশরের শাসকদের আর 'রাজা' বলা হতো না, 'ফেরাঊন' বলা হতো।'
- 'হুম, তো?'
- 'কিন্তু খালু, কোরানে ঈউসুফ আঃ এবং মূসা আঃ দুইজনের কথাই আছে। অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, কোরান ঈউসুফ আঃ এর বেলায় শাসকদের ক্ষেত্রে 'রাজা' শব্দ ব্যবহার করলেও, একই দেশের, মূসা আঃ এর সময়কার শাসকদের বেলায় ব্যবহার করেছে 'ফিরাঊন' শব্দটি। বলুন তো খালু, মরুভূমির বালুতে উট চরানো বালক মুহাম্মদ সাঃ ইতিহাসের এই পাঠ কোথায় পেলেন? তিনি কিভাবে জানতেন যে, ঈউসুফ আঃ এর সময়ের শাসকদের 'রাজা' বলা হতো, মূসা আঃ সময়কার শাসকদের 'ফেরাঊন'? এবং, ঠিক সেই মতো শব্দ ব্যবহার করে তাদের পরিচয় দেওয়া হলো?'
মহব্বত আলি নামের ভদ্রলোকটি হো হো হো করে হাসতে লাগলো। বললো,- 'মূসা আর ঈউসুফের কাহিনী তো বাইবেলেও ছিলো। মুহাম্মদ সেখান থেকে কপি করেছে, সিম্পল।'
সাজিদ মুচকি হেসে বললো,- 'খালু, ম্যাটার অফ সরো দ্যাট, বাইবেল এই জায়গায় চরম একটি ভুল করেছে। বাইবেল ঈউসুফ আঃ এবং মূসা আঃ দুজনের সময়কার শাসকদের জন্যই 'ফেরাঊন' শব্দ ব্যবহার করেছে, যা ঐতিহাসিক ভুল। আপনি চাইলে আমি আপনাকে বাইবেলের ওল্ড টেষ্টামেণ্ট থেকে প্রমান দেখাতে পারি।'
লোকটা কিছুই বললো না। চুপ করে আছে। সম্ভবত, উনার প্রমান দরকার হচ্ছে না।
সাজিদ বললো,- 'যে ভুল বাইবেল করেছে, সে ভুল অশিক্ষিত আরবের বালক মুহাম্মদ সাঃ এসে ঠিক করে দিলো, তা কিভাবে সম্ভব, যদি না তিনি কোন প্রেরিত দূত না হোন, আর, কোরান কোন ঐশি গ্রন্থ না হয়?'
লোকটি চুপ করে আছে। এরমধ্যেই তিনটি সিগারেট খেয়ে শেষ করেছে। নতুন আরেকটি ধরাতে ধরাতে বললো,- 'হুম, কিছুটা যৌক্তিক।'
সাজিদ আবার বলতে লাগলো,- 'খালু, কোরানে একটি সূরা আছে, সূরা আল ফাজর নামে। এই সূরার ৬ নম্বর আয়াতটি এরকম,- 'তোমরা কি লক্ষ্য করো নি, তোমাদের পালনকর্তা ইরাম গোত্রের সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছেন?'
এই সূরা ফাজরে মূলত আদ জাতি সম্পর্কে বলা হয়েছে। আদ জাতির আলাপের মধ্যে হঠাৎ করে 'ইরাম' নামে একটি শব্দ চলে এলো, যা কেউই জানতো না এটা আসলে কি। কেউ কেউ বললো, এটা আদ জাতির কোন বীর পালোয়ানের নাম, কেউ কেউ বললো, এই ইরাম হতে পারে আদ জাতির শারীরিক কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্য, কারন, এই সূরায় আদ জাতির শক্তিমত্তা নিয়েও আয়াত আছে। মোদ্দাকথা, এই 'ইরাম' আসলে কি, সেটার সুস্পষ্ট কোন ব্যাখ্যা কেউই দিতে পারেনি তখন। এমনকি, গোটা পৃথিবীর কোন ইতিহাসে 'ইরাম' নিয়ে কিছুই বলা ছিলো না। কিন্তু, ১৯৭৩ সালে, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি সিরিয়ায় মাটির নিচে একটি শহরের সন্ধান পায়।এই শহরটি ছিলো আদ জাতিদের শহর। সেই শহরে পাওয়া যায়, সুপ্রাচীন উঁচু উঁচু দালান। এমনকি, এই শহরে আবিষ্কার হয় তখনকার একটি লাইব্রেরি। এই লাইব্রেরিতে একটি তালিকা পাওয়া যায়। এই তালিকায় তারা যেসকল শহরের সাথে বাণিজ্য করতো, সেসব শহরের নাম উল্লেখ ছিলো।আশ্চর্যজনক হলেও সত্য এই- সেই তালিকায় 'ইরাম' নামের একটি শহরের নামও পাওয়া যায়, যেটা আদ জাতিদেরই একটি শহর ছিলো। শহরটি ছিলো একটি পাহাড়ের মধ্যে। এতেও ছিলো সুউচ্চ দালান।
চিন্তা করুন, যে 'ইরাম' শব্দের সঠিক ব্যাখ্যা এর পূর্বে তাফসিরকারকরাও করতে পারেনি। কেউ এটাকে বীরের নাম, কেউ এটাকে আদ জাতির শারিরীক বৈশিষ্ট্যের নাম বলে ব্যাখ্যা করেছে,
১৯৭৩ সালের আগে যে 'ইরাম' শহরের সন্ধান পৃথিবীর তাবৎ ইতিহাসে ছিলো না, কোন ভূগোলবিদ, ইতিহাসবিদই এই শহর সম্পর্কে কিছুই জানতো না, প্রায় ৪৩ শত বছর আগের আদ জাতিদের সেই শহরের নাম কিভাবে কোরান উল্লেখ করলো? যেটা আমরা জেনেছি ১৯৭৩ সালে, সেটা মুহাম্মদ সাঃ কিভাবে আরবের মরুভূমিতে বসে ১৪০০ বছর আগে জানলো? হাউ পসিবল? তিনি তো অশিক্ষিত ছিলেন।কোনদিন ইতিহাস বা ভূগোল পড়েন নি। কিভাবে জানলেন, খালু?'
আমি খেয়াল করলাম, লোকটার চেহারা থেকে মোঘলাই ভাবটা সরে যেতে শুরু করেছে। পুত্রতুল্য ছেলের কাছ থেকে তিনি এতোটা শক খাবেন, হয়তো আশা করেন নি।
সাজিদ আবার বলতে লাগলো,-
'খালু, আর রহমান নামে কোরানে একটি সূরা আছে। এই সূরার ৩৩ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে,-
'হে জ্বীন ও মানুষ! তোমরা যদি আসমান ও জমিনের সীমানায় প্রবেশ করতে পারো, তবে করো। যদিও তোমরা তা পারবেনা প্রবল শক্তি ছাড়া'
মজার ব্যাপার হলো, এই আয়াতটি মহাকাশ ভ্রমণ নিয়ে। চিন্তা করুন, আজ থেকে ১৪০০ বছর আগের আরবের লোক, যাদের কাছে যানবাহন বলতে কেবল ছিলো উট আর গাধা, ঠিক সেই সময়ে বসে মুহাম্মদ সাঃ মহাকাশ ভ্রমণ নিয়ে কথা বলছে, ভাবা যায়?
সে যাহোক, আয়াতটিতে বলা হলো,- 'যদি পারো আসমান ও জমিনের সীমানায় প্রবেশ করতে, তবে করো' ,
এটি একটি কন্ডিশনাল (শর্তবাচক) বাক্য। এই বাক্যে শর্ত দেওয়ার জন্য If (যদি) ব্যবহার করা হয়েছে।
খালু, আপনি যদি এ্যারাবিক ডিকশনারি দেখেন, তাহলে দেখবেন, আরবিতে 'যদি' শব্দের জন্য দুটি শব্দ আছে। একটি হলো 'লাও', অন্যটি হলো 'ইন'। দুটোর অর্থই 'যদি।' কিন্তু, এই দুটোর মধ্যে একটি সুক্ষ্ম পার্থক্য আছে। পার্থক্যটি হলো- আরবিতে শর্তবাচক বাক্যে 'লাও' তখনই ব্যবহার করা হয়, যখন সেই শর্ত কোনভাবেই পূরণ সম্ভব হবে না। কিন্তু, শর্তবাচক বাক্যে 'যদি' শব্দের জন্য যখন 'ইন' ব্যবহার করা হয়, তখন নিশ্চয় এই শর্তটা পূরণ সম্ভব।
আশ্চর্যজনক ব্যাপার, কোরানে সূরা আর রহমানের ৩৩ নম্বর আয়াতটিতে 'লাও' ব্যবহার না করে 'ইন' ব্যবহার করা হয়েছে। মানে, কোন একদিন জ্বীন এবং মানুষেরা মহাকাশ ভ্রমণে সফল হবেই।আজকে কি মানুষ মহাকাশ জয় করেনি? মানুষ চাঁদে যায়নি? মঙ্গলে যাচ্ছে না?
দেখুন, ১৪০০ বছর আগে যখন মানুষের ধারনা ছিলো একটি ষাঁড় তার দুই শিংয়ের মধ্যে পৃথিবীকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক তখন কোরান ঘোষণা করছে, মহাকাশ ভ্রমণের কথা। সাথে বলেও দিচ্ছে, একদিন তা আমরা পারবো। আরবের নিরক্ষর মুহাম্মদ সাঃ কিভাবে এই কথা বলতে পারে?'
-
এম.এম. আলি ওরফে মোহাম্মদ মহব্বত আলি নামের এই ভদ্রলোকের চেহারা থেকে 'আমি নাস্তিক, আমি একেবারে নির্ভুল' টাইপ ভাবটা একেবারে উধাও হয়ে গেলো। এখন তাকে যুদ্ধাহত এক ক্লান্ত সৈনিকের মতোন দেখাচ্ছে।
সাজিদ বললো,- 'খালু, খুব অল্প পরিমাণ বললাম। এরকম আরো শ খানেক যুক্তি দিতে পারবো, যা দিয়ে প্রমান করে দেওয়া যায়, কোরান মুহাম্মদ সাঃ এর নকল করে লেখা কোন কিতাব নয়, এটি স্রষ্টার পক্ষ থেকে আসা একটি ঐশি গ্রন্থ। যদি বলেন, মুহাম্মদ সাঃ নিজের প্রভাব বিস্তারের জন্য এই কিতাব লিখেছে, আপনাকে বলতে হয়, এই কিতাবের জন্যই মুহাম্মদ সাঃ কে বরণ করতে হয়েছে অবর্ণনীয় কষ্ট, যন্ত্রণা। এই কিতাবের বাণী প্রচার করতে গিয়েই তিনি স্বদেশ ছাড়া হয়েছিলেন।তাকে বলা হয়েছিলো, তিনি যা প্রচার করছেন তা থেকে বিরত হলে তাকে মক্কার রাজত্ব দেওয়া হবে। তিনি তা গ্রহন করেন নি। খালু, নিজের ভালো তো পাগলও বুঝে। মুহাম্মদ সাঃ বুঝলো না কেনো? এসবই কি প্রমান করেনা কোরানের ঐশি সত্যতা?'
-
লোকটা কোন কথাই বলছে না।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Contact the business
Website
Address
1216
