07/05/2018
বই: সানজাক-ই উসমান: অটোমানদের দুনিয়ায়
লেখক: প্রিন্স মুহাম্মদ সজল
প্রকাশক: গার্ডিয়ান পাবলিকেশন
জন্রা: ইতিহাস, অটোমান এম্পায়ার
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৪৩০
মুদ্রিত মূল্য:
পেপার ব্যাক- ৪৫০
হার্ড কভার- ৫০০
কাহিনী সংক্ষেপ-
উসমানি খেলাফত বা অটোমান এম্পায়ার এর ইতিহাস নিয়ে লেখা। তবে শুধু অটোমান না, মোঙ্গলদের উত্থান, মামলুক সুলতান এবং ক্রুসেডের ইতিহাসও উঠে এসেছে।
বইটিকে লেখক মোট ৬টি অধ্যায়ে ভাগ করেছেন। অধ্যায়গুলোকে আবার বিভিন্ন উপ অধ্যায়, মোট ৬৮টি উপঅধ্যায়ে ভাগ করেছেন। (সূচিতে একটু ভুল আছে। পঞ্চম অধ্যায় দুবার লেখা হয়েছে, এরপর ষষ্ঠ অধ্যায় না দিয়ে সপ্তম অধ্যায় দেয়া হয়েছে।)
শুরুটা হয়েছে 'মৃত্যুর সম্রাট' দিয়ে। এই অধ্যায়ে মোঙ্গলদের উত্থান রয়েছে।
এরপর আছে 'জানবাজ মামলুক'। এখানে মামলুকদের দ্বারা মোঙ্গলদের প্রতিহত করার ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে।
এরপর আপনি ঢুকে পড়বেন 'গাজীর ঘোড়া' অধ্যায়ে, গাজীর ঘোড়ায় চড়ে! এখানে অটোমানদের শুরু পাবেন।
এরপর আপনি যখন অটোমান এম্পায়ারে চলেই এসেছেন, আপনার তখন 'চারিদিকে শত্রু'! হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন অধ্যায়ের নাম চারিদিকে শত্রু। এ অধ্যায়ে বায়েজিদ ইয়েলদিরিম দ্য থান্ডারবোল্ট এর উত্থান আর তার শত্রু মিত্র সম্পর্কে জানবেন।
এরপর আপনার শুরু হবে 'বারুদী সালতানাত' এ ঢুকে পড়বেন আর প্রথমেই পড়বেন 'আল ফাতিহ'র সামনে। (ওনাকে নিয়ে পরে কথা হবেনি।) এই অংশটা আপনার জন্য (আমার মতে) সবচেয়ে বেশি ‘রিডিং রিয়ালিটি’র অনুভূতি দেবে। কি নেই এখানে!
এরপর অটোমান এম্পায়ার অনেকটা ঝিমিয়ে এসেছে। সময় পার হচ্ছে, আপনি ঢুকে পড়বেন ‘নয়া দুনিয়া’য়।
এই ছিল মোটামুটি বইয়ের ‘গল্প’। হ্যাঁ, গল্প। বাস্তব গল্প। মোটেও ইতিহাস মনে হয়নি। মনে হয়েছে ভার্চুয়াল রিয়ালিটির মতো রিডিং রিয়ালিটিতে বিচরণ করছি।
পাঠ অনুভূতি (না কি প্রতিক্রিয়া?!)
অনুভূতি তো আর লেখে প্রকাশ করা যায় না! তাও আবার টাইপ করে। সামনে থেকে হাত পা নাড়িয়ে প্রকাশ করতে হয়। তবু চেষ্টা করা যাক!
ইতিহাসের বই আগে খুব একটা পড়া হয়নি। খুব একটা কি, একদমই পড়া হয়নি। আসলে টানেনি। যে একটা দুটো হাতে এসেছে হেলাফেলায় দূরে সরিয়ে দিয়েছি। দূর দূর! এসব পড়ার জিনিস না কি!
কিন্তু সানজাক-ই উসমান এর ব্যাপারটাই আলাদা! বর্ণনা এতো প্রাঞ্জল, এতো গতিময় যে চারশ পৃষ্ঠার এই বইয়ে যখন তিনশ পৃষ্ঠায় ছিলাম, লেখককে ম্যাসেজ দিয়ে বললাম বইটার সাইজ ছোটো হয়ে গিয়েছে!
শুরু করা যাক প্রথম অধ্যায় দিয়ে। চেঙ্গিজ খানের উত্থান দিয়ে। চেঙ্গিজ খানের উত্থান প্রমাণ করে দিল, ঘা না খেলে কেউ কখনও ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে না! বেশি কিছু বলবো না, এতোটুকু বলবো চেঙ্গিজ খানে দুর্ধর্ষ এবং নৃশংস সেনানায়ক ছিল কিন্তু সেও পুত্র ছিল, বোর্তির স্বামী ছিল! সে পিতা ছিল, একজন নেতাও ছিল। তার তৈরি করা কুরুলতাই দিয়েই মোঙ্গলরা শাসন করেছিল তাদের বিরাট সাম্রাজ্য।
এরপর যখন জানবাজ মামলুক শুরু করলাম, তখন মাথায় দুটো ব্যাপার ঘুরছিল।
এক, আপনার সাহস, কৌশল বুদ্ধি আর সর্বশক্তিমান এর প্রতি যদি আপনার পূর্ণ আনুগত্য থাকে তাহলে অবশ্যই আপনি অন্যায়ের উপর জয়ী হবেন।
দুই, ইসলামি দাস ব্যবস্থা নিয়ে নাক সিটকানো পশ্চিমারা সম্ভবত মামলুকদের নাম শোনেনি।
এই অধ্যায়ের প্রিয় এবং পুরো বইয়ে সবচেয়ে প্রিয় তিনটি উপঅধ্যায়ের মধ্যে একটি হলো 'ইশকিস্তান'। জালালুদ্দিন রুমি কে নিয়ে লেখা। তার মাত্র কটা পঙ্কতিমালা আছে এখানে, আর আমি তাতেই নিজেকে খুঁজতে লাগলাম। হয়তো পেলাম, হয়তো পেলাম না!
"Why should I seek? I am the same as He.
His essence speak through me.
I have been looking for myself!"
- Rumi
এরপর যখন 'গাজীর ঘোড়া' পড়া শুরু করলাম তখন টের পেলাম কেন ইসলামি খেলাফতগুলো ভেঙে পড়তে শুরু করেছিল বা ভেঙে পড়লো আর কেন উসমান অটোমান এম্পায়ার এর ভিত গাড়লেন। প্রথমটার কারণ ইসলাম অনুপস্থিত, রাষ্ট্র শাসনে ইসলাম কে দূরে সরিয়ে দেয়া আর দ্বিতীয়টার কারণ ইসলামকে মেনে নেয়া, ইসলামের আদর্শে সাম্রাজ্য চালানো। রাষ্ট্র গঠনে ওরহাম থেকে মুরাদ যে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে তা আধুনিক সময়ে দেখা যায় কি না সন্দেহ! যেখানে বেশির ভাগ নেতা তেলের জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা আর ডাটা কালেকশনে ব্যস্ত!
একটা সাম্রাজ্য মানে একজন সম্রাট আর সম্রাট মানে তার চারিদিকে শত্রু। বায়েজিদ ইয়েলদিরিম দ্য থান্ডারবোল্ট যুদ্ধের ময়দান থেকে কূটনীতি সবখানেই বজ্রপাত ছিলেন যা তার জন্য আক্ষরিক অর্থেই তার চারপাশে শত্রু ডেকে এনেছিল।
এই অধ্যায়ে আছে আরেকটা প্রিয় উপঅধ্যায়, 'গুলবাহার'। আল ফাতিহ'র গুলবাহার!
মুহাম্মাদ: Like a slave, you have tied me up with the chain of the locks of your hair, May Allah not liberate me from adoring you.
গুলবাহার: The Earth would die if the sun stopped kissing her.
এরপর সবচেয়ে বড় অধ্যায়, বারুদী সালতানাত। শুরুটাই হয়েছে নবীজী (সাঃ) এর হাদীস প্রমাণের মধ্য দিয়ে। বেয়াড়া শাহজাদা মুহাম্মাদ এর মুহাম্মাদ আল ফাতিহ, দ্য কোঙ্কায়ারার হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে। 'আল ফাতিহ' উপ অধ্যায় আরেকটি সবচেয়ে প্রিয় অংশ বইয়ের। আল ফাতিহ, রূপকথার উত্থান এরপর নবীজীর (সাঃ) এর হাদীস প্রমাণ করলেন যিনি, একাই লড়ে গেলেন যিনি, যিনি শত্রুদের কাছে ছিলেন দ্য কোঙ্কয়েরর, গ্রেট ঈগল নামে পরিচিত।
এরপর আপনাকে মুখোমুখি হতে হবে ভ্লাদ দ্য ড্রাকুলার, যার প্রিয় কাজ ছিল ইমপেল করা আর রক্ত খাওয়া।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়ও এটা, আল ফাতিহ মারা গেলেন। পোপের কাছে ভেনিসের দূত চিঠি আনেন,
"The Great Eagle is Dead!"
এরপর ধীরে ধীরে জল গড়িয়ে পড়ে নয়া দুনিয়ায়। আর জল গড়ায় গাল বেয়ে। আন্দালুস থেকে ইসলাম চলে গেল। অটোমান এম্পায়ার গোল্ডেন পিরিয়ড পার করে ধুঁকছে। রেঁনেসা শুরু হচ্ছে। কলোনিয়াল দুনিয়া শুরু হয়েছে। গ্লোবালাইজেশন হচ্ছে। সময়ের চাকা চলে এসেছে নতুন এক পৃথিবীতে।
বই শেষ!
না, শেষ না। শেষটা পড়ে কখনওই মনে হবে না বই শেষ। এখনও অনেক কিছু বাকি। পড়লেই বুঝবেন ঠিক কি কি জানা বাকি। অনুরোধ নয় দাবি, লেখক আরও লিখবেন। দু'আ করি লেখক এভাবেই কাঠখোট্টা ইতিহাস কে সুখপাঠ্য হিসেবে তুলে ধরবেন, আর আমরা গোগ্রাসে গিলবো!
বইটা থেকে একটা লাইন কোট না করলেই না,
'ইরিন মোর নিগেন বুই।'
'মানবজাতির পথ একটাই, যুদ্ধ!' (তাতার প্রবাদ)
একটা অফ দ্য টপিক কথা না বললেই নয়, লেখক তার এই এতো সুন্দর প্রচ্ছদ বাইন্ডিং আর পৃষ্ঠার বইটার দাম যে এতো কম রেখেছেন এর জন্য তার ধন্যবাদ প্রাপ্য। সাধারণত এটার দাম হওয়ার কথা ৬০০+ সেখানে প্রি অর্ডারে মাত্র ২৭৫ টাকায় কিনেছিলাম!
একটু সাজেশন
লেখক বইয়ের শুরুতে একটা নির্দেশিকা দিয়ে পাঠকের জন্য বইটা পড়া সুবিধা করে দিয়েছেন। বিভিন্ন টীকা তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন। যেটা পড়ে নিলে বইটা পড়তে একদম বাধবে না। এই নির্দেশিকায় আর একটা বিষয় যোগ করা যেত, যুদ্ধের ট্যাকটিক্স বিষয়ক শব্দগুলি। যেমন- ক্যাভালরি, ইনফ্যান্ট্রি ইত্যাদি।

30/01/2018