30/09/2026
অতীতের ভুল এবং বর্তমানের দায়
লেখক: রাজেকুজ্জামান রতন,কেন্দ্রীয় সহকারী সাধারণ সম্পাদক, বাসদ
দৈনিক আগামীর সময় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়-২৯,০৯,২৬
সমাজ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না কখনো। সমাজ কেন পাল্টায় তার কারণ নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও, সমাজ যে পাল্টে যায়, সেটা মানতে বাধ্য সবাই। রাজনীতিকে বলা হয় সমাজের পরিচালিকা শক্তি, আর অর্থনীতি তার ভিত্তি। আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে এই অর্থনীতি আর রাজনীতির বিরোধের মধ্য দিয়েই। মানুষ পাল্টে দিয়েছে রাজতন্ত্র, প্রতিষ্ঠা করেছে পুঁজিবাদ। ইউরোপে এ সংগ্রামে মানুষ চেয়েছিল বুদ্ধির মুক্তি আর যুক্তির সমাজ। সেই সংগ্রামে সামন্ততন্ত্র উচ্ছেদ হলেও মানুষের মুক্তি এখনো আসেনি। কিন্তু মানুষ পেয়েছে কুসংস্কার, অযৌক্তিক ধারণাকে প্রশ্ন করার সাহস এবং শিক্ষা। অর্থাৎ শাসক সে যে-ই হোক না কেন, জনগণের সম্মতি নিয়ে শাসন করবে এবং জনগণ পছন্দ না করলে শাসককে পাল্টে দেবে। এ কথা যত যুক্তিসংগত, ততটাই কঠিন তার প্রয়োগ। কারণ ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত থাকে নানা অনৈতিক সুবিধা, প্রতিপক্ষকে দমন করে রাখার আনন্দ এবং অন্যের সম্পদ নিজের করে নেওয়ার সুযোগ। এ কারণে রাষ্ট্রের মধ্যে যুক্তিকে এবং প্রশ্নকে বিপজ্জনক বলে মনে করেন শাসকরা। কিন্তু একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রার জন্য অতীতের ভুল, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং তার পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। কারণ ইতিহাস শুধু গৌরবের স্মৃতি নয়, ভুলেরও হিসাব। অতীতের কোনো রাজনৈতিক অবস্থান পরবর্তী সময়ে বদলে গেলেই তার দায় মুছে যায় না; বরং সেই অবস্থানের কারণ, পরিণতি এবং তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের ইতিহাসেও এমন কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও অবস্থান রয়েছে, যেগুলো বর্তমান রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত না ভেবে শুধু অতীত বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া, আত্মসমালোচনা ও সংস্কারের প্রশ্নটির সমাধান হয়নি আজও। দলটির সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের লেখা নতুন বই প্রকাশের পর সেই পুরনো বিতর্কই নতুন করে সামনে এসেছে। 'ভাই, এসব পুরনো বিষয় বাদ দেন', এ কথা বলায় জামায়াতের নেতারা বলছেন, এসব এখন অপ্রাসঙ্গিক। তাদের ভাষায়, '১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য এখন ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। জামায়াত বিভিন্ন সময়ে দুঃখপ্রকাশ করেছে এবং জনগণ যদি দলটিকে ক্ষমা না করত, তাহলে সাম্প্রতিক নির্বাচনে তারা এত বড় জনসমর্থন পেত না।' তাদের কথা মেনে নিলে, কোনো অপরাধই আর প্রাসঙ্গিক থাকবে না। সময় গেলে সব ভুলে যাবে মানুষ। সময় সব গিলে ফেলবে। এর অন্য অর্থ দাঁড়ায়, অতীত ইতিহাস বলে কিছু থাকবে না।
এক্ষেত্রে একটা বিষয় বিবেচনা করতে হবে। কোনো সাফল্য অতীতকে ভুলিয়ে দেয় না; বরং প্রশ্নটাকে আরও তির্যক করে। যেমন জার্মানি এবং ইতালিতে ফ্যাসিস্ট পার্টিগুলো ভোট পাচ্ছে, তাই বলে মানুষ কিন্তু তাদের অতীত কাজকে যুক্তিসংগত বলে স্বীকৃতি দিচ্ছে না। তাদের বিচার-শাস্তি হওয়া সত্ত্বেও অতীত কাজের দায় এড়াতে পারছে না। কিংবা আমাদের ভূখণ্ডের জনগণ কি ভুলে যাবে ব্রিটিশ শাসন, শোষণ ও নির্যাতনের কথা? এখন ইংল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন আর মানুষ লন্ডনে যায় কি না, তা দ্বারা তো ব্রিটিশ শোষণ-নির্যাতন যুক্তিসংগত হয় না। কেউ কি ৩০০ বছর পার হয়েছে বলে এখন ভুলে যাবে ব্রিটিশ শোষণের কথা? কেউ কি তার সন্তানের নাম মীরজাফর কিংবা ঘসেটি বেগম রাখেন এখনো?
তিনি লিখেছেন, বিভিন্ন সময়ে দলের ভেতরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত তা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে রূপ নেয়নি। ২০১৬ সালে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুরোধে তিনি একটি বিবৃতির খসড়া তৈরি করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে জাতির সামনে একটি অবস্থান তুলে ধরা। খসড়া চূড়ান্ত করার জন্য একাধিক বৈঠক হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি দলের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে পরিণত হয়নি। ফলে নতুন প্রজন্ম নেতৃত্বে এলেও জামায়াতের নাম, পরিচয় ও ঐতিহাসিক অবস্থানের কারণে ১৯৭১-এর প্রশ্ন বারবার সামনে আসবে। প্রজন্ম পরিবর্তন করলেই ঐতিহাসিক দায় এড়ানো যায় না।
সেই স্বাধীনতার বিরোধিতা যারা করে তাদেরকে কীভাবে তারা ভুলে যাবে এবং ক্ষমা করবে? এত জীবন, রক্ত, কষ্ট এবং সংগ্রাম কি তাহলে কোনো মূল্য ধারণ করবে না? প্রতিটি দেশ গর্বের সঙ্গে তার পতাকা, সীমানা, সংস্কৃতি, সংগীত রক্ষা করতে চায়। এর পেছনের রক্তের স্রোত এবং চোখের জল তারা ভুলতে চায় না। তাই যে আমেরিকা পৃথিবীর দেশে দেশে স্বাধীনতা হরণে চ্যাম্পিয়ন, সে-ও মনে ধারণ করে ১৭৭৬ সালের স্বাধীনতার গৌরব। নেতৃত্ব পরিবর্তন, গঠনতন্ত্র সংশোধন কিংবা নতুন রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করলেই জামায়াতকে নিয়ে ১৯৭১-এর বিতর্ক শেষ হবে না। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, ততদিন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা আলোচিত হবে আর সে সময় কার কি অবস্থান ছিল, তা আলোচনায় আসবে বারবার।
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও লেখক