24/08/2026
দুধের বাটি, ঝুলন্ত পতাকা ও 'দেশপ্রেম প্রাইভেট লিমিটেড'
এক মা ফুটপাথে বসেছিলেন। তাঁর অপরাধ মারাত্মক — তিনি দরিদ্র! আর এই চকচকে যুগে গরিবের সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো, তাকে খালি চোখে দেখা যায়! তার ভাঙা উনুন দেখা যায়, তার উলঙ্গ শিশুটিকে দেখা যায়, সর্বোপরি তার দারিদ্র্যের করুণ হা-হুতাশ দেখা যায়। সুতরাং, নগর-সৌন্দর্যায়নের প্রথম নিয়ম - দৃশ্যপট পরিষ্কার করো। ফুটপাত হবে কাঁচের মতো স্বচ্ছ, শহর হবে ঝকঝকে আয়নামহল — শুধু চরিত্রগুলো অদৃশ্য হয়ে যাবে।
সেদিন কোনো এক মহতী পাঁচতারা মার্কা মন্ত্রীর চোখে পড়েছিল একটি ধোঁয়া ওঠা স্টোভ। রাষ্ট্রযন্ত্র হাঁ-হাঁ করে উঠল —‘বেআইনি দখল!’ মা মৃদুস্বরে বললেন —‘একটু দুধ গরম করছি।’ কী অপরূপ রসিকতা! আধুনিক রাষ্ট্রের অভিধানে শিশুর জন্য ‘দুধ গরম করা’র নামও এখন ‘জমি দখল’। তা, শিশুর পেটের খিদে নিবারণের জন্য কি আজকাল মহামহিম মন্ত্রীদের অনুমতি লাগে?
এটাই আমাদের নতুন নগর-সভ্যতা! এখানে বহুজাতিক ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং ঝুলতে পারে, বিলাসী প্রাসাদের কাট-আউট দাঁড়াতে পারে, প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীর হাসিমুখের প্রকাণ্ড ফ্লেক্স শোভা পেতে পারে — কেবল গরিবের শিশুর জন্য এক ছটাক দুধ ফুটানোর অধিকারটুকু একজন মা পেতে পারেন না!
তারপর দৃশ্যপট হঠাৎ বদলায়। ক্যামেরা ফুটপাত থেকে দ্রুত সরে যায় যাদবপুর ক্যাম্পাসে। সেখানে কোনো উনুন জ্বলছে না। সেখানে চলছে কিছু তর্ক, খোলা বই আর এক ঝাঁক উদ্ধত চোখ। কিছু তরুণ-তরুণী নাকি আজও বিশ্বাস করে — বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি উৎপাদনের কারখানা নয়, রাষ্ট্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আদালতও বটে!
ব্যাস, অমনি মুখ্যমন্ত্রীর ফরমান জারি হলো — ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’! ‘দেশদ্রোহী’! ‘জেহাদি’! একই সঙ্গে আবিষ্কৃত হলো এক অমূল্য ঐতিহাসিক সত্য — যাদবপুরে নাকি কোনোদিন জাতীয় পতাকা ওড়ে না!
অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের নথী বলছে — পতাকা ওড়ে, স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপিত হয়, জাতীয় সঙ্গীতও বাজে। কিন্তু ক্ষমতার কাছে সত্যের নিজস্ব কোনো অস্তিত্ব নেই; সত্যকেও এখন সরকারি দলের ব্যাজ পরে ঘুরতে হয়। সরকার যা বলবে সেটাই ইতিহাস, আর দলিল-দস্তাবেজ তো কেবল রদ্দি কাগজ!
দেশপ্রেম এখন এক একচেটিয়া লাইসেন্স-রাজ। আর এই লাইসেন্স দেওয়ার অথরিটি কারা? যাঁরা নিজেদের ‘দেশপ্রেমের একচ্ছত্র ঠিকাদার’ বলে দাবি করেন। দেশ তাঁদের, পতাকা তাঁদের, জাতীয়তাবাদ তাঁদের স্বত্বাধিকারী সম্পদ — এমনকি কার রক্তে কতটা দেশপ্রেম আছে, তার ল্যাব-টেস্টের সিলমোহরটিও তাঁদের পকেটে!
কিন্তু একটা ছোট্ট ভুল হয়ে যাচ্ছে। এই দেশটা তো কোনো প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি নয়। দেশটা সেই মায়ের, যিনি ফুটপাথের বাতাসে উনুনের ধোঁয়া মেশান। দেশটা সেই ছাত্রের, যে মন্ত্রীর চোখরাঙানিকে বুড়ো আঙুল দেখায়। দেশটা সেই শ্রমিকের, যার মেরুদণ্ডের ওপর এই শহরের ইমারত দাঁড়িয়ে থাকে। দেশটা সেই কৃষকের, যার হাতে লেগে থাকে এই মাটির গন্ধ।
সুতরাং দেশপ্রমের ঠিকাদারদের জানিয়ে রাখা ভালো — সরকারের প্রতি অন্ধ আনুগত্য আর দেশপ্রেম এক জিনিস নয়। সরকারের ব্যর্থতায় আঙুল তোলা কোনো রাষ্ট্রদ্রোহ নয়, বরং গণতন্ত্রের প্রথম শর্ত। যে রাষ্ট্র একটা স্বাধীন প্রশ্নকে ভয় পায়, তার পতাকার উচ্চতা যতই হোক না কেন, তার আদর্শের উচ্চতা আসলে অতি ক্ষুদ্র।
ফুটপাথের সেই মা আর যাদবপুরের সেই ছাত্র — তারা আলাদা গল্পের চরিত্র নয়, একই গল্পের দুই চরিত্র। একজন চাইছে —‘আমার শিশুর জন্য এক ফোঁটা দুধ।’ অন্যজন চাইছে — ‘আমার দেশের জন্য এক নিশ্বাস স্বাধীনতা।’ রাষ্ট্রের উত্তর একই — ‘নো স্পেস!’ একজনের জন্য ফুটপাথে জায়গা নেই, অন্যজনের জন্য যুক্তির টেবিলে জায়গা নেই।
কিন্তু রাষ্ট্র ভুলে যাচ্ছে, বঞ্চনার এই আগুন বেশিদিন ধামাচাপা দিয়ে রাখা যায় না। আন্দোলনের সেই কথা আজও বাতাসে ঘোরে - ‘কার বাছার জোটেনি দুধ, শুকনো মুখ — তৈরি হও!’
হ্যাঁ, এই ‘তৈরি হওয়া’র নামই তো ছাত্রের প্রতিবাদ, এই ‘তৈরি হওয়া’র নামই তো নাগরিকের প্রশ্ন করার সাহস। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ শাসকেরা ইতিহাস পড়ে না। তারা জানে না, যে শিশুর মুখে দুধ জোটে না, তার মায়ের চোখের জল একদিন শাসকের সিংহাসন ভাসিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ফুটপাত পরিষ্কার করে উনুন সরিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু রাজপথের ক্ষোভকে কোনো ফরমান দিয়ে আটকে রাখা যায় না।
উফফ! কী চোখ ধাঁধানো উন্নয়ন! শহর যত ঝলমল করছে, মানুষের বাঁচার অধিকার তত সংকুচিত হচ্ছে। পতাকা যত আকাশে উঠছে, প্রশ্নের অধিকার তত মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হচ্ছে।
তবে পাঁচতারা সংস্কৃতির মন্ত্রী ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের স্মরণে রাখা উচিত — ঝাড়ু দিয়ে ফুটপাত পরিষ্কার করা যায়, কিন্তু উনুন তুলে নিলেই খিদে উবে যায় না। আর প্রশ্নকর্তাকে ‘দেশদ্রোহী’ বানিয়ে দিলে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া হয়ে যায় না।
দেশপ্রেমের আসল পরীক্ষা জাতীয় পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে স্লোগান দেওয়া নয়; পতাকার ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা রক্তমাংসের মানুষটাকে ‘মানুষ’ বলে স্বীকার করা। যে মায়ের হাতে একটা ফুটন্ত দুধের বাটি — তার মধ্যেও দেশকে আবিষ্কার করা। যে তরুণের হাতে একখানা বই — তার মধ্যেও দেশকে চেনা।
ওদের কাছে দেশ মানে কেবল একখণ্ড কাপড় আর কিছু গর্জন। আমাদের কাছে দেশ মানে জীবন্ত মানুষ। ওদের কাছে দেশপ্রেম হলো বাধ্য নাগরিক। আমাদের কাছে দেশপ্রেম হলো মুক্তি।
ইতিহাস যখন একদিন তাঁর চূড়ান্ত খাতা খুলবে, সে জিজ্ঞেস করবে না — কার মাইকের আওয়াজ কত প্রখর ছিল? সে কেবল সেই ধোঁয়াটে উনুন আর ক্ষমতাচ্ছন্ন মাইক্রোফোনের ছবি দুটো পাশাপাশি রেখে বিচার করবে।
ইতিহাস বড্ড নির্মম সম্পাদক — সে গন্ডেরিরাম বাটপারিয়াদের তৈরি করা মন্ত্রীদের ফাঁকা বক্তৃতা কেটে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়, আর ধুলোমাখা মানুষের মুখগুলোকে অনন্তকালের জন্য অমর করে রাখে।
শমীক লাহিড়ী
২৪ আগস্ট, ২০২৬
DYFI West Bengal
DYFI, NADIA
CPIM West Bengal
ফুলিয়ার বামপন্থী আন্দোলন