17/01/2026
পার্বতীপুরের নামকরণের ইতিহাস.... 📖
ইংরেজ ইতিহাসবিদ মিস্টার মাটিনের বিবরণ ও বেল সাহেবের মৌজা ম্যাপের পরিসংখ্যানে এই পার্বতীপুর অঞ্চলে প্রাচীন অনেক চিহ্ন উল্লেখ করা হয়েছে ।
এই অঞ্চলটি মূলত খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দ থেকে বারোশো খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত হিন্দু এবং বৌদ্ধদের বিচরণ অর্ধেক অর্ধেক ছিল এরপরে মুসলমানদের আগমন এবং বিস্তার শুরু হয়।। খ্রিস্টপূর্ব ৫৬৩ সালে নেপালের লুভিং কি এলাকায় বুদ্ধদেব জন্মগ্রহণ করার কারণে দিনাজপুরের পার্বতীপুর অঞ্চলটা খুব দূরে ছিল না। ফলে এ অঞ্চলে খুব দ্রুত বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশ ঘটে ও বিভিন্ন ধরনের বৌদ্ধ বিহার ধর্মশালা ও সাধন কেন্দ্র স্থাপিত হয়।সম্রাট অশোকের কলিঙ্গ যুদ্ধ সমাপ্তির পর তিনি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন অহিংস চিন্তার মধ্য দিয়ে। বিশেষত বৌদ্ধ ধর্মের চর্চা ব্যাপকভাবে এই প্রাচীন পার্বতীপুর অঞ্চলে শুরু হয়।
প্রথম শতকের দিকে এই অঞ্চলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমৃদ্ধশালী হিন্দু রাজারা বসবাস করত। তেমনি বর্তমানে করতোয়া নদীর পার্বতীপুরের ফকিরা বাজার সংলগ্ন এলাকার কিচক রাজার একটি স্বাধীন রাজ্য ছিল। এই কিচক রাজার ধন সম্পদে ভরপুর রাজ্যটি ছিল। এখনও পর্যন্ত নদীর পশ্চিম তীরে যে গড়টি টিকে আছে তা দর্শনীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত আছে। কিন্তু স্থানীয় লোকজন তা নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছে। আয়তন অর্ধ কিলোমিটার সমতল ভূমি থেকে উচ্চতা ৩০ ফুট এবং পার্শ্ব ৫০০ ফুট পরীখা পরিবেশিত ছিল।জায়গায় জায়গায় ধ্বংসের স্তুপ হয়ে গেলেও গড়ের স্বরূপ এখনো অখ্যাত ।এখান থেকে ১০০ গজ দূরে দুটি প্রাচীন আমলের পুকুর রয়েছে নাম উসাহার ও কাশাহার এর এক মাইল উত্তরে একটি স্থান ছিল যা হীরা জিরার ভিটা নামে পরিচিত ।
স্থানীয় জনশ্রুতি প্রচলিত গাথা পুথি অনুযায়ী কথিত জায়গাটিতে কিচক নামের রাজার যাতায়াত ছিল। হিরা জিরার ভিটায় দুই বোন বসবাস করত এই দুই বোনের মধ্যে হীরা কে কিচক রাজা বিয়ে করেন । এবং তাদের ঘরে একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে। রাজা অনেক আদর করে কন্যাটির নাম রাখেন পায়রাবতী। পায়রাবতী অপরূপ সুন্দর হওয়ার কারণে রাজা খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। রাজা ঢোল দেয় তার কন্যা পায়রাবতীকে বিয়ে দিবে।
বিভিন্ন জায়গায় থেকে রাজপুত্ররা এসে পায়রাবতীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। কথিত আছে চন্দ্রনাথ নামে এক রাজপুত্র পায়রাবতীকে বিয়ে করে। এর কিছুদিন পর ডাকাত হানা দেয় ধনসম্পদ লুটের আশায় এবং পায়রাবতীর স্বামীকে ডাকাত দল হত্যা করে। পায়রাবতীকে ডাকার দল অপহরণ করে কথিত পৌরাণিক অবকাশে পায়রাবতীকে দিমালিকা দীঘিকা( বর্তমান বাসুপাড়া অঞ্চলে এই পুকুরটি অবস্থিত)। এবং ডাকাত দুর্বৃত্ত কতৃক অপহিত পায়রাবতী লাঞ্ছিত হয়। এই অপমান সহ্য করতে না পেরে পায়রাবতী এই দিমালিকা দীঘিকা তে আত্মহত্যা করেন।
এই নিষ্ঠুর এবং বেদনাক্ত ঘটনা কিচক রাজা সহ্য করতে না পেরে স্ত্রী তার রাজবাড়ী এবং তার রাজ্য ছেড়ে চলে যান ।তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না কোনদিন।এই ঘটনার পর এলাকার মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে শতাব্দীর পর শতাব্দি মানুষ এই ঘটনাটিকে কষ্ট ভরে স্মরণ করতো। কিচক রাজার কন্যা পায়রাবতীর নাম অনুসারে ধীরে ধীরে এই অঞ্চলটি পার্বতীপুর নামে আবির্ভাব হয় বলে অনুমান করা হয়।।
কথিত আছে এই করতোয়া নদীকে কেন্দ্র করে যে হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশ ঘটেছিল তার মধ্যে খোলাহাট নামক স্থানে বর্তমান যেখানে বার্নি হয় সেই স্থানে হিন্দু ধর্মাবলীর লোকেরা হিন্দু দেবী পার্বতীর নামে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান করত এই অনুষ্ঠান টার নাম ছিল পূজা দিগন্ত। এবং এই অনুষ্ঠান টি অত্যন্ত ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিল। হিন্দু দেবী পার্বতীর নামে এই অঞ্চলের হিন্দু জনগোষ্ঠীর ভক্তি ও শ্রদ্ধার নির্দেশনস্বরূপ দূর-দূরান্ত থেকে এই অঞ্চলে পূজা পার্বণ করতে আসত। সেই পার্বতী দেবীর নামেই ধীরে ধীরে এই অঞ্চলটি ইতিহাসের পরিক্রমায় এবং বিবর্তনে আজকের এই পার্বতীপুর।।
তবে এই ইতিহাস কিছু পুথি প্রবাদ বাক্য কিংবদন্তি পৌরাণিক কাহিনীর জনশ্রুতি সমর্থিত।
তথ্য ও ছবি সংগ্রহীত!
