রাষ্ট্রচিন্তা

রাষ্ট্রচিন্তা

Share

রাষ্ট্রব্যবস্থার সংকট চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের পথ সন্ধানে একটি উদ্যোগ

‘রাষ্ট্রচিন্তা’ রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তা ও গণ(ক্ষমতা)তান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণের একটি উদ্যোগ।

22/04/2026

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি বাতিল এবং অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্প্রতি সম্পাদিত ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ (এআরটি) নামক বাণিজ্য চুক্তিটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে এক অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার অত্যন্ত গোপনীয়তা ও তাড়াহুড়োর মধ্য দিয়ে এই নজিরবিহীন অসম চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। ৩২ পৃষ্ঠার এই দলিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাম ৫৯ বার এলেও বাংলাদেশের নাম এসেছে ২০৫ বার, যা মূলত বাংলাদেশের ওপর একতরফা ও আপত্তিজনক শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার স্পষ্ট প্রতিফলন। রাষ্ট্রচিন্তা মনে করে, জনমতের তোয়াক্কা না করে এবং অংশীজনদের অন্ধকারে রেখে করা এই চুক্তিটি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতাকে বিকিয়ে দেওয়ার একটি আইনি নথি মাত্র।

এই চুক্তির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো বাংলাদেশের জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। চুক্তির শর্তানুসারে বাংলাদেশকে আগামী ১৫ বছরে আমেরিকা থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের চড়া মূল্যের এলএনজি কিনতে হবে, যা পরবর্তী তিনটি নির্বাচিত সরকারকে এক ভয়াবহ ঋণ ও জ্বালানি আমদানির ফাঁদে আটকে ফেলবে। এর ফলে দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও সৌরবিদ্যুৎ খাতের বিনিয়োগ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া ১৪টি বোয়িং বিমান ও নির্দিষ্ট মূল্যে অপ্রয়োজনীয় সমরাস্ত্র কেনার বাধ্যবাধকতা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। রাশিয়ার কাছ থেকে পারমাণবিক প্রযুক্তি বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কেনার ক্ষেত্রে মার্কিন স্বার্থের দোহাই দিয়ে যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, তা আমাদের স্বাধীন জ্বালানি নীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে।

বাণিজ্যিক দিক থেকেও এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য বঞ্চনার এক সুনিপুণ ফাঁদ। মার্কিন তুলা ও তন্তু ব্যবহার করে পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে যে সামান্য শুল্ক ছাড়ের কথা বলা হয়েছে, তা আদতে কোনো কাজে আসবে না। কারণ, আমেরিকা থেকে তুলা আমদানির খরচ অন্য দেশের তুলনায় প্রতি কেজিতে ০.১০ থেকে ০.৩০ ডলার বেশি, যা শুল্ক সুবিধার চেয়েও ব্যয়বহুল। বিপরীতে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সাড়ে চার হাজার পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ায় সরকার বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাবে। সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত আসবে আমাদের ওষুধ শিল্পে; প্যাটেন্ট আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের শর্তের কারণে জীবনদায়ী ওষুধের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাবে এবং দেশের শত শত ক্ষুদ্র জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে করা পিসিএ চুক্তিও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক ধরনের আইনি হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করেছে। ৮৩টি ধারাসংবলিত এই চুক্তির মানবাধিকার ও সুশাসনের শর্তগুলো ব্যবহার করে ইইউ যেকোনো সময় একতরফাভাবে বাণিজ্যিক সুবিধা স্থগিত করার ক্ষমতা রাখবে। একইভাবে জাপানের সাথে ইপিএ, ভারতের সাথে প্রস্তাবিত সেপা এবং চীনের সাথে এফটিএ চুক্তির ক্ষেত্রেও অসম প্রতিযোগিতার ঝুঁকি বিদ্যমান। এ সমস্ত চুক্তির বাস্তবায়ন ঘটলে শুল্কমুক্ত আমদানির জোয়ারে আমাদের উদীয়মান হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিক, গ্লাস ও ডেইরি শিল্পগুলো ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে। বিশেষকরে ভারতের সাথে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্টের বিষয়গুলো আমাদের অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি করেছে।

রাষ্ট্রচিন্তা বিশ্বাস করে, কোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ তার নীতি নির্ধারণী ক্ষমতা এভাবে বিদেশের হাতে তুলে দিতে পারে না। আন্তর্জাতিক আইনের বেড়াজালে একবার আটকা পড়লে ভবিষ্যতে দেশের কোনো শিল্প সংকটে পড়লেও সরকার ভর্তুকি বা নীতিগত সহায়তা দিতে পারবে না। এই আত্মঘাতী পথ থেকে ফিরে আসা এখন সময়ের দাবি। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ৬০ দিনের নোটিশে এটি বাতিল করার যে সুযোগ রয়েছে, নবনির্বাচিত সরকারকে অনতিবিলম্বে সেই পথে হাঁটার আহ্বান জানাচ্ছি। রাষ্ট্রের প্রতিটি দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

আমরা জোরালো দাবি জানাচ্ছি যে, আমেরিকার সাথে করা এই বিতর্কিত চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। সেই সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, চীন ও জাপানের সাথে সম্পাদিত বা প্রক্রিয়াধীন প্রতিটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নিয়ে জাতীয় সংসদে উন্মুক্ত ও বিস্তারিত আলোচনার আয়োজন করতে হবে। বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন এবং সচেতন নাগরিকদের মতামত গ্রহণের মাধ্যমে একটি প্রকৃত জনবান্ধব ও সার্বভৌম বৈদেশিক বাণিজ্য নীতি প্রণয়ন করতে হবে। গোপন কক্ষে বসে দেশের ভাগ্য নির্ধারণের খেলা বন্ধ করে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিটি চুক্তির শর্ত পুনর্মূল্যায়ন করাই হবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব।

20/04/2026

২০ এপ্রিল, ২০২৬

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে নিছক মতপ্রকাশ বা রাজনৈতিক সমালোচনার দায়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নাগরিকদের যেভাবে আটক ও হয়রানি করা হচ্ছে, রাষ্ট্রচিন্তা তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহে ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী, অ্যাক্টিভিস্ট ও সাধারণ নাগরিকদের অন্তত ৬ জনকে বিনা পরোয়ানায় আটক কিংবা নিবর্তনমূলক আইনের মারপ্যাঁচে ফেলা হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, এই ধরণের ধরপাকড় তার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে সমালোচনা বা ব্যঙ্গাত্মক পোস্টের বিপরীতে তৃণমূল পর্যায়ে মামলা ও ব্যক্তিগতভাবে নাগরিকদের পুলিশে সোপর্দ করার এক ভয়াবহ সংস্কৃতি পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইনের এমন যথেচ্ছ ব্যবহার আমাদের সেই বিগত ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের স্মৃতিকেই স্পষ্ট করে, যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এ দেশের মানুষ রক্ত দিয়ে লড়াই করেছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সফলতায় অন্যতম প্রধান অংশীদার হিসেবে বিএনপি দীর্ঘদিন রাজপথে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। দীর্ঘ সেই আন্দোলনের অন্যতম স্টেকহোল্ডার হিসেবে আমরা আশা করি, বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা সহনশীলতা ও নাগরিক অধিকারের প্রতি তাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পরিচয় দেবেন। যে স্বাধীনতার জন্য ছাত্র-জনতা আত্মাহুতি দিয়েছে, সেখানে সামান্য ফেসবুক পোস্টের কারণে কোনো নাগরিককে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ক্ষমতার বলয়ে থেকে ভিন্নমত দমনের এই পুরোনো ছক থেকে বেরিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি।

রাষ্ট্রচিন্তা মনে করে, ফেসবুক পোস্ট বা অনলাইনে মতপ্রকাশের দায়ে যাদের আটক করা হয়েছে, অবিলম্বে তাদের মুক্তি দেওয়া উচিত। একইসাথে নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা হরণকারী সকল নিবর্তনমূলক আইনের অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার উদ্দেশ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহারের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।

ক্ষমতা বা দলীয় ইমেজের চেয়ে মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করাই এখন সময়ের প্রধান রাজনৈতিক কর্তব্য। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে ইতিবাচক সংস্কারের পথে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে হলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

13/04/2026

বাংলা নববর্ষ, চৈত্র সংক্রান্তি ও বৈসাবির ত্রিমাত্রিক মেলবন্ধন এ ভূখণ্ডের এক অনন্য সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। একদিকে আবহমান বাংলার কৃষি ও প্রকৃতিজাত চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষ, অন্যদিকে পাহাড়ি জনপদের সম্মিলিত উৎসব 'বৈসাবি'- এই দুই মিলে পাহাড় ও সমতলের জনআকাঙ্ক্ষাকে এক মোহনায় গেঁথেছে। এই উৎসবগুলো একদিকে বর্ষপরিক্রমার আনুষ্ঠানিকতা বহন করে, সেই সাথে আমাদের বৈচিত্র্যময় জনপদের ঐক্য, সহাবস্থান এবং শিকড় সন্ধানের এক বলিষ্ঠ সামষ্টিক ইশতেহার ধারণ করে।

সংস্কৃতির এই নিবিড় যোগসূত্রটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সমতলের চৈত্র সংক্রান্তিতে ব্যবহৃত লোকজ শব্দাবলি পাহাড়ি জনপদের উৎসবের সঙ্গে এক নিগূঢ় সেতুবন্ধ তৈরি করে। লোকজ দর্শনে বছরের শেষ দিনে প্রাচুর্যের যে আকাঙ্ক্ষা কাজ করে, তার প্রতিফলন সমতল ও পাহাড়- উভয় জনপদেই সমভাবে বিদ্যমান। একদিকে যখন মেলা, উৎসব আর হালখাতার প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে সমতলে উৎসব উদযাপিত হয়, পাহাড়ে তখন নদী বা ছড়ায় ফুল ভাসিয়ে পুরাতন বছরের গ্লানি মুছে ফেলার প্রার্থনা চলে। এই উৎসবগুলোর ভেতর দিয়ে এটিই প্রতিভাত হয় যে, ভাষা ও সম্প্রদায়ের ভিন্নতা সত্ত্বেও আমাদের চেতনার মূল সুর অভিন্ন- প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, মানবিক সম্প্রীতি এবং নতুনের প্রতি অবিচল প্রত্যাশা।

মূলত এই সাংস্কৃতিক ঐক্যই বাংলার বৈচিত্র্যময় সমাজকাঠামোর প্রধানতম শক্তি। চৈত্র সংক্রান্তি, বৈসাবি ও নববর্ষ প্রতিটিই আমাদের প্রকৃতি, ভূখণ্ড এবং উৎপাদন-সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। তাই এই উৎসবগুলোকে কেবল প্রথাগত উদযাপনের ফ্রেমে দেখা যায় না; এগুলো আমাদের জাতীয় ও সামষ্টিক সংহতির এক প্রোজ্জ্বল প্রতিফলন। কারণ পাহাড় ও সমতলের মানুষের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, যাপিত জীবন এবং ভবিষ্যৎ গন্তব্য আদতে একই অবিচ্ছেদ্য সূত্রে গ্রথিত।

রাষ্ট্রচিন্তার পক্ষ থেকে চৈত্র সংক্রান্তি, বৈসাবি ও বাংলা নববর্ষের আন্তরিক অভিবাদন। আমাদের এই ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন আরও সংহত হোক। নিজস্ব শিকড় ও হাজার বছরের এই বহুত্ববাদী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে যেকোনো বিকৃতি কিংবা বিভাজনের রাজনীতিকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মোকাবিলা করাই হোক এবারের নতুন বছরের অঙ্গীকার।

শুভ নববর্ষ 🥳

11/04/2026

মব সহিংসতা বন্ধ ও মাজার-দরগাহ সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় নীতিমালার দাবি

কুষ্টিয়ায় পীর শাহ সুফি শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা আমাদের স্তম্ভিত করেছে। ধর্মীয় শুদ্ধতার দোহাই দিয়ে একদল উন্মত্ত জনতা যেভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা স্পষ্টত একটি ফৌজদারি অপরাধ। কোনো স্বাধীন ও সভ্য সমাজে এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া মানা যায় না।

আমরা দেখছি, দীর্ঘদিন ধরে দেশে মাজার, খানকাহ ও দরগাহর ওপর একের পর এক হামলা হচ্ছে। অপরাধীদের বিচার না হওয়ায় এই ‘মব কালচার’ এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। যারা এই অপকর্মে উসকানি দিচ্ছে এবং যারা সরাসরি হামলায় অংশ নিচ্ছে- রাষ্ট্র তাদের আইনের আওতায় আনতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।

নির্বাচিত সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া। ধর্ম অবমাননা বা এ ধরণের যেকোন অভিযোগের বিচার করার অধিকার শুধু আদালতের। সাধারণ মানুষ কোনভাবেই এ ধরণের বিচারের ভার নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে পারে না। দেশের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া বন্ধ রেখে সাধারণ মানুষকে এভাবে অমানুষে পরিণত করার এই ষড়যন্ত্র সম্পূর্ণত অনাকাঙ্ক্ষিত।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে এ পর্যন্ত সারাদেশে প্রায় শখানেক মাজার ও খানকাহ ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে। এসব হামলায় হতাহত হয়েছেন বহু মানুষ। এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, আগের অন্তর্বর্তী সরকারের ধারাবাহিকতায় বর্তমান নির্বাচিত সরকারের আমলেও একই ধরণের মব সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর এই বর্বরোচিত হামলা প্রমাণ করে- রাষ্ট্রে আইনের শাসনের প্রতিশ্রুতি এখনো শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।

উল্লেখ্য, মাজার ও দরগাহগুলো শুধু ধর্মীয় স্থান নয়; এগুলো এ দেশের হাজার বছরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক। এসব আধ্যাত্মিক কেন্দ্রের ওপর আঘাত বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মূল ভিত্তিকে উপড়ে ফেলার নামান্তর। তাই শুধু প্রতিবাদ আর বিচারের আশ্বাস যথেষ্ট নয়, দরকার এই সহিংসতা বন্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ।

‘মাজার, খানকাহ ও দরগাহ সুরক্ষা নীতিমালা’র প্রস্তাবিত রূপরেখা:

রাষ্ট্রচিন্তা’র পক্ষ থেকে আমরা অবিলম্বে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের মাধ্যমে নিচের রূপরেখাটি বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি-

১. আইনি নিরাপত্তা ও জামিন অযোগ্য ধারা: মাজার ও দরগাহ সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে। যেখানে এসব স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগকে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর আঘাত হিসেবে গণ্য করে জামিন অযোগ্য ধারায় বিচারের বিধান থাকবে।

২. বিচার বিভাগীয় কমিশন ও দ্রুত বিচার: বিগত দেড় বছরে ঘটা প্রতিটি হামলার তদন্তে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করতে হবে। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার ছয় মাসের মধ্যে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে সম্পন্ন করে অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

৩. ডিজিটাল ও সামাজিক নিরাপত্তা (মব প্রিভেনশন): সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিদ্বেষমূলক প্রচারণা বা 'ব্লাসফেমি'র অভিযোগ তুলে যারা মব সংগঠিত করে, তাদের চিহ্নিত করতে বিশেষ সেল গঠন করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাকে মব সৃষ্টির আগে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য করতে হবে। কোনো স্থানে হামলা হলে সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তাদের অবহেলার জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

৪. রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও সুরক্ষা তহবিল: হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মাজার ও স্থাপনাগুলো সরকারি অর্থায়নে পুনঃনির্মাণ ও সংস্কার করতে হবে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন ও স্থায়ী আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দরগাহ ও মাজারের নিরাপত্তায় স্থায়ী পুলিশি প্রহরা বা আনসার মোতায়েন করতে হবে।

৫. আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক প্রকল্প: রাষ্ট্রকে নাগরিকদের মধ্যে সহনশীলতা ও মানবিকতা তৈরির দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প হাতে নিতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মব সহিংসতার কুফল সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। আধ্যাত্মিক চর্চাকে উগ্রবাদ বিরোধী ঢাল হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

একটি রাষ্ট্র তখনই সার্থক হয়, যখন সে তার দুর্বলতম নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। আমরা চাই না আর কোনো প্রাণের বিনিময়ে আমাদের এই অন্ধকার পথ অতিক্রম করতে হোক। সরকার অবিলম্বে এই নীতিমালা গ্রহণ করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নিজেদের সদিচ্ছার প্রমাণ দেবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

রাষ্ট্রচিন্তা
১১ এপ্রিল, ২০২৬

05/04/2026

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান অবশ্যই একটি দলের পতন আর অন্য দলের গদি দখলের লড়াই ছিল না। এটা ছিল রাষ্ট্রকাঠামো আমূল পরিবর্তনের এক মহাজাগরণ। ছাত্র-জনতা বুকের রক্ত দিয়ে যে আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিল, তার মূলে ছিল একটি জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ এবং মানবিক রাষ্ট্র গঠন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আন্দোলনের অন্যতম সুফলভোগী দল হিসেবে বিএনপি এখন সেই গণআকাঙ্ক্ষার পিঠেই ছুরি মারছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন শক্তিশালীকরণ এবং বিচার বিভাগীয় সচিবালয় পৃথকীকরণের মতো অন্তত ১৬টি অতিগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করে বিএনপি প্রমাণ করছে- তারা ক্ষমতার পরিবর্তন চায়, কিন্তু ব্যবস্থার পরিবর্তন চায় না। এর মধ্য দিয়ে তারা মূলত পতিত ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামোটিকেই নিজেদের আগামীর নিরাপদ আশ্রয় মনে করছে।

বিএনপির এই আত্মঘাতী, সুবিধাবাদী এবং গণবিরোধী অবস্থানের তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানাচ্ছি।

কেন?

১. গুম ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া:
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করার মধ্য দিয়ে বিএনপি কার্যত রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক অপহরণ ও নির্যাতনকে পরোক্ষ সমর্থন দিচ্ছে। বিগত ১৫ বছরে বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মী এই গুমের শিকার হয়েছেন। অথচ আজ তারা 'জাতীয় নিরাপত্তার' ঠুনকো দোহাই দিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীকে তদন্তের আওতামুক্ত রাখতে চায়। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, ক্ষমতায় থেকে বিএনপিও এই একই মরণঘাতী হাতিয়ার ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের খায়েশ লালন করছে। তারা চায় না এমন কোনো আইন থাকুক যা ভবিষ্যতে তাদের স্বেচ্ছাচারিতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

২. বিচার বিভাগকে পরাধীন রাখার পুরনো খাসলত:
বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে 'সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল' এবং নিম্ন আদালতের ওপর আইন মন্ত্রণালয়ের খবরদারি কমাতে 'পৃথক সচিবালয়' গঠনের উদ্যোগ থমকে দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ যেভাবে আদালতকে নিজেদের দলীয় কার্যালয়ের বর্ধিত অংশে পরিণত করেছিল, বিএনপিও সেই একই অন্ধকার পথে হাঁটতে চায়। বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার সুযোগ নষ্ট করার অর্থ হলো- পরবর্তী বিচারক নিয়োগ যেন আবার সেই পুরনো 'লবিং' আর 'দলীয় ক্যাডার' ভিত্তিক পদ্ধতিতে ফিরে যায়।

৩. আমলাতন্ত্র ও কায়েমি স্বার্থবাদীদের সাথে অশুভ আঁতাত:
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, এই সংস্কারগুলো বাতিলের পেছনে কলকাঠি নাড়ছে সেইসব আমলা, যারা জবাবদিহিতার ভয় পায়। অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে বিএনপি আজ সেই একই জনবিচ্ছিন্ন ও দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্রের পরামর্শে রাষ্ট্র মেরামতের পথ রুদ্ধ করছে। এটি জুলাই বিপ্লবের স্পিরিটের সাথে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

৪. ক্ষমতা উপভোগের 'মজা' বনাম জনগণের অধিকার:
রাষ্ট্র ও রাজনীতি পরিচালনায় যদি স্বচ্ছতা ও আইনি বাধ্যবাধকতা থাকে, তবে একচ্ছত্র ক্ষমতা ভোগ করা বা লুটপাট চালানো সম্ভব নয়। দুদক কিংবা তথ্য অধিকারের মতো আইনগুলো কার্যকর থাকলে দলের সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা ও নেতাদের আর্থিক অনিয়ম ঝুঁকির মুখে পড়বে। বিএনপি সম্ভবত সেই 'ক্ষমতা উপভোগের আদিম মজা' হারাতে চায় না বলেই রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিটি উদ্যোগকে নস্যাৎ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

কথা পরিষ্কার:

বিএনপি নেতারা দাবি করছেন, এগুলো পরবর্তীতে সংসদে যাচাই-বাছাই করা হবে। কিন্তু এটি সময়ক্ষেপণের এক চতুর চাল এবং পতিত ফ্যাসিবাদের উত্তরাধিকারকে সযত্নে লালন করার অপচেষ্টা মাত্র। মানবাধিকার ও গুম প্রতিরোধের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে 'পরে দেখা যাবে' নীতি আসলে অপরাধীদের এক ধরনের অঘোষিত 'ইনডেমনিটি' বা দায়মুক্তি দেওয়ারই নামান্তর।

বিএনপিকে স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিতে চাই, মানুষের রক্তের সাথে ছিনিমিনি খেলবেন না। আওয়ামী লীগ যেভাবে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের পকেটে পুরেছিল, আপনারাও যদি সেই একই পথে হাঁটেন, তবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে সময় লাগবে না।

মনে রাখবেন, অভ্যুত্থান এখনো শেষ হয়নি; রাষ্ট্র ও রাজনীতির ন্যূনতম জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এটা অব্যাহত থাকবে। জনআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী যেকোনো অশুভ সমীকরণ এবং রাজনৈতিক চতুরতাকে জনগণ রাজপথেই রুখে দেবে।

- চারু হক

26/03/2026

আমরা বিশ্বাস করতে চাই, রাষ্ট্র পরিচালনার নামে লুটপাটের কোনো মহাকাব্য রচনার জন্য এই দেশ স্বাধীন হয় নাই। এই জনপদের প্রতিটি নাগরিকের কষ্টার্জিত পাই-পয়সার হিসাব আমরা বুঝে নিতে চাই। আমাদের শ্রম ও ঘামের অর্থে প্রতিপালিত প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি এবং বাহিনীর জবাবদিহির নিশ্চয়তা চাই।

আমরা আমাদের প্রতিদিনকার যাপিত জীবনের নিরাপত্তা আর স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা চাই। যাদের অবহেলা আর অব্যবস্থাপনায় আইসিইউর সিরিয়াল পাওয়ার আগেই আমাদের শিশুরা হাসপাতালের হিমঘরে চলে যাচ্ছে- তাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দেখতে চাই।

নাগরিকের জীবনের এই ন্যূনতম মর্যাদাটুকু রক্ষা করতে না পারলে, এই স্বাধীনতার কার্যত কোনো অর্থই নাই।

25/03/2026

সম্প্রতি রাজধানীর মগবাজারে 'নবীন পাঞ্জাবি' নামক একটি পোশাক ব্র্যান্ডের ওপর যে নগ্ন আক্রমণ, হেনস্তা এবং এর মালিক নবীন হাশেমিকে প্রাণভয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য করার ঘটনা ঘটেছে, 'রাষ্ট্রচিন্তা' তার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

একজন উদ্যোক্তা যখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথা চিন্তা করে কম মুনাফায় পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নেন, তখন তাকে সহযোগিতা করার বদলে পুলিশ ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের যোগসাজশে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া এবং তাকে দেশান্তরী হতে বাধ্য করা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি অশনিসংকেত।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও আমাদের পর্যবেক্ষণ:

নবীন হাশেমি প্রবাস জীবন শেষ করে দেশে ফিরে প্রতিবন্ধী, হিজড়া সম্প্রদায় এবং বিপথগামী তরুণদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে একটি মানবিক ব্যবসায়িক মডেল দাঁড় করিয়েছিলেন। তার অপরাধ ছিল—তিনি সিন্ডিকেটের বেঁধে দেওয়া আকাশচুম্বী দাম (৪,৫০০ টাকার পাঞ্জাবি) অগ্রাহ্য করে মাত্র ৮০০ বা ১,০০০ টাকায় সাধারণ মানুষের হাতে মানসম্মত পণ্য তুলে দিচ্ছিলেন।

আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে:

* মুক্তবাজারের নামে মাফিয়াতন্ত্র: বাংলাদেশে তথাকথিত মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে আসলে একটি ‘বেসরকারি পরিকল্পনা কমিশন’ বা কার্টেল চলছে। এখানে পণ্যের দাম নির্ধারিত হয় না প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে, বরং নির্ধারিত হয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের পেশিশক্তির জোরে।

* রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষপাত: পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন সাধারণ ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা না করে সিন্ডিকেটধারী ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীন ব্যবসার পরিপন্থী।

* বিনিয়োগের নিরাপত্তাহীনতা: যখন একজন সৎ উদ্যোক্তাকে ‘সিংহের মতো বাঁচতে চাই, কিন্তু সন্তানদের এতিম করতে চাই না’ বলে দেশ ছাড়তে হয়, তখন বুঝতে হবে এ দেশে সুস্থ ব্যবসার পরিবেশ মৃতপ্রায়।

ব্যবসায়িক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ও বাস্তবতা:

বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার ব্যবসায়িক পরিবেশ বা ‘ইজ অব ডুইং বিজনেস’ সূচকে বাংলাদেশ বরাবরই নিচের সারিতে অবস্থান করছে। যদিও সরকার অবকাঠামোগত উন্নতির কথা বলছে, কিন্তু এই বাস্তব সূচকগুলো প্রমাণ করে যে সাধারণ উদ্যোক্তাদের জন্য পথ কতটা কণ্টকাকীর্ণ।

* বাজার দখল ও সিন্ডিকেট: ওষুধ, শিশুখাদ্য থেকে শুরু করে পোশাক খাত- সবখানেই রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক নেক্সাস বা আঁতাত জেঁকে বসেছে।

* প্রতিযোগিতার অভাব: নতুন উদ্যোক্তারা যখনই প্রচলিত উচ্চমূল্যের বিপরীতে বিকল্প নিয়ে আসছেন, তখনই তাদের মাফিয়া স্টাইলে দমন করা হচ্ছে।

ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতে রাষ্ট্রচিন্তার সুপারিশমালা:

দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং মেধা পাচার রোধে ‘রাষ্ট্রচিন্তা’ সরকারের কাছে নিম্নলিখিত দাবি ও সুপারিশ পেশ করছে-

১. সিন্ডিকেটবিরোধী স্বাধীন কমিশন: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি শক্তিশালী কমিশন গঠন করতে হবে, যারা বাজার কারসাজি এবং ‘প্রাইস ফিক্সিং’ (মূল্য নির্ধারণী সিন্ডিকেট) কঠোরভাবে দমন করবে।

২. নবীন হাশেমির নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ: নবীন হাশেমিকে যথাযথ নিরাপত্তা দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং তার ব্যবসায়িক ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

৩. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা: যেসব পুলিশ সদস্য বা কর্মকর্তা ওই সিন্ডিকেটকে সহায়তা করে দোকান বন্ধ করেছেন, তাদের চিহ্নিত করে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হবে।

৪. ভোক্তা অধিকার আইনের আমূল সংস্কার: ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে কেবল খুচরা দোকানে জরিমানা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, বড় বড় কার্টেল বা সিন্ডিকেট ভাঙার ক্ষমতা ও সদিচ্ছা প্রদর্শন করতে হবে।

৫. লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি: নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিড়ম্বনামুক্ত ট্রেড লাইসেন্স এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো ‘অলিখিত চাপ’ তাদের উদ্ভাবনী উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে।

একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয় যখন সেখানে সাধারণ মানুষের উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন সুরক্ষিত থাকে। এই প্রেক্ষিতে নবীন হাশেমির দেশত্যাগ শুধু একজন সৎ ব্যবসায়ীর ব্যক্তিক পরাজয় নয়, এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার নৈতিক পরাজয়। আমরা অবিলম্বে এই সিন্ডিকেটের হোতাদের বিচার এবং সুস্থ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানাচ্ছি।

23/03/2026

আওয়ামী শাসনামলে মেধার চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ায় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানসমূহ পেশাদারিত্ব হারিয়ে প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার জনমনে বিপুল আশার সঞ্চার করলেও, এক পর্যায়ে খোদ এর উপদেষ্টাদের নিয়োগ ও নিয়্যত নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। জনগণ তাই নির্বাচিত একটি সরকারের জন্যে এই ভেবে অপেক্ষা করতে থাকে যে, গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট হয়তো প্রশাসনের ভেতরে কাঙ্ক্ষিত নৈতিক শৃঙ্খলা ও ভারসাম্য ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু সরকারের সাম্প্রতিক নিয়োগগুলো সেই আশার জায়গাটিকেই পুনরায় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

নবগঠিত সরকারের নিয়োগ বিতর্কের সাম্প্রতিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখা দিয়েছে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পদ। ১৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের নয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে যে শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তিনি পেশাগতভাবে একজন শিক্ষক হলেও তাঁর সবচেয়ে পরিচিত পরিচয় হলো- তিনি সরকার দলের কেন্দ্রীয় শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক। একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান যখন রাজনৈতিক কার্যক্রমে সক্রিয় থাকেন, তখন প্রতিষ্ঠানটির নিরপেক্ষতা বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে- একাডেমিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে কি গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার মানদণ্ডই প্রধান হওয়া উচিত, নাকি রাজনৈতিক আনুগত্যও সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে? আর সেই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় আরও একটি সংশয়: বর্তমান সরকার কি সত্যিই জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে আগ্রহী, নাকি অনুগত শিক্ষক সমাজ তৈরির পুরনো পথেই হাঁটছে?

একইভাবে ইউজিসি চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন এমন একজন শিক্ষক, যিনি সরকার দলের চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এবং দলের একটি অঙ্গসংগঠনের সভাপতি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও সরাসরি দলীয় নেতৃবৃন্দকে উপাচার্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানো হয়েছে। প্রতিটি নিয়োগেই একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্ব কিংবা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা অভিজ্ঞতার বদলে ‘সাদা দল’ বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যানারের প্রতি আনুগত্যকে পরম ও প্রধান যোগ্যতা বিবেচনা করা হয়েছে। এখানেও তাই একই প্রশ্ন উঠছে, বর্তমান সরকারও কি পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে মেধার চেয়ে তদবির ও রাজনীতিকে প্রাধান্য দিচ্ছে?

বিশ্ববিদ্যালয় মানে মেধা ও জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্র, যেখানে আগামীর চিন্তা নির্মিত হয় এবং সমাজের নৈতিক দিকনির্দেশ নির্ধারিত হয়। এ কারণে উপাচার্যের মতো পদে এমন ব্যক্তিবর্গের প্রয়োজন, যারা প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি বৌদ্ধিক নেতৃত্ব দিতে সক্ষম; যারা জ্ঞান উৎপাদন বা গবেষণাকে এগিয়ে নেবেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতিষ্ঠানের অবস্থান শক্তিশালী করবেন এবং মুক্ত চিন্তার পরিবেশ নিশ্চিত করবেন। কিন্তু যখন নিয়োগের মানদণ্ড হিসেবে রাজনৈতিক আনুগত্য, মিছিলে উপস্থিতি বা লিয়াজোঁ করার ক্ষমতা গুরুত্ব পায়, তখন বিশ্ববিদ্যালয় তার মৌলিক চরিত্র হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি বিপজ্জনক ধারণা জন্ম নেয়- এখানে মেধা নয়, বরং রাজনৈতিক সংশ্লেষই নির্ধারক শক্তি। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য ও বিধেয়কে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ বিতর্কের প্রায় একই সময়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাতেও স্পষ্ট দলীয়করণের চিত্র দৃশ্যমান হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ সারা দেশের ৪২টি জেলা পরিষদ এবং বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনে সরকার দলের নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগেও ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে একই ধারা অনুসরণ করা হয়েছিল। প্রশাসনিক প্রয়োজনের যুক্তি সামনে আনা হলেও এই ধারাবাহিক পদক্ষেপ স্থানীয় সরকারের স্বায়ত্তশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কারণ, প্রশাসনিক নিয়োগের মাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নেতৃত্বে আনা হলে তাদের দায়বদ্ধতা স্বাভাবিকভাবেই জনগণের পরিবর্তে রাজনৈতিক কেন্দ্রের দিকে সরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে, যা গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের মূল দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, স্থানীয় সরকারের সিদ্ধান্তগুলো নাগরিক জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। এই কাঠামো দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হলে, জনসেবার গুণগত মান ব্যাহত হওয়া অনিবার্য। প্রশাসনিক ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের এই একীভূতকরণ ভবিষ্যৎ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের পথকেও প্রশস্ত করে। ফলে স্থানীয় সরকার তার স্বতন্ত্র গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে একটি 'নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায়' রূপ নেয়; যেখানে জন-অংশগ্রহণের চেয়ে দলীয় নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিতার চেয়ে আনুগত্যই মুখ্য হয়ে ওঠে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক একটি নিয়োগ দেশজুড়ে বিস্তৃত আলোচনা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে একজন ঋণখেলাপী ব্যবসায়ীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের আর্থিক ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত। সাধারণত এই গুরুত্বপূর্ণ পদে অর্থনীতিবিদ বা অভিজ্ঞ ব্যাংকারদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কারণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি দেশের মুদ্রানীতি নির্ধারণ, আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং ব্যাংকিং খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মূল দায়িত্ব পালন করে। এই প্রেক্ষাপটে এমন একজন ব্যক্তিকে এই পদে আসীন করা, যার সাথে বাণিজ্যিক স্বার্থের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, তা অবধারিতভাবেই ‘স্বার্থের সংঘাত’ (Conflict of Interest)-এর প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও সিপিডি-র মতো সংস্থাগুলো ইতোমধ্যেই এই নিয়োগের স্বচ্ছতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, যা পুরো বিতর্ককে আরও জোরালো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি রাষ্ট্রের “আর্থিক বিবেক”। কারণ, এখানকার নীতিনির্ধারণ সরাসরি মুদ্রাস্ফীতি, ঋণপ্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনাকে প্রভাবিত করে। এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে নিরপেক্ষতা, কঠোরতা এবং পেশাগত সততা তাই অপরিহার্য। কিন্তু যখন এমন একজনকে এই দায়িত্বে বসানো হয়, যার পেশাগত স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে এবং যার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট দায়ের হয়েছে, তখন জনমনে আস্থার সংকট তৈরি হওয়া অবশ্যম্ভাবী। বিশেষকরে অতীতের আর্থিক অনিয়ম ও অর্থপাচারের অভিজ্ঞতা বিবেচনায়, এই ধরনের সিদ্ধান্ত দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ প্রতীয়মান হচ্ছে। এতে করে একটি উদ্বেগ ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে- রাষ্ট্রের আর্থিক নিরাপত্তার চেয়ে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থই কি নতুন সরকারের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে?

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বকে ঘিরেও তৈরি হয়েছে আরেকটি বিতর্কিত অধ্যায়। একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত তার আন্তর্জাতিক পরিচয়, কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের মানচিত্র নির্ধারণ করে। তাই এই সংবেদনশীল মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এমন ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন, যার ওপর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সাম্প্রতিক নিয়োগে দেখা গেছে, অতীতে বিতর্কিত অবস্থানে থাকা একজন ব্যক্তিকেই এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। বিশেষত, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে যার ভূমিকা নিয়ে খোদ নিজ শিবিরের নেতারাই প্রশ্ন তুলেছিলেন, তাকেই স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে আসীন করা হয়েছে। এই দ্রুত অবস্থান পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট 'রাজনৈতিক স্মৃতি' এবং বর্তমান বাস্তবতার মধ্যকার বৈপরীত্য জনমনে গভীর সংশয় তৈরি করেছে।

রাজনীতির ইতিহাসে কৌশলগত অবস্থান বদল নতুন কিছু নয়; কিন্তু যখন সেই পরিবর্তনের কোনো গ্রহণযোগ্য নৈতিক ব্যাখ্যা থাকে না, তখন তা আস্থার সংকটে রূপ নেয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ধারক। তাই এখানে শীর্ষ নেতৃত্বের বিষয়টি যেমন প্রশাসনিক, তেমনি গভীরভাবে নৈতিকও। যখন এমন কাউকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয় যিনি দলীয় অভ্যন্তরেই প্রশ্নবিদ্ধ, তখন রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে- যাকে কিছুদিন আগে জনসমক্ষে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছিল, ক্ষমতার কোন সমীকরণে তাকে এমন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হলো?

রাষ্ট্রের শক্তিমত্তা ও দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নির্ভর করে তার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতার ওপর। কোনো রাষ্ট্রই রাতারাতি ভেতর থেকে দুর্বল হয় না; বরং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো ভুল মানুষের হাতে সঁপে দেওয়ার মাধ্যমেই এর প্রাতিষ্ঠানিক পঙ্গুত্ব শুরু হয়। বর্তমান নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলোতে স্বচ্ছতার অভাব এবং মেধার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়ার যে সংস্কৃতি পুনরায় দেখা যাচ্ছে, তা মূলত পুরনো অদক্ষতা ও দুর্নীতিকেই নতুন করে উৎসাহিত করছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যোগ্য ও দূরদর্শী জনবল নিয়োগ দেওয়া কোনো বাড়তি চাওয়া নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার পূর্বশর্ত। যখন পেশাদারিত্বের জায়গায় রাজনৈতিক আনুগত্য জেঁকে বসে, তখন কেবল প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতাই নষ্ট হয় না, বরং রাষ্ট্রের প্রতি সাধারণ মানুষের মৌলিক আস্থাও বিপন্ন হতে শুরু করে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সংকট হলো- জনপ্রিয়তার উন্মাদনা অনেক সময় নীতিনির্ধারণের নূন্যতম বৌদ্ধিক প্রস্তুতিকেও ছাপিয়ে যায়। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলন, মিছিল কিংবা নির্বাচনী প্রচারণায় যতটা পারদর্শী, রাষ্ট্র পরিচালনার সূক্ষ্ম ও জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের নীতিগত ও দার্শনিক ভিত্তি ঠিক ততটাই নড়বড়ে। যখন রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রস্তুতিতে এমন বিস্তর ঘাটতি থাকে, তখন শাসনব্যবস্থা অনিবার্যভাবেই তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়াগুলো ক্রমশ পেশাদারিত্ব হারায় এবং শেষ পর্যন্ত তা গভীর জনআস্থার সংকটে নিমজ্জিত হয়।

শেষপর্যন্ত সব বিতর্কই জনগণের প্রত্যাশার কেন্দ্রে ফিরে আসে। গণতন্ত্র যতটা না ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের পদ্ধতি, তারচেয়ে বেশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনের একটি প্রক্রিয়া। প্রতিটি নিয়োগে তাই স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কোনো সাধারণ সুযোগ নয়, বরং রাষ্ট্রের সম্মানজনক অস্তিত্ব ও সুরক্ষার এক অনিবার্য শর্ত। মেধা ও পেশাদারিত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা না হলে, রাষ্ট্রকে কাঠামোগত অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই পথ চলতে হবে।।

20/03/2026

উৎসবের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা সমাজের প্রতিটি স্তরে সমানভাবে পৌঁছায়। বৈষম্যহীন সমাজ গঠন ছাড়া তাই প্রকৃত উৎসব সম্ভব নয়।

ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিসর ছাড়িয়ে আমাদের রাষ্ট্রভাবনা হোক আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক।

একটি স্বচ্ছ, দায়বদ্ধ এবং মানবিক শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আমাদের সংহতি বজায় থাকুক।

ঈদ মোবারক 🌙

20/03/2026

ঈদের আনন্দ যখন ঘরে ঘরে কড়া নাড়ছে, চারদিকে যখন উৎসবের জোয়ার- তখন দেশের অগণিত আলু ও পেঁয়াজ চাষীর ঘরে শুধুই বিষাদ। যে ঈদ হওয়ার কথা ছিল পরম স্বস্তির, সেই ঈদ আজ তাদের কাছে দুশ্চিন্তার পাহাড়। কারণ, রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে যে কৃষকরা আমাদের মুখে অন্ন তুলে দেন, তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির ফসলের ন্যায্য দাম নেই বাজারে। তার ওপর অকাল বৃষ্টির অভিশাপ মাঠের ফসল মাঠেই পচিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেট ভারী হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কৃষক বয়ে বেড়াচ্ছে দেনার দায়। এবং এইসব সংকট বহাল থেকে যাচ্ছে নিতান্তই রাষ্ট্রের কাঠামোগত অবহেলায়।

শিল্পপণ্যের ক্ষতি হলে বীমা সুবিধার নানা পথ খোলা থাকলেও, কৃষকের ফসলের সুরক্ষায় আজও সর্বজনীন শস্যবিমা চালু করা হয়নি। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সব হারিয়ে কৃষক যখন নিঃস্ব হয়, তখন সেই দায়ভার নেওয়ার মতো প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কাঠামো খুঁজে পাওয়া যায় না।

একইভাবে, বাজারে প্রতিটি ক্ষুদ্র শিল্পপণ্যের দামও যেখানে উৎপাদন খরচের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত থাকে, সেখানে কৃষি পণ্যের দাম কেন কেবল বাজারের অনিশ্চিত মর্জির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, সেই প্রশ্ন তোলা আজ জরুরি হয়ে পড়েছে। কৃষি পণ্যের উৎপাদন খরচ বিবেচনা করে একটি টেকসই ও ন্যায্য মূল্য কাঠামো নিশ্চিত না করলে কৃষক কখনোই এই ঋণের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।

এই দীর্ঘস্থায়ী দুর্দশার অন্যতম প্রধান কারণ হলো কৃষকদের নিজস্ব এবং শক্তিশালী কোনো পেশাদার সংগঠনের অনুপস্থিতি। বর্তমানে কৃষক সংগঠনের নামে যা দেখা যায়, তার অধিকাংশই দলীয় লেজুড়বৃত্তি। ফলে কৃষকরা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েন, তাদের দাবিগুলো পৌঁছায় না নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে।

অথচ, দেশের বিশাল এই জনগোষ্ঠী যদি সত্যিকারের স্বাধীন ও পেশাদার সংগঠনের আওতায় আসত, তবে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে তাদের মতামতের গুরুত্ব থাকত সবার উপরে। এমনকি নতুন প্রজন্মের যেসব শিক্ষিত তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে আসছেন, তারাও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর আধুনিক বিপণন ব্যবস্থার অভাবে প্রতিনিয়ত হোঁচট খাচ্ছেন।

নাগরিকের খাদ্যের জোগানদাতা যখন উৎসবেও চোখের জল ফেলেন, তখন সেই রাষ্ট্রের উন্নয়নের ভিত্তি নড়বড়ে হতে বাধ্য। কৃষক বাঁচলে তবেই দেশ বাঁচবে। এই শোচনীয় অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কৃষক, কৃষি উদ্যোক্তা এবং কৃষিজীবীদের দল-মত নির্বিশেষে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। কৃষি ও কৃষক রক্ষায় সোচ্চার হওয়ার এবং তাদের অধিকার আদায়ের এখনই সময়।

19/03/2026

বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার প্রধান কারিগর আমাদের পোশাক শ্রমিকগণ। আমাদের রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আর উন্নয়নের যে চটকদার চিত্র আমরা দেখি, তার প্রতিটি সুতোর ভাঁজে মিশে আছে এইসব মানুষের হাড়ভাঙা খাটুনি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, উৎসবের মৌসুমে যখন দেশজুড়ে কেনাকাটার ধুম পড়ে, তখন এই খাতের শ্রমিকদের বড় একটি অংশকে লড়তে হয় বকেয়া বেতন আর নামমাত্র বোনাসের অনিশ্চয়তা নিয়ে।

সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদ ও মাঠপর্যায়ের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, অনেক কারখানায় এখনো শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। বর্তমান আকাশচুম্বী বাজারদরের ভিড়ে একজন শ্রমিকের যে বেতন, তা দিয়ে ঘরভাড়া আর চাল-ডাল কিনতেই হিমশিম খেতে হয়। এর ওপর বোনাস যখন কেবল ‘বেসিক’ বা মূল বেতনের অর্ধেক হিসেবে ধরা হয়, তখন সেই টাকা দিয়ে উৎসব পালন করা তো দূরের কথা, ঢাকা থেকে গ্রামে ফেরার যাতায়াত খরচ মেটানোই কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষকরে সাব-কন্ট্রাক্ট কারখানাগুলোতে সরকারি তদারকির অভাব এবং হুটহাট কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার (লে-অফ) ফলে হাজার হাজার শ্রমিক আজ দিশেহারা। রাষ্ট্রচিন্তা মনে করে, একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই সার্থক হয়, যখন সেই উন্নয়নের কারিগরদের জীবনমান উন্নত হয়। কেবল রপ্তানির রেকর্ড দিয়ে একটি খাতের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, যদি না শ্রমিকের পেটে খাবার আর মনে শান্তি থাকে।

এই বাস্তবতায় 'রাষ্ট্রচিন্তা'-র পক্ষ থেকে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আমাদের জরুরি আহ্বান:

১. ঈদের ছুটির আগেই প্রতিটি শ্রমিকের বেতন ও পূর্ণাঙ্গ বোনাস নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অজুহাতে যেন শ্রমিকের ঘামঝরানো টাকা বকেয়া না থাকে, সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

২. ডিআইএফই (DIFE) এবং বিজিএমইএ-কে কেবল কাগজে-কলমে নয়, বরং সরাসরি কারখানাগুলোতে গিয়ে প্রকৃত অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ও সাব-কন্ট্রাক্ট কারখানাগুলোর শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

৩. বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সংগতি রেখে শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে। উৎসবের বোনাস যেন কেবল দায়সারা না হয়ে শ্রমিকের প্রকৃত প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম হয়, সেই নীতি প্রণয়ন করতে হবে।

৪. উৎসবের মুখে হুট করে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া বা শ্রমিক ছাঁটাইয়ের অমানবিক প্রবণতা বন্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। বেকার হওয়া শ্রমিকদের দ্রুত বকেয়া আদায়ের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

পোশাক খাত আমাদের অর্থনীতির প্রাণ। এই খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করা কোনো দয়া নয়, বরং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য বিনিয়োগ। আমরা আশা করি, সরকার ও মালিকপক্ষ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই সংকটের সমাধানে এগিয়ে আসবে।

Want your business to be the top-listed Government Service in Dhaka?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Telephone

Address


Purana Paltan
Dhaka
1000