19/05/2017
ঢাবি শিক্ষার্থীর সাথে যা ঘটলো!!
আক্তার, বয়স ২০। ঢাকার এক হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগে ১৭ তারিখ সকালে কয়েক দিনের জ্বর এবং কাশি নিয়ে আসেন। তীব্র জ্বরের সাথে র্যাশ ছিল। সকালে একবার বমি হয়েছিল।
অধ্যাপক ডাঃ আব্দুল্লাহ স্যার রোগীটিকে দেখেন, জ্বরের সাথে র্যাশ, গায়ে ব্যথা দেখে ডেঙ্গু বলে সন্দেহ করেন। রোগীকে ডেঙ্গুর সাপোর্টিভ ট্রিটমেন্ট সহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে দেন। পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয় বেলা ১১টার পর এবং পরীক্ষার রিপোর্টগুলো বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় সবগুলো আসে। রক্ত পরীক্ষার রিপোর্টে আসে হিমোগ্লবিন স্বাভাবিকের কম, শ্বেত রক্ত কণিকা স্বাভাবিকের অন্তত ৩৫ গুণ বেশি, প্লেটিলেট স্বাভাবিকের অন্তত ১০গুণ কম, ব্লাস্ট সেল প্রায় শতভাগ (এটি স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে না, ২০% এর বেশী থাকা মানে একিউট লিইকেমিয়া-এক ধরনের রক্তের ক্যান্সার)। ডেঙ্গু পরীক্ষার রিপোর্টে ডেঙ্গু এন এস ১ এন্টিজেন অনুপস্থিত আসে(মানে ডেঙ্গু হয় নি)। অন্যান্য রিপোর্টে হাইপোক্যালেমিয়া (মানে পটাশিয়াম কম যার কারণে মাংসপেশীর দূর্বলতা থেকে শুরু করে হৃদপিণ্ডের সমস্যা হতে পারে)। এছাড়া এক্সরে তে নিউমোনিয়া আসে।
রিপোর্ট আসার পর পর দুটো কাজ করা হয়,
এক রিপোর্ট অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু এবং রক্ত রোগ বিশেষজ্ঞকে রেফার করা।
এই রিপোর্টে দুটি জিনিস গুরুত্বপূর্ণ,
প্রথমত, রোগীর একিউট লিউকেমিয়া হয়েছে,
দ্বিতীয়ত, রোগির রক্তে প্লেটিলেট কমে যাওয়ায় যে কোন সময় রক্তপাত শুরু হতে পারে। সাধারণত প্লেটিলেট ৫০ হাজারের কম হলে রক্তপাতের সম্ভাবনা থাকলেও এমন ও দেখা গেছে ৫ হাজার প্লেটিলেট নিয়েও রক্তপাত হয় না।
ব্যক্তিগতভাবে রোগীর সঙ্গে থাকা একজন এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকজন চিকিৎসকের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। তাঁদের সাথে কথা বলে জানা যায় রোগীর কোন দৃশ্যমান রক্তপাত ছিল না, তবে র্যাশ এবং মাসিক ছিল। জ্বর, র্যাশ, শরীর ব্যথা ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ এবং রক্তপাত না হলে এর চিকিৎসায় রক্ত দেয়া লাগে না।
কিন্তু একই রকম উপসর্গ একিউট লিউকেমিয়াতেও দেখা যায়। ডায়াগনোসিস নিশ্চিত করার জন্য আবারো একই পরীক্ষা পুনরায় করা হয়। এবং সেখানেও লিউকেমিয়া ই আসে(প্লেটিলেট, শ্বেত রক্তকণিকা কাছাকাছি কাউন্ট আসে, ব্লাস্ট সেল বেশি আসে)। রোগীর একিউট লিউকেমিয়া(এক ধরনে রক্ত রোগ) ধরা পরার পরেই রক্তরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করা হয়। সন্ধ্যা ৬:৩০ এ রিপোর্ট দেখে রক্ত রোগ বিশেষজ্ঞকে জানালে রাত ৮:৪৫ এ তাঁকে দেখতে আসেন এবং রোগীকে তাঁর অধীন হস্তান্তর করেন। লিউকেমিয়ার প্রাথমিক চিকিৎসা, পরবর্তী চিকিৎসার জন্য আরো নির্দিষ্ট পরীক্ষা এবং কয়েক ইউনিট প্লেটিলেট ট্রানস্ফিউশন (রক্ত দেবার মত শুধু প্লেটিলেট দেয়া) এর জন্য বলা হয়। এছাড়া রোগীর এটেন্ডেন্টদের কে রোগীর অসুখের ভবিষ্যত সম্পর্কে জানানো হয়(এ রকম একটা অসুখ ধরা পড়লে এটা খুব গুরুত্বের সাথেই করা হয়)।
রোগীর অবস্থা ১৭ তারিখ দুপুর থেকেই খারাপ হতে থাকে। এজন্য ভর্তির সময় পাওয়া চিকিৎসার সাথে অধ্যাপক আব্দুল্লাহ স্যার প্রয়োজনীয় নেবুলাইজেশন, এন্টিবায়োটিক, জীবন রক্ষাকারী স্টেরয়েড যোগ করেন। বিকেলের দিকে রোগীর শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে এবং বিকেল পাঁচটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত অক্সিজেন দেয়া হয়। ততক্ষণে রোগীর মাসিকের রাস্তায় রক্তক্ষরণ অনেক বেড়ে যায়(রোগীর এটেন্ডেন্টদের ভাষ্যমতে)। রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ তাৎক্ষণিক রক্ত বন্ধ হওয়ার ওষুধ শুরু করেন(এর আগে দৃশ্যমান রক্তপাত ছিল না, স্বাভাবিক মাসিক ছিল, এমনকি ভর্তির সময় রোগীর ইতিহাস বলার সময় রোগী বা তাঁর এটেডেন্ট কেউ এ ব্যাপারে জানায়নি)। শ্বাসকষ্ট আবার ১১টার দিকে বাড়তে থাকলে পুনরায় অক্সিজেন দেয়া হয়। রাত ১২টার দিকে তাঁকে আইসিইউ তে স্থানান্তর করা হয়(ডকুমেন্ট দেখে অনুমিত, বিকল্প রাত ৪টাও হতে পারে কারণ এরপর আর কোন ডকুমেন্ট পাওয়া যায় নাই)। রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত রোগীকে কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রতি ঘন্টায় ফলোয়াপ করেন। এসময় ঘন্টায় ঘন্টায় রোগীর রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কমতে থাকে। এসময় রোগীর অবস্থা খারাপ জেনেও রোগীর লোক অক্সিজেন বন্ধ করে দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কে বাধ্য করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীর এটেন্ডেন্টদের কাছ থেকে এজন্য রিস্ক বন্ড নেয় যে-রোগীর অবস্থা খারাপ জেনেও অক্সিজেন নিতে রাজী না হওয়া পরবর্তীতে রোগীর কোন অসুবিধা হলে ডাক্তার, নার্স, বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না।
এরকম একটা রোগীর ভবিষ্যত কি হতে পারে?
কোন চিকিৎসা না নিলে একিউট লিউকেমিয়া ৫ সপ্তাহের মধ্যে মারা যাবে।
সেক্ষেত্রে এমন হতে পারে রোগীর শরীরে এই ক্যান্সারটি আরো মাস খানেক আগে থেকে শুরু হয়েছিল। এবং তীব্র জ্বরের কারণেই রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল।
রোগীর এত তীব্র জ্বরের কারণ কি ডেঙ্গু না একিউট লিউকেমিয়া?
একিউট লিউকেমিয়ার রোগীর রক্ত জীবানুর সাথে লড়াই করে যে কণিকা(নিউট্রফিল) কম থাকে। দুর্ভাগ্য ক্রমে এই রোগীর রক্তে একটিও ছিল না(সাধারণত শ্বেত রক্ত কণিকার ৭৫ ভাগ থাকে নিউট্রোফিল)। দ্বিতীয় রিপোর্টেও নিউট্রোফিল ছিল মাত্র স্বাভাবিকের ৪ভাগের এক ভাগ ছিল। নিউট্রোফিল এত কম থাকলে একজন রোগীর সারা শরীরে ইনফেকশন ছড়িয়ে যাবে(দুর্ভাগ্য ক্রমে এই রোগীর নিউমোনিয়া ছিল-এক্সরে তে)। নিউট্রোফিল না থাকায় শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়া ইনফেকশনের কারণে তীব্র জ্বর হয়েছিল যাকে সেপ্টিসেমিয়া বলে(যার চিকিৎসা আব্দুল্লাহ স্যার তাঁর অভিজ্ঞতার কারণে শুরু করেছিলেন)। রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ও তাঁর সাধ্যমত একিউট লিউকেমিয়ার চিকিৎসা শুরু করেছিলেন। আমাদের দুর্ভাগ্য সৃষ্টিকর্তা হয়ত আমাদের প্রচেষ্টার চেয়ে আফিয়ার নিয়তি ঠিক করে রেখেছিলেন। আমরা আফিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
ঠিক এর পরপরই কি হলো?
শুরু হলো চিকিৎসকদের মারধোর।
অন্তত ৩ জন চিকিৎসক(উনাদের সম্মানার্থে লেভেল উল্লেখ করা হলো না) কে মারধোর করা হয়েছে। পরিচালক সহ একজন চিকিৎসককে গ্রেফতার করে থানা হাজতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ঐ হাসপাতাল তছনছ করা হয়েছে। পত্রিকায় নিউজ হয়েছে, বিদেশী পেইড মিডিয়া ভাঙচুরকারীদের বাংলাদেশের জাতীয় বীর হিসেবে টিভি পর্দায় প্রচার করেছে(যেমনটা এক বিশেষ বিদ্রোহের সময় খুনীদের করা হয়েছিল)। পর্দার আড়ালে কিছু হয়েছে কি না জানা নেই।
হ্যাঁ আরো কিছু হয়েছে, তিন জন দায়িত্বশীল চিকিৎসক মিডিয়ায় তিন রকম কথা বলেছে। তবে হ্যাঁ মারমুখী উদ্যত জনতার সামনে, নিজের হাসপাতাল তছনছ হতে দেখলে এরকম ছয় নয় কথা যে কেউ বলবে। স্থানীয় আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দায়িত্বশীল একজন মিডিয়ায় বলে বসলেন ডাক্তাররাই তো একেকজন একেক কথা বলে।
আরে ভাই একেক জন একেক কথা তো বলবেই। ডাক্তারি জ্ঞানটাই প্রমাণ নির্ভর। যখন রোগী জ্বর, গায়ে ব্যথা, র্যাশ নিয়ে আসছে দুনিয়ার তাবৎ ডাক্তার একে ডেঙ্গুই বলবে(গত ৩ সপ্তাহে ঐ হাসপাতালের রোগী দ্বিগুণ হয়েছে কেবল একই রকম জ্বর ডেঙ্গু আর চিকুনগুনিয়ার কারণে, তবে অধ্যাপক আব্দুল্লাহ ডেঙ্গুকেই ধারণা করেছিলেন তাঁর পরীক্ষা দেয়া তাই বলে)। কিন্তু রিপোর্ট দেখলে পৃথিবীর যে কোন ডাক্তার একে একিউট লিউকেমিয়া বলবেই। তখন ডেঙ্গু টিকবে না, একিউট লিউকেমিয়া একই রকম জ্বর(কেন হবে আগে উল্লেখ করেছি), গা ব্যথা, র্যাশ(মূলত প্লেটিলেট কমে যাওয়ায় চামড়ার নিচে রক্তপাত)। এই অবস্থায় লিটারে লিটার রক্ত দিলেও রোগীর সুস্থ হওয়ার নিদেন পক্ষে বাঁচার সম্ভাবনা নেই(রোগীর সাথে থাকা থার্ড ইয়ার মেডিকেল শিক্ষার্থীর ধারণা রক্ত দিলে রোগীতা বাঁচত বা সময় মত আইসি ইউতে নিলে রোগীটা বাঁচত)। আর রইলো বাকি, ভুল চিকিৎসা হয়েছে বলে হাসপাতালের পরিচালক এবং একজন আইসিইউ এর ডাক্তারের স্বীকারোক্তি-এই রোগীর এটেন্ডেন্ট অর্ধেক রিপোর্ট কেবল প্লেটিলেট এর সংখ্যা এবং জ্বর এইটুকু হিস্ট্রি বললে যে কেউই ডেঙ্গু বলবে সেজন্যে ডাক্তার হওয়া লাগে না। ডেঙ্গুর চিকিৎসা শুরু থেকেই চলছিল। পৃথিবীতে এমন কোন ইঞ্জেকশন ডাক্তাররা ব্যবহার করে না যেটা দিলে রোগী সাথে সাথে মরে যাবে।
ষড়যন্ত্র তত্বমতে, সরকারী হাসপাতাল, বারডেম, ল্যাব এইড, এপোলো, ইউনাইটেডের পর যে বাংলাদেশী হাসপাতালটা আক্রান্ত হবার কথা সেটি সেন্ট্রাল হাসপাতাল। ষোলকলা পূর্ণ হতে আর যেগুলো বাকি আছে গুণে রাখেন, যেখানে বিশেষ দেশের(পড়ুন ভারত) থার্ড ক্লাস মাত্র পাশ করে আসা ডাক্তারকে চেম্বারের জন্য বেতন দিয়ে না রাখা হবে সেখানে একটি দুঃখজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আমাদের মিডিয়া সর্বশক্তি দিয়ে নামবে, পর্দার আড়ালে দরকষাকষী হবে এবং বাংলাদেশের সর্বশ্রদ্ধ্যেয় চিকিৎসক, সকল আন্ডারগ্র্যাজুয়েট মেডিকেল শিক্ষার্থীদের শিক্ষক, একুশে পদক প্রাপ্ত অধ্যাপক ডাঃ এবিএম আব্দুল্লাহ স্যারের মত অধ্যাপকদের ধানমন্ডি থানায় দায়েরকৃত এজাহারের এক নাম্বার আসামী করা হবে।
As predicted, after Intern, after Honorary, after midlevel and associate professors BLAME GAME DEFAMATION Strategy has started with professors and এবং শুরুটা হলো দেশের সেরা অধ্যাপককে দিয়েই।
হ্যাঁ বাংলার মানুষ দৌড়ান,
দৌড়ান সেই দেশে যেখানে ভালো চিকিৎসা হয়,
দৌড়ান সেই দেশে যারা ব্যবসার জন্য বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবা ধ্বংস করে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ অন্তত এই একটা বার তিনি যৌক্তিক কোন কথা বলেছেন,
বাকি অধ্যাপক স্যারদের কাছে অনুরোধ, সবাই কিন্তু অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ নন, শুনছেন তো এবার আপনার পালা...
বিদ্রঃ বাংলাদেশের মানুষ অধ্যাপক আব্দুল্লাহ স্যার সেই মানুষ যে এখনো দিনে যতগুলো রোগী ৩০০টাকা ভিজিট (!), হ্যাঁ আবার পড়ুন ৩০০টাকা ভিজিট(!) দিয়ে দেখে ততগুলো রোগী ফ্রি(!), হ্যাঁ আবার পড়ুন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ১৬০১ নাম্বার রুমে দৈনিক ফ্রি দেখেন। কারো কোন রেফারেন্স ছাড়াই, প্রতিদিন যতক্ষণ তিনি ঐ রুমে বসেন রুমের বাইরে যেই স্যারকে দেখাতে চায় তাঁকে তিনি দেখে দেন বিনা ফিতে।
আর হ্যাঁ বাংলাদেশের সকল চিকিৎসক, শুক্রবার দিন আব্দুল্লাহ স্যার সেই ১৬০১ এ সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢুকে বসে বসে আপনাদের জন্য শর্ট কেসের নতুন এডিশন লেখে বা লং কেসের পর নতুন বই লেখে। কৃতজ্ঞত্তা দেখানোর এখনি সময়...
স্বত্বঃ প্ল্যাটফর্ম