05/08/2025
গণঅভ্যুত্থান, ৫ আগস্টের চেতনা, আগামীর বাংলাদেশ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট—এই সময়কাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে বাংলাদেশের ইতিহাসে। সবুজ শ্যামল বাংলায় রচিত হল আরেকটি রক্তাক্ত ইতিহাস। প্রায় দুই সহস্র দেশপ্রেমিক ছাত্র-জনতার রক্তের নজরানায় দেশ মুক্তি পায় ফ্যাসিস্টের হিংস্রতা থেকে। ভারতীয় আধিপত্যবাদ থেকে পরিত্রাণ পায় বাংলাদেশ। দীর্ঘ ১৬ বছর খুন, গুম, জেল-জুলুম, নৈরাজ্যোর ভয়ংকর উপত্যকায় পরিণত করে রাখা হয়েছিল। স্বৈরাচারী লুটেরা এ দেশকে বানিয়ে রেখেছিল লুটতন্ত্রের রাজ্য। এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্যে দেশের শিশু-কিশোর থেকে নিয়ে যুবক, বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ সকলে রাজপথে নেমে এসেছিল। মুক্তির সংগ্রামে বুলেটের সম্মুখে বুক পেতে দিয়েছে সকলে।
পতন হয় স্বৈরাচারের। পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় মোদীর আশ্রয়ে। বাংলার রক্তিম আকাশে উদিত হয় নব স্বাধীনতার সূর্য। গোটা বাংলাদেশ নেমে এলো আনন্দ উল্লাসে রাজপথে। শুকরিয়া জ্ঞাপনে সিজদায়বনত হয় মুক্তি পাওয়া মজলুম জনতা। শহর-বন্দর, পাড়া-মহল্লা সর্বত্র ধ্বনিত হয় "নারায়ে তাকবির--আল্লাহু আকবার", "ইনকিলাব-- জিন্দাবাদ"। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতে ওঠে গোটা বাংলাদেশ। রচিত হল গণজাগরণের রক্তিম এক মহাকাব্য!
শুরু হয়েছিল নিপীড়িত ছাত্রসমাজের কণ্ঠে “কোটা সংস্কার”-এর ন্যায্য দাবি দিয়ে, তা ক্রমেই পরিণত হয় একটি সর্বাত্মক গণঅভ্যুত্থানে। স্কুল, কলেজ, মাদরাসার ছাত্র, শিক্ষক, কওমী ওলামায়ে কেরাম, পেশাজীবী, শ্রমজীবী, বুদ্ধিজীবী সর্বস্তরের মানুষ জেগে ওঠে। তারা একসাথে রাজপথে নামে, বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্রীয় জুলুম, দুঃশাসন, বৈষম্য আর নতজানু পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে।
রাজপথ ভেসে যায় তাজা রক্তে। শহীদ হন শত শত ছাত্র, তরুণ, শ্রমিক, আলেম। গুলিবিদ্ধ হয়, গুম হয়, কারাবরণ করে অগণন প্রতিবাদী কণ্ঠ। শিক্ষাঙ্গনের আঙিনা হয় রক্তাক্ত, মসজিদের মিনারে ওঠে প্রতিবাদের স্লোগান।
৫ আগস্ট—এই দিনটি তাই নিছক কোনো তারিখ নয়; এটি এক যুগের অন্ধকারাচ্ছন্ন দুঃশাসনের করাল অবসান! এই দিনেই স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও পলায়নের মধ্য দিয়ে একটি হিংস্র, বর্বর যুগের সমাপ্তি ঘটে। এদিন বাংলার মাটিতে নতুন ইতিহাস রচিত হয়। এদিন গণমানুষ বিজয় অর্জন করে।
এই অভ্যুত্থান কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়—এ ছিল নিপীড়িত জনগণের অভিন্ন আর্তনাদ, সম্মিলিত দুঃখের বিস্ফোরণ। ছাত্র-জনতার শাহাদাত, ওলামায়ে কেরামের রক্ত, সাধারণ মানুষের চোখের জল—এই সবকিছু মিশে গিয়েছে ৫ আগস্টের চেতনায়। এই বিজয় তাই সবার, এই আনন্দ গোটা জাতির।
এ বিজয় আমাদের কাঁধে নতুন দায়িত্বও এনে দিয়েছে—একটি নতুন, ইনসাফভিত্তিক, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার ঐতিহাসিক দায়িত্ব।
আমরা চাই—
যেখানে দুর্নীতি থাকবে না, বৈষম্য থাকবে না, থাকবে না দলীয় দাসত্বে নিয়োজিত প্রশাসন।
নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশে ইসলামি মূল্যবোধ হবে রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি।
ইসলামপন্থী শক্তির প্রতি রাষ্ট্রীয় অবজ্ঞা, অপবাদ আর মিথ্যা নাটকের অবসান ঘটবে।
“উগ্রবাদ” বা “চরমপন্থা”র লেবেল সেঁটে আর কখনো যেন ইসলামী চেতনাকে দমন করার হীন চেষ্টা না হয়।
এখন সময় এসেছে—
প্রতিটি নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার,
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার,
নির্বাচনে অংশগ্রহণের সমান সুযোগ প্রদানের,
আইনের চোখে সবাইকে সমান করে তোলার।
আমরা আর চাই না ফ্যাসিবাদ কোনো নতুন রূপে ফিরে আসুক। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন আর কখনো গণতন্ত্রের মুখোশ পরে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে কুক্ষিগত করতে না পারে। রাষ্ট্র জনগণেরই—এই বিশ্বাসে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠিত করতে হবে।
রাষ্ট্রযন্ত্রকে করতে হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, প্রশাসনকে করতে হবে জবাবদিহিমূলক, রাজনীতিকে গড়ে তুলতে হবে জনকল্যাণভিত্তিক।
আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে চাই—
আর কখনো যেন এই দেশে প্রকৃত সন্ত্রাসবাদের পরিবর্তে ইসলামপন্থীদের নামে সাজানো ‘জঙ্গি নাটক’ মঞ্চস্থ না হয়।
আর কোনো নিরপরাধ নাগরিক যেন রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার না হয়।
প্রতিটি মানুষ পাবে সুবিচার, পাবে মর্যাদা, পাবে বেঁচে থাকার অধিকার।
৫ আগস্ট শুধু একটি বিজয়ের দিন নয়, এটি নবজাগরণের সূচনা, এটি ইতিহাসের বাঁকবদলের দিন।
আসুন, আমরা সবাই মিলে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে নতুন শপথ নেই:
আমরা গড়ব একটি নতুন বাংলাদেশ—ইনসাফের, মানবিকতার, বৈষম্যহীনতার, ইসলামের আদর্শে উজ্জ্বল এক বাংলাদেশ।
লেখক: উস্তাদে মুহতারাম হযরত @
Bahauddin Zakaria হাফি.
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ।
প্রিন্সিপাল, জামিয়া হোসাইনিয়া ইসলামিয়া আরজাবাদ