22/09/2025
***প্রশ্নঃ অভিভাবকের অমতে বিয়ে করার পর মেয়েটি স্বামীকে ছাড়তে পারবে কি?***
আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, প্রশ্নটি একজনের পক্ষ থেকে,আমার একটা ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিলো। কয়েক মাস পর বুঝতে পারি (প্রেম) হারাম। তাই পারিবারিক অমতে (কাজী অফিসে) বিয়ে করি। বিয়ের পর ১ মাস তার সাথে ছিলাম। তারপর যার যার বাড়িতে থাকি। বিয়ের ৬ মাস পর (একটা ফতোয়ায়) জানতে পারি আমাদের বিয়ে বাতিল-কারণ অভিভাবকের অমতে/পালিয়ে বিয়ে করেছি। এখন পারিবারিকভাবে বিয়ে সম্ভব না। কারণ ছেলে মাত্র এইচ.এস.সি শেষ করলো। পরিবার মানবে না। এখন আমার করণীয় কি? আর অন্য জায়গায় বিয়ে করলে এই কথা না জানালে কি ধোঁকা হবে?
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
এক. ইসলামি শরিয়তে বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার জন্য আবশ্যক ও ন্যূনতম শর্ত হলো, বিয়ের সময় সাক্ষী রাখতে হবে। সাক্ষী এমন দুইজন পুরুষ (স্বাধীন) সাক্ষী বা একজন পুরুষ (স্বাধীন) ও দুইজন মহিলা সাক্ষী হতে হবে, যারা প্রস্তাবনা ও কবুল বলার উভয় বক্তব্য উপস্থিত থেকে শুনতে পায়।
দুই. গোপন বিয়ে অমানবিক ও অসামাজিক হলেও যেহেতু তারা করেই ফেলেছে, এখন এই বন্ধন রক্ষা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এটি কোনো ছেলেখেলা নয় বরং এটি হলো, আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক প্রদত্ত ও নির্দেশিত নারী-পুরুষের সারাজীবনের একটি চিরস্থায়ী পূত-পবিত্র বন্ধন। ইসলামে তালাকের সুযোগ রাখা হয়েছে খুবই অপছন্দনীয়ভাবে। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পারিক সম্পর্ক যখন তিক্ত পর্যায়ে চলে যায় এবং সমাধানের কোনো পথ থাকে না তখনই তালাক দেওয়া হয়ে থাকে। তারপরও ইসলামে তালাক একটি জঘন্যতম বৈধ কাজ। রাসূলুল্লাহ ﷺ তা চরমভাবে ঘৃণা করতেন।
তিন, নতুন কোন জায়গায় বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে অবশ্যই আগের বিয়ে পরিপূর্ণ তালাক নিয়ে তবেই বিয়ে করতে হবে। তাছাড়া, নতুন জায়গায় বিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত অভিভাবকেরা আগের বিয়ে গোপন করে মিথ্যে-প্রতারণা-ধোঁকার আশ্রয় নেয় যেটা ঈমান আর ইসলামের সম্পূর্ণ খেলাফ, এ কাজ কখনোই করা যাবে না। যে অভিভাবকই এমনটা করবে তারা ইসলাম থেকেই বের হয়ে যাবে ইন শা আল্লাহ । (মহান আল্লাহর বিধান ও রসূল (স) এর আদর্শ তাই শিক্ষা দেয়)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَلَا تَلۡبِسُواْ ٱلۡحَقَّ بِٱلۡبَٰطِلِ وَتَكۡتُمُواْ ٱلۡحَقَّ وَأَنتُمۡ تَعۡلَمُونَ ٤٢﴾ [البقرة: ٤٢]
“তোমরা সত্যের সঙ্গে মিথ্যের মিশ্রণ ঘটাবে না। এবং জেনেশুনে সত্য গোপন করো না”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৪২]
নবীজি (সা.) বলেছেন, একজন মুমিনের ভেতরে অনেক ধরনের ত্রুটিই থাকতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই সে মিথ্যুক ও অসৎ হতে পারে না। (রেফারেন্সঃ মুসনাদ আহমাদ, হাদিস : ২২১৭০, বাইহাকী শু‘আবুল ঈমান, হাদীস নং ৪৮১২। হাদীসটি সহীহ।)
সাফওয়ান ইবনে সুলাইম বলেন, একবার নবীজিকে জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! মুমিন কি ভীতু হতে পারে? নবীজি (সা.) বলেন, হ্যাঁ। আবার বলা হলো, মুমিন কি কৃপণ হতে পারে? নবীজি বলেন, হ্যাঁ।
পুনরায় জিজ্ঞাসা করা হলো, মুমিন কি মিথ্যুক হতে পারে? নবীজি (সা.) বলেন, না। মুমিন কখনো মিথ্যুক হতে পারে না। (রেফারেন্সঃ সহীহ, তাম্বিহুল গাফিলিন, হাদিস : ১৯৯)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, ধোঁকা ও চালবাজ জাহান্নামে যাবে।’ (রেফারেন্সঃ তাবারানির কাবির ও সাগির, ইবনে হিব্বান)
রসূল (স) বলেছেন, যে প্রতারণা করে বা ধোঁকা দেয়, সে আমার উম্মতের মধ্যে গণ্য হবে না।’ (রেফারেন্সঃ সহীহ মুসলিম ১০২, মিশকাত)
তিনি আরও বলেন-من غشنا فليس منا : ‘যে ধোঁকা দেয়; সে আমাদের (মুসলিম) অন্তর্ভূক্ত নয়।’ (রেফারেন্সঃ সহীহ মুসলিম, ১৮৪-১৬৪/১০১)
আমাদের মতে, শরীয়তসম্মত পাকাপোক্ত ওজর না থাকলে কোনভাবেই তালাক করিয়ে নেয়া যাবে না।(সাবধান ! বিয়ে কোন ছেলেখেলা নয় !!)
হাদীসে এসেছে,
أبغض الحلال عند الله الطلاق
‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত হালাল–তালাক।’ (আবু দাউদ ২১৭৭)
প্রিয় নবীজি (স) বলেছেনঃ
بَابُ الْوَسْوَسَةِ
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ إِبْلِيسَ يَضَعُ عَرْشَهُ عَلَى المَاء ثمَّ يبْعَث سراياه فَأَدْنَاهُمْ مِنْهُ مَنْزِلَةً أَعْظَمُهُمْ فِتْنَةً يَجِيءُ أَحَدُهُمْ فَيَقُولُ فَعَلَتُ كَذَا وَكَذَا فَيَقُولُ مَا صَنَعْتَ شَيْئًا قَالَ ثُمَّ يَجِيءُ أَحَدُهُمْ فَيَقُولُ مَا تَرَكَتُهُ حَتَّى فَرَّقَتْ بَيْنَهُ وَبَيْنَ امْرَأَتِهِ قَالَ فَيُدْنِيهِ مِنْهُ وَيَقُولُ نَعَمْ أَنْتَ قَالَ الْأَعْمَشُ أرَاهُ قَالَ «فيلتزمه» . رَوَاهُ مُسلم
وعن جابر قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم إن إبليس يضع عرشه على الماء ثم يبعث سراياه فأدناهم منه منزلة أعظمهم فتنة يجيء أحدهم فيقول فعلت كذا وكذا فيقول ما صنعت شيئا قال ثم يجيء أحدهم فيقول ما تركته حتى فرقت بينه وبين امرأته قال فيدنيه منه ويقول نعم أنت قال الأعمش أراه قال «فيلتزمه» . رواه مسلم
ইবলীস (শয়তান) সমুদ্রের পানির উপর তার সিংহাসন স্থাপন করে। অতঃপর মানুষের মধ্যে ফিতনাহ্ (ফিতনা)-ফাসাদ সৃষ্টি করার জন্য সেখান থেকে তার বাহিনী চারদিকে প্রেরণ করে। এদের মধ্যে সে শয়তানই তার নিকট সর্বাধিক সম্মানিত যে শয়তান মানুষকে সবচেয়ে বেশী ফিতনায় নিপতিত করতে পারে। তাদের মধ্যে একজন ফিরে এসে বলে, আমি এরূপ এরূপ ফিতনাহ্ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করেছি। তখন সে (ইবলীস) প্রত্যুত্তরে বলে, তুমি কিছুই করনি। রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, অতঃপর এদের অপর একজন এসে বলে, আমি মানব সন্তানকে ছেড়ে দেইনি, এমনকি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ করে দিয়েছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, শয়তান এ কথা শুনে তাকে নিকটে বসায় আর বলে, তুমিই উত্তম কাজ করেছো। বর্ণনাকারী আ’মাশ বলেন, আমার মনে হয় জাবির (রাঃ) এটাও বলেছেন যে, ’’অতঃপর ইবলীস তার সাথে আলিঙ্গন করে’’। সহীহ : মুসলিম ২৮১৩, সহীহাহ্ ৩২৬১, সহীহ আত্ তারগীব ২০১৭, আহমাদ ১৪৩৭৭।
এজন্য যেমনিভাবে অতীব প্রয়োজন (যা শরীয়তে ওজর বলে গণ্য) ছাড়া স্বামীর জন্য তালাক দেওয়া জায়েয নয়, অনুরূপভাবে স্ত্রীর জন্যও তালাক চাওয়া বৈধ নয়।
রেফারেন্সঃ আদ-দুররুল মুখতার ৩/৯ ফাতওয়ায়ে হিন্দিয়া ১/২৬৮, ফাতওয়া-মুফতিয়ে আজম, ফতোয়ায়ে হানাফিয়া, আল-হিদায়া।
والله اعلم بالصواب
-------------------------------------------------
বিবাহের ক্ষেত্রে অভিভাবক শর্ত নয় এই বিষয়ে দলিল:
=========================
=>আদিপিতা আদম (আ) এর পুত্র হাবিলের জন্য নির্ধারিত স্ত্রী বেশী সুন্দরী হওয়ায় তাকে কাবিল পছন্দ করলেন বিবাহের জন্য। মহান আল্লাহর বিধানে যা জায়েয ছিল না সেসময় (একই জোড়া থেকে বিবাহ)। আদম (আ) চাইলেই জোর খাটাতে পারতেন কাবিলের উপরে। তিনি তা করলেন না, সিদ্ধান্ত হল দু’জন মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী/উৎসর্গ করবেন-যারটা কবুল হবে তিনি সেই সুন্দরী বোনকে পাবেন। (সুরা মায়িদাহ ২৭-৩১ আয়াত)
=>মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহীম (আ) নিজেও পিতার পছন্দে বিয়ে করেননি, এমনকি তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ)ও নয়। একদা ইবরাহীম (আ) স্বীয় পুত্র ইসমাঈল (আ) এর বসবাসস্থলে গমণ করলেন। বলাই বাহুল্য , তিনি জানতেনই না তাঁর পূত্র কাকে বিবাহ করেছে। পূত্রবধুর জীবন-সম্পর্কিত হতাশাব্যঞ্জক অভিব্যক্তি দেখে বুঝে গেলেন এ পূত্রবধু স্বীয় সন্তান ইসমাঈল (আ) এর জন্য সুখকর নয়। প্রসঙ্গত তিনি ইব্রাহীম (আ), যিনি খলিলুল্লাহ অর্থাৎ মহান আল্লাহর “বন্ধু” খেতাবী ছিলেন। তিনি কি করলেন, সন্তানকে জোর খাটিয়ে অন্য জায়গায় বিয়ে দিলেন। না, সন্তানের জন্য পরামর্শ রেখে গেলেন “চৌকাঠ” অর্থাৎ স্ত্রী পরিবর্তন করে (নিজের পছন্দমত) নতুন স্ত্রী গ্রহণ করার। (সহীহুল বুখারী ২৩৬৮, ৩৩৬৩-৩৩৬৫, আহমাদ ২২৮৫, ৩২৪০, ৩৩৮০)
=>আমাদের প্রাণের প্রিয় নবীজি (স) এর এক স্ত্রী “জাউনিয়াহ” কে বিবাহের পর বাসর করার আগে জানতে পারলেন তাঁর সেই স্ত্রীর মন থেকে সম্মতি নেই এ বিয়েতে। তৎক্ষনাৎ তিনি কি করলেন? জাউনিয়াহ’র অভিভাবককে ডাকলেন/দরবার করলেন?
না, স্ত্রীর মত নেই জেনে সাথে সাথেই তালাক্ব দিয়ে তাকে বিবাহ বন্ধন থেকে মুক্ত করে দিলেন। (বুখারী হা/৫২৫৪-৫৫; ইবনু হিশাম ২/৬৪৭।)
এছাড়াও রসূল (স) এর অন্তত তিনজন এমন স্ত্রী ছিলেন যাদের আপন অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া শুধুমাত্র নিজের সম্মতিতেই বিয়ে ও সংসার করেছিলেন।
*উম্মুল মুমিনীন জুওয়াইরিয়াহ বিনতে হারিস*
*উম্মুল মুমিনীন সাফিয়া বিনতে হুয়াই বিন আখত্বাব*
*উম্মুল মুমিনীন উম্মে হাবীবাহ রামলাহ বিনতে আবু সুফিয়ান*
ওনাদের মধ্যে উম্মুল মুমিনীন জুওয়াইরিয়া (রাঃ)-কে তো তাঁর পিতা হারিস ফিরিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা করলেও উম্মুল মুমিনীন তাতে রাজি না হয়ে আমৃত্যু রসূল (স) এর স্ত্রী হিসেবেই থেকে যান। (আত-ত্বাবাকাত, ৮ম খন্ড, পৃঃ ৯৩; সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ২য় খন্ড, পৃঃ ২৬৩, সনদ ছহীহ; হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী, তাহযীবুত তাহযীব, ১২শ খন্ড (বৈরুত : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১ম প্রকাশ, ১৯৯৪খ্রীঃ/ ১৪১৫হিঃ), পৃঃ ৩৫৮।)
*{আরো দুটি প্রাসঙ্গিক ঘটনা}*
উম্মুল মুমীনিন খাদিজা (রা) এর **সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছেতেই ও কারো অনুমতি নেয়া ছাড়াই সর্বপ্রথম তাঁর বান্ধবী নাফীসা বিনতে মুনাব্বিহ মাধ্যমে রসূল (স) এর কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন তিনি।**পরবর্তীতে উভয় পরিবার এতে সম্মত হয়।(ইবনু হিশাম ১/১৮৭, টীকা ১-২; হাকেম হা/৪৮৩৮, ৩/২০০; বিস্তারিত দ্রঃ সীরাতুর রাসূল ৭৩ পৃঃ, আল-বিদায়াহ ২/২৯৩-৯৪।)
রসূল (স) এর প্রাণপ্রিয় কন্যা ফাতিমা (রা), তাঁর জন্য বিয়ের প্রস্তাব দিলেন সাহাবাদের অনেকেই। ফাতিমা (রা) তখনও খেলার বয়সেই (কম বয়সী), তারপরেও দোজাহানের সর্দার আমার জানের নবীজি (স) ছুটলেন স্বীয় কন্যা ফাতিমা (রা) এর কাছে। জিজ্ঞেস করলেন তাকে তাঁর পছন্দের কথা, মতামত নিশ্চিত হয়ে তবেই আয়োজন করলেন বিয়ের। যদিও আবু বকর ও ওমর রা. এর মত অত্যন্ত কাছের সাহাবীও ফাতিমা (রা.)-কে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু রাসূল (সা.) ফাতিমা (রা.)-এর ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেন এবং আলী (রা.)-এর প্রস্তাবকে গ্রহণ করেন, যার ফলে এই বিয়ে সম্পন্ন হয়।
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبَّاسٍ؛ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ: الْأَيِّمُ أَحَقُّ بِنَفْسِهَا مِنْ وَلِيِّهَا
হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন, মেয়ে তার ব্যক্তিগত বিষয়ে অভিভাবকের চেয়ে অধিক হকদার। (মুয়াত্তা মালিক ৮৮৮, সহীহ মুসলিম ১৪২১, মুসনাদে আহমাদ ১৮৮৮, সুনানে আবু দাউদ ২০৯৮, সুনানে দারেমী ২২৩৪, সুনানে তিরমিজী ১১০৮, সুনানে নাসায়ী ৩২৬০, সহীহ ইবনে হিব্বান৪০৮৪, সুনানে দারাকুতনী ৩৫৭৬)
عَنْ أَبِي سَلَمَةَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ قَالَ: جَاءَتِ امْرَأَةٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ ، فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّ أَبِي وَنِعْمَ الْأَبُ هُوَ، خَطَبَنِي إِلَيْهِ عَمُّ وَلَدِي فَرَدَّهُ، وَأَنْكَحَنِي رَجُلًا وَأَنَا كَارِهَةٌ. فَبَعَثَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِلَى أَبِيهَا، فَسَأَلَهُ عَنْ قَوْلِهَا، فَقَالَ: صَدَقَتْ، أَنْكَحْتُهَا وَلَمْ آلُهَا خَيْرًا. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ : لَا نِكَاحَ لَكِ، اذْهَبِي فَانْكِحِي مَنْ شِئْتِ
হযরত সালামা বিনতে আব্দুর রহমান রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক মেয়ে রাসূল ﷺ এর কাছে এল। এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা! কতইনা উত্তম পিতা! আমার চাচাত ভাই আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিল আর তিনি তাকে ফিরিয়ে দিলেন। আর এমন এক ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চাইছেন যাকে আমি অপছন্দ করি। তখন রাসূল ﷺ মেয়েটিকে বললেন, “এ বিয়ে হবে না, তুমি যাও, যাকে ইচ্ছে বিয়ে করে নাও”। (সুনানে সাঈদ বিন মানসূর ৫৬৮, মুসন্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ১০৩০৪, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ১৫৯৫৩, দিরায়া ফী তাখরীজি আহাদিসীল হিদায়া ৫৪১
عَنِ ابْنِ بُرَيْدَةَ،عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: جَاءَتْ فَتَاةٌ إِلَى النَّبِيِّ ﷺ، فَقَالَتْ: إِنَّ أَبِي زَوَّجَنِي ابْنَ أَخِيهِ، لِيَرْفَعَ بِي خَسِيسَتَهُ، قَالَ: فَجَعَلَ الْأَمْرَ إِلَيْهَا،فَقَالَتْ: قَدْ أَجَزْتُ مَا صَنَعَ أَبِي،وَلَكِنْ أَرَدْتُ أَنْ تَعْلَمَ النِّسَاءُ أَنْ لَيْسَ إِلَى الْآبَاءِ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ
হযরত বুরাইদা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক মহিলা নবীজী ﷺ এর কাছে এসে বলল, আমার পিতা আমাকে তার ভাতিজার কাছে বিয়ে দিয়েছে, যাতে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। রাবী বলেন, তখন রাসূল ﷺ বিষয়টি মেয়ের ইখতিয়ারের উপর ন্যস্ত করেন, [অর্থাৎ ইচ্ছে করলে বিয়ে রাখতেও পারবে, ইচ্ছে করলে ভেঙ্গেও দিতে পারবে] তখন মহিলাটি বললেন, আমার পিতা যা করেছেন, তা আমি মেনে নিলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল, মেয়েরা যেন জেনে নেয় যে, বিয়ের ব্যাপারে পিতাদের [চূড়ান্ত] মতের অধিকার নেই। (সুনানে ইবনে মাজাহ ১৮৭৪, মুসনাদে ইসহাক বিন রাহুয়াহ ১৩৫৯, সুনানে দারা কুতনী ৩৫৫৫)
উল্লেখিত হাদীস ছাড়াও আরো এমন অনেক হাদীস রয়েছে, যা স্পষ্ট ভাষায় প্রমাণ করে যে, বিয়ের ক্ষেত্রে অভিভাবক নয়, প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। এক্ষেত্রে পিতা বা অভিভাবকের হস্তক্ষেপ কার্যকর হবে না।
**************************************************************
একবারও ভেবে দেখেছেন কি? যে হাদিসের রেফারেন্স দিয়ে অভিভাবক ছাড়া বিয়ে বাতিল বলে বেড়ান-সেটার শেষাংশে তালাক করিয়ে নেয়ার কথা বলেছেন স্বয়ং বর্ণনাকারী খোদ আয়িশা (রা)। এমনকি আয়িশা (রা) নিজেও তাঁর ভাইয়ের মেয়ে হাফসাকে (কনের স্বীয় পিতার অনুমতি ছাড়াই) বিবাহ দিয়েছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়? {মুয়াত্তা মালেক, হাদীস নং-২০৪০, ইফাবা, হাদীস নং-১৫}
*************************************************************
وَ اِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا تُقۡسِطُوۡا فِی الۡیَتٰمٰی فَانۡكِحُوۡا مَا طَابَ لَكُمۡ مِّنَ النِّسَآءِ مَثۡنٰی وَ ثُلٰثَ وَ رُبٰعَ ۚ فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا تَعۡدِلُوۡا فَوَاحِدَۃً اَوۡ مَا مَلَكَتۡ اَیۡمَانُكُمۡ ؕ ذٰلِكَ اَدۡنٰۤی اَلَّا تَعُوۡلُوۡا ؕ﴿۳﴾
আর যদি তোমরা আশঙ্কা কর যে, ইয়াতীমদের ব্যাপারে তোমরা ইনসাফ করতে পারবে না, তাহলে তোমরা বিয়ে কর নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভাল লাগে; দু’টি, তিনটি অথবা চারটি। আর যদি ভয় কর যে, তোমরা সমান আচরণ করতে পারবে না, তবে একটি অথবা তোমাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে। এটা অধিকতর নিকটবর্তী যে, তোমরা যুলম করবে না। (সুরা আন নিসা, আয়াত ৩)
এখানেও কোন অভিভাবকের কথা বলা হয় নি। আমভাবে সকলকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, অর্থাৎ সমাজে যারা বিবাহহীন তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করে দিতে বলা হয়েছে। এমনকি আপনার বাবাও যদি বিপত্নীক হয়ে থাকেন কিংবা মা যদি বিধবা হয় তবে তাদেরকেও আপনি বিয়ের ব্যবস্থা করে দিবেন সেই আদেশ এখানে দেয়া হয়েছে। নামাজ পড়-যাকাত দাও-হজ্ব সম্পাদন কর এর মানে এই নয় আপনি আপনার পছন্দে করবেন, বরং যার উদ্দেশ্যে করছেন তার পছন্দে হতে হবে। ঠিক তেমনই-বিয়ে যার, পছন্দ তারই। (এটাই সত্যি)
আবার দেখেন, এখানে অর্থ-প্রতিপত্তি-চাকুরী বা কোন পেশার কথাও উল্লেখ করা হয় নি। বরং বলা হয়েছে কেউ অভাবগ্রস্থ হলে এই বিয়ের কল্যাণে মহান আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। এই আয়াতের প্রমাণ, রসূল (স) এর জীবনেও পাওয়া যায়। রসূল (স) ও খাদিজা (রা) এর বিয়ের মোহর কিন্তু খাদিজা (রা) নিজেই আদায় করে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, এমনও সাহাবীর বিয়ের ব্যাপারে জানা যায়-যাকে পবিত্র কুর’আনের আয়াতের বিনিময়ে বিয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। (বুখারী ২৩১১, ৫০২৯, ৫০৩০, ৫০৮৭, ৫১২১, ৫১২৬, মুসলিম ১৪২৫, তিরমিযী ১১১৪, নাসায়ী ৩২৮০, আবূ দাউদ২১১১, ইবনু মাজাহ ১৮৮৯, আহমাদ ২২২৯২, মুওয়াত্তা মালেক ১১১৮, দারেমী ২২০০১।)
আরেক আয়াতে বলা হয়েছে-
وَ لَا تَنۡكِحُوا الۡمُشۡرِكٰتِ حَتّٰی یُؤۡمِنَّ ؕ وَ لَاَمَۃٌ مُّؤۡمِنَۃٌ خَیۡرٌ مِّنۡ مُّشۡرِكَۃٍ وَّ لَوۡ اَعۡجَبَتۡكُمۡ ۚ وَ لَا تُنۡكِحُوا الۡمُشۡرِكِیۡنَ حَتّٰی یُؤۡمِنُوۡا ؕ وَ لَعَبۡدٌ مُّؤۡمِنٌ خَیۡرٌ مِّنۡ مُّشۡرِكٍ وَّ لَوۡ اَعۡجَبَكُمۡ ؕ اُولٰٓئِكَ یَدۡعُوۡنَ اِلَی النَّارِ ۚۖ وَ اللّٰهُ یَدۡعُوۡۤا اِلَی الۡجَنَّۃِ وَ الۡمَغۡفِرَۃِ بِاِذۡنِهٖ ۚ وَ یُبَیِّنُ اٰیٰتِهٖ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمۡ یَتَذَكَّرُوۡنَ ﴿۲۲۱﴾
মুশরিকা নারীরা ঈমান না আনা পর্যন্ত তোমরা তাদেরকে বিবাহ করো না। মূলতঃ মু’মিন ক্রীতদাসী মুশরিকা নারী হতে উত্তম ওদেরকে তোমাদের যতই ভাল লাগুক না কেন, ঈমান না আনা পর্যন্ত মুশরিক পুরুষদের বিবাহ কর না, বস্তুতঃ মুশরিককে তোমাদের যতই ভাল লাগুক না কেন, মু’মিন গোলাম তার চেয়ে উত্তম। ওরা অগ্নির দিকে আহবান করে আর আল্লাহ নিজের অনুগ্রহে জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহবান করেন। তিনি মানুষদের জন্য নিজের হুকুমগুলো বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করছেন যাতে তারা শিক্ষা গ্রহণ করে। (সুরা বাকারা, আয়াত ২২১)
এখানেও একটা বিষয় লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মুশরিকদের ব্যাপারে বলা হয়েছে-তাদের ঘরে মুসলিম পুরুষদের/মেয়েদের বিবাহ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এখানে অনেকে (জালিয়াতি করে) পুরুষদের ক্ষেত্রে বিবাহ কর না, আর মেয়েদের ক্ষেত্রে বিবাহ দিও না অনুবাদ করে থাকে কিন্তু খেয়াল করুন উভয় ক্ষেত্রেই নারী/পুরুষবাচক শব্দ ব্যতীত পবিত্র কুর’আনে বাক্য একই ব্যবহার করা হয়েছে।
وَ لَا تُنۡكِحُوا الۡمُشۡرِكِیۡنَ حَتّٰی یُؤۡمِنُوۡا ؕ / وَ لَا تَنۡكِحُوا الۡمُشۡرِكٰتِ حَتّٰی یُؤۡمِنَّ ؕ
(আশা করি অনুবাদকদের উদ্দেশ্য ধরতে পেরেছেন)
আয় হায় ! কতই না সহজ ছিল বিয়ে রসূল (স) এর যুগে (ফিদাকা ইয়া রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। ইসলামে তো বিয়েকে এমন সহজ করে তবেই যিনা-ব্যভিচারকে কঠিনতম শাস্তিযোগ্য করা হয়েছে যাতে এর নিকটবর্তী হওয়ার প্রয়োজন না পড়ে কারও।
وَ لَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّهٗ كَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَ سَآءَ سَبِیۡلًا ﴿۳۲﴾
আর তোমরা যিনা-ব্যভিচারের কাছেও যেও না, তা হচ্ছে অশ্লীল কাজ আর অতি জঘন্য পথ। (সুরা বনী ইসরাইল, আয়াত ৩২)
--------------------------------------------------
বি।দ্র। যারা অভিভাবক শর্তের ব্যাপারে দলিল দেন, সেখানে পবিত্র কুর’আন ও হাদিসে কোথায় বিশ্বাসী অভিভাবক/মুসলিম অভিভাবক এসব শর্ত লেখা রয়েছে (বিয়ে দেয়ার জন্য) একটু জানিয়ে দিয়েন তো? আর আহলে কিতাবরা (তাওরাত, যাবুর, ইনজিল ইত্যাদি কিতাবের অনুসারীরা) কি তাদের সন্তানদের কষ্ট করে মানুষ করে নি?
নাকি শুধু মুসলিম নামধারী সুদখোর/ঘুখোর/অন্যায়-জুলুমকারী/অন্যের হক নষ্টকারীরা (যারা নিজেরাই পবিত্র কুর’আনের এসব বিধান মানে না) তাদের সন্তানদের কষ্ট করে মানুষ করেছে??!
***যিনা-ব্যভিচারের শাস্তি/শাস্তি কার্যকর করার অনেক বর্ণনা পাবেন হাদিসে। আচ্ছা সেখানে একটা বর্ণনা (প্রমাণ) কি দেখাতে পারবেন যেখানে অভিভাবকের অমতে বিয়ে বাতিল করে দিয়েছেন রসূল (স), এবং এমন বিয়ের কারণে শাস্তি দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বর-কনেকে??! কি নেই তো ??!***
=>এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান অথচ এর স্বপক্ষে একটি শাস্তির প্রমাণও নেই, এ হয় কী করে??!
***আবার আপনাদের তো কথায় কথায় বিয়ে বাতিল হয়ে যায়। একটা প্রমাণ দেখিয়েন তো যেখানে ইসলাম কবুলের পর সাহাবীদের (আগে কাফির-মুশরিক-অমুসলিম ছিলেন) পুনরায় বিবাহ পড়ানো হয়েছিল।***
=>এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান অথচ এর স্বপক্ষে একটি প্রমাণও নেই, এ হয় কী করে??!***
তবে হ্যাঁ, যাদের স্বামী বা স্ত্রী কোন একজন অমুসলিম রয়ে গিয়েছিলেন তাদের এক পর্যায়ে বিবাহ বিচ্ছেদ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক বা বিচ্ছেদ হয়ে যায় নি-আজকাল তো এমন স্বয়ংক্রিয় তালাকের ফতোয়া প্রদানকারী পাওয়া যায় যেখানে সেখানে। মহান আল্লাহ এদের সংশোধন করুন অথবা ধ্বংস করুন (আমীন)।
#ইসলামে_বিয়েকে_সহজ_ও_যিনাকে_কঠিন_করা_হয়েছে_আর_অন্যদিকে_বিয়েকে_কঠিন_করে_যিনাকে_সহজ_করে_দেয়ার_ফিতনা_আর_স্বামী-স্ত্রীর_মাঝে_বিচ্ছেদ_করা_শয়তানেরই_কাজ। (জ্বীন ও মানুষরূপী সবচেয়ে বড় শয়তানদের কাজ) রেফারেন্সঃ সহীহ : মুসলিম ২৮১৩, সহীহাহ্ ৩২৬১, সহীহ আত্ তারগীব ২০১৭, আহমাদ ১৪৩৭৭।
------------------------------------------------
প্রশ্নঃ যদি মহান আল্লাহ ও তাঁর রসূল (স) এর দেয়া আদেশ/নিষেধের পরিপন্থি কোন কাজ পিতা-মাতা-অভিভাবক করতে আদেশ বা জোর করেন তা মানা যাবে কি?
উত্তরঃ কখনোই নয়, এমনকি প্রয়োজনে তাদের মুখের উপরে না বলারও অধিকার রয়েছে সন্তানদের।
জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত মর্যাদাবান সাহাবী সাদ ইবন আবু ওয়াক্কাস (রা) বললেনঃ আম্মাজান, যদি আপনার দেহে একশ’ আত্মা থাকত, এবং একটি একটি করে বের হতে থাকত, তা দেখেও আমি আমার দ্বীন ত্যাগ করতাম না। এখন আপনি ইচ্ছা করলে পানাহার করুন অথবা মৃত্যুবরণ করুন। আমি আমার দ্বীন ত্যাগ করতে পারি না। এ কথায় নিরাশ হয়ে তার মাতা অনশন ভঙ্গ করল। [বাগভী] এ ঘটনার প্রেক্ষিতে সুরা আনকাবুতের ৮ নাম্বার আয়াত নাযিল হয় যা নির্দেশ করে বৈধ কাজে পিতামাতার আনুগত্য করতে হবে, কিন্তু শির্ক-জুলুম তথা মহান আল্লাহর বিধান পরিপন্থি সকল কাজে তাদের আনুগত্য হারাম। বিস্তারিত ঘটনা সহীহ মুসলিমেও বর্ণিত আছে। সহীহ মুসলিম ১৭৪৮, (৪৩/১৭৪৮)
মহান আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরও বলেছেন:
يَا عِبَادِي إِنِّي حَرَّمْتُ الظُّلْمَ عَلَى نَفْسِي وَجَعَلْتُهُ بَيْنَكُمْ مُحَرَّمًا فَلاَ تَظَالَمُوا
“হে আমার বান্দাগণ! আমি যুলুমকে আমার জন্য হারাম করে দিয়েছি, আর তা তোমাদের মধ্যেও হারাম করে দিয়েছি; অতএব তোমরা একে অপরের উপর যুলুম করো না।” রেফারেন্সঃ ৬৪৬৬-(৫৫/২৫৭৭-সহীহ মুসলিম)
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা কি বলতে পার, অভাবী লোক কে? তারা বললেন, আমাদের মাঝে যার দিরহাম (টাকা কড়ি) ও ধন-সম্পদ নেই সে তো অভাবী লোক। তখন তিনি বললেন, আমার উম্মাতের মধ্যে সে প্রকৃত অভাবী লোক, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন সালাত, সাওম ও যাকাত নিয়ে আসবে; অথচ সে এ অবস্থায় আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, অমুকের সম্পদ (অধিকার নষ্ট করেছে) ভোগ করেছে, অমুককে হত্যা করেছে ও আরেকজনকে প্রহার করেছে (বান্দার হক সংশ্লিষ্ট অন্যায় করেছে)। এরপর সে ব্যক্তিকে তার নেক ’আমল থেকে দেয়া হবে, অমুককে নেক আমল থেকে দেয়া হবে। এরপর যদি পাওনাদারের হক তার নেক ’আমল থেকে পূরণ করা না যায় সে ঋণের পরিবর্তে তাদের পাপের একাংশ তার প্রতি নিক্ষেপ করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সহীহ মুসলিম ৬৪৭৩-(৫৯/২৫৮১ (ইক ফা ৬৩৪৩, ইক সে ৬৩৯৩)
মহান আল্লাহ বলেন,
"আর যারা যুলম করেছে তোমরা তাদের পক্ষ অবলম্বন করো না; অন্যথায় আগুন তোমাদেরকে স্পর্শ করবে এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোন অভিভাবক থাকবে না। অতঃপর তোমরা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না।" [সূরা হূদ, আয়াত ১১৩]
হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে সাক্ষ্য দানকারী, সুবিচার প্রতিষ্ঠাতা হও এবং যদিও এটা তোমাদের নিজের অথবা মাতা-পিতা ও আত্মীয়-স্বজনের ক্ষতি হয় তবুও, যদিও সে সম্পদশালী কিংবা দরিদ্র হয় তাহলে আল্লাহই তাদের জন্য যথেষ্ট; অতএব সুবিচারে স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসরণ করনা, আর তোমরা যদি ঘুরিয়ে পেচিয়ে কথা বল কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও তাহলে তবে নিশ্চয়ই তোমরা যা করছ, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্পূর্ণ অবগত। (সুরা আন-নিসা আয়াত ১৩৫)
"আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী এমন কাউকে (কোন সম্প্রদায়) তুমি পাবেনা যারা ভালবাসে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচারীদেরকে (বিধানের অমান্যকারী), এই বিধান অমান্যকারী-বিরোধীতাকারীরা তাদের পিতা, পুত্র, ভাই কিংবা তাদের আত্নীয়-স্বজনই হোক না কেন।" (সুরা মুযাদালা, আয়াত ২২)
পিতা-মাতার অধিকার যে, ছেলেমেয়েরা তাদের সেবা করবে, তাদেরকে সম্মান ও শ্ৰদ্ধা করবে এবং বৈধ বিষয়ে তাদের কথা মেনে চলবে। কিন্তু শির্কের ব্যাপারে তাদের অনুসরণ করা যাবে না। অনুরূপভাবে কোন জুলুম বা গোনাহর কাজে কখনোই নয়। যেমনটি রাসূলের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। [মুয়াস্সার] আল্লাহর অবাধ্যতা করে কোন মানুষের আনুগত্য করা বৈধ নয়। [মুসনাদে আহমাদ: ১/১৩১] অর্থাৎ, আল্লাহর অবাধ্যতায় কোন ব্যক্তির আনুগত্য চলবে না। (আহমাদ ৫/৬৬, হাকেম, সহীহুল জামে’ ৭৫২০নং)
*****************************************
যারা একটিমাত্র আম নির্দেশের (পিতামাতার অবাধ্যতা) যেমন “তারা বার্ধক্যে পৌঁছালে তাদেরকে উফ শব্দটা করোনা” এই অজুহাত দিয়ে যারা সন্তানের উপর হওয়া জুলুমকে সাপোর্ট করেন, তাদেরকে বলছিঃ
পবিত্র কুর’আনের এতগুলো আয়াত ও রসূল (স) এর সন্দেহাতীত হাদিসগুলো কি চোখে পড়ে না আপনাদের? নাকি আপনারাও আসলে জাহেল কিংবা সেই জালিমদেরই অন্তর্ভুক্ত যারা সত্য গোপন করে বেড়ায় (!)
وَلَا تَلۡبِسُواْ ٱلۡحَقَّ بِٱلۡبَٰطِلِ وَتَكۡتُمُواْ ٱلۡحَقَّ وَأَنتُمۡ تَعۡلَمُونَ
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তোমরা সত্যের সঙ্গে মিথ্যের মিশ্রণ ঘটাবে না। এবং জেনেশুনে সত্য গোপন করো না”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৪২]
***********************************************************************
প্রশ্নঃ ইসলামেই তো একমাত্র কল্যাণ, জোর করে তাদের সন্তানকে ইসলাম কবুল করাতে বাধ্য করাতে পারবেন তো ?
উত্তরঃ জায়েয নেই ইসলামে। রসূল (স) নিজে কিংবা তাঁর কোন সাহাবীর এরকম জোর-জবরদস্তি করে ইসলাম কবুল করানোর কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। এমনকি রসূল (স) এর প্রিয় চাচা আবু তালিব সহ অনেক সাহাবীরই পরিবার-পরিজন আত্নীয়-স্বজন অমুসলিম থেকেই মৃত্যুবরণ করেছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।
প্রশ্নঃ পবিত্র কুর’আনেই আছে নিজে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচো, সন্তানদেরকে বাঁচাও-আর ইসলাম কবুল করানো তো দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ কাজ, জোর করলে-শাস্তি দিলে ক্ষতি কি?
উত্তরঃ দুনিয়া পরীক্ষার জায়গা-সবাই যার যার পরীক্ষা দিবে এখানে। কোন প্রকার জোর-জবরদস্তি-জুলুম কোনভাবেই জায়েয নেই, করলে শাস্তির সম্মুখীন হবে।
**সবই মানলাম, কিন্তু অভিভাবক তো সন্তানের ভালো চায় সবসময়, তাই তাদের পছন্দেই কল্যাণ।**যারা এই মতবাদে বিশ্বাসী তাদের জন্য-
প্রশ্নঃ অভিভাবক কি গায়েব জানেন? কাল কি হবে- না হবে? কে কার জন্য কল্যাণকর আর কে অকল্যাণকর হবে? অভিভাবক কি সংসারে সুখ এনে দিতে পারবেন বা তারা কি ভবিষ্যত জানেন?
উত্তরঃ না। গায়েব একমাত্র মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাই জানেন। আর কেউ জানার দাবী করলে সেটা শিরক ! এমনকি নূহ (আ), লূত (আ), ইবরাহীম (আ) সহ অনেক নবী-রসূলগণের স্ত্রী-সন্তান-পিতা-মাতা-পরিবার-পরিজন ও আত্নীয়-স্বজনদের মধ্যে অনেকের ব্যাপারে জাহান্নাম-শাস্তির ফয়সালা এসেছে।
প্রশ্নঃ তাহলে অনেকে অভিভাবকের অমতে বিয়ে করলে তাদের সংসারে অশান্তি হয় কেন?
উত্তরঃ প্রথমত, অশান্তি তো নবীদের পারিবারিক জীবনেও ছিল। স্বয়ং রসুলুল্লাহ (স) নিজেও একবার দীর্ঘ সময় সাংসারিক অশান্তির কারণে সকল স্ত্রী থেকে দূরে নির্জনবাসে ছিলেন। আবার আজ পর্যন্ত বহু পারিবারিক বিয়েতেও অনেক অশান্তি এমনকি স্বামী-স্ত্রী খুনের ঘটনাও অসংখ্য বিদ্যমান (একটু পরিসংখ্যান ঘাটলেই পেয়ে যাবেন ইন শা আল্লাহ)। তাহলে এসব ঘটনাকে কী বলবেন, প্রকৃতপক্ষে দুনিয়ার জীবন তো পরীক্ষা মাত্র-যার যার পরীক্ষা তার তার পছন্দমত দিতে দিন। বড়জোর পরামর্শ দিন, জোর-জবরদস্তি করবেন না।
দ্বিতীয়ত, কিছু পিতা-মাতা তাদের সন্তানদেরকে নিজেদের একচ্ছত্র মালিকানা ভাবেন এবং এভাবে স্বৈরাচারী হয়ে উঠেন । যখন সন্তানরা নিজেদের পছন্দমত বিয়ে করে তখন তাদেরকে অভিশাপ-বদ দুয়া দেয়া থেকে শুরু করে নানাভাবে চক্রান্ত করে সংসারে ভাংগন ধরানোর চেষ্টা করে থাকেন।
তৃতীয়ত, আমাদের জানামতে এমনকি অনেক অভিভাবক কালোজাদুর আশ্রয় পর্যন্ত নেন যা ইসলামে নিতান্তই ঘৃণিত একটি অপরাধ যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ঈমানকে সহ ধ্বংস করে দেয় এবং এদের কুফুরী অবস্থায় মৃত্যু ঘটবে ইন শা আল্লাহ।
মূলকথাঃ দুনিয়াবী জীবনে অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো প্রকাশ নাও পেতে পারে কিন্তু এসবের বিচার যখন রোজ কিয়ামতে হাশরের মাঠে সবাই দেখতে পাবে, তখন সমস্ত কিছুর সকল রহস্য প্রকাশ পাবে ইন শা আল্লাহ।
**বলতে পারবেন কী-আপনি আমি কোন অধিকারে, কীসের অহংকারে সন্তানদের হক নষ্ট করি?**
.
প্রিয় নবী (স) বলেছেনঃ জেনে রেখো! তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল; আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব ইমাম, যিনি জনগণের দায়িত্বশীল তিনি তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। পুরুষ গৃহকর্তা তার পরিবারের দায়িত্বশীল; সে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। নারী তার স্বামীর পরিবার, সন্তান-সন্ততির উপর দায়িত্বশীল, সে এসব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। কোন ব্যাক্তির দাস স্বীয় মালিকের সম্পদের দায়িত্বশীল; সে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব জেনে রাখ, প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্বাধীন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।
(সহীহ বুখারী ৭১৩৮) [৮৯৩] (আ প্র- ৬৬৩৯, ইক ফা- ৬৬৫৩)
***দেখুন এখানেও দায়িত্বশীল বলা হয়েছে, মালিক নয় (একথাই সত্য)***
ৃথিবীতে_কেউ_কারও_মালিক_নয়_যে_একজনের_জীবনে_আরেকজন_দখল_দিবে। (বড়জোর পরামর্শ দিতে পারে তাও আবার সৎপরামর্শ, অন্যথায় এই পরামর্শের কারণেও শাস্তির আওতায় পড়ে যাবে ইন শা আল্লাহ)
দুনিয়ার জীবনে প্রত্যেকটি সম্পর্ক, সম্পদ কিংবা ক্ষমতা মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার দেয়া আমানত কিংবা পরীক্ষার মাধ্যম ছাড়া আর কিছুই নয় যার ফলাফল আখিরাতে জান্নাত কিংবা জাহান্নাম।
মহান আল্লাহ সকল প্রকার জুলুম হারাম করে দিলেন নিজের ও সকলের জন্য। আর আমাদের মুসলিম দাবীধারীদের জুলুম শুরু হয় নিজের পরিবার থেকেই (!)
সারা দুনিয়া এগিয়ে গেছে একের পর এক ভূখন্ড-রাজত্ব-দেশ-মহাদেশ দখলে, পরাশক্তি হয়ে বসে আছে বিজ্ঞান-চিকিৎসা-প্রযুক্তি কিংবা বৈশ্বিক অর্থনীতি-রাজনীতি-সমরাস্ত্র ও সমরনীতিতে । আর আপনি আমি মুসলিম দাবি করে ব্যস্ত থাকি নিজেদের সন্তানদের ব্যক্তিগত জীবনে, তাদের পছন্দ-অপছন্দে জুলুম-দখল দেয়ার ফতোয়া নিয়ে (!)
==============================
পুনশ্চঃ দলিল তো শয়তানও দেখিয়ে (জালিয়াতি করে) অন্যের হক নষ্ট করে, সেইসব দলিল কিংবা ইজমা-কিয়াস নয়। সরাসরি মহান আল্লাহর দেয়া পবিত্র কুর’আন থেকে “অভিভাবকের পছন্দে বিয়ে করতে হবে” এমন আয়াত কিংবা রসূল (স) এর জীবনে কোন সাহাবীকে দেয়া সরাসরি ফয়সালা কিংবা তাঁর নিজের জীবন থেকে “সন্তানদের অপছন্দে, অভিভাবকের পছন্দ জোর করে চাপিয়ে বিয়ে দেয়া” এটা প্রমাণ করতে পারলে আমরাও তা মেনে নিতে বাধ্য।
কিন্তু সত্যি কথা কি জানেন, কিয়ামাত পর্যন্ত প্রমাণ করতে পারবে না ইন শা আল্লাহ।
কেননা-
*নিশ্চয়ই সকল জুলুমই জাহেলিয়্যাত*
আর-*সত্যধর্ম*
#ইসলাম_এসেছে_সকল_অন্যায়_জুলুম_আর_জাহেলিয়্যাতকে_নিশ্চিহ্ন_করতে (জারি রাখতে নয়/সেই অন্যায়-জুলুম-জাহেলিয়্যাতকারী নিজের বাবা-মা-অভিভাবকই হোক না কেন !)