জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এক মানুষ। বিদ্যানুরাগ, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও কর্মপ্রেরণায় এদেশের মননজগতে তিনি হয়ে আছেন এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। পান্ডিত্যে , জ্ঞানে ও দেশের মঙ্গল-আকাক্ষায় সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন তিনি। পঠন-পাঠনের ঈর্ষণীয় ব্যাপ্তি তাঁকে দেশ ও বিদেশের ভাবুক ও সারস্বত সমাজে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল।
সমগ্র জীবন তিনি ব্যাপৃত ছিলেন শিক্ষকতায়। জ্ঞানদানে ও বিদ্
যার্থীদের মধ্যে নিত্যনব জিজ্ঞাসা সঞ্চারে, এই কর্মকে ব্রত হিসেবে নিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন এদেশের শিক্ষা ও মননজগতের এক প্রাণময় ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। বহু বিদ্যার্থী তাঁর কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে নিজেদের মানসভুবনকে করেছেন সমৃদ্ধ। জ্ঞানপিপাসা, পাঠাভ্যাস এবং শিক্ষাদানে তাঁর মতো তুল্য কোনো ব্যক্তি ছিল না এদেশে। সেজন্য তিনি হয়ে উঠেছিলেন শিক্ষকদেরও শিক্ষক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণের জন্য লন্ডন যান। এই সময়ে তাঁর মানসভুবন পঠন-পাঠনের মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। শুধু রাষ্ট্রবিজ্ঞান নয়, মানববিদ্যার সকল শাখা থেকে তিনি জ্ঞান আহরণ করেন। সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতি হয়ে ওঠে তাঁর আগ্রহের বিষয়। দেশে প্রত্যাবর্তনের পর তাঁর বিদ্যানুরাগ ও পান্ডিত্যের খ্যাতি দেশে ও বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে।
বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকালে দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক সংকট ও পাকিস্তানিদের শোষণ তাঁকে বৃহত্তর কর্তব্যে নিয়োজিত করে। এই প্রতিবাদী ভূমিকার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাদানকালে তিনি রাষ্ট্রের ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হন। এই সময়ে শাসকগোষ্ঠীর শোষণ-বঞ্চনার প্রতিবাদে তিনি যে-ভূমিকা গ্রহণ করেন তা হয়ে আছে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এছাড়া সেই সময়ে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও সমাজবাস্তবতার আলোকে এই অঞ্চলের বাঙালি সমাজে যে-জাগরণ সৃষ্টি হয় তাতেও জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই বহুবিধ প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর জ্ঞানচর্চা অব্যাহত ছিল এবং বিদ্যার্থীদের মধ্যে তিনি জ্ঞানের আলোকবর্তিকা বিতরণে সর্বদা উন্মুখ ছিলেন।
অকৃতদার এই মানুষটির জীবনসাধনা ও চর্চার সঙ্গে মিশে ছিল প্রাত্যহিক গ্রন্থপাঠ। কত ধরনের বই যে তিনি সংগ্রহ করেছিলেন তার ইয়ত্তা নেই। বিচিত্র বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল। গ্রন্থই ছিল তাঁর জীবনসঙ্গী ও জ্ঞান আহরণের উপায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে তাঁর বিশেষ জ্ঞান এবং পা-িত্যের খ্যাতি সুবিদিত হলেও শিল্প ও সাহিত্যের সমকালীন গ্রন্থপাঠও তাঁর জীবনসাধনায় অঙ্গীভূত হয়েছিল। চিরায়ত সাহিত্যের তিনি ছিলেন বিশেষ অনুরাগী।
জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক ১৯৯৯ সালে পরলোকগমন করেন। দীর্ঘদিন থেকে তাঁর সংগৃহীত গ্রন্থের ভান্ডার বিশেষ যত্ন ও পরম মমতায় আগলে রেখেছেন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের।
আবুল খায়ের দীর্ঘদিন স্বপ্ন দেখেছেন পিতৃব্যের সংগৃহীত বই নিয়ে একটি পাঠাগার স্থাপনের। তাঁরই উদ্যোগ ও সহায়তায় ‘জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠ’ বাস্তবায়িত হলো। লাইব্রেরি ও পাঠাগার - এই প্রচলিত বোধ থেকে বেরিয়ে আরো প্রসারিত চেতনাকে ধারণ করে এর নামকরণের সঙ্গে যুক্ত হলো বিদ্যাপীঠ। এই শব্দটি বৃহত্তর চেতনাকে ধারণ করছে। শুধু গ্রন্থপাঠ নয়, এই বিদ্যায়তনে গবেষণার দ্বার উন্মুক্ত থাকবে। এই সংগ্রহের বই নির্দিষ্ট সময়ে এই ভবনে পাঠ করা যাবে। আব্দুর রাজ্জাকের সংগৃহীত বই থেকে তরুণ গবেষক ও বিদ্যানুরাগী তাঁর মানসভুবনকে সমৃদ্ধ করতে পারবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।