31/12/2025
৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ বুধবার এদেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের মহান নেতা মোহাম্মদ সুলতানের মৃত্যুবার্ষিকী।
মোহাম্মদ সুলতান ছাত্র জীবন থেকে শুরু করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এদেশের প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পক্ষে ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। তিনি সমাজ বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতেন। তার এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি আজীবন সংগ্রামী ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। ৫২এর ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান প্রতিটি ক্ষেত্রে মোহাম্মদ সুলতান অগ্রণী নেতৃত্বদানকারী ভূমিকা পালন করেছেন।১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ১১ জন ছাত্র ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন যিনি ক্যাম্পাসে প্রথম কালো পতাকা উত্তোলন করেছিলেন-- তিনি ভাষা সৈনিক মোহাম্মদ সুলতান।
উল্লেখ্য, ১৯৮৩ সালের এই দিনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করিডোরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এদেশের বাম প্রগতিশীল ব্যক্তিত্বদের মধ্যে মোহাম্মদ সুলতান ছিলেন একজন ব্যাতিক্রমধর্মী ব্যক্তিত্ব। একাধারে তিনি নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। যা তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত লালন করে গেছেন। প্রগতিশীল সাংবাদিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি সৃষ্টির পৃষ্টপোষক, প্রেরণাদায়ক এবং প্রকাশনা জগতের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও পথিকৃত। ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের তিনি অন্যমত সংগঠকই ছিলেন না- এই আন্দোলন সংগঠিত এবং তাকে বেগবান করতে তিনি ছিলেন নিভৃতচারী পুরোধা ও রূপকার। নেতা হিসাবে নিজেকে আড়ালে রেখেই সংগঠন সংগ্রাম সংগঠিত করেছেন এবং আন্দোলনে রূপ দিয়েছেন। তিঁনি গড়ে তুলেছিলেন পুঁথিপত্র প্রকাশনি। পুঁথিপত্র প্রকাশনির জন্য বক্সি বাজারে যে ঘরটি ভাড়া নিয়েছিলেন- এটি ছিল ভাষা আন্দোলনের বাম প্রগতিশীল অংশের কর্মীদের মিলনকেন্দ্র। ভাষা আন্দোলন দুটো ধারায় গড়ে উঠেছিল। মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগিশ প্রমুখদের নেতৃত্বে বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী ধারা- অন্য অংশে ছিল মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ প্রমুখদের নেতৃত্বে যারা বাম কমিউনিস্ট আন্দোলনের ধারার সাথে যুক্ত ছিলেন। এদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মোহাম্মদ সুলতান, গাজীউল হকসহ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক ছাত্র যুবকরা। এঁরা ভাষা আন্দোলনকে দেখেছিলেন জাতিগত নিপীড়নের অংশ হিসাবে। জাতিগত নিপীড়নের জন্য দায়ী হলো সাম্রাজ্যবাদ। তাই সাম্রাজ্যবাদ তার দেশীয় দালাল সামন্ত-আমলা-মুৎসুদ্দি শ্রেণী উচ্ছেদ করেই জাতিগত নিপীড়ন থেকে মুক্তি অর্জন সম্ভব। সেদিন কমিউনিস্ট পার্টি শ্লোগান তুলেছিল বাঙালী জাতিসহ পাকিস্তানের সকল জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার। তাই তারা বাংলা ভাষাসহ সকল ভাষার সমান অধিকার চেয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তিতে ভাষা আন্দোলন বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ দ্বারা প্রবাহিত হয়- যা উগ্র জাতীয়তাবাদে রূপ নেয়। মোহাম্মদ সুলতান জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জাতিগত নিপীড়নের সমস্যা সমাধানের মধ্যেই প্রকৃত জাতীয় মুক্তির বিষয়টি দৃঢভাবে বিশ্বাস করতেন। যারা মোহাম্মদ সুলতানের ছায়ায় লালিত পালিত হয়েছেন- পুষ্টি লাভ করেছেন তাদের অধিকাংশই আজ উগ্র জাতীয়তাবাদের কাতারে যুক্ত হয়ে বিত্ত-বৈভব-স্বীকৃতি অর্জন করে বর্তমান সমাজের উপরের কাতারে অবস্থান করছেন। তাঁরা মোহাম্মদ সুলতানের নামটি সচেতনভাবেই মুছে ফেলার অপচেষ্টা করে চলেছেন। সত্তা বিক্রি করে বিত্ত বৈভব অর্জন করা মোহাম্মদ সুলতান প্রচ-ভাবে ঘৃণা করতেন। এ জন্য কোন প্রলোভন ও সুবিধাবাদের প্রস্তাব নিয়ে মোহাম্মদ সুলতানের সামনে দাঁড়ানোর সাহস কখনও কেউ করনেনি। কোন সুবিধাতো দুরের কথা ব্যক্তিগত পরিচয় নিয়ে সমাজের কোন সুবিধা গ্রহণ করাও প্রচ-ভাবে অপছন্দ করতেন। হৃদযন্ত্রক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তিনি একাধিকবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন- একজন সাধারণ রোগীর মতো। ঐ সময় তার অনেক সহযোদ্ধা ও কর্মীদের কেউ কেউ জেনারেল জিয়া ও এরশাদের মন্ত্রী সভায় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীপদে আসীন ছিলেন। এদের মধ্যে এস,এ, বারী এটি ও এরশাদের প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর তাকে বিশেষ সুবিধায় চিকিৎসায় প্রস্তাব করলে মোহাম্মদ সুলতান অবলীলায় তা প্রত্যাখ্যান করতে পেরেছেন। শেষবার যখন তার হৃদক্রিয়া যন্ত্র আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান তখন তিনি ওয়ার্ডে কোন বেড পাননি। বারান্দার করিডোরে চিকিৎসাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
তিনি স্পষ্ট বক্তা ছিলেন- কোন সুবিধাবাদী সংশোধনবাদী তাঁর কাছে কোন ধান্দা নিয়ে গেলে তিনি সামনা-সামনি কঠোর ভাষায় তাদের স্বরূপ উম্মোচন করে দিতেন। এ জন্য সুবিধাভোগীরা মোহাম্মদ সুলতানের সামনে যেতে ভয় পেতেন। আবার দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক কর্মী সতীর্থদের তিনি ছিলেন অভিভাবক, আশ্রয়দাতা ও পরামর্শদাতা; এমনকি বিনয়ী বন্ধুও। এজন্য বয়স কোন সমস্যা তার কাছে ছিল না। পারিবারিকভাবে অনেক কৃচ্ছতা সাধনের মধ্যে দিয়ে জীবন কাটিয়েছেন তিনি। কিন্তু এ জন্য তার কোন আক্ষেপ বা হতাশা ছিল না। বরঞ্চ জীবন-দর্শন ও মূল্যবোধকে ভোগবাদের ডামাডোলের মধ্যেও বজায় রাখতে পেরেছিলেন, এজন্য তিনি সব সময় হাঁসি-খুশি থাকতেন।
মোহাম্মদ সুলতান জন্ম গ্রহণ করেন ১৯২৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার মাঝগ্রামে। তিনি বড় হয়েছেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের পরিবেশে। তাই স্কুল জীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। কিশোর বয়সে তাঁর বাবার চাকুরীর সুবাদে যশোর জেলা স্কুলে পড়তেন। এই সময়ে কমিউনিস্ট ছাত্র নেতা আবদুল হক সম্পর্কে অবহিত হন। তখন থেকেই তিনি তাঁর অনুরক্ত হয়ে পড়েন। পরবর্তি সময়ে ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সম্পর্কিত হন। ১৯৪৮ সালে রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫১ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সম্পর্কিত যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক হন। ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি প্রথম কালো পতাকা উত্তোলন করেন। ১৯৫২ সালের শেষ দিকে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন। তিনি ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
তিনি ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের পুকুর পাড়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। ১৯৫৭ সালে ন্যাপ প্রাদেশিক কমিটির ভারপ্রাপ্ত যুগ্ম সম্পাদক হন। এই সময়ে ক্রুশ্চেভ সংশোধনবাদের বিরোধীতা করে ন্যাপ বিভক্ত হলে ১৯৬৭ সালে তিনি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ক্রুশ্চেভ সংশোধনবাদের বিরোধী অংশ ন্যাশনাল আওয়ামী লীগ পার্টি (ন্যাপ)’র ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪ সালে তিনি এক বছর বিনা বিচারে কারাভোগ করেন। তিনি ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান সরকারের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে হাসান হাফিজের সম্পাদনায় ভাষা আন্দোলনের প্রথম একুশে সঙ্কলন প্রকাশ করেন। যা সরকার বাজেয়াপ্ত করে। তিনি ত্রি-বিশ্বতত্ত্বের জোয়ারের সময় মাও সেতুঙ চিন্তাধারার বিরুদ্ধে অনন্য ভূমিকা নেন। এ সময় বৃহত্তর ঐক্যের নামে প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনকে বিলোপবাদী ধারায় ঠেলে দেবার চক্রান্ত চলে- ঐ সময় প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলন রক্ষায় জাতীয় ছাত্রদলের সংগ্রামের ক্ষেত্রেও জোরালো পৃষ্টপোষকতা দেন। এখানে উল্লেখ্য তিনি বেশ কিছু সময় ধরে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত না থাকলেও কখনও প্রগতিশীল ভূমিকা নিতে কার্পণ্য করেননি। সাপ্তাহিক সেবা প্রত্রিকার ক্ষেত্রেও তার অবদানের কথা পরিমাপ করা দুঃসাধ্য। মোহাম্মদ সুলতান তাই দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব।

12/11/2025
10/11/2025
16/09/2025
06/09/2025