বাংলা সম্ভার

বাংলা সম্ভার

Share

বাংলা ভাষা বিষয়ক সংগ্রহশালা

11/02/2026

তুমি যেখানেই যাও
- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

তুমি যেখানেই যাও
আমি সঙ্গে আছি
মন্দিরের পাশে তুমি শোনো নি নিঃশ্বাস?
লঘু মরালীর মতো হাওয়া উড়ে যায়
জ্যোৎস্না রাতে
নক্ষত্রেরা স্থান বদলায়
ভ্রমণকারিণী হয়ে তুমি য়েলে কার্শিয়াং
অন্য এক পদশব্দ পেছনে শোনো নি?
তোমার গালের পাশে ফুঁ দিয়ে কে সরিয়েছে
চুর্ণ অলক?

তুমি সাহসিনী,
তুমি সব জানলা খুলে রাখো
মধ্যরত্রে দর্পণের সামনে তুমি
এক হাতে চিরুনি
রাত্রিবাস পরা এক স্থির চিত্র
যে রকম বতিচেল্লি এঁকেছেন:
ঝিল্লীর আড়াল থেকে
আমি দেখি
তোমার সুটাম তনু
ওষ্ঠের উদাস-লেখা
স্তনদ্বয়ে ক্ষীণ ওঠা নামা
ভিখারী বা চোর কিংবা প্রেত নয়
সারা রাত
আমি থাকি তোমার প্রহরী।
তোমাকে যখন দেখি, তার চেয়ে বেশি দেখি
যখন দেখি না
শুকনো ফুলের মালা যে-রকম বলে দেয়
সে এসেছে
চড়ুই পাখিরা জানে
আমি কার প্রতিক্ষায় বসে আছি
এলচের দানা জানে
কার ঠোঁট গন্ধময় হবে-
তুমি ব্যস্ত, তুমি একা, তুমি অন্তরাল ভালোবাসো
সন্ন্যাসীর মতো হাহাকার করে উঠি
দেখা দাও, দেখা দাও,
পরমুহূর্তেই ফের চোখ মুছি
হেঁসে বলি,
তুমি যেখানেই যাও, আমি সঙ্গে আছি!

31/01/2026

তোমার জন্য
- অনির্বাণ দত্ত

তুমি চাইলে কী না দিতে পারি আমি
কাকডাকা ভোরে উঠে
তুমি চাইলে এক বুক নদী সাঁতরে
ওপারের বাগান থেকে
সবচেয়ে সুন্দর ফুলগুলো নিয়ে এসে
তোমার হাতে দিয়ে বলতাম
এই দ‍্যাখো, তুমি চাইলে কী না দিতে পারি আমি।

যদি বলতে ওই উঁচু করমচা গাছে
কিংবা আকাশ ছোঁয়া কাঁচামিঠে আম
কিংবা জামরুল
কিংবা আমলকি থোকা পেড়ে দেবে
অমনি আমার চরকি নাচানো পায়ের আঙ্গুলে
কসরতের খেলায় তরতর করে এ ডাল ও ডাল সে ডাল ছাড়িয়ে
প্রায় আকাশটার কাছে উঠে গিয়ে
বলতাম -
এই দ‍্যাখো, তুমি চাইলে কী না দিতে পারি আমি।

আর তেমনি তোমার বুকের ঠিক মাঝখানটাতে
সিরসিরিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে যন্ত্রণার যে বিষ পোকাগুলো
আমার শক্ত আঙ্গুলের ফাঁকে
তীক্ষ্ম নখের ফাঁকে
একটা একটা করে টিপে মারার জন‍্যে
যদি বলতে, সমুদ্র তোলপাড় করে
পাহাড়ের চূড়ো ডিঙিয়ে, অরণ‍্যের বেড়া ভেঙে
সেই বিশল‍্যকরণী লতা
ঠিক নিয়ে এসে পাতাগুলো তোমার পায়ে
ঠেকিয়ে বলতাম
এই দ‍্যাখো, তুমি চাইলে কী না দিতে পারি আমি।

অথচ আশ্চর্য, কিছুতেই তুমি
চাইলে না কিছু।

22/11/2025

কুষ্ঠব্যাধি
- কায়েস আহমেদ

কই যাও চন্দ্রমোহন?
তোমার ক্ষ্যাত, তোমার পুস্কন্নী, তোমার
আম-জাম, কাঁঠাল, কলা, নারকেল ঘেরা
বাড়ি, উঠোন, হলুদ গাঁদা, নীল
সন্ধ্যামালতি, বাঁধানো তুলসী মঞ্চ,
গোয়াল ঘর, তোমার রাজ্যপাট
ফালাইয়া রাইতের আন্ধারে
কই যাও? ক্যান
যাইতে হয়!

বক্কেশ্বর পন্ডিতের কথা মনে পড়ে?
দ্বাপর যুগ সমাপ্ত হইলে প্রজাপতি
ব্রহ্মার পৃষ্ঠদেহে অধম্যের জন্ম হইল।
মিথ্যা হইল অধর্মের সহধর্মিনী।
দম্ভ তাহাদের পুত্র। দম্ভ আপন
সহোদরা মায়াকে বিবাহ করিল এবং
তাহাদের লোভ নামে এক পুত্র
জন্মগ্রহন করিল। লোভও
ভগিনীগমন করে, ফলত তাহাদের
ক্রোধ নামে এক পুত্র এবং হিংসা
নাম্নী এক কন্যার জন্ম হয়।

মনে পড়ে চন্দ্রমোহন? বক্কেশ্বর পন্ডিত
সেই কোঙ্কালে চিতাখোলার ছাই
হইয়া পঞ্চভূতে মিশ্যা গেছে। কথা
মিশে নাই। মুনি ঋষিগো বানী তো
জগতে রইয়া যায়। দম্ভ আর
মায়ার বিয়া আইজও হয়, লোভ
নামের পুত্রের জন্মও কেউ ঠেকাইতে
পারে না।

তাইতো চন্দ্রমোহন, রাইতের আন্ধারে
চৌদ্দ পুরুষের ভিটা ছাইড়া নদীর
জলে চক্ষের জল মিশাইয়া নির্বাসনে
যাইতে হয়। ভাইস্যা যায়গো নদীর
জলে প্রতিমা ভাইস্যা যায়।

বড় দুঃখ চন্দ্রমোহন, বড় কষ্ট!
তবু মাটির বড় মায়া। রাইত নাই
দিন নাই মাথার ভেতরে বুকের ভেতরে
খালি পাড় ভাঙে। নদী খালি
কল-কল কল-কল কইরা বইয়া যায়।

চন্দ্রমোহন, মনে পড়ে আশ্বিন মাসের সেই পূজা !
ভরা বর্ষার আন্ধার রাইতে মাঠ বিল
ভইরা লন্ঠনের আলো। কালো কালো
মানুষের হাতে ট্যাটা আর কোচ।
মাছ, জলের জিন বড় তড়পায়।
আহারে মাছ। সেই নদী মনে পড়ে
চন্দ্রমোহন?

বর্ষার নদী। আশ্বিনের
নদী। কাশবন। শীতের পিঠা।
নবান্ন। মনে পড়ে?

তবে, কই যাও চন্দ্রমোহন?
রাইতের আন্ধারে
রাজ্যপাট ছাইড়া কোন নির্বাসনে
যাও নদীর জলে চক্ষের জল মিশাইয়া।

চন্দ্রমোহন, ইংরাজ গেল, কিন্তু
তোমারে ক্যান নির্বাসনে যাইতে অয়।
দ্যাশ অইলো জননী। জননী ক্যান
সন্তান বিসর্জন দেয়।

’৭১ এর যুদ্ধের কথা মনে
পড়ে? মানুষের কী কষ্ট!
প্রানের কী মায়া! লাখো লাখো
মানুষ! রক্ত! আগুন! ভয়!
কান্না! দীর্ঘশ্বাস! অতঃপর
স্বাধীন হইল দ্যাশ। হায়রে স্বাধীন!

আমরা য্যান কোনো রাক্ষসের প্যাটের
মইদ্যে আছি। আমাগো চোখ
নাই, শরীর নাই। কেবল
মাংশের তাল। হিংসা আর
লোভের তাল।

চন্দ্রমোহন, এখনো এতকিছুর
পরও ক্যান নিজের শিকড়ে টান
পড়ে। এখনো ক্যান সন্ত্রস্ত
থাকতে হয় সদা, দ্যাশ তো স্বাধীন।
তবু ক্যান তুমি হও ভীত
কেবল এই জন্যে যে – তোমার
নাম চন্দ্রমোহন।

02/06/2025

রূপমকে একটা চাকরি দিন
সুবোধ সরকার

রূপমকে একটা চাকরি দিন—এম. এ পাস, বাবা নেই
আছে প্রেমিকা সে আর দু’-এক মাস দেখবে, তারপর
নদীর এপার থেকে নদীর ওপারে গিয়ে বলবে, রূপম
আজ চলি
তোমাকে মনে থাকবে চিরদিন
রূপমকে একটা চাকরি দিন, যে কোন কাজ
পিওনের কাজ হলেও চলবে।

তমালবাবু ফোন তুললেন, ফোনের অন্য প্রান্তে
যারা কথা বলেন
তাদের যেহেতু দেখা যায় না, সুতরাং তারা দুর্জ্ঞেয় |
তমালবাবু মামাকে বললেন রূপমের একটা চাকরি দরকার
মামা বললেন কাকাকে, কাকা বললেন জ্যাঠাকে,
জ্যাঠা বললেন
বাতাসকে।
মানুষ জানলে একরকম, কিন্তু বাতাস জানলে
প্রথমেই ছুটে যাবে দক্ষিণে, সে বলবে দক্ষিণের অরণ্যকে
অরণ্য বলবে আগুনকে, আগুন গেল আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে
আলিমুদ্দিন ছুটল নদীকে বলার জন্য
নদী এসে আছড়ে পড়ল
উপকূলে, আসমুদ্র হিমাচল বলে উঠল
রূপমকে একটা চাকরি দাও, এম. এ. পাশ করে বসে আছে ছেলেটা।

কয়েক মাস বাদের ঘটনা, আমি বাড়ি ফিরছিলাম সন্ধেবেলায়
গলির মোড়ে সাত-আটজনের জটলা দেখে থমকে দাঁড়ালাম
জল থেকে সদ্য তুলে আনা রূপমের ডেডবডি
সারা গায়ে ঘাস, খরকুটো, হাতের মুঠোয়
ধরে থাকা একটা এক টাকার কয়েন।
পাবলিক বুথ থেকে কাউকে ফোন করতে চেয়েছিল, রূপম?
ভারত সরকারের এক টাকা কয়েনের দিকে আমার চোখ।

সারা গায়ে সবুজ ঘাস, ঘাস নয়, অক্ষর
এম. এ. পাস করতে একটা ছেলেকে যত অক্ষর পড়তে হয়
সেই সমস্ত ব্যর্থ অক্ষর ওর গায়ে লেগে আছে।

একটা ছেলেকে কেন আপনারা এম. এ. পড়ান, কোন আহ্লাদে আটখানা বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়েছেন? তুলে দিন
এই কথাগুলো বলব বলে ফোন তুললাম পবিত্র সরকারের
ফোন বেজে উঠল, ফোন বেজে চলল, ফোন বেজেই চলল
২০ বছর ধরে ওই ফোন বেজে চলেছে, আরো কুড়ি বছর বাজবে।

বাতাস বলছে অরণ্যকে, অরণ্য চলেছে নদীর দিকে
নদী উপকূল থেকে আছড়ে পড়ে বলল :
রূপমকে একটা চাকরি দিন।
কে রূপম?
রূপম আচার্য, বয়স ২৬, এম. এ. পাস
বাঁ দিকের গালে একটা কাটা দাগ আছে।

03/05/2025

তোমার জন্য কৃষ্ণচূড়ার লাল
সালমান হাবীব - কবিতায় গল্প বলা মানুষ

তোমার জন্য কৃষ্ণচূড়ার লাল,
তোমার জন্য জমিয়ে রাখা
অভিমানের অযুত কোটি কাল।

তোমার জন্য পুড়ে যাওয়া মন,
তোমার জন্য পুষে রাখা
একশো আকাশ সেই সে কথা
আরও না-হয় 'থাকো কিছুক্ষণ'।

তোমার জন্য বৃষ্টি মূখর দিন,
তোমার জন্য জমিয়ে রাখা বুকে
হয়নি বলা 'অনেক কথার ঋণ'।

তোমার জন্য আকাশ দেখা বিকাল,
তোমার জন্য ঘুমভাঙা ভোর
রাত্রি শেষের স্নিগ্ধতম সকাল।

তোমার জন্য হৃদ মাঝারে টিপ,
তোমার জন্য আলোর শহর
সন্ধ্যা নামায় ঝিঁঝির বহর
জ্বলে উঠে জোনাকি প্রদীপ!

তোমার জন্য 'ভালোবাসি' বলা,
তোমার জন্য আকাশ হয়েও
'অনিয়ম' এর নিয়ম করে চলা।

তোমার জন্যেই 'যাই পুড়ে যাই রোজ,
তোমার জন্যেই চিঠির ভাঁজে লিখি;
'অভিমানের দিন ফুরালে একটু নিয়ো খোঁজ'।

11/02/2025

মনে থাকবে?
- আরণ্যক বসু

পরের জন্মে বয়স যখন ষোলোই সঠিক
আমরা তখন প্রেমে পড়বো
মনে থাকবে?

বুকের মধ্যে মস্তো বড় ছাদ থাকবে
শীতলপাটি বিছিয়ে দেব;
সন্ধে হলে বসবো দু’জন।
একটা দুটো খসবে তারা
হঠাৎ তোমার চোখের পাতায় তারার চোখের জল গড়াবে,
কান্ত কবির গান গাইবে
তখন আমি চুপটি ক’রে দুচোখ ভ’রে থাকবো চেয়ে…
মনে থাকবে?

এই জন্মের দূরত্বটা পরের জন্মে চুকিয়ে দেব
এই জন্মের চুলের গন্ধ পরের জন্মে থাকে যেন
এই জন্মের মাতাল চাওয়া পরের জন্মে থাকে যেন
মনে থাকবে?

আমি হবো উড়নচন্ডী
এবং খানিক উস্কোখুস্কো
এই জন্মের পারিপাট্য সবার আগে ঘুচিয়ে দেব
তুমি কাঁদলে গভীর সুখে
এক নিমেষে সবটুকু জল শুষে নেব
মনে থাকবে?
পরের জন্মে কবি হবো
তোমায় নিয়ে হাজারখানেক গান বাঁধবো।
তোমার অমন ওষ্ঠ নিয়ে
নাকছাবি আর নূপুর নিয়ে
গান বানিয়ে-
মেলায় মেলায় বাউল হয়ে ঘুরে বেড়াবো…
মনে থাকবে?

আর যা কিছু হই বা না হই
পরের জন্মে তিতাস হবো
দোল মঞ্চের আবীর হবো
শিউলিতলার দুর্বো হবো
শরৎকালের আকাশ দেখার-
অনন্তনীল সকাল হবো;
এসব কিছু হই বা না হই
তোমার প্রথম পুরুষ হবো
মনে থাকবে?

পরের জন্মে তুমিও হবে
নীল পাহাড়ের পাগলা-ঝোরা
গায়ের পোষাক ছুড়ে ফেলে
তৃপ্ত আমার অবগাহন।
সারা শরীর ভ’রে তোমার হীরকচূর্ণ ভালোবাসা।
তোমার জলধারা আমার অহংকারকে ছিনিয়ে নিল।
আমার অনেক কথা ছিল
এ জন্মে তা যায়না বলা
বুকে অনেক শব্দ ছিল-
সাজিয়ে গুছিয়ে তবুও ঠিক
কাব্য করে বলা গেল না!
এ জন্ম তো কেটেই গেল অসম্ভবের অসঙ্গতে
পরের জন্মে মানুষ হবো
তোমার ভালোবাসা পেলে
মানুষ হবোই- মিলিয়ে নিও!

পরের জন্মে তোমায় নিয়ে…
বলতে ভীষণ লজ্জা করছে
ভীষণ ভীষণ লজ্জা করছে
পরের জন্মে তোমায় নিয়ে…
মনে থাকবে?

29/11/2024

ভালোবাসা হলো কাঁচা সবজির মতো। নষ্ট হয়ে যায়। এই জন্য ভালোবাসা বুকের মধ্যে লুকায়ে রাখতে হয়। বুক খুব ঠান্ডা ফ্রিজের মতো - এখানে কোন জিনিস নষ্ট হয় না। যার বুক যত ঠান্ডা তার বুকে ততদিন ভালোবাসা থাকে।

🖋️ হুমায়ুন আহমেদ

09/09/2024

অপরাহ্ণের নারী

(আনন্দময়ী মজুমদারের তর্জমায় ডেভিড হোয়াইটের 'মিড লাইফ উওম্যান')

অপরাহ্ণের নারী
তুমি তো অদৃশ্য নও আমার কাছে
আমি দেখতে পাই
তোমার মুখের গভীরে
সেই সব অগণন নারীর মুখ
যা তোমারই ছিল একদিন
অপরাহ্ণের নারী,
কোন সমান্তরাল পৃথিবীতে
আমি তোমার সঙ্গে লতিয়ে উঠেছি,
তোমার মতো শ্বাস
নিতে নিতে,
তোমার মত চোখের নিমেষ
ফেলতে ফেলতে,
তোমার মতো
হাসির ভাঁজ আমার মুখে
এঁকে নিতে নিতে,
আর তোমারই জন্য
অপেক্ষা করতে করতে,
যেমন তুমিও করেছ বলে বুঝিয়েছ আমায়,
আমার জন্য।

তোমার বাইরের নিমিখে
আমি তোমার গহন ত্বকের রঙ
দেখতে পাই,
দেখে নিতে পারি
তোমার সব ক'টি জীবন,
তোমার সমস্ত প্রেম,
হয়তো তোমার জন্যই
আমার এমন বিপুল, উদার হতে ইচ্ছে করে
যৌবনের আমি-র চেয়ে
একজন ঢের ভাল পুরুষ হতে,
মুহূর্তের সকল দেওয়া-নেওয়া
আমি এবার মুঠোয়
ধরতে চাই।

তোমার কাছ থেকেই
আমি কল্পনা করে নিতে পারি
তোমার পুরনো তাবৎ ভালোবাসা।
অপরাহ্ণের নারী,
তুমি তো অদৃশ্য নও আমার কাছে।
আমি তোমার ভিতর এক
মেয়েকে আকাশে
মুখ তুলতে দেখি,
যে মেয়ে
অলৌকিক আভায় ঝলসে ওঠে
যে পূর্ণ, বলিষ্ঠ,
সময়ের থানের কাছে যে
তাঁর স্বয়ম্বরের জন্য অপেক্ষায়।
আমি তোমার মধ্যে একজন জননীকে দেখি,
তোমার ইতিহাসে,
অথবা এখনও পর্যন্ত
অজ্ঞেয় কোনো
ভবিষ্যতে রূপ নেবে সে।

আমি তোমাকে
গভীর ভালবাসতে দেখি
তোমার জন্য গভীর ভালবাসাকে
চাক্ষুষ করি আমি,
আর এখন,
তোমার নাম ধরে ডাকলে
প্রতিদিন
একটু একটু করে
আমার সঙ্গে
যে নারী
তুমি হয়ে উঠবে
সেই নারীকে
আমার দেখতে সাধ যায়।

অপরাহ্ণের নারী,
আমার কাছে এসো,
আমি বাতাসে ভেসে যাওয়া
সব মেয়ের চেয়ে
তোমাকেই স্পষ্ট দেখি।
আমি একজন
যোদ্ধা হয়েছি ব'লে
তোমার এই মুহূর্তের
নিটোল ভালবাসা
অর্জন করতে পারি,
তোমার কাছে এখন
আমার জখম
তুলে ধরি অকপট,
আমার চোখের রেখায়
তোমার সঙ্গে হাসতে পারার ভাঁজ,
আমি তাই তোমার কাছে আসি
অকর্ষিত,
অপ্রস্তুত,
বৃষ্টি আর বাতাস ভেঙে
বুনো এবড়োথেবড়ো পথ পেরিয়ে,
পাহাড় টপকে সারা রাত
আমি আসি
তোমাকে পাবার এই
আনন্দময়, জৌলুসময় মুহূর্তে।

অপরাহ্ণের নারী,
আঁধারে আমি তোমায়
দু'হাতে ধরি,
আর সেই অদৃশ্যমানতায়
তোমার অন্তরের তাবৎ জীবন
আমার কাছে চোখ দিয়ে
ছুঁয়ে দেখার
মতো বাস্তব হয়ে ওঠে
অপরাহ্নের নারী
আমি আজ তোমাকে
গভীর ভালবাসার
যোগ্য হয়েছি।
অপরাহ্নের নারী,
তুমি তো আমার কাছে অদৃশ্য নও।

আমার কাছে এসো
তোমার ভিতর
যত লাবণ্যময়ী বসত করেছে,
সকলকে
আমি আজ চুমু দিই নিবিড়
আমার প্রতিশ্রুতি
আজ তোমার কাছে,
তোমার ভবিষ্যৎ সবকটি
জীবনের কাছে।

06/09/2024

আমাকে একটু কথা পাঠাবেন?
আপনাকে খুব শুনতে ইচ্ছে করছে।
'ভালোবাসি' পাঠাতে হবে না।
ভালো তো বাসেনই না।
সেটা আমি জানি। টের পাই।
ভালো যে বাসেন না, সেটাই বলে পাঠান।
আমাকে অপছন্দ আপনার, এইটুকু বলে পাঠান।
তবুও একটু কথা পাঠান, প্লিজ!
আমার না আপনাকে খুব শুনতে ইচ্ছে করছে।
খুউব মানে খুউব! 'বিষম ভীষণ' এর মতোন!

বই : আমায় তুমি ফিরিয়ে নিও ফুরিয়ে যাবার আগে
সালমান হাবীব - কবিতায় গল্প বলা মানুষ

11/05/2024

তসলিমা নাসরিনের লেখা

ধরা যাক রবীন্দ্রনাথ বেঁচে আছেন,
অসুখ বিসুখ নেই, শয্যাশায়ী নন,
দিব্যি লিখছেন, গাইছেন, ভাবছেন, ভ্রমণ করছেন।
বেঁচে থাকলে আমার চিঠির জবাব দিতেন তিনি।
লিখতেন, 'তোমার সরলতা আর সততার কথা যখন বললে, এক মুহূর্তে আমার স্নেহ অধিকার করে নিলে তুমি।
যদি চিঠি লিখতে দেরি হয়, লিখতে যদি নাও পারি,
তাতেই বা এমন কী দুঃখ!
তোমাকে যখন স্নেহ করি তখন চিঠির চেয়েও
আমার মন তোমার ঢের বেশি কাছে আছে।’
অনেকদিন না লিখলে বলতেন, ‘ছোট হোক মন্দ হোক, একটা করে চিঠি আমায় রোজ লেখো না কেন বলো?’

আমাকে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে ডাকতেন,
কখনও শান্তিনিকেতনে,
সোনাঝুরি বনে হাঁটতে হাঁটতে বলতেন বিন্দুর মতো যেন না হই, যেন বাঁচি।
যেন মৃণালের মতো হই, অথবা মৃণালের চেয়েও সাহসী।
আমার দুঃখগুলো প্রেমকাঁটা তুলে ফেলার মতো
আমার মন থেকে একটি একটি করে তুলে ফেলতেন।
শিলং পাহাড়ে বেড়াতে নিয়ে ছাব্বিশের যুবক হয়ে উঠতেন, শেষের কবিতার অমিত হয়ে উঠতেন,
হাতে হাত ধরে হাঁটতেন সুঠাম সুদর্শন,
তাঁর স্পর্শের উষ্ণতা আমার বরফ-শীতল একাকীত্বকে নিমেষে ঝর্ণার উচ্ছল জল করে দিত।

গোটা বাংলা থেকে আমার আজীবন নির্বাসন,
আমার গৃহবন্দিত্ব,
আমার পায়ে পায়ে নিষেধাজ্ঞা,
আমার মাথার মূল্য,
পায়ের নিচে মাটি না থাকা।
শুধু সমতা চেয়েছি বলে,
শুধু সভ্য সুস্থ সমাজ চেয়েছি বলে,
শুধু লিখেছি বলে,
কবিতা বা গল্প প্রবন্ধ লিখেছি বলে;
রবীন্দ্রনাথ যদি বেঁচে থাকতেন, আমি নিশ্চিত,
দেখে প্রাণ বড় কাঁদতো তাঁর।
তিনি ভৎসর্না করতেন শাসকদের,
সভ্যতার সংকট দেখে আতঙ্কে কুঁকড়ে থাকতেন।
আমি তাঁর পিঠে মনে মনে আলতো হাত রেখে তাঁর দুশ্চিন্তাগুলো একটু একটু করে উড়িয়ে দিতে চাইতাম,
কপালে তিনি চুম্বন করতেন আমার।

একদিন বলতেনই, ‘বোটে করে চলো শিলাইদহে যাই’।
আমার সারা মন তিরতির করে কাঁপতো আনন্দে,
তাঁর গভীর চোখ সেই আনন্দকে দেখতে পেতো
তাঁর আঙুল সেই আনন্দকে স্পর্শ করতে পারতো,
আমাকে স্বদেশের জল মাটির স্বাদ গন্ধ দিতে তিনি শিলাইদহে নিতেন।
বোটে শুয়ে আকাশে তাকিয়ে তাকিয়ে সন্ধ্যার মেঘমালা দেখতেন,
আমি আধশোয়া হয়ে আকাশ নয়, তাঁকেই দেখতাম অপলক।
তখন আমার অমল ধবল মনে মন্দ মধুর হাওয়া,
তখন চারদিক থেকে নির্জনতা তার জলতরঙ্গ বাজিয়ে যেতো।
তখন তিনি গেয়ে উঠতেন, ‘আমি কান পেতে রই…’
গান শেষে, হেসে, আরও কাছে ডেকে বলতেন,
‘এই তারাময় আকাশের নীচে
আবার কি কখনও জন্ম নেবো?
যদি নিই, আর কি কখনও এমন প্রশান্ত সন্ধ্যাবেলায়
এই নিস্তব্ধ নদীটির ওপর
এমন নিশ্চিন্ত মুগ্ধ মনে
এমন নৌকোর ওপর বিছানা পেতে থাকবো আবার?’
তাঁর একটি হাত আমার হাতের মুঠোয় নিয়ে বলতাম,
‘আবার কেন জন্ম নিতে হবে!
আপনার এক জন্মই সহস্র জন্মের সমান।’

সারারাত পূর্ণিমার জলে স্নান করে কবি গা মোছেন আমার আঁচলে,
অস্ফুট কণ্ঠে ভোররাত্তিরে বলেন,
‘শিলাইদহে আমি কেন আসি জানো, প্রকৃতির শুশ্রূষা পাবো বলে আসি।
আজ তোমার শুশ্রূষাও পেলাম।’
কুঠিবাড়ির দিকে যেতে যেতে বলেন,
‘তুমিও তো প্রকৃতি ভালোবাসো।
যাও দেখে এসো গাছপালা নদী হাওড়,
এ তোমার সোনার বাংলা,
এ তোমার দেশের মাটি!'
আমি নিশ্চুপ শুনি,
আমার কাঁধে তাঁর ডান হাত,
‘কোনও ভয় নেই, আমার আশীর্বাদ তোমার সঙ্গে আছে।’
আমি তবু নিরুত্তর।

কুঠিবাড়িতে পৌঁছে বলেন, ‘তৈরি হয়ে নাও
সকালের গাড়িতে তোমাকে আমিই উঠিয়ে দেবো।’
তবুও আমি নতমুখ দাঁড়িয়ে থাকি,
বলি, ‘আমি তো যাবো না কোথাও’।
‘কেন, ব্রহ্মপুত্রে সাঁতার কাটবে না?
দেখবে না তোমার বাড়িঘর, তোমার উঠোন!
উঠোনের ঘাসের ওপর একটি শিশিরবিন্দু!’
’তার আর দরকার হবে না।’
‘কেন হবে না?’ রবীন্দ্রনাথ বিস্ময়ে থমকে দাঁড়ান।
আমি বলি, ‘ভাষাটিই আমার দেশ,
ভাষাটিই আমার সেই অপরূপ শিশিরবিন্দু,
আপনার গান, কবিতাই,
আপনার সুর আর শব্দগুচ্ছই আমার দেশ।
আপনিই, আপনার স্নেহই আমার নিরাপদ স্বদেশ।
পদ্মার জলে আমি ব্রহ্মপুত্র দেখে নিয়েছি,
ঈশ্বর বলে কোথাও কিছু নেই, ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই আমার।
তারপরও যদি নিভৃতে কেউ থাকে কোথাও,
যদি কেউ থাকে আমার হৃদয়ে,
ঈশ্বরের মতো কেউ,
সে রবীন্দ্রনাথ।'

যদি বেঁচে থাকতেন তিনি,
আমাকে বুকে জড়িয়ে বলতেন,
‘শুধুই কি স্নেহ, তোমাকে তো ভালোওবাসি, সে তুমি জানো?’
হ্যাঁ বা না বলার দরকার হতো না,
তিনি জানতেন যে আমি জানি।

04/04/2024

সেহরির সময় বাড়িতে ফোন দিলাম। আম্মা ফোন ধরে বললেন, 'হ্যালো'।

আমি বললাম, 'আব্বাকে দেন'।

আম্মা খানিক অবাক হলেন। সাধারণত বাড়িতে ফোন দিলে আম্মার সাথেই বেশি কথা হয়। আব্বা ফোনে কথা বলতে তেমন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। আম্মা আব্বাকে ফোন দিলেন। আব্বা ফোন ধরতেই আমি বললাম, 'আব্বা, আব্বা, ও আব্বা, আব্বা, আব্বা...'

আব্বা অবাক গলায় বললেন, 'কী হইছে আব্বা?'

আমি বললাম, 'আব্বা, ও আব্বা, আব্বা, আব্বা, আব্বা, ও আব্বা... আব্বা'।

আব্বা এবার রীতিমত চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি বিভ্রান্ত গলায় বললেন, 'কী হইছে আব্বা? কিছু হইছে?'

আমি আবারও বললাম, 'ও আব্বা, আব্বা, আব্বা, আব্বা, আব্বা... ও আব্বা।'

আব্বা বললেন, 'আব্বা, কী হইছে, কী হইছে?'

আমি ফিক করে হেসে দিয়ে বললাম, 'কিছু হয় নাই। এমনিই। অনেকদিন ধরে আপনারে ফোন দেই না। কতদিন আব্বা আব্বা বলে ডাকি না। মনে হচ্ছিল আব্বা আব্বা ডাকার জন্য বুকের ভেতরটা শুকাই গেছে, পানি না খাইতে পারলে যেমন তৃষ্ণা লাগে, সেইরকম। গলা শুকাই গেছে, কেমন খা খা লাগতেছিল বুকের মধ্যে। এইজন্য তৃষ্ণা মিটাইলাম। আব্বা, আব্বা, ও আব্বা, আব্বা, আব্বা...।

আমি ফোন রেখে দিলাম। খানিক বাদে আম্মা ফোন দিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, 'তুই তোর আব্বারে কী বলছস?'

আমি বললাম, 'কেন? কী হইছে?'

আম্মা বললেন, 'কী হইছে মানে? সেইটা তুইই জানস। সে ফোন রাখনের পর থেইকা কানতেছে আর কানতেছে। নামাজে দাঁড়াইয়া মোনাজাত ধইরাও হাউমাউ কইরা কানতেছে। কি কইছস তোর আব্বারে...?'

কী বলেছি আমি?

আমি হঠাৎ চুপ করে যাই। একদম চুপ। আম্মার প্রশ্নের কোন জবাব দেই না। বসে থাকি। নিঃশব্দ। আম্মা জিজ্ঞেস করতেই থাকেন। আমার চোখ ক্রমশই ঝাপসা হতে থাকে। গাল ভিজে যেতে থাকে। বাইরে সুবহে সাদিকের আলো ফুটছে। সেই আবছা আলোর দিকে তাকিয়ে আমার হঠাৎ মনে হতে থাকল, আব্বা কাঁদুক। কাঁদুক তার পুত্রও। জগতে এই কান্নার খুব দরকার। খুব।

এই অস্থির সময়ে অজস্র কষ্ট, বেদনা, শংকা, হাহাকার, ঘৃণা, মৃত্যু, জিঘাংসার কান্নায় ক্রমশই ডুবে যেতে থাকা জগতে এমন গভীর অনুভূতির তীব্র কান্না, এমন অপার ভালোবাসায় ডুবে থাকা বিশুদ্ধ কান্না খুব দরকার।

খুব দরকার।

~ সাদাত হোসাইন
(০৭.০৬.২০১৬)

16/01/2024

দূর থেকে হয় না
- তসলিমা নাসরিন

কাছে আসতে হয়,
কাছে এসে চুমু খেতে হয়,
ত্বক স্পর্শ করে ভালোবাসতে হয়,
চুল থেকে শুরু করে চোখ নাক চিবুক, বুক,
পেট তলপেট,
যৌনাঙ্গ,
পা, পায়ের নখ একটু একটু করে ছুঁতে হয়,
ছুঁয়ে ছুঁয়ে প্রেম করতে হয়।

দূর থেকে হয় না,
ফোনে ফেসবুকে হয় না,
তার চেয়ে কাছে এসো, স্পর্শ করো,
তোমার স্পর্শের অপেক্ষায় আমার সর্বাঙ্গ।

যদি আগুন থাকতে থাকতে স্পর্শ না করো,
যদি না তাপাও শরীর,
না পোড়াও,
না ভাঙো,
উন্মাদ না করো
তবে আর এসো না,
দূর থেকে হয় না সব।

কাছে এসে হাতে হাত রেখে,
চোখে চোখ রেখে,
আগুনে আগুন রেখে বলতে হয় ভালোবাসি।

Want your business to be the top-listed Government Service in Rangpur?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Category

Telephone

Website

Address


Chatra, Pirganj
Rangpur
5730