21/08/2025
একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর পূর্ব পাকিস্তানের সভাপতি ছিলেন গোলাম আযম। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস জুড়েই তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় দালাল আখ্যা দিয়ে তাদের হত্যায় মদদ দেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে।
মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে গোলাম আযম ও জামায়াতের তৎপরতা শুরু হয় ৪ এপ্রিল, অপারেশন সার্চলাইটের নামে ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা এবং প্রায় প্রতিটি জেলা শহরে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানোর পর টিক্কা খানের সাথে দেখা করার মধ্য দিয়ে। সেদিন টিক্কা খানের সাথে দেখা করে গোলাম আযমসহ অন্যান্য পাকিস্তানপন্থী নেতারা অবিলম্বে সমগ্র প্রদেশে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সামরিক আইন প্রশাসনকে সম্পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস এবং জনগণের মন থেকে ভিত্তিহীন ভয় দূর করার উদ্দেশ্যে ঢাকায় নাগরিক কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়।
পরে নিজের আত্মজীবনীতে গোলাম আযম দাবি করেন যে তিনি টিক্কা খানকে বেশ কিছু কঠিন প্রশ্ন করেন সেদিন এবং গণহত্যায় সহযোগিতার বিষয়ে তার ভূমিকা ছিল না। তবে সেই সময়ের পত্রিকা, এমনকি জামায়াতের পত্রিকা দৈনিক সংগ্রামেও এই বিবৃতির বিরুদ্ধে গোলাম আযমের কোন বিবৃতি পাওয়া যায় না। বরং বৈঠকের পর গোলাম আযমকে পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তা করার জন্য বেশ সক্রিয় দেখা যায়।
এই প্রসঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানে দায়িত্বরত রাও ফরমান আলী তার বই How Pakistan Got Divided-এ লেখেন, “I contacted all the political leaders in Dacca — Nurul Amin, Khawaja Khairuddin, Maulvi Farid Ahmed, Shafiqul Islam, Professor Ghulam Azam and others, and requested them to come to the MLA headquarters. They met Gen. Tikka, agreed to issue a press statement, and to form peace committees. They were truly loyal Pakistanis.”
এরপর ৬ এপ্রিল নুরুল আমীনের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানের পাকিস্তানপন্থী নেতাদের একটি অংশ আবার টিক্কা খানের সাথে দেখা করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। টিক্কা খানের সাথে বৈঠকের পর ১০ এপ্রিল গঠিত হয় "নাগরিক শান্তি কমিটি" যেখানে গোলাম আযম ছিলেন ছিলেন ওয়ার্কিং কমিটির অন্যতম সদস্য। ১৬ এপ্রিল নুরুল আমিনের নেতৃত্বে গোলাম আযম আবারও যান টিক্কা খানের সাথে দেখা করে তাদের উদ্যোগ শান্তি কমিটির অগ্রগতি সম্পর্কে জানাতে। ২০ এপ্রিল সারাদেশে শান্তি কমিটি গঠনের কার্যক্রম শুরু হলে সেখানে গোলাম আযমকে দায়িত্ব দেয়া হয় শান্তি কমিটির কেন্দ্রীয় কার্যক্রম সচল রাখার জন্য গঠিত সাব-কমিটিতে। তিনি ছিলেন সাব-কমিটির দ্বিতীয় সদস্য। ২৩ এপ্রিল কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির পক্ষ থেকে একটা বিশেষ প্রেস রিলিজ পাঠিয়ে আহ্বান জানানো হয় যেন মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মূলে দেশের সর্বস্তরের মানুষ এগিয়ে আসে।
মে মাসের ২১ তারিখ জামায়াতে ইসলামী বিবৃতি দিয়ে দাবি করে ভারত পূর্ব পাকিস্তানে তাদের দালালদের মাধ্যমে পাকিস্তান ভাঙার চেষ্টা করলে "বীর সেনাবাহিনীর সময়োচিত পদক্ষেপের ফলে" তা সম্ভব হয়নি। অপারেশন সার্চলাইট এবং লক্ষাধিক মানুষকে হত্যাকে গোলাম আযমের নেতৃত্বাধীন জামায়াত সময়োচিত পদক্ষেপ আখ্যা দেয়।
এরই মধ্যে পাকিস্তানি হানাদার সেনাদের সহায়তায় খুলনা অঞ্চলে জামায়াত নেতা একেএম ইউসুফের নেতৃত্বে গঠিত হয় রাজাকার বাহিনী। শুরুতে এই বাহিনী ছিল অনিয়মিত বাহিনী। হবে টিক্কা খানের সরকার ১ জুন রাজাকার বাহিনীকে স্বীকৃতি দেয়। ইয়েলেনা বিবারম্যানের বই Gambling with Violence: State Outsourcing of War in Pakistan and India থেকে রাজাকার বাহিনীর গঠন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা যায়। পাকিস্তান সরকারের একটি গোপন নথি থেকে জানা যায় রাজাকার বাহিনীর গঠন প্রক্রিয়ায় গোলাম আযমের নেতৃত্বাধীন শান্তি কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
নথিতে লেখা ছিল, “The recruitment will be carried out mainly through the org [sic] of loyal political leaders and prominent members of Peace Committees. The political leaders and members of Peace Committees will stand surety for the Razakars who are enrolled and will be answerable [sic] for conduct of Razakars.”
অর্থাৎ, পাকিস্তানের সরকারি দলিল থেকে জানা যাচ্ছে, তখন শান্তি কমিটির সবচেয়ে অনুগত ও শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে রাজাকার বাহিনীতে সদস্যদের নেয়া হতো এবং যে শান্তি কমিটি সদস্য যেই সদস্যের নাম প্রস্তাব করবে তাকে সেই রাজাকারের কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী করা হতো। সুতরাং রাজাকার বাহিনীর কর্মকাণ্ডের জন্য গোলাম আযম এবং জামায়াতের যেসব নেতারা শান্তি কমিটির সদস্য ছিল স্পষ্টতই তাদের দায় ছিল।
রাজাকার বাহিনীর মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের জানাশোনার প্রমাণ পাওয়া যায় পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী সাধারণ সম্পাদক জনাব আবদুল খালেকের স্বাক্ষরিত ১৯৭১ সালের ৮ জুলাইর বিবৃতিতে। খুলনা ও যশোর অঞ্চলে রাজনৈতিক সফর শেষে দেয়া এই বিবৃতিতে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ‘অনুপ্রবেশকারী ও ভারতীয় এজেন্টদের মাধ্যমে’ পূর্ব পাকিস্তানকে হজম করার ভারতীয় পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত আছে জানিয়ে বলেন, “দুষ্কৃতিকারী ও ডাকাতদের নির্মূল করার জন্য জনগণ এখন স্বেচ্ছায় রেজাকার ট্রেনিং নিচ্ছেন।” উল্লেখ্য, জামায়াতের তৎকালীন সকল বিবৃতিতে মুক্তিযোদ্ধাদের দুষ্কৃতিকারী, অনুপ্রবেশকারী, ভারতীয় চর আখ্যা দেয়া হতো।
এদিকে রাজাকার বাহিনী গঠনের তোড়জোড়ের মধ্যেই ২১ জুন গোলাম আযম লাহোরে যান এবং সেখানে জামায়াতের একটি সভায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে তাদের হত্যাযজ্ঞের জন্য "গভীর শ্রদ্ধা" জানান ও ভূয়সী প্রশংসা করেন। ২২ জুন দৈনিক পাকিস্তানে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, “জামায়াতের ফাতেমা জিন্নাহ রোড অফিসে কর্মীদের এক সভায় তিনি বলেন যে, সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ ছাড়া দেশকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া হতে রক্ষা করার অপর কোনই বিকল্প কিছু ছিল না।” পাকিস্তানে অবস্থানকালে গোলাম আযম ইয়াহিয়া খানের সাথেও বৈঠক করেন।
১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস পালন করে জামায়াত এবং কার্জন হলে আয়োজিত এক সিম্পোজিয়ামে বকৃতা করে গোলাম আযম। সেখানে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের দুশমন আখ্যা দিয়ে বলেন, “১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের দুশমন ছিল বাইরের [...] কিন্তু এবার পাকিস্তানের ভেতরে হাজারও দুশমন সৃষ্টি হয়েছে [...] এবারের দুশমন ভারতকে তাদের বন্ধু মনে করছে।”
দৈনিক পাকিস্তানের ১৬ আগস্টের প্রতিবেদনে গোলাম আযমের বক্তৃতা উদ্ধৃত করে বলা হয়, “সেনাবাহিনী ও শান্তি কমিটির মধ্যে যোগসূত্র প্রতিষ্ঠার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে জামাত নেতা বলেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাত দেশ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য শান্তি কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।” প্রতিবেদন অনুসারে গোলাম আযম সেদিন আরো বলেন যে, “দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব সেনাবাহিনীর। তাই দেশের মানুষকে বোঝানোর দায়িত্ব শান্তি কমিটির হাতে তুলে নিতে হবে। বক্তৃতার শেষে তিনি ঘরে ঘরে যেসব দুশমন রয়েছে, তাদেরকে খুঁজে খুঁজে বের করার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন দাবি করা হয় প্রতিবেদনে।
সেপ্টেম্বরে গোলাম আযমের নেতৃত্বে জামায়াতের পক্ষ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের নতুন সরকারের অন্তর্ভুক্ত হওয়া জামায়াত নেতাদের সংবর্ধনা দেয়া হয়। দৈনিক সংগ্রামে এই সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হয় ২৫ সেপ্টেম্বর। খবর অনুসারে সরকারে জামায়াতের অংশগ্রহণের স্বপক্ষে যুক্তি দিতে গোলাম আযম পাকিস্তান রক্ষার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, “যে উদেশ্য নিয়ে জামাত রাজাকার বাহিনীতে লোক পাঠিয়েছে শাস্তি কমিটিতে যোগ দিয়েছে সেই উদ্দেশ্যেই মন্ত্রিসভায় লোক পাঠিয়েছে।”
সেদিনের বক্তৃতায় গোলাম আযম বলেন, “সারা প্রদেশে সামরিক বাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসার পরও যে কয়েক হাজার লোক শহীদ হয়েছেন তাদের অধিকাংশই জামায়াতের কর্মী।” অর্থাৎ, গোলাম আযম স্বীকার করে নেন যে শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী গঠনে জামায়াতের প্রত্যক্ষ ও সক্রিয় ভূমিকা ছিল এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধে কয়েক হাজার জামায়াতের কর্মী, যারা তখন রাজাকার বাহিনীর অংশ ছিল, মারা গিয়েছিল।
তবে জামায়াতের এই দুই নেতার অন্তর্ভুক্তির মূল কারণ ছিল একদমই ভিন্ন। রাজাকার বাহিনীর গঠন প্রক্রিয়া ছিল কিছুটা অনানুষ্ঠানিক। রাজাকার বাহিনীর প্রশিক্ষণ হতো দশদিন। এদের মধ্যে একটা অংশ ছিল জামায়াত ও ছাত্র সংঘের কর্মী যারা ছিল পাকিস্তান রক্ষায় আদর্শিকভাবে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ (ideologically motivated), অন্যদিকে এদের অপর অংশের অনেকেই ছিল সুযোগসন্ধানী যারা মূলত আর্থিক সুবিধা, অস্ত্র ও সেই অস্ত্র ব্যবহার করে লুটপাটে আগ্রহী। যুদ্ধ তীব্র হতে শুরু করলে এই
সুযোগসন্ধানীরা কেউ পালিয়ে যায়, কেউ ভিড়ে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে। এই প্রসঙ্গে তৎকালীন পাকিস্তানি সেনাদের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান এএকে নিয়াজি তার The Betrayal Of East Pakistan বইতে লেখেন, “Their defection rate was four per cent in October 1971 and six percent in November 1971 and it increased tremendously when the (India-Pakistan) war started.”
তাই পাকিস্তানের সেনারা তখন খুঁজছিল এমন ব্যক্তিদের যারা যেকোন মূল্যে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তা করবে — মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজ এনে দিতে পারবে, গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করবে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পাহাড়া দিতে পারবে।
জামায়াত ও তাদের ছাত্র সংঘের কর্মীরা ছিল এই কাজের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। তাই জামায়াতের আস্থা অর্জনে নতুন সরকারে তাদের দুইজন প্রতিনিধিকে — একেএম ইউসুফ এবং আব্বাস আলী খান — নেয়া হয়। জামায়াতও এর প্রতিদান দেয়। সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ ছাত্রসংঘের কর্মীদের নিয়ে তৈরি হয় রাজাকার বাহিনীরই বিশেষ দল আল-বদর ও আল-শামস। ইয়েলেনা বিবারম্যানের Gambling with Violence: State Outsourcing of War in Pakistan and India বই অনুসারে, “Most of the al-Badr comprised members of the student wing of the Jamaat, the Islami Jamiat-e Tulabah.” জমিয়ত-এ-তালাবাহ হচ্ছে জামায়াতের ছাত্র সংগঠনের নাম, যার পূর্ব পাকিস্তানের অংশকে ছাত্রসংঘ বলা হতো।
আল-বদর ও আল-শামস সম্পর্কে নিয়াজি তার The Betrayal Of East Pakistan বইতে লেখেন, “Two separate wings called Al-Badr and Al-Shams were organized. Well-educated and properly motivated students from the schools and madrasas were put in Al-Badr Wing, where they were trained to undertake 'Specialized Operations', while the remainder were grouped together under Al Shams, which was responsible for the protection of bridges, vital points, and other areas.”
রাজাকার বাহিনীতে যে জামায়াত ও ছাত্রসংঘ কর্মীদের আধিক্য ছিল তা উঠে এসেছে পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিকের Witness to Surrender বইতেও। বইয়ের ১০৫ পৃষ্ঠায় লেখা আছে যে, “In September, a political delegation from West Pakistan complained to General Niazi that he had raised an army of Jamaat-i-Islami nominees.”
সিদ্দিক সালিক আরো লেখেন, “The Al-Badr and Ash-Shams groups were a dedicated lot, keen to help the Army. They worked hard and suffered hard. About 5,000 of them or their dependents suffered at the hands of the Mukti Bahini for the crime of co-operation.”
তবে গোলাম আযম ও জামায়াতের নেতারা রাজাকার বাহিনী ও এর বিশেষ দলগুলোকে পাকিস্তানিরা যেসব অস্ত্র দিচ্ছিল সেগুলোর কার্যকারিতা, অর্থাৎ সেগুলো দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের যথেষ্ট পরিমাণে হত্যা না করতে না পারায় ক্ষুদ্ধ ছিল। যার প্রমাণ মেলে নভেম্বরের ২৩ তারিখ লাহোরে দেয়া গোলাম আযমের এক বক্তৃতায়। দৈনিক সংগ্রামের প্রতিবেদনে লেখা হয় “সকল দেশপ্রেমিক, শাস্তি কমিটির সদস্য এবং রেজাকারদের উন্নতমানের ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে সজ্জিত করার জন্য অধ্যাপক আযম দাবী জানান।”
লাহোরে থাকা অবস্থায় ভারত পাকিস্তানে বিমান হামলা শুরু করলে গোলাম আযম ‘পূর্ব পাকিস্তান’ তথা বাংলাদেশে না এসে কিছুদিন পাকিস্তানে থেকে প্রথম সৌদি আরব ও পরে যুক্তরাজ্যে চলে যান।