24/04/2026
#হেলথ_অফিসার
ছোট গল্পে রাশিয়া সবসময় বেস্ট। ১৮৮৪ সালে আন্তন চেখভ লিখেছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ছোট গল্পটি, যা যুগে যুগে কালে কালে মানুষের তোষামুদে ও ক্রমপরিবর্তনশীল সুবিধাবাদী চরিত্রকে খোদাই করে রেখেছে। পড়েই দেখুন সেই সময়কার রাশিয়ার ছোট্ট এক গ্রামের ঘটনা আর বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে কী এমন পার্থক্য ! মাত্র পাঁচ মিনিট লাগবে পড়তে, কিন্তু এই গল্পের রেশ রয়ে যাবে আজীবন।
'বহুরূপী'
পুলিশ ইনস্পেক্টর ওচুমেলভ (ওচুমেলি কথার অর্থ ক্ষিপ্ত; তাই থেকে ওচুমেলভ) হেটে যাচ্ছিলেন বাজারের মধ্যে দিয়ে। গায়ে তাঁর নতুন ওভারকোট, হাতে পুঁটুলি। তাঁর পিছন পিছন চলেছে এক কনেস্টবল। কনেস্টবলের চুলের রঙটা লাল, হাতের চালুনিটা ভর্তি হয়ে গেছে বাজেয়াপ্ত-করা গুজবেরিতে। কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই... বাজার একেবারে খালি... খুদে খুদে দোকান আর সরাইখানার খোলা দরজাগুলো যেন একসার ক্ষুধার্ত মুখ-গহ্বরের মতো দীনদুনিয়ার দিকে হাঁ করে আছে। ধারে কাছে একটি ভিখিরি পর্যন্ত নেই।
হঠাৎ একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল, 'কামড়াতে এসেছ হতচ্ছাড়া? ওকে ছেড়ো না। ইচ্ছামত সবাইকে কামড়ে বেড়াবে সে দিন নেই আর। আটকাও শালাকে'
কুকুরের ঘ্যান ঘ্যান ডাকও শোনা গেল একটা। ওচুমেলভ সেদিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন, পিচুগিনের দোকান থেকে বেরিয়ে এসে একটি কুকুর তিন ঠ্যাঙে লাফাতে লাফাতে ছুটছে আর তার পিছু পিছ তাড়া করেছে একটি লোক, গায়ে তার কড়া ইস্ত্রি করা ছাপা কাপড়ের জামা, ওয়েস্টকোটের বোতাম সব খোলা, সারা শরীর ঝুঁকে পড়েছে সামনের দিকে। হুমড়ি খেয়ে পড়ে লোকটা কুকুরের পিছনের একটি পা চেপে ধরল। কুকুরটা আবার কেউ কেউ করে উঠল, আবার চিৎকার শোনা গেল, 'ধর শালাকে' দোকানগুলো থেকে উকি মারতে লাগল নানা তন্দ্রাচ্ছন্ন মুখ। দেখতে দেখতে যেন মাটি ফুঁড়ে ভিড় জমে উঠল দোকানের কাছে।
কনেস্টবল বলল, 'বেআইনী হৈচৈ বলে মনে হচ্ছে, স্যার।'
ওচুমেলভ ঘুরে দাঁড়িয়ে দমদম করে গেলেন ভিড়টার কাছে। দোকানের ঠিক সামনেই তাঁর নজরে পড়ল বোতাম খোলা ওয়েস্টকোট-পরা সেই মূর্তিটি দাঁড়িয়ে। ডান হাত উঁচু করে লোকটা তার রক্ত মাখা আঙুলখানা সবাইকে দেখাচ্ছে। তার মাতাল চোখমুখগুলো যেন বলছে, 'শালাকে দেখে নেবো।' আঙুলটা যেন তার দিগ্বিজয়েরই নিশান। লোকটাকে ওচুমেলভ চেনেন- স্যাকরা খিউকিন ( খিউ খিউ - অর্থ শুয়োরের ঘোঁৎ ঘোঁৎ)। ভিড়ের ঠিক মাঝখানটায় বসে আছে আসামী, অর্থাৎ বর্জোই জাতের একটি বাচ্চা কুকুর - চোখা নাক, পিঠের ওপর হলদে একটা ছোপ। সর্বাঙ্গ তার কাঁপছে। সামনের দুপা ফাঁক করে সে বসে, দুই চোখে আতঙ্কের ছাপ।
ভিড় ঠেলে ঢুকতে ঢুকতে ওচুমেলভ জিজ্ঞেস করলেন, 'ব্যাপারটা কী? কী লাগিয়েছ তোমরা? আঙুল তুলে রেখেছিস কী জন্যে? চিল্লাচ্ছিল কে? কে চিল্লাচ্ছিল?'
খিউকিন মুঠো-করা হাতের ওপর একটু কেশে নিয়ে শুরু করলে, 'আমি, স্যার, হেটে যাচ্ছিলাম নিজের মনে। তা খামকা, এই কুত্তার বাচ্চাটা এসে কামড়ে দিল একেবারে। স্যার, মেহনত করে খেতে হয় আমাদের... আমার ব্যবসার কাজটিও কষ্টের। যা অবস্থা তাতে আঙুলটি তো হপ্তাখানেক নড়াচড়া করা যাবে না। আইনে তো এসব নাই যে বুনো জানোয়ার মানোয়ারদের কামড়াবে আর আমাদের তা সহ্য করতে হবে।'
গলাখাঁকারি দিয়ে ভুরু কুঁচকে ওচুমেলভ বললেন কড়া সরে, 'কার কুকুর এটা? এ আমি সহজে ছাড়ছি না! কুকুর ছেড়ে রাখার মজা দেখিয়ে ছাড়ব আজ! যেসব ভদ্রলোক আইন মেনে চলতে চান না তাঁদের ওপর নজর দেবার সময় এসেছে। শালার ওপর এমন জরিমানা চাপাব যে শিক্ষা হয়ে যাবে: যত রাজ্যের গরু ভেড়া কুকুরকে চরতে ছেড়ে দেওয়ার মানে কী! কত ধানে কত চাল তা টের পাওয়াচ্ছি।'
কনেস্টবলের দিকে ফিরে ওচুমেলভ হাঁকলেন, 'এলুদীরিন, খোঁজ লাগাও কার কুত্তা এটা, আর একটা এজাহারও লিখে ফেলো। যা মনে হচ্ছে এ কুকুর ক্ষ্যাপা না হয়ে যায় না- ওটাকে সাবাড় করে ফেলা দরকার এখুনি!.. কার কুকুর এটা, জবাব দাও, কার কুকুর?'
ভিড় থেকে কে যেন বলে উঠল, 'মনে হচ্ছে ওটা জেনারেল জিগালভের কুকুর!'
'জেনারেল জিগালভ? হম্!.. এলুদীরিন, আমার কোটটা খুলে দাও... উহ্ কি গরম! বোধ হয় বৃষ্টি পড়বে।' ইনস্পেক্টর খিউকিনের দিকে তাকালেন, 'কিন্তু একটা ব্যাপার আমার মাথায় ঢুকছে না, রাস্তায় এত মানুষ থাকতে তোকে কামড়ালো কী করে? একেবারে হাতের আঙুলে গিয়ে কামড় বসাল, কিভাবে সম্ভব? এইটুকু একটা বাচ্চা কুকুর আর তুই বেটা এত বড় জোয়ান মর্দ? আমি নিশ্চিত ও আঙুল তুই পেরেক-মেরেকে খুঁচিয়ে এখন মতলব করেছিস ক্ষতিপূরণ আদায় করা যায় কিনা। তোদের চিনতে তো আমার বাকি নেই, শয়তানের ঝাড় সবাই!'
একজন বলে উঠল 'ও লোকটা, স্যার, তামাসা করে কুকুরটার নাকে সিগারেটের ছোঁকা দিতে গিয়েছিল। কুকুরটাও অমনি কামড় লাগিয়েছে। ঐ খিউকিনটা চিরকালই বদমাইসি করে বেড়ায়।'
চিৎকার করে উঠল খিউকিন 'মিথ্যা কথা, শালা ট্যারা চোখো কোথাকার! আমাকে ছোঁকা দিতে দেখেছিস?'
লোকটাও পাল্টা জবাব দিল 'স্যারের বুদ্ধি বিবেচনা আছে। উনি নিজেই বুঝতে পারবেন কে মিথ্যা বলছে, কে সত্য বলছে। মিথ্যা কথা বললে আদালতে তার বিচার হবে। না জানো তো বলি, আমারও এক ভাই পুলিশে আছে...'
'তর্ক কোরো না, তর্ক কোরো না বলছি!' ঝগড়া থামানোর চেষ্টা করে পুলিশ ইনস্পেক্টর ওচুমেলভ।
'এটা জেনারেলের কুকুর নয়,' কনেস্টবল বলল বিচক্ষণের মতো, 'অমন কোনো কুকুরই নেই জেনারেলের। ওনার সবকটা কুকুরই শিকারী কুকুর।'
'ঠিক জানিস?'
'ঠিক জানি, স্যার।'
'ঠিকই বটে, আমিও তাই ভাবছিলাম! জেনারেলের কুকুরগুলো সব দামী দামী, উঁচুজাতের কুকুর। আর এটা তাকাতেই ইচ্ছে করে না, বিচ্ছিরি নেড়ি কুত্তা একটা। অমন কুকুর কেউ পোষে নাকি? তোদের মাথ্য খারাপ? মস্কো কি পিটার্সবুর্গে ওরকম কুকুর দেখা গেলে কী হত জানো? মেরে ফেলত খিউকিন, তোমাকে কামড়েছে মনে রেখো, সহজে ব্যাপারটা ছাড়া হবে না। শিক্ষা দেওয়া দরকার এর মালিকের! সময় হয়েছে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার...'
কনেস্টবল আপন মনে বলতে শুরু করলে, 'কে জানে বাবা, জেনারেলের কুকুর হলেও হতে পারে। ওর গায়ে ত আর লেখা নেই। সেদিন জেনারেলের উঠোনে এমনি একটা কুকুর দেখেছিলাম মনে হয়।'
'জেনারেলের কুকুরই তো এটা!' ভিড় থেকে কে একজন বলে উঠল।
'হাঁ!.. এলুদীরিন কোটটা পরিয়ে দে... দমকা হাওয়া দিল কেমন, শীত করছে... জেনারেলের কাছে এটাকে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে আয়। বলবি, আমি কুকুরটাকে পেয়ে পাঠিয়েছি। বলবি অমন করে যেন রাস্তায় ছেড়ে না দেন এত দামী কুকুর। খিউকিনের মত শুয়োরের বাচ্চারা যদি সবাই সিগারেট দিয়ে অমন করে নাকে ছ্যাঁকা দিতে থাকে তবে অমন দামী কুকুরের বারোটা বেজে যেতে কতক্ষণ? কুকুর হল গিয়ে আদুরে জীব... আর তুই ব্যাটা আহাম্মক, হাত নামা শীগগির! উজবুকের মতো আঙুল দেখাচ্ছিস কাকে? তোরই তো দোষ!..'
'ওই তো জেনারেলের বাবুর্চি এসে গেছে। ওকেই জিজ্ঞেস করা যাক..., ও ভাই প্রোখর, এসো তো একটু এখানে! দেখতো ভালো করে, কুকুরটা কি তোমাদের?'
'মানে! কস্মিনকালেও অমন কোনো কুকুর আমাদের ছিল না।'
'ব্যস, ব্যস! ব্যাপারটা বোঝা গেল তাহলে।' ওচুমেলভ বললেন, 'বেওয়ারিশ একটা কুকুর। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তর্ক করে আর কী হবে; বলছি বেওয়ারিশ কুকুর এটা, এটাকে খতম করে ঝামেলা চুকিয়ে দেওয়া যাক।'
প্রোখর কিন্তু বলে চলল, 'এটা আমাদের নয়। এই কিছুদিন হল জেনারেলের ভাই এসেছেন, এটা তাঁরই কুকুর। বজোই জাতের কুকুর সম্পর্কে আমাদের জেনারেলের কোনোই শখ নেই। কিন্তু ওর ভাই- ওঁর পছন্দ হল গিয়ে...'
'কি বললে, জেনারেলের ভাই? ভ্লাদিমির ইভানিচ এসেছেন?'
ওচুমেলভ চেচিয়ে উঠলেন, তাঁর সারা মুখ ভরে উঠল এক অপার্থিব হাসিতে, 'কী কাণ্ড! আর আমি কিনা জানি না! এখানে থাকবেন বুঝি কিছুদিন?'
'হ্যাঁ, থাকবেন।'
'কী কাণ্ড! ভাইকে দেখতে এসেছেন। আর আমি খবর পাই নি! কুকুরটা তাহলে ওরই? ভারি আনন্দের কথা। কত সুন্দর ছোট্ট কুকুরটি! ওর আঙুলে কামড়ে দিয়েছিলি! হাঃ-হাঃ-হাঃ! আরে কাঁপছিস কেন?.. কত কিউট একটা বাচ্চা!'
প্রোখর কুকুরটাকে ডেকে নিয়ে দোকান থেকে চলে গেল। ভিড়ের লোকগুলো হেসে উঠল খিউকিনের দিকে চেয়ে। ওচুমেলভ হুমকি দিলেন, 'জেনারেলের ভাইয়ের কুকুরের নাকে সিগারেটের ছ্যাঁকা, তোকে আমি পরে মজা দেখাচ্ছি!' তারপর ওভারকোটটা ভালো করে গায়ে টেনে নিয়ে বাজারের মধ্যে দিয়ে হেটে চললেন পুলিশ ইনস্পেক্টর ওচুমেলভ।