26/09/2026
একদিকে এদেশে সংস্কৃত সপ্তাহ পালন, আর অন্যদিকে বিদ্যাসাগর। সংস্কৃত ভাষাকে ঘিরে বর্তমান শাসক ও বিদ্যাসাগরের দুই ভিন্ন রাজনৈতিক শিক্ষা-দর্শন।
বিদ্যাসাগর সংস্কৃতকে বর্জন করেননি; বৈজ্ঞানিক চিন্তাপদ্ধতির কোন মানুষই সেকথা বলবেন না। তাঁর দৃষ্টিতে সংস্কৃতের দুটি পৃথক মূল্য রয়েছে। প্রথমত, ভাষা হিসেবে এটি বাংলার ব্যাকরণ, শব্দভাণ্ডার ও গদ্য নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। দ্বিতীয়ত, সংস্কৃতে রক্ষিত জ্ঞানকে তিনি তার ভাষাগত ঐতিহ্যের জন্য মূল্যবান মনে করলেও সেই জ্ঞানকে শুধুমাত্র ঐতিহ্যের অংশীদার বলেই সত্য বা আধুনিকতার উপযোগী বলে মানেননি।
তাই, ১৮৫২-এর Notes on the Sanskrit College-এ সংস্কৃত ব্যাকরণ ও সাহিত্য থাকল, কিন্তু বেদান্ত-সাংখ্যের কর্তৃত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ল। বেদান্ত ও সাংখ্যকে “ভ্রান্ত দর্শন” বলে তিনি পশ্চিমা যুক্তি, বিজ্ঞান ও ব্যবহারিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিলেন। উপক্রমণিকা, ব্যাকরণ কৌমুদী, ঋজুপাঠ দিয়ে সংস্কৃতকে বাংলাভাষী শিক্ষার্থীর নাগালে আনলেন। সংস্কৃত তাঁর কাছে জ্ঞানের প্রতীক কিংবা প্রাচীন প্রাচুর্যের শাশ্বত ভান্ডার নয়, জ্ঞানে পৌঁছানোর আরো একটি উপকরণ মাত্র ।
এর প্রায় দেড়শো বছর অতিক্রান্ত এ দেশে ২০১৪-তে HRD মন্ত্রকের উদ্যোগে ৭–১৩ আগস্ট ‘সংস্কৃত সপ্তাহ’ পালনের নির্দেশ এল। CBSE-র নিজস্ব নথিতে সংস্কৃতকে ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐক্যের সঙ্গে যুক্ত করার যুক্তি দেখা যায়। সেই মুহূর্তেই প্রশ্ন উঠল: রাষ্ট্র একটি ভাষাকে আলাদা করে উদ্যাপন করলে অন্য ভাষাগুলির স্থান কোথায়? তাই তামিলনাড়ুর সমালোচকেরা ‘Classical Language Week’-এর বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
এখানেই ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’-এর প্রসঙ্গ। সংস্কৃত সপ্তাহকে কেউ ভারতীয় ঐতিহ্যের স্বাভাবিক উদ্যাপন হিসেবে দেখেছেন; সমালোচকেরা এটিকে রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক জাতি-নির্মাণে সংস্কৃতকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। আপত্তিটি সংস্কৃত শেখার বিরোধিতা নয়; প্রশ্নটি কোন ভাষাকে রাষ্ট্র দৃশ্যমান করে, এবং কোন ঐতিহ্যকে জাতীয়তার প্রতীক বানায়।
NEP 2020 এই প্রবণতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়: সংস্কৃতকে Sanskrit through Sanskrit পদ্ধতিতে, বহুমুখী শিক্ষায় এবং Indian Knowledge Systems-এর সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলে। বাস্তব কী বলে? প্রাচীন ভারতে, বিশেষত গুপ্তযুগে, এই অঞ্চলে বসবাসকারী একদল মানুষ সত্যিই বিজ্ঞানের অভাবিত উন্নতি ঘটিয়েছিলেন। এবং সেই গবেষণার মাধ্যম ছিল সংস্কৃত। কিন্তু সেই বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে নৈর্ব্যক্তিক এবং পক্ষপাতবিহীনভাবে অনুশীলনের জায়গায় 'সবই প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রে ছিল এবং তা বিদেশীদের আক্রমণে অন্ধকারে তলিয়ে গেছিল' এমন এক আখ্যান সৃষ্টি করে, বর্তমান ভারতীয় শাসকদল সারাদেশের বৈজ্ঞানিক মননের পরিসরে এক দূষণ সৃষ্টি করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সংস্কৃত শিক্ষার প্রাচীন একচেটিয়াকরণ, বিশেষত উচ্চবর্ণের আধিপত্য, বিদ্যাসাগরের সংস্কারেই আংশিকভাবে ভাঙতে শুরু করেছিল। ময়েট সাহেবকে এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, "আমাদের সংস্কৃত কলেজে বেদান্ত ও সাংখ্যের শিক্ষা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। বেদান্ত ও সাংখ্য যে ভ্রান্ত দর্শনব্যবস্থা, তা নিয়ে এখন আর কোনো বিতর্কের অবকাশ নেই। এই দর্শনগুলি ভ্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও হিন্দুদের মধ্যে এগুলির প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা রয়েছে। তাই সংস্কৃত পাঠক্রমে যখন এগুলি পড়ানো হবে, তখন ইংরেজি পাঠক্রমে যথার্থ ও যুক্তিনিষ্ঠ দর্শন পড়িয়ে এই দর্শনগুলির প্রভাবের মোকাবিলা করা উচিত।" ফলে আজকের রাষ্ট্রীয় উদ্যাপনের সমালোচনা শুধু ধর্মনিরপেক্ষতা বা ভাষা-রাজনীতির প্রশ্ন নয়; শিক্ষা কার, ঐতিহ্য কার, এবং কোন জ্ঞানকে কেন্দ্র হিসেবে নির্মাণ করা হচ্ছে—তারও প্রশ্ন। এক সপ্তাহের অনুষ্ঠানও তখন প্রতীকে পরিণত হয়।
মোহন ভাগবত, অমিত শাহ, তেজস্বী যাদবের মত শাসকদলের নেতারা বারবার সংস্কৃতর উপর জোর দিয়েছেন, ‘সমস্ত ভারতীয় ভাষার জননী হিসেবে’। ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই দাবী সর্বৈব মিথ্যা। ভারতের ভাষাগুলি মূলত চারটি প্রধান ভাষা-পরিবারের অন্তর্গত: ইন্দো-আর্য, দ্রাবিড়, চীনা-তিব্বত-বর্মী এবং মুণ্ডা। সংস্কৃত কেবল ইন্দো-আর্য শাখার একটি প্রাচীন সদস্য, যা প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা থেকে এসেছে। সংস্কৃতের ওপর এই একচেটিয়া গুরুত্ব আরোপ আসলে তামিল, তেলুগু, দ্রাবিড়, কন্নড়ের মতো দক্ষিণী ভাষা, মিজ. মনিপুরীর মত উত্তর-পূর্ব ভারতের ভাষা, সাঁওতালি, মুন্ডারী, লোধা সহ যাবতীয় অসংস্কৃত আদিবাসী ভাষার প্রতি অপমান।
ভারতীয় জ্ঞানতন্ত্র কিংবা ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেমের কথা বললেই সংস্কৃত ভাষায় লেখা রামায়ণ ও মহাভারতকে প্রায় প্রনম্যের মতো তুলে ধরে সরকার। অথচ তামিল ভাষায় লেখা সাতটি মহাকাব্য, মণিপুরের জাতীয় মহাকাব্য, সহ নানান আঞ্চলিক এবং অসংস্কৃত ভাষা-পরিবার থেকে উদ্ভূত সাহিত্যকে আসলেই বাদ দিয়ে যাওয়া হয়। এইভাবে কি প্রকৃত অর্থে ইন্ডিয়ান নলেজের চর্চা হওয়া সম্ভব?
ঐতিহাসিকভাবে সংস্কৃত শিক্ষা উচ্চবর্ণ ও পুরুষতান্ত্রিক শ্রেণির একচেটিয়া ছিল; শূদ্র, দলিত, আদিবাসী ও নারীদের এর থেকে দূরে রাখা হতো। তাই সংস্কৃত সপ্তাহকে অনেকে দলিত-বহুজনের প্রতি সামাজিক বৈষম্যের প্রতীক হিসেবে দেখেন। এই সন্দেহ আরো দৃঢ় হয়, যখন শুধুমাত্র সংস্কৃত মাধ্যম বা সংস্কৃত ভাষায় লেখা শাস্ত্রই নয়, সংস্কৃত টোল থেকে গুরু শিষ্য পরম্পরা পর্যন্ত ফিরে যাওয়ার কথা বলা হতে থাকে।
উপরোক্ত তথ্যগুলি থেকে সন্দেহ হয় যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার আসলে সংস্কৃত ভাষাকে নয়, সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে যে বিশেষ হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্ববাদী আধিপত্যকামী ধারণা লুকিয়ে আছে, তার নিগড়ে ছাত্রদেরকে বেঁধে রাখতে চায়।
বিদ্যাসাগর মাতৃভাষা হিসেবে বাংলার বিকাশের জন্য সংস্কৃত ব্যাকরণের ও ভাষার চর্চার কথা বলেছিলেন,এবং নেহাত সমাজে গভীর অন্ধকার রয়েছে বলে অপ্রয়োজনীয় সংস্কৃত দর্শন শাস্ত্র পড়ানোর পক্ষে নিমরাজী হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "আমাদের যা প্রয়োজন তা হল শিক্ষার সুফলকে সাধারণ মানুষের বৃহত্তর অংশের কাছে পৌঁছে দেওয়া। চলুন আমরা বহু সংখ্যক মাতৃভাষার বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করি; উপযোগী ও শিক্ষামূলক বিষয়ের উপর ধারাবাহিক মাতৃভাষার পাঠ্যপুস্তক প্রস্তুত করি; এবং এমন একদল মানুষ তৈরি করি, যাঁরা নিজেদের ভাষায় পূর্ণ দক্ষ, যথেষ্ট পরিমাণ ব্যবহারিক ও প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অধিকারী এবং নিজেদের দেশের প্রচলিত পূর্বধারণা থেকে মুক্ত।" তাঁর সেই চিন্তার বিপরীতেই আজকের শাসক শ্রেণী ভূমিকা গ্রহণ করছে। আজকের শাসক সংস্কৃতকে মাধ্যম করে ইতিহাসবোধকে তথা বৈজ্ঞানিক মননকে পাল্টে দিতে চায়।
এক্ষেত্রে দুপক্ষের সংগ্রামের স্থিতিদিশা বিপরীতমুখী। বিদ্যাসাগর প্রগতির পথিকৃৎ। আর আজকের দিনের সংস্কৃতবাদীরা প্রগতির শত্রু। তাই বিদ্যাসাগর চৰ্চা আজ ভীষণ রকম জরুরী।