১৯৭০ সালের কথা। তখন আমি বাগবাটী স্কুলের ছাত্র। আমাদের ক্লাশে দুইজন কুমার ( মাটির হাড়ি পাতিল নির্মাতা ) পরিবারের হিন্দু ছাত্র ছিল। ওরা দুজন আপন সহোদর। একজনের নাম ভবতোষ পাল, আরেকজনের নাম পরিতোষ পাল। ওদের দুজনের সাথেই আমার ভাল বন্ধুত্ত ছিল। একদিন ক্লাশ ছুটি শেষে ওরা দুজন আমাকে ওদের বাড়ীতে নিয়ে যায়। ভবতোষদের মা প্রথমে আমাকে সন্দেশ খেতে দিয়েছিল। তারপর ভাত। সেই প্রথম কোন হিন্দু বাড়ীতে আমার ভাত খাওয়া। তাও আবার নিম্ন বর্ণের হিন্দু। আমার মনে আছে পিড়িতে বসে খেয়েছিলাম। খুব যভ্ন করে আমাকে ওদের মা খাওয়াছিল। ভবতোষের মা'র সেই স্নেহমাখা আদর আপ্যায়ন আমি আজো ভুলতে পারিনি।
নওদাফুলকোচা Nawdafulkocha
ফুলের মতো গ্রাম নাম তার নওদাফুলকোচা
07/07/2016
আমার যা কিছু প্রথম বাবা'র হাত ধরেই। ছোটবেলায় ঈদের মাঠে বাবা'র হাত ধরেই নামাজ পড়তে গিয়েছিলাম। বাবা'র হাত ধরেই প্রথম সেই প্রাথমিক স্কুলে যাওয়া । বাবা'র হাত ধরেই প্রথম নানা বাড়িতে গিয়েছিলাম। চৈত্র মাসের ছোনগাছার মেলায় গিয়েছিলাম বাবা'র হাত ধরেই। গারোদহ নদীতে নৌকা বাইছ দেখতে গিয়েছিলাম বাবার হাত ধরে। আর ধনিদহ বিলে মাছ ধরা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলো বাবা আমার হাত ধরেই। প্রথম সিরাজগন্জ শহরে গিয়েছিলাম বাবা'র হাত ধরে। এমনকি ঢাকা শহরে প্রথম এসেছিলাম বাবাা'র হাত ধরে।
বাবা আজ আর নেই। ১৯৮২ সালের জুলাই মাসের ৭ তারিখে বাবা আমার হাত ছেড়ে দিয়ে চিরদিনের জন্য চলে গেছেন।আজ সেই সাত তারিখ। আজ ঈদের দিন। বাবা নেই। আমি আমার ছেলের হাত ধরে ঈদের মাঠে যাবো। আামরা দু'জন বাবা'র জন্য প্রার্থনা করবো। তিনি যেন বেহেস্তবাসী হোন।আমিন।
পায়ে হাত দিয়ে ঈদের দিনে যাদের সালাম করতাম, সেই মানুষগুলো দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। সবাই এক এক করে পরপারে চলে যাচ্ছেন। প্রথমে গেলেন বড়ো মা, তারপর গেলেন মেঝো মা। তারপর চলে গেলেন বাবা। ২০১০ সাল থেকে যেনো মৃত্যুর মিছিল। তারো আগে বড়ো ভাই,ভাবি চলে গেলেন। বড়ো খালা,মেঝো খালা চলে গেলেন তারপরে। মেঝো বুবু মারা গেল ২০১০ সালে। ২০১২ সালে প্রথম মারা গেলেন শাশুরী মা, তারপর না ফেরার দেশে চলে গেলেন আমার মা। শশুর সাহেব মারা গিয়েছেন ২০০১ এ।
২০১৫ সালে মারা গেলেন আমার বড়ো বোন। তারপর কে যাবেন, জানিনা ।
ঈদ এলেই এইসব প্রিয় মানুষগুলোকে খুব মিছ করি। যতোদিন মা বে্ঁচে ছিল, একটা দায় ছিলো দেশের বাড়ি যাওয়ার। বাড়িতে যেয়ে মা'কে সালাম করবার। আজ মা' নেই। তাই দেশের বাড়ি যাওয়ার কোনো দায়ও নেই।
01/07/2016
এখন নাকি যমুনা নদীতে আর জল নেই। আমাদের গাঙের স্টিমার বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু বালি ওড়ে যমুনার বুক থেকে। যত শুনি বুক হিম হয়ে যায়। আকন্ঠ তৃষ্ণা নিয়ে মানুষ ঘুরছে নদীর পাড়ে পাড়ে।
গ্রামে যেয়ে উন্মাতাল বসন্ত বাতাস গায়ে লাগাতে ইচ্ছা করছে। তপ্ত দুপুরে রোদ্রে হাটতে ইচ্ছা করছে।দূর তেপান্তরের মাঠের ওপারে পানির স্রোতের মতো মরিচীকা দেখতে ইচ্ছা করছে।ঠাকুর বাড়িির সেই জারুল বনে কোকিলের ডাক শুনতে ইচ্ছা করছে।
নিষিদ্ধ স্টাটাস:
হার্ট এ্যাটাকের পর থেকে মনটা কেমন যেন প্রায়ই মনমরা হয়ে থাকে। যদিও ডাক্তারের চিকিৎসায় এখন ভালই আছি। তারপরও মন প্রাণ দুটোই কাঁদে। হার্টের রোগীরা ভালো অবস্থাতেই পৃথিবী থেকে হঠাৎ করেই চলে যায়। আমার কেন জানি মনে হয়, আমার যে কোন সময় বুকে প্রচন্ড ব্যথা উঠবে, আমার দম বন্ধ হয়ে আসবে। আমি আমার প্রিয় মানুসদের অজ্ঞাতসারে এই পৃথিবী থেকে চলে যবো। কিন্তু আমিতো এমনটি চাইনা। আমার আত্মা একাকী ঘর থেকে চলে যাবে,এটা হয়না। আমার মৃত্যুর সময় আমার প্রিয়তমা পত্নী কাছে থাকবে, আমার ছেলে, আমার পিয় দুই মেয়ে আমার কাছেে থাকবে, এইটাইতো চাই। আমার সন্তানেরা কাঁদবে, আমার হাত আমার স্ত্রীর হাতে নিথর হবে, ওর দু'চোখের নোনা জলে ভিজবে আমার ম্লান করুণ মুখখানি । আমি আমার প্রিয় মানুসদের দেখতে দেখতেই এই পৃথিবী থেকে চলে যেতে চাই যে ।
তোমার হাতের চূড়ি:
আমার জন্য, আমাদের সংসারের জন্য, আমার স্ত্রী তার অঙ্গ থেকে একসময় সমস্ত গহনাগুলো খুলে দিয়েছিল আমাকে ।তার বিয়ের দিনের গলার হার,মালা,কানের দুল,হাতের সব চূড়ি,কপালের টিকলি,হাতের অঙ্গুরীয়সহ সমস্ত অভিজ্ঞান আমার হাতে তুলে দিয়েছিল বিক্রয়ের জন্য। বিয়ের দিনের সেই গহনা সাজের আমার স্ত্রীর সরল স্নিগ্ধ মায়াবি মুখছ্ছবি আমার চোখে ভাসতো কেবল। জীবনের অনেকগুলো বছর ছিল কেবলি দীর্ঘশ্বাসের। জীবন ছিল অনেক পরাজিতের আর গ্লানির।
এইতো সেদিন আমার স্ত্রীকে আবার দুটো চূড়ি কিনে দিলাম । আবার দেখলাম ওর মুখে স্নিগ্ধ হাসি। অস্ফুট কন্ঠে শুধু বললো, হাতে চূড়ি পরা থাকলে স্বামীর কোন অমঙ্গল হয়না।
আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ছাত্র ছিলাম। ডঃ আহমদ শরীফ স্যার তাঁর প্রথম ক্লাশে আমাদের বঙ্গিম চন্দ্রের দুর্গেশ নন্দিনী পড়াতে আসেন। ক্লাশে ঢুকেই স্যার রসিকতা বলেন, " এ দেখছি ইডেন কলেজ ! " উল্লেখ্য আমাদের ক্লাশে ৮০ জন ছাত্রী ছিল, ছাত্র ছিল মাত্র ৪০ জন।
সে কালে মহালয়ার ভোরে ঘুম ভাঙতো সানাইয়ের সুরে। সেই থেকে পুজার ক’দিন রোজ সকালে সানাইওয়ালা এসে সানাই বাজিয়ে যেত। পুজার কাছাকাছি তখন একটা গন্ধ পেতাম। সেই গন্ধের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে ছিল আনন্দ, আবেগ আর উৎসাহ যা একাত্ম হয়ে যেত আমাদের গ্রামের প্রতিটি বাড়ির সঙ্গে। এখন আর সে সব নেই। সব বিরান হয়ে গেছে। গত অর্ধ শতাবদীতে প্রায় সবাই চলে গেছে ভারতে।
১৯৭২ সাল। মুক্তিযুদ্ধের পর আমাদের স্কুল প্রথম খোলে। সম্ভবত ফেব্রুয়ারি মাস হবে। আমি বাগবাটি হাই স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র। আমাদের ক্লাশে প্রায় ষাট জনের মতো ছাত্র ছিলাম। প্রথম দিনের ক্লাশে অনেকেই এসেছে, আবার অনেকে আসে নাই। আমরা সবাই একে অপরের খোঁজ খবর নিছ্ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় কে কোথায় ছিলাম, কেমন ছিলাম, কার কি বিপদ হয়েছিল , সেইসব অগ্নিঝরা দিনগুলোর অভিগ্গতার কথা বলাবলি করছিলাম। আমার এক সহপাঠি বন্ধু শুকুর আলিকে খূঁজছিলাম ক্লাশে। শুকুর ক্লাশে নেই। ওর গ্রামের আর একজন ছাত্রের মাধ্যমে জানা গেল,শুকুর মুক্তিযুদ্ধের সময় নৌকাযোগে যমুনা নদী দিয়ে কুড়িগ্রামের রৌমারি হয়ে ভারতের আসামের ধুবুরীর চরে চলে গিয়েছিল। ওখানে মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিং গ্রহনকালীন সময়ে ক্যাম্পে কলেরায় আক্কারান্ত হয়ে মারা যায়। এবং সেখানেই ওকে সমাধিস্থ করা হয়। খবরটি শুনে খুব মন খারাপ হয়ে যায়। অঝোর ধারায় কেঁদেছিলাম অনেক।
"........মুক্তির মন্দির সোপানতলে
কত প্রাণ হলো বলিদান
লেখা আছে অশ্রুজলে
কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা
বন্দীশালায় ঐ শিকল ভাঙা
তারা কি ফিরিবে আর
তারা কি ফিরিবে এই সুপ্রভাতে......।
আজ থেকে তিন বছর আগে এমনি এক স্নিগ্ধ শারদীয় দিবাশেষে রাতে আমার মা না ফেরার দেশে চলে যান। দুপুর থেকেই মা কেমন যেন নিরব হয়ে যায়। মা কোন কথা বলছিলনা কারো সাথে। শুধু তাকিয়ে থাকছিল সবার দিকে। কোন খাবার গ্রহন করতে চায়নি। আসলে মা তখন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষনে। সে যে জীবনও নেই, মরনেও নেই। রাত বারোটা পার হয়ে গেছে। মা'র শয্যাপাশে আমি আর আমার ছোট বোন। আমি মা'র পায়ের কাছে বসে আছি, আর আমার বোন মা'র মাথার কাছে বসে। আমি মা'র চোখের দিকেই তাকিয়ে আছি। মা খুব স্নিগ্ধ ভাবে তাকিয়ে দেখছিল আমাকে।
আমি মা'র Puls দেখার জন্য মা'র্ পা ধরলাম। আমার হাতে মা'র নাড়ির স্পন্দন খুব সুন্দরভাবে অনুভব করছিলাম। আমি মনে মনে গুনছিলাম এক দুই তিন চার........ মা'র নাড়ির স্পন্দনে আমার চোখে হাসির ঝিলিক দেখা দেয়,....মা'র চোখের দিকে আমি তাকিয়েই আছি। আর গুনছিলাম নাড়ির স্পন্দন ...পনোর..ষোল..সতেরো....। আমার মুখ মলিন হলো, আমার হাতেই মা'র নাড়ির স্পন্দন থেমে গেল। মা তখনো তাকিয়ে,আছে, মনে হলো শেষ বারের মতো দেখে নিলো তার প্রিয় সন্তানকে। তারপর চিরতরে চোখ বন্ধ করে ফেললো। ঘড়ির কাটায় তখন রাত বারোটা পনেরো মিনিট। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে তখন কেবলই কান্নার শব্দ চারদিকে ধ্বনিত হছ্ছিল ।
কাল অনেক রাতে ডিডি বাংলায় সত্যজিৎ রায়ের অপরাজিত সিনেমাটি দেখছিলাম। সিনেমাটি এর আগেও বহুবার দেখেছি। যতবারই দেখি মনে হয় যেন এই প্রথম দেখছি।
আর মাত্র চার দিন পর আমার মা’র মৃত্যু দিবস। বাড়িতে যাবো। দেখবো মা কোথাও নেই। মা আমার জন্য জানালার পাশে বসে অপেক্ষায় নেই। আমাকেই যেয়ে দরজা খুলতে হবে। দেখবো সব কিছুতেই ধুলো জমে আছে। মা’র বিছানা, নামাজের স্থান, মা’র আলনাতে, সবখানে ধুলো জমে গেছে।
অপরাজিত দেখে আমাকে কাদঁতে হলো। তাহাজ্জতের নামাজ পড়লাম। প্রার্থনায় নিজের জন্যে, স্ত্রী সন্তানদের জন্য কিছুই চাইলামনা আজ। শুধু মা’র জন্যই আজ প্রার্থনা করলাম, তাঁর জান্নাতের জন্য।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Telephone
Website
Address
তালুকদার বাড়ি
Sirajganj
7500
