23/09/2026
আমি কিছুদিন আগে পর্যন্ত কম সন্তান নেওয়ার কনসেপ্টে বিশ্বাসী ছিলাম। চিন্তা করতাম, সন্তান কম হলে তাদের ঠিকভাবে দেখাশোনা করা যাবে। তাদের সব সখ আহ্লাদ পূরণ করা যাবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এ কনসেপ্টটা পুরোপুরি ভূল। এতে করে আমরা উল্টো আমাদের সন্তানের উপর এক ধরনের জুলুম করতেছি। আবার অনেক সময় দেখা যায় অতিরিক্ত আদর যত্নের হলে একমাত্র সন্তানের স্বভাব চরিত্রও খারাপ হয়ে যায়। এসব বাচ্চাদের ছোটবেলায় তেমন কোন রেসপনসেবলিটি দেয় না তাদের মা বাবা। নিজের ইচ্ছে মতো বড় হয়। আর আশা করা হয় বড় হওয়ার পর হঠাৎ করে একদিন সে গোটা পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে নিবে!
আমরা মনে করি বাচ্চা কম থাকলে এটেনশন একজনকেই দেওয়া যাবে। অথচ খেয়াল করলে দেখা যায়, আপনি তার রেসপনসেবলিটি টাই বাড়াচ্ছেন শুধু। যেমন আমি অনেক জায়গায় দেখছি যে একমাত্র সন্তান হওয়ায় তাকে পড়াশোনার জন্য দূরে কোথাও পাঠায় না, পড়াশোনার জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ থাকলে যেতে দেওয়া হয় না। বাচ্চা হাত থেকে বের হয়ে যাবে এ টেনশনে থাকে মা বাবা। মা বাবা বৃদ্ধ হলে তাদের রেসপনসেবলিটিও নিতে হয় তাকে একা হাতে। ইভেন আপনার মৃত্যুর সময়ও তাকে আপনার দাফন-কাফন করার জন্য তাকে একা দৌড়াতে হবে। অথচ কবরস্থানে নিতে খাটিয়া ওঠানোর জন্য ৮-১০ জন মানুষ লাগে। একজন মহিলা মানুষকে প্রপারলি কবরে নামানোর জন্যওতো ২-৩ জন মাহাররাম লাগে। অথচ আমরা সেটা এক জনের কাঁধের তুলে দেওয়ার চেষ্টা করতেছি। এটা কি অন্যায় না?
আমি আপনি হায়াত থাকলে সবাই একদিন বৃদ্ধ হবো। আপনি এ রকম অহরহ ফ্যামেলী পাবেন যাদের মাসে তাদের বাবা-মার ডাক্তার, মেডিকেল টেস্ট ও ওষুধের জন্যই ২০-৩০ হাজার টাকার খরচ আছে। মাসে ১০-১৫ হাজার টাকার ইনসুলিন নিতে হয় এ রকম পরিবারও অহরহ। অনেকসময় দেখা যায় পরিবারের কোন সদস্য গুরুতর অসুস্থ হলে ইমার্জেন্সি ২-৩ লাখ টাকা ধার নেওয়ার মতো মানুষ পাওয়া যায় না। এ খরচটা এক সন্তানের উপর চাপিয়ে দেওয়াটা কতটুকু যৌক্তিক? দেশে থেকে এ খরচটা কয়জন নেওয়ার মতো সামর্থ্য রাখে? অথচ এসব রেসপনসেবলিটি একা নিতে না পারলে সে মা বাবার জন্য হয়ে যায় খারাপ সন্তান!
আপনি তখনও হয়তো বলবেন আমরা এতো কষ্ট করে সব ফোকাস একজনকে দেওয়ার জন্য আর বাচ্চা নিইনি। এটা জাস্ট নিজেকে মহান বানানোর চেষ্টা। কিন্তু অধিকাংশ সময় দেখা যায় নতুন বাচ্চা হওয়াটাকে এখন নতুন ঝামেলা হিসেবে দেখা হয়। এটা কেউ স্বীকার করবে না। কারণ বাচ্চা মানুষ করা অনেক কষ্টের কাজ। মেডিকেল প্রবলেম থাকলে সে বিষয়টি আলাদা।
কিন্তু "ফোকাস একজনকে দিয়ে তাকে মানুষের মতো মানুষ করা" বিষয়টি পুরোপুরিই ভুল। আপনি আগের যুগের হাজার হাজার পরিবার দেখবেন, যাদের ৫-৬ জন সন্তানের সবাই ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার পিএইচডি হোল্ডার হয়েছে। আবার ৫-৬ জন সবাই গর্ধব হয়েছে এমন পরিবারও আছে। এখানে বিষয়টি হলো মূলত পরিবেশের। আপনি ভালো পরিবেশ, ভালো শিক্ষা দিতে পারলে বাচ্চা এমনিতেই ভালো মানুষ হবে। আগের যুগের মানুষ অশিক্ষিত হয়েও তাদের ৫-৭ জন সন্তানকে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানাতে পারলে, আপনি কেন পারবেন না? আপনিতো অন্তত ওনাদের চেয়ে বেশি শিক্ষিত। আপনি কেন ঐ পরিবেশ দিতে পারবেন না? ভালো পরিবেশ না দিলে আপনার বাচ্চা একটা হলেও সেটা অমানুষ হবে। ফোকাস কম-বেশির কোন ইস্যু না এটা।
একাধিক সন্তান থাকলে তারা একজন আরেকজনের সাথে খেলাধুলা করে বড় হয়। তারা একাকিত্বে ভোগে না। বাচ্চাদের শান্ত রাখতে ওদের হাতে মোবাইল দিতে হয়না। বরং ওরাই একজন আরেকজনের রেসপনসেবলিটি নেয়। ভালো পরিবেশ পেলেই হয়, এগুলো তাদের শিখিয়ে দিতে হয় না। কিন্তু এখন অনেক পরিবারেই দেখবেন, বাচ্চা খেলার জন্য সঙ্গী পায় না। কোন দায়িত্ব না দিলে সে রেসপনসেবলিটি নেওয়া কিভাবে শিখবে!
আপনাদের নাগাসাকিতে পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর একজন কিশোর তার আহত ছোট ভাইকে পিঠে নিয়ে আত্মীয়দের খোঁজার ছবির কথা হয়তো নিশ্চয়ই মনে আছে। এ রকম অনেক ইন্সিডেন্ট রিসেন্ট টাইমেও অনেক পাবেন। ভাই ভাইকে বা বোনকে কাঁধে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয় খুজতেছে, স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে। এ ভালোবাসা বা রেসপনসেবলিটি গুলো পিওর। ভালো পরিবেশ পেলে বাচ্চারা আশেপাশের মানুষকে ভালোবাসতে শিখে। শৈশবে একটা বাচ্চার জন্য নিজের ভাইবোন থাকাটা একটা সম্পদের মতো। একজন আরেকজনের রেসপনসেবলিটি অটোমেটিক নিয়ে নেয়।
আজকে আপনার সাথে কেউ অন্যায় করলে আপনার ভাইবোন আপনার হয়ে লড়ে যাওয়ার অপশন থাকে। আপনি বিপদে পড়লে তাদের সহায়তার আশা করতে পারেন। আপনার মেরুদণ্ড মজবুত থাকে। কিন্তু পরিবার ছোট রাখার কনসেপ্টের মাথায় নিয়ে আপনার সন্তানের জন্য তেমন কোন অপশনই আপনি রাখছেন না। ভবিষ্যতে কেউ তার সাথে অন্যায় করলে তার পেছনে যদি সাহায্যের জন্য কেউ না থাকে, তাহলে সে কিভাবে তা মোকাবিলা করবে?
ছোটবেলায় আমাদের কৃষক এবং তার অকর্মন্য ছেলেদের গল্প শোনানো হতো। "একটা লাঠিকে যে কেউ ভেঙে ফেলতে পারে, কিন্তু অনেকগুলো লাঠি একসঙ্গে থাকলে কেউ সহজে ভাঙ্গতে পারে না।" এ গল্প গুলো আমরা পড়েছি, কিন্তু শিখিনী কিছুই!
বড়বড় মানুষ এলন মাস্ক, সালমান বিন আবদুলআজিজ, ডোনাল্ড ট্রাম্প, জেপ বেজোস, মার্ক জাকারবার্গ, রোনালদো, মেসি সবারই একাধিক সন্তান রয়েছে। কারণ জীবনে কখন কোন সিটিউশনে ফেস করতে হয় সেটা কেউ জানে না। আপনার সম্পদ বেশী হলে, এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য মানুষের প্রয়োজন আরো বেশি। সন্তানকে যোগ্য বানাতে পারলে এটা সবচেয়ে বড় ইনভেস্টমেন্ট।
কিন্তু আমাদের মাথায় ঢুকানো হচ্ছে, "দুটি সন্তানের অধিক নয়, একটি হলে ভালো হয়!" ইসলামে যেখানে সামর্থ্য থাকলে অধিক সন্তান নেওয়াতে উৎসাহিত করা হয়েছে, সেখানে বাকি এসব থিউরি অযৌক্তিক। অনেকসময় চালাকি করতে গিয়ে অনেকের দেখা যায় আম-ছালা দুইটাই চলে যায়। দেরী হওয়ার আগে বিষয়গুলো একটু চিন্তা করে দেখবেন।