08/05/2025
বাচ্চা বাচ্চার মতো থাকবে। আমি যা বলবো শুনবে ....ভালো করে পড়াশোনা করবে ,যখন পড়তে বসতে বলবো চুপচাপ পড়তে বসে যাবে ...ভালো মার্কস আনবে ....এইটুকু হলেই আপনি খুশি তাই তো?
জেনে রাখুন আপনি ভুল রাস্তায় হাঁটছেন। আপনি যা যা চাইছেন ঠিক সেইগুলোই যদি আপনার বাচ্চা করে তাহলে আপনি একটা মেরুদণ্ডহীন কেরানী তৈরি করছেন ...এর বেশি কিছু না।
কথাটা আপনার গায়ে লাগতে পারে কিন্তু আপনারাই আপনার বাচ্চার আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করে দিচ্ছেন। কীভাবে করছেন জানবেন? তাহলে পড়তে থাকুন।
একদম ছোটো থেকেই শুরু করা যাক।
ধরুন একটা বাচ্চা সবে হাঁটতে শিখছে ... তো নতুন হাঁটতে শিখলেই ধুপ ধাপ পড়বে ...স্বাভাবিক.. খুবই স্বাভাবিক..
বাবা মা হিসাবে আপনার কী করা উচিত?
আপনার উচিত একটা এমন জায়গায় বাচ্চাকে নিয়ে যাওয়া যেখানে পড়ে গেলেও বাচ্চার খুব একটা জোরালো বা গুরুতর আঘাত লাগবে না ...যেমন ধরুন ঘাস আছে এমন মাঠ বা মাঠ না থাকলে বাড়িরই কোনো একটা ফাঁকা জায়গা যেখানে কোনো ধারালো কোন নেই ,সেখানে ফোম এর ম্যাট পেতে দিলেন...
বাচ্চা এরকম জায়গায় নিজে থেকে হামাগুড়ি দেবে .. তারপর একদিন হামাগুড়ি দিতে দিতেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়বে , তারপর ধরাম করে সামনে বা পিছনের দিকে উল্টে যাবে... আবার উঠবে আবার পড়বে ....এইরকম পড়তে পড়তেই একদিন এক পা দু পা এগিয়ে যাবে ....
চাইল্ড সাইকোলজি নিয়ে যদি একটু নাড়াঘাটা করেন জানতে পারবেন এই কাজটাই যদি আপনার বাচ্চা নিজে নিজে করে , এর মধ্যে দিয়েই বাচ্চার মনে "আত্মবিশ্বাস" নামক বীজটা অঙ্কুরিত হয়।
কিন্তু না ....আজকের দিনের মডার্ন বাবা মা কী করে... বেবী ওয়াকার কিনে তাতে বাচ্চাকে চাপিয়ে দেয়.... বাচ্চা পড়লো না ঠিকই ....কিন্তু সাথে ওই প্রথম "আত্মবিশ্বাস" নামক বীজটাও মাটির অনেক নীচে চলে গেলো।
এই যে শুরু হলো বাবা মা এর বাচ্চাকে প্রোটেক্ট করা ....এটা চলতেই থাকলো ।
বাচ্চা একবছর হয়ে গেলে তাকে নিজেকে খেতে দেওয়া উচিত ... নিজে খেলে হ্যান্ড আই ব্রেন কোঅর্ডিনসন হয় ...তার থেকেও বড়ো কথা বাচ্চা নিজের পেট শরীর বুঝে খেতে শেখে ।
কিন্তু না ... কিছু মা নিজের চার বছরের বাচ্চাকেও নিজে থেকে খেতে দিতে নারাজ ! সেই মেখে চটকে ছেলের মুখে গুজে দেবে। বাচ্চা নিজের শরীরটাকেই বুঝতে শিখবে না ।
একটা সহজ কথা মাথায় ঢুকিয়ে রাখুন ... দুনিয়ায় এমন কোনো প্রাণী নেই যার খিদে পেয়েছে সামনে খাবার আছে তাও খাচ্ছে না ! বাচ্চার সামনে খাবার রেখে চলে যান...খিদে পেলে ঠিক খাবে।
সকালে না খেলে বিকালে পেট চুই চুঁই করলে বিকালে খাবে ...বিকালেও না খেলে রাত্রে ঠিকই খাবে। একদিন আপনার বাচ্চাকে এটা করে দেখুন ...... সারা বছরের ওই খাবার নিয়ে অশান্তি আপনার চলে যাবে।
তারপর এটা করবি না ...ওটা করবি না ....সারাদিন ধরে বাচ্চার পিছনে টিকটিক টিকটিক টিকটিক... চিৎকার ...কোনো প্রয়োজন নেই।
বাচ্চা হয়তো খেলতে চাইছে ...বাবা মা হুকুম চালাচ্ছে "এক্ষুনি পড়তে বোস" ... বাচ্চা হয়তো বেড়াতে যেতে চাইছে ....বাবা মার হুকুম " এক্ষুনি ঘুমা "
বাচ্চাকে শাসন করার দরকার আছে ....কিন্তু কতটুকু করবেন সেই বোধটা অনেক বাবা মা এর নেই .....যখন শাসন এর দরকার তখন চুপ করে আছে , যখন শাসন করার কোনো প্রয়োজন নেই ,দিচ্ছে চটাস করে ধরিয়ে ...
বাচ্চা পুরোপুরি কনফিউস ! বাচ্চার ভালো মন্দ জ্ঞান , উচিত অনুচিত এর জ্ঞান কিন্তু আপনার শাসন করার ধরন থেকেই আসবে ।
যেমন ধরুন একদিন বাচ্চার পড়তে মন নাই হতে পারে ...পড়তে বসলো না , দিলেন চটাস করে লাগিয়ে ....এদিকে বাচ্চা স্কুল থেকে এসে নোংরা জামা কাপড় মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে রাখছে ....কোনো শাসন নেই! বাচ্চা ভেবে নিচ্ছে নোংরা জামাকাপড় মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলাটা এমন কোনো অপরাধ না।
অনেক বাবা মা কেই দেখি প্রায় প্রতিদিন অল্পসল্প করে ঠুকঠাক ধরিয়েই যাচ্ছে ....খুব ভুল পদ্ধতি । মাসে ঊনত্রিশ দিন ভালো মুখে বোঝান ....এক দিন দোষ করলে আচ্ছাসে পলিশ করুন ....
রোজ মারলে বাচ্চা রেকলেস হয়ে যাবে...এরকম অনেক বাচ্চাকে হতে দেখেছি । মারুন কম , কিন্তু যেদিন মারবেন সেদিনের শাসনটা যেনো অন্তত তিনমাস বাচ্চার মনে থাকে। আর প্লীজ ...কোনটা ঠিক অভ্যাস আর কোনটা খারাপ অভ্যাস এটা আগে নিজেরা ভালো করে বুঝুন। আপনি অফিস থেকে ফিরে নোংরা জামা কাপড় মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে রাখলে আপনার বাচ্চাও তাই করবে।
এখন আবার একটা মারাত্মক ট্রেন্ড দেখছি । বাচ্চার হোমওয়ার্ক কী আছে , এক্সাম এর সিলেবাস কী আছে ...বাচ্চার হুস নেই , এদিকে মা এর সব মুখস্ত !
বাচ্চার স্কুল প্রজেক্ট বাবা মা সুন্দর করে বানিয়ে দিচ্ছে যাতে নাম্বার ঠিকঠাক আসে!
জেনে রাখুন , লাইফের সবথেকে বড়ো ভুল করছেন। বাচ্চা ভাবছে এরকম চিটিং করাটাই বোধহয় নিয়ম !
একটা ছোটো ঘটনা বলি । আমি নিজে তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। এনুয়াল পরীক্ষার বাংলা পেপারটা দিতে গিয়ে দেখি অংকের প্রশ্নপত্র। বাড়ি ফিরতেই জানতে পারলাম আগের দিন আমাকে বাঙলা পড়তে দেখেও কিচ্ছুটি বলেনি ... একবারও মনে করিয়ে দেয়নি যে কালকে বাংলা না অঙ্ক পরীক্ষা !
অম্ল্যানবদনে বলে দিয়েছিল ..." তোর পরীক্ষা , হুস টা তোর থাকা দরকার । "
সেদিন কান্না পেয়েছিল, কিন্তু আজ বুঝি এই শিক্ষাটার দাম। একটা ক্লাসের একটা পরীক্ষায় হয়তো কিছুটা কম নাম্বার পেয়েছিলাম , কিন্তু নিজের কাজের রেসপনসিবিলিটি যে নিজেকেই নিতে হবে এই অসামান্য শিক্ষাটা আজও কাজে দেয়।
সামান্য এক দুটো পরীক্ষায় নাম্বার কম পেলে আপনার বাচ্চার কিচ্ছু এসে যাবে না । কিন্তু প্লীজ প্লীজ ওদের রেসপনসিবিলিটি নিতে শেখান .... ওদের হয়ে কোনো কাজ করে দেবেন না ....ওদের হোমওয়ার্ক কী আছে সেটা ওদেরকেই দেখতে বলুন ...ওদের স্কুল প্রজেক্ট ওদেরকেই করতে বলুন ....
রেসপনসিবিলিটি নিতে না শেখাটা আজকের দিনে প্রায় মহামারীর মতো হয়ে গেছে।
আপনার বাচ্চাকে রেসপনসিবিলিটি নিতে না শেখালে ...বা এর থেকেও বলা ভালো যে রেসপনসিবিলিটি নিতে না দিলে ....এরা কোনোদিনই রেসপনসিবল হবে না
.....মিলিয়ে নেবেন .. বুড়ো বাপ মা এর রেসপনসিবিলিটিও এরা নেবে না। তখন আর কাউকে দোষ দেবেন না , নিজেকেই দোষ দেবেন ।
আসলে "শিক্ষা" জিনিসটাকেই আমরা বড্ড সংকীর্ণ ভাবে নিয়ে নিয়েছি। শুধু কয়েকটা সাবজেক্ট পড়ে পরীক্ষায় ভালো নাম্বার পাওয়াটাকেই "শিক্ষা" বলে ধরে নিয়েছি।
অথচ আত্মবিশ্বাস , দায়িত্ব নিতে ভয় না পাওয়া .... অসহায়কে যতোটা পারা যায় সাহায্য করা .....এগুলোও কিন্তু শিক্ষার অঙ্গ! শুধু বই পড়া শিক্ষা হাত পা মুন্ডু বিহীন স্কন্ধকাটার মতো ....আসল রূপটা যেদিন উপলব্ধি করবেন বা চোখের সামনে দেখবেন সত্যি ভয় পেয়ে যাবেন । কিন্তু সেদিন আর কিছু করার থাকবে না ।
বাচ্চা বেলায় ভালো ফুটবল খেলতাম বলে পাড়ার ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন করে দিয়েছিল আমাকে .... নেতৃত্বের স্বাদ যে কী জিনিস সেই প্রথম বুঝেছিলাম । এগারো জন সমবয়সী ছেলে আমার কথা মেনে চলছে .... খুব ছোটো বয়সেই বুঝে গিয়েছিলাম কোনো জিনিসে দক্ষতা অর্জন করতে পারলে সন্মান পাওয়া যায়!
মজার ব্যাপারটা দেখুন...এই জিনিস আপনি হাজার বার আপনার বাচ্চাকে মুখে বলবেন বাচ্চা বুঝবে না ....মাঠে খেলতে পাঠান খুব সহজেই বুঝে যাবে ।
খেলা মানে কিন্তু সময় নষ্ট না ....এটা আজকের দিনের বাবা মাকে বলে বলেও বোঝাতে পারবেন না। মাথায় গেঁথে নিন খেলতে গিয়েই বাচ্চা অনেক কিছু শেখে ...
খেলতে গিয়ে ডিসিপ্লিন শেখে....অন্যকে বল পাস দিতে শেখে ... অন্যে গোল দিলে সেই আনন্দে লাফাতে শেখে ..... নেতৃত্ব দিতে শেখে ....
এগুলো যদি "শিক্ষা" না হয় তাহলে কোনটা আসল শিক্ষা? আজ থেকে কুড়ি বছর পরে আপনার বাচ্চা যখন জীবনসংগ্রামে বেরোবে এইগুলোই কিন্তু কাজে আসবে ...ক্লাস সিক্সে ইতিহাসে কতো নাম্বার পেয়েছিল কারো কোনো কাজে আসবে না।
ফর গড সেক.... বাচ্চাকে খেলতে দিন।
এটাকেও অনেকে ভুল বুঝবে । খেলা মানে ক্রিকেট কোচিং সেন্টার বুঝে নেবে.... পাতি পড়ার আরো পাঁচটা ছেলে পুলের সাথে খেলার কথা আমি বলছি , অন্য কিছু না ।
আসলে সমস্যাটা অন্য । আমরা যখন বড়ো হয়েছিলাম আমাদের সত্যি সেইভাবে দেখার কেউ ছিলো না । অনেকটা স্বাধীনতা পেয়েছিলাম .... সারাদিন আমাদের পিছনে কেউ টিকটিক টিকটিক করে বেড়াতো না ...
আজকের দিনের বাচ্চারা সত্যি খাঁচায় বন্দী পাখির মতো ...এদের কোনো স্বাধীনতা নেই। স্বাধীনতা ছাড়া কোনো ভাবেই আপনার বাচ্চার আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে না....লিখে রাখতে পারেন।
ফর গড সেক বাচ্চাকে ভুল করতে দিন .....
জীবনের প্রথম বছরগুলোতে যতো পারেক ভুল করুক । ভুল থেকে শিখলে শেখাটা জম্পেশ হবে। ভুল করে শিখলে আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে ।
আপনার বাচ্চাকে আজ ভুল করতে না দিলে বড়ো হয়ে ভুল করবে ....সেদিন হয়তো আপনি এই পৃথিবীতেই থাকবেন না । তাই আপনি যতোদিন আছেন , বাচ্চাকে ভুল করা থেকে আটকাবেন না।
বাচ্চা যেনো প্রশ্ন করতে ভয় না পায়...বাচ্চা যেনো "না" বলতে ভয় না পায়। আত্মবিশ্বাসী বাচ্চারা খানিকটা অবাধ্য হবে ... স্বাধীনচেতা হবে ....এই লক্ষণগুলো দেখলে আনন্দিত হন যে মেন্টালি স্ট্রং বাচ্চা তৈরি করতে পারছেন ।
একটা quote আমার খুব প্রিয়... রোজ সকালে উঠে একবার এটা নিজেই নিজেকে বলি...নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য।
"If YOU do TOO much for your children you are increasing your self esteem by STEALING theirs!"
কী রূঢ় সত্যি কথা... বার বার পড়ুন ...একদম হৃদয় দিয়ে বোঝার চেষ্টা করুন ....বুঝতে পারলে মনে হবে কেউ যেন মুখের সামনে একটা আয়না ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
লেখাটা পড়তে পড়তে আপনার কান মাথা গরম হয়ে গেলে মাফ করবেন । জোরে আঘাতটা না দিলে আপনার মনের গভীরে ঢুকবে না । নিজের বাচ্চা যদি মানুষের মতো মানুষ না হয় সত্যি বলছি যতই নিজে সফল হন না কেনো , জীবনের শেষ দিনে নিজেকে ব্যর্থ মনে হবে।
ছবিতে আমার বাচ্চা "ডোডো" .... নির্ভীক দামাল ..... কখনও কখনও অবাধ্য...আবার এই ছেলেই নিজের মনে বলে "রামকৃষ্ণ শরণম ...রামকৃষ্ণ শরণম" । গাছে জল দেয় ...কোনো কাজ দিলে দায়িত্বের সাথে করে...
কোনো গ্যারান্টি নেই এই বাচ্চা বড়ো হয়ে সমাজের চোখে "সফল" হবে কি হবে না...তবে মানুষ হিসাবে নির্ভীক আর আত্মবিশ্বাসী হবে, কোনো কিছুর দায়িত্ব নিতে ভয় পাবে না এটুকু আশা নিশ্চই বিফলে যাবে না।
আলোচনা হোক ...আপনার মতামত কমেন্টে জানান। লোকজনের সাথে শেয়ার করুন । সবার বাচ্চা ভালোভাবে মানুষ হোক 🙏

14/03/2023
02/11/2022