15/05/2026
ভারতের অর্থনৈতিক সংকট এবং মেহনতি জনগণ : কিছু বাস্তব খন্ডচিত্র
সরকার জিডিপি বৃদ্ধির হার ৭.৪% বা ৮.২% বলে দাবি করলেও, বিশেষজ্ঞরা একে একটা পরিসংখ্যানগত কারসাজি বা ‘জুমলা’ বলছেন। এই জিডিপি নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়ে যে অনেক প্রশ্নচিহ্ন আছে সেটা নিয়ে আমরা অতীতেও বিশদে আলোচনা করেছি। বরং ভারতের অর্থনীতিতে যেসমস্ত চিহ্ন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে তার থেকে এইটা স্পষ্ট যে আমাদের দেশ একটা অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তাই জিডিপি নিয়ে নাচানাচি না করে এই লেখায় আমরা দেখে নেব ভারতীয় অর্থনীতির আসল ছবিটা ঠিক কীরকম, এবং দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কীভাবে এই অর্থনীতিতে দিন কাটাচ্ছেন।
শ্রিঙ্কিং মিড্ল ক্লাস
জনগণের খরচের হিসেব এবং বিভিন্ন কোম্পানির পণ্য কীরকম বিক্রি হচ্ছে সেই তথ্যের উপর ভিত্তি করে কয়েকটা গবেষণা বলছে, ভারতের শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণী আসলে “শ্রিঙ্ক” করছে, অর্থাৎ সঙ্কুচিত হচ্ছে। এর মানে হল এই শ্রেণীর একটা ছোট অংশ উপরের দিকে উঠলেও, বেশিরভাগ অংশটাই নিচের দিকে, অর্থাৎ প্রায় নিম্ন-মধ্য বা নিম্নবিত্তের জীবনযাত্রায় নেমে যেতে বাধ্য হয়েছে। নেস্ট্লে, হিন্দুস্তান ইউনিলিভার ইত্যাদি বড় বড় কোম্পানির সিইও-রা পর্যন্ত আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন যে বড় বড় শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জনগণ এখন কম বেতন, ঋণ নেওয়া, চড়া সুদে ঋণ মেটানো ইত্যাদি বিভিন্ন সমস্যায় জরাজীর্ণ। কিছু প্রতিবেদন বলছে, বাস্তবে ভারতে গত পাঁচ বছরে বেতন বৃদ্ধির হার মাত্র ০.০১%; যার ফলে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ক্রময়ক্ষমতা কমছে, তারা বেহিসেবী খরচ কমিয়েছে, এবং ফলস্বরূপ এইসমস্ত এফএমজিসি (ফাস্ট মুভিং কনসিউমার গুড্স) কোম্পানিগুলোর ব্যবসা ধাক্কা খাচ্ছে।
‘স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া’-র একটা সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে যে গত দশকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গড় আয় যে হারে বেড়েছে তার থেকে নিত্যনৈমিত্তিক জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির হার বেশি। হিসেবমতো একজন ব্যক্তি, যিনি ২০১৩-১৪ সালে বছরে ৫ লক্ষ টাকা আয় করতেন, তাঁকে ২০২৩-২৪ সালে এসে ৮.৬ লক্ষ টাকা আয় করতে হতো। স্বাভাবিকভাবেই, বাস্তবে তেমনটা ঘটেনি। এদিকে খাদ্যসামগ্রীর ক্ষেত্রে এই মূল্যবৃদ্ধির পরিমাণ আরও বেশি – প্রায় ১০.৮৭%। অতএব, মধ্যবিত্ত জনতার ক্রময়ক্ষমতা কমতে বাধ্য।
সরকারের ধামাধারিদের চোখে অবশ্য এগুলো ধরা পড়বে না। তাঁরা বলবেন জনগণ এখন দুই-চাকার মোটরবাইক ছেড়ে, সরাসরি এসইউভি গাড়ি কিনছে! তাঁদের এই আজগুবি কথার উত্তর অবশ্য মারুতি কোম্পানির চেয়ারম্যান নিজেই দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এসইউভি বিক্রি বেশি হওয়ার পিছনে কারণ হলো যারা বড়লোক, তারা আরও বড়লোক হয়েছে। সত্যিটা হলো, মধ্যবিত্ত শ্রেণী ধুঁকছে।
ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি
‘রিজার্ভ ব্যাবক অফ ইন্ডিয়া’-র গত বছরের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী পারিবারিক ঋণের পরিমাণ ২০২৩-এর মাথাপিছু ৩.৯ লক্ষ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৪.৮ লক্ষ টাকাতে, অর্থাৎ ২৩% বৃদ্ধি পেয়েছে। চিন্তার ব্যাপার হল এই ঋণের একটা বড় অংশ (৫৫%, মার্চ ২০২৫) বাড়ি তৈরি বা বাড়ির ইএমআই সংক্রান্ত নয়, পড়াশোনা বা ছোট ব্যবসার জন্য নয়; বরং দৈনন্দিন খুচরো খরচে এবং জীবনযাত্রার মান বজায় রাখার জন্য। ক্রেডিট কার্ড কেন্দ্রিক ঋণের পরিমাণ বিরাট পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ১৩ বছরে ক্রেডিট কার্ড মারফৎ করা খরচের পরিমাণ ১৩ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে; ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে পাঁচ গুণ। পাশাপাশি বৃদ্ধি পেয়েছে ঋণখেলাপীর পরিমাণও।
একদিকে মূল্যবৃদ্ধি এবং অন্যদিকে সেই অনুপাতে আয় না বাড়া ও ঋণের বোঝা – এই দুইয়ের মাঝে পরিবারের মোট সঞ্চয় কমতে কমতে এসে যেখানে দাঁড়িয়েছে সেটা গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সঞ্চয় হবে কীভাবে, যদি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বেতনের ৩৩%-ই চলে যায় ইএমআই দিতে; বাড়িভাড়া, খাওয়া-খরচ ইত্যাদি শুরু হওয়ার আগেই। গ্রামের ক্ষেত্রেও ছবিটা আলাদা কিছু নয়। সেখানে ঋণের কারণটা দৈনন্দিন খুচরো খরচের বদলে মূলত কৃষি-ঋণ, এবং মাধ্যমটা ডিজিটালের বদলে মহাজনের উপর নির্ভরতা। এই প্রবণতাগুলোই বুঝিয়ে দেয় যে দেশের সার্বিক অর্থনীতির অবস্থা ভালো নয়। আর এই ঋণ-চক্র থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোনও রাস্তা তো সরকার দেখাচ্ছেই না, বদলে স্টক মার্কেটে অনিয়ন্ত্রিত ও অযৌক্তিক লগ্নি করতে উৎসাহ দিচ্ছে, এবং আরও ভয়ঙ্কর, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তথাকথিত সেলিব্রিটিদের সামনে রেখে নানান রকমের অনলাইন জুয়ার প্রলোভন দেখাচ্ছে।
গত তিন দশকে নয়া-উদারনৈতিক অর্থনৈতিক মডেল যে অশ্বডিম্ব প্রসব করেছে তা একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই বোঝা যায়। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে উস্কে দিয়ে এফএমজিসি, অটোমোবাইল, ও রিয়েল এস্টেট ক্ষেত্রগুলো ভেবেছিল যে কয়েক বছরের মধ্যেই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সংখ্যা ৪৫ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তথ্য বলছে যে সংখ্যাটা টেনেটুনে হয়েছে এর পাঁচ ভাগের এক ভাগে, যাদের মাসিক আয় ২৫,০০০-৫০,০০০ টাকার মধ্যে। কোভিড লকডাউনের পর এটারও তিন ভাগের এক ভাগ ধসে গিয়ে সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৬০ লক্ষে। জনগণের স্বার্থে কিছু করার সদিচ্ছা থাকলে অনেক কিছুই করা যেত, যেমন – উপযুক্ত বেতনসহ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, মূল্যবৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে বেতন বাড়ানোর ব্যবস্থা করা, ছোট ব্যবসাগুলোকে সরকারি সাহায্য দেওয়া ইত্যাদি। কিন্তু আমরা দেখেছি সরকার উল্টে জিএসটি চালু করে ছোট ব্যবসার মেরুদণ্ড ভেঙ্গেছে, চাকরি চাইতে গেলে পুলিস লেলিয়ে লাঠিপেটা করিয়েছে। তাই মাঝে মাঝে বাজেটে কর-ছাড় দিয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ক্ষতবিক্ষত শরীরে ব্যান্ডেজ লাগানোর চেষ্টা সরকারকে করতে হয়; যেটুকু না করলে এই ব্যবস্থাটা তাসের ঘরের মতো ধসে পড়বে মুহুর্তে।
বৈষম্যের বাস্তব, বাস্তবের বৈষম্য
‘ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ডেটাবেস’-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬১ সালে ভারতের মোট সম্পদের প্রায় ১১.৪% ছিল নিচের ৫০% মানুষের হাতে; ২০২৩ সালে তা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসে ৬.৫%-তে দাঁড়িয়েছে (বর্তমানে ৬.৪%)। ওই একই সময়কালে, শীর্ষস্থ ১০% মানুষের সম্পদ ৪৪.৯% থেকে বেড়ে ৬৪.৬%-তে (বর্তমানে ৬৫%) এবং উপরের ০.১% জনগণের সম্পদ মাত্র ৩.২% থেকে এক বিশাল লাফ মেরে ২৯%-তে পৌঁছেছে। সম্পদের যে অংশটি হাতছাড়া হয়েছে, তার সিংহভাগই এসেছে মাঝের ৪০% গোষ্ঠীর মানুষের কাছ থেকে, যাদের সম্পদের পরিমাণ ৪৩.৭% থেকে কমে ২৯%-তে নেমে এসেছে। বর্তমানে আয়ের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেও দেখা যাবে, শীর্ষস্থানীয় ১০% বড়লোক দখল করে আছে মোট জাতীয় আয়ের ৫৭.৭%, আর সর্বনিম্ন ৫০% জনগণের গড় আয় মোটের ১৫%।
এইসব তথ্যের দিকে ভালো করে তাকালে এটা দেখা যায় যে বড়লোক-গরীবদের মধ্যে বৈষম্য স্বাধীনতার পর থেকে মোটের উপর একই রকম ছিল, বা বলা চলে অত্যন্ত ধীরগতিতে হলেও কমছিল। অর্থনৈতিক বৈষম্য ক্রমাগত বাড়তে থাকার এই প্রবণতাটা শুরু হয়েছে সেই ১৯৮০-র দশক থেকে। তারপর ১৯৯০-এর দশকের শুরুতেই নয়া-উদারনৈতিক অর্থনৈতিক মডেলকে অনুসরণ করার পর থেকে যত দিন গেছে, গরীবরা আরই গরীব হয়েছে, বড়লোকেরা আরই বড়লোক হয়েছে, এবং তাদের মধ্যেও যারা বেশি বড়লোক তাদের সম্পদের পরিমাণ, আয়ের পরিমাণ বাকি বড়লোকেদের থেকে বেশি হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এটা রকেটের গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ছবিটা আরও পরিষ্কার হয় বিভিন্ন স্তরের দেশবাসীর ২০২২-২৩ সালের বার্ষিক আয়ের তারতম্যের দিকে তাকালে। দেশবাসীর নিচের ৫০%, মাঝের ৪০%, উপরের ১০%, শীর্ষস্থ ১%, শীর্ষস্থ ০.১%, শীর্ষস্থ ০.০১%, শীর্ষস্থ ০.০০১%-র ২০২২-২৩ সালের বার্ষিক গড় উপার্জন ছিল যথাক্রমে ৭১ হাজার ১৬৩, ১.৬৫ লক্ষ, ১৩.৫৩ লক্ষs, ৫৩ লক্ষ, ২.২৫ কোটি, ১০.১৮ কোটি, এবং ৪৮.৫২ কোটি! এককথায় এর মানে দাঁড়ায়, ভারতের শীর্ষস্থ ১ শতাংশ মানুষের আয় নিচের ৫০ শতাংশ মানুষের আয়ের চেয়ে ৭৫ গুণ এবং সম্পদ ৩১৩ গুণ বেশি। অর্থনৈতিক বৈষম্যের নিরিখে আজকে দেশের সার্বিক অবস্থা ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতের তুলনাতেও খারাপ। আর এই বাস্তবতাকেই ‘জিডিপি’-র ঢক্কানিনাদ দিয়ে আড়াল করতে চায় শাসক শ্রেণী।
নেপোয় মারে দই
কিন্তু গরীব-মধ্যবিত্তদের পকেট থেকে এই টাকা তাহলে যাচ্ছে কোথায়? উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে ‘রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া’-র প্রাক্তন ডেপুটি গভর্নর ভিরাল আচার্য-র কথাতেই। ২০২৩ সালে তিনি লেখেন যে ভারতের ‘বিগ-৫’ বা শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি শিল্পগোষ্ঠী—রিলায়েন্স, টাটা, আদানি, আদিত্য বিড়লা এবং ভারতী টেলিকম—এর প্রভাব ক্রমশ বেড়ে চলেছে; ‘নন-ফিনান্সিয়াল’ ক্ষেত্রগুলোতে তাদের মোট সম্পদের অংশ ১৯৯১ সালের ১০% থেকে বেড়ে ২০২১ সালে ১৮ শতাংশে পৌঁছেছে। বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলোর এই একত্রীকরণ বা আধিপত্যের বিস্তার ঘটেছে মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য বেসরকারি সংস্থাগুলোর ক্ষতির বিনিময়ে।
২০১৯ সালে ভারত সরকার কর্পোরেট করের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। সরকারের তরফে যুক্তি দেওয়া হয় এর মাধ্যমে নাকি কর্মসংস্থান হবে, আয়ের বৃদ্ধি ঘটবে! যার একটাও হয়নি, হওয়ার কথাও নয়। বরং এর ফলে যেটা হয়েছে সেটা হল – ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো ব্যক্তিগত আয়কর থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব কর্পোরেট কর রাজস্বকে ছাড়িয়ে গেছে; ২০২০-২১ অর্থবছরের ২.৫ ট্রিলিয়ন টাকা থেকে কর্পোরেট মুনাফা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭.১ ট্রিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে; এবং কর্পোরেট মুনাফা ও জিডিপি-র অনুপাত ২০২৪ সালে গত ১৫ বছরের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, ‘রাইট-অফ’-এর অব্যাহত প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৬.১৫ লক্ষ কোটি টাকা কর্পোরেট ঋণ মকুব করা হয়েছে।
তাই যখনই কর্পোরেট কর বাড়ানোর প্রশ্নটা ওঠে শাসক শ্রেণীর নেতামন্ত্রীরা দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে ওঠেন। যেমন, ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে নির্মলা সীথারমন বলেন যে – ‘সম্পদ সৃষ্টিকারী’দের যদি এই কারণে শাস্তি দেওয়া হয় যে তাদের হাতে কিছু অর্থ সঞ্চিত রয়েছে, তবে গত দশ বছরে ভারতের যে ‘অগ্রগতি’ হয়েছে তার গোটাটাই নাকি নস্যাৎ হয়ে যাবে! বোঝাই যায় আসলে কাদের অগ্রগতির কথা সরকার ভাবছে!
সম্পদ কারা তৈরি করে?
নির্মলা সীথারমন-এর কাছে ‘সম্পদ সৃষ্টিকারী’র সংজ্ঞা অন্যরকম হতে পারে, কিন্তু সমাজের আসল সম্পদ যারা সৃষ্টি করে সেই মেহনতি মানুষ কীভাবে জীবনযাপন করছেন তার খবর কি তিনি রাখেন? ২০১৯-২০২৪ সালের মধ্যে গ্রামীণ মজুরি নামমাত্র হিসেবে বার্ষিক ৫.২% হারে বৃদ্ধি পেয়েছে; যেটাকে মুদ্রাস্ফীতির সাথে সমন্বয় করলে দেখা যায় যে প্রকৃতপক্ষে বৃদ্ধির হার হল বার্ষিক -০.৪%, অর্থাৎ বৃদ্ধি তো হয়ইনি, বরং ‘জিডিপি’ বৃদ্ধি নিয়ে ভূতের নেত্যর মাঝে মেহনতি জনগণের মজুরি ধারাবাহিক ভাবে কমেছে। ২০২৪ সালের এপ্রিল–জুন কোয়ার্টারে গ্রামাঞ্চলের অস্থায়ী (ক্যাসুয়াল) শ্রমিকদের গড় দৈনিক মজুরি ছিল প্রায় ৪১৭ টাকা (পুরুষ ৪৪৪, নারী ২৯৯), আর শহুরে অস্থায়ী শ্রমিকদের ৫১৬ টাকা (পুরুষ ৫৩৭, নারী ৩৬৪); যেখানে এই টাকার বড় অংশই খাবার, ভাড়া, যাতায়াতে চলে যায়। এই সামান্য টাকায় তাদেরকে দিনে প্রায় ১৪ ঘণ্টা পরিশ্রম করতে হয়। কাজের অস্বাস্থ্যকর ও নিরাপত্তাহীন পরিবেশে প্রতি বছর প্রায় ৪৮,০০০ শ্রমিক প্রাণ হারান, যে সংখ্যাটা বিশ্বে সর্বোচ্চ।
ভারতের অসংগঠিত ক্ষেত্রটা হল ভারতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড, যেখানে দেশের মোট কর্মীবাহিনীর ৯০%-ই যুক্ত আছেন। জিডিপি-র প্রায় ৫০% সম্পদ তারা সৃষ্টি করেন যেটা নির্মলা সীথারমন-দের চোখে পড়ে না। অসংগঠিত ক্ষেত্রের এই শ্রমিকদের মধ্যে মাত্র ১০%-ই মাসে ১০,০০০ টাকার বেশি আয় করতে পারেন, এবং ২০%-এরও কম শ্রমিকদের কাছে পেনশন, স্বাস্থ্য বীমা, মাতৃকালীন সুবিধা, বা আইনি সুরক্ষার রক্ষাকবচ আছে। ভারতে পরিযায়ী শ্রমিকদের সংখ্যা ১০ কোটিরও বেশি, যাদের কাছে পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা তো নেই-ই, সেটা ছাড়াও এখন তাদেরকে দ্বিমুখী সামাজিক আক্রমণ সামলাতে হচ্ছে। একদিকে যেমন ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে জাত-ধর্ম এমনকি ভাষাভিত্তিক পরিচয়ে তাদেরকে ব্রাহ্মণ্যবাদী আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে SIR-এর মাধ্যমে তাদের নাগরিকত্ব হরণ করে নেওয়ার চেষ্টাও চলছে, যাতে তাদের নাগরিক অধিকারের বিষয়টাই না থাকে।
এসবের সাথে যুক্ত হয়েছে শ্রমিকদের সম্পূর্ণরূপে ক্রীতদাসে পরিণত করার নীল নকশা – লেবার কোড। এই কোডের মাধ্যমে শিল্প মালিকদের হাতে আরও বেশি ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছে; ১২ ঘণ্টার কাজের দানবীয় নীতিকে আইনসম্মত করা হচ্ছে; শ্রমিকদের ধর্মঘট করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। শহুরে এলাকায় গিগ শ্রমিকদের দুর্দশার ছবিও প্রতিনিয়ত সামনে আসছে। চাকরি নেই, তাই শিক্ষিত যুব সম্প্রদায় সাইকেল/বাইক নিয়ে এই ‘গিগ’ শ্রমকেই নিজেদের পূর্ণ সময়ের কর্মসংস্থান হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তাদেরকে তো আবার ‘কর্মী’ হিসেবেই স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না, যাতে তাদের ওপর শ্রম আইনগুলোই প্রয়োগ করা না যায়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তায় কাজ, দুর্ঘটনার সম্ভাবনা—এসব সত্ত্বেও তাদের কোনো ন্যূনতম সুরক্ষা নেই। নির্মলা যাদের ‘সম্পদ সৃষ্টিকারী’ বলে মনে করেন, তাদের সম্পদ সৃষ্টি করার জন্য দশ মিনিটের মধ্যে ডেলিভারি করতে গিয়ে রাস্তায় প্রাণ হারাচ্ছে এই গিগ কর্মীরা। দুর্ঘটনা নয়; বরং এগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক খুন বলাই ভালো।
উপসংহার
সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনাবলীর দিকে তাকিয়ে এই আশা করাই যায় যে ‘জিডিপি’ ও ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি’ নিয়ে সরকারি প্রচারের ফানুসকে মেহনতি জনগণ খুব শীঘ্রই ফাটিয়ে দেবে। গত বছর ২৫ ও ৩১ ডিসেম্বর ধর্মঘট করে গিগ কর্মীরা নিজেদের শক্তি দেখিয়ে দিয়েছে। ডেলিভারি থমকে গিয়েছিল অনেক শহরে। তাদের শক্তি ক্রমশ আরও সংগঠিত হচ্ছে। এছাড়া, লেবার কোড প্রত্যাহার, বেসরকারিকরণের বিরোধিতা, ন্যূনতম মহুরি বৃদ্ধি ইত্যাদি বিভিন্ন ন্যায্য দাবিতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘ভারত বন্ধ’ ছিল দেশব্যাপী শ্রমিকদের একটা সফল ধর্মঘট, যেখানে সংগঠিত ও অসংগঠিত ক্ষেত্র মিলিয়ে প্রায় প্রায় ৩০ কোটি মেহনতি জনগণ অংশ নিয়েছিল। এর পরেও নয়ডা-র সাফাই কর্মীদের ধর্মঘট, পানিপাত-এ রিফাইনারি শ্রমিকদের বিক্ষোভ, এবং সিঙ্গরৌলি-তে আদানি পাওয়ার প্ল্যান্টে শ্রমিকদের বিক্ষোভ – এগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে যে ‘জিডিপি’-র জুমলা দিয়ে বেশিদিন মেহনতি জনগণকে ভুলিয়ে রাখা যাবে না। যারা প্রকৃতই সম্পদ সৃষ্টি করে, তারা নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে নিতেও জানে।
#জিডিপির_জুমলা