02/05/2026
🏛️ধাপ উদয়পুর: রাজা ভবচন্দ্রের হারিয়ে যাওয়া রাজ্য📜
(একটি সংকলিত গবেষণা 🗞️)
📚📍মিঠাপুকুর উপজেলার ১৩ নং গোপালপুর ইউনিয়নের ধাপ উদয়পুর গ্রামটি মানচিত্রে একটি সাধারণ গ্রাম হিসেবেই চিহ্নিত। কিন্তু যখন আমি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নথি এবং পুরনো জনশ্রুতির সন্ধান করি, তখন দেখি এই গ্রামটি আসলে একটি হারিয়ে যাওয়া রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ। রাজা ভবচন্দ্র বা হবচন্দ্রের নামে যে রাজ্য ছিল, তার সাক্ষী এখনো এই ধাপের মাটিতে লুকিয়ে আছে।
⚔️ ১. রাজা ভবচন্দ্র: ইতিহাস নাকি জনশ্রুতি?
প্রাচীন গ্রন্থের সূত্র
দীনেশচন্দ্র সেনের "গোপীচন্দ্র" গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে রংপুর অঞ্চলের প্রবাদ অনুযায়ী উল্লেখ আছে যে, গোপীচন্দ্রের পুত্রের নাম ছিল উদয়চন্দ্র বা ভবচন্দ্র। রংপুর জেলার দক্ষিণাঞ্চলে বাগদুয়ার পরগণায় ভবচন্দ্রের বাসভবনের ধ্বংসাবশেষ এখনো প্রদর্শিত হইয়া থাকে এবং ভবচন্দ্রের বা হবচন্দ্রের নির্ব্বুদ্বিতার অনেক গল্প এখনও ঠাকুরমার ঝুলি অন্বেষণ করিলে প্রাপ্ত হওয়া যায়।
এটি মাত্র একটি জনশ্রুতি নয়। কৈলাসচন্দ্র সিংহ ত্রিপুরা জেলার চৌদ্দগ্রাম ও তৎসন্নিহিত স্থানেও ভবচন্দ্র নামে এক রাজার উল্লেখ করিয়াছেন। সম্ভবত রংপুরের ভবচন্দ্র ও চৌদ্দগ্রামের ভবচন্দ্র অভিন্ন। মাণিকচন্দ্র ও গোপীচন্দ্রের ত্রিপুরা ও রংপুর জেলা উভয় অঞ্চলে রাজত্ব থাকিলে তদ্বংশীয় ভবচন্দ্রের না থাকিবার কথা কি?
মুদ্রার সন্ধান: প্রমাণের খোঁজে
গ্লেজিয়ার সাহেব তাঁহার রংপুরের বিবরণে উল্লেখ করিয়াছেন যে, এ জেলায় খৃঃ অষ্টাদশ শতাব্দীতে পায়রাবন্দ নামক স্থানে কতকগুলি মুদ্রা পাওয়া গিয়াছিল। এক বৃদ্ধ তাঁহাকে বলিয়াছিল যে, তাহার একটীর উপর এক দিকে ভবচন্দ্র রাজার নাম ও অপরদিকে তাঁহার গৃহদেবী বাগীশ্বরী খোদিত দেখা গিয়াছিল। দুঃখের বিষয়, গোপীচন্দ্র বা ভবচন্দ্রের কোন মুদ্রা বা খোদিত লিপির পরিচয় এ পর্য্যন্ত পাওয়া যায় নাই। পাওয়া গেলে এই যুগের ঐতিহাসিক রহস্য উদ্ঘাটনের বিশেষ সহায়তা ঘঠিত।
🔍সূত্র: ।
🗺️ ২. ধাপ উদয়পুর: নামের পেছনের অর্থঃ
"ধাপ" = উঁচু স্থান
স্থানীয়ভাবে প্রত্নতত্ত্ব স্থানটি "ধাপ" নামে পরিচিত। ধাপ অর্থ উঁচু স্থান। এটি সূচিত করে যে এই এলাকাটি প্রাকৃতিকভাবে উঁচু ছিল, এবং সম্ভবত রাজবাড়ি বা দুর্গ নির্মাণের জন্য এটিকে বেছে নেওয়া হয়েছিল।
"উদয়পুর" = উদয়চন্দ্রের শহর?
রাজা ভবচন্দ্রের আরেক নাম ছিল উদয়চন্দ্র। তাহলে কি "উদয়পুর" মানে "উদয়চন্দ্রের পুর"? এটি একটি যৌক্তিক অনুমান যা স্থানীয় নামকরণের ঐতিহাসিক পটভূমিকে আরও সমৃদ্ধ করে।
🕌 ৩. রাজা গোপাল ও ভবচন্দ্র পাল: দুই রাজার এক রাজ্য?
গোপালপুর ইউনিয়নের নামকরণ সম্পর্কে উইকিপিডিয়ায় উল্লেখ আছে যে, মোঘল শাসন আমলের রাজা গোপাল এর নামানুসারে এ ইউনিয়নের নাম রাখা হয় "গোপালপুর"। রাজা গোপাল এর রাজবাড়ি ইউনিয়নের উদয়পুরে আছে ।
একই উৎসে আরও উল্লেখ আছে যে, মোঘল শাসন আমলে রাজা গোপাল ও ভবচন্দ্র পাল এর রাজবাড়ী ও প্রকৃতি প্রদত্ত ৫০০ একর সুবিশাল শালবন ও রাবার বাগান ছিল।
গবেষণার প্রশ্ন: মুঘল আমলের আগেই কি রাজ্য ছিল?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে "মোঘল শাসন আমলের রাজা গোপাল"। কিন্তু দীনেশচন্দ্র সেনের গ্রন্থ অনুযায়ী ভবচন্দ্রের রাজত্ব গোপীচন্দ্রের বংশধর হিসেবে, যা সম্ভবত মুঘল আমলেরও আগে।
তাহলে কি ধাপ উদয়পুরে মুঘল আমলের আগেই একটি হিন্দু রাজ্য ছিল, যা পরে মুঘলদের অধীনে চলে আসে? এবং রাজা গোপাল কি সেই পুরনো রাজ্যের শেষ শাসক, নাকি মুঘল আমলে নিযুক্ত একজন নবাব?
🌊 ৪. পাঁচ রানীর পুকুর: রাজকীয় প্রেমের সাক্ষী
পুকুরগুলোর তালিকা
ধাপ উদয়পুরে রাজা গোপাল ও ভবচন্দ্র পালের চারজন রানীর নামে পাঁচটি পুকুর খনন করা হয়েছিল।
সেগুলো হলো:
প্রথমটি শুভরানী পুকুর — শুভ্রা রানীর নামে।
দ্বিতীয়টি কদরানী পুকুর — কদরা রানীর নামে।
তৃতীয়টি ঝলেআনী পুকুর — ঝলেআ রানীর নামে।
চতুর্থটি পদ্ম পুকুর — পদ্মা রানীর নামে।
এবং পঞ্চমটি ঘোটক পুকুর — ঘোটক রানীর নামে।
উইকিপিডিয়ায় আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য উল্লেখ আছে — রাজার ছেলে-মেয়ে, নাতী-নাতনী সহ ১০০টি পুকুর। এটি কি শুধু জনশ্রুতি, নাকি আসলেই এতগুলো পুকুর ছিল?
স্থানীয়ভাবে এখনো "চার রানীর পুকুর" বলা হয়। সম্ভবত পঞ্চমটি পরে যোগ করা হয়, অথবা এটি অন্য রাজার সময়কার। কিন্তু ১০০টি পুকুরের কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে ধাপ উদয়পুর ছিল একটি বিশাল রাজকীয় জল ব্যবস্থাপনার কেন্দ্র।
🌲🌳 ৫. ৫০০ একর শালবন ও রাবার বাগান: প্রকৃতির রাজ্য
রাজকীয় শিকারখেত্র
মুঘল শাসন আমলে রাজা গোপাল ও ভবচন্দ্র পালের ৫০০ একর সুবিশাল শালবন ও রাবার বাগান ছিল। এই বনভূমি ছিল রাজাদের শিকারখেত্র, গোচারণ ভূমি, এবং প্রকৃতি প্রদত্ত সম্পদের ভাণ্ডার।
বরেন্দ্র বনের অংশ
মিঠাপুকুরের পশ্চিমাঞ্চলে প্রচুর শালবন রয়েছে, যা এক সময় বিশাল বরেন্দ্র বনের অংশ ছিল। গোপালপুর বন এই এলাকার একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিরূপ। মিঠাপুকুর জাতীয় উদ্যানের একটি অংশ শালটি গোপালপুর মৌজায় অবস্থিত।
এটি সূচিত করে যে রাজা গোপাল ও ভবচন্দ্রের শালবন কেবল তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না, বরং একটি বৃহৎ বন্যপ্রাণী ও পরিবেশগত করিডোরের অংশ ছিল।
গ্রামের তালিকাঃ
বর্তমানে ধাপ উদয়পুর গোপালপুর ইউনিয়নের ১০ নং গ্রাম। ইউনিয়নের অন্যান্য গ্রামগুলোর মধ্যে রয়েছে ছোট কৃষ্ণপুর তেঁতুলবাড়ি(এজরাপাড়া), শাল্টিপাড়া, গোপালপুর, বগেরবাড়ী, মন্ডলপাড়া, ধাপশ্যামপুর, রামেশ্বরপুর মরিচবাড়ী, রাঙ্গাপুকুর, এবং দুর্গামতি।
নামগুলোর ঐতিহাসিক সূত্রঃ
এই গ্রামের নামগুলোতেও ঐতিহাসিক সূত্র লুকিয়ে আছে। ধাপশ্যামপুর — শ্যামপুর? কৃষ্ণ বা শ্যামের নামে? রামেশ্বরপুর — রামেশ্বর দেবতার নামে? দুর্গামতি — দুর্গা দেবীর নামে? এই নামগুলো সূচিত করে যে গোপালপুর ইউনিয়নে হিন্দু ধর্মীয় উপাসনার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল, যা পরে মুসলিম সংস্কৃতির সাথে মিশে গেছে।
🚫⛔৬. গবেষণার সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচিঃ
যা পাওয়া গেছে
রাজা ভবচন্দ্রের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে দীনেশচন্দ্র সেনের "গোপীচন্দ্র" গ্রন্থ থেকে। মুদ্রার সন্ধানের কথা জানা গেছে গ্লেজিয়ার সাহেবের রংপুর বিবরণ থেকে। ধাপ উদয়পুরের অবস্থান নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নথি থেকে। পাঁচ রানীর পুকুরের তথ্য পাওয়া গেছে উইকিপিডিয়ার গোপালপুর ইউনিয়ন প্রবেশদ্বার থেকে। ৫০০ একর শালবনের কথাও একই উৎস থেকে জানা গেছে। এবং বাগদুয়ার ঢিবির অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকা থেকে।
যা এখনো পাওয়া যায়নি
ভবচন্দ্রের মুদ্রা বা খোদিত লিপি এখনো পাওয়া যায়নি। রাজবাড়ীর সুনির্দিষ্ট স্থান নির্দেশ করা যায়নি। ১০০টি পুকুরের সঠিক অবস্থান ও বর্তমান অবস্থা জানা যায়নি। এবং রাজা গোপাল ও ভবচন্দ্রের সময়কাল নির্ণয় করা যায়নি।
🌐 📖 গবেষণায় ব্যবহৃত প্রাথমিক সূত্রঃ
১. বাংলাপিডিয়া — মিঠাপুকুর উপজেলা প্রবেশদ্বার।
২. উইকিপিডিয়া — গোপালপুর ইউনিয়ন, মিঠাপুকুর।
৩. দীনেশচন্দ্র সেন, "গোপীচন্দ্র" (দ্বিতীয় খণ্ড)।
৪. বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর — বাগদুয়ার ঢিবি। এবং মিঠাপুকুর উপজেলা পর্যটন স্পট সম্পর্কিত তথ্য।
5. স্থানীয় জনশ্রুতি ও বয়োবৃদ্ধদের সাক্ষাৎকার (স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত)
💡ধাপ উদয়পুর কেবল একটি গ্রাম নয়, এটি একটি স্তরযুক্ত ইতিহাসের সাক্ষী। যেখানে গোপীচন্দ্রের বংশধর ভবচন্দ্রের রাজত্ব, মুঘল আমলের রাজা গোপালের শাসন, পাঁচ রানীর পুকুর, ৫০০ একর শালবন, এবং সুফি সাধকের মাজার — সব একত্রিত হয়েছে।
গ্লেজিয়ার সাহেবের মুদ্রার সন্ধান এবং বাগদুয়ার ঢিবির ধ্বংসাবশেষ আমাদের বলে দেয় যে এই এলাকায় আরও গভীর গবেষণার প্রয়োজন আছে। হয়তো একদিন ধাপ উদয়পুরের মাটি থেকে ভবচন্দ্রের সেই হারিয়ে যাওয়া মুদ্রা বেরিয়ে আসবে, এবং রংপুরের ঐতিহাসিক রহস্য উদ্ঘাটিত হবে।

01/05/2026
29/04/2026