09/06/2026
বস্তি উচ্ছেদ: সেকাল ও একাল, উন্নয়ন ও পুনর্বাসনের প্রশ্ন
স্বাধীনতার পর ভারতবর্ষে নগরায়নের গতি যত বেড়েছে, ততই বেড়েছে শহরমুখী মানুষের সংখ্যা। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং উন্নত জীবনের আশায় গ্রাম থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ শহরে এসে বসতি গড়েছেন। কিন্তু শহরের পরিকল্পিত বিকাশের বাইরে থাকা এই মানুষদের বড় অংশই বস্তি, ঝুপড়ি বা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে আশ্রয় নিয়েছেন। ফলে স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত ভারতের নগর উন্নয়নের ইতিহাস একদিকে যেমন নতুন রাস্তা, সেতু, আবাসন ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার ইতিহাস, তেমনি বস্তি উচ্ছেদ এবং পুনর্বাসন নিয়ে দীর্ঘ বিতর্কেরও ইতিহাস।
স্বাধীনতার পর কংগ্রেস শাসনামলে দেশের বড় শহরগুলিতে নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একাধিক বস্তি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়। তৎকালীন সরকারের যুক্তি ছিল, অপরিকল্পিত বসতি শহরের স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও পরিকাঠামোর উপর চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন রাজ্যে বস্তি উন্নয়ন ও পুনর্বাসনের নীতিও গ্রহণ করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে বস্তি উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করা হয় এবং সরকারি আবাসন প্রকল্পের মাধ্যমে কিছু মানুষের পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হয়। তবে বাস্তবে পুনর্বাসন সবক্ষেত্রে কার্যকর হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই উচ্ছেদ হওয়া মানুষদের অভিযোগ ছিল, বিকল্প বাসস্থান কর্মস্থল থেকে অনেক দূরে হওয়ায় তাদের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে পুনর্বাসন কেবল মাথার উপর ছাদ দেওয়ার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা জীবিকা, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ে।
পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার দীর্ঘ ৩৪ বছর ক্ষমতায় ছিল। এই সময় ভূমি সংস্কার, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং কৃষকদের কিছু অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বামফ্রন্ট প্রশংসা পায়। কিন্তু শহরাঞ্চলে উচ্ছেদ নীতি নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ১৯৯৬ সালের ‘অপারেশন সানশাইন’। কলকাতার ফুটপাত ও রাস্তা দখলমুক্ত করার নামে হাজার হাজার হকারকে উচ্ছেদ করা হয়। সরকারের বক্তব্য ছিল, শহরের যান চলাচল ও নাগরিক সুবিধার জন্য এটি প্রয়োজনীয়। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন এবং হকার সংগঠনগুলির একাংশ অভিযোগ তোলে যে জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া এই উচ্ছেদ সামাজিকভাবে অন্যায়। একইভাবে কলকাতা ও শহরতলির বিভিন্ন এলাকায় রেললাইন বা সরকারি জমির ধারে বসবাসকারী মানুষের উচ্ছেদ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। বামফ্রন্ট সরকার অনেক ক্ষেত্রে পুনর্বাসনের কথা বললেও বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর ‘মা-মাটি-মানুষ’-এর রাজনীতির কথা বলা হয়। গরিব ও প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নের লক্ষ্যে একাধিক সামাজিক প্রকল্প চালু হয়। কিন্তু নগর উন্নয়ন, রাস্তা সম্প্রসারণ, সৌন্দর্যায়ন প্রকল্প, জলাশয় সংস্কার বা অবৈধ দখল উচ্ছেদের নামে বিভিন্ন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানও পরিচালিত হয়। কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলের বেশ কয়েকটি উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে নাগরিক সমাজের একাংশ প্রশ্ন তোলে যে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত ছিল কি না। সরকারের দাবি ছিল আইন মেনেই কাজ করা হচ্ছে এবং বহু ক্ষেত্রেই বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্তদের একাংশের অভিযোগ ছিল, পুনর্বাসন প্রকল্প বাস্তব চাহিদা পূরণ করতে পারেনি। ফলে উচ্ছেদ বনাম পুনর্বাসন বিতর্ক অব্যাহত থাকে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে ‘বুলডোজার রাজনীতি’ শব্দবন্ধটি জাতীয় স্তরে আলোচিত হয়েছে। উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, দিল্লির কিছু অংশ এবং অন্যান্য রাজ্যে অবৈধ নির্মাণ উচ্ছেদের নামে বড় আকারের অভিযান চালানো হয়েছে। সরকারের সমর্থকদের মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অবৈধ দখল রোধ এবং নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এই পদক্ষেপ প্রয়োজনীয়। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠন, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের একাংশ অভিযোগ করেছে যে অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নোটিশ, আইনি প্রক্রিয়া এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়াই উচ্ছেদ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন আদালতও বারবার উল্লেখ করেছে যে কোনো উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পুনর্বাসনের প্রশ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে।
আসলে স্বাধীনতার পর সাত দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও বস্তি উচ্ছেদের প্রশ্নে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব থেকেই গেছে। একদিকে শহরের পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা, যান চলাচলের সুবিধা এবং পরিকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। অন্যদিকে রয়েছে লক্ষ লক্ষ গরিব মানুষের বাসস্থান ও জীবিকার অধিকার। সরকার যেই দলেরই হোক— কংগ্রেস, বামফ্রন্ট, তৃণমূল কংগ্রেস বা বিজেপি— প্রত্যেক সময়েই উন্নয়নের যুক্তি দেখিয়ে উচ্ছেদ হয়েছে। পার্থক্য হয়েছে মূলত পুনর্বাসনের পরিমাণ, মান এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে।
প্রশ্ন হলো, উন্নয়ন কি শুধুমাত্র জমি খালি করার নাম? একটি ফ্লাইওভার, মেট্রো প্রকল্প বা আধুনিক নগর কেন্দ্র অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু সেই উন্নয়নের মূল্য যদি গরিব মানুষের মাথার উপর থাকা একমাত্র আশ্রয় হারানো হয়, তাহলে সেই উন্নয়নের নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নের মুখে পড়ে। কারণ শহরের অর্থনীতি মূলত শ্রমজীবী মানুষদের উপর নির্ভরশীল। নির্মাণ শ্রমিক, রিকশাচালক, গৃহকর্মী, হকার, পরিবহন কর্মী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা শহরের অপরিহার্য অংশ। তাদের বাদ দিয়ে কোনো শহরের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তাই বস্তি উচ্ছেদ নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত পুনর্বাসন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি এবং ভারতের সংবিধানের চেতনা অনুযায়ী, মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কোনো উচ্ছেদের আগে বিকল্প বাসস্থান, বিশুদ্ধ জল, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পুনর্বাসনকে দয়া বা অনুগ্রহ হিসেবে নয়, নাগরিক অধিকার হিসেবে দেখতে হবে।
সেকাল হোক বা একাল, উচ্ছেদের ঘটনাগুলি আমাদের একটি শিক্ষা দেয়— উন্নয়ন ও মানবাধিকারের মধ্যে কৃত্রিম দ্বন্দ্ব সৃষ্টি না করে উভয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শহর সুন্দর হোক, আধুনিক হোক, কিন্তু সেই শহরের নির্মাতা শ্রমজীবী মানুষদের স্থানচ্যুত করে নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন রাষ্ট্র উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের জীবন, জীবিকা ও মর্যাদাকেও সমান গুরুত্ব দেবে। কারণ একটি সভ্য সমাজের পরিচয় কেবল তার উঁচু অট্টালিকায় নয়, বরং সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির প্রতি তার আচরণে প্রকাশ পায়।