03/10/2026
সমাজ কে রক্ষা করার দায়িত্ব শ্রমজীবীদের নিতে হবে
৩ অক্টোবর, ২০২৬
সি আই টি ইউ, বর্ধমান শহর ১ সমন্বয় কমিটি --
প্রবণ বটব্যাল ভবন, কাছারি রোড, বর্ধমান
রাহুল সাংকৃত্যায়ন ও সমাজ ভাবনা - সাম্প্রদায়িকতার বিপদ এই বিষয় নিয়ে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয় সি আই টি ইউ বর্ধমান শহর ১ সমন্বয় কমিটির উদ্যোগে। মুখ্য বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক অরুণ পান্ডে। তিনি বলেন রাহুল সাংকৃত্যায়নের জীবন, তা আজ আমরা স্মরণ করছি এমন একজন মানুষকে, যাঁর জীবন ছিল এক অবিরাম জ্ঞানসন্ধানের যাত্রা—তিনি মহাপণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন।
রাহুল সাংকৃত্যায়নের জন্ম ১৮৯৩ সালে উত্তরপ্রদেশের আজমগড় অঞ্চলে। তাঁর আসল নাম ছিল কেদারনাথ পাণ্ডে। পরবর্তীকালে বৌদ্ধ দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে তিনি ‘রাহুল’ নাম গ্রহণ করেন। তাঁর জীবন ছিল প্রচলিত গণ্ডি ভেঙে সত্যের সন্ধানে এগিয়ে চলার জীবন। তিনি শুধু একজন সাহিত্যিক ছিলেন না—তিনি ছিলেন ভ্রমণকারী, ইতিহাস-অনুসন্ধানী, ভাষাবিদ, দার্শনিক, গবেষক এবং সমাজ চিন্তক। ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তিব্বত, শ্রীলঙ্কা, সোভিয়েত রাশিয়া সহ বহু দেশে তিনি ভ্রমণ করেছেন। তাঁর ভ্রমণ ছিল নিছক পর্যটন নয়; মানুষের জীবন, সমাজ, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জ্ঞানকে জানার এক গভীর প্রচেষ্টা।
তাঁর জীবনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল চিন্তার ক্রমবিকাশ। ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে শুরু করে বৌদ্ধ দর্শনের অনুসন্ধান, তারপর যুক্তিবাদ, বস্তুবাদ এবং শেষ পর্যন্ত মার্কসবাদী চিন্তার প্রতি গভীর আকর্ষণ—এই পথ অতিক্রম করেই তাঁর চিন্তার জগৎ গড়ে উঠেছিল। রাহুল সাংকৃত্যায়ণ মনে করতেন, মানুষের মুক্তির জন্য অন্ধ বিশ্বাস নয়, প্রয়োজন যুক্তি, বিজ্ঞান ও জ্ঞানচর্চা। তাই তিনি মানুষের মধ্যে প্রশ্ন করার সাহস তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাছে জ্ঞান ছিল কেবল পুঁথিগত বিষয় নয়—জ্ঞানকে মানুষের জীবন ও সমাজ পরিবর্তনের কাজে লাগাতে হবে।
মার্কসবাদ তাঁকে সমাজকে নতুনভাবে বুঝতে সাহায্য করেছিল। শ্রেণি-বিভাজন, শোষণ, বৈষম্য এবং উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে মানুষের জীবনের সম্পর্ককে তিনি ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেন। এখানেই তাঁর চিন্তার সঙ্গে বামপন্থী সমাজভাবনার গভীর মিল। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’ শুধু একটি উপন্যাস নয়; মানবসমাজের দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিবর্তনকে সাধারণ মানুষের জীবন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেখার এক অসাধারণ প্রচেষ্টা। তাঁর আত্মজীবনীমূলক রচনা, ভ্রমণসাহিত্য, ইতিহাস ও দর্শনচর্চাও ভারতীয় জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’ পরবর্তীকালে বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে।রাহুল সাংকৃত্যায়ণের জীবন থেকে বামপন্থীদের জন্য একটি বড় শিক্ষা হল—চিন্তাকে কখনও স্থির করে রাখা যাবে না। সত্যের সন্ধানে প্রশ্ন করতে হবে, পুরনো ধারণাকে যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করতে হবে এবং মানুষের বাস্তব জীবনকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। আজ যখন সমাজে কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, অন্ধবিশ্বাস ও ইতিহাসকে বিকৃত করার প্রবণতা দেখা যায়, তখন রাহুল সাংকৃত্যায়নের বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিবাদী চিন্তা আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—জ্ঞানকে ভালোবাসতে হবে, যুক্তিকে গ্রহণ করতে হবে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে এবং শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্নকে মানুষের বাস্তব সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। তাই রাহুল সাংকৃত্যায়ণকে স্মরণ করা শুধু একজন মহান লেখককে স্মরণ করা নয়; তাঁকে স্মরণ করা মানে জ্ঞান, যুক্তি, বিজ্ঞান, মানবমুক্তি ও সামাজিক পরিবর্তনের চেতনাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। ৩৬ টি ভাষার উপর দখল ছিল। মার্কসবাদী চিন্তা ভাবনাকে সাধারণ মানুষকে সহজ ভাবে বোঝাতেন। শ্রমিক, কৃষক, মহিলা, ছাত্রীদের দাবি নিয়ে লড়াই করেছেন। আজ পরিবেশকে নষ্ট করার চেষ্টা চলছে। রানীগঞ্জ ১৯৯৪ সালে আমরা সাধারণ মানুষ রাহুল সাংকৃত্যায়নের স্ট্যাচু তৈরি করেছিল। সরকার পরিবর্তনের পর ঐ স্ট্যাচু ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। ধর্ম হলো আফিংয়ের নেশার মতো। মানুষ বিপথে যাচ্ছে। কলকাতায় নেতাজী মূর্তির উপর আক্রমণ করা হলো। রামপুরহাটের নাম পাল্টে দেওয়া হলো। আজ আর্থিক ভাবে পঙ্গু করার চেষ্টা চলছে। সমাজকে ভেঙে তছনছ করা হচ্ছে। এই সমাজকে রক্ষা করার দায়িত্ব নিতে হবে শ্রমজীবীদের। এছাড়া প্রারম্ভিক বক্তব্য রাখেন সমন্বয় কমিটির সম্পাদক দেবদুলাল ঠাকুর, নতুন চিঠির পক্ষে দীনেশ ঝা। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সৌমেন ব্যানার্জী। উপস্থিত ছিলেন সি আই টি ইউ পূর্ব বর্ধমান জেলা কমিটির সভাপতি, রাজ্য শ্রমিক নেতা নজরুল ইসলাম, শুক্লা সরকার, অতনু হুই প্রমুখ।