হুমায়ুন আহমেদ স্যার এর রচনা সমগ্র

হুমায়ুন আহমেদ স্যার এর রচনা সমগ্র

Share

হুমায়ুন আহমেদ স্যার এর বিখ্যাত সব উপন?

13/07/2020

শুভ্র গেছে বনে

হুমায়ুন আহমেদ

13/07/2020

প্রথম পর্ব
# শুভ্র_গেছে_বনে - হুমায়ূন আহমেদ
শুভ্র গেছে বনে
উৎসর্গ
শুভ্রর মতো কাউকে কি আমি চিনি, যাকে এই বই উৎসর্গ করা যায়? না, চিনি না। প্রকৃতি শুদ্ধতম মানুষ তৈরি করে না। কিছু-না-কিছু খাদ ঢুকিয়ে দেয়।
এই বই আমার অচেনা সেইসব মানুষের জন্যে, যারা জানেন তাদের হৃদয় শুভ্রর মতোই শুভ্র।
ভূমিকা
বিজ্ঞানী স্যার আইজাক নিউটনকে পার্লামেন্ট সদস্যপদ দেওয়া হয়েছিল। তিনি এই দায়িত্ব পালনকালে একটি মাত্র বাক্য উচ্চারণ করেছিলেন—জানালাটা খুলে দিন। তিনি দ্বিতীয় কোনো বাক্য উচ্চারণ করেন নি।
শুভ্র সারা জীবন বন্ধ জানালা খুলতে চেয়েছে।
হুমায়ূন আহমেদ
নুহাশপল্লী
০১.
সুন্দর একটা দিন। চৈত্র মাসের ঝকঝকে নীল আকাশ। গতকাল বৃষ্টি হয়েছে, আবহাওয়া শীতল। হাওয়া দিচ্ছে।
হঠাৎ সব এলোমেলো হয়ে গেল। একটা প্রাইভেট কারে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো। ছোটাছুটি, চিৎকার, হৈচৈ। টোকাই ছেলেগুলি আনন্দিত। তারা কোথেকে যেন পুরনো। টায়ার জোগাড় করেছে। টায়ারে আগুন দিতে চেষ্টা করছে। আগুন ধরছে না। একদল লাঠি হাতে নেমে এসেছে রাস্তায়! তাদের আক্রোশ রিকশার দিকে।
যুথী গিয়েছে ফুল কিনতে। তখন এই কাণ্ড। আজ তার বান্ধবী নীপার জন্মদিনে সে এক প্যাকেট চকলেট এবং ফুল দেবে। আজ সন্ধ্যায় জন্মদিনের উৎসব। ফুল কেনা হয়ে গেছে। নীপা চকলেট খায় না। ফুলে তার এলাৰ্জি। যেকোনো ফুলের গন্ধে সে হাঁচতে শুরু করে। যুথীর সব বান্ধবী মিলে ঠিক করেছে, সবাই চকলেট এবং ফুল নিয়ে উপস্থিত হবে।
যুথী ঘড়ি দেখল। ছটা বাজে, এখনই সন্ধ্যা হবে। যে ঝামেলা শুরু হয়েছে নীপাদের বাসায় মনে হয় যাওয়া হবে না। ফুলের দোকানি হুড নামিয়ে দিচ্ছে। যুথী বলল, ভাই, আমি ফুল কিনব না। টাকা ফেরত দিন। দোকানি বলল, বিক্রি হওয়া জিনিস ফিরত নাই। বদলায়া নিতে পারেন। যুথী অন্য সময় হলে তর্ক করত। এখন তর্কের সময় না। দৌড়ে পালানোর সময়। লোকজন চারদিকেই দৌড়াচ্ছে। কোনদিকটা নিরাপদ সেটা বোঝা যাচ্ছে না। একজন বৃদ্ধ রিকশাওয়ালা ঝড়ের গতিতে যেতে যেতে চেঁচাচ্ছে, বিডিআর নামছে! বিডিআর! তার গলার স্বরে আনন্দ। যেন বিডিআর নামা উৎসবের মতো। এ দেশের মানুষ বিপর্যয়েও উৎসব খোঁজে।
আপনি কি আমাকে একটু সাহায্য করতে পারেন?
যুথী চমকে তাকাল। বাইশ-তেইশ বছরের এক যুবক ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। কিশোরদের মতো চেহারা। বেচারার ফর্সা মুখ আতঙ্কে নীল হয়ে গেছে। সে ঘনঘন টোক গিলছে। যুথী বলল, কী সাহায্য চান?
শুভ্ৰ শাড়ি ছেড়ে দিল।
হঠাৎ শুরু হওয়া ঝামেলা হঠাৎই শেষ হয়; যুথী শাহবাগের মোড় পার হয়েই দেখল। সব শান্ত। একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট মোটর সাইকেলে বসে গম্ভীর ভঙ্গিতে কলা খাচ্ছে। তার চোখের দৃষ্টি উদাস। যুথী তার কাছে এগিয়ে গেল। সহজ ভঙ্গিতে বলল, কলা খাচ্ছেন?
ট্রাফিক সার্জেন্ট চমকে তাকাল। যুথী বলল, কিসের গণ্ডগোল হচ্ছিল?
শ্রমিক লীগের ঝামেলা। তারা উজাইছে।
তাদের উজানো কি বন্ধ হয়েছে?
পুলিশের হেভি পিটুন খাইছে। বন্ধ হওয়ার কথা।
স্যার, আপনি কি একটা ট্যাক্সির ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন? কোনো ট্যাক্সি যেতে রাজি হচ্ছে না। আমার গুলশানে যাওয়া খুব জরুরি। আমার এক বান্ধবী নীপার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। তাকে দেখতে যেতে হবে।
সার্জেন্ট বলল, ট্যাক্সি যাবে না মানে? তার বাপ যাবে, তার শ্বশুর যাবে। দাঁড়িয়ে থাকেন, ট্যাক্সির ব্যবস্থা হচ্ছে।
মুহূর্তের মধ্যে ইয়েলো ক্যাবের ব্যবস্থা হয়ে গেল। যুথী শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, উঠুন। শুভ্ৰ বিনা বাক্যে উঠে বসল। যুথী বলল, আমি অনেক ভ্যাবদা পুরুষ দেখেছি, আপনার মতো দেখি নি।
শুভ্র বলল, ভ্যাবদা মানে কী?
যুথী বলল, ভ্যাবদা মানে হলো ভেজিটেবল। গাড়িতে করে আমার সঙ্গে রওনা হলেন। কোথায় যাচ্ছি। জিজ্ঞেস করবেন না?
কোথায় যাচ্ছেন আমি তো জানি। কেন জিজ্ঞেস করব? আপনার বান্ধবী নীপার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, তাকে দেখতে যাচ্ছেন।
যুথী বলল, আপনি যা শোনেন তা-ই বিশ্বাস করে ফেলেন। আশ্চর্য ভেজিটেবল তো। আজ নীপার জন্মদিন। সেই পার্টিতে যাচ্ছি। আমি নীপাদেয়। বাড়িতে নেমে পড়ব, আপনি ট্যাক্সি নিয়ে আপনার বাসায় চলে যাবেন। ট্যাক্সির ভাড়া যা হয় দিয়ে দেবেন।
শুভ্র বলল, কীভাবে দেব! আমার মানিব্যাগ তো গাড়িতে আগুনে পুড়ে গেছে।
যুথী বলল, আপনি বাসায় যাবেন। আপনার মাকে কিংবা বাবাকে ট্যাক্সি ভাড়া দিতে বলবেন। পারবেন না?
পারব।
আপনার কথাবার্তা মানসিক প্রতিবন্ধীর মতো। আপনি কি মানসিক প্রতিবন্ধী?
না!
আবার আমার শাড়ি ধরেছেন কেন?
ভুলে ধরেছি। আমার ভয়টা যাচ্ছে না তো, তাই মনে হয় এরকম করছি। ছোটবেলা থেকেই ভয় পেলে মায়ের শাড়ির আঁচল ধরতাম। অভ্যাসটা রয়ে গেছে।
আমি কি আপনার মা?
জি-না।
সরে বসুন এবং আমার সঙ্গে আর কোনো কথা বলবেন না। তাকিয়ে থাকবেন না।
যুথী নীপাদের বাড়ির গেটে ট্যাক্সি থেকে নেমে হুট করে গেট দিয়ে ঢুকে গেল; শুভ্ৰ নামের মানসিক প্রতিবন্ধী অনেকক্ষণ তাকে ঝামেলা করেছে। আর ঝামেলা করতে দেওয়া হবে না। এই ধরনের ছেলেপুলেই মৃত্যুর পর সিন্দাবাদের ভূত হয়। ঘাড়ে চাপে, আর নামে না।
পার্টি হচ্ছে নীপাদের বাড়ির ছাদে। ছাদে সুইমিংপুল আছে। উঁচু রেলিং দিয়ে ছাদ ঘেরা। নানান ধরনের গাছ দিয়ে ছাদ সাজানো। নকল এক পাহাড়ের মতো করা হয়েছে। পাহাড়ে বোতাম সাইজের নীল ফুলের গাছ। শুধু ছাদের বাগান দেখাশোনার জন্যে দুজন মালি আছে। আনোয়ার, সানোয়ার। এরা দুই ভাই। এদের সম্পর্ক আদা-কাচকলার চেয়েও খারাপ। দুই ভাইয়ের প্রত্যেকের ধারণা, অন্য ভাই মালির কাজ কিছুই জানে না।
পার্টি এখনো জমে নি। বন্ধুবান্ধবরা আসতে শুরু করেছে। এক কোনায় বিশাল ছাদের নিচে বার সাজানো হচ্ছে। ঢাকা ক্লাবের একজন বারটেন্ডার বারের দায়িত্বে। নীপার বাবা আবদুর রহমান সাহেব দুএকজন বন্ধু নিয়ে মেয়ের জন্মদিনের পার্টিতে সবসময় যোগ দেন এবং দরাজ গলায় বলেন, মা-মণিরা, তোমাদের যাদের বয়স আঠারোর ওপরে, তারা ইচ্ছা করলে বার সার্ভিস নিতে পার। এইসব বিষয়ে আমার কোনো প্রিজুডিস নেই। তবে সাবধান, সীমা লংঘন করবে না। You got to know your limit.
আবদুর রহমান কমার্শিয়েল জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন। অবসর নেওয়ার পর জাহাজ ব্যবসা শুরু করেন। এই মুহুর্তে দেশে এবং বিদেশে তাঁর কী পরিমাণ টাকা আছে তিনি নিজেও জানেন না।
দুই-তিন পেগ ব্লু লেবেল হুইস্কি খাওয়ার পর আবদুর রহমান দার্শনিকস্তরে পৌঁছে যান। তখন তিনি উচ্চশ্রেণীর বৈরাগ্য-বিষয়ক কথা বলতে পছন্দ করেন। মেয়ে এবং মেয়ের বন্ধুদের ডেকে বলেন, মা-মণিরা, কী বলছি মন দিয়ে শোনো। আমি যখন মাতৃগৰ্ভ থেকে পৃথিবীতে আসি, তখন আমার দুহাতে দুটা পঁচিশ টাকার বান্ডিল ছিল না। যখন মারা যাব, তোমরা আমাকে কবরে শোয়াবে, তখনো দুহাতে দুটা পাঁচশ টাকার বাণ্ডিল থাকবে না। জগৎ অনিত্য, এটা আমি বুঝেছি। আমি চাই তোমরাও সেটা বোঝার চেষ্টা করে।
পঞ্চম পেগ খাওয়ার পর তিনি তাঁর মৃত স্কুল-টিচার বাবার কথা মনে করে চোখের পানি ফেলতে শুরু করেন। আবেগ জর্জরিত গলায় বলেন, তিনি ছিলেন টুয়েন্টি ওয়ান ক্যারেট ম্যান। তার মধ্যে কোনো খাদ ছিল না। আমার পুরোটাই খাদ।
এই পর্যায়ে ছাদের মালি আনোয়ার-সানোয়ার তাঁকে ধরাধরি করে নিচে নিয়ে যায়।
নীপা তার শোবার ঘরে চুল ঠিক করছিল। যুথী বসেছে তার সামনে। নীপা রূপকথার বইয়ের বন্দিনী রাজকন্যাদের মতে রূপবতী। সে খানিকটা বোকা। তার প্রধান গুণ সে ভালো মেয়ে। তার মধ্যে ঘোরপ্যাচের কোনো ব্যাপার নেই। যুথী বলল, তোদের বাড়িতে কেন আসি জানিস?
নীপা বলল, নিমন্ত্ৰণ করি, সেইজন্যে আসিস।
তা-না। আমাকে অনেকেই নিমন্ত্রণ করে, আমি কোথাও যাই না। তোদের এখানে আসি তুলনা করতে।
কী তুলনা?
অর্থনৈতিক তুলনা। আচ্ছা আজ এই পার্টিতে খাবার আসবে কোত্থেকে?
কিছু আসবে হোটেল রেডিসন থেকে, কিছু আসবে সোনারগাঁ থেকে।
যুথী বলল, আমাদের বাড়িতে আজ দুপুরে কী রান্না হয়েছে শোন। তিতা করলা ভাজি, কচুর লতি দিয়ে চিংড়ি মাছ আর ডাল। রাতে করলা ভাজি বাদ। দুপুরের কচুর লতি ডাল থাকবে। বাড়তি আইটেম—জাম আলুর ভর্তা।
নীপা বলল, জাম আলুর ভর্তা তো খুবই ভালো খাবার।
যুথী বলল, বৎসরে একদিন খেলে খুবই ভালো খাবার। প্রতিদিন খেলে না।
নীপ বলল, তোর তো অনেক বুদ্ধি। আমাকে একটা পরামর্শ দে। সফিক ভাই বিষয়ে পরামর্শ। সফিক ভাই আমাকে মডেল করে ছবি আঁকতে চায়। রাজি হব?
তুই নেংটু হয়ে থাকবি, সফিক ভাই ছবি আঁকবেন—এরকম?
প্ৰায় সেরকম।
ভুলেও রাজি হবি না। বিয়ে হোক। বিয়ের পর যত ইচ্ছা ছবি আঁকবে, তার আগে না।
সফিক একজন শখের পেইন্টায়। পেইন্টিং-এ ফ্রান্সে তিন মাসের কী একটা কোর্সও করেছে। এমনিতে ব্যবসায়ী। চাকায় কয়েকটা গার্মেন্টস কারখানা আছে। খুলনায় চিংড়ির ঘের আছে। সফিক এমবিএ করেছে আমেরিকায়। নীপার সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা প্ৰায় পাকা। সফিকের বোনরা সব দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে আছে। তাদের সবাইকে একত্র করা যাচ্ছে না বলে বিয়ের তারিখ করা যাচ্ছে না।
যুথী বলল, সফিক ভাই কি চলে এসেছেন?
হুঁ। ছাদে বসে আছে। আজ ছাদে তার ছবির প্রদর্শনী হবে। পাঁচটা ছবি নিয়ে এসেছে। পর্দা দিয়ে ঢাকা আছে। কক্লিম অ্যাঙ্কেল ফিতা কেটে প্রদর্শনী উদ্বোধন করবেন। চল ছাদে যাই।
ছাদে উঠে যুথী হতভম্ব। এককোনায় চেয়ারে শুকনা মুখে শুভ্র বসে আছে। যুথী রাগী ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল। যুথীর সঙ্গে নীপাও এগোলো।
কী ব্যাপার! আপনি যান নি?
ট্যাক্সি ড্রাইভার আমাকে নেয় নি। নামিয়ে রেখে চলে গেছে।
ভাড়া না নিয়ে চলে গেছে?
এই বাড়ির একজন কে যেন ভাড়া দিয়েছেন।
তিনিই আমাকে বললেন, ছাদে চলে যেতে। কালো একজন মানুষ। রোগা লম্ব। চোখে চশমা।
যুথী বলল, আপনার বাসার টেলিফোন নাম্বার দিন। টেলিফোন করে দিচ্ছি, বাসা থেকে লোক এসে নিয়ে যাবে।
শুভ্র বলল, বাসার টেলিফোন নাম্বর আমার মনে নেই। আমার টেলিফোন নাম্বার মনে থাকে না।
নীপা বলল, সমস্যাটা কী?
যুথী বলল, সমস্যা টমস্যা এখন বলতে পারব না। এই লোক চশমা ছাড়া চোখে দেখে না। শাহবাগ থেকে আমি একে সঙ্গে নিয়ে ঘুরছি। তুই কি একে তার বাড়িতে পাঠাবার ব্যবস্থা করতে পারবি?
অবশ্যই পারব। ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলছি। আপনার নাম কী?
শুভ্ৰ।
শুনুন, আজ আমার জন্মদিন। জন্মদিন উপলক্ষে এখানে পার্টি হচ্ছে। আপনি ইচ্ছা করলে পার্টিতে জয়েন করতে পারেন। তবে গাড়ি রেডি আছে। এখনই যদি যেতে চান যেতে পারেন।
একটু চিন্তা করে তারপর বলি?
কোনো সমস্যা নেই। চিন্তা করে বলুন।
পার্টির লোকজন আসতে শুরু করেছে। নীপা ছাদের দরজার পাশে দাঁড়াল। যুথী অবাক হয়ে লক্ষ করল, তার বান্ধবীরা কেউ কথা রাখে নি। কারও হাতেই চকলেটের প্যাকেট এবং ফুল নেই। অতিথিরা চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে। সবাই কথা বলছে। সবার গলার স্বরই স্বাভাবিকের চেয়ে উঁচু। করিম আঙ্কেল চলে এসেছেন। মেয়েরা তাকে ঘিরে ভিড় করেছে। করিম আঙ্কেলের বয়স ষাট। তিনি বিপত্নীক। তিনি তার রূপবতী প্রাইভেট সেক্রেটারি যমুনাকে নিয়ে এসেছেন। যমুনার বয়স ২৩/২৪। সে ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ করেছে ইংল্যান্ডের এক ইউনিভার্সিটি থেকে। যমুনার সঙ্গে তিনি এখন লিভ টুগেদার করছেন। করিম আঙ্কেল অল্পবয়সী মেয়েদের সঙ্গ পছন্দ করেন। মেয়েরাও তার সঙ্গ পছন্দ করে।
নীপা ডায়াসে উঠে হাত নেড়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে হাসিমুখে বলল, সৌভাগ্যক্রমে আজ পূর্ণিমা। যারা চাঁদের আলোয় সুইমিংপুলে নামতে চাও তারা নামতে পার। আমি বেশ কয়েক সেট সুইমিং কষ্টিউম আনিয়ে রেখেছি। সুইমিংএর সময় ছাদের সব বাতি নিভিয়ে দেওয়া হবে। পুরুষরা কেউ সুইমিং করতে পারবে না। আমরা যখন সুইমিং করব, তখন পুরুষদের চলে যেতে হবে ছাদের দক্ষিণ দিকে। খাবার সেখানেই দেওয়া হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই চিত্রপ্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হবে।
করিম আঙ্কেল বললেন, নীপা! মা, তুমি তো অত্যন্ত গৰ্হিত কথা বলছি। তালেবান টাইপ কথা। তোমরা মেয়েরা জলকেলি করবে। আয় আমরা চোখ বন্ধ করে দক্ষিণের ছাদে বসে থাকব তা তো হবে না। আমরা পুরুষরা সুইমিংপুলের চারপাশে থাকব। তোমাদের উৎসাহ দেব। তোমরা ড়ুবর্সাতার দিবে, আমি হব। তার জাজ! নারীদের দৈহিক সৌন্দৰ্য স্থলে একরকম, জলে আরেক রকম। আজ শ্রেষ্ঠ জলনারী নির্বাচিত হবে। আমরা প্রত্যেকেই তার গায়ে জল ছিটিয়ে তাকে অভিনন্দন জানাব।
নীপা বলল, আঙ্কেল চুপ করুন তো। বার ওপেন হয়েছে। আপনি বরং বারে গিয়ে বসুন।
করিম আঙ্কেল বললেন, রাত আটটার আগে আমি মদ্যপান করি না। রাত আটটা থেকে সাড়ে নটা হলো আমার Time of intoxication. তবে আজ বিশেষ দিন হিসেবে নিয়মের ব্যতিক্রম করা যেতে পারে।
তিনিযমুনার হাত ধরে বারের দিকে এগুলেন। নিজের জন্যে এক পেগ রয়েল স্যালুট নিলেন। যমুনার জন্যে টাকিলা। সফিক এসে বলল, চিক্রপ্রদর্শনীর উদ্বোধন করে তারপর গ্লাস নিয়ে বসুন।
করিম আঙ্কেল বললেন, গ্লাসের সঙ্গে চিত্রকলার কোনো বিরোধ নেই। সফিক। চিত্রকলার গ্রান্ডমাস্টাররা সবাই পাড়ামাতাল ছিলেন। ভালো কথা, তোমার পেইন্টিং কি বিক্রি হবে?
সফিক বলল, বিক্রির কথা ভাবি নি। কেউ কিনতে চাইলে ভাববো।
তোমার ওখানে কি কোনো N**e ছবি আছে? যদি থাকে। আমি কিনব।
আছে?
भाँछि।
ভেরি গুড। পৃথিবীর সৌন্দর্য মাত্র দুটি জায়গায়। আলোছায়ার খেলাতে এবং নারীদেহে। কার কথা জানো?
মনে হচ্ছে। আপনার নিজের কথা।
না। Claude Monet এর কথা। তাঁর আঁকা N**e ছবি Olympia দেখার মতো চিত্রকর্ম। মনেটের ভাবশিষ্য আমেরিকান মহিলা পেইন্টার Mary Cassatt. ইম্প্রেশনিস্ট ধারার শিল্পী। তিনি কিন্তু কোনো N**e ছবি আঁকেন নি। মহিলা শিল্পীরা মনে হয় কোনো বিচিত্র কারণে তাঁদের শরীর নিয়ে বিব্রত থাকেন বলে শরীর আঁকেন না। যাই হোক, চলো চিত্ৰপ্ৰদৰ্শনীর উদ্বোধন করা যাক।
করিম আঙ্কেল চিত্ৰপ্ৰদৰ্শনীর উদ্বোধন করতে গিয়ে চিত্রকলার ইতিহাস বিষয়ে ছোট্ট ভাষণ দিলেন, ভাষণ শেষ হলো Cubism-এর ওপর।
Cubism শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন Louis Vauxcellos, যিনি জীবনে কখনো ছবি আঁকেন নি। তিনি একজন আর্ট ক্রিটিক মাত্র।—এই ছিল করিম আঙ্কেলের শেষ কথা। তিনি প্রদর্শনীর ছবিগুলির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বারে ফিরে গেলেন।
বারের পাশেই শুভ্র বসে আছে। তিনি শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বললেন, হ্যালো ইয়াং ম্যান! সবাই আগ্রহ করে ছবি দেখছে আর তুমি ঝিম ধরে বসে আছ, ব্যাপার কী?
শুভ্র বলল, আমি চশমা ছাড়া দূরের কিছু দেখি না। এইজন্যে বসে আছি। আপনার বক্তৃতা আগ্রহ করে শুনলাম। আপনি অনেক জানেন।
ইয়াং ম্যান! আমি অনেক বিষয় সম্পর্কেই জানি। তাতে কিছু যায় আসে না। মদ্যপানের অভ্যাস আছে?
জি-না।
বিয়ার খাও। বিয়ার মদের মধ্যে পড়ে না। অনেক দেশেই কুলকুচরি কাজে ব্যবহার করা হয়। দিতে বলব একটা আইসকোন্ড বিয়ার?
জি-না।
করিম আঙ্কেল নিজের গ্লাসের দিকে মনোযোগ দিলেন। সফিক এসে তার পাশে বসল। করিম আঙ্কেল বললেন, ড্রিংকস নেবো?
সফিক বলল, এখন না।
এখন না তো কখন? শিল্পী মানুষ, তোমরা তো এর ওপরই থাকবে।
আমার ছবি কেমন দেখলেন?
অনেষ্ট অপিনিয়ন চাও না-কি ডিসঅনেষ্ট অপিনিয়ন?
অনেষ্ট অপিনিয়ন।
ছবি কিছু হয় নি। দামি ক্যানভাস নষ্ট করেছ। রঙ নষ্ট করেছ। সবচেয়ে খারাপ এঁকেছ N**e ছবিটা। মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে সে দুৰ্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চল থেকে এসেছে। তার সারা শরীরে দুর্ভিক্ষের ছাপ। শুধু তার পশ্চাদ্ভাগ দুৰ্ভিক্ষমুক্ত। প্রোটিনের অভাবে রুগ্ন এক নারী বিশাল পাছা নিয়ে শুয়ে আছে। এইসব ছবি মডেল দেখে আঁকতে হয়।
মডেল পাওয়াই তো সমস্যা।
করিম আঙ্কেল বললেন, আমাকে বললেই আমি মডেল জোগাড় করে দেই। যমুনা মডেল হতে রাজি হবে। তার ফিগার পারফেক্ট না হলেও ভালো। যমুনা, তুমি কি রাজি হবে? মহান শিল্পের কারণে কিছুক্ষণের জন্যে বস্ত্ৰ বিসর্জন। ঘণ্টা দুয়েকের জন্যে দ্ৰৌপদী হবে। ভাববে তোমার বস্ত্ৰ হরণ হয়েছে।
যমুনা কিছু বলল না। টাকিলার গ্লাসে চুমুক দিল।
মেয়েরা কয়েকটা দলে ভাগ হয়েছে। তিনজনের একটা দল ছাদের এক কোনায় বসেছে। এই দলের প্রধানের নাম নামিরা। সে দুটা ইয়াবা ট্যাবলেট নিয়ে এসেছে। ইয়াবা নেশা করার পদ্ধতি শেখাচ্ছে। একজন বলল, আমি তো জানি গিলে খেতে হয়।
নামিরা বলল, গিলে খেতে চাইলে গিলে খা। আমি কী করছি আগে দেখ! এই ফয়েলে ট্যাবলেট রাখলাম। এখন লাইটার দিয়ে ফয়েলের নিচে আগুন দেব। ট্যাবলেট গরমে গলে যাবে। ধোঁয়া বের হবে। সেই ধোঁয়া নাকে টেনে নিতে হবে। ট্যাবলেট সবসময় নড়াচড়া করতে হবে। এক জায়গায় রাখা যাবে না।
ধোঁয়া নাকে নিলে কেমন লাগবে?
নিয়ে দেখ কেমন লাগে।
ভয় লাগছে তো।
নামিরা বলল, ভয় লাগলে নিবি না।
ট্যাবলেটের নিচে লাইটার দিয়ে আগুন দেওয়া হয়েছে। হালকা ধোঁয়া বের হচ্ছে। নামিরা বড় করে নিঃশ্বাস নিয়ে চাপা গলায় বলল, আহ।
করিম আঙ্কেল গ্লাস হাতে সুইমিংপুলের পাশে এসে বসলেন। যমুনা তাঁর সঙ্গে নেই। নীপা এবং তার বন্ধুরা করিম আঙ্কেলকে ঘিরে বসেছে। তিনি গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললেন, মানুষের দশটি প্রধান আনন্দ কী তোমরা জানো?
নীপা বলল, আমরা কিছুই জানি না। আপনি কী জানেন বলুন। করিম আঙ্কেল বললেন, আনন্দের তালিকায় প্রথমেই আছে sex। মুখ চাওয়া-চাওয়ি করার কিছু নেই। যেটা সত্য সেটা বলতেই হবে। এখন তোমরা বলো, দ্বিতীয় প্রধান আনন্দ কী?
নীপা বলল, গান শোনা?
করিম আঙ্কেল বললেন, হয় নি। দ্বিতীয় প্রধান আনন্দও হলো sex। তৃতীয়ও তাই। চতুর্থ হচ্ছে বন্ধুদের সঙ্গ। পঞ্চম হলো Food। ষষ্ঠ হলো Music। সপ্তম হলো দৃষ্টিনন্দন বস্তু। অষ্টম হলো Books।
নীপার বন্ধু জয়তী বলল, ভালোবাসা কি কোনো আনন্দের ব্যাপার না?
করিম আঙ্কেল জয়তীর দিকে তাকিয়ে বললেন, My dear child, ভালোবাসা বলে কিছু নেই। ভালোবাসা হচ্ছে এমন একটা শব্দ যা রাজশেখর বসু তাঁর চলন্তিকা ডিকশনারিতে ব্যবহার করেছেন। এর অর্থ তিনি লিখেছেন- প্রীতি করা, কাহারো প্রতি অনুরক্ত হওয়া, পছন্দ হওয়া। ডিকশনারির বাইরে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। তোমরা চাইলে প্রমাণ করে দিতে পারি।
প্ৰমাণ করুন।
একটি শর্তে প্ৰমাণ করব। তোমাদের সঙ্গে আমাকে জলে নামতে দিতে হবে। কি রাজি?
জয়িতা বলল, আমি রাজি। নীপা, তুই কী বলিস?
নীপা বলল, না।
যুথী শুভ্রর সামনে এসে দাঁড়াল। বিরক্ত গলায় বলল, আপনি এখনো বসে আছেন?
শুভ্ৰ বলল, বাসায় একা একা থাকি। কোথাও যাই না। আজ চারদিকে হৈচৈ আর আনন্দ দেখে খুব ভালো লাগছে।
যুথী বলল, আমি বাসায় চলে যাচ্ছি। আসুন আমার সঙ্গে। নীপার গাড়ি আমাকে প্রথমে নামাবে, তারপর আপনাকে নামাবে।
আপনি চলে যাচ্ছেন কেন?
বাসা থেকে টেলিফোন এসেছে, বাবার শরীর হঠাৎ খুব খারাপ করেছে। বুকে ব্যথা। কাজেই চলে যাচ্ছি।
শুভ্র বলল, শ্ৰেষ্ঠ জলনারী প্রতিযোগিতাটা করবেন না? আমার দেখার শখ ছিল কে হয় শ্রেষ্ঠ জলনারী। আমার ধারণা আপনি হতেন।
যুথী বলল, আপনাকে খুব কঠিন কিছু কথা বলার ইচ্ছা ছিল। বলছি না, কারণ আপনার সঙ্গে আমার দ্বিতীয়বার দেখা হবে না।
শুভ্র বলল, কিছু কঠিন কথা বলুন তো আমি শুনি। আপনার গলার স্বর খুব মিষ্টি তো। আমার জানার শখ মিষ্টি গলায় কঠিন কথা শুনতে কেমন লাগে।
যুথী বলল, আপনি নির্বোধ মানসিক প্রতিবন্ধী একজন মানুষ। গাধামানব সম্প্রদায়ের একজন। আপনার নিজের গাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আপনার তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নাই। আপনি অচেনা এক মেয়ের জন্মদিনের উৎসবে এসে বসে আছেন। শ্ৰেষ্ঠ জালনারী নির্বাচন দেখবেন। ছিঃ!
যুথীর বাবা আজহার ইস্টার্ন ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে কাজ করেন। ফিল্ড ইন্সপেক্টর। তিনি শোবার ঘরে খাটের ওপর বসা। তার মুখভর্তি পান। হাতে বিড়ি। খরচ কমানোর জন্যে ইদানীং বিড়ি খাওয়া ধরেছেন। তিনি মন দিয়ে টিভিতে একটা নাটক দেখছেন। এক পাগল পুকুরে বাস করে—এই হলো নাটকের কাহিনী। পাগলের কাণ্ডকারখানা দেখে তিনি যথেষ্টই মজা পাচ্ছেন। যুথীকে ঘরে ঢুকতে দেখে তিনি টিভি বন্ধ করে দিলেন। বড় মেয়েকে তিনি বেশ ভয় পান।
যুথী বলল, বাবা! তোমার না শরীর খারাপ?
আজহার বললেন, খারাপ ছিল। এখন ঠিক হয়েছে। হঠাৎ ব্যথা উঠল, ভাবলাম হার্টের কোনো সমস্যা বোধহয়। এখন বুঝছি হার্টের কিছু না। গ্যাস হয়েছিল। গ্যাস বেশি হলে ফুসফুসে চাপ দেয়, তখন ব্যথা হয়।
যুথী বলল, বাবা, তোমার কিছুই হয় নি। আমাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরানোর জন্যে এই কাজটা করেছ। আমি বারবার বলেছি, রাত এগারোটার মধ্যে ফিরব। নীপা গাড়ি দিয়ে নামিয়ে দিবে।
যুথীর মা সালমা বললেন, তোর বাবার সত্যি ব্যথা উঠেছিল। এমন ভয় লাগল। পাখা দিয়ে বাতাস করলাম অনেকক্ষণ। ইলেকট্রিসিটি ছিল না তো, এইজন্যে পাখা দিয়ে বাতাস।
যুথী বলল, পাখা কোথায় যে পাখা দিয়ে বাতাস? এই বাড়িতে তো কোনো পাখা নেই। কেন মিথ্যা কথা বলছি মা?
আজহার কথা ঘুরাবার জন্যে বললেন, মা, খেয়ে এসেছিস?
যুথী বলল, আটটার সময় কী খেয়ে আসব? খাবার দিবে। রাত দশটায়।
আজহার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, মেয়েকে একটা ডিম ভেজে ভাত দাও। পটলভাজি আছে না? পটলভাজি ভালো হয়েছে। মা যুথী, যাও খেয়ে আসো। পিতামাতা যদি ভুলও করে তারপরেও তাদের উপর রাগ করতে নাই। তবে বুকের ব্যথার ব্যাপারটা মিথ্যা না।
যুথী খেতে বসেছে। সালমা বললেন, তুই কি তোর বাবার মানিব্যাগ থেকে কোনো টাকা নিয়েছিস? পাঁচশ টাকার হিসাব মিলছে না।
যুথী বলল, মা, আমি আমার নিজের খরচ টিউশনির টাকায় করি। তোমাদের কাছ থেকে একটা পয়সা নেই না।
সালমা বললেন, তোর বাবার তো সব হিসাবের টাকা। হিসাব না করলে সংসারও চালাতে পারত না। একটা মানুষ হিসাব করতে করতে বুড়ো হয়ে গেল। তার কোনো শখ মিটাল না, আহাদ মিটাল না।
যুথী বলল, পুরনো ঘ্যানঘ্যাননি বন্ধ করো তো মা! বুদ্ধি হবার পর থেকে তোমার এই ঘ্যানঘ্যাননি শুনছি।
সালমা চুপ করে গেলেন।
রাত দশটায় টিফিন কেরিয়ার ভর্তি খাবার পাঠাল নীপা; আজহার দ্বিতীয়বার খেতে বসলেন। আনন্দে তার চোখমুখ ঝলমল করতে লাগল। তিনি কয়েকবার বললেন, টুনু বাড়িতে থাকলে মজা করে খেত। মিস করল। বিরাট মিস।
টুনু আজহারের বড় ছেলে। সে দেশের বাড়িতে গেছে ধান-চালের ভাগ আনতে।
স্বামীর সঙ্গে সালমাও খেতে বসেছেন। একটা খাবার মুখে দিয়ে বললেন, মাছ কিন্তু মিষ্টি মিষ্টি লাগছে।
আজহার বললেন, কথা না বলে আরাম করে খাও তো। হাই ক্লাস ফুড় মিষ্টি মিষ্টি হয়। লোয়ার লেবেল ফুড হয় ঝাল। এমন ঝাল যে মুখে দেওয়া যায় না। যুথী মা! সব কি ঘরের রান্না?
যুথী বলল, খাবার এসেছে হোটেল সোনারগাঁ আর হোটেল রেডিসন থেকে।
আজহার বললেন, বললাম না হাই ক্লাস ফুড! যুথী মা, তুইও বোস। মাংসের এই আইটেম অসাধারণ হয়েছে।
যুথী বলল, প্রতিটি কথার শুরুতে একবার করে যুথী মা বলবে না। শুধু যুথী ডাকবে।
আজহার বিস্মিত গলায় বললেন, নিজের মেয়েকে মা ডাকতে পারব না!
যুথী বলল, বাবা খাও তো। কথা বন্ধ।
যুথী বাবা-মার খাওয়া দেখছে। তাদের এক রাতে দ্বিতীয়বার খেতে বসা এবং আনন্দের সঙ্গে খাওয়ার দৃশ্য দেখে হঠাৎ তার চোখে পানি এসে গেল। চোখের পানি গোপন করার জন্যে উঠে নিজের ঘরে চলে গেল।
শুভ্র বাথরুম।
হাট শাওয়ার নিচ্ছে। তার মা রেহানা বাথরুমের বাইরে তোয়ালে নিয়ে অপেক্ষা করছেন। রাগে তাঁর শরীর জ্বলে যাচ্ছে। অনেক কষ্টে রাগ সামলে রেখেছেন। ছেলে নানান ঝামেলার ভেতর দিয়ে গিয়েছে। এখনো রাতের খাবার খায় নি। খাওয়া শেষ হোক। তাকে কঠিন কিছু কথা আজ রাতে শুনতেই হবে, তবে এখন না।
রাথরুমের দরজা সামান্য খোলা। শুভ্র কখনোই বাথরুমের দরজা বন্ধ করে না। ছোটবেলায় একবার বাথরুমের দরজা বন্ধ করে আর খুলতে পারে নি। দরজা ভেঙে তাকে উদ্ধার করা হয়। সেই থেকে তার ভেতর ভয় ঢুকে গেছে।
শুভ্ৰ, মাথায় শ্যাম্পু দিয়েছ?
হুঁ।
মাথায় গরম পানি দিয়ো না।
আচ্ছা।
যে মেয়েটা তোমাকে উদ্ধার করেছে তার নাম যেন কী? তুমি একবার বলেছ। আমি ভুলে গেছি।
যুথী।
মিডল ক্লাস ফ্যামিলি নেম।
নাম থেকে ক্লাস বোঝা যায় মা?
অবশ্যই বোঝা যায়। যুথী, বকুল, পারুল, এইসব ফুলের নামে নাম হয় লোয়ার মিডল ক্লাস ফ্যামিলিতে।
শুভ্ৰ কি খুব হাই ক্লাস নাম মা?
তোমার গায়ের রঙ দেখে তোমার নাম দিয়েছিলাম শুভ্ৰ।
ওরাও হয়তো তাই করেছে। ফুলের মতো স্বভাব দেখে ফুলের নামে নাম রেখেছে।
যুথী মেয়েটার স্বভাব ফুলের মতো?
উঁহু। খুব রাগী। আমাকে কঠিন গলায় গালি দিয়েছে! আমাকে বলেছে, মানসিক প্রতিবন্ধী, গাধামানব।
তুমি চুপ করে গালি শুনলে?
হ্যাঁ। আমি নিশ্চয়ই তাকে গালি দেব না। মা, মেয়েটার গলার স্বর অস্বাভাবিক মিষ্টি।
গলার স্বরের টক মিষ্টি বুঝা শিখলে কবে থেকে?
তুমি রাগ করছ না-কি মা?
তোমার খাটের ওপর টাওয়েল রাখলাম। আমি টেবিল সাজাতে বলছি। তুমি খাবার টেবিলে চলে এসো।
আচ্ছা।
শুভ্ৰর বাবা মেরাজউদ্দিন সাহেব খাবার টেবিলে ছেলের জন্যে অপেক্ষা করছেন। তার হাতে এই সংখ্যা National Geographic, গ্লোবাল ওয়ামিং-এর ওপর একটা লেখা ছাপা হয়েছে। মন দিয়ে পড়ছেন। শুভ্র ঘরে ঢুকতেই তিনি পত্রিকা বন্ধ করলেন এবং বললেন, সারা দিন তোমার ওপর দিয়ে অনেক ঝামেলা গিয়েছে শুনেছি। কীভাবে উদ্ধার পেয়েছ তাও শুনেছি। তোমাকে কিছু উপদেশ দেওয়া প্রয়োজন, তবে খাবার টেবিল উপদেশ দেওয়ার Forum না।
শুভ্র বলল, কেমন আছ বাবা?
মেরাজউদ্দিন বললেন, ভালো আছি। বেশির ভাগ সময় আমি ভালো থাকি। তোমার মা বেশির ভাগ সময় তোমার চিস্তায় অস্থির থাকেন। আজ তোমার কোনো খবর না পেয়ে তার প্রেসার নিচেরটা একশ দিশে চলে গিয়েছিল।
শুভ্ৰ বলল, বাবা! তোমার গাড়িটা ওরা পুড়িয়ে ফেলেছে। সরি ফর দ্যাট।
মেরাজউদ্দিন বললেন, সরি হবার কিছু নেই। গাড়ির সবরকম ইনস্যুরেন্স করা আছে। গাড়ির প্রসঙ্গ থাকুক। যে মেয়েটির জন্মদিনে অনিমন্ত্রিতভাবে ভাবে উপস্থিত হয়েছিলে, তাকে আ ভোরবেলা একটি উপহার পাঠাবে। আর যে মেয়েটি তোমাকে সাহায্য করেছে, তাকেও একটা উপহার পাঠাবে।
শুভ্ৰ প্লেটে খাবার নিতে নিতে বলল, এটা তো বাবা সম্ভব হবে না। বাসায় ফেরার সময় গাড়িতে বসে ছিলাম। বড় গাড়ি, যুথীদের বাড়ির গলিতে ঢোকেনি। ওদের বাড়িটা চিনি না।
যে বাড়ি থেকে গাড়িটা এসেছে সে বাড়িটা চিনবে না?
না।
মেরাজউদ্দিন খাবার মুখে দিতে দিতে বললেন, তারপরেও মেয়ে দুটির ঠিকানা বের করা সম্ভব।
রেহানা বললেন, কীভাবে সম্ভব?
মেরাজউদ্দিন বললেন, মাতা-পুত্র দুজনে মিলে চিন্তা করো কীভাবে সম্ভব?
রেহানা বললেন, শুভ্ৰ যদি কিছু মনে করতে না পারে এবং মেয়ে দুটির টেলিফোন নাম্বার যদি তার কাছে না থাকে তাহলে কোনোভাবেই সম্ভব না। শুভ্ৰ, তোমার কাছে কি ওদের টেলিফোন নাম্বার আছে?
না।
মেরাজউদ্দিন বললেন, শুভ্ৰকে নিয়ে গাড়ি যখন আমার বাড়ির গেট দিয়ে ঢুকেছে তখনি সিসি টিভিতে ছবি উঠেছে। কাজেই গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নাম্বার আমাদের জানা। এছাড়াও গেটের দারোয়ানদের বলা আছে, যে গাড়িই ঢুকবে তার রেজিস্ট্রেশন নাম্বার তারা লিখে রাখবে।
শুভ্র বলল, বাবা, তোমার অনেক বুদ্ধি।
মেরাজউদ্দিন বললেন, তোমারও অনেক বুদ্ধি। তবে তুমি বুদ্ধি ব্যবহার করো না। ব্যবহার না করলে বুদ্ধি কিন্তু নষ্ট হয়ে যায়। তোমাকে যদি একমাস ঘন অন্ধকার একটা ঘরে আটকে রাখা হয়, একবারও যদি সেই ঘরে আলো জ্বালা না হয়, তাহলে একমাস পর দেখা যাবে তুমি চোখে কিছু দেখছি না। তুমি পুরোপুরি অন্ধ হয়ে গেছে। এটা বৈজ্ঞানিক সত্য। গল্পগাথা না। ব্রিটিশ আমলে অনেক রাজবন্দিকে অন্ধকূপে মাসের পর মাস রাখা হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। এরকম একজন অন্ধ রাজনীতিবিদের কথা ভাসানী যখন ইউরোপে বইটিতে আছে। বইটির লেখকের নাম খোন্দকার ইলিয়াস।
রেহানা বললেন, বক্তৃতা বন্ধ করো। খাওয়ার সময় এত বক্তৃতা ভালো লাগে না। কাঁচা কাঁঠাল দিয়ে গরুর মাংসের এই তরকারিটা কেমন হয়েছে বলো?
ভালো।
নতুন বাবুর্চি রোধেছে। তার প্রবেশন পিরিয়ড যাচ্ছে। আগামী একমাস সে যদি ভালো রাঁধতে পারে, তাহলে চাকরি পার্মানেন্ট হবে। কাজেই এখন থেকে আগামী একমাস রাতের খাবারের পর কোন আইটেম কেমন হয়েছে আমাকে বলবে। এক থেকে দশের ভেতর নাম্বার দেবে। কাঁঠাল-গরু মাংস—কত দিচ্ছ?
ছয়।
শুভ্ৰ, তুমি কত দিবে?
আমিও ছয়। বাবা যা নাম্বার দিবে। আমিও তাই দিব। কারণ বাবা হচ্ছে আমার Idol.
মেরাজউদ্দিন কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই কাজের বুয়া রহিমা হাসিমুখে খাবার ঘরে ঢুকে বলল, আম্মা, ভাইজানরে টিভিতে দেখাইতেছে।
মেরাজউদ্দিন স্ত্রীর সঙ্গে চোখাচোখি করলেন। হাসপাতাল, থানা কোথাও যখন শুভ্রর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন রেহানা টিভি চ্যানেলগুলিতে শুভ্রর ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। শুভ্র ফিরে আসার উত্তেজনায় বিজ্ঞাপন বন্ধের কথা ভুলে গেছেন।
আজহার অফিসে যান নি। গতকাল রাতে দুবার খাওয়ায় শরীর বিগড়ে গেছে। ঘনঘন বাথরুমে যেতে হচ্ছে। অ্যাসিডিটিতে বুক জ্বলে যাচ্ছে। দুধ খেলে অ্যাসিডিটির আরাম হয়। যুথী মোড়ের দোকান থেকে এক প্যাকেট মিল্কভিটা নিয়ে এসেছে। তিনি পুরোটা খেয়ে কিছুক্ষণ আগে বমি করেছেন। বমির পর মাথা ঘুরছে। এই উপসৰ্গ দুধ খাওয়ার আগে ছিল না। আজহার যুথীকে বললেন, আমি তো মনে হয় মারা যাচ্ছিরে মা।
যুথী বাইরে যাবে। শাড়ির কুচি ঠিক করতে করতে নির্বিকার গলায় বলল, এত সহজে কেউ মারা যায় না। বাবা।
আজহার বললেন, মানুষ সহজেই মারা যায়। আলেকজান্ডারের মতো মহাবীর ইলিশ মাছ খেয়ে মারা গেছে। কাল রাতে তোর বান্ধবীর বাড়ি থেকে যে খাবার এসেছে, সেখানে ইলিশ মাছের আইটেম ছিল। স্মোকড় হিলসা। আমি ঐ আইটেমটাই বেশি খেয়েছি।
মহাবীর আলেকজান্ডারের ইলিশ মাছ খেয়ে মৃত্যুর গল্প আজহার তাঁর বস ইমতিয়োজ সাহেবের কাছে শুনেছেন। ইমতিয়োজ সাহেব সুন্দর সুন্দর গল্প করেন। তাঁর সব গল্পই আজহার সুযোগমতো ব্যবহার করেন।
যুথী বলল, বেশি খেলেও তুমি মরবে না। বাবা। কারণ তুমি মহাবীর আলেকজান্ডার না। তুমি কাপুরুষদের একজন।
সালমা মাছ কুটছিলেন। মাছ ফেলে উঠে এসে বললেন, এইসব কী ধরনের কথা? বাজারের নটিরাও তো বাপের সঙ্গে এইভাবে কথা বলে না।
যুথী বলল, বাজারের নটিদের বাবারা নটিদের সঙ্গে বাস করে না। কাজেই নটিরা এ ধরনের কথা বলে না।
আজহার বললেন, বাদ দাও। কথা চালাচালি বন্ধ। তুই যাচ্ছিস কোথায়?
চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছি।
কিসের চাকরি? কী ইন্টারভিউ? আমি তো কিছুই জানি না।
সবকিছু তোমাকে জানতে হবে?
অবশ্যই। আমি এই সংসারের প্রধান। আমাকে সবকিছু জানতে হবে। তোর মা দুপুরে কী রাধবে তাও আমি জানব।
তোমার সবকিছু জানার দরকার নেই।
আজহার মেয়েকে কঠিন কিছু কথা বলার প্রস্তুতি নিলেন। কথাগুলি বলতে পারলেন না। তাকে অতি দ্রুত বাথরুমে ঢুকতে হলো। যুথী তার মাকে বলল, মা যাই। দোয়া করো যেন চাকরিটা হয়।
সালমা বললেন, কিসের চাকরি?
যুথী বলল, এখনো জানি না কিসের চাকরি। বেতন অনেক। কুড়ি হাজার টাকা। কোম্পানির গাড়ি এসে নিয়ে যাবে, দিয়ে যাবে।
বলিস কী!
যাই মা।
মাকে কদমবুসি করে দোয়া নিবি না?
হলো না-কদম বুসি মাঠে মারা গেল। এটা তো ঠিক না।
যুথী বের হয়ে গেল। বাথরুম থেকে আজহার ডাকছেন, যুথী, পাঁচটা মিনিট অপেক্ষা কর। জাস্ট ফাইভ মিনিটস।
যুথী চলে যাবার আধঘণ্টার মধ্যে গিফটয়্যাপে মোড়া বিশাল প্যাকেট এসে উপস্থিত। সঙ্গে মুখবন্ধ খাম। খামের ওপর লেখা মিস যুথী।
আজহার খাম হাতে নিয়ে বললেন, একটা ধারালো ব্লেড আনো। চিঠিতে কী লেখা দেখি।
সালমা বললেন, যুথীর চিঠি তুমি পড়লে ও খুব রাগ করবে।
রাগ করলেও চিঠি পড়তে হবে। কোথায় কী চিঠি চালাচালি হচ্ছে জানতে হবে না? তাছাড়া যুথী কিছু জানতে পারবে না। খাম এমনভাবে খুলব যে ডিটেকটিভ। শার্লক হোমস সাহেবও ধরতে পারবেন না। চুলায় পানি দিয়ে কেতলি বসাও।
কেন?
আজহার বললেন, কেতলির মুখ দিয়ে ষ্টিম বের হবে। খামটা স্টিমে ধরলে পাম নরম হবে। তখন ব্লেড় দিয়ে খুলব। চিঠি পড়া শেষ হলে আগের মতো লাগিয়ে রাখা হবে। ক্লিয়ার?
আজহার চিঠি খুলে পড়লেন। চিঠিতে লেখা——
যুথী,
আমার ছেলে শুভ্ৰ বিপদে পড়েছিল। তাকে তুমি সাহায্য করেছি। তার জন্যে তোমাকে ধন্যবাদ। সামান্য কিছু ফল পাঠালাম। গ্রহণ করলে খুশি হব।
ইতি
শুভ্রর মা।
আজহার বললেন, শুভ্ৰটা কে?
সালমা বললেন, জানি না কে।
তুমি তার মা। তুমি কিছুই জানো না?
আমাকে না বললে জানব কীভাবে?
তুমি অতি মুর্থ একজন মহিলা। মূর্থিশ্রেষ্ঠ। মেয়ের সঙ্গে মায়ের থাকবে সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক। যেন মেয়ে পেটে কথা রাখতে না পারে। রাতে এক বিছানায় মা-মেয়ে শোবে। মেয়ে গুনগুন করে সব কথা বলবে। তুমি সময়মতো আমাকে জানাবে। তা-না, সন্ধ্যা হতেই ঘুম। বুদ্ধির কোনো নাড়াচাড়া আমি তোমার মধ্যে দেখলাম না। অপদার্থ মেয়েছেলে!
গা

13/07/2020

দ্বিতীয় পর্ব
# শুভ্র_গেছে_বনে - হুমায়ূন আহমেদ
আজ জুলাই মাসের এক তারিখ, সোমবার।
যুথীর অফিসে জয়েন করার তারিখ। সে হাতে যোলদিন সময় পেয়েছিল। এই ষোলদিনে সে অনেকগুলি কাজ করেছে। New Age computer নামের এক প্রতিষ্ঠানে এক হাজার টাকা দিয়ে নাম লিখিয়েছে। সপ্তাহে তিন দিন সন্ধ্যা সাতটা থেকে নয়টা পর্যন্ত ক্লাশ। তারা ছয় মাসে নাকি কম্পিউটারে ওস্তাদ বানিয়ে দেবে। নিউ এজ কম্পিউটারের মালিক আব্দুস সোবাহান কোরানে হাফেজ। তিনি বললেন, মা শুনেন। কম্পিউটার হলো মানব সস্তানের মতো। তার যত্ন করবেন। তাকে আদর করবেন। সে আদরের কাঙাল। শিশুদের যেমন পোষ মানাতে হয়, তাকেও পোষ মানাতে হবে। তারপর তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে কাজ আদায় করতে হবে।
হাফেজ সাহেবের কথাবার্তা যুথীর পছন্দ হলো। সে একদিন ক্লাশ করেছে। তার কাছে মনে হয়েছে, হাফেজ সাহেব শিক্ষক হিসেবে ভালো।
সে একজন গানের টিচারের সাথেও কথা বলেছে। তার নাম অশোক মিত্ৰ। তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে গান শেখান। তবলা সঙ্গে নিয়ে যান বলে ছাত্রের বড়িতে তবলা না থাকলেও সমস্যা নাই। অশোক বাবু মাসে এক হাজার টাকা নেবেন এবং সপ্তাহে একদিন শুক্রবার গান শেখাবেন এমন কথা হয়েছে। যুথীর গান শেখা এখনো শুরু হয় নি।
যুথী চারটা ছেলেমেয়েকে পড়াত। এদের প্রত্যেককে এক প্যাকেট চকলেট দিয়ে বিদায় নিল। চাকরির প্রথম বেতনের টাকা পেয়ে সে তাদের সবাইকে নিয়ে পিৎজাহাটে খাবে, এই কথা বলে এল।
চাকরিতে জয়েন করতে যাবার আগে বাবা-মাকে পা ছুঁয়ে সালাম করল। আজহার বললেন, সোনার হরিণ সহজে ধরা যায় না। তোর ওপর ময়মুরুব্বির দোয়া আছে বলে ধরে ফেলেছিস। চেষ্টা করবি যেন হরিণ ছুটে না যায়।
যুথীর মা শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করলেন। আজহার বললেন, শুভযাত্রার সময় চোখের পানি ফেলছি। মূর্খামীর সীমা থাকা দরকার। কাঁদতে হয় বাথরুমে দরজা বন্ধ করে ভেউ ভেউ করে।
টুনু ট্যাক্সি ক্যাব ভাড়া করে এনেছে। প্রথমদিন ভাড়া ট্যাক্সিতে করে যুথী যাচ্ছে। আজ অফিস শেষে অফিসের গাড়ি বাসা চিনে যাবে, তখন অফিসের গাড়িতেই আসা-যাওয়া হবে! টুনু বলল, আমি তোর সঙ্গে যাই। অফিসটা দেখে আসি।
যুথী বলল, ভাইয়া আজ না। আরেক দিন। আজ আমার খুব লজ্জা লাগছে।
অফিসে পা দেওয়া মাত্র বড় সাহেব ডেকে পাঠালেন; আজ তাঁর সামনে কোনো গল্পের বই নেই। চোখে চশমা। ওইদিন চোখে চশমা ছিল না। হালকা সবুজ রঙের শার্টে তাকে আগের দিনের চেয়েও সুন্দর লাগছে।
যুথী আপনার নাম?
জি।
ভালো আছেন?
জি স্যার ভালো আছি।
জয়েন করতে এসেছেন?
জি।
আমাদের কিছু সমস্যা হয়েছে। আপনাকে নিতে পারছি না। অ্যািপয়েন্টমেন্ট লেটারে উল্লেখ করা আছে, কোনো কারণ দর্শানো ছাড়া আমরা অ্যাপিয়েন্টমেন্ট লেটার বাতিল করতে পারি। আপনার বায়োডটা আলাদা রেখে দিতে বলেছি। কোনো স্কোপ হলে আপনাকে খবর দেব। বুঝতে পারছি আপনাকে অসুবিধায় ফেলেছি। সরি ফর দ্যাট।
বড় সাহেব ড্রয়ার খুলে কাগজপত্র বের করে পড়তে শুরু করলেন। হঠাৎ তাকে অনেক ব্যস্ত মনে হলো।
যুথী বড় সাহেবের ঘর থেকে বের হলো। তার উচিত মাথা নিচু করে কেউ কিছু বুঝতে পারার আগেই অফিস থেকে বের হয়ে যাওয়া। কেন জানি এই কাজটা সে করতে পারছে না। তার ইচ্ছা করছে। সারা দিন অফিসে বসে থাকতে। অফিস ক্যানটিনে চা খেতে। জহির সাহেবকে খুঁজে বের করে তার সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করতে।
জহিরকে দেখা গেল। সে চট করে চোখ সরিয়ে নিয়ে করিডরের দিকে চলে যাচ্ছিল। যুথী গলা উঁচিয়ে ডাকল, জহির সাহেব!
জহির দাঁড়াল। যুথী তার কাছে এগিয়ে গেল। সহজ গলায় বলল, কেমন আছেন?
জহির বলল, জ্বি ভালো।
মনে হচ্ছে আপনি আমাকে চিনতে পারেন নি। আমার নাম যুথী।
আমি আপনাকে চিনেছি।
আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। নিশ্চয়ই শুনেছেন?
জি আমি জানি।
আমার পোষ্টে কি কাউকে নেওয়া হয়েছে?
আগে যিনি ছিলেন তিনি জয়েন করেছেন।
যুথী বলল, প্রচণ্ড রাগ লাগছে। কী করা যায় বলুন তো? বড় সাহেবের অফিসঘরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া তো সম্ভব না।
আমার রুমে কিছুক্ষণ বসবেন?
আপনার কি ধারণা আপনার ঘরে কিছুক্ষণ বসলে আমার রাগ কমবে?
এক কাপ চা খান!
থ্যাংক য়্যু। আরেকদিন এসে চ খেয়ে যাব।
আপনাকে এক মাসের বেতন দেওয়ার কথা। এই বিষয়ে কি বড় সাহেবের সঙ্গে কথা বলবেন?
না! চলুন আপনার ঘরে বসি, এক কাপ চা খাই। গফুর ভালো চা বানায়। ওকে বলুন আমাকে এক কাপ চা দিতে।
চা খেতে খেতে যুথী বলল, এই মুহুর্তে অপমানটা আমার গায়ে লাগছে না। কিন্তু বাসায় যখন ফিরুব, সবাই জানবে, তখন অপমানটা গায়ে লাগবে। অভাবী। সংসার তো। কুড়ি হাজার টাকা বেতনের চাকরি অনেক বড় ব্যাপার। সোনার হরিণের চেয়েও বেশি। প্লাটিনাম হরিণ।
জহির বলল, মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলবেন? ঠিকানা দেব?
যুথী দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, না। আমি আরেক কাপ চা খাব।
দুকাপ চা পুরোপুরি শেষ করে যুথী উঠল। সে ঠিক করুল আজ সন্ধ্যার আগে বাসায় ফিরবে না। সারাদিন পথে পথে ঘুরবে। পার্কে বসে বাদাম খাবে। হাফ প্লেট চটপটি খাবে।
গফুরকে দশ টাকা বখশিশ দিয়ে যুথী বের হলো। গফুর অত্যন্ত বিরক্ত হলো। এত কম বখশিশ মনে হয় তাকে এর আগে কেউ দেয় নি।
নিউ এজ কম্পিউটারে একবার যেতে হবে। টাকাটা ফেরত পাওয়া যায় কি না সেই চেষ্টা। মনে হয় না ফেরত পাওয়া যাবে; গানের টিচার বাতিল করতে হবে। পুরনো টিউশনি ফেরত পাওয়া যায় কি না সেই চেষ্টাও করতে হবে। আজ একদিনে তার অনেক কাজ।
অনেকক্ষণ ধরে কে যেন বেল টিপছে। বাসায় সালমা ছাড়া কেউ নেই। ঠিকা কাজের মেয়ে কাজ শেষ করে চলে গেছে। সম্ভবত টুনু এসেছে। সালমা দরজা খুললেন। অপরিচিত একটা মেয়ে। ষোল-সতেরোর বেশি বয়স হবে না। চামড়ার একটা সুটকেস আর কাধে ঝোলানো ব্যাগ নিয়ে ভীতমুখে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা সুন্দর। যে-কোনো কারণেই হোক ভয়ে তার চোখমুখ শুকিয়ে আছে। মনে হয় অনেকক্ষণ কেঁদেছে। চোখ ফোলা এবং লাল। মেয়েটা শাড়ি পরে এসেছে। শাড়ি খানিকটা এলোমেলো। মনে হয় শাড়ি পরায় সে অভ্যস্থ না।
সালমা বললেন, কী চাও?
মেয়েটা বলল, ও নাই?
সালমা বললেন, ওটা কে?
টুনু ভাই।
টুনু ভাইয়ের সঙ্গে তোমার কী?
দরকার আছে।
মেয়েটা ফুঁপিয়ে উঠল। সালমা বললেন, আমি টুনুর মা। টুনুর সঙ্গে তোমার কী দরকার?
আমাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। আমার কোথাও যাবার জায়গা নাই।
সালমা বললেন, টুনু তোমাকে জায়গা দিবে কী জন্যে? টুলুর সঙ্গে তোমার কী?
ওর সঙ্গে আমার কোর্টে বিয়ে হয়েছে। আগস্ট মাসের সাত তারিখ।
কী বলছ পাগলের মতো! নাম কী তোমার?
লাইলি। আমি কি আপনাকে কদমবুসি করব?
আসো ভিতরে। টুনু আসুক। তখন ফয়সালা হবে।
সালমার হাত-পা কাঁপতে লাগল। এইসব তিনি কী শুনছেন?
বাসা থেকে তোমাকে কে বের করে দিয়েছে? তোমার বাবা-মা?
না, আমার মামা। আমার বাবা-মা দুজনই মারা গেছেন। আমি মামার সঙ্গে থাকি। আমি এক গ্ৰাস পানি খাব।
সালমা পানি এনে দিলেন। এবং মোবাইল টেলিফোনে আজহারকে ঘটনা জানালেন।
আজহার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, মেয়ের পাছায় কষে একটা লাথি দিয়ে বাসা থেকে বের করে দাও। টুনু হারামজাদা বাসায় ফিরুক, আমি তাকে লাথি দিয়ে বের করব। লাইলি-মজনু খেলা আমার বাড়ির বাইরে হবে। আমি এক্ষুনি রওনা হচ্ছি। বাসায় এসে যেন মেয়েকে না দেখি। যদি দেখি তাহলে তোমাকে বের করে দেব।
সালমা বসার ঘরে ঢুকলেন। বেতের চেয়ারে মেয়েটা বসে আছে। তার ভাবভঙ্গি মোটেই ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। লাইলি বলল, আমি আরেক গ্লাস পানি খাব।
সালমা বললেন, যত ইচ্ছা পানি খাও, তারপর বাসা থেকে চলে যাও। টুনুর বাবা আসছেন। উনি ভয়ঙ্কর রাগী মানুষ। কী করে বসেন তার নাই ঠিক।
লাইলি বলল, আমি কোথায় যাব?
সেটা তো আমি জানি না। বিয়ে করার সময় তো আমাকে জিজ্ঞেস করে বিয়ে করোনি।
ও না আসা পর্যন্ত আমি যাব না। আমার কোথাও যাবার জায়গা নেই।
টুনুর বাবা এলে কী হবে তুমি কল্পনাও করতে পারছি না।
আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে টুনু ভাইয়ের জন্যে অপেক্ষা করি?
যা ইচ্ছা করো। শুধু ঘরে থাকবে না।
সুটকেস এবং ব্যাগটা এখানে থাকুক?
কোনো কিছুই থাকবে না।
ঘণ্টাখানিকের মধ্যে আজহার উপস্থিত হলেন। রাগে তাঁর মুখ গনগন করছে। বুকে ব্যথা শুরু হয়ে গেছে। টুনুর গলা টিপে ধরতে পারলে শান্তি পেতেন। টুনুর খোঁজ নেই।
আজহার বললেন, ঘরের স্টিলের ডান্ডাওয়ালা একটা ছাতা আছে না? ছাতা বের করে রাখে। ঐ ডান্ডা আজ তোমার ছেলের পিঠে ভাঙিব। তারপর কানে ধরে বহিষ্কার। আমার ঘাড়ে চেপে বসে থাকার দিন তার শেষ। এখন সে চরে খাবে।
সালমা বললেন, একগ্লাস লেবুর শরবত করে দেব? খুব ঘামছ।
দাও লেবুর শরবত। শরীরে বল করি। মেয়েটাকে দেখলাম। ইঁদুরের মতো মুখ।
সালমা বললেন, ইঁদুরের মতো মুখ তো না। সুন্দর চেহারা।
তাহলে কি দেবীর মতো মুখ? তুমিও কি তোমার ছেলের মতো দেবীদর্শন করে ফেললে? ঘরে বসে থেকে কী করবে! যাও দেবীর আশেপাশে ঘোরাঘুরি করো।
তুমি কি খেয়ে এসেছ?
না।
আবার অফিসে যাবে?
বাসায় যে অবস্থা, অফিসে কী যাব!
গোসল করে আসো। ভাত খাও। শুয়ে কিছুক্ষণ রেস্ট নাও।
আর রেস্ট! আমার জীবন থেকে রেস্ট উঠে গেছে।
সালমা বললেন, যুথীকে কি খবরটা জানাব?
আজহার বললেন, না। প্রথম চাকরিতে জয়েন করেছে। এখন তাকে ডিসটার্ব করা যাবে না।
আজহার সদর দরজার দিকে এগুলেন। সালমা বললেন, কোথায় যাও?
আজহার বললেন, আরেকবার দেবীদর্শন করে আসি।
সালমা ক্ষীণ গলায় বললেন, মেয়েটাকে বাসায় নিয়ে আসো। সারা দিন নিশ্চয়ই না খেয়ে আছে।
আজহার বললেন, আরেকবার এই ধরনের কথা বললে তোমাকেও ছাতাপিটা করব। মাতাপুত্র একসঙ্গে ছাতার নিচে।
লাইলি আগের জায়গাতেই আছে। আগে দাঁড়িয়ে ছিল, এখন স্যুটকেসের ওপর বসে আছে। শাড়ির আঁচলে তার মুখ ঢাকা। মাঝে মাঝে শরীর কেঁপে উঠছে। বলে বোঝা যাচ্ছে সে কাঁদছে। তাকে ঘিরে আছে চার-পাঁচজন কৌতূহলী মানুষ। তাদেরকে দেখে মনে হচ্ছে দৃশ্যটা দেখে তারা আনন্দ পাচ্ছে।
আজহার ফিরে এসে গোসল করলেন। ভাত খেলেন। বিছানায় শুয়ে পর পর দুটা বিড়ি টেনে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন। তাঁর ঘুম ভাঙল সন্ধ্যাবেলায়। টুনু তখনো ফেরে নি। তিনি মেয়েটির খোঁজ নিতে গেলেন। মেয়েটি নেই।
রেহানা শুভ্ৰকে নিয়ে বারান্দায় বসেছেন। ছেলের সঙ্গে কীভাবে কথা শুরু করবেন। বুঝতে পারছেন না। কখনো তার এরকম হয় না। শুভ্ৰ যে এরকম একটা কাণ্ড করতে পারে তা তার মাথাতেই কখনো আসে নি। শুভ্রর বাবার সঙ্গে কথা বলা যাচ্ছে না। তিনি জাপানে। চার দিন পর ফিরবেন।
রেহানা বললেন, শুভ্ৰ, তুমি অচেনা অজানা একটা মেয়ে নিয়ে বাসায় উপস্থিত হয়েছ?
শুভ্র বলল, মেয়েটার যে অবস্থা মা, যে-কেউ তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যেত। পুরো ঘটনোটা বলি, আগে শোনো। বলব?
রেহানা হ্যাঁ না কিছু বললেন না। শুভ্ৰ নিজে থেকেই শুরু করল। যুথী আজ সন্ধ্যায় তাদের বাসায় আমাকে চা খেতে বলেছে। টেলিফোনে বলে নি, চিরকুট পাঠিয়েছে। আমি তার বাসার কাছে গিয়ে দেখি একটা মেয়ে সুটকেসের ওপর এলিয়ে পড়ে আছে। প্রায় অচেতন অবস্থা। তাকে ঘিরে নানান ধরনের মানুষের জটিল।
রেহানা বললেন, ভিড় ঠেলে তুমি ভেতরে ঢুকলে এবং মহান ত্ৰাণকৰ্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে। মেয়েটাকে পাজাকোলা করে গাড়িতে তুলে বাসায় নিয়ে এলে?
শুভ্র বলল, পাজাকোলা করে আনতে হয় নি মা। আমি যখন বললাম, আপনি কি আমার সঙ্গে আমার বাড়িতে যাবেন? সে সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। চারপাশের লোকগুলি এমন অদ্ভুত, ওরা হাততালি দেওয়া শুরু করল।
রেহানা বললেন, ওরা হয়তো ভেবেছে বাংলা ছবির কোনো দৃশ্যের শুটিং হচ্ছে। সেরকম ভাবাই স্বাভাবিক। দর্শকদের মধ্যে আমি থাকলে আমিও হাততালি দিতাম। যাই হোক, আমি ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলেছি। মেয়েটিকে যেখান থেকে আনা হয়েছে ড্রাইভার তাকে সেখানে রেখে আসবে।
শুভ্ৰ বলল, মা, মেয়েটি ভয়ঙ্কর বিপদে পড়েছে। বিপদ কেটে গেলে সে নিজের জায়গায় ফিরে যাবে।
রেহানা বললেন, বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মেয়ে ভয়ঙ্কর বিপদে আছে। তাদের সবাইকে তুমি এখানে নিয়ে আসবে?
শুভ্ৰ বলল, বাংলাদেশের সব বিপদগ্ৰস্ত মেয়েকে আমি চিনি না মা। একে চিনি।
একেও তুমি চেনো না। হঠাৎ দেখেছ, তুলে নিয়ে এসেছ।
শুভ্ৰ বলল, আমি তাকে নিয়ে এসেছি, এখন আমি তাকে বলব চলে যেতে?
রেহানা বললেন, তোমাকে কিছুই বলতে হবে না। যা বলার আমি বলব। তুমি তোমার ঘরে চলে যাও। গান শোনো কিংবা টিভি দেখো। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক-এর নতুন কপি আজ দুপুরেই এসেছে। সেটাও পড়তে পার।
শুভ্র বলল, মা শোনো। তুমি যদি সত্যি সত্যি মেয়েটাকে বাসা থেকে বের করে দাও, আমিও কিন্তু বের হয়ে যাব।
বের হয়ে যাবে?
হ্যাঁ।
কোথায় যাবে?
তা জানি না, কিন্তু বের হয়ে যাব।
রেহানা বারান্দা থেকে উঠে নিজের ঘরে ঢুকলেন। টেলিফোনে সব ঘটনা শুভ্রর বাবকে জানালেন।
মেরাজউদ্দিন বললেন, মেয়েটাকে এই মুহূর্তে বের করে দাও। তোমার ছেলে যদি বের হয়ে যায় তাহলে যাবে। ঢাকা শহর হলো ভয়াবহ অরণ্য। অরণ্যে বাস করার যোগ্যতা তার নেই। সে ফিরে আসবে। শিক্ষাসফর শেষ করে ফিরবে। এটাই লাভ। কোনো টাকা পয়সা সে যেন সঙ্গে না নেয় এটা খেয়াল রাখবে।
রাত আটটায় রেহানা শুভ্রকে এবং মেয়েটাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলছেন।
শুভ্র বলল, মা আমি যাচ্ছি, কিন্তু তুমি আমার ওপর রাগ করে থেকে না। রাগ করার মতো কিছু করি নি। মেয়েটাকে দেখে খুবই কষ্ট লেগেছিল। আমরা তো বিচ্ছিন্ন কেউ না। সবাই সবার সঙ্গে যুক্ত। আমরা বৃহৎ মানবগোষ্ঠীর অংশ। একই Species, হোমোসেপিয়ানস।
রেহানা বললেন, বক্তৃতা দিয়ে না। তোমার বক্তৃতা শোনার মতো মনের অবস্থা আমার না। ড্রাইভারকে বলো কোথায় তোমাদের নামিয়ে দিতে হবে, সে নামিয়ে দিয়ে চলে আসবে।
ড্রাইভার লাগবে না। মা, যাই। তোমাকে বিরাট একটা সমস্যায় ফেলেছি, সরি।
রেহানা বললেন, তোমার সঙ্গে কি মানিব্যাগ আছে?
শুভ্ৰ বলল, আছে!
রেহানা কঠিন গলায় বললেন, মানিব্যাগ রেখে যাও।
রাস্তায় নেমেই লাইলি বলল, এতক্ষণ খুব ভয় লাগছিল। এখন কোনো ভয় লাগছে। বরং মজা লাগছে।
শুভ্র বলল, মজা লাগছে?
হুঁ। খুব ক্ষিধে লেগেছে। সকালে দুটা রুটি আর আলুভাজি খেয়েছি। সারা দিন কিছু খাই নি। ঐ দোকানে গরম গরম সিঙ্গারা ভাজছে! আসুন সিঙ্গারা খাই।
শুভ্র বলল, তোমার কাছে কি টাকা আছে? আমার কাছে কোনো টাকা নেই।
আমার কাছে সাতশ পঁচিশ টাকা আছে; পাশের বিরিয়ানি হাউসে যাবেন? বিরিয়ানি খাবেন?
তোমার খেতে ইচ্ছা করলে চলে যাই। তবে আমি কিছু খাব না।
আমার এখন এই অবস্থা পৃথিবীর সব কিছু খেয়ে ফেলতে ইচ্ছা করছে। আমার সবচেয়ে পছন্দের খাবার কী জানেন? মাছ মাংস কিছু না। রসুনের ভর্তা। রসুন পুড়িয়ে শুকনা মরিচ দিয়ে ভর্তাটা বানানো হয়। আমার এখন রসুনভার্তা দিয়ে ভাত খেতে ইচ্ছা করছে।
যুথী রাত আটটায় প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে বাসায় ফিরেছে।
আজহার বাসার সামনের বারান্দায় টুল পেতে উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, তোকে না। অফিসের গাড়ি নামিয়ে দেবে! রিকশায় করে এসেছিস কেন?
যুথী বলল, অফিসের গাড়ির চাকা পাংচার হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে আমার নিজের চাকরিও পাংচার।
আজহার বললেন, তার মানে কী?
এখন মানে টানে বলতে পারব না; আমার মাথায় পানি ঢালতে হবে, প্ৰচণ্ড জ্বর।
জ্বর হলো কেন?
যুথী বলল, ভাইরাসঘটিত জ্বর না বাবা, চাকরি পাংচার হবার কারণে জ্বর।
সালমা মেয়ের কপালে হাত দিয়ে চমকে উঠলেন। ভীত গলায় বললেন, তোর গা তো পুড়ে যাচ্ছে রে!
যুথী বলল, পুড়ে যাওয়াই ভালো। গা পুড়ে কয়লা হয়ে যাবে। সেই কয়লা দিয়ে আগুন করে তোমরা চা খাবে। এবং গীত গাইবে—
পুড়ল কন্যা উড়ল ছাই
তবেই কন্যার গীত গাই।
আজহার বললেন, জ্বর মেয়ের মাথায় উঠে গেছে। বাথরুমে নিয়ে যাও, ননষ্টপা মাথায় পানি ঢালতে থাকে। মেয়েকে শক্ত করে ধরে। মাথা এলিয়ে পড়ে যাচ্ছে তো। আমি ডাক্তার নিয়ে আসি।
মাথায় পানি ঢালতে ঢালতেই দিনে বাসায় যে নাটক হয়েছে সালমা মেয়েকে জানালেন। যুথী বলল, বড় ধরনের অন্যায় করেছ মা। কতটা সমস্যায় পড়লে একটা মেয়ে সুটকেস হাতে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে উপস্থিত হয় এটা বুঝতে পারছ না?
সালমা বললেন, টুনু কত বড় অন্যায় করেছে এটা বুঝতে পারছিস না? সে বাপের ঘাড়ে বসে খাচ্ছে। আয় নাই, রোজগার নাই, এরমধ্যে গোপনে বিয়েও করেছে।
যুথী বলল, ভাইয়া ভুল করা বা অন্যায় করার মতো মানুষ না। খুব যারা ভালো মানুষ, যেমন আমি, আমরা হলাম গিনি সোনা। গিনি সোনা কী জানো?
গিনি সোনা হলো বাইশ ভাগ সোনা দুভাগ তামা। আর ভাইয়ার পুরোটাই সোনা।
সালমা বললেন, আমি কী?
যুথী বলল, তুমি হলে গিনির উল্টা—নিগি। বাইশ ভাগ তামা আর দুভাগ সোনা।
তোর বাবা কী?
বাবার মধ্যে সোনার কোনো কারবার নেই, উনার সবটাই তামা।
আজহার ডাক্তার নিয়ে এসেছেন। থার্মোমিটারে জ্বর পাওয়া গেল একশ তিন। ডাক্তার প্যারাসিটামল এবং ঘুমের ওষুধ দিল। ভিজিট নিল না। সে এবছরই ইন্টার্নি পাশ করে তাজ ফার্মেসিতে বসা শুরু করেছে। সে ঘোষণা দিয়েছে প্রথম তিনমাস কোনো ভিজিট নেবে না; আজহারের গোপন ইচ্ছা তার সঙ্গে যুথীর বিয়ে হোক। ডাক্তারের চেহারা সুন্দর। সে তার নিজের লাল রঙের একটা গাড়ি চালিয়ে ফার্মেসিতে আসে। ডাক্তারের নামটাও আজহারের পছন্দ। ভারিক্কি নাম-আমিরুল ইসলাম চৌধুরী। পুরুষের তিন শব্দের ভালো নাম আজহারের অত্যন্ত পছন্দ।
যেসব ডাক্তার ভিজিট নেয় না। তারা রোগীর বাড়িতে চা-বিসকিট খায়, কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে। এই ডাক্তার সেরকম না। প্রেসক্রিপশন লিখেই সে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে হকে বলল, আপনার বান্ধবী নীপা আমার খালা হন। দূরসম্পর্কের খালা।
যুথী সঙ্গে সঙ্গে বলল, তাহলে আপনি অবশ্যই আমাকে খালা ডাকবেন।
আজহার বিরক্ত গলায় বললেন, এইসব কী ধরনের কথা? ডাক্তার সাহেব, কিছু মনে করবেন না। জ্বর মাথায় উঠে যাওয়ায় যুথী আবোলতাবোল বকছে।
ডাক্তার বলল, যুথী খালার কথায় আমি কিছুই মনে করছি না।
শুভ্ৰ লাইলিকে নিয়ে গেছে নীপাদের বাড়িতে। ঘটনা শুনে নীপা বলেছে—একটা মেয়ে বিপদে পড়েছে, সে যতদিন ইচ্ছা আমার এখানে থাকবে। দুটা গেস্টরুম খালি পড়ে আছে, কোনো সমস্যা নেই। যুথীর সঙ্গে কথা বলে আমিই সমস্যার সমাধান করে দেব। আপনি এটা নিয়ে আর ভাববেন না। আপনি বাড়িতে চলে যান। গাড়ি দিচ্ছি। গাড়ি আপনাকে নামিয়ে দেবে।
শুভ্ৰ বলল, গাড়ি লাগবে না; আমি হেঁটে হেঁটে যাব। আকাশে মেঘ জমেছে। বৃষ্টি হবে। আমি বৃষ্টিতে ভিজব। অনেকদিন বৃষ্টিতে ভিজি না।
রাত বাজে বারোটা। আজহার এখনো স্টিলের ছাতা হাতে বারান্দায় বসে আছেন। টুনুর প্রতীক্ষা। তার দেখা নেই। সে মনে হয়। ঘটনা আঁচ করতে পেরে পালিয়ে গেছে। যুথী মরার মতো ঘুমাচ্ছে। সালমা মেয়ের পাশে জেগে বসে আছেন। লাইলি মেয়েটা কোথায় আছে। এই নিয়ে হঠাৎ দুশ্চিন্তা শুরু করেছেন। পুরো বিষয়টা ভুলে থাকতে চেষ্টা করছেন। পারছেন না। তাঁর মন বলছে টুনু মেয়েটাকে বিয়ে করে নি। হয়তো ভাব হয়েছে। এই মেয়ের সঙ্গে টুনুর ভাব কীভাবে হলো সেও এক রহস্য।
লাইলি দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল করেছে। নীপার দেওয়া নাইটি পরেছে। পোশাকটা অশ্লীল ধরনের। লাইলির লজ্জা লাগছে, আবার ভালোও লাগছে।
নীপা বলল, এসো ছবি দেখি। বাড়িতে হোম থিয়েটার আছে। হোম থিয়েটারে ছবি দেখতে অন্যরকম মজা। বাবা যখন বাড়িতে থাকেন, তখন আমরা দুজনে মিলে হোম থিয়েটারে ছবি দেখি।
লাইলি বলল, হোম থিয়েটার কী?
হোম থিয়েটার হলো মিনি সিনেমাহল। Sixty two inches, টিভিতে ছবি দেখা। চারদিকে সাউন্ড বক্স দেওয়া। বসার সিটিগুলিও সিনেমা হলের সিটের মতো। একসঙ্গে বিশজন মিলে সিনেমা দেখার ব্যবস্থা। ভয়ের ছবি দেখবে?
দেখক।
সাইনিং ছবিটা দেখেছ? স্ট্যানলি কুব্রিকের?
চমৎকার ছবি। আমি একবার দেখেছি। আরেকবার দেখতে কোনো সমস্যা নাই।
আপনার বাবা কোথায় থাকেন?
উনি জাহাজে জাহাজে থাকেন। আর আমার মা বাবার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর প্রেমে পড়ে তার সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছেন। আমি উনাকে ডাকতাম মজুচাচা। খুব মজা করতেন, এইজন্যে মজুচাচা। মা এখন মজুচাচার সঙ্গে অস্ট্রেলিয়াতে থাকেন। মায়ের একটা ছেলে হয়েছে। ছেলের নাম মা আমাকে রাখতে বলেছিলেন। আমি রেখেছি। তার নাম দিয়েছি বন্ধু! নামটা সুন্দর না?
লাইলি তাকিয়ে আছে। নীপা নামের মেয়েটা কত সহজেই না নিজের কথা বলে যাচ্ছে। সে কি কোনোদিন এভাবে কথা বলতে পারবে? বিশাল যারা বড়লোক তারা মনে হয়। এভাবেই কথা বলে। আর যারা তার মামার মতো অভাবী মানুষ, তাদের কথাগুলিও হয় অভাবী।
শুভ্ৰ সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে সিমেন্টের বেঞ্চে বসে আছে। জায়গাটা অন্ধকার না। স্ট্রীট ল্যাম্পের আলো আছে। বসে থাকতে শুভ্ৰয় খারাপ লাগছে না। কিছুক্ষণ আগে একপশলা বৃষ্টি হয়েছে। শুভ্রর শার্ট ভিজেছে। বাতাসে ভেজা শার্ট থেকে ঠান্ডা গায়ে লাগছে। গা কেঁপে উঠছে। তার কাছে মনে হচ্ছে সে অতিরিক্ত ঠান্ডা কোনো এসি ঘরে বসে আছে। তার বাবার অনেকগুলি অফিসের একটা এরকম ঠান্ডা। চিকেন ফেদার কোম্পানির এমডির অফিস।
চিকেন ফেদার নামটাও শুভ্রর দেওয়া। এবং কাগজেকলমে শুভ্ৰ সেই অফিসের এমডি; যদিও মাত্র দুবার সেই অফিসে গিয়েছে।
শুভ্ৰ হঠাৎ একটু নড়েচড়ে বসল। তার বেঞ্চের এক কোনায় অল্পবয়েসী। একটা মেয়ে এসে বসেছে; বাচ্চা মেয়ে। পনেরো-ষোল বছরের বেশি বয়স হবে। না। মেয়েটা এত রাতে পার্কে কী করছে কে জানে! তবে মেয়েটা বেশ সহজস্বাভাবিক। তার সঙ্গে লাল রঙের ভ্যানিটিব্যােগ। সে ব্যাগ খুলে একটা লিপষ্টিক বের করল। আয়না বের করল। এখন সে আয়োজন করে ঠোঁটে লিপষ্টিক দিচ্ছে। এত রাতে মেয়েটা সাজগোজ শুরু করেছে কেন কে জানে! শুভ্র আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। এখন সে কপালে একটা লাল রঙের টিপ দিয়ে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, ভাইজান দেখেন তো টিপটা মাঝখানে পড়ছে?
শুভ্ৰ বলল, হ্যাঁ।
মেয়েটা শুভ্রর দিকে পুরোপুরি ফিরে বলল, এই পরথম টিপ মাঝখানে পড়ছে। সবসময় আমার টিপ হয় ডাইনে বেশি যায়, নয় বাঁয়ে বেশি যায়। এর ফলাফল খুব খারাপ। ফলাফল কী জানেন?
না।
ফলাফল সতিনের সংসার।
শুভ্র বলল, এত রাতে তুমি এখানে কী করছ?
মেয়েটা অবাক হয়ে বলল, এত রাইতে এইখানে কী করি আপনে বুঝেন না?
শুভ্র বলল, না। তবে তোমার উচিত বাসায় চলে যাওয়া। ঢাকা শহরে অনেক দুষ্টলোক থাকে। তুমি যদি চাও আমি তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিতে পারি।
মেয়েটা বলল, আমার চড়নদার লাগে না। আপনে পার্কে আসছেন কী জন্যে? মেয়েমানুষের সন্ধানে আসেন নাই?
শুভ্ৰ অবাক হয়ে বলল, মেয়েমানুষের সন্ধানে কেন আসব? আমার মা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। কাজেই আমি পার্কে বসে আছি।
মেয়েটি বলল, আমারও আপনার মতো অবস্থা। আমার বাবা-মাও আমারে বাইর কইরা দিছে। বলছে, রোজগার কইরা খা। আমি রোজগারে বাইর হইছি। এখন বুঝেছেন?
শুভ্র বলল, না। তোমার নাম কী?
ফুলকুমারী।
বাহ, নামটা তো খুব সুন্দর।
ব্যবসার জন্যে এই নাম নিছি। আসল নাম মর্জিনা।
শুভ্ৰ বলল, তোমার কিসের ব্যবসা?
মর্জিনা বলল, কিসের ব্যবসা আপনার না জানলেও চলবে। খাওয়াদাওয়া করেছেন?
দুপুরে খেয়েছি। রাতে কিছু খাই নি।
ক্ষিধা লাগছে?
হ্যাঁ। মানিব্যাগ রেখে এসেছি তো। ক্ষিধে লাগলেও কিছু খেতে পারব না।
চলেন আমার সাথে।
শুভ্ৰ বলল, কোথায় যাব?
মর্জিনা বলল, আপনারে খানা খাওয়াব। খাবেন গরিবি খানা?
খাব।
বাপজান রান্ধে। সে ভালো বাবুর্চি। আগে রিকশা চালাইত। ঠ্যাং কাটা পড়ায় ঘরেই থাকে। আমার জন্যে রান্ধে। তার হাতের পাক খাসির মাংস যদি খান জীবনে ভুলবেন না। আপনার নাম কী?
শুভ্র।
দুজন হাঁটছে। শুভ্র যাচ্ছে মেয়েটার পেছনে পেছনে। তার যে এতটা ক্ষিধে লেগেছে তা সে বুঝতে পারে নি।
মর্জিনা বলল, আপনার সাথে আমি ভাই পাতাইলাম। ঠিক আছে?
শুভ্র বলল, অবশ্যই ঠিক আছে। এবং আমার ধারণা তুমি খুবই ভালো একটা মেয়ে। অচেনা একজনকে ভাত খাওয়ানোর জন্যে নিয়ে যাচ্ছ।
অচেনা হবেন কী জন্যে? আপনার সাথে ভাই পাতাইলাম না? আমার কী ধারণা জানেন, বাসায় গিয়া দেখব বাপজান খাসি পাকাইছে। খাসি আর পোলাও।
এরকম ধারণা হলো কেন?
মর্জিনা বলল, আল্লাপাক মানুষ বুইঝা রিজিক বাটে। আপনেরো খাইতে নিতেছি—এইটাও আল্লাপাকের ইশারা।
তুমি খুব আল্লাহভক্ত মেয়ে?
জি ভাইজান।
তোমার বাসা কোথায়?
প্রায় চইলা আসছি। আমরা পাইপের ভিতর থাকি। তিনটা পাইপ ভাড়া নিছি। একটাত বাপজান থাকে, একটাত আমি, আরেকটা থাকে খালি। তয়। বিছানা পাতা আছে। শীতলপার্টি আছে, কোলবালিশ আছে, হাতপাখা আছে।
শুভ্র বলল, পাইপের বাসা ব্যাপারটা কী?
গেলেই দেখবেন। বড় বড় পাইপের ভিতর সংসার।
মর্জিনার বাবা ইয়াকুব সত্যি সত্যি খাসির মাংস এবং পোলাও রান্না করেছে। মর্জিনা শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, ভাইজান, আমার কথা সত্য হইছে?
শুভ্ৰ বলল, হয়েছে। মর্জিনা বলল, আরাম কইরা খান। খায়া পাইপের ভিতর ঘুম দেন। ঝুম বৃষ্টি নামব। দেহেন আসমানের অবস্থা।
খেতে খেতে শুভ্ৰ ইয়াকুবকে বলল, আপনার রান্না অসাধারণ। খাসির মাংসের এই স্বাদ অনেকদিন আমার মুখে লেগে থাকবে। আপনি একটা রেস্টুরেন্ট দেন না কেন?
ইয়াকুব বলল, বাবা, টাকা থাকলে রেস্টুরেন্ট দিতাম। মূল জিনিসই নাই। মূল ছাড়া বিদ্যা কাজে লাগে না। তবে বাবা, একসময় আমার টাকা ছিল। পদ্মার ধারে টিনের ঘর ছিল। দুইটা গাভি ছিল। নৌকা ছিল। ধানী জমি ছিল কুড়ি বিঘা। বসতবাড়িতে আমগাছ ছিল এগারোটা, কাঁঠাল গাছ দশটা, গাব গাছ ছিল তিনটা। জাম্বুরা গাছ নয়টা…
মর্জিনা বলল, বাপজান, গাছের হিসাব বন্ধ করো।
ইয়াকুব বলল, গাছের হিসাব দিতে ভালো লাগে। মনে হয় এখনো সব আছে।
শুভ্র বলল, আপনার ঘরবাড়ি কোথায় গেছে?
পদ্মায় ভাইঙা নিয়া গেছে। তবে এখন খবর পাইছি বিরাট চর জাগছে। যাদের ঘর ভাঙছে, সরকার তারারে চরে জমি দিতেছে। ইচ্ছা করে একবার চেষ্টা নেই। আগের জমির দলিল সবই আমার কাছে আছে।
শুভ্র বলল, চেষ্টা নিতে সমস্যা কী?
মর্জিনা বলল, একটাই সমস্যা। আমরা গরিব। চরের দখল কোনোদিন গরিবে পায় না। এই আলোচনা বাদ। ভাইজান, পান খাইবেন?
শুভ্র বলল, পান আমি খাই না, কিন্তু আজ খাব।
হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামল। পান মুখে দিয়ে শুভ্ৰ পাইপের বিছানায় ঘুমুতে গেল। মর্জিনা মাথার কাছে কুপি এবং ম্যাচ রেখে বলল, ভাই পাতাইলে ভাইরে কিছু দিতে হয়। ধরেন ভাইজান, বিশটা টাকা রাখেন।
শুভ্র বলল, থ্যাংক য়্যু।
সে আগ্রহ করে টাকাটা নিল। পাইপের বিছানায় রাতে তার খুব ভালো ঘুম হলো।
সকাল এগারোটা। চিকেন ফেদার-এর হেড অফিসে হঠাৎ করেই তুমুল ব্যস্ততা। এমডি সাহেব এসেছেন। তাঁর ঘরের তালা খুলে দেওয়া হয়েছে! ইলেকট্রিসিটি নেই বলে এসি চালু করা যাচ্ছে না। জরুরি ভিত্তিতে জেনারেটার দিয়ে এমডি সাহেবের এসি চালু করা হয়েছে।
চিকেন ফেদারের জেনারেল ম্যানেজার আহসান টেবিলের স্মাওনে দাঁড়িয়ে আছেন। এমডি সাহেবের অনুমতি ছাড়াই তিনি বসবেন কি বসবেন না। এই সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। তাকে খুবই চিন্তিত দেখাচ্ছে।
শুভ্ৰ বলল, বসুন। দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
আহসান বসলেন।
শুভ্র বলল, মনে হয় আজ সন্ধ্যায় বাবার জাপান থেকে ফেরার কথা।
আহসান বিস্মিত হয়ে বললেন, উনি তো গতকাল ফিরেছেন! স্যার আপনি জানেন না?
শুভ্ৰ বলল, আমি বাড়িতে ছিলাম না। আমার এক বোনের সঙ্গে ছিলাম। বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ নেই। যাই হোক, আমার কিছু টাকা দরকার। কীভাবে পাব?
টাকার পরিমাণ কত স্যার?
দুলাখ হলেই চলবে।
আহসান বললেন, একটা ক্লিপ দিয়ে ক্যাশিয়ারের কাছ থেকে নিয়ে নিতে পারেন। কিংবা চেক কাটতে পারেন। আপনার ড্রয়ারে চেক বই আছে। চেক কাটলে একটু সময় লাগবে।
শুভ্ৰ স্লিপ লিখে টাকা নিল।
আহসান বললেন, চা খাবেন স্যার?
শুভ্ৰ বলল, চা খাব। চা দিতে বলুন। আমি দুটা চিঠি লিখে দিচ্ছি। একটা যাবে আমার মার কাছে। আরেকটা যাবে একটা মেয়ের কাছে। তার ঠিকানা জানি না, তবে বাসা চিনি। আমার গাড়ির ড্রাইভার তার বাসা চেনে। তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন।
আহসান বলল, অবশ্যই নিয়ে যাব। স্যার, আপনার বোনের বাসা কোথায়?
ও বস্তিতে থাকে। ঠিক বস্তিও বলা যাবে না। পাইপের ভেতর সংসার। জায়গাটা কটাবনের আশেপাশে। রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজের গুদামঘরের বাউন্ডারির ভেতর।
আহসান বলল, স্যার, আমি খুবই কনফিউজড বোধ করছি।
শুভ্র বলল, কনফিউজড় হবার কিছু নেই। অনেকেই এ ধরনের বাড়িতে থাকে। ফুটপাতে থাকার চেয়ে ভালো।
স্যার, আপনি কি বড় সাহেবের সঙ্গে কথা বলবেন? আমি লাইন করে দেব?
শুভ্র বলল, বাবার সঙ্গে এখন কথা বলব না। চা খেয়ে বিদায় হব।
কোথায় যাবেন?
কিছু বইপত্র কিনব।
স্যার, বইয়ের লিষ্ট দিয়ে দিন, আমি কিনে নিয়ে আসছি।
আমি নিজে দেখেশুনে কিনব।
আহসান বিব্রত গলায় বলল, স্যার, আপনার বোনের নামটা কি জানতে পারি?
শুভ্র বলল, অবশ্যই পারেন। ওর আসল নাম মর্জিনা। তবে ওকে সবাই ফুলকুমারী নামে চেনে। ওর বাবার নাম ইসহাক। আগে রিকশা চালাতেন। ট্রাকের ধাক্কায় পা কাটা পড়েছে। এখন পাইপেই বেশির ভাগ সময় থাকেন। উনার রান্নার হাত খুবই ভালো।
আহসান হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে এক্ষুনি তার বড় সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করা দরকার। সেটাও করা সম্ভব হচ্ছে না। এমডি সাহেব সামনে বসে আছেন।
শুভ্ৰ চা খেয়ে টাকা নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
আহসান বলল, স্যার, আমি কি আপনার সঙ্গে আসব?
শুভ্ৰ বলল, না।
আপনি তো গাড়ি আনেন নি। অফিসের গাড়ি দিয়ে দেই?
শুভ্র বলল, না। রিকশায় করে ঘুরতে আমার চমৎকার লাগে।
শুভ্রর লেখা চিঠিটা রেহানা এই নিয়ে চারবার পড়লেন। পঞ্চমবার পড়তে যাচ্ছেন তখন মেরাজউদ্দিন বললেন, দেখি কী লিখেছে। রেহানা স্বামীর হাতে চিঠি দিয়ে চোখ মুছলেন। শুভ্র চলে যাবার পর থেকে একটু পর পর তাঁর চোখে পানি আসছে।
শুভ্র লিখেছে—
মা,
কাল রাতে তোমাকে স্বপ্নে দেখেছি। স্বপ্নটা বেশ মজার। আমি চশমা হারিয়ে ফেলেছি। আর তুমি বলছি, কান্না বন্ধ করো। একটা স্পেয়ার চশমা সবসময় তোমার ড্রয়ারে থাকে। তুমি কি ড্রয়ার খুলে দেখেছ?
আমি ড্রয়ার খুললাম। দেখি ড্রয়ারে শুধু আমার মানিব্যাগটা আছে। আমি মানিব্যাগ খুলে দেখি মানিব্যাগের ভেতর আমার চশমা।
স্বপ্নে অনেক অদ্ভুত ব্যাপার হয় মা। মানিব্যাগের ভেতর টাকার বদলে চশমা পাওয়া যায়। তবে স্বপ্ন যত অদ্ভুতই হোক তার ব্যাখ্যা থাকে। চশমা ছাড়া আমি আচল, কাজেই যে-কোনো দুঃস্বপ্নে আমি চশমা দেখব। এটাই স্বাভাবিক।
টাকা পয়সার হঠাৎ অভাবে ঝামেলায় পড়েছিলাম বলে মানিব্যাগ স্বপ্নে দেখেছি।
মা শোনো। আমি চিকেন ফেদার অফিসের ক্যাশিয়ারের কাছ থেকে দুলক্ষ টাকা স্লিপ কেটে নিয়েছি। বাবা ঘটনাটা জানলে হয়তো মনে কষ্ট পাবেন। বাবা আমার আইডল। আমি কোনো অবস্থাতেই বাবাকে কষ্ট দিতে চাই না। মা, তুমি তোমার কাছ থেকে দুলক্ষ টাকা অফিসে জমা দিয়ে দিয়ে। আমি ভালো আছি। বেশ ভালো আছি। তুমি এবং বাবা তোমাদের দুজনের ধারণা আমি তোমাদের প্রটেকশন ছাড়া অচল। ধারণা মিথ্যা।
মা শোনো। ঐদিন একটা অসহায় মেয়েকে তুমি সাহায্য করো নি। আমার খুব মন খারাপ হয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই আমি জেনে এসেছি, তুমি এবং বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ। এর ব্যতিক্রম যখনই দেখি তখন অস্থির লাগে।
মা, তুমি ভালো থেকে এবং আমার ওপর রাগ করো না। কেউ আমার ওপর রাগ করে থাকলে আমার কেমন জানি লাগে। নিজেকে তখন ক্ষুদ্র এবং তুচ্ছ মনে হয়।
ইতি
শুভ্র
মেরাজউদ্দিন বললেন, রেহানা, তুমি upset হয়ে না। সবকিছু কনট্রোলের ভেতর চলে আসবে। আমাদের হিসেবে সামান্য ভুল হয়েছে। ভুল হবেই। ভুল থেকে আমরা শিখব। আহসান কি এসেছে?
হ্যাঁ, ড্রয়িং রুমে বসে আছে।
ওকে ডাকো। ওর সামনে এমন কিছু করবে না যাতে অস্থিরতা প্রকাশ পায়। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতি অস্থির হলে সেই অস্থিরতা সৈন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
রেহানা বললেন, আমরা কি যুদ্ধে নেমেছি?
প্রচুর বিত্ত মানেই যুদ্ধ। বিত্ত সামলানোর যুদ্ধ। বিত্ত বাড়ানোর যুদ্ধ।
মেরাজউদ্দিন এবং রেহানা খাবার টেবিলে বসে ছিলেন। আহসানকে ভীত এবং সংকুচিত ভঙ্গিতে তাদের সঙ্গে বসতে হলো। মেরাজউদ্দিন বললেন, আহসান, কেমন আছ?
আহসান বলল, স্যার ভালো আছি।
আজ আমার বাড়িতে কেক কাটার মতো একটা আনন্দময় ঘটনা ঘটেছে। এই বিষয়ে কি কিছু জানো?
জানি না স্যার।
শুভ্রর M.Sc. পরীক্ষার রেজাল্ট হয়েছে। ও রেকর্ড নাম্বার পেয়ে প্রথমশ্রেণীতে প্রথম হয়েছে। সে যে KNS তা জানো?
জানি না। স্যার। KNS কী?
কালিনারায়ণ স্কলার। যাই হোক, চিকেন ফেদার অফিসে এই উপলক্ষে তোমরা একটা কেক কাটবো।
অবশ্যই স্যার।
মেরাজউদ্দিন আহসানের দিকে সামান্য ঝুঁকে এসে বললেন, এডোলোসেন্স পিরিয়ড ১৯ বছরেই শেষ হবার কথা। অনেকের হয় না। শুভ্রর হয় নি। হয় নি বলেই সে পাইপের ভেতর বাস করার অদ্ভুত কাণ্ড করছে। তার বিষয় হচ্ছে Physics, প

Want your business to be the top-listed Government Service in Sylhet?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Category

Website

Address


Sylhet