Projonmo Alo - প্রজন্ম আলো

Projonmo Alo - প্রজন্ম আলো

Share

প্রজন্ম আলো

12/11/2021

জায়গাটা সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডের কাছে - জীবন নগর ।
সময়টা শেষ বিকেল ।
দিনটা ৩০ শে মার্চ, ১৯৭১ ।
দুজন মানুষ - একজন বয়সে তরুন, চেহারা লুকাবার জন্য যে তাঁর শখের ফ্রেঞ্চকাট দাড়িটি কেটে এসেছেন কয়েকদিন আগে ঢাকা ত্যাগের সময়েই । আরেকজন মধ্যবয়ষ্ক, আকৃতিতে ছোটখাট । দুজনেই অপেক্ষা করছেন মার্চের রোদে পোড়া তপ্ত মাটির উপরে বসে, ক্লান্ত-চিন্তাক্লিষ্ট চেহারা । পরণে ময়লা গেন্জি আর লুঙ্গি - সাধারণ কৃষকদের যেমন থাকে ।
দেখতে সাধারণ এই দুজন আসলে মোটেও সাধারণ কেউ নন । দুজনে আসলে এসেছেন ‘রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি’ হিসেবে - অতি সদ্যপ্রসুত স্বাধীন-সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’ থেকে । কিন্তু তাঁদের জিদ তাঁরা ভারতে প্রবেশ করবেন চোরের মত লুকিয়ে লুকিয়ে নয়, বরং যদি ভারত সরকার তাঁদেরকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বরণ করে নেয়, শুধু তখনই ।
কাছের সীমান্ত ক্যাম্পে এই বার্তা দিয়ে প্রতিনিধি পাঠিয়ে দুজনেই বসে আছেন গভীর চিন্তায়, অনেকটা ধ্যানমগ্ন হয়ে ।
সন্ধ্যার খানিক পরেই হঠাৎ বুটের শব্দ ! পাশের ঝোপ থেকে মার্চ করে এগিয়ে এলো একদল জওয়ান । পরণে ভারতীয় বাহিনীর ইউনিফর্ম । অবিলম্বে এসে পৌঁছালেন ভারতীয় সিমান্তরক্ষী বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের আইজি - গোলক মজুমদার । তিনি এসেছেন দিল্লীর নির্দেশমত, যথাযোগ্য মর্যাদায় এই দুজনকে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে বরণ করে নিতে ।
দুজনকে জিপে তুলে নিয়ে আরোহীদের দিকে ফিরে তাঁদের পূর্ণ পরিচয় জানতে চাইলেন গোলক মজুমদার ।
“আমি আমীর-উল-ইসলাম ।“ তরুনটি বললেন ।
“আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের একজন প্রতিনিধি মাত্র ।“ ছোটখাট মধ্যবয়ষ্ক মানুষটি একটু হাসবার ভংগী করে বললেন । “আমার নাম তাজউদ্দীন আহমদ ।“
রাতের অন্ধকার ফুঁড়ে জীপ ছুটে চলছে কোলকাতার দিকে । ইতিহাস তখনও জানে না, এই ছোটখাটো মধ্যবয়ষ্ক মানুষটিই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের ভেতরের-বাইরের অগণিত শত্রুর সাথে লড়াই করে যাবেন প্রতিনিয়ত, বহুবার স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে একক কিন্তু নির্ভুল সিদ্ধান্তে আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামকে চালিয়ে নিয়ে যাবেন একদম ঠিক ঠিকানায় । কিন্তু স্বাধীনতার পরে মাত্র কিছু দিনের মধ্যেই সেই তাঁকেই আবার ছুঁড়ে ফেলা হবে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের সবচেয়ে অপাঙতেয়-অচ্ছুৎ একজন হিসেবে, এই ভুলের ভয়াবহ ফলাফল দেশ-জাতি-রাষ্ট্র ভোগ করবে শুধু একটি আগষ্ট নয়, বরং বহু বছর, বহু যুগ ধরে !
একজন তাজউদ্দীন, যিনি যুদ্ধের রাজনীতিতে হয়ে উঠবেন একজন আড়ালের সেনাপতি ।
শুরু করলাম সুহান রিজওয়ানের ‘সাক্ষী ছিলো শিরস্ত্রাণ‘ । ইতিহাস কিংবা ইতিহাসের নায়কদের নিয়ে ইতিহাস-আশ্রিত উপন্যাস লেখা মোটেও সহজ কোনো কাজ নয় । সাধারণত: অনেক বাঘা বাঘা সাহিত্যিকও এই কাজটি করতে সাহস পাননা । সুহান রিজওয়ানের মত অপেক্ষাকৃত তরুণ একজন এই সাহসটি করেছেন শুনেই প্রথমত: এই বইটির প্রতি আগ্রহ জন্মায় ।
আজ সকালে হাতে নিয়ে শুরু করতেই প্রথম পাতা থেকেই আটকে গেলাম চুম্বকের মত ! অসাধারণ লেখা আর গল্প বলার ঢং !
এই সপ্তাহান্তের ছুটিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের শিরস্ত্রানহীন অন্তরালের নায়ক ‘তাজউদ্দিন আহমদ’এর সাথে ইতিহাসের সঙ্গী হিসেবে যাত্রা আমার ।


Galib Bin Mohammad ভাইয়ের টাইম লাইন থেকে ❤

13/05/2021

🌙✨ ঈদ মোবারক 🌙✨

12/01/2021

ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবের অগ্নিপুরুষ মাস্টারদা সূর্যসেনের প্রয়াণ দিবসে অশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলী।
১৮ এপ্রিল, ১৯৩০ সাল। রাত দশটা। চট্টগ্রামের সবকিছু চলছে ঠিকঠাক আর দশটা রাতের মতোই। অল্পবয়স্ক ছেলে ছোকড়ার দল খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছে অধিকাংশই। যারা শোয়নি তারাও শোবার পায়তারা করছে। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা সেরে ঘরের বধুরা শুরু করেছে রাত্রি যাপনের প্রস্তুতি। নতুন বিয়ে হওয়া কোনো কোনো বধু হয়ত তেল মেখে ফিতেয় বাঁধছে অবাধ্য চুলগুলো। চারদিকে নেমে এসেছে জমাট অন্ধকার। রাস্তায় লোকজনের চলাফেরা একেবারেই সীমিত। পাড়ার নেড়ি কুকুরগুলো এখানে ওখানে কুন্ডলী পাকিয়ে আছে। হালকা ফিনফিনে বাতাস বইছে। ঘুমের দেশে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করা চট্টগ্রামের মানুষজন তখনও জানে না, কি হতে চলেছে আজ। ব্রিটিশ সরকারের বুকের ওপর কী গভীর ক্ষত তৈরি হবে আজকেরই রাতে, তা তখনো কেউ টের পায়নি!
যারা টের পেয়েছে, তাদের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। সিগন্যাল পাওয়া মাত্রই আসল কাজে নেমে পড়বে তারা। কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা, চারদিক পর্যবেক্ষণ শেষে চারটা বাড়ি থেকে বের হয়ে এল চারটা দল। লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট। কার কি করতে হবে পরিস্কার করে জানে সকলেই। নি:শব্দে তারা ছড়িয়ে গেল চারদিকে।
এই চারটা দল যখন ভিন্ন ভিন্ন পথে হারিয়ে গেল অন্ধকারে, ঠিক ততক্ষণে বহুদূরের ‘ধুম’ রেলস্টেশনে একটা মালবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে উল্টে গেছে। এমনি এমনি উল্টে যায়নি। এদের দলেরই সতীর্থ একটা দল রেললাইনের ফিশপ্লেট খুলে নিয়েছিল সুযোগ বুঝে। মালগাড়িটা আসতেই হুড়মুড় করে পড়ে গেল লাইন থেকে। এমনভাবে পড়ল যে গোটা চট্টগ্রাম সমগ্র বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল একেবারে!
ওদিকে আরো একটি দল চলে গেছিল টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিসে। অতর্কিত আক্রমণ করে তারা টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিস দখল করে নেয়। হাতুরি দিয়ে সব যন্ত্রপাতি ভেঙে দেয়। পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয় সেখানে। অকেজো হয়ে পড়ে চট্টগ্রামের টেলিফোন যোগাযোগ ব্যবস্থা। রেলপথের পর তারালাপনী থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় চট্টগ্রাম!
লোকনাথ বলের নেতৃত্বে আরেকটি দল পাহাড়তলীতে অবস্থিত চট্টগ্রাম রেলওয়ে অস্ত্রাগারে আক্রমণ করে একই রাতে। খুব বেশি প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয় না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই অস্ত্রাগারটি দখল করে নেয় বিপ্লবীরা। বিপুল পরিমাণ উন্নতমানের রিভলবার ও রাইফেল দখল করে তারা। অস্ত্রগুলো গাড়িতে নিয়ে অস্ত্রাগারটিতে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। তবে গোলাবারুদের অবস্থান র্নিণয় করতে ব্যর্থ হয় তারা। সেখানে কোনো গুলি পাওয়া যায়নি। এটা ছিল বিরাট হতাশার!
ত্রিমুখী আক্রমণ সফলতার সাথে শেষ করে সর্বশেষ পরিকল্পনা অনুযায়ী গনেশ ঘোষের নেতৃত্বে আক্রমণ করা হয় দামপাড়া পুলিশ রিজার্ভ ব্যারাক। ব্যারাকের অধিকাংশ পুলিশ তখন বিশ্রামে ছিল। অতর্কিত তাদের ওপর হামলে পড়ে ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির সদস্যরা। রিজার্ভ ব্যারাকের পুলিশ সদস্যরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুলিশ ব্যারাকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় বিপ্লবীরা।
এদিন আরো একটি কাজ তারা করে ফেলে। যার জন্য প্রস্তুতি হয়ত সেভাবে ছিল না। ঝোঁকের বসে এই আক্রমণে অংশ নেওয়া বিপ্লবীরা দামপাড়া পুলিশ লাইনে সমবেত হয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে বসে। মিলিটারি কায়দায় কুচকাওয়াজ করে সূর্যসেনকে সংবর্ধনা দেয় তারা। সূর্যসেন চট্টগ্রামে অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। তার ঘোষণায় তিনি বলেন,
“The great task of revolution in India has fallen on the Indian Republican Army. We in Chittagong have the honour to achieve this patriotic task of revolution for fulfilling the aspiration and urge of our nation. It is a matter of great glory that today our forces have seized the strongholds of Government in Chittagong…The oppressive foreign government has closed to exist. The national Flag is flying high. It is our duty to defend it with our life and blood.”
নতুন এক ইতিহাস সেদিন রচিত হয়েছিল দামপাড়া পুলিশ লাইনে। ব্রিটিশ সরকার সম্ভবত স্বপ্নেও কল্পনা করেনি এমন কোনো ঘটনার আঁচ। বাঙালী স্বদেশী বিপ্লবীরা সূর্যসেনের নেতৃত্বে এমনই এক কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলল যে গোটা ব্রিটিশ সম্রাজ্যজুড়ে হৈ চৈ পড়ে গেল! চট্টগ্রাম সম্পূর্ণরূপে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত ছিল চারদিন।
….
ফেব্রুয়ারির ১৬ তারিখ, সাল ১৯৩৩। রাতের বেলা এ বাড়িতে এক বৈঠকে মিলিত হলেন সূর্যসেন। সাথে ছিলেন কল্পনা দত্ত, শান্তি চক্রবর্তী, মণি দত্ত, ব্রজেন সেন আর সুশীল দাসগুপ্ত। গোপন মিটিং চলছে। এদিকে সূর্যসেনের মাথার দাম তখন দশ হাজার টাকা। ব্রজেন সেনের সহোদর নেত্রসেন সে টাকার লোভ সামলে উঠতে পারল না। সে সংবাদ পৌছে দিল পুলিশকে। রাত প্রায় দশটার দিকে পুলিশ আর সেনা সদস্যদের যৌথ বাহিনী ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের এই বাড়িটি ঘিরে ফেলল চারদিক থেকে। শুরু হল গোলাগুলি।
হাত বোমা ফাটিয়ে কল্পনা দত্ত, শান্তি চক্রবর্তী, মণি দত্ত আর সুশীল দাসগুপ্ত পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। কিন্তু পারলেন না মাস্টার দা। অন্ধকারে গুলি করতে করতে তিনি এসে পড়ে গেলেন বাঁশঝাড়ের পাশে এই খাদটিতে। খাদের ভেতর ছিল শুকনো বাঁশ পাতার গাদা। এরই ভেতর ঘাপটি মেরে পড়ে থাকলেন তিনি অনেকক্ষণ। চারিদিকে শত শত ইংরেজ সৈন্যর চোখ। কোনো অবস্থাতেই মাথা তোলবার উপায় নেই। ঘন্টা দুই তিনেক এভাবে প্রায় শ্বাস বন্ধ করে নিশ্চুপ পড়ে থেকে, অস্থির হয়ে উঠলেন তিনি। একটু নড়াচড়া করতেও পারছেন না। শুকনো পাতায় খসখস আওয়াজ হচ্ছে। রাত থাকতে থাকতে এখান থেকে সটকে পড়তে না পারলে ধরা পড়া বিনে গতি নাই। কাজেই রিস্ক তাকে নিতেই হল। কোনোরকমে মাথা উঁচু করে চারিদিকটা দেখতে চাইলেন। বিপত্তি ঘটাল শুকনো বাঁশপাতা। একটু নড়ে উঠতেই খসমসে আওয়াজ করে উঠল। পাশেই ছিল কয়েকজন ইংরেজ সৈন্য। লাফিয়ে পড়ে তারা ধরে ফেলল সূর্যসেনকে। সূর্যসেনের রিভলবার তখন ছিল গুলিশূন্য। একেই বলে ভাগ্য! নির্মম ভাগ্য! তিনি পারলেন না! ধরা পড়ে গেলেন! তার সাথে ধরা পড়লেন ব্রজেন সেন!
পরদিন ১৭ ফেব্রুয়ারি রাতে সূর্যসেন ও ব্রজেন সেনকে প্রথমে জেলা গোয়েন্দা সদর দফতরে, পরে নেওয়া হয় চট্টগ্রাম জেলে। সূর্যসেন গ্রেফতার হওয়ার সংবাদ প্রকাশিত হয় পত্রিকায়। আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখা হয়েছিল,
“চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন সম্পর্কে ফেরারী সূর্যসেনকে গত রাতে পটিয়া হইতে ৫ মাইল দূরে গৈরলা নামক স্থানে প্রেফতার করা হইয়াছে। সূর্যসেনকে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মামলায় প্রধান আসামি বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে। গত ১৯৩০ সাল হইতে সূর্যসেন পলাতক ছিলেন এবং তাহাকে ধরাইয়া দিবার জন্য গভর্নমেন্ট দশ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করিয়াছিলেন।”
১৯৩৩ সালের ফেব্রæয়ারি মাসে বেঙ্গল চিফ সেক্রেটারি কর্তৃক লন্ডনে ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছে পাঠানো রিপোর্টে লেখা হয়,
“The outstanding event of the fortnight is the arrest on 17 February of Surja Sen of Chittagong Armory Raid notoriety, who, as the leader and brain of absconders, has been giving constant anxiety over the last three years. It was unfortunate that when Surja sen and his companion were arrested, 4 others made good their escape…But luck enters very largely into these night operations and it certainly was a great stroke of luck that Surja Sen was secured.”
মাত্র কয়েক লাইনের এই মেসেজ থেকেই বোঝা যায় কি জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছিলেন সূর্যসেন ইংরেজ সরকারের মনে। ঘুম হারাম করে দিয়েছিল একেবারে। সূর্যসেনকে গ্রেফতারের মাধ্যমে তার মনে যেন নেমে এল বিরাট স্বস্তি!
সূর্যসেন, তারকেশ্বর দস্তিদার ও কল্পনা দত্তকে আসামি করে ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের ‘১২১/১২১ এ’ ধারা অনুযায়ী গঠন করা হয় স্পেশাল ট্রাইবুনাল। বাখরগঞ্জের দায়রা জজ ডব্লিউ ম্যাকসার্পি, সিলেটের অতিরিক্ত দায়রা জজ রজনী ঘোষ এবং চট্টগ্রামের দায়রা জজ খোন্দকার আলী তোয়েবকে যৌথ কমিশনার করা হয় এই ট্রাইবুনালের। কঠিন গোপনীয়তার ভেতর দিয়ে চলতে থাকে মামলার শুনানী। কেবল আগ্নেয়াস্ত্র বহন করা ছাড়া সূর্যসেনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আর কোনো অভিযোগের প্রত্যক্ষ প্রমাণ উপস্থাপন করা যায়নি। তারপরও রায়ে ১২১ ধারা অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত করে প্রাণদন্ড দেওয়া হয় তাকে। প্রাণদন্ড দেওয়া হয় তারকেশ্বর দস্তিদারকেও। কল্পনা দত্তকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদন্ড! এ বিষয়ে আনন্দবাজার পত্রিকা পরের দিন লিখেছিল,
“চট্টগ্রাম ১৪ই আগস্ট- অদ্য দ্বিপ্রহর ১২ ঘটিকার সময় স্পেশাল ট্রাইবুনাল হইতে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মামলার রায় প্রদত্ত হয়। ট্রাইবুনাল সূর্যসেনকে ১২১ ধারা অনুসারে দোষী সাব্যস্ত করিয়া প্রাণদন্ডে দন্ডিত করে। ওই একই ধারায় তারকেশ্বর দস্তিদারের প্রতিও প্রাণদন্ডের আদেশ প্রদত্ত হয়। কুমারী কল্পনা দত্তকে ভারতীয় দন্ডবিধির ১২১ ধারা অনুসারে দোষী সাব্যস্ত করিয়া তাহার প্রতি যাবজ্জীবন দন্ডাদেশ প্রদান করা হয়। আদালত প্রাঙ্গনের চারিদিকে পুলিশের বিশেষ বন্দোবস্ত করা হইয়াছিল। রায় প্রদত্ত হইবার পূর্বে সেনাদল কিছুকাল শহরে কুচকাওয়াজ করে। আসামীরা শান্তচিত্তে দন্ডাদেশ গ্রহণ করে এবং তাৎক্ষণাৎ আদালত হইতে স্থানান্তরিত করা হয়। তাহারা বিপ্লবাত্মক ধ্বনি করিতে করিতে আদালত গৃহ ত্যাগ করে।”
জেলখানায় শুরু হয় সূর্যসেনের বন্দী জীবন। এবার কনডেম সেল! কড়া পাহারায় তাকে আটকে রাখা হয় নির্জন কুঠুরীতে। একাধিকবার তার সহযোগী বিপ্লবীরা জেলখানা থেকে তাকে মুক্ত করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু প্রতিবারই তাদের গোপন পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। সূর্যসেন বন্দী থাকেন জেলে। তবে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকার লোক তো তিনি না! কনডেম সেলে বন্দি থেকেও তিনি জেলখানায় বন্দী অন্যান্য বিপ্লবীদের সাথে যোগাযোগ করেন। একজন কয়েদী মেথর সূর্যসেনের লেখা চিঠি ময়লার টুকরীতে নিয়ে জেলের বিভিন্ন ওয়ার্ডে বন্দী বিপ্লবীদের দিয়ে আসত।
মৃত্যুর আগে আটক বিপ্লবী কালীকিংকর দে’র কাছে সূর্যসেন পেন্সিলে লেখা একটি বার্তা পাঠান। সে বার্তায় তিনি লেখেন,
“আমার শেষ বাণী- আদর্শ ও একতা।”
তিনি স্বরণ করেন তার স্বপ্নের কথা। স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন যার জন্য জীবনভর উৎসাহ ভরে, অক্লান্তভাবে তিনি পাগলের মতো ছুটেছেন। তিনি লিখেছেন,
“ভারতের স্বাধীনতার বেদীমূলে যে সব দেশপ্রেমিক জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের নাম রক্তাক্ষরে অন্তরের অন্তরতম প্রদেশে লিখে রেখো।” তার সংগঠনে বিভেদ না আসার জন্য একান্ত ভাবে আবেদন করেন।
শেষ দিনগুলোতে জেলে থাকার সময় তার একদিন গান শোনার খুব ইচ্ছে হল। সেই সময় জেলের অন্য এক সেলে বন্দী ছিলেন বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী। রাত ১১টা/১২টার দিকে কল্পনা দত্ত তাকে চিৎকার করে ডাকেন,
“এই বিনোদ! বিনোদ! দরজার কাছে আয়। মাস্টার দা গান শুনতে চেয়েছেন!”
বিনোদ বিহারী গান জানতেন না। না জানলেই কী? মাস্টার দা শুনতে চেয়েছেন বলে কথা। তিনি তার জন্য রবিঠাকুরের “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে” গানটা গেয়ে শোনালেন। সূর্যসেন চোখ বন্ধ করে স্থীর হয়ে শুনলেন গানটা! এরপর আর কখনো তিনি গান শোনেন নি!”
-‘জলপাই রঙের কোট’ উপন্যাস থেকে সংক্ষেপিত

09/01/2021

ইছামতি- বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়

বিভূতিভূষণের যেকোনো ব‌ই পড়তে বসলেই একটু পরপর ইচ্ছা করে চিৎকার দিয়ে বলি, "কি সুন্দর! কি অসাধারণ!!'' ওনার বর্ণনাভঙ্গি,লেখনশৈলী, কাহিনী বিন্যাস সবকিছুই এত অসাধারণ যে না পড়েছে তার পক্ষে ধারণা করা সম্ভব নয়। বিভূতি পড়ার আগে অনেককেই ভয় দেখাতে শুনেছি ওনার লেখা অসম্ভব রকম সাধু ভাষায়। কিন্তু পড়তে গিয়ে সেরকম কিছুই দেখিনি। বিভূতিভূষণ এমন একজন লেখক যিনি সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে তার লেখাকে ক্রমাগত আধুনিক করে গেছেন। ইছামতিও সেই আধুনিক চলিত ভাষায় লেখা ব‌ইগুলোর একটি।

রিভিউ: ইছামতি একটি নদীর নাম। গল্পটা এই নদীর তীরে বাস করা মানুষগুলোর। গল্পটা যে সময়কার তখন ব্রিটিশ শাসনামল চলছে। গ্রামের মানুষগুলোর ধানী জমি আত্নসাৎ করে ক্রমাগত সেখানে নীল চাষ চলছে। একদল কিছুই খেতে পায় না আরেকদল নীল চাষ করে এবং প্রজাদের থেকে নানাবিধ ঘুষ নিয়ে ক্রমাগত পকেট ভারী করছে।

সেরকম‌ই একজন পকেট ভারী করা নীলকুঠির দেওয়ান রাজারাম রায়। মানুষ হিসেবে তিনি খুব উন্নত না হলেও তার তিন বোন তিলু,বিলু,নীলু এবং তাদের একমাত্র জামাই ভবানী মানুষ হিসেবে প্রথম শ্রেনীর। ভবানী সন্নাসী প্রকৃতির মানুষ যাকে বৈষয়িক কোন বিষয়‌ই স্পর্শ করতে পারে না। সে ব্যস্ত থাকে ইশ্বরের প্রকৃত স্বরুপ অনুসন্ধানে। তার সাথেসাথে ব্যস্ত থাকে আরো অনেকেই। যেমন সন্নাসিনী খেপি,কবিরাজ রামকানাই।

যে সময়ের কথা লেখক লিখেছেন তখন চুন থেকে পান খসলেই মানুষের জাত যেত।‌ সেই জাত যাওয়ার ভয়ে গ্রামের সব মেয়ে খুব সাবধানে চলাফেরা করলেও নিস্তারিনী নামের একটি মেয়ে ছিল খুব সাহসী। কে কি বললো তার তোয়াক্কা সে কখনোই করতো না। আরেকজন‌ও করতো না, সাহেবদের কুঠির আশ্রিতা গয়া। সবাই যাকে গয়ামেম বলে ডাকে।

গল্পের শুরুটা দারুন। মোট মাথায় নিয়ে অতি দরিদ্র এক লোক বাজারে যাচ্ছে পান সুপুরি বিক্রি করতে। তার অবস্থা অতি হতদরিদ্র হলেও স্বপ্ন অনেক বড়। যে স্বপ্ন একদিন তাকে সমাজের সেরা ধনবান ব্যক্তি বানিয়ে দেয়।

গল্পটা আরো অনেকের। আমিন প্রসন্ন চক্রবর্তীর গয়ামেমের প্রতি কুলকিনারাহীন প্রেমের। গল্পটা সেইসব প্রতিবাদী প্রজাদের যারা নীল চাষ করবে না বলে জীবন দিতেও দ্বিধা করেনি। গল্পটা মিঃ গ্রান্ট, শিপটন,ডেভিডসহ আরো অনেক সাহেবের।‌ আজ যাদের কেউ‌ই বেঁচে নেই। কিন্তু ইছামতির নদীতে তাদের সকলেই গল্প‌ই বন্দী হয়ে থেকে গেছে। তাই গল্পটা সর্বোপরি ইছামতির।

08/01/2021

বুক রিভিউ

বইয়ের নামঃ দেবী চৌধুরানী
লেখকঃ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ধরণঃ উপন্যাস
প্রকাশকালঃ ১৮৮৪
প্রকাশকঃ তিশা বুকস ট্রেড
মূল্যঃ ১০৮/-

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন উনিশ শতকের বিশিষ্ট বাঙ্গালি ঔপন্যাসিক। বাংলা গদ্য এবং উপন্যাসের বিকাশে তার অবদান অপরিসীম। তাকে "বাংলা সাহিত্যের জনক" বলা হয়। এছাড়াও তিনি "সাহিত্য সম্রাট" হিসেবেও পরিচিত।

"দেবী চৌধুরানী" বঙ্কিমচন্দ্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। এতে ঐতিহাসিক চরিত্রের উল্লেখ থাকলেও মূলত এটি ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়।

"দেবী চৌধুরানী" প্রকাশের সময় বঙ্কিমচন্দ্র নিজে জানিয়েছিলেন "ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। সুতরাং ঐতিহাসিকতার ভান করি নাই,দেবী চৌধুরানীও ঐরূপ। তবে এখানে একটু ঐতিহাসিক মূল আছে।"

দেবী চৌধুরানী এখানের মূল চরিত্র এবং নায়িকা। তার নামানুসারেই উপন্যাসের নামকরণ হয়েছে।

জমিদার হরবল্লভের পুত্রবধূ প্রফুল্ল। প্রফুল্লের স্বামী তাকে প্রথম দেখেই তার প্রেমে পড়ে। বিয়ের সময় প্রফুল্লকে প্রতিবেশীরা জাতিভ্রষ্টা হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে হরবল্লভ প্রফুল্লকে পুত্রবধূ হিসেবে গ্রহণ করেনা। প্রফুল্লকে ফেরত আসতে হয় তার বাপের বাড়িতে। প্রফুল্লরা গরীব,যতটুকু গরীব হলে দুবেলা খাবার জোটে না ততটুকু গরীব।

প্রফুল্ল সিদ্ধান্ত নেয় শ্বশুরবাড়িতে আসার। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে সবার হাতেপায়ে ধরেও সেখানে তার জায়গা হয় না। শ্বশুরবাড়ি ত্যাগ করে ঘটনাচক্রে ডাকাতদলের হাতে পড়ে প্রফুল্ল।

ঘটনাক্রমে তখন সে অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়। ডাকাতদলের সর্দার ভবানী পাঠক প্রফুল্লের মাঝে দেবীত্ব দেখতে পান এবং তাকে শিক্ষা দেন গীতার কর্মযোগের। দীর্ঘ দশ বছর দীক্ষার পর প্রফুল্ল হয়ে উঠে - দেবী চৌধুরানী।

"দেবী চৌধুরানী" নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন চ্যানেলে সিরিয়াল হয়েছে। কিন্তু বই পড়ে মনে হল সিরিয়ালে নানা দিক অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। সিরিয়ালের গল্প মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে বইটি পড়তে হবে তবেই এ উপন্যাস টি ভালো লাগবে।

আমার ব্যক্তিগতভাবে উপন্যাসের শেষদিকে প্রফুল্লের শ্বশুরবাড়ি ফিরে আসাটা ভালো লাগেনি।

যেখানে সম্মান নেই,সেখানে কিসের ফেরত যাওয়া..

যারা বঙ্কিমপ্রেমী তারা পড়ে দেখতে পারেন উপন্যাসটি।
#বই

Want your business to be the top-listed Government Service in Dhaka?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Category

Website

Address


15/12D, Block# F, Hazi Chinu Miah Road, Mohammadpur
Dhaka
1207