বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর আদর্শ স্বপ্ন লীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।

বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর আদর্শ স্বপ্ন লীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।

Share

Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর আদর্শ স্বপ্ন লীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।, Political Party, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ,গুলিস্তান, ঢ, Dhaka.

05/02/2021

পাচারে: বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর আদর্শ স্বপ্ন লীগ।
----------------------------------------------
বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা

৭ই জুন ৬-দফা দিবস হিসেবে আমরা পালন করি। ২০২০ সাল বাঙালির জীবনে এক অনন্য বছর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমাদের অর্থাৎ বাংলাদেশের জনগণের জন্য এ বছরটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে ব্যাপক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বব্যাপী প্রবাসী বাঙালিরাও প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। ইউনেস্কো এ দিবসটি উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশগুলো প্রস্তুতি নিয়েছিল। জাতিসংঘ ইতোমধ্যে একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে।
যখন এমন ব্যাপক আয়োজন চলছে, তখনই বিশ্বব্যাপী এক মহামারি দেখা দিলো। করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ নামক এক সংক্রামক ব্যাধি বিশ্ববাসীকে এমনভাবে সংক্রমিত করছে যে, বিশ্বের প্রায় সকল দেশই এর দ্বারা আক্রান্ত এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সকল কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশও এ ভাইরাস থেকে মুক্ত নয়। এমতাবস্থায়, আমরা জনস্বার্থে সকল কার্যক্রম, বিশেষ করে যেখানে জনসমাগম হতে পারে, সে ধরনের কর্মসূচি বাতিল করে দিয়ে কেবল রেডিও, টেলিভিশন বা ডিজিটাল মাধ্যমে কর্মসূচি পালন করছি।

১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তি সনদ ৬-দফা ঘোষণা দিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমি পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, শ্রদ্ধা জানাই আমার মা বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুননেসাকে। ৭ই জুনের কর্মসূচি সফল করতে তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। স্মরণ করি ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট শাহাদাতবরণকারী আমার পরিবারের সদস্যদের। শ্রদ্ধা জানাই জাতীয় ৪ নেতাকে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদ ও নির্যাতিত মা-বোনকে।

৬-দফা দাবির আত্মপ্রকাশ

১৯৬৬ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর বাসভবনে কাউন্সিল মুসলিম লীগের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আফজালের সভাপতিত্বে বিরোধী দলের সম্মেলন শুরু হয়। সাবজেক্ট কমিটির এই সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয়-দফা দাবি পেশ করেন। প্রস্তাব গৃহীত হয় না। পূর্ব বাংলার ফরিদ আহমদও প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন।

৬ই ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েকটি পত্রিকা এ দাবি সম্পর্কে উল্লেখ করে বলে যে, পাকিস্তানের দুটি অংশ বিচ্ছিন্ন করার জন্যই ৬-দফা দাবি আনা হয়েছে। ১০ই ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাংবাদিক সম্মেলন করে এর জবাব দেন। ১১ই ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। বিমানবন্দরেই তিনি সাংবাদিকদের সামনে ৬-দফা সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরেন।

৬-দফা দাবিতে পাকিস্তানের প্রত্যেক প্রদেশকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের অন্যান্য রাজনৈতিক দল এ দাবি গ্রহণ বা আলোচনা করতেও রাজি হয়নি। বঙ্গবন্ধু ফিরে আসেন ঢাকায়।

আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটিতে ৬-দফা দাবি পাস করা হয়। আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে এ দাবি গ্রহণ করা হয়। ব্যাপকভাবে এ দাবি প্রচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত হয় দলের নেতৃবৃন্দ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান সফর করে জনগণের কাছে এ দাবি তুলে ধরবেন। ৬-দফা দাবির ওপর বঙ্গবন্ধুর লেখা একটি পুস্তিকা দলের সাধারণ সম্পাদকের নামে প্রকাশ করা হয়। লিফলেট, প্যাম্ফলেট, পোস্টার ইত্যাদির মাধ্যমেও এ দাবিনামা জনগণের কাছে তুলে ধরা হয়।

কেন ৬-দফা দাবি

১৯৬৫ সালে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যে যুদ্ধ হয়েছিল সে যুদ্ধের সময় পূর্ববঙ্গ বা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এ অঞ্চলের সুরক্ষার কোনও গুরুত্বই ছিল না। ভারতের দয়ার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল পূর্ব বাংলাকে। ভারত সে সময় যদি পূর্ববঙ্গে ব্যাপক আক্রমণ চালাতো, তাহলে ১২শ’ মাইল দূর থেকে পাকিস্তান কোনোভাবেই এ অঞ্চলকে রক্ষা করতে পারতো না। অপরদিকে তখনকার যুদ্ধের চিত্র যদি পর্যালোচনা করি, তাহলে আমরা দেখি পাকিস্তানের লাহোর পর্যন্ত ভারত দখল করে নিতো যদি না বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিকেরা সাহসের সঙ্গে ভারতের সামরিক আক্রমণের মোকাবিলা করতো।

পূর্ব পাকিস্তানে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর কোনও শক্তিশালী ঘাঁটি কখনও গড়ে তোলা হয়নি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৪ ডিভিশনের একটা হেড কোয়ার্টার ছিল খুবই দুর্বল অবস্থায়। আর সামরিক বাহিনীতে বাঙালির অস্তিত্ব ছিল খুবই সীমিত। ১৯৫৬ সালে দৈনিক ডন পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বাঙালিদের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছিল।



অর্থাৎ পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে সর্বোচ্চ পদে তা-ও লে. কর্নেল পদে মাত্র ২ জন বাঙালি অফিসার ছিলেন। অথচ যুদ্ধের সময় বাঙালি সৈনিকেরাই সবথেকে সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন।

ওই যুদ্ধের পর তাসখন্দে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা তাসখন্দ চুক্তি নামে পরিচিত। সেখানেও পূর্ববঙ্গের স্বার্থের বা নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিত হয়।

একটু পেছন ফিরে তাকালে আমরা দেখি যে বাঙালির বিরুদ্ধে সব সময় পাকিস্তানের শাসকচক্র বৈমাত্রীয়সুলভ আচরণ করেছে।

প্রথম আঘাত হানে বাংলা ভাষা যা আমাদের মাতৃভাষার ওপর। মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত শুরু করে। রক্ত দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করে বাঙালিরা। সে ভাষা আন্দোলন শুরু করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্র শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৮ সালে। মূলত তখন থেকেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানিদের শাসন-শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে হবে।

বাঙালিরা সব সময়ই পশ্চিমাদের থেকে শিক্ষা-দীক্ষা, সাংস্কৃতিক চর্চায় সমৃদ্ধ ছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনেও অগ্রণী ভূমিকা ছিল এ অঞ্চলের মানুষের। জনসংখ্যার দিক থেকেও সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি। ৫৬ ভাগ মানুষের বসবাস ছিল পূর্ববঙ্গে।

পূর্ববঙ্গের উপার্জিত অর্থ কেড়ে নিয়ে গড়ে তোলে পশ্চিম পাকিস্তান। বাঙালিদের ওপর অত্যাচার করাই ছিল শাসকদের একমাত্র কাজ। ১৯৫৪ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অন্যান্য দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে জয়লাভ করে। মুসলিম লীগ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। কিন্তু ৯২ ক ধারা অর্থাৎ ইমার্জেন্সি জারি করে নির্বাচিত সরকার বাতিল করে দেয়। পূর্ববঙ্গে চালু করে কেন্দ্রীয় শাসন। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে যখন ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে তখনও ষড়যন্ত্র থেমে থাকে না। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল’ জারি করে। এভাবেই বারবার আঘাত আসে বাঙালিদের ওপর।

৬-দফার প্রতি জনসমর্থন

আইয়ুব খানের নির্যাতন-নিপীড়নের পটভূমিতে যখন ৬-দফা পেশ করা হয়, অতি দ্রুত এর প্রতি জনসমর্থন বৃদ্ধি পেতে থাকে। আমার মনে হয় পৃথিবীতে এ এক বিরল ঘটনা। কোনও দাবির প্রতি এত দ্রুত জনসমর্থন পাওয়ার ইতিহাস আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সমগ্র পূর্ব বাংলা সফর শুরু করেন। তিনি যে জেলায় জনসভা করতেন সেখানেই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হতো, গ্রেফতার করা হতো। জামিন পেয়ে আবার অন্য জেলায় সভা করতেন। এভাবে পর পর ৮ বার গ্রেফতার হন মাত্র দুই মাসের মধ্যে। এরপর ১৯৬৬ সালের ৮ই মে নারায়ণগঞ্জে জনসভা শেষে ঢাকায় ফিরে আসার পর ধানমন্ডির বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। ৯ই মে তাঁকে কারাগারে প্রেরণ করে। একের পর এক মামলা দিতে থাকে।

একইসঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা শুরু হয়। সমগ্র বাংলাদেশ থেকে ছাত্রনেতা, শ্রমিক নেতাসহ অগণিত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে মামলা দায়ের করে।

১৯৬৬ সালের ১৩ই মে আওয়ামী লীগ প্রতিবাদ দিবস পালন উপলক্ষে জনসভা করে। জনসভায় জনতা ৬-দফার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। ৩০শে মে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির (ওয়ার্কিং কমিটি) সভা হয় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী। ৭ই জুন প্রদেশব্যাপী হরতাল ডাকা হয় এবং হরতাল সফল করার সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এ সময় আওয়ামী লীগের অনেক সভা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির বাড়িতে অনুষ্ঠিত হতো।

৭ই জুনের হরতালকে সফল করতে আমার মা বেগম ফজিলাতুননেসা বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ছাত্রনেতাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করে তিনি দিকনির্দেশনা দেন। শ্রমিক নেতা ও আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সব ধরনের সহযোগিতা করেছিলেন তিনি। পাকিস্তানি শাসকদের দমন-পীড়ন-গ্রেফতার সমানতালে বাড়তে থাকে। এর প্রতিবাদে সর্বস্তরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়। ৬-দফা আন্দোলনের সঙ্গে পূর্ব বাংলার সকল স্তরের মানুষ, রিকশাওয়ালা, স্কুটারওয়ালা, কলকারখানার শ্রমিক, বাস-ট্রাক-বেবিটেক্সি চালক, ভ্যান চালক, দোকানদার, মুটে-মজুর- সকলে এ আন্দোলনে শরিক হয়েছিলেন।

পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ও রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান যেকোনও উপায়ে এই আন্দোলন দমন করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব দেয় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানকে।

কিন্তু তাদের শত নির্যাতন উপেক্ষা করে বাংলাদেশের মানুষ ৭ই জুনের হরতাল পালন করে ৬-দফার প্রতি তাঁদের সমর্থন জানিয়ে দেন। পাকিস্তান সরকার উপযুক্ত জবাব পায়। দুঃখের বিষয় হলো বিনা উসকানিতে জনতার ওপর পুলিশ গুলি চালানো হয়। শ্রমিক নেতা মনু মিয়াসহ ১১ জন নিহত হন। আন্দোলন দমন করতে নির্যাতনের মাত্রা যত বাড়তে থাকে, সাধারণ মানুষ ততবেশি আন্দোলনে শামিল হতে থাকেন।

৭ই জুন হরতাল সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন: ‘‘১২টার পরে খবর পাকাপাকি পাওয়া গেলো যে হরতাল হয়েছে। জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করেছেন। তাঁরা ৬-দফা সমর্থন করে আর মুক্তি চায়। বাঁচতে চায়, খেতে চায়, ব্যক্তিস্বাধীনতা চায়, শ্রমিকের ন্যায্য দাবি, কৃষকদের বাঁচার দাবি তাঁরা চায়, এর প্রমাণ এই হরতালের মধ্যে হয়েই গেল” (কারাগারের রোজনামচা, পৃ. ৬৯)।

১৯৬৬ সালের ১০ ও ১১ই জুন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সভায় হরতাল পালনের মাধ্যমে ৬-দফার প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করায় ছাত্র-শ্রমিক ও সাধারণ জনগণকে ধন্যবাদ জানানো হয়। পূর্ববঙ্গের মানুষ যে স্বায়ত্তশাসন চায়, তারই প্রমাণ এই হরতালের সফলতা। এ জন্য সভায় সন্তোষ প্রকাশ করা হয়। ১৭, ১৮ ও ১৯শে জুন নির্যাতন-নিপীড়ন প্রতিরোধ দিবস পালন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আওয়ামী লীগের সকল নেতাকর্মীর বাড়িতে বাড়িতে কালো পতাকা উত্তোলন এবং তিন দিন সকলে কালো ব্যাজ পরবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। হরতালে নিহতদের পরিবারগুলোকে আর্থিক সাহায্য এবং আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য একটা তহবিল গঠন এবং মামলা পরিচালনা ও জামিনের জন্য আওয়ামী লীগের আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি আইনগত সহায়তা কমিটি গঠন করা হয়। দলের তহবিল থেকে সব ধরনের খরচ বহন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। আন্দোলনের সকল কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালন করারও নির্দেশনা দেওয়া হয়।

৬-দফা দাবির ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন আরও ব্যাপকভাবে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সভা, সমাবেশ, প্রতিবাদ মিছিল, প্রচারপত্র বিলিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এই দাবির প্রতি ব্যাপক জনমত গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু হয়।

এদিকে সরকারি নির্যাতনও বৃদ্ধি পেতে থাকে। তবে যত বেশি নির্যাতন আইয়ুব-মোনায়েম গং চালাতে থাকে, জনগণ তত বেশি তাদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং সকল নিপীড়ন উপেক্ষা করে আরও সংগঠিত হতে থাকেন।

১৯৬৬ সালের ২৩ ও ২৪শে জুলাই আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং আন্দোলন দ্বিতীয় ধাপে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ আন্দোলন কেন্দ্র থেকে জেলা, মহকুমা ও ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, তীব্রতর হতে থাকে।

সরকারও নির্যাতনের মাত্রা বাড়াতে থাকে। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্তদের একের পর এক গ্রেফতার করতে থাকে। অবশেষে একমাত্র মহিলা সম্পাদিকা অবশিষ্ট ছিলেন। আমার মা সিদ্ধান্ত দিলেন তাঁকেই ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হোক। আওয়ামী লীগ সে পদক্ষেপ নেয়।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা

পাকিস্তান সরকার নতুন চক্রান্ত শুরু করলো। ১৯৬৮ সালের ১৮ই জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে নিয়ে যায়। অত্যন্ত গোপনে রাতের অন্ধকারে সেনাবাহিনীর দ্বারা এ কাজ করানো হয়। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেওয়া হয়, যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে অধিক পরিচিতি পায়।

এই মামলায় ১ নম্বর আসামি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর সঙ্গে আরও ৩৪ জন সামরিক ও বেসামরিক অফিসার ও ব্যক্তিকে আসামি করে।

অপরদিকে ৬-দফা দাবি নস্যাৎ করতে পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু নেতা দিয়ে ৮-দফা নামে আরেকটি দাবি উত্থাপন করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়। তবে এতে তেমন কাজ হয় না। উঁচুস্তরের কিছু নেতা বিভ্রান্ত হলেও ছাত্র-জনতা বঙ্গবন্ধুর ৬-দফার প্রতিই ঐক্যবদ্ধ থাকেন।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা অর্থাৎ রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান মামলার মূল অভিযোগ ছিল যে, আসামিরা সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এ কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বক্তব্য ছিল: আমরা পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৫৬ ভাগ, সংখ্যাগুরু। আমরা বিচ্ছিন্ন হবো কেন? আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার চাই, স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই। যারা সংখ্যালঘিষ্ঠ, তারা বিচ্ছিন্ন হতে পারে, সংখ্যাগরিষ্ঠরা নয়।

এই মামলা দেওয়ার ফলে আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করে। বাংলার মানুষের মনে স্বাধীনতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা ও চেতনা শানিত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলা হয়। ছাত্ররা ৬-দফাসহ ১১-দফা দাবি উত্থাপন করে আন্দোলনকে আরও বেগবান করে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জেলা, মহকুমায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

ক্যান্টনমেন্টের ভিতরেই কোর্ট বসিয়ে মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করা শুরু হয়। অপরদিকে জেল, জুলুম, গুলি, ছাত্র হত্যা, শিক্ষক হত্যাসহ নানা নিপীড়ন ও দমন চালাতে থাকে আইয়ুব সরকার।

পাকিস্তানি সরকারের পুলিশি নির্যাতন, নিপীড়ন ও দমনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শুরু করে। তাঁরা রাস্তায় নেমে আসে। সরকারপন্থী সংবাদপত্র থেকে শুরু করে থানা, ব্যাংক, সরকারের প্রশাসনিক দফতরে পর্যন্ত হামলা চালাতে শুরু করে। সমগ্র বাংলাদেশ তখন অগ্নিগর্ভে পরিণত হয়।

‘আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করো, জেলের তালা ভাঙবো শেখ মুজিবকে আনবো, শেখ মুজিবের মুক্তি চাই’ - এ ধরনের স্লোগানে স্লোগানে স্কুলের ছাত্ররাও রাস্তায় নেমে আসে। এরই একপর্যায়ে ১৯৬৯ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি এই মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে বন্দিখানায় হত্যা করা হয়। মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তাঁদের আশঙ্কা হয় এভাবে শেখ মুজিবকেও হত্যা করবে। সাধারণ মানুষ ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করতে অগ্রসর হয়। জনতা মামলার বিচারক প্রধান বিচারপতির বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে পালিয়ে যান।

প্রচণ্ড গণআন্দোলনের মুখে ২১শে ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান আগড়তলা মামলা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। ২২শে ফেব্রুয়ারি দুপুরে একটা সামরিক জিপে করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ধানমন্ডির বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয় অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে। অন্য বন্দিদেরও মুক্তি দেয়।

ভাষা আন্দোলন-স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা: ৬ দফার সফলতা

গণআন্দোলনে আইয়ুব সরকারের পতন ঘটে। ক্ষমতা দখল করে সেনাপ্রধান ইয়াহিয়া খান। ৬-দফার ভিত্তিতে ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সমগ্র পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

১৯৭০ সালের ৫ই ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘোষণা দেন পূর্ব পাকিস্তানের নাম হবে ‘বাংলাদেশ’।

কিন্তু বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশের মানুষ তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন।

অসহযোগ আন্দোলন থেকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জন করে বাঙালি জাতি। ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি সামরিক জান্তা গণহত্যা শুরু করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ৯ মাসের যুদ্ধ শেষে ১৬ই ডিসেম্বর বাঙালি চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। বাঙালিরা একটি জাতি হিসেবে বিশ্বে মর্যাদা পায়, পায় জাতি-রাষ্ট্র, স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ।

লেখক: শেখ হাসিনা
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী

31/01/2021

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ স্বপ্ন লীগ কেন্দ্রীয় কমিটি
---------------------------------------------------------
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে নিয়ে
এক বছরে ঘুড়ে দাঁড়ান বঙ্গবন্ধু

⚫ কৃষি ও সমবায়ের মাধ্যমে শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ার পরিকল্পনা

⦿ প্রথমবারের মতো গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালু
⦿ দুই স্তর বিশিষ্ট সমবায় ব্যবস্থা
⦿ তাঁত শিল্প সরঞ্জাম আমদানিতে আইন প্রণয়ন
⦿ ইরি ২০ জাতীয় ধানের ছয় লাখ মণ বীজ বিতরণ। ইরি ৮ জাতীয় ধানের
দুই লাখ মণ বীজ বিতরণ
⦿ মিল্ক ভিটা প্রতিষ্ঠা, যা আজও দেশের ৭০ ভাগ তরল দুধের জোগান দিচ্ছে

30/01/2021

প্রচারে: বঙ্গবন্ধুর আদর্শ স্বপ্ন লীগ।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে নিয়ে
এক বছরে ঘুড়ে দাঁড়ান বঙ্গবন্ধু

⚫ কৃষি ও সমবায়ের মাধ্যমে শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ার পরিকল্পনা

⦿ প্রথমবারের মতো গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালু
⦿ দুই স্তর বিশিষ্ট সমবায় ব্যবস্থা
⦿ তাঁত শিল্প সরঞ্জাম আমদানিতে আইন প্রণয়ন
⦿ ইরি ২০ জাতীয় ধানের ছয় লাখ মণ বীজ বিতরণ। ইরি ৮ জাতীয় ধানের
দুই লাখ মণ বীজ বিতরণ
⦿ মিল্ক ভিটা প্রতিষ্ঠা, যা আজও দেশের ৭০ ভাগ তরল দুধের জোগান দিচ্ছে

28/01/2021

বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িকতা উপমহাদেশের জন্য শিক্ষনীয়ঃ অমর্ত্য সেন

সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা এবং ধর্মকে রাজনীতির বাইরে রাখার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে মতাদর্শ, তা এখনও সারা পৃথিবীর জন্য প্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেছেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বুধবার লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের সাউথ এশিয়া সেন্টার আয়োজিত এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় বক্তব্যে একথা বলেন তিনি।

অমর্ত্য সেন বলেন, “ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার না করার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর শক্তিশালী স্বতন্ত্র যে ধরন ছিল, বর্তমান সময়ে তার বিস্তৃত ব্যবহার রয়েছে। যা কেবল বাংলার জন্য নয়, সারা পৃথিবীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”

বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান প্রণয়নে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাকে বিশেষভাবে উপস্থাপনের প্রসঙ্গ বক্তৃতায় তুলে ধরেন তিনি।

অমর্ত্য সেন বলেন, “বঙ্গবন্ধুর সেকুলারিজম ধারণার মানে মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকবে না, এমন নয়। সেটা ছিল ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার হবে না।

“সংবিধান প্রণয়নের সময় বলা হয়েছিল, এটা এমন নয় আমরা ধর্মপালন বন্ধ করব। মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ সবাই তার ধর্ম পালন করবে। কেবল ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ থাকবে।”
বঙ্গবন্ধুর দর্শনের কথা বলতে গিয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়ে ষোড়শ শতকের সম্রাট আকবরের মতাদর্শের প্রসঙ্গেও অমর্ত্য সেন বলেন।

তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধু ও আকবরের মতাদর্শ এখনও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটা কেবল ভারতে ব্যবহৃত হতে পারে তা নয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও প্রাসঙ্গিক।

“ইউরোপ-আমেরিকার রাজনৈতিক আলোচনায় তাদের ধারণার ব্যবহার হতে পারে। এটা হয়ত কেবল ধর্মীয় দিক থেকে নয়, বর্ণবাদ ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর অধিকারের আলোচনায়ও আসতে পারে।”

বঙ্গবন্ধুকে ‘বিশ্ববন্ধু’ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তার মতাদর্শ থেকে শেখা ও অনুসরণের মাধ্যমে সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য সুফল বয়ে আনা দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।

১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে অনিশ্চিত ভোটারের সামনে সমতার ধারণা তুলে ধরার কথা উল্লেখ করে অমর্ত্য সেন বলেন, “সমতাবাদী এই নীতিতে আওয়ামী লীগের সেক্যুলার অবস্থান ভোটে জিতে আসতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। কারণ এর পেছনে ছিল জনমত গঠনের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ ক্ষমতা।”

আলোচনায় অংশ নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, “বঙ্গবন্ধুর সমাজতন্ত্রের ধারণা এসেছে তার উদঘাটিত অভিজ্ঞতার আলোকে। কারণ তিনি তৃণমূল থেকে কেন্দ্রে তার রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ করেছেন।”

এক্ষেত্রে পায়ে হেঁটে বঙ্গবন্ধুর গ্রামে-গঞ্জে পরিভ্রমণ কিংবা নিম্ন শ্রেণির কামরায় রেলভ্রমণের প্রসঙ্গ টানেন তিনি।

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের এই সদস্য বলেন, “বঙ্গবন্ধু তার নীতি পরামর্শ হিসাবে বার বার আমাদের কাছে গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন, কোনো পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক নীতি কিংবা সমাজ গঠন করা যাবে না, যা সুযোগ-সুবিধা দেবে বাঙালি মধ্যবিত্তকে, যারা অচিরেই শাসক শ্রেণি হয়ে উঠতে যাচ্ছে।

“আমাদেরকে এমন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণই হবে সম্পদ তৈরি এবং উপকারভোগী হওয়ার ক্ষেত্রে অংশীদার ও শাসক। এটা ছিল বঙ্গবন্ধুর মূল এজেন্ডা।”

এ ধরনের সামাজিক পরিবর্তনের কারণে অভিজাত শ্রেণি অনেক ক্ষেত্রে তাকে মেনে নিতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন রেহমান সোবহান।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের পরিচালক অধ্যাপক মিনোশ শফিকের সঞ্চালনায় আলোচনা অনুষ্ঠানে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের সাউথ এশিয়া সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক আল নূর ভিমানি এবং যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাই কমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিম বক্তব্য দেন।

28/01/2021

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ স্বপ্ন লীগের কমিটি দেওয়া হবে জেলা এবং থানায়।
বঙ্গবন্ধুর আদর্শে আদর্শিত নেতা-নেত্রীদের কে বিনীত ভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে যোগাযোগ করার জন্য।

(আদেশক্রমে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি)

একটি অনুমোদনকৃত এবং রেজিস্ট্রেশন কৃত সংগঠন।

28/01/2021

পাচারে: বঙ্গবন্ধুর আদর্শ স্বপ্ন লীগ।

মানুষের হারানো সম্পদ ফিরিয়ে দিতে আইন করেন বঙ্গবন্ধু
শরণার্থী এবং দুস্থদের জন্য ব্যাপক পুনর্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়েও সরকার অপর একটি ঘোরতর সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং এর জন্য নতুন একটি বিশেষ আইন প্রণয়ন করতে হয়। যুদ্ধকালে বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন এমন অসংখ্য শরণার্থী, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা দেশে ফিরে কেবল তাদের ঘরবাড়ি ও সহায়-সম্পদ বিধ্বস্ত অবস্থায়ই পাননি, অনেকেই দেখতে পান যে তাদের অবর্তমানে তাদের বাড়িঘর ও সম্পত্তি অন্যরা ভোগ করছেন। অনেক ক্ষেত্রে পাকিস্তান সরকার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে দিয়েছিল এবং এত দিন তা ছিল অন্যদের দখলে। যাদের সম্পত্তি এভাবে হস্তান্তর করা হয়েছিল, তাদের অধিকাংশ ছিলেন আওয়ামী লীগের। তাদের হৃত সম্পত্তি পুনর্দখল ও পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে গিয়ে সরকার ১৯৭২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ হৃত সম্পত্তি পুনরুদ্ধার আদেশ ১৯৭২ (Restoration of Evacuee Property) জারি করে। ১৯৭৪ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত তা বলবৎ থাকবে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়।
সূত্র: বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ নির্মাণ (পৃষ্ঠা: ৪৮)

27/01/2021

দেশ পুনর্গঠনে প্রত্যেকের সমান দায়িত্ব রয়েছে।

-বঙ্গবন্ধু

(এক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে বক্তৃতাকালে, ২২ জানুয়ারি ১৯৭৩)

26/01/2021

বাকশাল: ঐতিহাসিক জনআকাঙ্ক্ষা পূরণের চূড়ান্ত পদক্ষেপ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রাম ও ৯ মাস স্বাধীনতা যুদ্ধের পর অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় অর্জিত হয়। কিন্তু দেশ গঠনের শুরুতেই দেখা দেয় বহুমুখী প্রতিবন্ধকতা। একদিকে যেমন দীর্ঘদিনের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত, সদ্য স্বাধীন একটা জাতির, স্বপ্নের মতো জীবনযাপনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল; তেমনি অন্যদিকে, তাৎক্ষণিকভাবে সাত কোটি মানুষকে তাদের স্বপ্নের মতো সমাজব্যবস্থা উপহার দেওয়ার সক্ষমতা ছিল না রাষ্ট্রের। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু যে বাংলাদেশ পেয়েছিলেন, সেখানে ছিল না কোনো রাস্তা-ঘাট-ব্রিজ-কালভার্ট-নদী ও সমুদ্রবন্দর, ছিল না প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, এমনকি রাষ্ট্রের কোষাগারেও ছিল না কোনো নগদ অর্থ। শুধু আগুন ও বোমায় পোড়া এক ভূখণ্ড, ত্রিশ লাখ মানুষের লাশের স্তূপ, কমপক্ষে তিন কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষ- এসব নিয়েই আবারো ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য দিনরাত শ্রম দিচ্ছিলেন স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমান। দুই যুগের বেশি সময় ধরে এই জাতি যেরকম জীবনযাপনের জন্য বারবার ম্যান্ডেট দিয়েছে, ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে ঠিক সেরকম সমাজব্যবস্থা কায়েমের জন্য কাজ শুরু করলেন বঙ্গবন্ধু।
কিন্তু দেশ গঠনের কাজ ক্রমেই কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি জান্তারা এদেশের লাখ লাখ কর্মঠ ও সক্ষম মানুষকে যেমন হত্যা করে, তেমনি ধ্বংস করে দেয় পুরো দেশের অর্থনীতি, যোগাযোগব্যবস্থা ও শিক্ষা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান। যুদ্ধের ৯ মাসে বাংলাদেশ থেকে প্রায় হাজার কোটি টাকা পাচার করে পাকিস্তানিরা এবং ঢাকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে থাকা স্বর্ণ-রৌপ্যসহ সব নগদ অর্থ পুড়িয়ে ফেলে। ফলে তারল্য সংকট দেখা দেয়। প্রকৃত অর্থেই শূন্য হাতে যাত্রা শুরু হয় সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের।
উগ্র বাম-প্রতিক্রিয়াশীল-ভ্রান্ত প্রতিবিপ্লবী ও স্বাধীনতাবিরোধিদের ষড়যন্ত্র
একদিকে সর্বশান্ত অবস্থা, অন্যদিকে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়ায়- পরাজিত পাকিস্তানিদের দোসর ও এদেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের চক্রান্ত। পাকিস্তানিদের দিয়ে যাওয়া অস্ত্র ব্যবহার করে দেশে অস্থিরতা ও গুপ্তহত্যা শুরু করে মাওবাদী উগ্র বামপন্থীরা। মুক্তিযুদ্ধের পর অস্ত্র জমা না দিয়ে মধ্যবিত্তদের খুন ও তাদের সম্পদ লুটতরাজ শুরু করে সর্বহারারা। মুজিব বাহিনীর একটা তরুণ অংশ ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে প্রতিবিপ্লব করে জাসদ গঠন করে এবং দেশজুড়ে অরাজকতা সৃষ্টি করে। এমনকি ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালের প্রলংকারী বন্যা, যুদ্ধ-পরিস্থিতি ও বন্যায় টানা কয়েক বছর ফসলহানি, চোরাচালান ও মজুতদারি, বিশ্বমন্দা ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের কারণে ১৯৭৪ সালে যখন তুমুল দুর্ভিক্ষ শুরু হয় দেশে; বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ সরকার যখন এই দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যস্ত সময় পার করছিলেন; ঠিক সেই সময়টাতেই সশস্ত্র গণবাহিনী গঠন করে অপহরণ-হামলা-হত্যাযজ্ঞ শুরু করে জাসদ।
স্বাধীনতার পরবর্তী দুই বছরে কমপক্ষে দুই হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে খুন, পাঁচ হাজারের বেশি গুপ্তহত্যা এবং ৬০টির বেশি থানায় হামলা চালিয়ে অস্ত্র লুট করে এই উগ্রবাম ও প্রতিক্রিয়াশীল ঘাতক চক্র। এদের কারণে ফের সক্রিয় হয়ে ওঠে পরাজিত স্বাধীনতাবিরোধীরা। দেশের সার্বিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে গড়ে ওঠে একটা ফাটকাবাজ শ্রেণি। এমনকি দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে নিজ দলের ৪৪ জন এমএনএ এবং এমসিএকেও বহিষ্কার করেছেন বঙ্গবন্ধু।
হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যেও থেমে থাকেননি বঙ্গবন্ধু
শূন্য সম্পদ নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টার পাশাপাশি একশ্রেণির ভ্রান্ত তারুণ্য ও উগ্রবাদীদের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থির অবনতি হলেও হাল ছেড়ে দেননি বঙ্গবন্ধু। তিনি একাধিকবার তাদের সঠিক পথে ফেরার সুযোগ দিয়েছেন, সহিংসতা ছেড়ে দেশ গঠনের কাজে নামার আহ্বান জানিয়েছেন, ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। কিন্তু বিপরীতে তারা আরও প্রতিক্রিয়াশীলতা দেখিয়েছে। এসব কিছুর মধ্যেও ভারত থেকে প্রত্যাগত এক কোটি শরণার্থী এবং যুদ্ধের কারণে দেশের ভেতরে বাস্তুচ্যুত ও স্থানান্তরিত আরও দুই কোটি মানুষকে পুনর্বাসন করে বঙ্গবন্ধুর সরকার। নির্মাণ করা হয় পাকিস্তানিদের পুড়িয়ে দেওয়া ৪৩ লাখ ঘরবাড়ি। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় ধর্ষণের শিকার দুই লাখের অধিক নারী ও তাদের গর্ভের সন্তানের। সংস্কার করা হয় প্রয়োজনীয় রাস্তা-ঘাট; ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রায় ছয়শ' সড়ক ও রেল সেতু চলাচলের উপযোগী করা হয়। এই সময়ের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক তৎপরতায় ১১৬টি দেশের স্বীকৃতি এবং জাতিসংঘ-ওআইসিসহ২৭ টি আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ অর্জন করে বিশ্বের বুকে পা রাখার জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ। তবে প্রথমবারের মতো পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ঘোষণা করে দেশ গঠনের যে প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে তা পদে পদে বাধাগ্রস্ত হয়।
প্রায় তিন বছর ধরে ধৈর্যের সঙ্গে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করেও, দেশ পুনর্গঠনের কাজ অনেকটাই গুছিয়ে আনেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু দেশের মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের মতো সমাজব্যবস্থা গড়তে যে পরিবেশ দরকার, প্রতিক্রিয়াশীলদের অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য তা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছিলো না। তাই অস্থিরতা দূরীকরণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করে, দেশকে দ্রুত গুছিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর তিনি সংবিধানসম্মতভাবে রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ জানান জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে। এরপর জনজীবনের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে দ্বিতীয় বিপ্লবের ঘোষণা দেন।
জাতীয় ঐক্যের ঘোষণা
১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদের অনুমোদন নিয়ে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী আনেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। এক নতুন ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার দিকে যাত্রা শুরু করে দেশ। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে, সাংবিধানিকভাবে সংগঠিত এবং মূলধারার সব রাজনৈতিক দলকে তিনি একত্রে একটি পাটাতনে আনেন, স্পষ্টভাবেই এটি ছিল জাতীয় ঐক্য গঠনের উদ্যোগ। এটি উল্লেখ্য যে, ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চের নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩ আসনে জেতা আওয়ামী লীগকে পর্যন্ত বিলুপ্ত করে সব দলের সমন্বয়ে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক লীগ বা বাকশাল গঠন করেন বঙ্গবন্ধু।
সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করা, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে গতিশীল করা, গণমানুষের দীর্ঘদিনের চাহিদা অনুযায়ী বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা কায়েম, অসাম্প্রদায়িক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্যই তিনি এই সংস্কারের ঘোষণা দেন। স্বাধীনতা অর্জন যেমন বাঙালির প্রথম বিপ্লব ছিল, তেমনি সেই স্বাধীনতার সুফল ভোগ করার জন্য সমৃদ্ধি অর্জনের দ্বিতীয় বিপ্লব ছিল এটি। পূর্ণ অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমে শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলার দুখি মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন তিনি। এজন্যই জাতীয় ঐক্যের ঘোষণা দিয়ে জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, সরকারি কর্মচারী, সামরিক বাহিনীর সদস্যসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে বাকশালের সদস্য করা হয়।
বাকশালের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু যেসব কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন সেগুলো হলো: দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, বৈষম্যহীন-অসাম্প্রদায়িক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম, সামাজিক সাম্য ও সুবিচার নিশ্চিত, দেশের ৮০ ভাগ গ্রামীণ মানুষের জন্য কৃষিভিত্তিক উন্নয়ন, বহুমুখী সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, ভূমি ব্যবস্থা সংস্কারের মাধ্যমে দেশের কৃষক-শ্রমিকদের জন্য ভূমি ও অধিকার নিশ্চিতকরণ, শাসন ও বিচার ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে মানুষের দুর্ভোগ কমানো এবং সুশাসন নিশ্চিত করা, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে শক্তিশালী নতুনপ্রজন্ম গঠন প্রভৃতি।
জাতীয় ঐক্য এবং দ্বিতীয় বিপ্লবের ঘোষণা দেওয়ার পর সাড়ে চার মাসের মধ্যে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। ঊর্ধ্বগামী দ্রব্যমূল্য অনেক হ্রাস পায়। সার্বিকভাবেই পরিস্থিতির উত্তরণ হতে শুরু করছিল।
বাকশাল: সমাজব্যবস্থা বদলে দেওয়ার ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিক্রিয়াশীলদের অপপ্রচার
'বাকশাল' বাঙালি জাতির ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দেশের মানুষের ঐতিহাসিক চাহিদা ও জনআকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য ১৯৭৫ সালে এই ব্যবস্থার উদ্যোগ নিয়েছিলেন দেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। এই ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য একটি বৈশিষ্ট্য ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত গণতন্ত্রীকরণ। দেশকে পুনর্গঠনের জন্য ৬১ জেলায় ভাগ করা হয়েছিল। প্রত্যেকটি জেলার প্রধান একজন করে গভর্নর। ১৯৭৫ সালের ১৬ জুলাই তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। ৬১ জন গভর্নরের মধ্যে ৩৩ জন ছিলেন সংসদ সদস্য, ১৩ জন ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী, একজন সামরিক কর্মকর্তা এবং বাকি ১৪ জন বিভিন্ন ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যক্তি হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন।
এছাড়াও উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে করা হয়েছিল প্রশাসনিক কাউন্সিল। স্থানীয়ভাবে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করার জন্য সরকারি-বেসরকারি কর্মচারি, রাজনৈতিক নেতানেত্রী, সংসদ সদস্য, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় তরুণ-যুবকদের সদস্য করে এসব জেলা ও উপজেলা কাউন্সিল গঠনের বিধান করা হয়। এমনকি বিচারব্যবস্থার সংষ্কার করে উপজেলা পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে সুবিচার নিশ্চিতের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
এই বিপ্লবের অন্যতম আরেকটি দিক ছিলো অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গ্রামভিত্তিক সমবায় উৎপাদনব্যবস্থা চালু করা। যার মাধ্যমে দেশের ৬৫ হাজার গ্রামের প্রতিটিতে বহুমুখী সমবায় গঠন এবং জমির মালিকানা হস্তান্তর না করে যৌথ উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে জমির মালিকেরা ছাড়াও গ্রামের প্রতিটি কর্মক্ষম মানুষ সমবায়ের সদস্য হয়ে উৎপাদন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারেন। সরকারি বরাদ্দের অর্থ, সার, টেস্ট রিলিফ ও ওয়ার্কস প্রোগ্রাম সরাসরি সমবায়ের কাছে পৌঁছানো, যাতে সেগুলো প্রকৃত প্রাপকদের কাছে পৌঁছায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বিলোপ করা যায়। উৎপাদিত ফসল জমির মালিক, সমবায় এবং রাষ্ট্রের মধ্যে আনুপাতিক হারে বণ্টন করার মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক সমাজকাঠামোকে শক্তিশালী করা।
১৯৭৫ সালের ২১ জুলাই বঙ্গবন্ধু নবনির্বাচিত গভর্নরদের জন্য প্রশিক্ষণ উদ্বোধন করেন। তিন সপ্তাহ পর, ১৬ আগস্ট, নিজ নিজ জেলার প্রশাসনিক দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল তাদের। মূলত সেদিন থেকেই এই দ্বিতীয় বিপ্লবের বাস্তবায়ন শুরু হতো। কিন্তু ১৫ আগস্ট দেশবিরোধী চক্র কর্তৃক বঙ্গবন্ধুকে বর্বরোচিতভাবে সপরিবারে হত্যার পর দেশ ও মানুষের ভাগ্য বদলের এই বিপ্লব বিনষ্ট হয়ে যায়। সংবিধানকে পদদলিত করে দেশকে অন্ধকারের চাদরে ঢেকে ফেলে সামরিক জান্তা এবং তাদের সহযোগী স্বাধীনতাবিরোধীরা। পরবর্তীতে এই চক্রই মানুষকে দুর্ভোগের মধ্যে রেখে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার লোভে 'সমাজব্যবস্থা বদলের ব্যবস্থাপনা' তথা 'বাকশাল' নিয়ে অপপ্রচার চালাতে শুরু করে।
বাকশাল গঠনের মাধ্যমে, বঙ্গবন্ধু- দেশ ও মানুষের দীর্ঘ দিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য, সংবিধানের চার মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে, একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু এটি বাস্তবায়িত হলে গণতন্ত্রকে অবদমন করা রাখা সম্ভব হতো না, অর্জিত হতো সামাজিক ন্যায় ও সাম্য, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সম্প্রীতির বাংলাদেশ প্রতিটি নাগরিক তীব্র জাতীয়তাবোধে উন্মুখ হয়ে কাজ করতো দেশের জন্য; যার দ্বারা উন্নত জীবনের সুবিধা পেতো প্রতিটি পরিবার। কিন্তু এই বিপ্লব সফল হলে পাকিস্তানিদের জান্তাদের ভূত হয়ে চেপে বসা স্বৈরাচারেরা সুবিধা করতে পারতো না, ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ হয়ে যেতো কট্টর উগ্রবাদীদের, বাংলাদেশকে মাথা উঁচু করে বিশ্বের বুকে চলতে দেখলে পরাজিত রাজাকারদের ঘুম হতো না। তাই সবাই চক্র একসঙ্গে হাত মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশে দমনপীড়ন চালাতে শুরু করে আওয়ামী লীগ নেতাদের ওপর। এরপর একচেটিয়াভাবে বছর পর বছর ধরে দেশজুড়ে অপপ্রচার চালায় বাকশাল নিয়ে। এই অশুভ শক্তির প্রোপাগাণ্ডার কারণে বাকশালে সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্যই আর জানতে পারেনি মানুষ। নতুন প্রজন্মের অধিকাংশই বাকশালের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এবং এর সঙ্গে জনগণের ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষার সম্পর্কের ব্যাপারে কিছুই জানে না।
বাঙালির ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষা সঙ্গে বাকশালের সম্পর্ক:
বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে, দীর্ঘ সময়ের শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে গণমানুষ সবসময় যা চেয়েছে; সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্যই বাকশাল করতে হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে শোষিত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু শোষকদের কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। মানুষের সেই দাবিগুলো পূরণ করাই ছিল বাকশালের উদ্দেশ্য। বাংলার মানুষের ঐতিহাসিক চাহিদা এবং বাকশালের সম্পর্ক খুঁজতে, আসুন একবার ইতিহাসের পাতা থেকে ঘুরে আসি।
পশ্চিম পাকিস্তানিদের বৈষম্য ও আগ্রাসনের শিকার হয় সাত কোটি বাঙালি। ধর্মের নামে আমাদের সঙ্গে যে ফাটকাবাজি করা হয়েছে, তা স্পষ্ট হতে থাকে। দীর্ঘ প্রায় দুই যুগের শোষণে, শ্মশানে পরিণত হয় সোনার বাংলা। একপর্যায়ে পশ্চিম পাকিস্তানি জান্তা ও মুসলিম লীগের শোষণ থেকে বাঁচার জন্য একতাবদ্ধ হয় সবাই। ১৯৫৪ সালে সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা, ভাসানী ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রাদেশিক নির্বাচনে অংশ নেয় যুক্তফ্রন্ট। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে ২১৫টিতে জয়লাভ করে এই জোট। মানুষ কেনো এতো ভোটে বিজয়ী করেছিল যুক্কফ্রন্টকে? যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের ইশতেহারে মানুষের জন্য করতে চেয়েছিল, তা দেখলেই কারণটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও রাষ্ট্রভাষা বাংলা ছাড়াও এই ইশতেহারে সমাজব্যবস্থা পরিবর্তনের অঙ্গীকার করা হয়। মানুষের জীবনমান বদলের জন্য যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় তারমধ্যে অন্যতম হলো: ভূমি ব্যবস্থার সংস্কার করে কৃষকদের অধিকার নিশ্চিত করা, কৃষিতে সমবায় প্রথা চালুর মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি, খাল খনন ও সেঁচ ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, কুটির ও লবণ শিল্পের উন্নয়ন, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রভৃতি।
কিন্তু বিশাল ভোটে জেতার পর সরকার গঠনের দুই সপ্তাহের মাথায় ষড়যন্ত্র করে পূর্ব বাংলায় কেন্দ্রের শাসন জারি এবং বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। ফলে কোটি কোটি বাঙালির তীব্র আকাঙ্ক্ষাগুলো আর পূরণ হলো না। পরবর্তীতে আরও শোষণ বাড়তে থাকে। ফলে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলায়, ১৯৬৪ সাল থেকে খাদ্যঘাটতি শুরু হয়। অর্থনেতিক ও প্রশাসনিক আগ্রাসনে শ্মশানে পরিণত হতে থাকে আমাদের জন্মভূমি।
এরপর দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের একপর্যায়ে ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবার বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্বে শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের ইশতেহার ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ। এই ইশতেহারে যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয় সেগুলো হলো: মানুষের মর্যাদাময় জীবন, সামাজিক ন্যায় ও সাম্য, গ্রামের জনগণের উন্নয়নের অগ্রাধিকার, কৃষি ও ভূমি পদ্ধতির আমূল সংস্কার, সমবায়ের মাধ্যমে কৃষি বিপ্লব, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পানি ব্যবস্থাপনা সংস্কার, কৃষক ও শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতকরণ। এসব আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য এবারও স্বতঃস্ফূর্তভাবে জনগণ নৌকা মার্কায় ভোট দেয়। যার ফলে জাতীয় পরিষদে মোট ১৬৭ আসনে জিতে অখণ্ড পাকিস্তানের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সরকার গঠনের অধিকার লাভ করে আওয়ামী লীগ। কিন্তু এবারও বিধিবাম! পাকিস্তানি জান্তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিকে সরকার গঠন করতে না দিয়ে, উল্টো রাতের অন্ধকারে শুরু করে ইতিহাসের বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ।
মোট কথা, বাংলার মানুষ যেসব অধিকার ও দাবি আদায়ের জন্য ১৯৫৪, ১৯৭০ ও ১৯৭৩ এর নির্বাচনে একচেটিয়াভাবে নৌকা মার্কা ও বঙ্গবন্ধুকে ভোট দিয়েছে, সেসব দাবি পূরণের চূড়ান্ত উদ্যোগ ও মহাপরিকল্পনার নামই ছিল ‘বাকশাল’। কিন্তু যারা বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্ব মেনে নিতে পারেনি; তারাই উন্নয়ন, সমাজব্যবস্থা ও মানুষের জীবনমান বদলানোর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করে গেছে। তাই তারা দেশ গঠনের মহাপরিকল্পনা নিয়ে নিয়মিত অপপ্রচার চালিয়েছে। অথচ এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ হয়তো অনেক আগেই কৃষি ও শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছে যেতো।

Want your business to be the top-listed Government Service in Dhaka?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Category

Website

Address


বঙ্গবন্ধু এভিনিউ,গুলিস্তান, ঢ
Dhaka