28/09/2026
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর পরে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া মানুষ আবার নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক বা ইআরও-র কাছে নাম তোলার আবেদন করতে পারবেন। ফর্ম ৬ জমা দিয়ে নতুন করে নাম অন্তর্ভুক্তির সুযোগও রয়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বর এমন সিদ্ধান্তই একটি বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। অথচ এই একই সময়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তৈরি ট্রাইবুনালে নাম ফেরানোর জন্য ২২ লক্ষেরও বেশি বাদ পড়া ভোটারের আপিল ঝুলছে।
এই বিপুল আপিলের চাপ সামলাতে কমিশন কয়েক দিন আগেই ট্রাইবুনালের সংখ্যা ১৯ থেকে ৪২ করার প্রস্তাব দিয়েছিল। কারণ ৩৭ লক্ষেরও বেশি মামলা তখনও নিষ্পত্তি হয়নি। তার পরেই বাদ পড়া ভোটারদের জন্য আবার ইআরও-র মাধ্যমে নাম তোলার পথকে সামনে আনা হল।
ইআরও-র কাছে ফর্ম ৬ জমা দেওয়ার ব্যবস্থা অবশ্য নতুন নয়। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পরেও ‘ধারাবাহিক হালনাগাদ’-এর মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তি ফর্ম ৬ জমা দিয়ে নিজের নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গের জটিলতা তৈরি হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ ব্যবস্থার কারণে।
ফেব্রুয়ারিতে রাজ্য সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের মধ্যে ‘অনাস্থা’-র কথা উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্ট এসআইআর-এর প্রায় ৬০ লক্ষ বিতর্কিত নামের দাবি ও আপত্তি বিচার করার দায়িত্ব সাধারণ প্রশাসনিক আধিকারিকদের বদলে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের দেয়।
১০ মার্চ আদালত আরও স্পষ্ট করে জানায়, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনও প্রশাসনিক আধিকারিকের কাছে আপিল করা যাবে না। সেই আপিল শুনতে প্রাক্তন হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি ও বিচারপতিদের নিয়ে বিশেষ ট্রাইবুনাল তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়।
১৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট জানায়, এই ট্রাইবুনাল বাদ পড়া ভোটারের নাম ফেরানোর আবেদন যেমন শুনবে, তেমনই তালিকায় রাখা কোনও নামের বিরুদ্ধে ওঠা আপত্তিও বিচার করবে। অর্থাৎ ট্রাইবুনাল ছিল এসআইআর-এর জন্য তৈরি আলাদা বিচারিক আপিল ব্যবস্থা।
এখন বাদ পড়া একজন ভোটারের সামনে দু’টি পথ থাকছে। আগের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ট্রাইবুনালে আপিল চলতে পারে। আবার ফর্ম ৬ দিয়ে ইআরও-র কাছেও নতুন করে নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করা যায়।
আইনি ভাবে দু’টি এক নয়। একটি আগের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল। অন্যটি নতুন অন্তর্ভুক্তির আবেদন। কিন্তু বাস্তবে একই ভোটারের নাম নিয়েই দু’টি প্রক্রিয়া চলতে পারে। ট্রাইবুনালে আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় ইআরও নাম তুলে দিলে সেই আপিলের কী হবে? ট্রাইবুনাল পরে অন্য সিদ্ধান্ত নিলে কোনটি কার্যকর হবে? কমিশনের নতুন পদক্ষেপে এই সম্পর্ক এখনও স্পষ্ট নয়।
এই সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এসেছে, যখন নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েই দেশজুড়ে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। ২৫ সেপ্টেম্বর কংগ্রেস একাধিক রাজ্যে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং এসআইআর নিয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে। ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে পাঁচ বাম দলও কমিশনের বিরুদ্ধে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি শুরু করেছে।
ফলে প্রশ্ন শুধু ফর্ম ৬-এর নয়। আইনে ইআরও-র পথ আগে থেকেই ছিল। কিন্তু ২২ লক্ষেরও বেশি বাদ পড়া ভোটার যখন ট্রাইবুনালে অপেক্ষা করছেন, তখন কমিশন কেন এখন সেই প্রশাসনিক পথকেই নতুন করে সামনে আনছে?
ফলে দেশজোড়া চাপের মুখেই কি কমিশনের এমন সিদ্ধান্ত? ট্রাইবুনালের দীর্ঘ জট কাটাতে পুরনো আইনি পথকেই সামনে আনা হল? তাহলে ট্রাইবুনালে ঝুলে থাকা ২২ লক্ষেরও বেশি আপিলের ভবিষ্যৎ কী? প্রশ্ন কিন্তু উঠছে।
তথ্যসূত্র: সুপ্রিম কোর্টের ২০ ফেব্রুয়ারি, ১০ মার্চ ও ১৩ এপ্রিল ২০২৬-এর নির্দেশ; নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর; ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ১৮–২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬; দ্য প্রিন্ট/পিটিআই, ২৫–২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬।