05/03/2026
তারিখঃ ০৫ মার্চ ২০২৬
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিঃ
অধ্যাদেশের ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রেখে আইনে রূপান্তরের আহ্বান: ভুক্তভোগীদের সঙ্গে এনএইচআরসি’র মতবিনিময়
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (এনএইচআরসি) সম্মেলন কক্ষে আজ মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ভুক্তভোগী ও স্বজনদের সঙ্গে নবনিযুক্ত চেয়ারপার্সন ও কমিশনারদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ভুক্তভোগীরা আশঙ্কা ব্যক্ত করেন যে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ এবং গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ২০২৫-সহ সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশসমূহ সংসদে আইনে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় যদি পরিবর্তিত হয়ে ক্ষমতা খর্ব করা হয়, তবে কমিশন আবারও পূর্বের মতো দুর্বল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে। ফলে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও প্রতিকার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
র্যাবের গুলিতে পা হারানো লিমন বলেন, “জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ এবং গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ২০২৫ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করেছে। আমাদের মতো ভুক্তভোগীদের প্রতিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে এই অধ্যাদেশগুলো কমিশনকে পর্যাপ্ত ক্ষমতা দিয়েছে। আমরা চাই, অধ্যাদেশের আলোকে কমিশনকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে তা অক্ষুণ্ণ থাকুক এবং উক্ত অধ্যাদেশসমূহ কোনো পরিবর্তন ছাড়া আইনে পরিণত হোক।”গুমের শিকার ভুক্তভোগীর ছেলে জাহিদ বলেন, “বর্তমান কমিশনাররা অন্যান্য পদে থাকাকালে মানবাধিকার কর্মী হিসেবে তাদের কাজ দেখার সুযোগ আমাদের হয়েছে। তাই তাদের ওপর আমাদের আস্থা আছে।”
সভায় ভুক্তভোগীরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে যে ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন তা কমিশনের সামনে উপস্থাপন করেন। তারা উল্লেখ করেন, পূর্ববর্তী সময়ে আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা ও কার্যকর ক্ষমতার ঘাটতির কারণে কমিশন অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও প্রতিকার প্রদানে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি। এ প্রেক্ষিতে তারা বর্তমান কমিশন ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারবে—এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
চেয়ারপার্সন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বর্তমান কমিশন মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ভুক্তভোগীদের পক্ষে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভুক্তভোগীদের কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশসমূহ অক্ষুণ্ণ রেখে তা দ্রুত আইনে পরিণত হবে। তিনি আরও বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কমিশন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
কমিশনার অধ্যাপক মোঃ শরীফুল ইসলাম বলেন, মানবাধিকার সুরক্ষার প্রশ্নে কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট হবে না এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে কাজ করবে। কমিশনার মোঃ নূর খান বলেন, মানবাধিকারের ধারণা বিস্তৃত; একজন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিবার ও সমাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই কমিশন ভুক্তভোগীদের পাশে থাকবে এবং কোনো চাপের কাছে মাথানত করবে না।
কমিশনার ইলিরা দেওয়ান বলেন, বর্তমান অধ্যাদেশের আলোকে কমিশন তার আইনি ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করবে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করবে। ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশসমূহ কীভাবে আইনে পরিণত হবে—অপরিবর্তিত অবস্থায় থাকবে কি না—এ বিষয়ে তারা সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন।
কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মানবাধিকার সুরক্ষায় সকল অংশীজনের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতেও নিয়মিত মতবিনিময় সভার মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বরকে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হবে। সভা শেষে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ও সুপারিশসমূহ পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস প্রদান করা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন চেয়ারপার্সন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (BLAST)-এর অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন, অধিকার-এর সাজ্জাদ হোসেনসহ আইন ও সালিশ কেন্দ্র, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি, ব্লাস্ট, অধিকারসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিগণ। সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন ঘটনার ভুক্তভোগী ও স্বজনরা—যাদের মধ্যে ছিলেন র্যাবের গুলিতে পা হারানো লিমন, পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তারের পর মৃত্যুর শিকার জনির ভাই রকি, পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর শিকার বডি বিল্ডার ফারুকের স্ত্রী, জুলাই অভ্যুত্থানে যাত্রাবাড়ীতে মাথায় গুলিবিদ্ধ কাজল মিয়া, গণপিটুনিতে হত্যার শিকার দিপু দাসের পরিবার এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনরা।
সভাটির উদ্দেশ্য ছিল ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা, অভিযোগ ও প্রত্যাশা সরাসরি শুনে মানবাধিকার সুরক্ষা ও প্রতিকার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা।
