গন অধিকার পরিষদ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বক্তব্য রাখছেন,কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম,, ২৬/১০/২০২২ ইং
কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ
It's an official fan page of কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ.
27/09/2022
কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ টাঙ্গাইল জেলার সভাপতি এডভোকেট আলহাজ্ব রফিকুল ইসলাম এর অকাল মৃত্যুতে কালিহাতী উপজেলা কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ উদ্যোগে ২৯/০৯/২০২২ ইং (বৃহস্পতিবার) স্বরণ সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে । উপস্থিত থাকবেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কেন্দ্রীয়, জেলা ও উপজেলা যুব আন্দোলনের,ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ।।
উক্ত স্বরণ সভায় আপনার উপস্থিতি একান্ত কাম্য ।।
স্থান ঃ কালিহাতী পেট্রোল পাম্পের পশ্চিম পাশে ।।
সময় ঃ বিকেল ৩ টা ।।
ধন্যবাদান্তে,,
ইথার সিদ্দিকী
সাধারণ সম্পাদক
কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ
কালিহাতী উপজেলা ।।
12/09/2022
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসারত বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমের পাশে বড় ভাই আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ,মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে মাননীয় ভাইস চ্যান্সেলর ডাঃ শারফুদ্দিন আহমেদ।
তারিখ: ১২.০৯.২০২২
23/08/2022
এই পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে দেশের নিরাপত্তা কোথায়? সরকারের বাইরের মানুষ দেশের বিরুদ্ধে কথা বললে তারা দেশদ্রোহী, সরকারে থেকে বললে দেশদ্রোহী নয়- এমনটা কী করে হয়? নিশ্চয়ই আমাদের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন দেশদ্রোহী। তাঁকে অনতিবিলম্বে দেশদ্রোহিতার দায়ে গ্রেফতার করে বিচার করা উচিত।
#বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম
16/08/2022
আগস্টে পিতা চলে গেলেন আমাকে নিলেন না
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম
মঙ্গলবার, ১৬ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ টা
যেখানে পাকিস্তানি হানাদারদের গুলিতে ১৯৭১ সালের ১৬ আগস্ট আমার মরার কথা, সেখানে মাত্র চার বছর পর ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ আমার ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা, আমার হৃদস্পন্দন, চোখের আলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে ধানমন্ডির ৩২-এ নির্মমভাবে নিহত হন। আল্লাহর কি অপার কুদরত, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমার চলে যাওয়ার কথা সেখানে বঙ্গবন্ধু চলে গেলেন পরিবারের সবাইকে নিয়ে। কেন যে আমাকে নিলেন না, কী অপরাধ ছিল, কোথায় আমার ব্যর্থতা কত খুঁজলাম এখনো তার নাগাল পেলাম না। ’৭৫-এর পর আগস্ট এলেই ভালো লাগে না।
কেমন একটা খেইহারা হয়ে যাই। ’৬৫-এর শুরুতে বাড়ি থেকে পালিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে গিয়েছিলাম। স্থান হয়েছিল ১ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্টে। যুদ্ধ শেষে চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হলো।
স্থান হলো চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসার পাশে পাহাড়ের কোলে ৬ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্টে। তখন কেবলই রেজিমেন্ট তৈরি হচ্ছিল। কিছুদিন পর নিয়ে আসা হলো ময়নামতি পাঞ্জাব লাইনে। একসময় নানা তদবির করে নানা ঝকমারি মোকাবিলা করে বাড়ি ফিরলাম লেখাপড়া করতে।
পরের বছর ম্যাট্রিক দেব। বড় ভাই জেলখানা থেকে লিখলেন, ‘এবারই পরীক্ষা দেও। সেনাবাহিনীতে গিয়ে তুমি তো মূর্খ হওনি। কিছুটা লেখাপড়া করেছ। আর বাস্তব অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে।
’ পরীক্ষার তিন মাস বাকি। যে মানুষ পড়তেই বসতাম না, সেই মানুষ রাতদিন পড়ালেখা শুরু করলাম। অনেক রাতে অনেকবার মা বই নিয়ে গিয়ে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিতেন। প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে পাস করলাম। গেলাম করটিয়া সাদৎ কলেজে। সেখানে নানা ঝকমারি করে ভর্তি হলাম। বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী তখন জেলে। আমি হাত পায়ে তালপাত সিং লতিফ সিদ্দিকীর ভাই বলে আমার কাছে অনেকের অনেক আশা। কিন্তু আমি যে নিরেট গর্দভ একেবারে অপদার্থ এর জন্য খেসারত দিতে হলো অনেক। ছাত্রলীগ করি। নাক ঢেকে স্লোগান দিই, মিছিল করি। কিন্তু সভা-সমাবেশের সময় পালিয়ে বেড়াই। বক্তৃতায় নাম ঘোষণা করে আমাকে পায় না। এভাবে চলে বেশ কিছুদিন। উপায় নেই তাই নদীর চরে গিয়ে হাত-পা ছুড়ে চিৎকার করতাম। যা মনে হতো তা-ই বলতাম। এমনি করতে করতে একবার বাসাইল উপজেলার বর্ণী প্রাইমারি স্কুলে গিয়ে ছেলেমেয়েদের সামনে হাত-পা ছুড়ে চিৎকার করেছিলাম। ফিরে আসার পথে মনে হলো আমি যা বলতে চেয়েছি তা বলতে পেরেছি। এরপর আস্তে আস্তে ধীরে ধীরে সভা-সমাবেশে কথা বলা শুরু করলাম। চলে গেল আরও কিছুদিন। তখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচার শুরু হয়েছে। আন্দোলনও তীব্র হচ্ছে। এর মধ্যে ছাত্রদের ১১ দফা ছাত্রসমাজকে উদ্বেলিত করে তুলল। ছয়-সাত মাস আগে যে পরিমাণ লোকজন হতো তার ১০ গুণ হওয়া শুরু হয়ে গেল। ছাত্রদের মধ্যে তখন কোনো দলাদলি নেই, হলাহলি নেই- সবাই এক। এমনকি মোনায়েম খানের ছাত্র সংগঠন এনএসএফের বড় অংশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে যুক্ত হলো। মূল রাজনৈতিক দলগুলো তেমন তৎপর ছিল না। কিন্তু ছাত্র-যুবরা সব মরিয়া। আমরা ৫০ জন নিয়ে মিছিল শুরু করলে শেষ হতো ৫ হাজারে। মানুষ ছটফট করছিল। দিন দিন আন্দোলনের সমর্থন বাড়ছিল। এর মধ্যে ’৬৯-এর ফেব্রুয়ারিতে আসাদ পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিলেন। তখন মানুষের কাছে ছাত্রনেতা ছাত্রদের অপরিসীম গুরুত্ব। রাজা-বাদশাহদের সম্মানের চেয়ে বেশি। তোফায়েল আহমেদ মুকুটহীন সম্রাট। আ স ম আবদুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, আবদুল কুদ্দুস মাখন, শাজাহান সিরাজের নাম আকাশে বাতাসে। আবদুর রাজ্জাক, শেখ ফজলুল হক মণি, কে এম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসে মিশে গেছেন। আসাদের হত্যার পর আইয়ুব খান আর বেশিদিন টেকেননি। ২১ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবকে মুক্তি দিলে বাংলার সাড়ে ৭ কোটি মানুষের পক্ষ থেকে ছাত্র আন্দোলনের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ ২২ ফেব্রুয়ারি তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এদিকে আমাদের গুরু রাজনৈতিক ঠিকানা লতিফ সিদ্দিকী ময়মনসিংহ জেল থেকে বেরিয়ে আসেন। আমরা তো জেগেই ছিলাম। লতিফ সিদ্দিকীকে পেয়ে আরও উজ্জীবিত হলাম। কদিন পরই এলেন ইয়াহিয়া খান। আইয়ুব খানের বিদায়। ’৫৮ সালে ইস্কান্দার মির্জাকে বিতাড়িত করে আইয়ুব খান এসেছিলেন, ’৬৯ সালে আইয়ুব খানকে বিতাড়িত করে ইয়াহিয়া খান। মার্চ থেকে ডিসেম্বর রাজনীতি নিষিদ্ধ। তবে ঘরোয়া রাজনীতি চালু থাকল। রাজনৈতিক অফিস-আদালত খোলা, ’৭০-এর পয়লা জানুয়ারি রাজনীতি মুক্ত হলো, নির্বাচনী প্রস্তুতি নেওয়া হলো। তখন ঘরে ঘরে বঙ্গবন্ধু, ঘরে ঘরে নৌকা। ৭ ও ১৭ ডিসেম্বর ’৭০-এ দেশে নির্বাচন হলো। ১৬৯ আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধু পেলেন ১৬৭টি। প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯১টি। মানুষ ভাবল শান্তি আসবে সুস্থিতি আসবে। বুক বাধল তারা। ৩ জানুয়ারি নৌকার মঞ্চ বানিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু সব সদস্যকে শপথ পড়ালেন। সেই ভাষণ তিনি শেষ করেছিলেন ‘জয় বাংলা জয় পাকিস্তান’ বলে। সেটা শুনে অনেকেই বলেন, নেতার ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে ‘জয় বাংলা জয় পাকিস্তান’ বলে শেষ করেছিলেন। আদতে কখনো না। তিনি জয় পাকিস্তান বলেছিলেন ৩ জানুয়ারি আর ৭ মার্চের ভাষণ তো ৭ মার্চেই; মাঝে মাত্র এক মাস কয়েকদিন। পাকিস্তান জনগণের রায় মানেনি। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে বললেন, ‘যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। আমরা যখন মরতে শিখেছি কেউ আমাদের দাবাতে পারবে না। ’ ৭ মার্চের আগেই ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ভিপি আ স ম আবদুর রবের হাতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন, ৩ মার্চ ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে শাজাহান সিরাজের স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ, জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা, রাষ্ট্রপতি এসব ঘোষণা করা হয়েছিল। বাকি ছিল না কোনো কিছুই। বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ শেষ করেছিলেন ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে। ২৪ মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইয়াহিয়া খান নানা রকমের আলোচনা চালিয়ে সময় নষ্ট করে সময়মতো বাঙালির ওপর পাকিস্তানি সেনাদের লেলিয়ে দিয়েছিলেন। প্রত্যক্ষ সশস্ত্র যুদ্ধে নেতৃবৃন্দের যতটা অংশ থাকার কথা তা ছিল না। যে কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো দ্বিধা না থাকলেও অনেক নেতার মধ্যে ‘হারিয়ে’ যাওয়ার সন্দেহ ছিল। প্রায় সবাই জীবন বাঁচাতে চলে গিয়েছিলেন, আত্মরক্ষার জন্য দেশত্যাগ করেছিলেন। বলতে লজ্জা হয়, অনেক নেতা পালিয়েও গিয়েছিলেন। সে যা হোক, পালাতে দ্বিধা হচ্ছিল। একসময় হাত-পা ছুড়ে বক্তৃতা করেছি, ‘প্রয়োজনে দেশের জন্য জীবন দেব’। তাই যখন জীবন দেওয়ার সময় এলো তখন পালিয়ে গেলে মানুষ হতাশ হবে। তা ছাড়া নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করতে দেখে, বাড়িঘর জ্বালানোয়, মা-বোনের সম্মান-সম্ভ্রম নষ্ট করা দেখে মন বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল। ১১ আগস্ট কাদেরিয়া বাহিনী হানাদার পাকিস্তানিদের দুটি অস্ত্রবোঝাই জাহাজ দখল করে। ১২ ও ১৩ আগস্ট প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। এমনকি বিমান হামলা হচ্ছিল বারবার। ২-৩টি পাকিস্তানি স্যাবরজেট চরের বালুমাটি ছড়িয়ে ছিটিয়ে অন্ধকার করে ফেলেছিল। ১৩ তারিখ সন্ধ্যায় আমরা ভূঞাপুর ঘাঁটি ছেড়ে দিয়েছিলাম। এ যুদ্ধে পাকিস্তানিরা অনেক শক্তি প্রয়োগ করলেও আমাদের তেমন ক্ষতি করতে পারেনি। মাত্র দু-তিন জন যোদ্ধা সামান্য আহত হয়েছিলেন। ভূঞাপুর থেকে কিছু পুবে গলগন্ডায় রাত কাটিয়েছিলাম। ১৪ তারিখ সেখানেও যুদ্ধ হয়েছিল। পাকিস্তানি হানাদাররা আমাদের ওপর অতর্কিত ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সেখানে কমান্ডার খোরশেদ আলম বীরপ্রতীক দারুণভাবে আহত হয়। সে খুব কান্নাকাটি করছিল, ‘স্যার আপনি আমার ধর্মের বাপ। আমাকে ফেলে যাবেন না। ’ বলেছিলাম, আহতদের ফেলে গেলে যুদ্ধ চলবে কী করে! অন্যদের মনোবল ভেঙে যাবে। আমরা তোমাকে নিয়ে শেষ চেষ্টা করব। তাকে নিয়ে আমরা পাহাড়ের দিকে গিয়েছিলাম। পোড়াবাড়ির বটতলীতে রাত কাটিয়েছিলাম। তারপর সন্ধানপুর। সেখান থেকে পেঁচার হাট। তারপর আহত খোরশেদকে বুলবুল খান মাহবুব ও নুরুন্নবীর সঙ্গে মহানন্দপুর কাদেরিয়া বাহিনীর যুদ্ধকালীন হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলাম। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের পর সেই খোরশেদ আলম সুস্থ হয়েছিল। ৯০-৯৫ বছর বয়সে আল্লাহ তাকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছেন।
১৫ আগস্ট সন্ধ্যায় শেওড়াবাড়ী এমপি বাছেত সিদ্দিকীর বাড়িতে পৌঁছেছিলাম। মুক্তিযুদ্ধে এমপি বাছেত সিদ্দিকী একমাত্র মানুষ যিনি প্রত্যক্ষ যুদ্ধের ময়দানে ছিলেন। চারদিকে গোলাগুলি হচ্ছিল। তাই রাতে স্থির করেছিলাম ঘুম থেকে উঠে প্রথম যেদিকে আওয়াজ পাব সেদিকেই যাব। ফুলবাড়িয়ার রাঙামাটি ডিফেন্সে যাওয়ার কথা চিন্তা করেছিলাম। বেরিয়েও ছিলাম সেই উদ্দেশ্যেই। রাঙামাটি ছিল পূর্ব-উত্তরে। অন্যদিকে পশ্চিমে ধলাপাড়া চৌধুরীবাড়ি ঘাট। আচমকাই পশ্চিমে চৌধুরীবাড়ি ঘাটে ব্যাপক গোলাগুলি। বংশাই নদীতে কোনো নৌকা ছিল না। প্রায় ২ হাজার মুক্তিযোদ্ধা বাংকার খুঁড়ে চৌধুরীবাড়ির ঘাটসহ প্রায় দেড়-দুই মাইল জায়গা জুড়ে পজিশন নিয়েছে। তাই হানাদারদের নদী পার হওয়া কোনোমতেই সম্ভব না। আমি ধলাপাড়া ঘাটে না গিয়ে কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে পেঁচার হাট, তার থেকেও উত্তরে গিয়ে বংশাই পার হয়ে হানাদারদের পেছনে মাকরাইয়ে পজিশন নিয়েছিলাম। বেলা ১টার দিকে হানাদাররা পিছু হটছিল। মাকরাই থেকে ঘাটাইল সদর প্রায় ১১-১২ কিলোমিটার। পুরো রাস্তাই পায়ে হেঁটে যেতে হবে। ১.১০ মিনিটের দিকে দেখলাম সব এলোমেলো হয়ে ছুটছে কার আগে কে যাবে। ধুলায় অন্ধকার। মনে হয় ১.১৫-১৬ মিনিটের দিকে গুলি চালিয়েছিলাম। চাইনিজ এলএমজির মাত্র ২টি চেইন। আশপাশের সহযোদ্ধারা প্রবল বেগে গুলি চালিয়েছিল। হঠাৎই আমার হাতে-পায়ে গুলি লাগে। রক্তে সারা মুখ ভেসে যায়। সেখান থেকে পিছিয়ে চাম্বলতলা তুলাদের বাড়ি এসেছিলাম। সেখানে জীবনে প্রথম জ্ঞান হারিয়েছিলাম। মনে হয় ঘণ্টাখানেক বা তার একটু কম জ্ঞানহারা ছিলাম। অনেক মানুষ, কেউ কেউ পায়ে গরম তেল মাখছিল। বাড়ির এক নতুন বউ তার শাড়ি ছিঁড়ে হাত-পা বাঁধছিল। এক বৃদ্ধ মা এক গ্লাস গরম দুধ এনে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘বাবা, এই দুধ খেলে তোমার ভালো লাগবে। ’
১৯৭১-এর ১৬ আগস্ট মরে যাওয়ার কথা আমার। কিন্তু তার মাত্র চার বছর পর আমাদের এতিম করে চলে গেলেন জাতির পিতা। ১৫ আগস্ট সুবেহ সাদিকে পাকিস্তানের কয়েকজন পেতাত্মা তথাকথিত বিপথগামী সেনা সদস্য বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। জাতির গৌরব সেনাবাহিনী। পৃথিবীর সব সেনাবাহিনীর আমাদের মতো গর্ব করার কিছু নেই। দেশ হয় তারপর সেনাবাহিনী তৈরি হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী হয়েছে, তারপর দেশ। কত গর্বের কথা। বঙ্গবন্ধু নিহত হলে এক কাপড়ে ঘর ছেড়েছিলাম। ১৬ বছর আর ঘরে ফেরা হয়নি। এ সময় পলে পলে উপলব্ধি করেছি, বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে প্রকৃত সেনাবাহিনী কখনো জড়িত ছিল না। অথচ ষড়যন্ত্রকারীরা কৌশলে সেনাবাহিনীর বদনাম করেছে। অনেকের এখনো ধারণা, সেনাবাহিনী বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে। মোটেই তা নয়। প্রতিবাদ করতে গিয়ে দেখেছি, কত বড় বড় সেনা অফিসার যোগাযোগ করেছেন, ‘যখন বলবেন তখনই আমরা আপনাদের পাশে দাঁড়াব। বঙ্গবন্ধুর হত্যা আমরা চাইনি। এর দায় আমরা কোনোভাবেই নেব না। ’ ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেদিন যারা জীবনের কথা চিন্তা না করে সবকিছু বিসর্জন দিয়ে হত্যার প্রতিবাদ করেছিল আজ আমার বোনের শাসনামলে তারাই বরং নিন্দিত, অবহেলিত। পিতার চামড়া দিয়ে যারা ডুগডুগি বাজাতে চাইত, ‘জাতির পিতা না জুতার ফিতা’ বলত তারা কত আরামে, কত দাপটে। কিন্তু ’৭৫-এর প্রতিরোধ যোদ্ধারা এখনো স্বীকৃতি পেল না। তারা সবাই দুষ্কৃতকারী। জিয়ার সময়, এরশাদের সময়, বেগম খালেদা জিয়ার সময় দুষ্কৃতকারী হিসেবে নিজেদের গর্ব হতো। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আমলে বড় দুঃখ হয়, অবিচার বলে মনে হয়।
বঙ্গবন্ধু নিহত হলে যৌবনে সোনার দিনগুলো ভারতে কাটিয়েছি। নানা দিক থেকে আগস্ট আমার প্রিয় হতে পারত। কারণ ১৪ আগস্ট আমার স্ত্রীর জন্মদিন। কিন্তু ’৭৫-এর পর প্রতিটি আগস্ট আমাকে কাঁদায়, আমাকে ভাবায়, আমার ভিতরে কাঁপন তোলে। সেদিন এমনিতেই মনটা ভারী ছিল। সারা দুনিয়ার সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, ‘আমরা বেহেশতে আছি। ’ ভদ্রলোক কবে যে বেহেশত দেখে এলেন কিছুই জানি না। তবে রাস্তাঘাটে মানুষের যে অবস্থা, বাজারে যেমন আগুন তাতে সাধারণ লোকজন সামনে পেলে খুব একটা সমাদর করবে না। তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি মানুষের মাথায় নয়, পেটে আগুন জ্বালিয়েছে। আমার বোন কেন যে ভাবলেশহীন বোধের অভাবী এসব লোককে অত উচ্চপদ দিয়ে দেশের ক্ষতি করছেন বুঝতে পারছি না। গিয়েছিলাম টাঙ্গাইলে মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। গেটে পাহারাদাররা ঢুকতে দেয়নি। ফিরে এসেছিলাম। একটু পর ভিসি অধ্যাপক ড. ফরহাদ হোসেন আমার বাড়ি এসেছিলেন। উনি খুব লজ্জিত হয়েছিলেন। আমি তাঁকে বলেছিলাম, আপনি লজ্জিত হয়েছেন এটাই যথেষ্ট। গেটে যারা ছিল তারা দোষী নয়, দোষী যারা পরিচালনা করে তারা প্রক্টর সাহেব, আপনার পিএস সাহেব। না বলায় যেমন গেট বন্ধ রেখেছে, বলা থাকলে পুরো গেট খুলে রাখত। তাই গেটে পাহারাদারদের কিছু বলা নিজেদেরই অপমান করা। সঙ্গে এও বলেছিলাম, টাঙ্গাইলের মানুষ টাঙ্গাইলের মানুষকে সম্মান করতে জানে না, কোনো দিন করেওনি। হুজুর মওলানা ভাসানী, জননেতা শামসুল হক, জননেতা আবদুল মান্নান, শামসুর রহমান খান শাজাহান, হাতেম আলী তালুকদার, বদিউজ্জামান খান, মির্জা তোফাজ্জল হোসেন, লতিফ সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ এদের কাউকে কোনো দিন সম্মান করেনি। আর কদিনই বা বাঁচব। আমরা মরে গেলে টাঙ্গাইলের লোকজন ঢাকার বড় বড় অফিসে দরজার পিয়নের টুলের সঙ্গে কথা বলবে, ভিতরে যেতে পারবে না। ভিসির পিএস ও প্রক্টর দুজনই টাঙ্গাইলের। সেজন্য অবহেলা তো কিছু থাকবেই। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পশ্চিম পাশে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। মনে হয় মহাসড়কের দিকেই তিন-চারটা গেট। অন্যদিকে আরও গেট আছে কি না জানি না। দিনে সব গেট খোলা থাকে। কিন্তু মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি গেটের ছয়টিই বন্ধ, কয়েকটি তো ঝালাই করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মেইন গেট যদিও খোলা থাকে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ। সন্তোষে শুধু প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, সেখানে হুজুর মওলানা ভাসানী কলেজ আছে, স্কুল আছে, মসজিদ আছে, হুজুরের দরবার হল আছে, সর্বোপরি আফ্রো-এশিয়া-লাতিন আমেরিকার শ্রেষ্ঠ মহামানব অলি-এ-কামেল মওলানা ভাসানীর মাজার আছে। ভক্তরা রাতদিন মাজারে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব থাকে। সেসব রাস্তাও নাকি বন্ধ করা হয়েছে। এবার ১০ মহররম আশুরার দিনে কোনো মুরিদ মওলানা ভাসানীর কবর জিয়ারতে যেতে পারেনি। আশপাশে একটা উত্তেজনা বিরাজ করছে। কখন যে দাবানলের মতো জ্বলে ওঠে আল্লাহ রব্বুল আলামিনই জানেন।
গতকাল ধানমন্ডি ৩২-এর বাড়িতে গিয়েছিলাম। যে সিঁড়িতে পিতার দেহ পড়ে ছিল সেখানে জোহরের নামাজ আদায় করেছি। নামাজ পড়তে গিয়ে চোখে পানি আসা ভালো না। তবু এসেছিল। থামিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছি। খুব ভালো লেগেছে যারা ৩২-এর বাড়ি দেখাশোনা করছে তাদের। নামাজ পড়তে গিয়ে একটা চেয়ার চেয়েছিলাম। বড় যত্ন করে চেয়ার এনে দিয়েছিল। মনে হয় ধানমন্ডির ৩২-এর কিউরেটর মো. নজরুল ইসলাম খান পাশে কোথাও বসেন। খবর পেয়ে ছুটে এসেছিলেন। তাঁর অমায়িক ব্যবহার খুবই ভালো লেগেছে। পুরান যারা ছিল তারা সম্মান করার চেষ্টা করেছে, নতুনরাও করেছে। সহধর্মিণী নাসরীনের শরীরটা বেশ খারাপ। ছেলে দীপ অসুস্থ, মেয়ে কুঁড়ির পরীক্ষা। তাই কুশির সঙ্গে কুশির মাকে নিয়ে গিয়েছিলাম। বুকের মধ্যে যেমন তোলপাড় করেছে তেমন এক অনাবিল প্রশান্তিও পেয়েছি। পরম প্রভু দয়ালু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবার-পরিজন সবাইকে ছায়াতলে রাখেন এবং তাঁদের বেহেশতবাসী করেন। আমার স্ত্রী নাসরীনকেও যেন হেফাজত করেন।
লেখক : রাজনীতিক
15/08/2022
15/08/2022
প্রতিরোধের নেতৃত্ব দেন কাদের সিদ্দিকী
বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমই সশস্ত্র প্রতিরোধযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। তার নেতৃত্বে সেই প্রতিরোধযুদ্ধে অস্ত্রহাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ১৭ হাজার মুজিবভক্ত। মহাদেও থেকে রংপুরের চিলমারী পর্যন্ত সাতটি ফ্রন্টে বিভক্ত হয়ে চলে ভয়াবহ প্রতিরোধযুদ্ধ। এতে অংশ নেওয়া অন্তত ১০৪ জন মুজিবপ্রেমী নিজেদের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে শহীদ হন।
গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন পাঁচ শতাধিক প্রতিরোধযোদ্ধা। এ ছাড়া সেনাবাহিনীর হাতে আটক অবস্থায় সীমাহীন অত্যাচার-নির্যাতন ও জেল-জুলুমের শিকার হন আরও তিন শতাধিক প্রতিবাদী। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার প্রতিবাদে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত জুড়ে ২২ মাস ধরে চলে এ প্রতিরোধযুদ্ধ। সারা দেশে কারফিউ, সেনা তত্পরতার মুখে যখন টুঁ শব্দটি করার উপায় ছিল না, তখন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর আহ্বানে একদল দামাল যোদ্ধা অস্ত্রহাতে গর্জে ওঠেন।
যোদ্ধারা অস্ত্রহাতে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে কাঁপিয়ে তোলেন সীমান্তবর্তী জনপদ। জাতির পিতাকে হারানোর শোকে মুহ্যমান একেকজন বীরযোদ্ধা জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েন গেরিলাযুদ্ধে। গারো পাহাড়ঘেঁষা ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা জেলা ও সুনামগঞ্জের হাওর-বেষ্টিত সীমান্তের বিরাট এলাকা জুড়ে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হন তারা। সশস্ত্র আক্রমণের মাধ্যমে সীমান্তবর্তী পাঁচটি বিডিআর ক্যাম্প ও দুটি থানা দখল করে প্রায় ৩০০ বর্গমাইল এলাকা নিজেদের কবজায় নেন প্রতিরোধযোদ্ধারা।
আজ অনেকেই অশ্রু, কান্না, শোকে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করলেও পঁচাত্তরে বাঘা সিদ্দিকীর মতো আর কেউ গর্জে ওঠেননি, অস্ত্রহাতে নেতৃত্ব দিয়ে কেউ নামেননি প্রতিরোধে। ওই সময় সেনা-বিডিআর-পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে প্রতিরোধযোদ্ধাদের সম্মুখযুদ্ধের বিবরণ বেশ কয়েকবার আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়ও গুরুত্ব পায়। ১৯৭৬ সালের ২০ জানুয়ারি কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার হেডিং ছিল— ‘কংশ নদের উত্তরাংশের ৩০০ বর্গমাইল এলাকা বাঘা বাহিনীর দখলে শেখ মুজিব হত্যার প্রতিরোধ চলছে’।
14/08/2022
বঙ্গবন্ধু হত্যার সশস্ত্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আন্দোলন-
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার প্রতিবাদে মুজিব ভক্তরা গড়ে তুলেছিলেন সশস্ত্র প্রতিবাদ। ইতিহাসের জঘন্যতম এই হত্যাকান্ডের পর পর বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সেই সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ চলেছে ’৭৭ সালের মে মাস পর্যন্ত। প্রায় দুই বছর এই আন্দোলনে জীবনদান করেন শতাধিক যোদ্ধা। বাংলাদেশের আদিবাসীরা এ প্রতিবাদ আন্দোলনে ছিলেন অন্যতম প্রধান শক্তি। এ সশস্ত্র আন্দোলনে জীবন দেয়া যে ৮৬ জনের নাম পরিচয় পাওয়া গেছে, তার মধ্যে ২৫জনই আদিবাসী।
যেভাবে শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ : ১৫ আগস্ট ভোরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর গোটা দেশ স্তম্ভিত হয়ে যায়। ঘাতকদের পক্ষে মেজর ডালিম বার বার রেডিওতে ঘোষণা করছিল এ হত্যাকান্ডের খবর। অনেকেই আশা করেছিল এই হত্যাকাণ্ডের তাৎক্ষনিক প্রতিবাদ হবে। কিন্তু শীর্ষ নেতাদের অধিকাংশই আত্মগোপণ করেন। তৎকালীন সেনা, বিমান, নৌ বাহিনী প্রধান, বিডিআর এর মহাপরিচালক, রক্ষীবাহিনী, পুলিশের আইজি সহ সরকারি সব বাহিনীর প্রধান গিয়ে একে একে খুনীদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের শীর্ষ কয়েকজন মোস্তাকের মন্ত্রীসভায় যোগদান করেন। এসব দেখে হতাশ হয়ে পরে সারা দেশের অগণিত মুজিব ভক্ত। তবে ছাত্রলীগ, যুবলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা কিছু একটা করার জন্য তৎপর হন। নিজেদের মধ্যে তারা যোগাযোগ শুরু করেন। ২২ আগস্ট টাঙ্গইলের তৎকালীন জেলা গভর্নর প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম ছয়জন সঙ্গী নিয়ে জামালপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। সেখানে গিয়ে ‘হত্যাকারী অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে’ সশস্ত্র প্রতিরোধের ডাক দেন।
সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু : শুরুতে টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধা এবং ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কিছু নেতাকর্মী ভারতে গিয়ে যোগদেন কাদের সিদ্দিকীর সাথে। ৭৫এর অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে এই বাহিনীর একটি গ্রুপ যমুনা নদী হয়ে নৌপথে দেশে প্রবেশ করে। সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর চরে বাংলাদেশের আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে তাদের সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এতে বগুড়া জেলা যুবলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেক খসরু নিহত হন। প্রচন্ড যুদ্ধের মুখে তার লাশ সহযোদ্ধারা যমুনা নদীতে ভাসিয়ে দেন। পরে তারা সেখান থেকে পিছু হটে টাঙ্গাইল হয়ে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত এলাকায় চলে যায়। পথে হালুয়াঘাটে পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধ হয়।
জাতীয় মুক্তিবাহিনী গঠন : হালুয়াঘাট সীমান্তে গিয়ে গোবড়াকুড়া গ্রামে গারো আদিবাসী প্রবোধ দিও-র বাড়িতে প্রতিরোধ ব্যুহ (ডিফেন্স) তৈরি করে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন প্রতিরোধ যোদ্ধারা। তখন থেকে ছাত্রলীগ, যুবলীগ নেতাদের পাশাপাশি দলে দলে আদিবাসী যুবকরা সেই প্রতিরোধ আন্দোলনে যোগদান শুরু করে। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ভারতের তিনমাইল অভ্যন্তরে চান্দুভুই নামক স্থানে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়। এ বাহিনীর নামকরণ করা হয় ‘জাতীয় মুক্তিবাহিনী’। এবাহিনীর লগো ও ব্যাচ নির্বাচন করা হয় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি। বাহিনীর কমান্ডার ইন চীফ নির্বাচিত হন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম।
এছাড়া ৩৬জনকে এই বহিনীর বিভিন্ন কমান্ডার করা হয়। এরা হলেন সুনীল কুমার গুহ, ফারুক আহমেদ, আ.হ সেলিম তালুকদার, সৈয়দ নূরুল ইসলাম, আরিফ আহেমদ দুলাল, কবিরুল ইসলাম বেগ, সাইদুর রহমান মহারাজ, খোরশেদ আলম আর.ও, মাহবুব আহমেদ, আলী হোসেন, মীর দেলোয়ার, আব্দুল বাতেন, জয়নাল আবেদীন, বিজন সাহা, নাসিম ওসমান, অলোক দত্ত, দীপংকর তালুকদার, মোঃ আব্দুল্লাহ, পংকজ আজিম, আব্দুল হক, জীতেন ভৌমিক, বাবুল হক, লুৎফর রহমান, মোঃ আমান উল্লাহ, তমছের আলী, আলবার্ট ম্রং, গাজী লুৎফর, সুকুমার সরকার, হাসেমী মাসুদ জামিল, জগলুল পাশা, বিজন সরকার, আব্দুল হালিম, এম.এ মান্নান, আব্দুর রব, সুলতান মোহাম্মদ, এম.এ জলিল ও প্রবোধ দিও।
জাতীয় মুক্তিবাহিনীর প্রতি সংহতি প্রকাশ : চান্দুভুই হেড কোয়ার্টার থেকেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অপারেশন পরিচালনা করা হতো। হেড কোয়ার্টারে গিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তৎকালীন দপ্তর সম্পাদক আনোয়ার চৌধুরী, ফরিদপুর জেলা গভর্নর শামসুদ্দিন মোল্লা, রাজবাড়ী জেলা গভর্নর ডা. এস.এ মালেক, সাংসদ আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, চট্টগ্রামের এমবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ (সাবেক সিটি মেয়র, চট্টগ্রাম) বাংলাদেশ থেকে আওয়ামী লীগে বিভিন্ন স্তরের নেতারা জাতীয় মুক্তিবাহিনীর সাথে সংহতি জানিয়েছেন।
প্রথম শোক দিবসে প্রতিশোধের পরিকল্পনা : ৭৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ জাতীয় মুক্তিবাহিনী বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। সে বছর আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। বাহিনীর পক্ষ থেকে ১৫ আগস্টকে জাতীয় শোকদিবস ঘোষণা করে অনেকগুলো সশস্ত্র গ্রæপকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাঠানো হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব গ্রুপের সাথে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এতে জাতীয় মুক্তিবাহিনীর বেশ কিছু সদস্য নিহত, আহত ও গ্রেফতার হন। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় বিশ্বজিৎ নন্দীর নেতৃত্বে একটি গ্রুপ টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কে বানারপাড়া সেতু আক্রমণ করতে আসেন। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে তাদের যুদ্ধ হয়। সে যুদ্ধে বিশ্বজিৎ নন্দীর সাথে আসা চার জন জীবন দেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে বিশ্বজিৎ নন্দী গ্রেপ্তার হন। সামরিক আদালতে তার ফাঁসির আদেশ হয়। ১৪ বছর কনডেম সেলে কাটিয়ে ৯০ সালে তিনি মুক্তি পান।
যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন : প্রতিরোধ যোদ্ধা পরিষদের সূত্রে জানা যায়, এই সশস্ত্র আন্দোলনে শতাধিক যোদ্ধা জীবন দেন। এদের ৮৩জনের নাম পাওয়া গেছে। এরা হচ্ছেন বগুড়ার আব্দুল খালেক খসরু, নজিবুর রহমান নিহার, গাইবান্ধার ইবনে সাউদ, রেজাউল করিম (১), মিজানুল হক মুকুল, মোহাম্মদ আলী, আব্দুর রাজ্জাক, আলী আযম আলমগীর, মোঃ বাবুল, মোঃ সোলায়মান, আব্দুর রহিম আজাদ, কুড়িগ্রাম জেলার রেজাউল করিম (২), নূরুল ইসলাম, নরুল আমিন, নেত্রকোনা জেলার আব্দুল খালেক, রাধারমন রায় ঝন্টু, বামুন সরকার, রজব আলী, আবুল কাশেম, হামিদুল ইসলাম, ফজর আলী, শান্তি বিকাশ সাহা পলটু, আব্দুল হেকিম, মুসলিম উদ্দিন তালুকদার, সুব্রত, টাঙ্গাইল জেলার সাখাওয়াত হোসেন মান্নান, সৈয়দ নূরুল ইসলাম, চট্টগ্রামের মৌলভী সৈয়দ আহমেদ, কুমিল্লার সুশীল ভৌমিক বেলু, সুনামগঞ্জের নিরানন্দ দাশ, মতি লাল দাশ, আখলমন মাঝী, বলরাম সরকার, শেরপুর জেলার বিপ্লব কুমার দে দুলাল, দুলাল মিয়া, মনোরঞ্জন সরকার, হাবিবুর রহমান, বীরেন্দ্র চন্দ্র পাল, কছর আলী, আলী হোসেন, শওকত আলী, মোতালেব, ধীরেন্দ্র চন্দ্র শীল, রুস্তম আলী, মোজাম্মেল হক, জামালপুর জেলার নজরুল ইসলাম, আলতাফুর রহমান, ময়মনসিংহ জেলার আব্দুল হামিদ, আব্দুল আজিজ, সুশীল চন্দ্র দত্ত, রঞ্জিত কুমার এস, মজিবুর রহমান খান, সুবোধ চন্দ্র ধর, আলকাস উদ্দিন সরকার, দ্বীপাল চন্দ্র দাশ, জোবেদ আলী, সিরাজুল ইসলাম। শহীদদের মধ্যে ২৫জন আদিবাসী রয়েছে। এরা হচ্ছেন শেরপুরের নালিতাবাড়ি উপজেলার রঞ্জিত সাংমা, অনন্ত বর্মণ, জয়েশ্বর বর্মণ, সপ্রæ সাংমা, কাশেম সাংমা, নিরঞ্জন সাংমা, পিটারসন সাংমা, প্রাণবল্লভ বর্মণ, প্রটিন দিও, শ্রীদাম রিছিল, চিত্তরঞ্জন ডালু, শ্রীবর্দী উপজেলার সম্রাট সাংমা, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার ফনেস সাংমা, তপন চাম্বুগং, অ্যালিসন মারাক, গোবিনিক মারাক, সুদর্শন মানকিন, হারু সাংমা, হযরত সাংমা, জবিনাশ তেলসী, অগাস্টিন চিছিম, সুধীন কুবি, ডমিনিক চাম্বুগং, নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার হেনরী সাংমা এবং ধোবাউড়া উপজেলার পংকজ আজিম। এদের মধ্যে অবশ্য কেউ কেউ অন্তর্দলীয় কোন্দলে নিহত হন।
ভারত সরকারের অসহযোগিতা : ’৭৭ সালে নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকারের পরাজয়ের পর ক্ষমতায় আসেন মোরারজী দেশাই। নতুন সরকার জাতীয় মুক্তিবাহিনীকে তাদের দেশের মাটি ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। জাতীয় মুক্তিবাহিনীর প্রধান কাদের সিদ্দিকীকে আলোচনার কথা বলে মেঘালয়ের তুরায় নজরবন্দী করেন। বাহিনীর অন্যান্য সদস্যদের চান্দুভূই হেড কোয়ার্টারে বিএসএফ সদস্যরা ঘিরে রাখে। এক পর্যায়ে ’৭৭ এর মে মাসে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করে। বাহিনী প্রধান কাদের সিদ্দিকীসহ নেতৃস্থানীয় কয়েকজনকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয় ভারত সরকার। আর এর মধ্য দিয়েই সমাপ্তি ঘটে প্রতিরোধ যুদ্ধের।
খুনীরা বিনা চ্যালেঞ্জে যেতে পারেনি : প্রতিরোধ যোদ্ধা পরিষদের আহ্বায়ক আ হ সেলিম তালুকদার বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। সারা বিশ্ব তাকিয়ে ছিল এর প্রতিবাদে কি হয় তা দেখতে। যাদের ভূমিকা রাখার কথা ছিল তারা অনেকেই সে ভূমিকা রাখতে পারেনি। আমরা প্রতিরোধ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিনা চ্যালেঞ্জে যেতে দেইনি। জাতিকে কলঙ্কের হাত থেকে রক্ষা করেছি।
অগ্রণী ভূমিকায় ছিল আদিবাসীরা : এই বাহিনীর বিভিন্ন স্তরে বাঙালিদের পাশাপাশি আদিবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ৩৬ জন কমান্ডারের মধ্যে অন্যতম চার কমান্ডার ছিলেন আদিবাসী। এরা হচ্ছেন, দীপংকর তালুকদার (সাবেক পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী), পংকজ আজিম, আলবার্ট ম্রং, প্রবোধ দিও। এছাড়া নরবাট ম্রং, হরিষ সাংমা, চিত্ত সাংমা, মনোজ সাংমা, তরুণ সাংমা, রঞ্জিত সাংমা, জয়েশ্বর বর্মণ, সুদর্শন সাংমা, প্রদীপ সাংমা, প্রাণবল্লভ বর্মণ, সন্যাস হাজং, অমায়ুষ চিসিম, হলুদ আজিম কমান্ডার তালিকার সদস্য ছিলেন। জাতীয় মুক্তিবাহিনীর প্রতিটি অপারেশনে আদিবাসীরা বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
জাতীয় মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার হাশমী যুগল মাসুদ জানান, প্রতিরোধ যুদ্ধের যোদ্ধাদের ৩০ ভাগই ছিল আদিবাসী। তারা সেসময় বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাদের যে দায়িত্ব দেওয়া হতো তা পরিপূর্ণভাবে পালন করত। প্রতিরোধ যোদ্ধা সুসং দূর্গাপুরের যতীন্দ্র সাংমা (বর্তমানে বিরিশিরি কালচারাল একাডেমির পরিচালক) জানান, ৭৫সালের অক্টোবরে আরও অনেক আদিবাসীর মত তিনিও যোগ দেন সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধে। কলমাকান্দা, দূর্গাপুর, ধোবাউড়া সহ বিভিন্ন স্থানে ৮/৯টি যুদ্ধে অংশ নেয়। ভবানীপুরের যুদ্ধে সহযোদ্ধা ডমিনিক চাম্বুগং তার চোখের সামনেই শহীদ হন। তিনি বলেন, কিছু পাওয়ার জন্য সেদিন প্রতিরোধ যুদ্ধে যাইনি। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করতেই যুদ্ধে গিয়েছিলাম। সুসং দূর্গাপুরের হাজং মাতা রাশিমনি কল্যান পরিষদের সভাপতি মতিলাল হাজং বলেন, বৃহত্তর ময়মনসিংহের সীমান্ত এলাকার আদিবাসীরা বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে যুদ্ধে অংশ নেয়ায় সেখানকার আাদিবাসীদের চরম অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করতে হয়। মামলায় পড়ে সর্বশান্ত হয় অনেকে। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিব দ্রং বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এর প্রতিবাদে গড়ে উঠা সশস্ত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও সমর্থন জানানোর অপরাধে সাধারণ আদিবাসীদেরও সে সময় অনেক নির্যাতন, হয়রানীর শিকার হতে হয়েছে। অনেক আদিবাসী দেশ ত্যাগ করতে পর্যন্ত বাধ্য হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক এবং বাংলাদেশ আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মেসবাহ কামাল বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আওয়ামীলীগের নেতৃত্বের মধ্য থেকে তেমন কোন প্রতিবাদ প্রতিরোধ দেখা যায়নি। কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে যে সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল তার প্রধান শক্তি ছিল আদিবাসীরা। এর মধ্যদিয়ে দেশের প্রতি, দেশ নায়কের প্রতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতি আদিবাসীদের যে কমিটমেন্ট তাই প্রকাশ পেয়েছে। এজন্য তাদের অনেক অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। প্রতিরোধ যোদ্ধাদের এই ত্যাগের স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। এটা খুবই অনভিপ্রেত।
তথ্য সংগ্রহ: সাবেক ছাত্রনেতা, সাংবাদিক- কামনাশীষ শেখর।
10/08/2022
১৬ আগস্ট স্মৃতিময় ঐতিহাসিক মাকরাই দিবস। যেখানে ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে বিখ্যাত মাকরাই যুদ্ধে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম সম্মুখ যুদ্ধে গুলিতে আহত হয়েছিলেন। এক জন শহীদ ও আরো বেশ কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়েছিলেন।
আগামী ১৬ আগষ্ট ২০২২ ইং মঙ্গলবার
মাকরাই দিবস উদযাপন সফল করুন।
উপস্থিত থাকবেন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।
স্থান: মাকরাই ঘটনাস্থল , ঘাটাইল, টাঙ্গাইল ।
09/08/2022
দেশের সবচাইতে বেশি আলোচিত তর্কিত বিতর্কিত বিষয় পেট্রোল ডিজেলের দাম বাড়ানো। যখন সারা দুনিয়ায় ১৭০ ডলার হয়েছিল প্রতি ব্যারেল তখন বাড়ানো হয়নি। এখন ৮৮-৯০ ডলার প্রতি ব্যারেল। কদিনে আরও কমবে। এর মধ্যে আবার প্রিয় বোন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেদিন বলেছিলেন, অকটেন পেট্রোল দেশেই উৎপাদন হয়। ঠিক এমনি এক সময় হঠাৎ করে তেলের দাম ব্যাপক বৃদ্ধি অকল্পনীয়।
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম
05/08/2022
02/08/2022
শেখ হাসিনা ও একটি বুলেটপ্রুফ গাড়ি-২
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম
মঙ্গলবার, ২ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ টা
হজরত খোয়াজ খিজিরের চশমা নিয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজামের দুটি লেখা পড়লাম। অসাধারণ, তুলনাহীন, আন্তরিকতায় ভরপুর। এমনিতেই নঈম নিজামের লেখার আমি ভীষণ ভক্ত। সেই সময় মুসা (আ.)-এর জমানায় চশমা ছিল কি ছিল না জানি না।
কিন্তু পর্দা আর বেপর্দা সে সময়ও ছিল। তাই একটা আসল-নকল তো সব সময়ই ছিল। দোয়া করি আল্লাহ রব্বুল আলামিন নঈম নিজামের ক্ষুরধার লেখা যেন অব্যাহত রাখার তৌফিক দেন। আসলেই সত্য বড় কঠিন।
আমরা একমুহূর্ত আগেও জানি না পরমুহূর্তে কী হতে চলেছে। অথচ আমাদের কত দেমাক, কত অহংকার যার কোনো সীমা নেই। লিখতে চেয়েছিলাম সেই বুলেটপ্রুফ গাড়িটি নিয়ে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে। কিন্তু মনটা বড়ই খারাপ।
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বুঝে ওঠার আগেই ট্রেন দুর্ঘটনায় মুহূর্তে ১১টি তাজা প্রাণ ঝরে গেল। কারও কিছু করার ছিল না। বাপ-মা হারা সন্তান যেমন এতিম-অসহায়, ঠিক আমরাও কেন যেন তেমন অসহায় লাচার। কারও কোনো কিছু করার নেই। কবে যেন প্রিয় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে একটু সজাগ হতে, রাস্তাঘাটে ছোটবড় সব পরিবহন বা যান চালকদের একটু প্রশিক্ষণ একটু যত্ন নিতে বলেছিলাম।
বলেছিলাম তারা স্বাভাবিক কি না, নেশা স্পর্শ করেছে কি না খোঁজখবর করে দেখতে। অনুরোধের রেশ কাটতে না কাটতেই এমন ভয়াবহ দুর্বিষহ রেল দুর্ঘটনা সহ্য করা যায় না।
একটি রেল দুর্ঘটনায় এ উপমহাদেশের এক প্রবীণ নেতা মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তাঁর বন্ধুবান্ধব-সহকর্মীরা তাঁকে বোঝাতে গিয়েছিলেন কেন পদত্যাগ করবেন। আপনি তো আর রেল চালান না যে দুর্ঘটনার জন্য আপনি দায়ী। পন্ডিত জওহরলাল নেহরুর মন্ত্রিসভার রেলমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী পদত্যাগ করেছিলেন। তিনি পরে মহান ভারতের প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন। আমাদের মাননীয় রেলমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন কি পদত্যাগ করবেন? নাকি এসব দুর্ঘটনা তাঁর কাছে কোনো ধর্তব্যই নয়, সবই পানি পানি। রেলমন্ত্রীর বড় ভাই সিরাজুল ইসলাম একজন নামকরা নেতা, দরদি মানুষ ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে ‘আমার পাগল’ বলে আদর করতেন। সিরাজ ভাই বেঁচে থাকলে তিনি রেলমন্ত্রী হলে এ রকম বেপরোয়া রেল দুর্ঘটনায় সঙ্গে সঙ্গে পদত্যাগ করতেন- এ ব্যাপারে আমি শতভাগ নিশ্চিত। পাকিস্তান আমলে আমাদের রেলপথ ছিল হাজার-বারো শ মাইল। এখন সেটা দুই-আড়াই হাজার মাইলে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু অনিয়ম-দুর্ঘটনা বেড়েছে হাজার গুণ। শুনলাম, রেলক্রসিং নাকি সাড়ে ৩ হাজারের মতো। তার ২ হাজারই অবৈধ। নিজেরাই রাস্তা করে নিয়েছে। এও কি সম্ভব! দুনিয়ার আর কোথাও নিজেরা ইচ্ছামতো রেলক্রসিং বানাতে পারে কখনো শুনিনি। তবে বাংলাদেশে সবই সম্ভব। শুনেছি গেটম্যানকে আসামি করে মামলা দেওয়া হয়েছে। জানি না ওই ক্রসিংয়ে আদৌ কোনো বৈধ গেটম্যান ছিল কি না। থাকলে সে নিয়মিত বেতন পায় কি না বা একজনের কাজ আরেকজনকে দিয়ে চালায় কি না। আর শুধু রেলকেই বলব কেন, শুধু রেলকে দায়ী করে কী লাভ। যে মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় পড়েছে তারও খোঁজখবর নেওয়া দরকার, গাড়িটি রেললাইনের ওপর নষ্ট হবে কেন বা দাঁড়িয়ে যাবে কেন। গাড়ির কোনো ত্রুটি ছিল কি না। রেললাইনের ওপর গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ার তো কোনো কথা নয়। রেললাইন পার হওয়ার সময় মাইক্রোবাস চালকের তো এপাশ-ওপাশ দেখা উচিত। আশপাশে গাড়ি না থাকলে কিছুটা গতি নিয়েই তো রেললাইনের ওপর মাইক্রোবাসটি ওঠার কথা। তাহলে রেললাইনের ওপরে দাঁড়িয়ে যাবে কেন? এখানে মাইক্রোবাস চালকের কোনো ত্রুটি নেই তো? আর যে মাইক্রোবাসের ১১ জন লোক মারা গেছেন, আর কয়েকজন আহত হয়েছেন। গাড়ি থেকে দু-চার জন নেমে ধাক্কা দিলেই তো মাইক্রোবাসটি রেললাইন থেকে সরে যেতে পারত। সবাই কি দিশাহারা বোধশক্তিহীন ছিল কিছুই বুঝতে পারছি না। সাধারণত সব ক্রসিং পার হওয়ার সময় রেলগাড়ি অনেক দূর থেকে হুইসেল দেয়। সবকিছু খতিয়ে দেখা দরকার।
২৭ জুলাই বুধবার ছিল নির্বাচন কমিশনে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের বৈঠক। নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের ১৭ জন প্রতিনিধি নিয়ে এক সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা। আগের নূরুল হুদা কমিশনের চেয়ে বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ধীরস্থির একজন স্বতঃস্ফূর্ত মানুষ মনে হয়েছে। প্রথমেই শুনেছিলাম আওয়ামী লীগের জন্য দুই ঘণ্টা, বিএনপির জন্য দুই ঘণ্টা। বিষয়টা একেবারে ভালো লাগেনি। তবে নির্বাচন কমিশন ও রকম কারও জন্য বেশি কারও জন্য কম এমন সিদ্ধান্ত নেয়নি। তারা সবার জন্য সমান সময় দিতে চেয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রেও দিয়েছেনও। আলোচনায় কতটা কাজ হবে জানি না, এর আগে নির্বাচন কমিশনে ইভিএম দেখার আমন্ত্রণে যাইনি। এখন দেশটা দুই ভাগে বিভক্ত। কোনো কিছু হলেই হয় আওয়ামী লীগ, না হয় বিএনপি। তবে আমরা আওয়ামী লীগ-বিএনপি নই। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ জনগণের পক্ষের জনগণের দল। জনগণের কথা বলাই আমাদের মূল লক্ষ্য। তাই আমরা চেষ্টা করেছি। তলোয়ার রাইফেল নিয়ে কথা হয়েছে, কথা হয়েছে ১০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার নিয়েও। ইভিএমের ভুল ধরতে পারলে ওই পুরস্কার নির্বাচন কমিশন দেবে, না যিনি বলেছেন সেই কমিশনার ব্যক্তিগতভাবে দেবেন। কারণ এখন তো আর কারও টাকাপয়সা কম নেই। সবাই টাকার ওপর ভাসে। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল যেভাবে বিষয়টা ব্যাখ্যা করেছেন আমাদের কাছে ভালো লেগেছে। আমরা মেনে নিয়েছি। কারণ ভুল সবারই হয়। ভুল ধরে বসে থাকলে তার কোনো সমাধান নেই। তবে নির্বাচন কমিশনের দৃঢ় শক্ত মেরুদন্ড থাকা উচিত। নির্বাচন কমিশনের সময় দুই ধরনের। একটা নির্বাচন তফসিল ঘোষণার পর, আরেকটা ঘোষণার আগে। নির্বাচন কমিশনের দুই ধরনের ক্ষমতা। জাতীয় নির্বাচন ঘোষণা হয়ে গেলে ৯০ দিনের জন্য নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রের সবকিছু। নির্বাচন কমিশন মন্ত্রিসভা, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি সবকিছু। তফসিল ঘোষণার পর রাষ্ট্রের সবকিছু নির্বাচন কমিশনের অধীন। এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও আলাদা নন। এ ক্ষমতা সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে দিয়েছে। সেটা ব্যবহার করতে না পারলে, তেমন মেরুদন্ড না থাকলে সেটা সংবিধানের কোনো ত্রুটি নয়, ত্রুটি নির্বাচন কমিশনের, যাদের নিয়ে কমিশন তাদের। আমরা সব সময় প্রভাবমুক্ত নির্বাচন চাই। দেশবাসী তেমনটাই আশা করে, আমরাও তা-ই আশা করি। দেখা যাক ভবিষ্যতে কী হয়। তবে আমরা কেন, দেশের মানুষ কেউ ত্রুটিযুক্ত ইভিএম চায় না। আওয়ামী লীগ কেন চায় বুঝতে পারছি না। আওয়ামী লীগের বিরোধীরা যদি ইভিএম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পায় তার পরও কি তারা ইভিএম চাইবেন? মনে হয় না। ইভিএম নির্বাচনের জন্য কোনো ভালো কিছু নয়। তাই এ চুরির যন্ত্র বাদ দেওয়াই ভালো।
‘শেখ হাসিনা ও একটি বুলেটপ্রুফ গাড়ি’ লেখাটিতে অনেক সাড়া পেয়েছি, অনেক খুদে বার্তা পেয়েছি। দাদু আলাউদ্দিন নাসিম। আলাউদ্দিন নাসিম একসময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিএস বা প্রধান সচিব হিসেবে অনেকদিন কাজ করেছেন। আমার দাদার নাম আলাউদ্দিন সিদ্দিকী। তাই নাসিমকে দাদু বলেই ডাকি। ভীষণ ভালো মানুষ। আরেকজনকে দাদু বলে ডাকতাম রাজশাহীর বাঘার সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলাউদ্দিন। কীভাবে যেন বিএনপি তাকে বাগিয়ে নিয়ে মন্ত্রী করেছিল। আওয়ামী লীগে থাকতে তাঁর সঙ্গে একবার সাংগঠনিক সফরে তাঁর বাড়ি গিয়েছিলাম। বাঘায় চমৎকার নকশিকাঁথা তৈরি হয়। মায়েরা, বোনেরা, মেয়েরা ঘরে ঘরে নকশিকাঁথা বানায়। কি চমৎকার সেলাই, তুলনাহীন। কিন্তু সত্যিকার অর্থে সেসব কাঁথার সঠিক বিপণন নেই, মায়েরা-বোনেরা-মেয়েরা সত্যিকারের মজুরি পায় না। তাদের রাতদিনের পরিশ্রমের ফসল যায় ইন্দুর বাইতানের পেটে। সেই আলাউদ্দিন নাসিম খুদে বার্তায় জানিয়েছেন, ২১ আগস্ট ওই নির্মম ঘটনার সময় বুলেটপ্রুফ গাড়িটি চালাচ্ছিল মতিন নামে একজন ড্রাইভার। মিটিংয়ে যাওয়ার সময় আলাউদ্দিন নাসিম নেত্রীর সঙ্গেই ছিলেন। সেই মতিনই নাকি গাড়ি চালিয়ে পল্টন থেকে সুধা সদনে ফিরেছিলেন।
আমি তখন ঢাকায় ছিলাম না। তাই ঢাকার তেমন কিছুই জানতাম না। প্রণবদার বাড়ি থেকে প্রায় ২-৩ ঘণ্টা ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করছিলাম। বাবর রোডের বাড়িতেও বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করেছিলাম, দীপের আম্মুকে বোনের খোঁজ নিতে বলেছিলাম। আমার স্ত্রী খুবই সাদামাটা মানুষ, ভালো করে ফোনে ডায়াল করতে জানতেন না। এখনো বোতাম টিপতে জানেন না। যা হোক, দিল্লিতে একটা থমথমে ভাব। ওরপর যেখানেই গেছি সবার আগে জানতে চেয়েছে ঢাকার খবর কী, নেত্রীর খবর কী, তিনি নিরাপদ কি না। একদিন পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতে শুধু ঢাকার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। হাত মিলিয়ে গামছা গলায় পরিয়ে দেওয়ার পর তিনি প্রথমেই বলেছিলেন, ‘আমি ভারতের প্রধানমন্ত্রী। আরও অনেকেই প্রধানমন্ত্রী হবেন। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আপনার যে অবদান আপনার যে ভূমিকা এটা আর কারও হবে না। আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ মানে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা। ’ এরপর আর তেমন অন্য কথা হয়নি। প্রায় ১ ঘণ্টার মতো শুধু ঢাকা, ঢাকা আর ঢাকার দুঃসময়ের কথা। তখন বাংলাদেশে ভারতের বর্তমান হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী ছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎকারের সময় ছিলেন। অমায়িক এক বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ। এরপর সকালে গিয়ে রাতেই ফিরেছিলাম আজমির শরিফ থেকে। কিছুই ভালো লাগছিল না। মনে হচ্ছিল তখনই ফিরে আসি। বাংলাদেশ বিমানের টিকিট ছিল। ফোন করেছিলাম দিল্লির অফিসে। তারা বলছিল যখন চাইবেন তখনই টিকিট পাবেন। টিকিট নিশ্চিত করতে লোক পাঠিয়েছিলাম। ঠিক সে সময়ই কে যেন বলল ২১ আগস্টের অনেক আহত দিল্লির অ্যাপোলো হাসপাতালে আসছেন। টিকিট নিশ্চিত না করে এক দিন বা দুই দিন দেরি করেছিলাম। জীবনে প্রথম গিয়েছিলাম দিল্লির অ্যাপোলো হাসপাতালে। সে তো হাসপাতাল নয়, যেন ফাইভ স্টার হোটেল। দিল্লির অশোকা হোটেলের চেয়েও চমৎকার।
অ্যাপোলো হাসপাতালে গিয়ে দেখি অনুপ কুমার সাহা তুলসীকে। তুলসী ফরিদপুরের ছেলে। জননেতা রাজ্জাক ভাইকে জানপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। তুলসী আহতের প্রায় সবাইকে দেখিয়ে ছিল। প্রথমে দেখা হয়েছিল বাহাউদ্দিন নাছিমের সঙ্গে। খুবই অসুস্থ ছিল। বাহাউদ্দিন নাছিমের জন্য সেদিন বড় মায়া হয়েছিল, বড় কষ্ট হয়েছিল। সে যে আমার হাত ধরে ছিল তাতে উষ্ণতা ছিল, আবেগ ছিল। এরপর গিয়েছিলাম প্রিয় ওবায়দুল কাদেরের কাছে। খুবই খারাপ ছিল তাঁর অবস্থা। তিনি দুই হাত চেপে বলেছিলেন, ‘কাদের ভাই, আমরা কি শেষ হয়ে যাব? একটা কিছু করেন। আমাদের শেষ করে দেবে। ’ তাঁর আকুলতা বড় বেশি আমার বুকে বেঁধেছিল। নাসিম, ওবায়দুল কাদের, আবদুর রাজ্জাক, মমতাজ হোসেন, নজরুল ইসলাম বাবু, অজয় কর খোকন, বাহাউদ্দিন নাছিম, এনামুল হক শামীম ভর্তি ছিলেন। রাজ্জাক ভাই তাঁর ক্ষতস্থান পরিষ্কার করতে ড্রেসিংরুমে গিয়েছিলেন। সুরঞ্জিৎ সেনগুপ্ত আমি যাওয়ার কিছু আগে বাইরে চলে গিয়েছিলেন। তাঁর আঘাত একটু কম ছিল। বড় কষ্ট নিয়ে অ্যাপোলো হাসপাতাল ছেড়েছিলাম। সেসব দিনের কথা মনে হলে এখনো বড় বেশি খারাপ লাগে। পরদিন ফিরেছিলাম ঢাকার পথে। বিমান কিছুটা দেরিতে ছিল। তাই ভিআইপিতে বসে ছিলাম। সেখানে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার বীণা সিক্রি ছিলেন। বিমানে উঠে দেখি আমাদের দুজনের পাশাপাশি সিট। ভদ্রমহিলাকে আমার খুবই ভালো লেগেছিল। বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে মুচকুন্দ দুবে আর বীণা সিক্রির মতো অমন সফল হাইকমিশনার আর দেখিনি। বিমান দেরিতে দিল্লি পৌঁছলেও ওড়ার সময় যা ছিল তার চাইতে ১০ মিনিট কম সময়ে ঢাকায় নেমেছিল। আমার স্ত্রী ছেলেমেয়ে নিয়ে আমাকে আনতে বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে বীণা সিক্রির পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। পরে দাওয়াত করে বেশ কয়েকবার বীণা সিক্রির বাড়িতে আমার স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েদের খাইয়েছেন। মান্যবর হাইকশিনার আমার বাড়িতে এসে খাবার গ্রহণ করেছেন। সত্যিই একজন যথার্থ যোগ্য মানুষ ছিলেন বীণা সিক্রি। বিমানবন্দর থেকে সোজা সুধা সদনে বোনকে দেখতে গিয়েছিলাম। তিনি বড় উৎকণ্ঠিত ছিলেন, চিন্তিত ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৯০-এ দেশে ফিরলে যেভাবে আকুল হয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন, ঠিক তেমনি সেদিনও ওভাবে ব্যাকুল হয়ে আমাকে, ছেলেমেয়েকে, নাসরীনকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। আমাদের সবার চোখে ছিল পানি। আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে, তাকে শেষ করে দিতে এটা যে জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র তা বারবার বলছিলেন। আমরাও খুব ব্যথিত ছিলাম। কারণ এভাবে কারও জনসভায় আক্রমণ কোনো গণতান্ত্রিক দেশে হতে পারে না। অথচ তা-ই হয়েছে। এ ধরনের আক্রমণ মেনে নেওয়া যায় না। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরিবারের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে, এবার নেত্রী শেখ হাসিনাকে আক্রমণ। এমন নিন্দনীয় কাজ প্রাণ দিয়ে প্রতিহত করা উচিত, প্রতিরোধ করা উচিত। যতটা সম্ভব আমরা তা-ই করার চেষ্টা করছি, এখনো করি।
বোন শেখ হাসিনাকে দেখে বাড়ি ফিরলে মা প্রথম জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘হাসিনাকে কেমন দেখলি? মা আমার কেমন আছে?’ বলেছিলাম, খুব একটা ভালো না। মা খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন, চিন্তিত ছিলেন। মনে হয় না সারা জীবনে কখনো বাড়ির কাছে এসে মাকে না দেখে অন্য কোথাও গেছি। সেই ছিল জীবনে প্রথম। বিমান থেকে নেমে মাকে দেখতে বাবর রোডে না গিয়ে বোনের খবর নিতে তাঁকে দেখতে সুধা সদনে গিয়েছিলাম।
লেখক : রাজনীতিক।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Website
Address
Tangail
Dhaka
1976
