19/09/2025
জিহ্বার শক্তি — রাজা ও তিন সন্তানের গল্প:
এক ছিলো জ্ঞানী রাজা—বহু যুদ্ধ জিতেছেন, তবু তিনি জানতেন: মানুষের সবথেকে বড় জয় মিলে থাকে কথার জোরে। তাঁর তিন সন্তান ছিল—বড় পলি, মাঝখানে মলি, আর ছোট ডলি। একদিন রাজা সবাইকে ডেকে বললেন—
“জিহ্বা দিয়ে তলোয়ার দেওয়া যায় আর সেতু বানানোও যায়। আজ তোমরা তিনজনই জিহ্বার পরীক্ষা দেবে—
১) একজন দরিদ্র কৃষকের মনে আশা জাগাবে,
২) এক কঠোর ব্যবসায়ীর মন নরম করবে,
৩) আর এক শত্রুর হৃদয়ে শান্তি বপন করবে।”
প্রথম সন্তান — পলি
পলি কৃষকের সামনে গমন করে উচ্চ স্বরে বলল,
“তুমি তো দেশের শ্রেষ্ঠ কৃষক; তোমার পরিশ্রম নির্মলের মতো।”
কৃষক প্রথমে খুশি হলেও মনটা ভরে উঠল সন্দেহে—পলির কণ্ঠে আন্তরিকতার অনুপস্থিতি ছিল। সময় গেলে বোঝা গেলো—বড়াই আর খাঁটি উৎসাহের মধ্যে ফারাক আছে; ফাঁকা প্রশংসা বহুবার মানুষের ভিতরে কুৎসিত আশা জন্মায়, যা ভাঙলে কষ্টও হয়।
দ্বিতীয় সন্তান — মলি
মলি গেলো ফল ব্যবসায়ীর কাছে। সে ধীরে কণ্ঠে বলল,
“তোমার দৃঢ়তা লোককে রক্ষা করেছে; যদি একটু নম্রতা যোগ করো, ব্যবসাও টিকবে এবং মানুষ তোমায় আরও সম্মান করবে।”
মিলি শুধু প্রশংসা করেনি—সৎ পরামর্শ ও সদিচ্ছা দিল। ব্যবসায়ী প্রথমে অবাক, পরে কণ্ঠে নরমতা এলো। মলির কথায় দেখা গেলো—সত্য ও সদ্ভাব দিয়ে কঠোর মনও বদলে যায়।
তৃতীয় সন্তান — ডলী
ডলি গেলো প্রতিবেশী রাজা বরেন্দ্রর কাছে, যিনি বহুদিন ধরে রাগ ও সন্দেহে টিকে আছেন। বরেন্দ্র কটু কথা বলল; ডলি প্রথমে শুধু শুনল, কোনো জবাব দিল না। কিছুক্ষণ নিরবতার পর সে বলল,
“তোমার কষ্টের কাহিনি শুনালে আমার কাছে তা বোঝা সহজ হবে—তুমি বলো, আমি শুনি।”
ডলি সম্মান আর সহানুভূতিতে কথা বলল; সে প্রশ্ন করল, শুনল, বোঝার চেষ্টা করল। কথার ভেতর সততা আর শ্রদ্ধা থাকায় বরেন্দ্রর রাগ গলতে লাগল। দুই রাজ্যের মাঝের শত্রুতা ধীরে ধীরে মিলেমিশে বন্ধুত্বের পথে নেমে এলো।
রাজার শিক্ষা:
কালান্তরে তিন সন্তান ফিরে এলে রাজা বললেন—
“পলি দেখালো, শব্দ যদি খাঁটি না হয়, তা মানুষকে ভাসাবে, পরে ডোবাবে।
মলি প্রমাণ করলো—সত্য, নম্রতা ও সদিচ্ছায় কঠোর হৃদয়ও নরম হয়।
অবশেষে ডলি শেখালো—শোনা এবং সম্মান দেখানোই শান্তি আনতে পারে।”
রাজা আরও যোগ করলেন, “জিহ্বা আগুনও হতে পারে, অমৃতও হতে পারে। কথার আগে তিনবার ভাবো—এটি কি কারও মর্যাদা রক্ষা করছে? এটি কি সত্য? এটি কি কারো জন্য উপকার করছে? যেখানে কথা আঘাত করে, সেখানে চুপ থাকাই শ্রেয়।”
নীতি (ভাবার্থ):
কথা মানুষের সবচেয়ে সূক্ষ্ম অস্ত্র। সঠিকভাবে বলা হলে মানুষকে বাঁচায়, উৎসাহ দেয়, শান্তি দেয়; অন্যথায় তা ভাঙে, আঘাত দেয়, বিশ্বাসকে ধ্বংস করে। তাই প্রাত্যহিক জীবনে প্রতিটি শব্দের দায়িত্ব নাও—কথা বলো যাতে কেউ মানসিকভাবে বেঁচে থাকে, মর্যাদা পায় এবং পথ খুঁজে পায়।