04/10/2026
আপনি কোন দলে?
দোকানে দাঁড়িয়েছিলাম আইসক্রিম কেনার জন্য। আগে থেকেই একজন কাস্টমার ছিলেন। আমাদের পরপর আরও একজন এলেন— সঙ্গে তার ৮–১০ বছর বয়সী ছেলে।
ভদ্রলোক ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, কী খাবে?
ছেলে জানাল, কোল্ড ড্রিংকস খেতে চায়। মোজো খাবে কি না জিজ্ঞেস করতেই সে অনাগ্রহ দেখাল।
তখন দোকানে থাকা প্রথম কাস্টমারটি বললেন, আমার ছেলেকে সেভেন আপ, কোকাকোলা এসব খাওয়ানো যায় না। এগুলো নাকি ইসরায়েলি পণ্য। ও মাদ্রাসায় পড়ে।
কথাটা শুনে আমার ভেতরটা কেমন যেন ভালো লাগায় ভরে গেল। আমি নিজেও যতটা সম্ভব এসব পণ্য বাছাই করে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি।
কিন্তু পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা দ্বিতীয় কাস্টমার কিছুটা কটাক্ষের সুরে, জোর দিয়ে, হেসে বললেন, আর ইসরায়েলি পণ্য ফেসবুক যে পকেটে নিয়ে ঘুরি, সেটা?
একবার নয়— পরপর দুবার কথাটা বললেন। যেন বোঝাতে চাইছিলেন, ফেসবুক ব্যবহার করছি অথচ ইসরায়েলি পণ্য বয়কটের কথা বলছি— এ কেমন কথা! এসব বয়কট করে কী আর হবে!
ফেসবুকেও এমন কথা অনেকবার দেখেছি। “ফেসবুক তো ব্যবহার করছেন, সেটাও তো তাদেরই পণ্য/ সেবা— তাহলে অন্য জিনিস বয়কট করছেন কেন?”
তখন আমার মনে হলো—
আচ্ছা, এই আংকেল যদি তার নিজের সন্তানের মৃত্যু দেখতে পেতেন? যদি নিজের চোখের সামনে সন্তানের শরীর ক্ষতবিক্ষত হতে দেখতেন? যদি দেখতেন, তার সন্তানের একটি হাত নেই, একটি পা নেই— তবুও কি তিনি বলতেন, “সবকিছু একসঙ্গে বয়কট করতে পারছি না, তাই কিছুই বয়কট করব না”?
আমাদের প্রিয় নবী ﷺ মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝাতে বলেছেন—
“মুমিনগণ পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, দয়া ও সহমর্মিতায় একটি দেহের মতো। দেহের কোনো একটি অঙ্গ অসুস্থ হলে পুরো দেহ জ্বর ও অনিদ্রায় তার সঙ্গে শরিক হয়।” (সহিহ মুসলিম, ২৫৮৬)
তাহলে প্রশ্নটা শুধু এই নয়— “আমি ফেসবুক ব্যবহার করি কেন?”
প্রশ্নটা হলো— অন্যায়, জুলুম আর নিরপরাধ মানুষের রক্তপাত যখন আমার কোনো ভাই-বোনের ওপর ঘটে, তখন তার ব্যথা কি আমার হৃদয়ে পৌঁছায়? আমরা নিজের শরীরে সামান্য আঘাত পেলেও কষ্ট বুঝি। নিজের সন্তান অসুস্থ হলে রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। অথচ উম্মাহর কোনো শিশু বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হলে, কোনো মায়ের কোলে সন্তান নিথর হয়ে পড়লে— সেই কষ্টকে কি আমরা শুধু “ওদের ব্যাপার” বলে পাশ কাটিয়ে যেতে পারি?
বয়কট হয়তো সবসময় শতভাগ করা সম্ভব নয়। বাস্তব জীবনে আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে। কোন পণ্য সরাসরি কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত, কোনটি বিকল্পযোগ্য— এসব নিয়েও যাচাই-বাছাই প্রয়োজন।
যতটুকু পারি, যাচাই করে, সচেতনভাবে অন্যায়কে অর্থনৈতিক সমর্থন না দেওয়ার চেষ্টা করা— এটুকুও কি আমাদের দায়িত্ববোধের অংশ হতে পারে না?
আমি কাউকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাই না। শুধু নিজের কাছেই প্রশ্নটা রাখতে চাই— আমি কোন দলের?
“ফেসবুক পকেটে নিয়ে ঘুরি, তাই কিছুই বয়কট করব না”— এই যুক্তির দলে? নাকি- যতটুকু সম্ভব, যাচাই করে, অন্যায়কে ঘৃণা করি এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত পণ্য বয়কট করার চেষ্টা করি— এই দলে?
হয়তো আমার ছোট্ট একটি সিদ্ধান্ত পৃথিবী বদলে দেবে না। কিন্তু অন্তত এটুকু তো জানাবে— অন্যায়ের সঙ্গে একমত নই। নিরপরাধ মানুষের রক্তের প্রতি উদাসীন নই। আমার সামর্থ্যের সীমার মধ্যে হলেও, জুলুমের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান আছে।
___________
|| সবটা না পারলেও ||
সিরাজাম বিনতে কামাল
#রৌদ্রময়ী