ওপারে তাহারা ৪
ধারাবাহিক উপন্যাস
সাজেদুন নাহার
অতিথিরা এগিয়ে এলেন বিদায় নেবার জন্য। মোহোসেনা বেগমের আম্মা-আব্বা, শ্বশুর -শ্বাশুড়ি, বড় ভাসুর, বড় জা, মেঝো,সেঝো, নয়া ভাসুর, চাচা-চাচিরা, সবাই একে একে বিদায় নিচ্ছিলেন আবার আসবেন বলে আর ওনারাও যেনো যায় এই বলে। যাবার সময় মোহোসেনা বেগম তার লুতফা ভাইজানের ছোটো ছেলেটাকে অনেক আদর করে দিলেন। আহারে বেচারা কতো ছোটো বয়সে লঞ্চডুবি হয়ে মারা গিয়েছিলো! তাকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,'বাবা খুব কষ্ট পেয়েছিলে?' হেসে তার ভাতিজা বললো, 'না, ফুফুআম্মা, কিভাবে কি হলো তাই বুঝতে পারিনি। তবে খুব ভয় পেয়েছিলাম, মা'র মুখটাই শুধু মনে পড়ছিলো। আজ আপনাকে দেখে আমার খুব ভালো লাগছে। আর সবচেয়ে ভালো কথা হচ্ছে আমার কোনো হিসাব হবে না। আমিতো এখন থেকেই জান্নাতের ছায়ায় থাকি। আর আমার জন্য আমার আত্মীয় স্বজনরা সবাই অনেক কয়েন পেয়েছে। আপনিও পেয়েছেন কারন আপনি মন থেকে আমার জন্য কেঁদেছিলেন। তাইতো আমি আপনাকে দেখতে এসেছি। ফুপুআম্মা, আপনি কিন্তু আমার ওখানে আসবেন। আপনার জন্য আমি কনসার্ট আয়োজন করবো যা এখানে পাবেন না। আর আপনাদের সব খরচ আমি দিবো। আজ তাহলে আসি?' তাকে আনন্দ নিয়ে বিদায় জানালেন মোহোসেনা বেগম।
একে একে সবাই চলে গেলো। সবাই তাদের জায়গায় মোহোসেনা বেগমকে দাওয়াত দিয়ে গেলো। কেয়ামতের আগে এতো দাওয়াত এটেন্ড করতে পারবেন কিনা চিন্তায় পড়ে গেলেন তিনি। সবশেষে বিদায় নিতে এলেন মুন্নির চাচা শ্বশুর, আব্দুল মালেক ব্যাপারি আর আব্দুর রহিম, লাইজুর মরহুম স্বামী। মালেক চেয়ারম্যান এখানেও তার দলের কিছু মানুষ পেয়েছেন আর স্বভাবতই তিনি একা চলতে পারেন না তাই এখানেও কিছু সাংগপাংগ নিয়েই তিনি চলেন। তাদের বিদায় জানিয়ে তিনি রহিমকে বললেন,'তুমি কেনো যাবে? তুমি আমাদের সাথে থাকবে না?' জবাবে আব্দুর রহিম বললো, 'না আম্মা, আমি তো আমার বাবা-মায়ের সাথে থাকি। আপনিতো আমার বাবাকে দেখেননি আমার ওখানে এলে পরিচয় করিয়ে দিবো। আমি এখানেও লাইজুর জন্য 'মৈনাক' নামেই বাড়ি করেছি। তার অপেক্ষায় আছি। আপনি আর আব্বা এসে দেখে যেয়েন কেমন হয়েছে বাড়িটা?' মোহোসেনা বেগমের এখনই যেতে ইচ্ছে করছে লাইজু-রহিম এর বাড়িটা দেখতে কিন্তু আবদুল খালেক সাহেব বললেন,'তোমার এখনও নিজের কিছু কাজ বাকি আছে। আগে আমাদের বাড়িটা গুছিয়ে নেই কাল ওখানে যাওয়া যাবে।'
আব্দুর রহিম চলে গেলে জায়গাটা একদম ফাঁকা হয়ে গেলো। এতক্ষণে তিনি চারপাশটা দেখার অবকাশ পেলেন।
Abdul Khaleque and Mohoshena Begum Trust
we are here to help people in needs specially from our locality, Nalcity Bapary Bari
ওপারে তাহারা ৩
ধারাবাহিক উপন্যাস
সাজেদুন নাহার
আরে আরে কী করছো? আব্দুল খালেক সাহেব এগিয়ে এসে বললেন।
জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলেন মোহোসেনা বেগম। যেনো জানতে চাইছেন, 'কী আবার হলো।'
এখানে কাঁদতে নেই।
কেনো?
আসলে এখানে কান্না পায়ই না। তারপরও যদি কেউ কাঁদে তাহলে তার অনেক কয়েন খরচ হয়ে যায়। ওই যে দেখো।
আব্দুল খালেক সাহেবের হাতের ইশারা অনুসরণ করে মোহোসেনা বেগম যেদিকে তাকালেন সেখানে ছিলো এক বিশাল কাঁচের ট্যাংকি। মহল্লায় মহল্লায় ওয়াসার যে বিশাল ট্যাংকি থাকে সেরকম। অত উঁচুতে না তবে সাইজ সেরকম বড়। ট্যাংকির মুখে একটা পাইপ। সেখান থেকে কয়েন এসে জমা হয়। তবে পাইপটা শেষ হয়েছে কোথায় তা দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে হঠাৎ হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে একটা বাঁক নিয়ে। এটা মোহোসেনা বেগমের কয়েন ব্যাংক। প্রায় ভর্তি আছে এতোবড় ট্যাংকটা। ওনার চোখে পানি আসার কারনে নিচের কল থেকে বেশ কিছু কয়েন বের হয়ে বাতাসে মিলিয়ে গেলো। কৌতুহলের কারণে তার মন খারাপ ভাব চলে গেছে তাই কয়েন পড়াও বন্ধ হয়েছে।
তিনি জানতে চাইলেন এতো কয়েন দিয়ে কী হবে এখানে?
আব্দুর রহিম এবার জবাব দিলো,'আম্মা, এখানে অনেক খরচ। কয়েন ছাড়া কিচ্ছু হয় না। আপনার যতদিন কয়েন আছে আপনি এখানে থাকতে পারবেন। কয়েন শেষ, কবরের অন্ধকারে গিয়ে থাকতে হবে। আপনার কয়েন ব্যাংক অনেক ভরা ছিলো সেজন্য আপনার কবরের দরজা তাড়াতাড়ি খুলে গেছে। আমার এতো তাড়াতাড়ি খুলেছিলো না। কিছুক্ষণ থাকতে হয়েছিলো কবরে। আপনি মনে করছেন আপনার ট্যাংকি ভরাই আছে তা না। আপনার কবরের দরজা খোলা থেকে এখান থেকে খরচ হওয়া শুরু হয়ে গেছে। বোঝা যাচ্ছে না কারন আপনার কয়েন অবিরত আসছে ওই পৃথিবী থেকে।'
কয়েন আসে ওই পৃথিবী থেকে? অবাক হলেন মোহোসেনা বেগম।
এবার আব্দুল খালেক সাহেব হেসে বললেন, হ্যা, ওই পৃথিবী থেকে। ওই যে পাইপটা হঠাৎ করে মিলিয়ে গেছে শুন্যে? আসলে সেটা ওই পৃথিবীর সাথে যুক্ত। তোমার নামে যতো দোয়া, দান, সদগা, ভালো আলোচনা সব কয়েন হয়ে এখানে জমা হয়। এখানে প্রতি মুহুর্তের জন্য কয়েন খরচ হচ্ছে। বাড়তি কিছু করতে চাইলে বাড়তি কয়েন খরচ করতে হবে। এই যে সবাই তোমার সাথে দেখা করতে এসেছেন নিজের জায়গা ছেড়ে, সবাই আজকে এক্সট্রা কয়েন খরচ করেছেন। কয়েন আছে, তো এখানে, পৃথিবীর এই ওপারে ঘুরবে ফিরবে, কয়েন নেই কবরের অন্ধকারে থাকতে হবে।
(চলবে)
ওপারে তাহারা ২
ধারাবাহিক উপন্যাস
সাজেদুন নাহার
এতোগুলো মুখ কাকে রেখে কাকে দেখবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না মোহসেনা বেগম। সবার দিকেই একসাথে তাকাচ্ছিলেন কিন্তু কাউকেই পুরোপুরি দেখে উঠতে পারছিলেন না। একজনকে দেখা শেষ হয়ে ওঠার আগেই আরেকজনের দিকে চোখ চলে যাচ্ছে। সবাই তার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে আছে এটা বুঝতে পারছিলেন। আস্তে আস্তে জড়তা কেটে উঠতেই তিনি আবিস্কার করলেন, 'আরে! এই তো তার সব আপনজন! যারা চলে গিয়েছিলেন একের পর এক তাকে কাঁদিয়ে!' ওই তো বড় চাচা,বারেক, ছোটো চাচা, খালেক,এই তো মাত্র মারা গিয়েছিলেন যার জন্য তিনি অনেক কাঁদলেন সেই ছোটো চাচি,সাজিদের মা। হঠাৎ তার চোখদুটো চঞ্চল হয়ে উঠল, তার মানে এখানে তার মা-বাবাও আছেন! ভালো করে এদিক ওদিক তাকাতেই তিনি দেখতে পেলেন হাফ সার্কেলে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন সেই দুইজন! কতো বছর? কতো যুগ? পার হলো তাদের দেখেন নি? সত্যি কি তাদের দেখছেন এখন? না কি ভুল? না কি মায়া? একবার ছুটবেন ভেবে আবার সন্দেহ নিয়ে ধীরে ধীরে তিনি কাছে গেলেন বাবা,আবদুল গনি আকন্দ, ও মা, খাদিজা বেগমের কাছে। ওনারা খুব মজা পাচ্ছেন মনে হচ্ছে মোহসেনা বেগমের এই হতবিহ্বল অবস্থা দেখে।
মা-বাবা হাত বাড়িয়ে দিতেই তিনি দুজনকেই একসাথে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি বুকফাটা চিতকারে কাঁদতে চাইলেন কিন্তু ওনার কন্ঠ হেসে উঠলো। তিনি আশ্চর্য হয়ে অনুভব করলেন তার হৃদয়ে কোনো ব্যাথা কোনো শোক নেই। সেখানে শুধুই আনন্দ!
আব্দুল খালেক সাহেব এগিয়ে এসে মোহোসেনা বেগমের বাবা-মায়ের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা দুজন মানুষের সাথে তার পরিচয় করিয়ে দিলেন। 'এই দ্যাখো, এনারা হচ্ছেন আমার বাবা-মা।' আবদুল খালেক সাহেবের বাবা-মাকে মোহোসেনা বেগম কখনও দ্যাখেননি। তারা আব্দুল খালেক সাহেবের ছোটো বেলায়ই মারা গিয়েছিলেন। ওনারা মোহোসেনা বেগমকে মাথায় হাত দিয়ে অনেক আদর করলেন। বললেন,'মা, তোমাকে এখান থেকে দেখেছি আর অনেক খুশি হয়েছি। সামনাসামনি দেখার ইচ্ছা পূরণ হলো আজ।'
ওনাদের সাথে কথা শেষ হতে না হতেই একজন লোক টুপ করে মোহোসেনা বেগমের পায়ে কদমবুসি করে হাসিমুখে উঠে জিজ্ঞেস করলেন,'আম্মা কেমন আছেন? '
'রহিম!' একসাথে অনেক অনুভূতি ছুঁয়ে গেলো মোহোসেনা বেগমের হৃদয়কে। তিনি শুধু চেয়েই রইলেন তার বড় মেয়ের মরহুম স্বামীর মুখের দিকে। আহা! পরিবারের সবার হৃদয় দুমড়েমুচড়ে ছেলেটা চলে এসেছিলো সেই কবে! আজ কতো বছর পর দেখা! এই প্রথম তার নিজের ছেলেমেয়েদের কথা মনে পড়ে গেল যাদের তিনি ওপারে রেখে এসেছেন। হাত বাড়িয়ে তিনি আব্দুর রহিমের চিবুক স্পর্শ করলেন। বললেন,'ভালো আছো বাবা?' তার চোখদুটো ছলছল করে উঠলো। উপস্থিত সবাই খুব অবাক হয়ে গেলো কারন এমন হওয়ার কথা না। এখানে কেউ কাঁদে না। কান্না বলে এখানে কিছু নেই। তাহলে মোহোসেনা কিভাবে কাঁদছেন?
(চলবে)
ওপারে তাহারা ১
ধারাবাহিক উপন্যাস
সাজেদুন নাহার
মোহসেনা বেগম চোখে আলো পড়তেই চোখ মেলে চাইলেন। তার সামনেই একটা দরজা ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে। দরজার ওপাশে নরম সুন্দর আলো। বড় বড় গাছের ডাল-পালাগুলো মৃদু হাওয়ায় দুলছে। ছোটো ছোটো গাছে রং বেরংএর ফুল ফুটে আছে।সবুজ ঘাসে ছাওয়া বিস্তৃত মাঠ। শুয়ে শুয়ে তিনি দেখছিলেন। উঠবেন কিনা বুঝতে পারছেন না। আসলে আদৌ উঠতে পারবেন কি না তাই তিনি সিওর না। কারন তাকে প্যাকেট করে কবরে নামিয়ে শুইয়ে দেয়া হয়েছিলো। এতক্ষণ তিনি নড়াচড়া করতে পারছিলেন না। অন্ধকার কবরে নামতে তার খুব খারাপ লাগছিলো। আহারে! কতো মানুষ এসেছিলো তার বাড়িতে! সবাই, সবাই যাদের তার দেখার খুব ইচ্ছা করছিলো তারা সবাই এসেছিলো। কিন্তু তিনি তাদের সাথে কথা বলতে পারছিলেন না। সবাইকে দেখে তবু তিনি খুব খুশি হয়েছেন। তার জন্য এই করোনা, বৃষ্টি, কাঁদা সবকিছু উপেক্ষা করে সবাই ছুটে এসেছে দূর দূরান্ত থেকে এটা অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। কিন্তু কবরে থাকা কোনো আনন্দের বিষয় না। এখানে যখন নাতি ভাতিজা তাকে ধরাধরি করে নামিয়ে রেখে গেলো তার খুব মন খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু পরক্ষণেই চোখে এই আলোর ধাঁধানি।
কি হলো উঠে আসছো না কেনো?
কন্ঠটা শুনেই তিনি চমকে উঠলেন। এ তো তার কন্ঠ! সেই তেরো বছর আগে শেষ শোনা। প্রথম শুনেছিলেন ষোড়শী কালে। বিবাহ বাসরে। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তিনি কারন তিনি স্বপ্নে প্রায়ই এই কন্ঠ শুনতেন, তাকে দেখতেন কিন্তু ঘুম ভাংলেই তা মিথ্যে হয়ে যেতো।
আরে উঠে এসো। সবাই তোমার অপেক্ষা করছে।
দ্বিতীয় বার শোনার পর ভালো করে তাকিয়ে দেখলো সত্যি আব্দুল খালেক সাহেব তার দিকে হাত বাড়িয়ে মুখে সেই মৃদু হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছেন। আরও অবাক হলেন যখন দেখলেন তিনি দিব্যি হাত বাড়িয়ে খালেক সাহেবের হাত ধরে উঠে দাড়াতে পারলেন। তিনি আর প্যাকেট করা নেই। তিনি শরীরে আর কোনো কষ্ট অনুভব করছেন না। বরং বেশ শক্তি পাচ্ছেন। খালেক সাহেবের হাত ধরে সেই দরজা দিয়ে ওপাশে বের হতেই তিনি দেখলেন বিশাল এক জন সমাগম।
23rd August 2020. The date of departure of the glorious lady Mohoshena Begum. It is included to Arbi month Moharram. Allah must has kept Jannat for her. Fi amanillah.
হে আল্লাহ আমাদের পিতা মাতার নামে কুরবানী আপনি কবুল করুন। আমিন।
রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সগিরা
জুন মাসে কাকে সাহায্য করা যায়? নলছিটি অগ্রাধিকার পাবে।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Website
Address
Dhaka

29/07/2020