15/09/2026
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে মোহনদাস গান্ধী এবং মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, এই দুজনই অপরিহার্য। একজন অহিংস গণআন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়েছিলেন; অন্যজন সাংবিধানিক রাজনীতি ও আলোচনার মাধ্যমে ভারতীয় মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁদের পথ আলাদা হয়ে যায় কিন্তু তাঁদের মধ্যকার সম্পর্ক মোটেই শত্রুতার ছিল না।
গান্ধীর চেয়ে জিন্নাহ ভারতীয় জাতীয় রাজনীতিতে আগে প্রতিষ্ঠিত হন। ব্যারিস্টার জিন্নাহ প্রথম জীবনে কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ধর্মীয় পরিচয়ের বদলে সাংবিধানিক অধিকার, প্রতিনিধিত্ব এবং ধাপে ধাপে স্বশাসন অর্জনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন।
"হিন্দু-মুসলমানের যৌথ রাজনৈতিক আন্দোলন ছাড়া ব্রিটিশদের পরাজিত করা সম্ভব নয়" এটাই ছিল তাঁর প্রাথমিক অবস্থান।
১৯০৬ সালে ঢাকায় সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হলেও জিন্নাহ এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না। বরং তিনি প্রথমদিকে মুসলিম লীগকে সাম্প্রদায়িক সংগঠন মনে করে দূরে ছিলেন এবং ১৯১৩ সালে সংগঠনটিতে যোগ দেন। একই সময়ে তিনি কংগ্রেসের সদস্যও ছিলেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ঐতিহাসিক বিবরণ অনুসারেও জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনের এই পরিবর্তনটি গুরুত্বপূর্ণ।
১৯১৬ সালের লক্ষ্ণৌ চুক্তিতে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় জিন্নাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এই কারণেই কংগ্রেস নেত্রী সরোজিনী নাইডু তাঁকে “হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত” বলে অভিহিত করেছিলেন। তখনকার জিন্নাহ পাকিস্তানের দাবিদার নন; বরং একটি ঐক্যবদ্ধ ভারতবর্ষে মুসলমানদের সাংবিধানিক নিরাপত্তার প্রবক্তা।
গান্ধী ১৯১৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই কংগ্রেসের রাজনীতিকে আমূল বদলে দেন। কংগ্রেস এতদিন মূলত শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত মানুষের সাংবিধানিক সংগঠন ছিল। গান্ধী কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষকে রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এলেন।
এখানেই দুজনের মৌলিক পার্থক্য প্রকাশ পায়।
গান্ধী বিশ্বাস করতেন সত্যাগ্রহ, অসহযোগ, ব্রিটিশ আইন অমান্য এবং অহিংস গণআন্দোলনে। জিন্নাহ বিশ্বাস করতেন আইনসভা, আলোচনা, রাজনৈতিক সমঝোতা ও সাংবিধানিক পদ্ধতিতে। গান্ধীর ধর্মীয় প্রতীকনির্ভর গণরাজনীতিও জিন্নাহকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। ব্যক্তিজীবনে শিয়া মুসলিম হলেও জিন্নাহর রাজনৈতিক ভাষা ছিল মূলত আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও আইনকেন্দ্রিক।
১৯২০ সালে গান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে খিলাফত আন্দোলনকে যুক্ত করলে জিন্নাহ তীব্র আপত্তি করেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, রাজনীতিতে ধর্মীয় আবেগ এবং জনতার উত্তেজনা প্রবেশ করলে সাংবিধানিক শৃঙ্খলা নষ্ট হবে। তিনি গান্ধীকে চিঠি লিখে সতর্ক করেন এবং শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস ত্যাগ করেন।
এটি শুধু ব্যক্তিত্বের সংঘাত ছিল না; ছিল রাজনৈতিক দর্শনের বিরোধ। গান্ধীর কাছে স্বাধীনতা ছিল নৈতিক ও গণজাগরণের সংগ্রাম। জিন্নাহর কাছে তা ছিল ক্ষমতা, অধিকার ও প্রতিনিধিত্বের একটি সাংবিধানিক সমীকরণ।
গান্ধী ও জিন্নাহ দীর্ঘদিন রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলেন এবং প্রবল মতবিরোধের মধ্যেও একে অপরকে গুরুত্ব দিতেন। বর্তমান যুগের রাজনীতিতে যা একেবারেই দেখতে পাওয়া যায়না বলেই আমাদের মাথায় ওদের মধ্যকার এই সম্পর্কটা কেমন ছিল সেটা কল্পনা করা কঠিন।
তাঁদের জীবনযাপনেও তীব্র বৈপরীত্য ছিল। গান্ধী পরতেন ধুতি, থাকতেন আশ্রমে এবং সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলতেন। জিন্নাহ ছিলেন নিখুঁত পোশাকপরিচ্ছদের শিক্ষিত ব্যারিস্টার; তাঁর রাজনীতি ছিল পরিমিত, যুক্তিনির্ভর এবং অভিজাত সংসদীয় ধারার।
গান্ধী জনতার হৃদয়ের ভাষা বুঝতেন। জিন্নাহ বুঝতেন আইন, রাষ্ট্রক্ষমতা ও দর-কষাকষির ভাষা। ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে দুজনেরই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তাঁদের পদ্ধতিগত দূরত্ব ক্রমে রাজনৈতিক দূরত্বে পরিণত হয়।
১৯৩০-এর দশকের শুরুতে ভারতীয় রাজনীতির প্রতি হতাশ হয়ে জিন্নাহ লন্ডনে চলে যান এবং সেখানে আইন পেশায় মনোযোগ দেন। অনেকেই মনে করেন, তিনি তখন কার্যত সক্রিয় ভারতীয় রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছিলেন।
এই সময়ে আল্লামা ইকবাল জিন্নাহকে পুনরায় সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে এসে ভারতীয় মুসলমানদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। ইকবাল ১৯৩০ সালের এলাহাবাদ ভাষণে ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোকে নিয়ে একটি স্বায়ত্তশাসিত মুসলিম রাজনৈতিক এককের ধারণা দেন। এটি পরবর্তী পাকিস্তান-চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি হলেও তখনকার প্রস্তাবটি ১৯৪৭ সালের মতো সম্পূর্ণ স্বাধীন পাকিস্তানের সুস্পষ্ট নকশা ছিল না।
১৯৩৬–৩৭ সালে ইকবাল জিন্নাহকে লেখা চিঠিতে মুসলমানদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, দারিদ্র্য, ইসলামী সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোর স্বশাসন নিয়ে আলোচনা করেন। বলা যায়, ইকবাল জিন্নাহকে নতুন করে মুসলিম নেতৃত্বের ঐতিহাসিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করেছিলেন।
জিন্নাহ ১৯৩৪ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে এসে মুসলিম লীগকে পুনর্গঠিত করেন। দুর্বল অভিজাত সংগঠন থেকে লীগকে তিনি ধীরে ধীরে শক্তিশালী গণরাজনৈতিক দলে পরিণত করেন।
১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের পর কংগ্রেস কয়েকটি প্রদেশে সরকার গঠন করে। মুসলিম লীগ আশানুরূপ ফল করতে পারেনি। কংগ্রেস নিজেকে সব ভারতীয়ের প্রতিনিধি মনে করত; কিন্তু জিন্নাহর বক্তব্য ছিল, মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে কংগ্রেস এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, মুসলিম লীগের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগিতে অনীহা এবং ভবিষ্যৎ স্বাধীন ভারতে মুসলমানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সব মিলিয়ে জিন্নাহর অবস্থান কঠোর হতে থাকে।
কাজেই "জিন্নাহ একাই ভারত ভেঙ্গেছে" - এই দাবিটা খুবই একতরফা এবং ভুল। ভারতীয় লেখক যশবন্ত সিং তাঁর "জিন্নাহ: ইন্ডিয়া পার্টিশন ইনডিপেনডেন্স" বইয়ে উপমহাদেশ ভাগের জন্য জিন্নাহকে এককভাবে দায়ী করার প্রচলিত ধারণা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণে, দেশভাগ শুধু জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব বা রাজনৈতিক অবস্থানের ফল ছিল না; এর পেছনে কংগ্রেসের কিছু রাজনৈতিক ভুল, মুসলিম লীগের কৌশল এবং ব্রিটিশদের নীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
বইটিতে বলা হয়েছে, ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের পর উত্তর প্রদেশে কংগ্রেস মুসলিম লীগের সঙ্গে সরকার গঠনে রাজি না হওয়ায় জিন্নাহর রাজনৈতিক অবস্থান আরও কঠোর হয়। একইভাবে ১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা (ব্রিটিশ সরকারের একটি প্রস্তাব, যা ভারতে ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে সৃষ্ট অচলাবস্থা নিরসনের জন্য আনা হয়েছিল) নিয়ে জওহরলাল নেহরুর বক্তব্য জিন্নাহর মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করে। পরে জিন্নাহ পরিকল্পনা থেকে সরে গিয়ে ডাইরেক্ট অ্যাকশনের এর ডাক দেন।
যশবন্ত সিংয়ের বিশ্লেষণে ব্রিটিশদের ডিভাইড এন্ড রুল নীতি এবং শেষ পর্যায়ে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের তড়িঘড়ি করে ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্তও দেশভাগের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অর্থাৎ তাঁর দৃষ্টিতে দেশভাগ ছিল জিন্নাহ, মুসলিম লীগ, কংগ্রেস ও ব্রিটিশ শাসকদের নানা সিদ্ধান্ত ও ব্যর্থতার সম্মিলিত ফল।
অন্যদিকে গান্ধী বিশ্বাস করতেন, ভারত কোনো দুটি পৃথক জাতির আবাস নয়। হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রিষ্টানসহ সবাই মিলে একটি ভারতীয় জাতি। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগকে তিনি নৈতিক ও ঐতিহাসিক বিপর্যয় মনে করতেন।
জিন্নাহর যুক্তি ছিল ভিন্ন। তাঁর মতে, হিন্দু ও মুসলমান কেবল দুটি ধর্মীয় সম্প্রদায় নয়; তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, সামাজিক বিধান ও রাজনৈতিক স্বার্থ আলাদা। ব্রিটিশরা চলে গেলে সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতন্ত্র মুসলমানদের স্থায়ী রাজনৈতিক সংখ্যালঘুতে পরিণত করতে পারে। তাই তাদের জন্য প্রয়োজন কার্যকর সাংবিধানিক নিরাপত্তা অথবা পৃথক রাষ্ট্র।
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোতে “স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ” গঠনের কথা বলা হয়। সেখানে সরাসরি “পাকিস্তান” শব্দটি ছিল না, কিন্তু পরে এটিই পাকিস্তান দাবির রাজনৈতিক ভিত্তি হয়ে ওঠে।
গান্ধী দেশভাগ ঠেকাতে চেষ্টা করেন। ১৯৪৪ সালে বোম্বেতে তাঁর ও জিন্নাহর মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়। দুজন মুখোমুখি বসে চিঠি ও যুক্তির মাধ্যমে সমাধান খোঁজেন। গান্ধী জিন্নাহকে “কায়েদে আজম” (মহান নেতা) সম্বোধন করলেও তাঁর দ্বিজাতিতত্ত্ব মেনে নেননি। জিন্নাহও মুসলমানদের পৃথক জাতি হিসেবে স্বীকৃতি ছাড়া কোনো সমঝোতায় রাজি হননি।
তাঁদের আলোচনা ব্যর্থ হয়। তবু এই সাক্ষাৎ প্রমাণ করে তাঁরা শুধু পরস্পরকে আক্রমণ করেননি; শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বোঝানোর চেষ্টাও করেছেন।
১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা একটি শিথিল ভারতীয় ইউনিয়ন বজায় রেখে প্রদেশগুলোকে তিনটি গ্রুপে ভাগ করার প্রস্তাব দিয়েছিল। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ প্রথমে শর্তসাপেক্ষে এটি গ্রহণ করলেও পরিকল্পনার ব্যাখ্যা ও ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। নেহরুর বক্তব্য মুসলিম লীগের মধ্যে আশঙ্কা সৃষ্টি করে যে কংগ্রেস পরে পরিকল্পনাটি পরিবর্তন করতে পারে। জিন্নাহ সমর্থন প্রত্যাহার করেন।
এরপর “ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে”, কলকাতা, নোয়াখালী, বিহার, পাঞ্জাবসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড ভারতীয় ঐক্যের সম্ভাবনাকে প্রায় ধ্বংস করে দেয়।
১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে গান্ধী ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে একটি নাটকীয় প্রস্তাব দেন: জিন্নাহকে অবিভক্ত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া হোক; কংগ্রেস প্রয়োজন হলে সেই সরকারকে সহযোগিতা করবে। জিন্নাহ তা গ্রহণ না করলে কংগ্রেস সরকার গঠন করবে।
এটি মূলত দেশভাগ ঠেকানোর জন্য গান্ধীর শেষদিকের মরিয়া রাজনৈতিক উদ্যোগ ছিল। তিনি প্রথমে মাউন্টব্যাটেনের কাছে পরিকল্পনাটি উত্থাপন করেছিলেন। গান্ধীর প্রস্তাবের বিবরণ তাঁর জীবনবিষয়ক গান্ধী-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক বইগুলোতে পাওয়া যায়।
নেহরু ও বল্লভভাই প্যাটেলসহ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব পরিকল্পনাটি সমর্থন করেননি। তাঁরা আশঙ্কা করেছিলেন, নির্বাচনে কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার পরও পুরো কেন্দ্রীয় সরকার মুসলিম লীগের হাতে তুলে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয় এবং এতে নতুন রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হবে। নেহরু-প্যাটেলসহ কংগ্রেস নেতৃত্বের বিরোধিতায় গান্ধীর পরিকল্পনাটি আর এগোয়নি। কিছু ঐতিহাসিক বিবরণে জিন্নাহও এমন প্রস্তাব গ্রহণ করতেন না বলে উল্লেখ রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস নেতৃত্ব দেশভাগ মেনে নেয়। গান্ধী ব্যক্তিগতভাবে মেনে নিতে না পারলেও একা তা ঠেকাতে পারেননি।
১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হয়। জিন্নাহ পাকিস্তানের গভর্নর-জেনারেল হন; নেহরু হন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী।
দুইশ বছর পর ভারতীয় উপমহাদেশের এই স্বাধীনতা এসেছিল ভয়াবহ মূল্য দিয়ে। পাঞ্জাব ও বাংলার বিভাজন, গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি সহস্র বছর প্রাচীন সভ্যতার অঞ্চলটিকে রক্তাক্ত করে। জিন্নাহ নতুন রাষ্ট্র নির্মাণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। গান্ধী স্বাধীনতার উৎসব থেকে দূরে থেকে কলকাতা ও দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।
১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে গান্ধী পাকিস্তানের প্রাপ্য আর্থিক অংশ পরিশোধ এবং ভারতে মুসলমানদের নিরাপত্তার দাবিতে অনশন করেন। উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা এ কারণে তাঁকে “মুসলিম ও পাকিস্তানপন্থী” বলে অভিযুক্ত করেছিল।
৩০ জানুয়ারি ১৯৪৮ নাথুরাম গডসে গান্ধীকে হত্যা করে।
এই নাত্থুরাম গোডসের সংগঠন ছিল আরএসএস, যাদের অবৈধ সন্তান আজকের বিজেপি। বিজেপি সমর্থকদের চোখে গান্ধী এখনও পাকিস্তান ও মুসলিমদের দালাল! আর বাঙ্গু অশিক্ষিত ছাগুদের চোখে মোদী-গান্ধী সবাই সমান!
গান্ধীর মৃত্যুর সময়ে জিন্নাহ তখন পাকিস্তানের গভর্নর-জেনারেল হিসেবে করাচিতে ছিলেন। তিনি শোকবার্তায় গান্ধীকে হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্ম দেওয়া অন্যতম মহান ব্যক্তি বলে অভিহিত করেন এবং তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় উপমহাদেশের জন্য গভীর ক্ষতির কথা জানান।
এর কয়েক মাস পরেই, একই বছর এগারো সেপ্টেম্বর তারিখে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহও মারা যান।
ভারত-পাকিস্তানের ঐতিহাসিক ফ্যাক্ট এই যে এই দুটি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই তাদের জাতির পিতারা মারা যান। যে স্বপ্ন ও পরিকল্পনা নিয়ে তাঁরা দেশদুটো স্বাধীন করেছিলেন, সেই স্বপ্নের পথে তাঁরা কোন কাজই করতে পারেননি।
তাঁরা বেঁচে থাকলে কি করতে পারতেন, নায়ক হতেন, নাকি ভিলেন হতেন সেসব কল্পনা করাটা বোকামি।
ইতিহাসের ট্র্যাজেডি এখানেই: যিনি একসময় “হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত” ছিলেন, তিনিই পরে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা হলেন। আর যিনি অখণ্ড ভারতের জন্য শেষ দিন পর্যন্ত লড়েছিলেন, স্বাধীনতার কয়েক মাস পরই একজন হিন্দু উগ্রবাদীর গুলিতে নিহত হলেন।
এখন আসে বাংলাদেশের ব্যাপারে জিন্নাহর ভূমিকা কি? যারা ঘৃণা করছেন, এই ঘৃণা কতটা জাস্টিফায়েড? আর যারা দেবতা বানিয়ে দিয়েছেন, সেটাই বা কতটা সঠিক?
তারও আগে আসি আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নীতি কি ছিল তাঁর ব্যাপারে। উনি কি জিন্নাহ বিরোধী ছিলেন? দ্বিজাতি তত্বের বিরোধী ছিলেন? যতদূর জানি, না। বরং তিনি তরুণ বয়সে মুসলিম লীগের কর্মী ছিলেন, পাকিস্তান আন্দোলনে অংশ নেন এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকে সমর্থন করেন। তবে ১৯৪৭ সালের পর পূর্ব বাংলার প্রতি বৈষম্য এবং বিশেষ করে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এমনকি ১৯৬৫ সালে আইয়ুব বিরোধী নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামীলীগ ফাতিমা জিন্নাহর পক্ষ নেয় এবং পূর্ব পাকিস্তানে প্রচারণা চালায়।
১৯৪৮ সালে জিন্নাহ ঢাকায় এসে ঘোষণা করেন, “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।” শেখ মুজিবুর রহমান তখন বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলনরত নেতাদের একজন ছিলেন এবং এই নীতির বিরোধিতা করেন।
অনেককেই দেখছি "উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে কি সমস্যা হতো" তা নিয়ে প্রশ্ন করেন।
সহজ ভাষায় বললে, সরকারি চাকরি থেকে শুরু করে সব দিক দিয়েই বাঙালি পিছিয়ে যেত। ব্রিটিশরা যখন ভারতীয় উপমহাদেশ দখল করে, তখন ফার্সির বদলে অফিস আদালতের ভাষা ইংলিশ করে। মুসলিমরা গোড়ামি করে ইংলিশ ভাষা শিখেনি। ফলে মুসলিম সমাজ পিছিয়ে গিয়েছিল। একই ঘটনা ঘটতো যদি কেবলই উর্দু হতো পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। এর অর্থ এই ছিল না যে আমরা তখন "উর্দুমে বাতচিৎ, গুফতগু কারতে।" আমরা বাংলাতেই কথা বলতাম, উর্দু না জানলে বস্তিতে বাস করতাম, ফকির মিসকিন থাকতাম।
জিন্নাহর নিজের মাতৃভাষা ছিল "সিন্ধি।" ইনফ্যাক্ট, উর্দু পাকিস্তানের কোন অঞ্চলেরই মাতৃভাষা না। তবে ওদের দ্বারা উর্দু ভাষা বলা ও লেখা সহজ, আমাদের দ্বারা সেটা না।
অনেকে গোলাম আযম এবং জিন্নাকে এক কাতারে ফেলছে। জিন্নাহকে ইসলামের নেতা বানিয়ে ফেলছে! ভাইরে, মূর্খামির একটা লিমিটতো থাকা দরকার!
জিন্না ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান এনেছিলেন ঠিকই, কিন্তু জামাতে ইসলাম এবং জিন্নাহর রাজনীতির মূল পার্থক্য হচ্ছে, জিন্না চেয়েছিলেন "মুসলিমদের শাসন" - আর মওদুদীর জামাত চায় "ইসলামের শাসন।"
জিন্নাহ নিজেও নিজেকে ধর্মীয় নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে আগ্রহী ছিলেন না বলে উল্লেখ করা হয়েছে নিউজিল্যান্ডের লেখক হেক্টর বলথোর গ্রন্থে। সেখানে বলা হয়েছে, একবার একটি শোভাযাত্রায় তাঁকে ‘মাওলানা জিন্নাহ’ বলা হলে তিনি শোভাযাত্রা থামিয়ে জানান, তিনি কোনো ধর্মীয় নেতা নন, তিনি রাজনৈতিক নেতা। তবে ভারতীয় মুসলিমদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার নিয়ে তাঁর অবস্থানকে কেউ "সাম্প্রদায়িক" বললে তিনি সেই পরিচয় গ্রহণ করতেও আপত্তি করেননি।
এখন শেষে কেবল একটা কথাই বলি - ইতিহাসে যে যা করেছে, সেটাকে সেভাবেই উপস্থাপন করতে হবে। মোদির অপকর্মের জন্য গান্ধীকে গালাগালি করা এবং বর্তমান পাকিস্তানের জন্য জিন্নাহকে দোষারোপ করাটা নিজেকেই ছোট করে। উপমহাদেশের রাজনীতিতে এই দুই নেতাই ছিলেন মহান নেতা। তাঁদের কেউই নিখুঁত ছিলেন না। তাঁদের সিদ্ধান্ত, সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু তাঁদের একজনকে দেবতা এবং অন্যজনকে খলনায়ক বানালে ইতিহাস বোঝা যায় না। ইতিহাস পড়তে হয় নির্মোহভাবে।
© Manzur Choudhury