Choto Bangla Golpo

Choto Bangla Golpo

Share

ছোট বাংলা গল্প পড়তে এই Page এ আসুন

31/07/2025

"একটু কচুর শাক তুলে দাও না গো শুভ্রা ।
ইলিশ মাছের মাথা গুলো জমে গেছে বেশ কয়েকটা।" কচুর শাক রান্না করে খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে রিনা বৌদি।

"দেবো, বৌদি দেবো ,একটু সময় করে নি। পাঁচ বাড়ি কাজে যাই কখন নামি বলো তো কচু বাগানে।"

রিনা বৌদি রান্না ঘরের জানালা দিয়ে 5 কাঠা জায়গার ওপর কচু শাকের বন দেখতে পায়। মনে মনে ভাবে এখনো প্রোমোটারদের চোখ পড়েনি জায়গাটার উপর, তাই অট্টালিকা উঠতে যতদিন বাকি আর কি। তার মধ্যে যে কয়েক বছর টাটকা ও পরিষ্কার কচু শাক খাওয়া যায় ক্ষতি কি! বলতো শুভ্রা। তাছাড়া প্রত্যেক বছর বর্ষাকালে তুমি আমাকে ওই কচু বন থেকে কচুশাক এনে দাও। কি ভালো গো, একদম গলা চুলকায় না ।ছোলা কচু এখন দেখাই যায় না ।আর এখানে দেখো ছোলা কচুর বনে ভর্তি।"

না বৌদি ,"এখন হবে না প্রচুর বর্ষায় জল জমে আছে নিচে নামাই যাবে না। কোথা থেকে সাপ খোপ এসে পায়ে জড়িয়ে ধরবে আমাদের কি ভয় করে না বলো।"

নারে বাবা , "তা কেন আমি তো প্রত্যেক দিনই দেখি কেউ না কেউ শাক তুলে নিয়ে যাচ্ছে, অত উপর থেকে ডাকি না ওরা শুনতে পাবে না বলে। আর বর্ষার বৃষ্টিতে দেখো একদম সবুজ ঝলমল করছে পাতাগুলো আর পাতার উপরে জল পড়ে মুক্তোর মত টলমল করছে। একটু দাও না বাবা তুলে।"
রিনা বৌদির কাতর আবেদনে শুভ্রা সারা না দিয়ে কাজ করে বিদায় নেয়।

মনে মনে রিনা বৌদি ভাবে ৩-৪ দিন হয়ে গেছে ফ্রিজে ইলিশ মাছের মাথা গুলো রয়ে গেছে। কিছু একটা উপায় তো করতেই হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। রিনা বৌদি তরতর করে নিচে নেমে গিয়ে সোজা কচু বন ভর্তি ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে যায়। কি যে করে এখন। না পারছে নিজে নামতে, না বলার মত কাউকে পাচ্ছে। খানিকক্ষণ কচু বনে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে "আঙ্গুর ফল টক"ভেবে যখন ফিরে আসছে , ঠিক তখনই ঠেলা করে যারা সবজি নিয়ে যায় সে রকম একটি ছেলের সাথে দেখা হয়ে যায়।
রিনা বৌদি বলে" হ্যাঁ রে তোর কাছে কচু শাক আছে নাকি? "
ছেলেটি বলে," না বৌদি আমার কাছে নেই"।

রিনা বৌদি বলে ,"একটা আবদার করবো রাখবি।"

ছেলেটি বলে," বলেই দেখো না কি এমন কথা তুমি বলবে।"
রিনা বৌদি, নিজের ইচ্ছার কথা প্রকাশ করতে ছেলেটা কি যেন ভাবলো তারপর একটা ছুরি নিয়ে নেমে গেল কচু বনে। রিনা বৌদিকে বেশ খানিকটা কচু শাক ও লতি তুলে দেওয়ার পর নিজের ঠেলাগাড়িতে ভর্তি করে নিল কচু শাক ও লতি।

বলল," বৃষ্টির জন্য আজকে বিক্রি বাট্টা সেইরকম কিছু হয়নি । দেখি তোমার কল্যাণে কচু শাক বিক্রি করে টাকা নিয়ে বাড়ি যেতে পারি কিনা। আজ আমার ভীষণ টাকার দরকার। হয়তো ঈশ্বর পথ দেখালেন তোমার মাধ্যমে।"

ছেলেটি চলে যাওয়ার পথের দিকে রিনা বৌদি খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে প্রসন্ন চিত্তে কচু শাক ও লতি নিয়ে মনের আনন্দে বাড়ি ফিরে এলেন।

✍️ আমি মন্দিরা

ছবি গুগল থেকে নেওয়া ।

31/07/2025

বেশ কয়েকদিন একটানা বৃষ্টিতে মোহিনী বাবুর দোকান লাটে ওঠার উপক্রম। প্রাইভেট কোম্পানিতে বহু বছর চাকরি করার পর আচমকা যখন চাকরিটা চলে যায় বিনা কারণে, তখন প্রথম প্রথম মোহিনী বাবু মনের দিক থেকে ভেঙে পড়েছিলেন ।কিন্তু সংসারের হাজারো দায়িত্ব ছেলে মেয়েকে বড় করে তোলা এসব যখন ভাবতে শুরু করলেন তখন কোথা থেকে যেন শক্তি পেলেন নিজের ভেতরে এবং মনস্থির করলেন যেমন করে হোক সংসারটা বাঁচাতে হবে । মোহিনী বাবুর চাকরিটা যখন চলে যায় তখন ওনার স্ত্রী লীলার সাথে প্রত্যেকদিনই কোন না কোন কারণে অশান্তি লেগেই থাকতো। লীলা যেন মোহিনী বাবুকে সহ্যই করতে পারতো না। এদিকে মোহিনী বাবু সংসারটা বাঁচানোর জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন। এমত অবস্থায় একদিন হঠাৎ করে লীলা অন্তর্ধান হয় । মোহিনী বাবু প্রথম কয়েকদিন ভেবে পাচ্ছিলেন না কেমন করে এই জোড়া শোক চাকরি চলে যাওয়া এবং স্ত্রীর অন্তর্ধানকে কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন। সেই সময় ক্লাস ফাইভ এর অভীক ও ক্লাস টু এর অভিদীপ্তা বাবার হাত শক্ত করে ধরে। মোহিনী বাবু আর পিছন ফিরে না তাকিয়ে নিজের চেষ্টায় দোকান ঘর ভাড়া নিয়ে ফাস্টফুডের কারবার শুরু করেন। গুণগত মান বজায় রেখে মানুষের চাহিদা অনুযায়ী ফাস্টফুডের দোকানে ধীরে ধীরে নাম যশ হতে থাকে মোহিনী বাবুর। সঙ্গে ওনার চায়ের স্টল থাকার জন্য দোকান কোন সময় খালি থাকতো না। কিন্তু কয়েকদিন ক্রমাগত বৃষ্টির জন্য কারবারে মন্দা দেখা দেয়।

উনি যখনই মনমরা থাকতেন তখন ছেলে-মেয়ে সব সময় বাবাকে উৎসাহিত করতো। তাতে ওনার মনোবল দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেত এবং উনি সব রকম প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে যেতেন। মাঝে মাঝে লীলার কথা মনে করে উনি মন খারাপ করতেন। এইভাবে দেখতে দেখতে বছরের পর বছর সুখে দুঃখে মোহিনী বাবুর জীবন যুদ্ধ চলতে থাকে। ছেলে অভীক ক্লাস টুয়েলভ এর পর কমার্স নিয়ে কলেজে ভর্তি হয়। তখন থেকে অভীক টিউশন শুরু করে এবং নিজের হাত খরচ নিজেই বহন করে, এদিকে দেখতে দেখতে অভিদীপ্তা ক্লাস টুয়েলভ এর পর হোটেল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়া শুরু করে। এইভাবে দুই ভাই বোন একসময় বাবার শক্ত খুঁটি হয়ে দাঁড়ায়।

মোহিনী বাবু নিজের পৈত্রিক একতলা এসবেস্টটারের বাড়িতে ছেলেমেয়ে নিয়ে থাকবেন, সামনে একটা সুন্দর ফুলের বাগান ছিল ওনার। প্রত্যেকদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে উনি গাছের পরিচর্যা করতেন। তারপরে ছেলেমেয়ে কি খাবে এবং সকাল থেকে তাদের রান্নাবান্না করে স্কুলে পাঠানো সব নিজে হাতে মোহিনী বাবু করতেন ।ওনার ফাস্টফুড সেন্টার চলতো বিকেল চারটে থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত। কাজেই সকাল বেলা মোহিনী বাবু প্রচুর সময় পেতেন ছেলেমেয়ের দেখাশোনা করবার। প্রত্যেকদিন রাত এগারোটার পর ছেলে মেয়ের সাথে খেতে বসতেন ও তিনজনের নানা বিষয়ে কথাবার্তা চলতো। কিন্তু রাতে শোয়ার পর মোহিনী বাবু প্রত্যেকদিন লীলার কথা মনে করতেন।

মোহিনী বাবুর ফাস্টফুড সেন্টার যে অঞ্চলে সেখানে এক পাগলীর উদয় হয় বেশ কিছুদিন ধরে। মোহিনী বাবু দোকানে থাকাকালীন বেশ কয়েকবার সেই পাগলীকে দেখেন। সারা শরীরে নোংরা ভর্তি, চুল উসকো খুসকো, ময়লা জামাকাপড় পরিহিতা পাগলী সবার কাছে চেয়ে চিনতে পেট ভরাতো। কখনো কোন দোকান থেকে পাগলীর গায়ে জল ঢেলে দিয়ে তাড়ান হতো। মোহিনী বাবু যত্ন করে একদিন পাগলীকে খেতে দেন। সেদিনও প্রচুর বৃষ্টির জন্য কম সংখ্যক লোক আসাতে খাওয়ার বেঁচে ছিল মোহিনী বাবু তা পাগলীকে দেন। পাগলী যখন খেতে ব্যস্ত মোহিনী বাবু হাঁ করে পাগলিকে পর্যবেক্ষণ করেনএবং লীলা ঠিক এইভাবেই খেতো এ কথা মনে পড়ে যেতে অন্যমনস্ক হন খানিকটা। পরের দিন বিকেল চারটের সময় ফাস্ট ফুড সেন্টার খুলতে এসে দেখেন বেঞ্চিতে শুয়ে ঘুমোচ্ছে পাগলী। হঠাৎ ডান হাতের কনুইতে নজর যেতে দেখেন লীলার মত ঠিক একই জায়গায় একই রকম জরুল। চমকে ওঠেন মোহিনী বাবু ঘুমন্ত পাগলীকে অনেকক্ষণ ধরে দেখার পর বুঝতে অসুবিধা হয় না এই তার হারিয়ে যাওয়া লীলা। ভেতরে ভেতরে তখন মোহিনী বাবুর নানা রকম দ্বিধা দ্বন্দ্ব শুরু হয়, কিন্তু সমস্ত দ্বিধা দূরে ঠেলে পাগলীকে জোর করে নিজের বাড়ি নিয়ে আসেন। ছেলে মেয়ে পাগলীকে নিয়ে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলে মোহিনী বাবু যা বলেন তাই শুনে ছেলে অভীক ,মেয়ে অভিদীপ্তার চোখ কপালে ওঠে। তারা পাগলিকে রাখতে কিছুতেই রাজি হয় না, কিন্তু মোহিনী বাবুর জোড়াজুড়িতে হার মানে দুইজনে।

তারপর থেকে মোহিনী বাবুর শুরু হয় আবার নতুন এক যুদ্ধের অধ্যায়। লীলার চিকিৎসা শুরু করেন মোহিনী বাবু। দোকান থেকে তখন মোহিনী বাবুর মন উঠে গেছে, ছেলে মেয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে রোজগার করার জন্য ফাস্টফুড সেন্টার অবহেলায় পড়ে থাকে, লীলার সেবা শুশ্রূষা শুরু করেন মোহিনী বাবু। ডাক্তারবাবু বলেন প্রচন্ড শক পেয়ে লীলা ট্রমাই চলে গেছে, তার থেকেই এই বিপত্তি। যত আদর- যত্ন, ভালবাসা, ওষুধ, পথ্য লীলা কে দেওয়া যাবে তত তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবে সে ।কারণ সাময়িকভাবে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন তিনি। মাসের পর মাস চিকিৎসা, মোহিনী বাবুর যত্ন ও ভালোবাসা, এক বছরের মাথায় লীলা স্বাভাবিক জীবন ফিরে পায়।

মোহিনী বাবুর মনে অনেক প্রশ্ন ছিল অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে লীলার। সেই সমস্ত প্রশ্নের উত্তরে লীলা মোহিনী বাবু কে জানান মোহিনী বাবুর অফিস কলিগ রথীন বাবুর সাথে ঘর বাঁধার আশায় লীলা বাড়ি ত্যাগ করেন। কিন্তু রথীন বাবু কয়েকদিন তার সাথে থাকার পর মধুচন্দ্রিমার নাম করে একটি হোটেলে কয়েকজনের কাছে টাকার বিনিময়ে লীলাকে বিক্রি করে দেন। সেখানে লীলার উপর চলে অকথ্য অত্যাচার ও হাত বদল করে লীলা পৌঁছে যায় বেশ্যা পট্টিতে। এখানে দিনের পর দিন অমানুষিক নরক যন্ত্রণায় জর্জরিত হতে থাকে লীলা। উপায়ান্তর না দেখে বাধ্য হয়ে লীলা সেখানে থাকে নোংরা স্যাঁতসেতে ছোট ফুপড়ির এক কামরার ঘরে। আসার পর থেকে ছোট ছোট ছেলে মেয়ে অভীক ও অভিদীপ্তার মুখ ভেসে উঠতো, সঙ্গে মোহিনী বাবুর কথা সর্বদা মনে পড়তো। তার জন্য বিবেক যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে থাকে লীলা। অবশেষে এক সময় মানসিক ভারসাম্য হারায় এবং অস্বাভাবিক আচরণের জন্য সেখান থেকে তাকে রাস্তায় গাড়ি করে নামিয়ে দিয়ে আসা হয়। তারপর থেকে রাস্তাই হয় লীলার ঘরবাড়ি। যখন যেখানে খুশি ঘুমতো, যা পেতো তাই খেতো, কখনো গাছতলা তো কখনো রেলস্টেশন মানুষের দয়ায় পেট চলতো। পাঁচজনের সাথে বিভিন্ন ধর্মস্থানে ভিক্ষা করতেও বসতো লীলা। এইভাবে বছরের পর বছর ঘুরতে ঘুরতে এই অঞ্চলে আসা। কি করে এসে এই জায়গায় পৌঁছালো তার সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারে না লীলা। সবকিছু যেন আবছা আবছা চোখের সামনে ভাসে। কথাগুলো বলতে বলতে লীলা জ্ঞান হারায়। ডাক্তার বাবু বলেন মনের ওপর অস্বাভাবিক চাপের কারণে লীলা জ্ঞান হারিয়েছে। যখনই ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসতো তখন পূর্বের সব কথাই লীলার মনে পড়ে যেত। তাই আমি নিশ্চিত ছিলাম আপনাদের সেবা যত্নে লীলা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবেন।

মোহিনী বাবু সবকিছু শোনার পর একদম সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আচরণ করেন লীলার সাথে ।যেন জীবনের ফেলে আসা অধ্যায় শেষ করে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে মোহিনীবাবু ও লীলার। অভীক ও অভিদীপ্তা লীলা দেবীকে মায়ের জায়গা দিতে না চাইলেও মোহিনী বাবু ছেলে মেয়ের দিকে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দেন শক্ত করে ধরার জন্য, ঠিক আগের মতো।যাতে মোহিনী বাবু আবার শক্তি পান নিজের সংসারকে আগলে রাখার।

27/02/2025

গ্রামের বাড়ি থেকে কাকভোরে অধীর সাইকেল চালিয়ে কয়েক ক্রোশ দূরে টিউশন পড়তে যেত। তখনো চোখে ঘুম লেগে থাকতো। আধো আধো ঘুম অবস্থাতে সাইকেল চালিয়ে যেতে হতো পড়তে। ভোরবেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে সাইকেল চালাতে অধীরের মন্দ লাগত না।বাড়ি এসে আবার কলেজ যাওয়ার তাড়া থাকতো। কলেজ ছিল গ্রামের বাড়ি থেকে অনেক দূরে শহরে। এইভাবে নিত্যদিন যাতায়াতের মাধ্যমে অধীর খানিকটা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল নিজের প্রাত্যহিক কর্মে। কিন্তু সন্ধ্যেবেলায় নিজেদের মুদির দোকানে বসতেও কখনো ভুল হতো না বাবাকে সাহায্য করার জন্য। অধীরের মাও সারাদিন গৃহস্থালি কাজকর্মের ফাঁকে কাঁথা সেলাই করতেন তাতেও মাঝে মাঝে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত অধীর। এইভাবে দিনগুলো কাটছিল অধীরের মা ও বাবাকে নিয়ে। অধীরের বাবা স্বপ্ন দেখতেন ছেলে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উপার্জনের মাধ্যমে ঘরের অবস্থা একদিন ফেরাবে। বুক বেঁধে সেই স্বপ্নই দেখতেন বাবা। অধীর কে নিয়ে মায়ের ও স্বপ্ন কিছু কম ছিল না।

কলেজের গণ্ডি পার করে উচ্চশিক্ষার জন্য অধীর কলকাতায় চলে আসে। মা ও বাবা রাজি না থাকলেও ছেলের স্বপ্নকে সার্থক করার জন্য মনের কষ্ট, যন্ত্রণা ,ব্যথা সবকিছু বুকে চেপে ছেলের ইচ্ছায় সায় দেন। প্রথম দিন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রবেশ করে অধীরের সবকিছু যেন মাথার মধ্যে গুলিয়ে যেতে থাকে। কিছুদিনের মধ্যে অধীর বিশ্ববিদ্যালয় এর নিজের ডিপার্টমেন্টে খানিকটা ধাতস্থ হয়ে যায়। কিন্তু ইউনিভার্সিটিতে কারোর সাথেই সেভাবে অধীর মেলামেশা করতে পারত না বা নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিল যথাসম্ভব। অধীরের এই অবস্থা দেখে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয় করবী ও প্রসেনজিৎ। ধীরে ধীরে করবী ও প্রসেনজিৎ অধীরের অনেক মনের কাছাকাছি আসাতে সবরকম কথা বার্তা করবী ও প্রসেনজিতের সাথে নির্দ্বিধায় চলতো এবং নিজেদের পড়াশুনা নিয়েও আলোচনায় রত থাকতো অধীর। পড়াশোনার সাথে সাথে অধীর সমস্ত রকম প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিতে থাকে। মা ও বাবার সাথে প্রত্যেকদিন রাত নটার সময় অধীর নিয়ম করে খানিকক্ষণ কথা বলতো এবং সকাল আটটার সময় মা-বাবার সাথে কথা না বলে কাজ শুরু করত না। এভাবেই অধীরের দিনগুলো বেশ ভালই কাটছিল নানা দোলাচলের মধ্যে।
সন্ধ্যেবেলা অধীর ব্যাচ করে অংক পড়াতো, যে বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসাবে ছিল। সেই বাড়ির মালিক সুকান্ত বাবু ব্যাংকে চাকরি করতেন। ওনার ছেলেকে পড়ানোর শর্তে উনি বাড়ি ভাড়া দিয়েছিলেন অধীর কে। তবে বলে রেখেছিলেন ব্যাচ করে পড়ান তে ওনার কোন আপত্তি নেই। তাই ব্যাচ করে পড়াতে থাকে অধীর সন্ধ্যে ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত। নিজের কিছুটা খরচ নিজেই বহন করতে সক্ষম ছিল অধীর এইভাবেই। রাত ১১টা থেকে ২টা অব্দি অধীর নিজে পড়াশোনায় মগ্ন থাকতো।

ইউনিভার্সিটি গণ্ডি শেষ হওয়ার প্রাগমুহুর্তে অধীরের সাথে পরিচয় হয় একজন হীরে ব্যবসায়ীর । ওনার আমদানি ও রপ্তানির ব্যবসা ছিল দেশে ও বিদেশে। ধীরে ধীরে পরিচয়ে হৃদ্যতা বাড়তে থাকে দুইজনের মধ্যে। যদিও ভদ্রলোকের বয়স ছিল অনেক বেশি অধীরের থেকে। এই অসম বয়সের বন্ধুত্ব অধীরের মা শোনার পর থেকে খুঁতখুঁত করতে থাকেন এবং ছেলেকে বোঝাতে থাকেন যে কিছু উদ্দেশ্য ওনার আছে ।তার জন্য তোর সাথে এইভাবে বন্ধুত্ব করেছেন। তুই এই জাল থেকে বেরিয়ে আয়। কিন্তু ভদ্রলোকের চোখ ধাঁধানো বাড়ি ,গাড়ি, ঝাঁ চকচকে অফিস সবকিছুই আকৃষ্ট করতে থাকে অধীর কে। অধীর বারে বারে তার মাকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে ভদ্রলোক অর্থাৎ মিস্টার কুলকার্নি একজন ভালো মানুষ এবং ওনার কোন উদ্দেশ্য নেই অধীর কে নিয়ে। মিস্টার কুলকার্নি নিজে অধীর কে হীরে ব্যবসায় কর্মচারী হিসেবে যুক্ত হতে বলেন। এই প্রস্তাবে অধীর আগুপিছু চিন্তা না করে যোগদান করে , মা-বাবার কথা উপেক্ষা করে। প্রচুর টাকার হাতছানি খুব তাড়াতাড়ি বড়লোক হওয়ার বাসনা অধীরকে পেয়ে বসে। আমদানি রপ্তানি ব্যবসার সাথে অধীর নিবিড় ভাবে জড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন বড় বড় পার্টিতে যোগদান করতে থাকে। গ্রামের বাড়ির অসচ্ছলতা থেকে এই জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাত্রা অনেক বেশি আকৃষ্ট করে অধীর কে। মিস্টার কুলকার্নি খুব ভালো মতোই বুঝে গিয়েছিলেন গ্রামের এই সরল সাদাসিধি ছেলেটিকে দিয়ে ব্যবসা সংক্রান্ত বৈধ অবৈধ কাজ করিয়ে নেওয়ার সম্ভব।

গ্রামের বাড়িতে যখন অধীর আসতো তখন তার বেশভূষা সবই পাল্টে গেছে এবং গ্রামের বাড়ির পুরো চেহারার আদল পাল্টে ফেলে কয়েক বছরের মধ্যে। মায়ের মনে তবুও যেন শান্তি ছিল না। তিনি অধীরের সাথে কথা প্রসঙ্গে তার সংশয়ের কথা সব সময় প্রকাশ করতেন। তিনি সব সময় কোন ব্যক্তি বিশেষের অঙ্গুলি লেহনের পরিবর্তে প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষার মাধ্যমে কোন সরকারি চাকরিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু তখন কে শোনে কার কথা।কয়েক বছরের মধ্যে অধীর মিস্টার কুলকার্নির ডান হাত হয়ে ওঠে এবং নিজস্ব বিচার বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে আলেয়ার পেছনে ছুটতে থাকে। কোনরকম প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষা আর অধীর দিত না। শুধু হীরে ব্যবসায় নিজেকে আষ্টে-পিষ্টে জড়িয়ে ফেলে।

এইভাবে ব্যবসার খুঁটিনাটি জানতে জানতে দুবাইতে গিয়ে অধীরের চোখে পড়ে যায় কিছু অজানা তথ্য। এর আগেও বার দুই দুবাইতে আসতে হয়েছিল অধীর কে ব্যবসার কাজে। তখন কোন কিছু তার চোখে পড়ে নি। দুবাইয়ের চোখ ধাঁধানো বিলাস বহুল জীবন যাপন ক্রমে অধীর এতটাই আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল যে সব সময় মিস্টার কুলকার্নি কে দুবাইয়ের কাজ থাকলে নিজের যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করতো। এইভাবে বার কয়েক দুবাইতে যাওয়ার সূত্রে বিভিন্ন অজানা তথ্য জেনে ফেলে অধীর, যা মিস্টার কুলকার্নি কে বেকায়দায় ফেলার পক্ষে যথেষ্ট। তিনি রাতারাতি বেতন অনেকটাই বাড়িয়ে নিজের পার্সোনাল সেক্রেটারি হিসেবে নিযুক্ত করেন অধীর কে। কিন্তু সব সময় বিভিন্ন লোক দিয়ে চোখে চোখে রাখতেন অধীরকে, কখন কোন কাজ করছে দেখার জন্য। অধীর যখন গ্রামের বাড়িতে মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে যেত তখনও দুই একজন তাকে লক্ষ্য করতো তা অল্প দিনের মধ্যে অধীরের বুঝতে অসুবিধা হয় নি। নিজের সংশয়ের কথা মা-বাবাকে জানিয়েছিল কিছুটা হলেও এবং মনে মনে ভয় পেত। হীরের ব্যবসায় কাজ করায় আর মন ছিল না অধীরের। কিন্তু নিরুপায় অধীর মিস্টার কুলকার্নির নির্দেশে কাজ করতে বাধ্য হত।

এইভাবে কয়েক মাস কাজ করার পর অধীর গ্রামের বাড়িতে আসে নিজের খুড়তুতো বোনের বিয়ে উপলক্ষে। বিয়েতে অনেক আনন্দ করলেও মনে মনে যেন ভয় বাসা বেঁধেছিল অধীরের অন্তরে। সেইবার গ্রামের বাড়ি থেকে নিজের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার পর অধীর সবসময় অন্যমনস্ক থাকতো। মা বাবা ফোন করলে দায়সারা উত্তর দিত। নিয়ম করে মা বাবাকে ফোন করা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল। সব সময় হতাশা অধীর কে গ্রাস করে ফেলেছিল। নিজের অবিবেচক মনোভাবের জন্য অধীর সবসময় কষ্ট পেত এবং মায়ের কথা না শোনার জন্য অনুশোচনা করতো ফোনে কথা প্রসঙ্গে মায়ের কাছে। মা নিয়ম করে সবসময় অধীরের সাথে যোগাযোগ রাখার চেষ্টায় থাকতেন। অনেক সময় ফোন বেজে যেত অধীর সারাদিন বাদে রাত্রে ফোনে কথা বলতো। আবার কোন কোন দিন তাও করতো না ।এই জন্য মা ও বাবার দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না ছেলেকে নিয়ে। কাজ ছেড়ে দিয়ে বাড়ি চলে আসার কথা বললে অধীর বলতো আর তা সম্ভব নয় । গ্রামের বাড়ি থেকে ফিরে আসার ৫-৬ মাস বাদ থেকে অধীরের সাথে আর কোনোভাবেই যোগাযোগ করে উঠতে পারছিলেন না বাড়ির মা-বাবা, অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনেরা। অধীর যেন একেবারেই নিরুদ্দেশ হয়ে যায়।

অধীর কে নিয়ে চিন্তা যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছায় তখন
বিস্তর খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছিলেন মা-বাবা এবং আত্মীয়-স্বজনেরা মিলে ।কলকাতায় এসে দফায় দফায় মিস্টার কুলকার্নির অফিসেও যাতায়াত করে কোন রকম সুরাহা করতে পারেন নি তারা। অবশেষে পুলিশের দ্বারস্থ হন। তাতেও যখন কোনো রকম ফল পাওয়া যায় না তখন কোন এক প্রভাবশালী আত্মীয়র সাহায্যে পুলিশের এক উচ্চপদস্থ কর্তার সাথে যোগাযোগ করে নিজের ছেলের কথা জানান। সেখানেও আশ্বস্ত করা হয় যে, জলজ্যান্ত ছেলের খোঁজ নিশ্চয় পাওয়া যাবে, ওনারা যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন। কিন্তু মাসের পর মাস চলে গেলেও যখন হদিস পাওয়া যায় না ছেলের, তখন আবার সেই ভদ্রলোকের সাথে যোগাযোগ করলে উনি বলেন এই ব্যাপারে করার কিছুই নেই ।যেহেতু মিস্টার কুলকার্নির হাত অনেক দূর পর্যন্ত, তাই এই কেসের ব্যাপারে তিনি কোন সাহায্য করতে পারবেন না। উকিল, আদালত করা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু অর্থের অভাবে সবই ধামাচাপা পরে যায়।নিরুদ্দেশের ঠিকানায় ঠাঁই হয় অধীরের।

আর মা-বাবা গ্রামের বাড়িতে অপেক্ষা করতে থাকেন কোন না কোনদিন অধীরের সাথে দেখা হওয়ার বাসনা নিয়ে। বছরের পর বছর অপেক্ষায় রয়ে গিয়ে অবশেষে সন্তান হারানোর যন্ত্রণা ভোগ করে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন অল্প দিনের ব্যবধানে একে একে অধীরের মা ও বাবা। অধীরের নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার ঘটনা অজানা থেকে যায় মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনের কাছে।

স্নেহ ,ভালোবাসা ,আবেগ, অনুভূতি এইগুলোর কোনই মূল্য থাকে না অর্থাভাব থাকলে। আর অর্থ সর্বস্ব মানুষের কাছে এই আবেগ, স্নেহ, ভালবাসা মূল্যহীন। তারা ব্যবসার মাধ্যমে নিজের আখের গোছাতেই ব্যস্ত থাকে। এইভাবে গ্রামের সহজ, সরল, পড়াশোনায় ভালো ছেলেরা অনেকেই বিকিয়ে যায় অর্থের কাছে। সেখানে হাজার যুক্তি দেখালেও কোন যুক্তিই ধোপে টেকে না।

29/01/2025

রোজ কলেজ থেকে এসে নিয়মমাফিক মধুজা খানিকটা সোফায় বসে, বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে চা বসায় গ্যাসে। সারা বাড়ি একেবারেই খাঁ খাঁ করতে থাকে কেউ কোথাও থাকে না নিচের তলায়।শুধুমাত্র কাজের মেয়ে এবং দুই নাতনির গলা উপরে দোতলায় পাওয়া যায় মাঝে মাঝে তারস্বরে। সেদিনও কাজের মেয়ে রমার সাথে কিছু একটা নিয়ে দুই বোনের তুমুল বচসা বেঁধেছে ।মধুজা আর নিচে বসে থাকতে না পেরে সোজা উঠে যায় ওপরের ঘরে। দুই নাতনি এসে জড়িয়ে ধরে মধুজাকে এবং বলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রমা দিদিকে এই ঘর থেকে বার করে দাও। মধুজার বুঝতে অসুবিধা হয় না দুই ও চার বছরের নাতনিকে সামলাতে রমা যেমন হিমশিম খায়, তেমনি দুই নাতনি ও বাড়ির কাউকে দেখতে না পাওয়ার জন্য বড় বেশি জেদি হয়ে উঠেছে। মধুজার ছেলে ও বৌমা দুইজনই যেহেতু কর্মরত সেই জন্য সকাল এগারোটা পর দুইজনেই অফিস চলে যায় ফিরতে রাত হয়। কখনো কখনো ছুটির পর দুইজনে কিছুটা সময় কাটায় নিজেদের মতো, তারপর ফিরে আসে বাড়িতে। যেদিন দেরি হয় সেদিন মাকে বলে যায় মধুজার ছেলে ও বৌমা। ছেলে- বৌমা ভাল থাক মধুজার একান্ত ইচ্ছা তাই। সব সময়ের কাজের লোক না পাওয়ার জন্য নিজে কলেজ থেকে এসে যখন নিজের সমস্ত কাজ করতে হয় তখন মাঝে মাঝে মধুজা হাঁপিয়ে ওঠে এবং ভাবতে থাকে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা।

তখন মধুজার স্বামী সমীর বাবু অফিসের যতই কাজ থাক না কেন বাড়িতে এসে সমস্ত কাজে মধুজাকে সাহায্য করতেন ,এমনকি ছোট্ট ছেলে অয়নের ব্যাপারেও ছিল সজাগ দৃষ্টি। সকাল হলে সমীর বাবু নিজেই চা করে মধুজা কে দিতেন। এটা ছিল প্রত্যেক দিনের কাজ ,মধুজার কোন আপত্তি সমীর বাবু শুনতেন না। এইভাবেই দেখতে দেখতে চোখের সামনে দিয়ে ছেলে বড় হয়ে নিজের কর্মজীবনে প্রবেশ করলো, যার বেশিরভাগ কৃতিত্ব সমীর বাবুর। মধুজা কলেজ করতো ঠিকই কিন্তু বাকি দায়দায়িত্ব সমীর বাবু যেন নিজের থেকেই নিয়েছিলেন।

এরপর কালের নিয়মে সমীর বাবু যেদিন কাজ থেকে অবসর নিলেন সেদিন মধুজা কলেজে যাননি স্বামীর জন্য। মধুজা প্রায় দিন নানা অছিলায় কলেজে যাওয়া বন্ধ রেখে একসাথে সময় কাটাতেন। সমীর বাবু সবই বুঝতেন এবং মনে মনে খুশিও হতেন মধুজার এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও কর্তব্য পরায়ণতা দেখে। সমীর বাবুর যাতে সময় ভালো মতো কাটে সেই জন্য মধুজা ছেলের বিবাহ দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু কোন মেয়ে যখন ছেলের পছন্দ হয় না তখন সমীরবাবু ও মধুজা ছেলের কাছে জানতে পারেন যে নিজের অফিসেরই এক কলিগকে তিনি মন দিয়ে বসে আছেন। মধুজা ছেলের কাছে এহেন কথা শোনার পর খানিকটা আহত হলেও খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নেন সমীর বাবুর সহায়তায়। তারপর যথা সময় অয়নের বিয়ে দেন সুপর্ণার সাথে ধুমধাম সহকারে।

মধুজা কখনোই সুপর্ণার উপর কোনরকম জোর খাটাতেন না। সব সময় বন্ধুর মতো ব্যবহার করতেন সুপর্ণার সাথে। কিন্তু অনেক সময় মধুজা কলেজ এবং বাড়ির কাজ সামলে যখন পেরে উঠতেন না তখন সমীরবাবু বলতেন সুপর্ণা কে শাশুড়ী মাকে খানিকটা সাহায্য করার জন্য। সুপর্ণা অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাজে হাত দিলে শাশুড়ি মা সযত্নে সেখান থেকে সুপর্ণাকে সরিয়ে সমীর বাবুর সহায়তায় সব কাজ সম্পন্ন করতেন। এই নিয়ে সমীর বাবুর সাথে প্রায় মধুজার বাকবিতণ্ডা চলতে থাকতো। এরপর এক এক করে দুই নাতনির আগমনে বাড়ি যেন সবসময় সরগরম থাকতো। এতে মধুজা ও সমীর বাবু ভীষণ আনন্দে কাটাতেন দিনগুলো। কিন্তু এই আনন্দ বেশি দিন স্থায়ী হয় না মধুজার জীবনে।

দুম করে সমীর বাবু একদিন রাত্রিবেলা ঘুমের মধ্যে চলে যান পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে। তারপর বেশ কিছুদিন মধুজা কোন কাজে মন দিতে পারেন না এবং কলেজের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভাবতে থাকেন। কিন্তু অয়ন জানতো কলেজের ব্যস্ততা এবং বাড়িতে নাতনিদের ব্যস্ততার মধ্যে থাকলে মা অনেক বেশি ভালো থাকবে । তাই অয়ন মা কে চাকরি যাতে না ছাড়েন তার জন্য পীড়াপিড়ি করতে থাকে, অবশেষে মধুজা ছেলের ইচ্ছায় সায় দেন এবং আর দুটো বছর নিজেকে টেনে নিয়ে যেতে চান অবসর জীবনের অপেক্ষায়।

আর যখন মাত্র দুদিন বাকি ছিল মধুজার অবসর জীবনের, এক মনে মধুজা সমীর বাবুর ছবির দিকে তাকিয়ে থাকেন। বুকের ভেতর একটা গোপন কান্না দানা বাঁধতে থাকে। বড় অর্থহীন মনে হয় সবকিছু মধুজার কাছে। কার জন্য , কিসের আশায় জীবনভর খেটে চললেন? বিনা নোটিশে সমীর বাবুর চলে যাওয়া কিছুতেই যেন মন থেকে মেনে নিতে পারছিলেন না। ছেলে- বৌমা নিজেদের ঘিরে একটু একটু করে আলাদা পরিমণ্ডল গড়ে তুলছে। সংসার এখন তাদেরই। বৃথাই মানুষ ভাবতে ভালোবাসে নিজের সংসার নিয়ে, নিজেকে সংসারের অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে জীবনপাত করে দেয়।এই নিষ্ঠুর ভ্রান্তি নিয়ে প্রত্যেকটা সংসার গড়ে উঠে। একজনের অনুপস্থিতি আরেকজনকে সংসার জীবনে নিষ্প্রভ করে দেয়। যেখানে ছেলে বৌমা তাদের নিজস্ব সুখ, দুঃখ, সমস্যা, তাদের মেয়েদের নিয়ে ব্যতিব্যস্ত, সেখানে মধুজার জায়গা কোথায়?

নির্দিষ্ট দিনে মধুজার বিদায় অনুষ্ঠান শুরু হলো অর্থাৎ ফেয়ারওয়েল। অনুষ্ঠানের শুরুতেই কলেজের ছাত্রী এসে মধুজাকে হাতে ফুলের তোড়া দেয় ও আরো কিছু বিদায়ী উপহার তুলে দেওয়া হয় অনুষ্ঠান মঞ্চে। অনেক কলিগ ও বিশিষ্ট জনেরা সেদিন মধুজার কর্মজীবন নিয়ে অনেক ভাষণ দিলেও কোন কথাই যেন মধুজার কানে প্রবেশ করছিল না। এক ধরনের আবেগে আচ্ছন্ন ছিলেন মধুজা, সেই আচ্ছন্নতায় ছিল শূন্যতা, ছিল ফুরিয়ে যাওয়া, বাতিল হয়ে যাওয়ার ভয়। ৩২ বছরের কর্মজীবন কেমন করে নিভে গেল এক লহমায়। অনুষ্ঠান শেষের মুখে যখন মধুজাকে তার এত বছরের কর্মজীবন সম্বন্ধে কিছু বলতে অনুরোধ জানানো হলো তখন মধুজা ভাষণ দেওয়ার অবস্থায় ছিলেন না।

শুধু কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই গান গেয়ে উঠলেন,

দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইলো না,
(সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি॥)
কান্নাহাসির বাঁধন তারা সইলো না,
(সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি)॥
আমার প্রাণের গানের ভাষা
শিখবে তারা ছিল আশা,
উড়ে গেল, সকল কথা কইলো না।
(সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি॥)
স্বপন দেখি যেন তারা কার্ আশে
ফেরে আমার ভাঙা খাঁচার চার পাশে
(সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি॥)
এত বেদন হয় কি ফাঁকি?
ওরা কি সব ছায়ার পাখী?
আকাশ পারে কিছুই কি গো বইলো না?
(সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি॥)

17/01/2025

প্রায় এক বছর বাদে আমি আবার কলম ধরলাম। যদিও মা-বাবাকে হারিয়ে মন যথেষ্ট ভারাক্রান্ত, তবুও আমার পাঠক বন্ধুদের অনুরোধে কলম ধরতে বাধ্য হলাম। যদি মনের কষ্ট খানিকটা হলেও লাঘব করা
যায় । পাঠক বন্ধুরা আমার লেখার ভুল ত্রুটি নিজ গুনে ক্ষমা করবেন আশা রাখি।

সেদিন ছিল বর্ষাকালের নিশুতি রাত। অষ্টাদশী তরুণী নিজের বাড়ির জানালায় চোখ রেখেছিল বর্ষার সৌন্দর্য দেখার জন্য। আকাশ ভাঙ্গা বৃষ্টির জলে গাছপালা, লাল মাটির মোরমের রাস্তাঘাট ধুয়ে সাফ হওয়ার সাথে সাথে অষ্টাদশী সুচেতার চোখ যায় নিজেদের বারান্দায় কে একজন জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জলের ঝাপটায় সে একেবারেই ভিজে সপসপে। এমন দৃশ্য দেখার পর সুচেতা আর চুপ থাকতে পারে না। ঘর থেকে বেরিয়ে আসে দরজা খুলে এবং ছেলেটিকে সাদর আমন্ত্রণ জানায় ভেতরে প্রবেশের জন্য। একবারের জন্যে মনে হয় নি সুচেতার যে এই অচেনা অজানা ছেলেটি আমার জীবনে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে, যেখানে বাড়ির অন্যান্য সদস্যরা অনুপস্থিত। ছেলেটি ভেতরে প্রবেশ করতে তখন দ্বিধাগ্রস্ত। কিন্তু সুচেতার চাপে ভেতরে প্রবেশ করতে এক প্রকার বাধ্য হয়।

সুচেতা ছেলেটিকে দাঁড়াতে বলে ভিতরের ঘরের আলমারি খুলে বাবার পাজামা পাঞ্জাবি ও একটি গামছা এগিয়ে দেয় ছেলেটির দিকে। ছেলেটির বয়স বড়জোর ২৩ বা ২৪ বছর দেখে মনে হয় সুচেতার। সুচেতা ভেতরে চা করতে চলে যায়, ছেলেটি এই সময় নিজের ভেজা জামা কাপড় ছেড়ে পাজামা ও পাঞ্জাবি পড়ে নেয়। কিন্তু আড়ষ্টতার সঙ্গে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে।
গরম চা দেওয়ার পর সুচেতা তাকে বসতে আহ্বান জানায় এবং পরিচয় জিজ্ঞাসা করে। জানা যায় ছেলেটির নাম শুভ্র ঘোষ এবং জামশেদপুরে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করে, পলিটেকনিক পাস করেছে বিষ্ণুপুর থেকে। এখানে অর্থাৎ বাগনানে সে এসেছে মাসির বাড়ি। নিজেদের বাড়ি জামশেদপুরের কাছে সিনি নামক একটি ছোট্ট মফস্বল শহরে। বাবা রেলে কর্মরত ও রেল কলোনিতে বসবাস। কথার ফাঁকে বৃষ্টি কমলে ছেলেটি উঠে পড়ার তোড়জোড় করতে থাকে। সুচেতার ইচ্ছা ছিল আরো কিছুক্ষন ছেলেটির সাথে সময় কাটানোর, কিন্তু বলে ওঠা আর হয়নি সে কথা। চলে যাওয়ার আগে ছেলেটি সুচেতাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানায় তার এই মানবিকতার জন্য। কথার ফাঁকে পরোপকারী সুচেতার নাম ও পড়াশোনার খবর নিয়ে নেয়।

এরপর বেশ কিছুদিন কেটে যায়, কিন্তু সুচেতার পক্ষে ছেলেটিকে ভোলা সম্ভব হয় না। এদিকে শুভ্র সুচেতাকে দেখার পর থেকে কোন কাজ মনোযোগ সহকারে করতে পারে না। মন যেন তার কারো অপেক্ষার প্রহর গুনছে। দিন যায় ,রাত যায় কারো মনেই স্বস্তি নেই। এ এক অদ্ভুত টানাপোড়েন। শুভ্রর এমনতর অবস্থা দেখে মা মিনতি দেবী শঙ্কিত হয়ে ওঠেন। ছেলের মানসিক অবস্থার কথা তার বন্ধুদের খোঁজ নিতে বলেন মিনতি দেবী।

বন্ধুদের সাথে কথায় কথায় শুভ্র সযত্নে তার ভালোবাসার মানুষের প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যেত। বন্ধুরা ও নাছোড়বান্দা, তার মনের খবর পেতে মরিয়া। এমতাবস্থায় বন্ধুদের ফাঁদে পা দিতে শুভ্র একদিন বাধ্য হয়। খুলে বলে মনের কথা। বন্ধুদের মারফত মা মিনতি দেবীর কাছে খবরটা পৌঁছতে সময় লাগে না। মিনতি দেবী, ছেলের অনুমতি অপেক্ষা না করে নিজের বোনের সহায়তায় চলে যান সুচেতাদের বাড়ি। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি মিনতি দেবীর স্বামী অভ্র ঘোষও সেদিন উপস্থিত ছিলেন।সেখানে সুচেতার হাস্যময়ী, লাবণ্যময়ী এবং স্নিগ্ধ সৌন্দর্য মুগ্ধ করে মিনতি দেবী ও অভ্র বাবুকে। উনারা সুচেতার বাবাকে পরিবারের পরিচয় দেন এবং সুচেতাকে পুত্রবধু হিসেবে পাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সুচেতার বাবা এই প্রস্তাবে কিছুটা সময় চেয়ে নেন নিজেদের প্রস্তুত করার জন্য। তারপর দুই বাড়ির যোগাযোগ ও যাতায়াতের মাধ্যমে দুই বছর অতিক্রান্ত হয়।
ইতিমধ্যে সুচেতা বিএসসি পাস করে। সুচেতা পরোপকারী ও হিতাকাঙ্খী হওয়ার জন্য বন্ধু-বান্ধব ছিল অসংখ্য। সারাদিন কোন না কোন কাজের সাথে নিজেকে যুক্ত রাখতো । মা-বাবার সম্মতি সাপেক্ষে সব কাজ করতো মন দিয়ে । একমাত্র ভাইয়ের সাথে খুনসুঁটি করতে পিছপা হত না সুচেতা। মেয়ে যেহেতু সবসময় বাড়ি মাতিয়ে রাখতো তাই বিয়ে হয়ে যাবে একথা ওর মা বাবা ভাবতেই মন কষ্টে ভুগতেন। ছোট ভাইও দিদিকে কাছছাড়া করতে চাইতো না। কিন্তু মেয়ে বড় হওয়ার সাথে সাথে বিয়ে দেওয়া যেহেতু নিজেদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে তাই যথাসময়ে শুভ্রর মা বাবার সাথে কথাবার্তার মাধ্যমে,
প্রত্যেকের অনুমতি সাপেক্ষে প্রজাপতি নিবন্ধে সুচেতা ও শুভ্রের চার হাত এক হয় নির্দিষ্ট দিনে আত্মীয় সমাগমে।

এদিকে শ্বশুর বাড়ি(রেল কোয়ার্টার) প্রবেশ করে সুচেতা শাশুড়ি মা, শ্বশুর মশাই, একমাত্র বিবাহিতা ননদকে আপন করে নেয় নিজে গুনে। তখনো শুভ্রর বাবা অভ্র বাবুর কয়েক বছর চাকরি আছে। কয়েক মাসের মধ্যেই সুচেতার আগমনে বাড়িতে অনাবিল আনন্দে তৃপ্ত হন মিনতি দেবী ও অভ্র বাবু। কিন্তু ছ মাস যেতে না যেতে শুভ্র সুচেতা কে জামশেদপুরে নিজের কর্মস্থলে বাড়ি ভাড়া করে নিয়ে যায়। এখানে এসে প্রথমে মন খারাপ হলেও পরে সময় কাটানোর জন্য সুচেতা টিউশনি শুরু করে। টিউশনি করতে করতে সুচেতার ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ৫০ জন ছাড়িয়ে যায়। কেননা গরিব ঘরের দুঃস্থ বাচ্চাদেরই সুচেতা পড়াতো সামান্য গুরুদক্ষিণার বিনিময়। বিয়ের পাঁচ বছর পরও যখন সুচেতা সন্তানসম্ভবা হয় না তখন মিনতি দেবী তাকে ডাক্তার দেখানোর জন্য জোড়াজুড়ি করতে থাকেন। অবশেষে শুভ্র ও সুচেতা ডাক্তার দেখাতে সম্মত হয়।। নানান রকম রিপোর্ট সামনে আসতে দেখা যায় শুভ্র কোনদিনই বাবা হতে পারবে না।

এই কথা জানার পর শুভ্র চোখ তুলে সুচেতার দিকে তাকাতেই পারে না। কিন্তু সুচেতা নিজ গুনে শুভ্র কে এই অনভিপ্রেত অপরাধবোধ থেকে বেরিয়ে আসতে বলে। সুচেতা শুভ্র কে বোঝাতে থাকে আমার এই বিরাট সংসারে ৫০ জন বাচ্চা ইতিমধ্যে ঠাঁই পেয়েছে। আরো কত শত বাচ্চা, ইচ্ছা করলে তুমি, আমি অপত্য স্নেহে বড় করতে পারি, এরাই আমাদের সন্তান। একজন আত্মজাকে নিয়ে ক্ষুদ্র সংসারের মধ্যে আবদ্ধ না থেকে এই বিরাট পরিসরে প্রচুর শিশুদের নিয়ে আমাদের সংসার গড়ে উঠুক আনন্দ আশ্রমে। তোমার- আমার বন্ধন অটুট থাকুক এই মায়ার সংসারে আনন্দ আশ্রম কে কেন্দ্র করে। অনেক সময় অনেক সাধ ,অনেক পরিকল্পনাতেও.... আয়োজন ভেস্তে যায়, আবার না পাওয়াতেও তৃপ্তির স্বাদ ঝরে পড়ে কখনো কখনো ।শুধুমাত্র নিজের সুখ টুকু, স্বার্থ টুকু ত্যাগ করতে পারাই বড় কথা। সুচেতার কথায় শুভ্র বাকরুদ্ধ হয়ে নিজেকে ভেতরে ভেতরে সামলাতে থাকে।

জোয়ার- ভাটার এই চলাচলের পথে শুভ্র- সুচেতার জীবন কাহিনী যেন এক যাত্রা পথের ছবি। এই কাহিনীতে দুটো মানুষের আত্মিক সম্পর্ক মূর্ত হয়ে উঠেছে। সেখানে অন্য সব চাওয়া পাওয়া তুচ্ছ।

13/01/2025

একটা মেয়ে যখন পড়াশোনা শিখে বড় হয়ে সংসার জীবনের গণ্ডিতে প্রবেশ করে তখন তার সাধারন কথাগুলো বিয়ের পরে অন্য পরিবেশে অচেনা-অজানা মানুষের বিচার্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তারা তখন সেই মেয়েটিকে কাঠগোড়ায় দাঁড় করাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না। যে মানুষটাকে আঁকড়ে ধরে সংসার জীবন শুরু করে প্রতি পদক্ষেপে তাকেও সব সময়, সেই মেয়েটির পক্ষে বোঝা সম্ভব হয় না।

ঠিক এইরকম-ই সবিতা যখন প্রথম সংসার জীবনে প্রবেশ করলো তখন একরাশ রঙিন স্বপ্ন ছিল তার দুই চোখে। নিজের সংসার সুন্দর করে সাজাবে, ছেলে মেয়েকে মনের মত করে মানুষ করবে ,স্বামীর সাথে ঘুরবে, বেড়াবে ,আনন্দ করবে এই ছিল সবিতার মনে। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই সংসারের নানা যাঁতাকলে সবিতা পৃষ্ট হতে থাকে। শাশুড়ি মা তো ভুল ধরতে পারলেই বেঁচে যান। তারপর দেখতে দেখতে প্রকৃতির নিয়মে সবিতা যমজ সন্তান ফুট ফুটে কন্যা ও পুত্রসন্তানের জন্ম দেয়। ধীরে ধীরে মায়ের সাহচর্যে তারা বড় হতে থাকে। সবার জন্য সবকিছু করার পরও সবিতাকে বোঝার মত কেউ ছিল না পাশে। অনেক দূর বাপের বাড়ি হওয়ার জন্য বছরে একবারই ছেলে-মেয়ে সব সবিতা বাপের বাড়িতে ৮-১০ দিন কাটিয়ে আসতো। সেই সময়টা তার কাছে ছিল অতীব মূল্যবান। বাপের বাড়ি প্রত্যেকে তাকে প্রচন্ড ভালোবাসতো এবং যে কয়দিন থাকতো মা, বাবা ,ভাই, ভাই বৌ প্রত্যেকে তাকে নিয়ে শশব্যস্ত থাকতো। এভাবে গতানুগতিক নিয়মে সবিতার জীবন অতিবাহিত হতে থাকে ।ছেলে ,মেয়ে বড় করা ,স্বামীর সমস্ত রকম কাজে সহযোগিতা এবং শ্বশুর শাশুড়ির পরিচর্যা সবকিছুর মাধ্যমে।

কিন্তু সবিতার মনে শান্তি ছিল না একেবারেই। সাংসারিক নানা কাজের পর সবিতা নিজেকে খোঁজার চেষ্টা করতো। আমি কে? আমার মূল্য এ বাড়িতে কতখানি ?আমি প্রত্যেকের জন্য করে কি পেলাম? আমি এত পড়াশোনা শিখে যে সার্টিফিকেট সংগ্রহ করলাম জীবনের অমূল্য ২২ টা বছর দিয়ে, তার প্রেক্ষিতে সার্টিফিকেটগুলো কি কাজে এলো? এই সমস্ত নানা প্রশ্ন সবিতাকে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে সারাক্ষণ।

কিন্তু নীরবে নিজের সমস্ত দায়-দায়িত্ব পালন করে যেত সবিতা। সকালবেলা থেকেই শুরু হত নানা কাজ। কিন্তু মনের মধ্যে নানা রকম দ্বন্দ্বে নিজেই দুঃখিত হতো। ছেলে ও মেয়ে যখন ক্লাস সিক্সে উঠে তখন থেকে সবিতা ডিপ্রেশনে চলে যায়। এই ডিপ্রেশন এমন আকার ধারণ করে একদিন সবিতা সামান্য কিছু গয়না নিজের কাছে রেখে ,বাকি গয়না কোনগুলো মেয়ের বিয়েতে দেওয়া হবে ,কোনগুলো ছেলের বউকে দেওয়া হবে সমস্ত কিছু লিখে রেখে বেড়িয়ে পরে দরজা খুলে ভোরবেলা। তখন সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন। সবিতা ছেলে ও মেয়েকে আদর করে তাদের দুইজনের কপালে স্নেহ চুম্বন দিয়ে পেছন ফিরে আবার তাদের পানে চেয়ে ঘর ছাড়ে।

সকালবেলায় যথারীতি মেয়ে চিৎকার করে ডাকতে থাকে মা ,মা করে। কিন্তু মা-এর কোন সাড়া পাওয়া যায় না। অপরদিকে ছেলেও ডাকতে থাকে মা একটু এসো আমাকে জল দিয়ে যাও। সবিতার স্বামী মিহির চা দেওয়ার জন্য তাড়া দিতে থাকে। শাশুড়ি মা চিৎকার করে ডাকতে থাকেন থাইরয়েডের ওষুধের জন্য। বেশ খানিকক্ষণ বাদে মেয়ে দেখে মা কোথাও নেই, তখন সবাইকে জিজ্ঞাসা করে আমার মা কোথায়? প্রত্যেকেই সব ঘর দেখতে থাকে কিন্তু কোথাও সবিতা কে খুঁজে পাওয়া যায় না, দেখে মিহির খানিকটা চিন্তা গ্রস্ত হয়ে ছাদে ঘুরে আসে। কিন্তু সেখানে ও দেখতে না পেয়ে মেইন দরজা খোলা দেখে ভাবে সামনে কোথাও হাঁটতে গেছে। সমস্ত কাজ ফেলে হাঁটা শুরু করেছে তাও আবার আমাকে না জানিয়ে মিহির রাগান্বিত হয়। কিন্তু অনেকক্ষণ হয়ে যাওয়ার পরও সকাল আটটা, নটা, দশটা কিন্তু সবিতার দেখা পাওয়া যায় না। তখন মিহির খুব চিন্তিত হয় এবং চারিদিকে খোঁজখবর শুরু করে।

কিন্তু কোথাও সবিতার দেখা না পেয়ে থানায় ডায়রি করতে বাধ্য হয় মিহির। এভাবে একদিন, দুইদিন, এক মাস, দু মাস কেটে যায় কিন্তু সবিতার কোন খোঁজ পাওয়া যায় না। সবিতা ছাড়া প্রত্যেকের জীবন যেন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে ।বুঝতে পারে যে সবিতা সংসারের জন্য কি কি করতো। বিশেষ করে মিহির এবং মিহিরের মা-বাবা জব্দ হন ভালো মতো। ছেলে ও মেয়ে মায়ের অভাব প্রতি পদক্ষেপে অনুভব করতে থাকে এবং তারা অত্যন্ত জেদি হয়ে উঠতে থাকে। সুমি (মেয়ে)ও রনি (ছেলে )এই দুইজনকে সামলাতে হিমশিম খেতে হয় মিহিরকে ।একদিকে অফিস অন্যদিকে সংসার সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলা অসম্ভব হয়ে উঠতে থাকে মিহিরের কাছে। মিহির বাড়িতে ২৪ ঘন্টার লোক রাখতে বাধ্য হয়। টাকা পয়সা দিয়ে লোক রাখলেও সবিতার মতো দায়িত্ব সহকারে কাজ করতে পারে না আয়া দিদি সন্ধ্যা। এদিকে মিহিরের মা কোন কথা বললে দু কথা শুনিয়ে দিতেও ছাড়ে না সন্ধ্যা।

কালের নিয়মে মিহিরের মা বাবা একে একে মারা যান। ছেলে, মেয়ে বড় হয়। মিহির বাবু চাকরি থাকতে থাকতে মেয়ের বিয়ে ঠিক করেন। মেয়ে তখন চাকুরীরতা। যথা সময় স্ত্রীর অবর্তমানে মেয়ের বিয়ে দেন ও ছেলেও চাকরি নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেয়।
এরপর একদিন মিহির বাবু এক কলিগের কাছে জানতে পারেন ওনার স্ত্রী পন্ডিচেরিতে ঋষি অরবিন্দ আশ্রমে রয়েছেন। পন্ডিচেরি ঘুরতে গিয়ে ওনার মুখোমুখি হন মিহিরের কলিগ মিস্টার ঘোষাল।

সাথে সাথে মিহির বাবু টিকিট কেটে পন্ডিচেরির উদ্দেশ্যে রওনা দেন মেয়ে সুমিকে নিয়ে। যতক্ষণ না পর্যন্ত পন্ডিচেরিতে পৌঁছাচ্ছেন, ততক্ষণ মিহির বাবু ও কন্যা সুমির মন উথাল পাথাল করতে থাকে। সত্যি গিয়ে উনি উনার সবিতা এবং সুমি তার মা কে দেখতে পাবে কিনা। পন্ডিচেরিতে ঋষি অরবিন্দ আশ্রমে প্রবেশ করে মিহির বাবু ও সুমি দেখতে পায় বহু মানুষ মেডিটেশন রত। দুইজনে খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে সবিতার দেখা পান। কিন্তু সবিতা তখন ধ্যানমগ্ন। আধঘন্টা পর সবিতা চোখ মেলে প্রথমেই মিহির ও সুমিকে দেখতে পান। কিন্তু কোনরকম প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে উঠে যেতে চাইলে মিহির সবিতার হাত চেপে ধরেন এবং বলতে থাকেন সবিতা তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও ।এই তোমার মেয়ে সুমি তোমার অবর্তমানে আমি সুমি ও রনিকে মানুষ করে উপযুক্ত করে তুলেছি। তুমি আর মুখ ফিরিয়ে থেকো না। সেই দিন তোমাকে একটু বোঝার চেষ্টা করলে আজকের এই দিন আমাকে দেখতে হতো না।

সুমি মাকে জড়িয়ে ধরে। তখন সবিতা সুমিকে বলে তুমি বিবাহিত জীবনে সুখী হও ,নিজের কর্মস্থলে ভালো মতো কাজ করে সুনাম অর্জন করো ।সাথে সাথে নিজের পিতা ও প্রত্যেকের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন কোর। এরপর সবিতা মিহির কে নিজের প্রতি খেয়াল রাখতে বলে এবং অনুমতি চায় আশ্রমের ভিতরে প্রবেশ করবার। মিহির কিছুতেই সবিতা কে ছাড়তে রাজি হয় না। কিন্তু সবিতা বলে আমার পথ সংসার জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আমি আধ্যাত্মিক চিন্তাধারায় নিজেকে নিয়োজিত করেছি। সংসারের কোন বন্ধন আমাকে আর আটকে রাখতে পারবে না। তোমরা ভালো থাকো এবং আমাকে আর দুর্বল করার কোনরকম চেষ্টা করো না। এই কথা বলে সুমিমাকে আদর করে সবিতা আশ্রমের ভেতরে চলে যায়। মিহির ও সুমি এক দৃষ্টিতে সেই দিকে চেয়ে থাকে আর চোখ বেয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়তে থাকে।

এরপর সুমি ফিরে যায় নিজের জায়গায়। আর মিহির বাবু চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার এক বছরের মধ্যে রনির বিয়ে ঠিক করে সেই দায়িত্ব সম্পন্ন করে চলে যান পন্ডিচেরিতে যেখানে সবিতা তার জন্য অপেক্ষা করছে।

✍️ মন্দিরা সিনহা

আমি প্রায় ৩০ বছর আগে একজন মহিলার মনের অবস্থা কেমন হয়েছিল, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি তাকে কিভাবে বাধ্য করেছিল আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশ করতে তারই ব্যাখ্যা দিয়েছি এখানে। তবে তখনো সব মেয়ের পক্ষে এত কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব ছিল না ।কারণ অধিকাংশ মেয়েরা পড়াশোনা জানলেও স্বাবলম্বী না থাকার জন্য এবং ছেলে মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে সবকিছুই সহ্য করতো নীরবে।

Want your business to be the top-listed Government Service in KOLKATA?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Category

Address

Kolkata