05/09/2026
স্মৃতির সরণিতে অমর প্রাপ্তি:-
গভীর রাত। চালকুমড়োর মাচায় জোনাকিদের লুকোচুরি খেলা থামেনি এখনো। বাঁশবাগানের মাথার ওপর দিয়ে একফালি চাঁদ উঁকি মারছে। সেই মায়াবী চাঁদের আলো জানালার গরাদ গলে এসে পড়েছে রামানুজ বাবুর পুরনো কাঠের টেবিলটার ওপর। সেখানে রাখা আছে তাঁর একসময়ের প্রিয় ছাত্র অনিকেতের জেতা একটা পুরনো মেডেল, আর তার সেই জরাজীর্ণ কবিতার খাতাটা।
আজকালকার দিনে শিক্ষার আঙিনায় যেখানে কেবলই অর্থের ঝনঝনানি, শিক্ষক আর ছাত্রের সম্পর্কটা যেখানে নিতান্তই বাজারের কেনাবেচার মতো রুক্ষ, রামানুজ বাবুদের সময়টা কিন্তু এমন ছিল না। তখন স্কুল মানে ছিল এক ছায়াসুনিবিড় তপোবন। সেই গভীর মমতার টানেই আজ মধ্যরাতে বৃদ্ধ মাস্টারের চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। বড় অকালে হারিয়ে যাওয়া অনিকেত আর তার বন্ধুদের সেই সোনালি কৈশোরের স্মৃতি আজ বড় বেশি করে মনে পড়ছে।
সেই হারানো বসন্ত আর কালভার্টে ছাত্রদের আড্ডা আর দূর থেকে স্কুলের কোন শিক্ষককে আসতে দেখলেই পড়িমরি করে ছুটে পালানো!
রামানুজ বাবুর চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ওঠে নব্বইয়ের দশকের সেই পুরনো দিনগুলো। অনিকেতদের রেজাল্ট খারাপ হওয়ার পেছনে আজকের মতো ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা নেটফ্লিক্সের কোনো হাত ছিল না। জীবনের প্রথম অগোছালো প্রেমই সে দায়িত্ব পরম যত্নে কাঁধে তুলে নিয়েছিল। আর বাকি যে পাঁচ শতাংশ ফাঁকিবাজি, তার রসদ জোগাত আসানসোল-রানিগঞ্জ অঞ্চলের সুভাষ, গোধূলি আর মনোজ সিনেমা হলগুলি।
টিউশন থেকে ফেরার পথে সাইকেলের চেন পড়ে গেলে সবার মিলে কালিমাখা হাতে সেটা ঠিক করা, মোড়ের মাথায় কালভার্টের ওপর বসে বন্ধুদের সেই অন্তহীন আড্ডা, কিংবা একটা হাফ-কাটিং চা আর বাদলের সিঙ্গারা সবার মধ্যে ভাগ করে খাওয়ার যে অনাবিল আনন্দ ছিল, তা আজকের এই যান্ত্রিক যুগে কোথায়! খানিকটা রূপ কুমার রাঠোর, খানিকটা 'কেয়ামত সে কেয়ামত তক', আর অনেকটা হঠাৎ পাওয়া বসন্তকাল। গোলবাগান, ঊষাগ্রাম গার্লস স্কুল আর বি.বি কলেজের রাস্তায় কতশত স্মৃতির আনাগোনা!
রামানুজ বাবুর মনে পড়ে, ছাত্রদের তিনি কে.সি. নাগের 'নব গণিত' থেকে অঙ্ক শেখাতেন। সেই হলুদ মলাটের বইটা কারও কাছে ছিল অমৃতভাণ্ডার, আবার কারও কাছে দুঃস্বপ্ন। তেল চপচপে বাঁশে বাঁদরের ওঠানামা, কিংবা অঙ্ক কষে পিতার বয়স বের করা, সেই চিরন্তন গরু-মহিষের অঙ্ক এইসব পাটিগণিত কখন যে পরিবারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যেত, তা বোঝার আগেই মাধ্যমিকের গণ্ডি পার।
আজ কালের নিয়মে কোথায় যেন সব হারিয়ে গেল! অনিকেত আজ আর নেই, কিন্তু তার বন্ধুরা আজ সবাই জীবনের সংগ্রামে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছে। সেই চিরন্তন গরু-মহিষের অঙ্ক ভুলে তারা আজ বাস্তব জীবনে গরুর দুধের খরচের অঙ্ক কষে, আর জীবনের শেষ অঙ্কে পৌঁছানোর অপেক্ষায় দিন গোনে।
কিন্তু ওই গরিব অথচ মেধাবী ছেলেমেয়েদের জন্য রামানুজ বাবুর গড়া "অনিকেত স্মৃতি শিক্ষা তহবিল" আজও বেঁচে আছে। কত গরিব ঘরের ছেলেমেয়ে যে এই তহবিলের সাহায্যে পড়াশোনা চালিয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা খেলোয়াড় হলো, তার ইয়ত্তা নেই। তারা যখন ফিরে এসে রামানুজ বাবুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে, তখন কোনো দেনা-পাওনার হিসেব থাকে না; থাকে কেবল এক বুক ভক্তি।
রামানুজ বাবু আজ বুঝতে পারেন, সেই পুরনো প্রেমটা আসলে কোনো নির্দিষ্ট মানুষের সঙ্গে ছিল না; প্রেমটা ছিল ওই সময়টার সঙ্গে, সেই অনিকেতের মত ছোট ছোট ছাত্রদের সঙ্গে তারা সবাই যেন ছিল আত্মার আত্মীয়! যে সময় আর কোনোদিন ফিরবে না।
স্ত্রী মিতা এসে এক কাপ ধোঁয়া-ওঠা চা নামিয়ে দিয়ে স্নিগ্ধ স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, "কী অত ভাবছো গো?" রামানুজ বাবু মেডেলটার ওপর পরম স্নেহে হাত বুলিয়ে বললেন, "আমরা মাস্টাররা জীবনে যা ভালোবাসা আর সম্মান পেয়েছি মিতা, আধুনিক যুগের কোনো হাটে-বাজারে কি তার দাম চোকানো যায়?"
আজ ৫ই সেপ্টেম্বর, পবিত্র শিক্ষক দিবস। এই পুণ্য লগ্নে দেশের সমস্ত শিক্ষাগুরুদের জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম ও বিনম্র শুভেচ্ছা।
আজকের এই দ্রুত গতির ডিজিটাল জীবনে আমরা যেন বড্ড বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি। শিক্ষার আঙিনাও আজ প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড় আর বাণিজ্যিকীকরণের শিকার। আসুন না, আমরা আবার আমাদের সেই শেকড়ের কাছে ফিরে যাই। শিক্ষক আর শিক্ষার্থীর সম্পর্কটা শুধু সিলেবাস আর মার্কশিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, তাকে একটা বটবৃক্ষের মতো ছায়াসুনিবিড় করে তুলি। মাঠের খেলাধুলা, বন্ধুদের সাথে নিঃস্বার্থ আড্ডা, আর সুস্থ সংস্কৃতির চর্চাই পারে একটা শিশুর মনের জানলাগুলো খুলে দিতে। আসুন, আমরা এমন এক সমাজ গড়ি যেখানে শিক্ষার অভাবে কোনো অনিকেত এর স্বপ্ন ঝরে না পড়ে, আর শিক্ষকরা পান তাঁদের প্রাপ্য নিখাদ সম্মান ও ভালোবাসা। কারণ, পুঁথিগত বিদ্যা হয়তো পেশা দেয়, কিন্তু সঠিক শিক্ষাই দেয় জীবন গড়ার দিশা।
® নরকিচাক্ষ
Yoga Guru
#শিক্ষকদিবস