21/10/2021
বঙ্গবন্ধুর আমলে নিষিদ্ধ থাকা মদ জুয়া হাউজির লাইসেন্স চালু করেন স্বৈরাচার জিয়া ৷
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার দেশে মদ, জুয়া নিষিদ্ধ করেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দৃশ্যপটে আসে খন্দকার মোশতাকের অন্যতম সহযোগী সেনাপ্রধান ও উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান।
২৯ নভেম্বর ১৯৭৬ সালে এক সামরিক ফরমান বলে বঙ্গবন্ধু সরকারের মদ জুয়ার নিষিদ্ধ আদেশটি বাতিল করে মদের বার, ক্যাসিনো, হাউজিসহ সকল রকমের জুয়া ও পতিতাবৃত্তির লাইসেন্স প্রদান করে উন্মুক্ত করে দিলেন। এই ফরমান বাতিলে ১৯৭৯ সালে জাসদের শাহজাহান সিরাজ সংসদে প্রস্তাবনা উত্থাপন করেন। এই প্রস্তাবের প্রতিবাদে ওই সময় কুখ্যাত রাজাকার আবদুস সবুর খান সংসদকে জানান, আউট অব বন্ডসহ জুয়া-ক্যাসিনো নগর সভ্যতার নিয়ামক শক্তি। এগুলো সমাজের সেফটি বাল্ব।
জিয়া ইমানদার সামরিক নেতা। তার উদারতায় আজ আমরা সংসদে আসার সুযোগ পেয়েছি। তার কোনো ফরমান বাতিল করা যাবে না। আমরা সংবিধান সংশোধনীতে তার সকল জারিকৃত ফরমানকে শতভাগ বৈধ করে দিয়েছি। সবুর খানকে সমর্থন করে বক্তব্য রাখেন রাজিয়া ফয়েজ, ইউসুফ, কাজী কাদের সহ মুসলিম লীগের সদস্য এবং পাকিস্তানপন্থী সাংসদেরা।
এদিকে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এক অনুষ্ঠানে জানান, বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে মদ, জুয়া, হাউজি চালু করেন। আর খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে তার প্রসার ঘটান। মির্জা আব্বাস, ফালুরাই ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বিএনপি জামাত জোট সরকার ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসার পর সাদেক হোসেন খোকার হাত ধরে ব্রাদার্স ইউনিয়নে প্রথম ক্যাসিনো বসানো শুরু হয়।
সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য সে সময় মির্জা আব্বাসও মতিঝিলের আরামবাগ ক্লাব ও ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে ক্যাসিনো শুরু করেন। মির্জা আব্বাস আর সাদেক হোসেন খোকার পদাঙ্ক অনুসরণ করে মোসাদ্দেক আলী ফালু মোহামেডান ক্লাব ও রহমতগঞ্জ ক্লাবে ক্যাসিনো শুরু করেছিলেন। ৯১-৯৬ সালে বিএনপির আমলে একমাত্র আবাহনী ক্লাব ছাড়া অন্য সবগুলো ক্লাবেই জুয়া-ক্যাসিনোর বাজার বসানো হয়েছিল।
সাবেক সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের আমলে রাজধানী ঢাকাসহ মহানগরগুলোকে ১৮৬৭ সালের দ্য পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্টের আওতামুক্ত করা হয়েছিল। ফলে আইনত দেশের মহানগর এলাকায় মুনাফার আশায় যে কোনো ধরনের জুয়াসামগ্রী ক্রয়, রক্ষণ ও ব্যবহার বৈধতা পেয়ে যায়। কারণ, ব্রিটিশ রাজত্বকালের ১৮৬৭ সালের আইনে নির্দিষ্টভাবে জুয়া এবং কমন গেমিং হাউস নিষিদ্ধ করা আছে। মহানগরগুলোর বাইরে তাই সব ধরনের জুয়া এখনে নিষিদ্ধ।
জানা যায়, ১৯৭৬ সালে প্রথমবারের মতো ঢাকা মহানগর পুলিশ অধ্যাদেশ সংশোধন করে ঢাকা মহানগরীকে ওই আইনের আওতামুক্ত করে জুয়া খেলার পথ খোলা হয়। এরপর ১৯৭৮ সালে আরেকটি সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের সব মহানগরীকে জুয়া নিষিদ্ধ আইনটির আওতামুক্ত করা হয়।
জেনারেল জিয়ার আমলে কেন তখন ওই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, জানতে চাইলে সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ বলেন, ‘আমি তখন সরকারে ছিলাম না। তবে মনে হচ্ছে, মহানগর এলাকায় পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে কিছু হোটেলে জুয়া ও পানীয়ের সুবিধা বজায় রাখতে ওই সংশোধনী আনা দরকার মনে করা হতে পারে। কিন্তু ওই সংশোধনী সত্ত্বেও মহানগর এলাকায় বাড়িতে বাড়িতে ক্লাব বা ক্যাসিনো বসানোর সুযোগ আছে বলে মনে করি না।’
মহানগরগুলোকে ১৮৬৭ সালের আইনের আওতামুক্ত করার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ১৯৭৬ সালের পুলিশ অধ্যাদেশে যে কোনো ধরনের জুয়া নিষিদ্ধ করা আছে। কিন্তু ওই অধ্যাদেশসহ দেশের বিদ্যমান আইনগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮৬৭ সালের আইনেই ‘কমন গেমিং হাউস’ সংজ্ঞায়িত আছে, যেখানে টাকা দিয়ে খেলা নিষিদ্ধ আছে। এমনটা অন্যান্য আইনে নেই।
এ বিষয়ে বিচারপতি মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, আইনের প্রশ্নের চেয়েও বড় হলো, ইনডোর গেমসের নামে আন্ডারওয়ার্ল্ড তৈরি হচ্ছে। এটা আইন-শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার জন্য ভয়ংকর। আজ যা চলছে, সেটা ১৯৭৬ সালে কল্পনা করা যায়নি।
জানা গেছে, বিচারপতি মোয়াজ্জেম হোসেনের নেতৃত্বাধীন একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১৪ সালের ১৮ জুন জুয়াবিরোধী একটি রায় দেন। এতে বলা হয়, অর্থ দিয়ে সব খেলাই অবৈধ। সেই অর্থে জুয়া ও গেমস সমার্থক। সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, হাইকোর্টের এই নির্দেশনাই প্রচলিত আইন।
২০১৩ সালে নওগাঁর মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ক্লাবে কথিতমতে নিপুণ, চড়চড়ি, ডায়েস, ওয়ান-টেন, ওয়ান-এইট নামে জুয়া খেলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। সেই রিটে হাইকোর্ট বিভাগ ওই পর্যবেক্ষণ দেন। অথচ বর্তমান সরকারের আমলে প্রণীত আমদানি নীতিমালায় ক্যাসিনোসামগ্রী বৈধ পণ্যের তালিকায় আছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, ক্যাসিনো ও জুয়াসংক্রান্ত দেশের প্রচলিত আইনগুলোর সবটাই অস্পষ্ট ও অসম্পূর্ণ। ১৮৬৭ সালের পাবলিক গ্যাম্বলিং আইনটি ইতিহাসের কোনো পর্বেই সমগ্র ব্রিটিশ ভারতের জন্য প্রযোজ্য ছিল না। এটি সব সময় নির্দিষ্ট কিছু রাজ্য ও এলাকার জন্য কার্যকর ছিল। তবে লক্ষণীয় হলো, ১৮৬৭ সালের আইনটির নাম পাবলিক গেম্বলিং হলেও এই আইনে কিসে ‘গ্যাম্বলিং’ হয়, তা ব্যাখ্যা করা হয়নি। লটারি বৈধ কিন্তু তারও সংজ্ঞা নেই।
১৯৭২ সালে অন্য অনেক আইনের মতো ১৮৬৭ সালের আইনটি গ্রহণের সময় হর্সরেসিং বা ঘোড়দৌড়ের ওপর বাজি ধরাকে সুরক্ষা দেওয়া হয়। ১৯২২ সালের বিনোদন ট্যাক্স আইনে তাই বেটিং ট্যাক্স এখনো বহাল আছে। পাকিস্তান আমলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘোড়দৌড়ের বাজি জনপ্রিয় ছিল। সে জন্য এলাকাটি রেসকোর্স হিসেবে পরিচিতি পায়। ১৮৬৭ সালের আইনে ‘কমন গেমিং হাউস’-সংক্রান্ত অপরাধের জন্য ২০০ থেকে ৬০০ টাকা জরিমানা ছিল। অনাদায়ে এক থেকে ছয় মাসের জেল। তবে পরে একই অপরাধ করলে শাস্তি দ্বিগুণ। তদুপরি অনধিক অর্থদণ্ড ৬০০ টাকা অথবা ১ বছর পর্যন্ত জেল হবে। রাস্তায় পাখি বা প্রাণী দিয়ে জুয়া খেলার শাস্তি অনধিক ৫০ টাকা জরিমানা অথবা অনধিক এক মাসের বিনাশ্রম বা সশ্রম জেল। ১৯৭৬ সালের ঢাকা মহানগর পুলিশ অধ্যাদেশে এ বিষয়ে দুটি ধারা আছে।
৯২ ধারা বলেছে, যারাই জুয়া খেলার উদ্দেশ্যে কোনো সড়ক বা পাবলিক প্লেসে (জনসমাগম স্থল) মিলিত হবে, তাদের অনধিক ১০০ টাকা জরিমানা করা যাবে। ৯৩ ধারা বলছে, গণবিনোদনে কেউ কোনো খেলায় যুক্ত হলে তাকে অনধিক ২০০ টাকা জরিমানা করা যাবে। সেদিক থেকে পুলিশ অধ্যাদেশের চেয়ে ১৮৬৭ সালের আইনটি কিছুটা নির্দিষ্ট। সেখানে ‘জুয়ার’ সংজ্ঞা নেই। কিন্তু কমন গেমিং হাউসের সংজ্ঞায় পরিষ্কার বলা হয়েছে, কোনো বাড়ি, কক্ষ, তাঁবু বা গাড়িসহ যে কোনো স্থানই হোক না কেন, সেখানে মুনাফা বা লাভের আশায় কোনো খেলার সামগ্রী ব্যবহৃত হলে তা দণ্ডনীয়। অবশ্য ১৯১৩ সালেই এক সংশোধনী এনে বলা হয়, যে খেলায় দক্ষতা থাকবে, সেখানে এই আইন প্রযোজ্য হবে না।
সংবিধান কী বলে : সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘জনগণের পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন এবং বিশেষত আরোগ্যের প্রয়োজন কিংবা আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট অন্যবিধ প্রয়োজন ব্যতীত মদ্য ও অন্যান্য মাদক পানীয় এবং স্বাস্থ্যহানিকর ভেষজের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’
১৮ অনুচ্ছেদের ২ উপদফা বলেছে, ‘গণিকাবৃত্তি ও জুয়াখেলা নিরোধের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সংবিধান শর্তহীনভাবে মদ ও জুয়া নিষিদ্ধ করেছে। উপরন্তু কোনো নাগরিক এই অনুচ্ছেদের কার্যকরতা বলবৎ করার জন্য হাইকোর্টে রিট দায়েরের মাধ্যমে প্রতিকার আশা করতে পারে না। কারণ, বাহাত্তরের সংবিধানই বলে দিয়েছে, এই বিধান আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য নয়।
পাকিস্তান আইন কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯৬১ সাল পর্যন্ত ১৮৬৭ সালের আইন পশ্চিম পাকিস্তানে বহাল ছিল। আইয়ুব খানের আমলে ওই আইন বিলোপ করে জুয়া প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ১৯৬১ জারি করা হয়। কিন্তু ওই আইনেই ব্যতিক্রম রাখা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এই আইন করাচির ফেডারেল এলাকা এবং বিশেষ এলাকাগুলোতে কার্যকর হবে না। ১৮৭০ সাল থেকে অননুমোদিত লটারি দণ্ডবিধির ২৯৪(ক) ধারায় শাস্তিযোগ্য করা হয়। ১৮৭২ সালের চুক্তি আইনের (কন্ট্রাক্ট ল) ৩০ ধারার আওতায় জুয়াসংক্রান্ত যে কোনো চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হয়। ব্রিটিশ সংসদ হস্তক্ষেপ করার আগ পর্যন্ত ইংলিশ কমন লতে জুয়া নিষিদ্ধ ছিল না।
১৬৬৪ সালের গ্যাম্বলিং অ্যান্ড বেটিং আইনে ‘প্রতারণামূলক ও মাত্রাতিরিক্ত’ জুয়া এবং ক্রীড়াবাজি দণ্ডনীয় করা হয়। এরপর ১৭১০ সালে আসে গেমিং আইন। ১৮৪৫ সালের আইনে প্রথমবারের মতো বলা হলো, জুয়া খেলাসংশ্লিষ্ট সব ধরনের চুক্তিই বেআইনি। ১৮৯২ সালে এই আইন আরও কঠোর করা হয়। ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির (যা বাংলাদেশে বলবৎ) ২৯৪(ক) ধারায় অনুমোদনহীন লটারির জন্য জরিমানাসহ ছয় মাসের জেলের বিধান আছে।
মালয়েশিয়ায় সীমিতভাবে জুয়া বৈধ। ২০১৬ সালে জুয়া থকে তার রাজস্ব আয় ১৮০৫.২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০১৬ সালে ভারতের ল কমিশনকে বেটিং আইনানুগ করা যায় কি না, খতিয়ে দেখতে নির্দেশনা দেন। গত বছর ৫ জুলাই ল কমিশন ‘লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক: গ্যাম্বলিং এন্ড স্পোর্টস বেটিং ইন ইন্ডিয়া’
শীর্ষক ১৪৫ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বলেছে, বেটিং আর গ্যাম্বলিং সমার্থক। আইনসিদ্ধ না হলেও গোপনে এসব গোটা ভারতে চলছে। বিচারপতি বিএস চৌহানের নেতৃত্বাধীন কমিশন লাইসেন্সিংসহ ২১টি শর্তে জুয়া ও ক্যাসিনোকে বৈধতা দিতে রাজ্যগুলোর জন্য একটি উপযুক্ত মডেল আইন তৈরির সপক্ষে মত দেয়। ৬ সদস্যের কমিশনের মধ্যে এস. শিবকুমার ভিন্নমত দেন। তার যুক্তি, ভারত সরকারের নীতি সাধারণভাবে জুয়াবিরোধী। সুপ্রিম কোর্ট শুধু ক্রিকেটে বেটিং বৈধতা পরখ করতে বলেছিলেন। ভারতে জুয়া নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় সরকারের এখতিয়ার নেই। সংবিধান এটা বিধানসভার কাছে ন্যস্ত করেছে।
সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক আর আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ জানান , জুয়ার বিলোপ অবাস্তব, এটা সমাধান দেবে না। অপ্রিয় বাস্তবতা মেনেই রাষ্ট্র যৌনপল্লীকে আইনের আওতায় এনেছে। এখানেও লাইসেন্সিং, করারোপ ইত্যাদির মাধ্যমে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে।