★★নামাযের মধ্যে ঢেকুর উঠলে নামাযের সমস্যা হবে কি না?★★
★★প্রশ্ন টি মুফতী আবু সাঈদ
উস্তাদকে করা হয়েছে.....
আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, হযরত। কোন নামাজি ব্যাক্তি নামাজের মধ্যে আওয়াজ করে করে ডেকোর তুলে অার এটা বারংবার করতে থাকে তাহলে কি নামাজ নষ্ট হবে কি না
উত্তরঃ
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
নামাযের মধ্যে বারবার ঢেকুর উঠলে নামায নষ্ট হবে না।
তবে ইচ্ছা করে ঢেকুর তুললে নামায মাকরুহ হবে।
"و" من الأدب "دفع السعال ما استطاع" تحرزا عن المفسد فإنه إذا کان بغیر عذر یفسد وکذا الجشاء(مراقی الفلاح) قوله: "دفع السعال ما إستطاع" أی مدة إستطاعتہ أما إذا کان یحصل له منه ضرر أو یشتغل قلبه بدفعه فالأولی عدم دفعه کما فی تنحنح محتاج إلیه لدفع بلغم منعه عن القراء ة أو عن الجهر وہو إمام.(حاشیة الطحطاوی علی مراقی الفلاح شرح نور الإیضاح ص: )
والله اعلم بالصواب
উত্তর প্রদানে… মুফতী আবু সাঈদ
উস্তাজ, ইদারাতুত্ তাখাসসুস ফিল উলূমিল ইসলামিয়া, আজিমপুর
In search of the path of light
সত্যের সন্ধানে, আলোর সন্ধানে
★★ভুলক্রমে পানাহার ও স্ত্রী সম্ভোগ রোযা ভঙ্গ হবে না,
এই সম্পর্কে নিচে একটি হাদীস বর্ননা করা হলো ..,. ★★
وَحَدَّثَنِي عَمْرُو بْنُ مُحَمَّدٍ النَّاقِدُ، حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، عَنْ هِشَامٍ الْقُرْدُوسِيِّ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ سِيرِينَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، - رضى الله عنه - قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " مَنْ نَسِيَ وَهُوَ صَائِمٌ فَأَكَلَ أَوْ شَرِبَ فَلْيُتِمَّ صَوْمَهُ فَإِنَّمَا أَطْعَمَهُ اللَّهُ وَسَقَاهُ " .
★★ভুলক্রমে পানাহার ও স্ত্রী সম্ভোগ রোযা ভঙ্গ হবে না★★
★আমর ইবনে মুহাম্মাদ নাকিদ (রাহঃ) ......... আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, রোযা পালনকারী যদি ভুলক্রমে খায় বা পান করে তবে, সে তার রোযা পূর্ণ করবে। কেননা আল্লাহ তাআলাই তাকে আহার করিয়েছেন ও পান করিয়েছেন।
হাদীসের ব্যাখ্যা:
এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, রোযার কথা ভুলে গিয়ে পানাহার করলে তার রোযা নষ্ট হবে না। তবে রোযা স্মরণ হওয়ামাত্রই পানাহার ছেড়ে দিতে হবে।
—সহীহ মুসলিম, হাদীস নং 2587 (আন্তর্জাতিক নং 1155)
হাদীসের বর্ননাকারী: হযরত আবু হুরায়রা রাযি. (মৃত্যু 57/58/59 হিজরী)
আহলান সাহলান
পবিত্র মাহে রমজান
اِنَّا زَیَّنَّا السَّمَآءَ الدُّنۡیَا بِزِیۡنَۃِۣ الۡکَوَاکِبِ ۙ
إِنَّا = নিশ্চয়ই আমি
زَيَّنَّا = আল্লাহ) সৃুশোভিত করেছি)
السَّمَاءَ = আকাশকে
الدُّنْيَا = কাছে র
بِزِينَةٍ = চাকচিক্যদ্বারা
الْكَوَاكِبِ = তারকাদের
★★ মুফতী তাকী উসমানী
নিশ্চয়ই আমি (আল্লাহ) নিকটবর্তী আকাশকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছি (বিভিন্ন) নকশা দ্বারা অর্থাৎ নক্ষত্রমণ্ডলী দ্বারা।
★★মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
নিশ্চয় আমি (আল্লাহ) নিকটবর্তী আকাশকে তারকারাজির দ্বারা সুশোভিত করেছি।
★★ইসলামিক ফাউন্ডেশন
আমি (আল্লাহ) নিকটবর্তী আকাশকে নক্ষত্ররাজির সুষমা দিয়ে সুশোভিত করেছি,
ব্যাখ্যাঃ
হযরত নূহ (আঃ) সর্বপ্রথম শরীয়তধারী পয়গাম্বর । তিনি তাঁর জাতিকে দীর্ঘদিন হেদায়েত করবার পরও তারা তাঁর উপদেশ মানে নি । তখন তাঁর বদ্ দোয়ায় তারা পানিতে ডুবে মরল । তার পর মানব বংশ তাঁর ছেলে-হাম, শাম ও ইয়াফেসের দ্বারাই পুনরায় শুরু হল । (ইব্ঃ কাঃ)
★★ —আছ ছাফ্ফাত - ৬★★
সুরা: আন্-নূর
আয়াত নং :-33
টিকা নং:54, 55, 56, 57, 58, 59,
وَ لْیَسْتَعْفِفِ الَّذِیْنَ لَا یَجِدُوْنَ نِكَاحًا حَتّٰى یُغْنِیَهُمُ اللّٰهُ مِنْ فَضْلِهٖ١ؕ وَ الَّذِیْنَ یَبْتَغُوْنَ الْكِتٰبَ مِمَّا مَلَكَتْ اَیْمَانُكُمْ فَكَاتِبُوْهُمْ اِنْ عَلِمْتُمْ فِیْهِمْ خَیْرًا١ۖۗ وَّ اٰتُوْهُمْ مِّنْ مَّالِ اللّٰهِ الَّذِیْۤ اٰتٰىكُمْ١ؕ وَ لَا تُكْرِهُوْا فَتَیٰتِكُمْ عَلَى الْبِغَآءِ اِنْ اَرَدْنَ تَحَصُّنًا لِّتَبْتَغُوْا عَرَضَ الْحَیٰوةِ الدُّنْیَا١ؕ وَ مَنْ یُّكْرِهْهُّنَّ فَاِنَّ اللّٰهَ مِنْۢ بَعْدِ اِكْرَاهِهِنَّ غَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ
★★মুফতী তাকী উসমানী
যাদের বিবাহ করার সামর্থ্য নেই, তারা সংযম অবলম্বন করবে, যতক্ষণ না আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করেন। তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীদের মধ্যে যারা ‘মুকাতাবা’ করতে চায়, তোমরা তাদের সঙ্গে মুকাতাবা করবে যদি তাদের মধ্যে ভালো কিছু দেখ এবং (হে মুসলিমগণ!) আল্লাহ তোমাদেরকে যে সম্পদ দিয়েছেন তা থেকে তাদেরকেও দাও এবং তোমরা নিজ দাসীদেরকে দুনিয়ার ধন-সম্পদ অর্জনের জন্য ব্যভিচারে বাধ্য করো না যদি তারা পুতপবিত্র থাকতে চায়। কেউ তাদেরকে বাধ্য করলে, তাদেরকে বাধ্য করার পর (তারা ক্ষমার আশা রাখতে পারে। কেননা) আল্লাহ তো অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
★★মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
যারা বিবাহে সামর্থ নয়, তারা যেন সংযম অবলম্বন করে যে পর্যন্ত না আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেন। তোমাদের অধিকারভুক্তদের মধ্যে যারা মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তি করতে চায়, তাদের সাথে তোমরা লিখিত চুক্তি কর যদি জান যে, তাদের মধ্যে কল্যাণ আছে। আল্লাহ তোমাদেরকে যে, অর্থ-কড়ি দিয়েছেন, তা থেকে তাদেরকে দান কর। তোমাদের দাসীরা নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করতে চাইলে তোমরা পার্থিব জীবনের সম্পদের লালসায় তাদেরকে ব্যভিচারে বাধ্য কারো না। যদি কেহ তাদের উপর জোর-জবরদস্তি করে, তবে তাদের উপর জোর-জবরদস্তির পর আল্লাহ তাদের প্রতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
★★ইসলামিক ফাউন্ডেশন
যাদের বিবাহের সামর্থ্য নেই, আল্লাহ্ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে এবং তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীদের মধ্যে কেউ তার মুক্তির জন্যে লিখিত চুক্তি চাইলে, তাদের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হও, যদি তোমরা এদের মধ্যে মঙ্গলের সন্ধান পাও। আল্লাহ্ তোমাদেরকে যে সম্পদ দিয়েছেন তা হতে তোমরা এদেরকে দান করবে। তোমাদের দাসিগণ, সতীত্ব রক্ষা করতে চাইলে পার্থিব জীবনের ধনলালসায় তাদেরকে ব্যভিচারিণী হতে বাধ্য কর না, আর যে তাদেরকে বাধ্য করে, তবে তাদের ওপর জবরদস্তির পর আল্লাহ্ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
★★—আন নূর - ৩৩★★
★★তাফসীর : ★★
★★টিকা:৫৪★★
এ প্রংসগে নবী ﷺ থেকে যে হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে সেগুলোই এ আয়াতগুলোর সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যা করতে পারে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেছেন, নবী ﷺ বলেনঃ يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ “হে যুবকগণ! তোমাদের মধ্য থেকে যে বিয়ে করতে পারে তার বিয়ে করে নেয়া উচিত। কারণ এটি হচ্ছে চোখকে কুদৃষ্টি থেকে বাঁচাবার এবং মানুষের সততা ও সতীত্ব রক্ষার উৎকৃষ্ট উপায়। আর যার বিয়ে করার ক্ষমতা নেই তার রোযা রাখা উচিত। কারণ রোযা মানুষের দেহের উত্তাপ ঠাণ্ডা করে দেয়।” (বুখারী ও মুসলিম) হযরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ ثَلاَثَةٌ حَقٌّ عَلَى اللَّه عَوْنُهُمُ النَّاكِحُ يُرِيدُ الْعَفَافَ والْمُكَاتَبُ يُرِيدُ الأَدَاءَ وَالغازى فِى سَبِيلِ اللَّهِ- “তিন ব্যক্তিকে সাহায্য করা আল্লাহর দায়িত্ব। এক ব্যক্তি হচ্ছে, যে চারিত্রিক বিশুদ্ধতা বজায় রাখার জন্য বিয়ে করে। দ্বিতীয় ব্যক্তি হচ্ছে, মুক্তিলাভের জন্য যে গোলাম লিখিতভাবে চুক্তিবদ্ধ হয় এবং তার মুক্তিপণ দেয়ার নিয়ত রাখে। আর তৃতীয় ব্যক্তি, যে আল্লাহর পথে জিহাদ করার জন্য বের হয়।” (তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, আহমাদ। এছাড়া আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, আন নিসা ২৫ আয়াত )।
★★টিকা:৫৫★★
মূল শব্দ হচ্ছে مُكَاتَبَتْ এর শাব্দিক অর্থ লিপিবদ্ধ। কিন্তু পারিভাষিক দিক দিয়ে এ শব্দটি তখন বলা হয় যখন কোন গোলাম বা বাঁদী নিজের মুক্তির জন্য নিজের প্রভুকে একটি মূল্য দেবার প্রস্তাব দেয় এবং প্রভু সে প্রস্তাব গ্রহণ করে নেয় তখন উভয়ের মধ্যে এর শর্তাবলী লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। ইসলামে গোলামদের মুক্ত করার জন্য যেসব পথ তৈরী করা হয়েছে এটি তার অন্যতম। এ মূল্য অর্থ বা সম্পদের আকারে দেয়া অপরিহার্য নয়। উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে প্রভুর জন্য কোন বিশেষ কাজ করে দেয়াও মূল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। চুক্তি হয়ে যাবার পর কর্মচারীর স্বাধীনতায় অনর্থক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার অধিকার প্রভুর থাকে না। মূল্য বাবদ দেয় অর্থ সংগ্রহের জন্য সে তাকে কাজ করার সুযোগ দেবে। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে গোলাম যখনই তার দেয় অর্থ বা তার ওপর আরোপিত কাজ সম্পন্ন করে দেবে তখনই সে তাকে মুক্ত করে দেবে। হযরত উমরের আমলের ঘটনার। একটি গোলাম তার কর্ত্রীর সাথে নিজের মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তি করে এবং নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে চুক্তিতে উল্লেখিত পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে তার কাছে নিয়ে যায়। কর্ত্রী বলে, আমিতো সমুদয় অর্থ এক সাথে নেবো না। বরং বছরে বছরে মাসে মাসে বিভিন্ন কিস্তিতে নেবো। গোলাম হযরত উমরের (রা.) কাছে অভিযোগ করে। তিনি বলেন, এ অর্থ বায়তুল মালে দাখিল করে দাও এবং চলে যাও তুমি স্বাধীন। তারপর কর্ত্রীকে বলে পাঠান, তোমার অর্থ এখানে জমা হয়ে গেছে, এখন তুমি চাইলে এক সাথেই নিয়ে নিতে পারো অথবা আমরা বছরে বছরে মাসে মাসে তোমাকে দিতে থাকবো। (দারুকুত্নী, আবু সাঈদ মুকবেরীর রেওয়ায়াতের মাধ্যমে)।
★★টিকা:৫৬★★
একদল ফকীহ এ আয়াতের এ অর্থ নিয়েছেন যে, যখন কোন বাঁদী বা গোলাম মুল্য দানের বিনিময়ে মুক্তিলাভের লিখিত চুক্তি করার আবেদন জানায় তখন তা গ্রহণ করা প্রভুর জন্য ওয়াজিব হয়ে যায়। এটি আতা, আমর ইবনে দ্বীনার, ইবনে সীরান, মাসরূক, দ্বাহ্হাক, ’ইক্রামাহ, যাহেরীয়্যা ও ইবনে জারীর তাবারীর অভিমত। ইমাম শাফে’ঈও প্রথমে এরই প্রবক্তা ছিলেন। দ্বিতীয় দলটি বলেন, এটি ওয়াজিব নয় বরং মুস্তাহাব ও মান্দুব তথা পছন্দনীয়। এ দলে শা’বী, মুকাতিল ইবনে হাইয়ান, হাসান বাস্রী, আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ, সুফিয়ান সওরী, আবু হানীফা, মালেক ইবনে আনাসের মতো মনীষীগণ আছেন। শেষের দিকে ইমাম শাফে’ঈও এ মতের প্রবক্তা হয়ে উঠেছিলেন। প্রথম দলটির মতে সমর্থন করতো দু’টো জিনিস। এক, আয়াতের শব্দ كَاتِبُوهُمْ “তাদের সাথে লিখিত চুক্তি করো।” এ শব্দাবলী পরিষ্কার প্রকাশ করে যে, এটি আল্লাহর হুকুম। দুই, নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়াত থেকে প্রমাণ হয়, প্রখ্যাত ফকীহ ও মুহাদ্দিস হযরত মুহাম্মাদ ইবনে সীরীনের পিতা সীরীন যখন তাঁর প্রভু হযরত আনাসের (রা.) কাছে মূল্যের বিনিময়ে গোলামী মুক্ত হবার লিখিত চুক্তি করার আবেদন জানায় এবং তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন তখন সীরীন হযরত ওমরের (রা.) কাছে নালিশ করে। তিনি ঘটনা শুনে দোর্রা নিয়ে আনাসের (রা.) ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং বলেন, আল্লাহর হুকুম হচ্ছে, “গোলামী মুক্তির লিখিত চুক্তি করো।” (বুখারী) এ ঘটনা থেকে যুক্তি পেশ করা হয়ঃ এটি হযরত উমরের ব্যক্তিগত কাজ নয় বরং সাহাবায়ে কেরামের উপস্থিতিতে তিনি এ কাজ করেছিলেন এবং কেউ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাননি, কাজেই এটি এ আয়াতের নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা। দ্বিতীয় দলটির যুক্তি হচ্ছে, আল্লাহ শুধুমাত্র كَاتِبُوهُمْ বলেননি, বলেন فَكَاتِبُوهُمْ إِنْ عَلِمْتُمْ فِيهِمْ خَيْرًا “তাদের সাথে লিখিত চুক্তি করো যদি তাদের মধ্যে কল্যাণের সন্ধান পাও।” এ কল্যাণের সন্ধান পাওয়াটা এমন একটি শর্ত যা নির্ভর করে একমাত্র মালিকের রায়ের ওপর। এর এমন কোন নির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই যার ভিত্তিতে কোন আদালত এটা যাচাই-পর্যালোচনা করতে পারে। আইনগত বিধানের রীতি এ নয়। তাই হুকুমটিকে উপদেশের অর্থেই গ্রহণ করা হবে আইনগত হুকুমের অর্থে নয়। আর সীরীনের যে নজির পেশ করা হয়েছে তার জবাব তারা এভাবে দেনঃ সেকালে তো আর লিখিত চুক্তির আবেদনকারী গোলাম একজন ছিল না। নবীর যুগে ও খেলাফতে রাশেদার আমলে হাজার হাজার গোলাম ছিল এবং তাদের বিপুল সংখ্যক মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তি করেছিল। কিন্তু কেবলমাত্র সীরীনের ঘটনাটি ছাড়া কোন প্রভুকে আদালতের হুকুমের মাধ্যমে গোলামী মুক্তির লিখিত চুক্তি করতে বাধ্য করার আর একটিও দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। কাজেই হযরত উমরের এ কাজটিকে আদালতের ফায়সালা মনে করার পরিবর্তে আমরা একে এ অর্থে গ্রহণ করতে পারি যে, তিনি মুসলমানদের মাঝখানে কেবল কাযীর ভূমিকায় অধিষ্ঠিত ছিলেন না বরং ব্যক্তি ও সমাজের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল পিতা ও সন্তানের মতো। অনেক সময় তিনি এমন অনেক বিষয়েও হস্তক্ষেপ করতেন যাতে একজন পিতা হস্তক্ষেপ করতে পারেন কিন্তু একজন বিচারক পারেন না।
★★টিকা:৫৭★★
কল্যাণ বলতে তিনটি জিনিস বুঝানো হয়েছেঃ
★একঃ ★
চুক্তিবদ্ধ অর্থ আদায় করার ক্ষমতা গোলামের আছে। অর্থাৎ সে উপার্জন বা পরিশ্রম করে নিজের মুক্তি লাভের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আদায় করতে পারে। যেমন একটি মুরসাল হাদীসে বলা হয়েছে, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ ان علمتم فيهم حرفة ولاترسلوهم كلا على الناس “যদি তোমার জানো তারা উপার্জন করতে পারে তাহলে লিখিত চুক্তি করে নাও। তাদেরকে যেন লোকদের কাছে ভিক্ষা করতে ছেড়ে দিয়ো না।” (ইবনে কাসীর, আবু দাউদের বরাত দিয়ে)
★দুইঃ★
তার কথায় বিশ্বাস করে তার সাথে চুক্তি করা যায়, এতটুকু সততা ও বিশ্বস্ততা তার মধ্যে আছে। এমন না হয় যে, লিখিত চুক্তি করার পর সে মালিকের খিদমত করা থেকে ছুটিও পেয়ে গেলো। আবার এ সময়ের মধ্যে যা কিছু আয়-রোজগার করে তাও খেয়ে পরে শেষ করে ফেললো।
★তিনঃ★
মালিক তার মধ্যে এমন কোন খারাপ নৈতিক প্রবণতা অথবা ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রুতার এমন তিক্ত আবেগ-অনুভূতি পাবে না যার ভিত্তিতে এ আশঙ্কা হয় যে, তার স্বাধীনতা মুসলিম সমাজের জন্য ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক হবে। অন্য কথায় তার ব্যাপারে আশা করা যেতে পারে যে, সে মুসলিম দেশের ও সমাজের একজন ভালো ও স্বাধীন নাগরীক হতে পারবে, কোন বিশ্বাসঘাতক ও ঘরের শত্রু আস্তিনের সাঁপে পরিণত হবে না। এ প্রসঙ্গে একথা সামনে রাখতে হবে যে, বিষয়টি ছিল যুদ্ধবন্দী সংক্রান্তও এবং তাদের সম্পর্কে অবশ্যি এ ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করার প্রয়োজন ছিল।
★★টিকা:৫৮★★
এটি একটি সাধারণ হুকুম। প্রভু, সাধারণ মুসলমান এবং ইসলামী হুকুমাত সবাইকে এখানে সম্বোধন করা হয়েছে। প্রভুদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তির আবেদনকারীদের দেয় অর্থ থেকে কিছু না কিছু মাফ করে দাও। কাজেই বিভিন্ন রেওয়ায়াত থেকে প্রমাণ হয় সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের চুক্তিবদ্ধ গোলামদের দেয় অর্থ থেকে বেশ একটা বড় পরিমাণ অর্থ মাফ করে দিতেন। এমন কি হযরত আলী (রা.) হামেশা এক চতুর্থাংশ মাফ করেছেন এবং এরই উপদেশ দিয়েছেন। (ইবনে জারীর) সাধারণ মুসলমানদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যে কোন লিখিত চুক্তিবদ্ধ গোলাম তার দেয় অর্থ আদায় করার জন্য তাদের কাছে আবেদন জানাবে, তাদেরকে যেন প্রাণ খুলে সাহায্য করে। কুরআন মজীদে যাকাতের যে ব্যয় ক্ষেত্র বর্ণনা করা হয়েছে فِي الرِّقَابِ তার মধ্যে একটি অর্থাৎ “দাসত্বের জোয়াল থেকে গর্দানমুক্ত করা।” (সূরা তওবা, ৬০ আয়াত) আর আল্লাহর নিকট فَكُّ رَقَبَةٍ “গর্দানের বাঁধন খোলা” একটি বড় নেকীর কাজ। (সূরা বালাদ, ১৩ আয়াত) হাদীসে বলা হয়েছে এক গ্রামীন ব্যক্তি এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললো, আমাকে এমন কাজ বলুন যা করলে আমি জান্নাতে প্রবেশ করবো। রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “তুমি অতি সংক্ষেপে অনেক বড় কথা জিজ্ঞেস করেছো। গোলামকে মুক্ত করে দাও, গোলামদের স্বাধীনতা লাভে সাহায্য করো, কাউকে পশু দান করলে অত্যধিক দূধেল পশু দান করো এবং তোমাদের যে আত্মীয় তোমাদের প্রতি জুলুম করে তুমি তার সাথে সৎ ব্যবহার করো। আর যদি তা না করতে পারো, তাহলে অভুক্তকে আহার করাও, পিপাসার্তকে পানি পান করাও, মানুষকে ভালো কাজ করার উপদেশ দাও এবং খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করো। আর যদি এও না করতো পারো, তাহলে নিজের মুখ বন্ধ করে রাখো। মুখ খুললে ভালোর জন্য খুলবে আর নয়তো বন্ধ করে রাখবে।” (বায়হাকী ফী শু’আবিল ঈমান, আনিল বারাআ ইবনে আযিব)। ইসলামী রাষ্ট্রকেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে, বায়তুল মালে যে যাকাত জমা হয় তা থেকে লিখিত চুক্তিবদ্ধ গোলামদের মুক্তির জন্য একটি অংশ ব্যয় করো। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ, প্রাচীন যুগে তিন ধরনের গোলাম হতো। এক, যুদ্ধবন্দী। দুই, স্বাধীন ব্যক্তিকে ধরে গোলাম বানানো হতো এবং তারপর তাকে বিক্রি করা হতো। তিন, যারা বংশানুক্রমিকভাবে গোলাম হয়ে আসছিল, তাদের বাপ-দাদাকে কবে গোলাম বানানো হয়েছিল এবং ওপরে উল্লেখিত দু’ধরনের গোলামের মধ্যে তারা ছিল কোন্ ধরনের তা জানার কোন উপায় ছিল না। ইসলামের আগমনের সময় আরব ও আরবের বাইরের জগতের মানব সমাজ এ ধরনের গোলামে পরিপূর্ণ ছিল। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা শ্রমিক ও চাকর বাকরদের চাইতে এ ধরনের গোলামদের ওপর বেশী নির্ভরশীল ছিল। ইসলামের সামনে প্রথম প্রশ্ন ছিল, পর্ব থেকে এই যে গোলামদের ধারা চলে আসছে এদের ব্যাপারে কি ব্যবস্থা নেয়া যায়। দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল আগামীর জন্য গোলামী সমস্যার কি সমাধান দেয়া যায়? প্রথম প্রশ্নের জবাবে ইসলাম কোন আকস্মিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। প্রাচীনকাল থেকে গোলামদের যে বংশানুক্রমিক ধারা চলে আসছিল হঠাৎ তাদের সবার ওপর থেকে মালিকানা অধিকার খতম করে দেয়নি। কারণ এর ফলে শুধু যে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়তো তাই নয় বরং আরবকে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের চাইতেও অনেক বেশী কঠিন ও ধ্বংসকর গৃহযুদ্ধের সম্মুখীন হতে হতো। এরপরও মূল সমস্যার কোন সমাধান হতো না, যেমন আমেরিকায় হয়নি এবং কালোদের (Negroes) লাঞ্ছনার সমস্যা সেখানে রয়েই গেছে। এ নির্বোধসুলভ ও অবিবেচনা প্রসূত সংস্কারের পথ পরিহার করে ইসলাম فَكُّ رَقَبَةٍ তথা দাসমুক্তির একটি শক্তিশালী নৈতিক আন্দোলন শুরু করে এবং উপদেশ, উৎসাহ-উদ্দীপনা, ধর্মীয় বিধি-বিধান ও দেশজ আইন-কানুনের মাধ্যমে লোকদেরকে গোলাম আজাদ করতে উদ্বুদ্ধ করে। তাদেরকে আখেরাতে নাজাত লাভ করার জন্য স্বেচ্ছায় গোলাম আজাদ করার অথবা নিজের গোনাহের কাফ্ফারা দেবার জন্য গোলামদেরকে মুক্তি দানের কিংবা অর্থের বিনিময়ে তাদেরকে ছেড়ে দেবার ব্যাপারে উৎসাহিত করে। এ আন্দোলনের আওতাধীন নবী ﷺ নিজে ৬৩ জন গোলামকে মুক্ত করে দেন। তার স্ত্রীগণের মধ্য থেকে একমাত্র হযরত আয়েশারই (রা.) আজাদকৃত গোলামদের সংখ্যা ছিল ৬৭। রসূলুল্লাহর ﷺ চাচা হযরত আব্বাস (রা.) নিজের জীবনে ৭০ জন গোলামকে স্বাধীন করে দেন। হাকিম ইবনে হিযাম ১০০, আবদুল্লাহ ইবনে উমর ১০০০, যুল কিলাহ হিম্ইয়ারী ৮ হাজার এবং আবদুর রহমান ইবনে আউফ ৩০ হাজার গোলামকে আজাদ করে দেন। এমনি ধরনের ঘটনা অন্যান্য সাহাবীদের জীবনেও ঘটেছে। এদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত উমরের (রা.) নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের একটি সাধারণ প্রেরণা। এ প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে লোকেরা ব্যাপকভাবে নিজেদের গোলামদেরকেও মুক্ত করে দিতেন এবং অন্যদের গোলাম কিনে নিয়ে এসে তাদেরকে আজাদ করে দিতে থাকতেন। এভাবে খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগ শেষ হবার আগেই পূর্ব যুগের প্রায় সমস্ত গোলামই মুক্তিলাভ করেছিল।
এখন প্রশ্ন হলো ভবিষ্যতে কি হবে। এ ব্যাপারে ইসলাম কোন স্বাধীন ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে গোলাম বানানো এবং তার কেনা বেচা করার ধারাকে পুরোপুরি হারাম ও আইনগতভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। তবে যুদ্ধবন্দীদেরকে শুধুমাত্র এমন অবস্থায় গোলাম বানিয়ে রাখার অনুমতি (আদেশ নয় বরং অনুমতি) দেয় যখন তাদের সরকার আমাদের যুদ্ধবন্দীদের সাথে তাদের যুদ্ধবন্দীদের বিনিময় করতে রাজী হয় না এবং তারা নিজেরাও নিজেদের মুক্তিপণ আদায় করে না। তারপর এ গোলামদের জন্য একদিকে তাদের মালিকদের সাথে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে মুক্তি লাভ করার পথ খোলা রাখা হয় এবং অন্যদিকে প্রাচীন গোলামদের ব্যাপারে যেসব নির্দেশ ছিল তা সবই তাদের পক্ষে বহাল থাকে, যেমন নেকীর কাজ মনে করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্য তাদেরকে মুক্ত করে দেয়া অথবা গোনাহর কাফ্ফারা আদায় করার জন্য তাদেরকে আজাদ করা কিংবা কোন ব্যক্তির নিজের জীবদ্দশায় গোলামকে গোলাম হিসেবে রাখা এবং পরবর্তীকালের জন্য অসিয়ত করে যাওয়া যে, তার মৃত্যুর পরই সে আজাদ হয়ে যাবে (ইসলামী ফিকাহর পরিবভাষায় একে বলা হয় তাদবীর এবং এ ধরনের গোলমকে “মুদাব্বার” বলা হয়)। অথবা কোন ব্যক্তি নিজের বাঁদীর সাথে সঙ্গম করা এবং তার গর্ভে সন্তান জন্ম লাভ করা, এ অবস্থায় মালিক অসিয়ত করুক বা না করুক মালিকের মৃত্যুর সাথে সাথেই সে নিজে নিজেই স্বাধীন হয়ে যাবে। ইসলাম গোলামী সমস্যার এ সমাধান দিয়েছে। অজ্ঞ আপত্তিকারীরা এগুলো না বুঝে আপত্তি করে বসেন। পক্ষান্তরে ওজর পেশকারীগণ ওজর পেশ করতে করতে শেষ পর্যন্ত এ বাস্তব সত্যটাকেই অস্বীকার করে বসেন যে, ইসলাম গোলামীকে কোন না কোন আকারে টিকিয়ে রেখেছিল। (তা যে কারণেই হোক না কেন)।
★★টিকা:৫৯★★
এর অর্থ এ নয় যে, বাঁদীরা নিজেরা যদি সতী সাধ্বী না থাকতে চায়, তাহলে তাদেরকে বেশ্যাবৃত্তি গ্রহণে বাধ্য করা যেতে পারে। বরং এর অর্থ হচ্ছে, বাঁদী যদি স্বেচ্ছায় ব্যভিচারের লিপ্ত হয়, তাহলে নিজের অপরাধের জন্য সে নিজেই দায়ী, তার অপরাধের জন্য আইন তাকেই পাকড়াও করবে। কিন্তু যদি তার মালিক জোর করে তাকে এ পেশায় নিয়োগ করে, তাহলে এজন্য মালিক দায়ী হবে এবং সে পাকড়াও হবে। আর একথা সুস্পষ্ট যে, জোর করার প্রশ্ন তখনই দেখা দেয় যখন কাউকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজ করতে বাধ্য করা হয়। আর “দুনিয়াবী স্বার্থ উদ্ধারের উদ্দেশ্যে” বাক্যাংশটি দ্বারা এ কথা বুঝানো হয়নি যে, যদি মালিক তার উপার্জন না খায় তাহলে বাঁদীকে দেহ বিক্রয়ে বাধ্য করার কারণে সে অপরাধী হবে না বরং বুঝানো হয়েছে যে, এ অবৈধ বল প্রয়োগের মাধ্যমে অর্জিত উপার্জনও হারামের শামিল।
কিন্তু এ নিষেধাজ্ঞাটির পূর্ণ উদ্দেশ্য নিছক এর শব্দাবলী ও পূর্বাপর আলোচনা থেকে বুঝা যেতে পারে না। একে ভালোভাবে বুঝতে হলে যে পরিস্থিতিতে এ হুকুমটি নাযিল হয় সেগুলোও সামনে রাখা জরুরী। সেকালে আরব দেশে দু’ধরনের পতিতাবৃত্তির প্রচলন ছিল। এক, ঘরোয়া পরিবেশে গোপন বেশ্যাবৃত্তি এবং দুই, যথারীতি বেশ্যাপাড়ায় বসে বেশ্যাবৃত্তি।
ঘরোয়া বেশ্যাবৃত্তিতে লিপ্ত থাকতো বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাঁদীরা, যাদের কোন পৃষ্ঠপোষক ছিল না। অথবা এমন ধরনের স্বাধীন মেয়েরা, কোন পরিবার বা গোত্র যাদের পৃষ্ঠপোষক ছিল না। তারা কোন গৃহে অবস্থান করতো এবং একই সঙ্গে কয়েকজন পুরুষের সাথে তাদের এ মর্মে চুক্তি হয়ে যেতো যে, তারা তাকে সাহায্য করবে ও তার ব্যয়ভার বহন করবে এবং এর বিনিময়ে পুরুষরা নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করতে থাকবে। সন্তান জন্ম নিলে মেয়েরা যে পুরুষ সম্পর্কে বলে দিতো যে, এ সন্তান অমুকের। সে-ই সন্তানের পিতা হিসেবে স্বীকৃত হতো। এটি যেন ছিল জাহেলী সমাজের একটি স্বীকৃত প্রথা। জাহেলিয়াতের যুগে লোকেরা একে এক ধরনের ‘বিয়ে’ মনে করতো। ইসলাম এসে বিয়ের জন্য ‘এক মেয়ের এক স্বামী’ এ একমাত্র পদ্ধতিকেই চালু করলো। এছাড়া বাদবাকি সমস্ত পদ্ধতি আপনা আপনিই যিনা হিসেবে গণ্য হয়ে অপরাধে পরিণত হয়ে গেলো। (আবু দাউদ, বাবুন ফী অজুহিন নিকাহ আল্লাতী কানা ইয়াতানাকিহু আহলুল জাহেলিয়াহ)।
দ্বিতীয় অবস্থাটি অর্থাৎ প্রকাশ্য বেশ্যাবৃত্তিতে নিয়োগ করা হতো বাঁদীদেরকেই। এর দু‘টি পদ্ধতি ছিল। প্রথমত লোকেরা নিজেদের যুবতী বাঁদীদের ওপর একটি নির্দিষ্ট অংক চাপিয়ে দিতো। অর্থাৎ প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে তাদেরকে দিতে হবে। ফলে তারা দেহ বিক্রয় করে তাদের এ দাবী পূর্ণ করতো। এছাড়া অন্য কোন পথে তারা এ পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতেও পারতো না। আর তারা কোন পবিত্র উপায়ে এ পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে এনেছে বলে তাদের মালিকরাও মনে করতো না। যুবতী বাঁদীদের ওপর সাধারণ মজুরদের তুলনায় কয়েকগুণ বেশী রোজগার করার বোঝা চাপিয়ে দেবার এছাড়া আর কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল না। দ্বিতীয় পদ্ধতি ছিল, লোকেরা নিজেদের সুন্দরী যুবতী বাঁদীদেরকে আলাদা ঘরে বসিয়ে রাখতো এবং তাদের দরজায় ঝাণ্ডা গেড়ে দিতো। এ চিহ্ন দেখে দূর থেকেই “ক্ষুধার্তরা” বুঝতে পারতো কোথায় তাদের ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে হবে। এ মেয়েদেরকে বলা হতো “কালীকীয়াত” এবং এদের গৃহগুলো “মাওয়াখীর” নামে পরিচিত ছিল। বড় বড় গণ্যমান্য সমাজপতিরা এ ধরনের বেশ্যালয় পরিচালনা করতো। স্বয়ং আবদুল্লাহ ইবনে উবাই (মুনাফিক প্রধান, যাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের পূর্বে মদীনাবাসীরা নিজেদের বাদশাহ করার সিদ্ধান্ত করে ফেলেছিল এবং যে হযরত আয়েশার বিরুদ্ধে অপবাদ রটানোর কাজে সবার আগে ছিল) মদীনায় এ ধরনের একটি বেশ্যালয়ের মালিক ছিল। সেখানে ছিল ছয়জন সুন্দরী বাঁদী। তাদের মাধ্যমে সে কেবলমাত্র অর্থই উপার্জন করতো না বরং আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত নামী দামী মেহমানদের আদর আপ্যায়নও তাদের দিয়েই করাতো। তাদের অবৈধ সন্তানদের সাহায্যে সে নিজের পাইক, বরকন্দাজ ও লাঠিয়ালের সংখ্যা বাড়াতো। এ বাঁদীদেরই একজনের নাম ছিল মু’আযাহ। সে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল এবং এ পেশা থেকে তাওবা করতে চাচ্ছিল। ইবনে উবাই তার ওপর জোর জবরদস্তি করলো। সে গিয়ে হযরত আবু বকরের (রা.) কাছে নালিশ করলো। তিনি ব্যাপারটি রসূলের ﷺ কাছে পৌঁছে দিলেন। (ইবনে জারীর, ১৮ খণ্ড, ৫৫-৫৮ এবং ১০৩-১০৪ পৃষ্ঠা, আল ইসতি’আব লি ইবনি আবদিল বার, ২ খণ্ড, ৭৬২ পৃষ্ঠা, ইবনে কাসীর, ৩ খণ্ড, ২৮৮-২৮৯ পৃষ্ঠা)। এ সময়েই আল্লাহর পক্ষ থেকে এ আয়াত নাযিল হয়। এ পটভূমি দৃষ্টি সমক্ষে রাখলে পরিষ্কার জানা যাবে, শুধুমাত্র বাঁদীদেরকে যিনার অপরাধে জড়িত হতে বাধ্য করার পথে বাধা সৃষ্টি করাই নয় বরং ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে বেশ্যাবৃত্তির (Prostitution) ব্যবসায়ে সম্পূর্ণরুপে আইন বিরোধী গণ্য করা এবং একই সঙ্গে যেসব মেয়েকে জোর জবরদস্তি এ ব্যবসায়ে নিয়োগ করা হয় তাদের জন্য ক্ষমা ঘোষণাও এখানে এর মূল উদ্দেশ্য।
আল্লাহর পক্ষ থেকে এ ফরমান এসে যাবার পর নবী ﷺ ঘোষণা করেন لاَ مُسَاعَاةَ فِى الإِسْلاَمِ “ইসলামে বেশ্যাবৃত্তির কোন অবকাশই নেই।” (আবু দাউদ, ইবনে আব্বাসের রেওয়ায়াতের মাধ্যমে, বাবুন ফী ইদ্দিআয়ে ওয়ালাদিয যিনা) দ্বিতীয় যে হুকুমটি তিনি দেন সেটি ছিল এই যে, যিনার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ হারাম, নাপাক ও পুরোপুরি নিষিদ্ধ। রাফে’ ইবন খাদীজের রেওয়ায়াত হচ্ছে, নবী করীম (সা.) مَهْرُ الْبَغِىِّ অর্থাৎ যিনার বিনিময়ে অর্জিত অর্থকে নষ্ট, সর্বাধিক অকল্যাণমূলক উপার্জন, অপবিত্র ও নিকৃষ্টতম আয় গণ্য করেন। (আবু দাউদ, তিরমিযি ও নাসাঈ) আবু হুজাইফা (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ (সা.) كَسْبِ الْبَغِىِّ অর্থাৎ দেহ বিক্রয়লব্ধ অর্থকে হারাম গণ্য করেছেন। (বুখারী, মুসলিম, আহমাদ) আবু মাস’উদ উকবাহ ইবনে আমরের রেওয়ায়াত হচ্ছে, রসূলুল্লাহ (সা.) مَهْرُ الْبَغِىِّ তথা যিনার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থের লেনদেনকে নিষিদ্ধ গণ্য করেছেন। (সিহাহে সিত্তা ও আহমদ) তৃতীয় যে হুকুমটি তিনি দিয়েছিলেন তা ছিল এই যে, বাঁদীর কাছে থেকে বৈধ পন্থায় কেবলমাত্র হাত ও পায়ের শ্রম গ্রহণ করা যেতে পারে এবং মনিব তার ওপর এমন পরিমাণ কোন অর্থ চাপিয়ে দিতে বা তার কাছ থেকে আদায় করতে পারে না যে সম্পর্কে সে জানে না অর্থ সে কোথা থেকে ও কিভাবে উপার্জন করে। রাফে’ ইবনে খাদীজ বলেনঃ نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ كَسْبِ الأَمَةِ حَتَّى يُعْلَمَ مِنْ أَيْنَ هُوَ- “রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাঁদীর মাধ্যমে কোন উপার্জন নিষিদ্ধ গণ্য করেন যতক্ষণ না একথা জানা যায় যে, এ অর্থ কোথা থেকে অর্জিত হয়।” (আবু দাউদ, কিতাবুল ইজারাহ) রাফে’ ইবনে রিফা’আহ আনসারীর বর্ণনায় এর চাইতেও সুস্পষ্ট হুকুম পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছেঃ نَهَانَا نَبِىُّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ كَسْبِ الأَمَةِ إِلاَّ مَا عَمِلَتْ بِيَدِهَا وَقَالَ هَكَذَا بِأَصَابِعِهِ نَحْوَ الْخَبْذى وَالْغَزْلِ وَالنَّفْشِ- “আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাঁদীর সাহায্যে অর্থোপর্জন করতে আমাদের নিষেধ করেছেন, তবে হাতের সাহায্যে পরিশ্রম করে সে যা কিছু কামাই করে তা ছাড়া। এবং তিনি হাতের ইশারা করে দেখান যেমন এভাবে রুটি তৈরী করা, সূতা কাটা বা উল ও তুলা ধোনা।” (মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, কিতাবুল ইজারাহ)
একই বক্তব্য সম্বলিত একটি হাদীস আবু দাউদ ও মুসনাদে আহমাদে হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তাতে كسب الاماء (বাঁদীর কামাই) ও مهر البغى (ব্যভিচারের উপার্জন) গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এভাবে নবী ﷺ কুরআনের এ আয়াতের উদ্দেশ্য অনুযায়ী সেকালে আরবে প্রচলিত বেশ্যাবৃত্তির সকল পদ্ধতিকে ধর্মীয় দিক দিয়ে অবৈধ ও আইনগত দিক দিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। বরং আরো অগ্রসর হয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ---এর বাঁদী মু’আযার ব্যাপারে যা কিছু সিদ্ধান্ত তিনি দেন তা থেকে জানা যায়, যে বাঁদীকে তার মালিক জোর করে এ পেশায় নিয়োগ করে তার ওপর থেকে তার মালিকের মালিকানা সত্বও খতম হয়ে যায়। এটি ইমাম যুহরীর রেওয়ায়াত। ইবনে কাসীর মুসনাদে আবদুর রাযযাকের বরাত দিয়ে তাঁর গ্রন্থে এটি উদ্ধৃত করেছেন।
প্রশ্নঃ আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, যুলহিজ্জাহ মাসের গুরুত্বপূর্ণ আমালগুলো কি?
★★উত্তর★★
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
★★যুলহাজ্ব মাসের গুরুত্বপূর্ণ আমল :★★
★★ 1 ★★
প্রথম দশ দিনে নফল রোযা রাখা ও রাতে ইবাদত করা।
যুলহাজ্ব মাসের চাঁদ উদিত হওয়ার পর থেকে দশ তারিখ পর্যন্ত যত দিন সম্ভব নফল রোযা রাখা আর রাতে বেশী বেশী ইবাদত করা। নফল নামায, কুরআন তিলাওয়াত, তাসবীহ-তাহলীল, তাওবাহ-ইস্তিগফার ও আল্লাহরা কাছে কান্নাকাটি ইত্যাদি ইবাদতের মাধ্যমে রাত কাটানো।
عن حفصة رضى الله عنها- قالت : أربع لم يكن يدعهن النبي- صلى الله عليه وسلم- : صيام عاشوراء، والعشر، وثلاثة أيام من كل شهر والركعتين قبل الغداة .
হযরত হাফসা রাদি. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো চারটি আমল পরিত্যাগ করেননি। আশুরার রোযা, যিলহজ্জের দশ দিনের রোযা, প্রত্যেক মাসের [১৩, ১৪, ১৫] তিন দিনের রোযা, ও ফজরের পূর্বের দু রাক্আত সুন্নাত নামায। -মুসনাদেআহমদ -২৮৭/৬; সুনানে আবূদাউদ-২১০৬; সুনানে নাসায়ী- ২২৩৬
এ হাদীসে যুলহাজ্বের দশ দিনের রোযা বলতে নবম তারিখ ও তার পূর্বের রোযা বোঝানো হয়েছে। কেননা দশম দিন অর্থাৎ ঈদের দিনে রোযা রাখা জায়েয নেই।
عن أبي هريرة عن النبي صلى الله عليه و سلم : قال ما من أيام أحب إلى الله أن يتعبد له فيها من عشر ذي الحجة يعدل صيام كل يوم منها بصيام سنة وقيام كل ليلة منها بقيام ليلة القدر
হযরত আবু হুরায়রা রা.থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যুলহাজ্বের দশ দিনের ইবাদত আল্লাহর নিকট অন্য দিনের ইবাদত তুলনায় বেশী প্রিয়। প্রত্যেক দিনের রোযা এক বছরের রোযার ন্যায়, আর প্রত্যেক রাতের ইবাদত লাইলাতুল কদরের ইবাদতের ন্যায় ।[তিরমিজী শরীফ,হাদীস নং-৭৫৮]
★★2️★★
যারা কুরবানী করার ইচ্ছে পোষণ করছেন, তারা যুলহাজ্ব মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর থেকে হাত পায়ের নখ, মাথার চুল ও অবাঞ্ছিত পশম ইত্যাদি কাটবে না। এ আমলটি সুন্নত (যদি এগুলো না কাটার মেয়াদ ৪০ দিন না হয়ে থাকে)
عن أم سلمة أن النبي صلى الله عليه وسلم قال اذا دخلت العشر فأراد أحدكم أن يضحي فلا يمس من شعره ولا من بشره شيئا.
হযরত উম্মে সালমাহ রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যখন [যুলহাজ্বের প্রথম] ১০ দিনের সূচনা হয়, আর তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছে করে, সে যেন চুল-নখ ইত্যাদি না কাটে। {সুনানে নাসায়ী কুবরা, হাদীস নং-৪৪৫৪}
قال الرجل أرأيت ان لم أجد إلّامنيحة أنثى أفأضحى بها؟ قال لا، ولكن تاخذ من شعرك وأظفارك وتقص شاربك وتحلق عانتك فتلك تمام أضحيتك عند الله.
“জনৈক সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এক ব্যক্তি দুধ খাওয়ার জন্য আমাকে একটি উট দিয়েছে। আমি কি তা দ্বারা কুরবানী করবো? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে নিষেধ করলেন এবং বললেন, তবে তুমি [যুলহাজ্জ মাসের চাঁদ দেখা দিলে নিজের চুল ও নখ কর্তন করো না এবং ঈদুল আযহার দিন] চুল, নখ কাটো, মোচ ছোট করো এবং নাভীর নিচের পশম হলক্ব করো। এটাও তোমার জন্যে আল্লাহ’র দরবারে পূর্ণ কুরবানী।‘’ [এটা বলে রহমাতুললিল আলামীন গরীব সাহাবীকে সুসংবাদ দিলেন।] -আবূদাউদ : ২৪১০; সহীহ ইবনে হিব্বান : ৬০৪০
★★3️★★
যুলহাজ্ব মাসের নয় তারিখ রোযা রাখা সুন্নাত :
صيام يوم عرفة أحتسب على الله أن يكفر السنة التي قبله والسنة التي بعده
হযরত আবু কাতাদাহ রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আরাফার দিনের রোযার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, এ রোযা তার পূর্বের ও পরের বৎসরের গোনাহ মুছে ফেলবে। {সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৭৪০}
তবে যারা হজ্বে গিয়েছেন, তাদের জন্য এদিন রোযা না রাখা উচিত।
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- نَهَى عَنْ صَوْمِ يَوْمِ عَرَفَةَ بِعَرَفَةَ
অনুবাদ-হযরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ আরাফার দিনে আরাফার ময়দানে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন। {সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-২৪৪২}
★★4️★★
তাকবীর তাশরীক্ব বলা :
যুলহাজ্ব মাসের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরয নামাযের পর একবার তাকবীর বলা ওয়াজিব।পুরুষের জন্য আওয়াজ করে, আর মহিলাদের জন্য নীরবে।
اَللهُ أَكْبَرُ، اَللهُ أَكْبَرُ، لَاإِلَهَ إِلاَّ اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ وَلِلهِ الحَمْدُ
আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু
ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ্।
— মুসান্নাফু ইবনে আবী শাইবাহ, ২/১৬৪; ফাতওয়া শামী-তৃতীয় খন্ড,৬১ পৃষ্ঠা
★★ 5 ★★
ঈদুল আযহার রাতে বেশি বেশি ইবাদত করা :
عن أبي أمامة عن النبي صلى الله عليه و سلم قال من قام ليلتي العيدين محتسبا لله لم يمت قلبه يوم تموت القلوب
যে ব্যক্তি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার রাতে সওয়াবের নিয়তে জাগরিত থেকে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থাকবে, তাহলে যে দিন অন্যান্য দিল মরে যাবে সেদিন তার দিল মরবে না।
{সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৭৮২, শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং-৩৭১১}
★★ 6 ★★
ঈদের দিনের সবচে বড় আমল হল ঈদের নামায শেষে "কুরবানী করা"।
১০, ১১, ১২ যুলহজ্বের যে কোন একদিন, কোন ব্যক্তির মালিকানায় যদি নিত্য প্রয়োজন অতিরিক্ত সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ, অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা বা এর সমমূল্যের সম্পদ থাকে, তাহলে তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। পুরুষ-মহিলা সকলের উপরই এ বিধান প্রযোজ্য।
ফাতওয়া শামী-৯/৪৫৩, ৪৫৭; ফাতওয়া আলমগীরী-৫/২৯২
عن عائشة : أن رسول الله صلى الله عليه و سلم قال ما عمل آدمي من عمل يوم النحر أحب إلى الله من إهراق الدم إنها لتأتي يوم القيامة بقرونها وأشعارها وأظلافها وأن الدم ليقع من الله بمكان قبل أن يقع من الأرض فيطيبوا بها نفسا
হযরত আয়শা রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কুরবানীর দিনে বনী আদম এমন কোন কাজ করতে পারে না, যা আল্লাহর নিকট রক্ত প্রবাহিত করা তথা কুরবানী করার চেয়ে বেশি প্রিয়। কুরবানীর পশু সকল শিং, তাদের পশম ও তাদের খুরসহ কিয়ামতের দিন [কুরবানীদাতার পাল্লায়] এসে হাজির হবে। আর কুরবানীর পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর নিকট সম্মানের স্থানে পৌছে যায়। সুতরাং তোমরা প্রফুল্ল চিত্তে কুরবানী করবে।
{সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-১৪৯৩}
عن زيد بن أرقم قال أصحاب رسول الله صلى الله عليه و سلم يا رسول الله ماهذه الأضاحي ؟ قال ( سنة أبيكم إبراهيم ) قالوا فما لنا فيها ؟ يا رسول الله قال ( بكل شعرة حسنة ) قالوا فالصوف ؟ يا رسول الله : قال ( يكل شعرة من الصوف حسنة
যায়েদ বিন আরকাম রাঃ বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ সকল কুরবানীর ফযীলত কি? উত্তরে তিনি বললেন, তোমাদের জাতির পিতা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর সুন্নাত।
তারা পুনরায় আবার বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তাতে আমাদের জন্য কী সওয়াব রয়েছে? উত্তরে তিনি বললেন, কুরবানীর পশুর প্রতিটি চুলের বিনিময়ে একটি সওয়াব রয়েছে। তারা আবারো প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! ভেড়ার লোমের কি হুকুম? [এটাতো গণনা করা সম্ভব নয়] তিনি বললেন, ভেড়ার লোমের প্রতিটি চুলের বিনিময়ে একটি সওয়াব রয়েছে।
{সুনানে ইবনে মাজাহ-হাদীস নং-৩১২৭}
والله اعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেনঃ ইসহাক মাহমুদ
মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিআ মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া, মোহাম্মদপুর
প্রশ্ন: আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ,
শায়খ আমরা জানি হাদীসে আছে শয়তান কে রমজান মাসে বেঁধে রাখা হয়, এবং হাদীসে এটাও আছে যে জামায়াতে কাতার এর মাঝো ফাঁকা রাখলে সেখানে শয়তান একটি বোকরির আকার ধারণ করে দাড়ায়, অন্য আরেকটি হাদীস বিসমিল্লাহ না পড়ে খাবার খাওয়া শুরু করলে শয়তান তার সাথে খায়, এখন আমার প্রশ্ন হলো রমজান মাসে তো শয়তান বাঁধা থাকে তাহলে খাবারের শুরুতে এবং কাতারের মাঝে ফাঁকা রাখলে শয়তান আসতে পারবে কি? যদি আসে তাহলে প্রথম হাদীস এর বিপরীত হয়ে যাচ্ছে আর না আসলে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় হাদীস এর বিপরীত হয়ে যাচ্ছে! দয়া করে আমার কনফিউশান টা দূর করার জন্য যথাযত উত্তর দিবেন...
উত্তরঃ
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
লিখেছেন, মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
**********
রমজান মাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এ মাসে অভিশপ্ত শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। তাহলে প্রশ্ন জাগে, রমজান মাসে শয়তান শিকলে আবদ্ধ থাকলে মানুষ রমজানে কিভাবে পাপ করে? এর বেশ কিছু জবাব হাদিসবিশারদরা দিয়েছেন।
আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন রমজান উপস্থিত হয়, জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়। জাহান্নামের সব দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। দুষ্ট শয়তানদের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হয়।’ (মুসলিম, হাদিস : ১০৭৯)
★★এক. কাজি ইয়াজ (রহ.) বলেন, শয়তান শিকলে আবদ্ধ থাকার অর্থ আক্ষরিক ও রূপক উভয় অর্থেই হতে পারে। রূপক অর্থে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, রমজানে শয়তানের ধোঁকা-প্রবঞ্চনার হার কমে যায়, অন্যায় কাজ কম হয় এবং মানুষের মধ্যে আল্লাহর বিধান পালনের প্রতি আগ্রহ প্রবল থাকে। এ অর্থে উল্লিখিত হাদিসে বাস্তব জীবনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যার বাস্তবতা আমরা সবাই স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করে থাকি। (ইকমালুল মুলিম : ৪/৬)
আর আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করা হলে হাদিসের অর্থ হলো, মানুষ পাপ করে দুই কারণে—১. তার কুপ্রবৃত্তি ও বদ-অভ্যাসের কারণে; ২. শয়তানের প্ররোচনায়। রমজানে শয়তান বন্দি থাকলেও কুপ্রবৃত্তির কারণে মানুষ পাপ করে থাকে। (ফাতহুল বারি : ৪/১১৪)
★★দুই. আল্লামা আইনি (রহ.) বলেন, শয়তানকে ওই সব রোজাদার থেকে দূরে আবদ্ধ রাখা হয়, যারা রোজার আদব ও শর্ত সঠিকভাবে পালন করে। কিন্তু যারা সেসবের ধার ধারে না, তাদের থেকে শয়তানকে আবদ্ধ না-ও রাখা হতে পারে। (উমদাতুল কারি : ১০/২৭০)
★★তিন. রমজানের আগে কৃত পাপের প্রভাবে মানুষ পাপ করে থাকে। যেমন একটি লোহা দীর্ঘক্ষণ আগুনে রাখার পর তা থেকে বের করা হলেও বেশ কিছুক্ষণ তার প্রভাব বাকি থাকে, একইভাবে গাড়ির চাকা দীর্ঘ সময় চলার পর থামানো হলেও কিছুদূর পর্যন্ত চলতে থাকে; ঠিক তেমনি ১১ মাসের পাপের প্রভাবে রমজানেও কারো কারো কাছ থেকে পাপ হয়ে থাকে।
★★চার. কোনো কোনো হাদিস ব্যাখ্যাকারী বলেছেন, রমজানে সব শয়তানকে বন্দি করা হয় না, অতিরিক্ত দুষ্ট শয়তানকে বন্দি করা হয়। তাই অন্য শয়তানদের প্ররোচনায় মানুষ পাপ করে। (ফাতহুল বারি : ৪/১১৪)
★★পাঁচ. মহান আল্লাহ কোরআনের সুরা নাসে বান্দাদের মানুষ শয়তান ও জিন শয়তান উভয় থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন, যারা মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে মানুষের মধ্যেও এক ধরনের শয়তান রয়েছে, যারা মানুষকে কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে। রমজানে জিন শয়তানকে বন্দি রাখা হলেও মানুষরূপী শয়তানদের কার্যক্রম অব্যাহত থাকে।
★★ছয়. কারো কারো মতে, রমজানে বন্দি থাকার কারণে শয়তানের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ বন্ধ থাকলেও পরোক্ষ হস্তক্ষেপ বন্ধ থাকে না। তাই মানুষ পাপ করে। (বিস্তারিত দেখুন : শরহুন নববী আলা মুসলিম : ৭/১৮৭, শরহুস সুয়ূতি আলা মুসলিম : ৩/১৮৩, মিরকাতুল মাফাতিহ : ৪/১৩৪১, ফয়জুল বারি : ৪/৩২৭)
والله اعلم بالصواب
উত্তর প্রদানে: মুফতি সাইদুজ্জামান কাসেমি
বাইতুল কুরআন মাদারাসা , মোহাম্মাদপুর
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Website
Address
Rangpur
