13/09/2026
কল্পনা করুন এমন এক নারীর কথা, যিনি জীবনের মাত্র তিনটি মাস তার স্বামীর সাথে কাটিয়েছেন, আর বাকি ৫০টি বছর কাটিয়েছেন শুধু তাঁরই অপেক্ষায়! কোনোদিন তাঁর রাজপ্রাসাদের রানি হতে পারেননি, কোনোদিন তাঁর পাশে বসার অধিকার পাননি; অথচ প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে সেই মানুষটারই দীর্ঘায়ু আর সাফল্যের জন্য উপবাস রেখেছেন।
তিনি যশোদাবেন মোদী — ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর স্ত্রী। তাঁর গল্প কোনো রাজকন্যার রূপকথা নয়, এটি এক চরম বাস্তব ত্যাগ, অটুট বিশ্বাস আর হিমালয়সম আত্মমর্যাদার জীবন্ত ইতিহাস।
সময়টা ১৯৬৮ সাল। গুজরাটের এক রক্ষণশীল গ্রামীণ সমাজে মাত্র ১৬ বছরের এক কিশোরী, যশোদাবেনের বিয়ে হয় ১৮ বছরের তরুণ নরেন্দ্র মোদীর সাথে। কিন্তু সেই বিয়ের সানাইয়ের শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই স্পষ্ট হয়ে যায় — তাঁদের পথ আলাদা।
নরেন্দ্র মোদীর মনে তখন প্রথাগত সংসার জীবন নয়, বরং দেশসেবা আর আধ্যাত্মিকতার তীব্র টান। বিয়ের মাত্র তিন মাসের মাথায় যখন নরেন্দ্র মোদী ঘর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন যশোদাবেনের মনে আকাশ ভেঙে পড়েছিল।
বিদায়বেলায় স্বামী তাঁকে কোনো গয়না বা সম্পত্তির প্রতিশ্রুতি দেননি, দিয়েছিলেন শুধু একটি বার্তা —
"আমি দেশসেবার কঠিন পথে যাচ্ছি, তুমি বাপের বাড়ি ফিরে গিয়ে পড়াশোনা করো, নিজের পায়ে দাঁড়াও।"
সমাজ সেদিন চুপ থাকেনি। চারপাশের মানুষ বাঁকা চোখে তাকিয়েছিল, উঠেছিল হাজারো অপবাদ আর করুণার সুর। একজন নারী চাইলে ভেঙে পড়তে পারতেন, সমাজ ও আইনি ব্যবস্থার আশ্রয় নিয়ে নিজের অধিকার ছিনিয়ে নিতে পারতেন, কিংবা অন্য কারো হাত ধরে নতুন সংসার পাততে পারতেন। কিন্তু যশোদাবেন তা করেননি। তিনি স্বামীর সেই শেষ কথাটিকে তাঁর জীবনের একমাত্র ধ্রুবতারা বানিয়ে নিলেন।
চোখের জলকে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি কঠোর পরিশ্রম শুরু করলেন। সমাজকে দেখিয়ে দিলেন যে স্বামীর ফেলে যাওয়া নারী মানেই জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। তিনি পড়াশোনা শেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হলেন। দীর্ঘ মেয়াদে চাকরি করে নিজের উপার্জনে স্বাবলম্বী হলেন, অথচ মনের গহীনে এবং নিজের সিঁথিতে নরেন্দ্র মোদীর নামটা অমলিন রেখে দিলেন।
দীর্ঘ পাঁচটা দশক! মোদীজী যখন আরএসএস (RSS)-এর প্রচারক থেকে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়ে বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়াচ্ছেন, যশোদাবেন তখন গুজরাটের এক ছোট্ট গ্রামে তাঁর ভাইয়ের সাথে অত্যন্ত সাধারণ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ জীবনযাপন করছেন।
মোদীজীর প্রতিটি বড় নির্বাচনের আগে এই নিঃসঙ্গ নারী অন্ন-জল ত্যাগ করে খালি পায়ে মন্দিরে গেছেন, ঈশ্বরের কাছে মানত করেছেন। কোনোদিন সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে নিজের অধিকার দাবি করেননি, কোনোদিন মোদীর রাজনৈতিক জীবনের পথে বিন্দুমাত্র বাধা বা বিতর্কের সৃষ্টি হতে দেননি।
দীর্ঘ ৪৬ বছর ধরে এই বিয়ের বিষয়টি জনসমক্ষে আড়ালে থাকার পর, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের হলফনামায় নরেন্দ্র মোদী প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে যশোদাবেনকে নিজের স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এই স্বীকৃতির পর যশোদাবেনের বৃদ্ধ চোখ দুটিতে আনন্দের অশ্রু নেমেছিল।
তিনি কোনো অভিযোগ না করে শুধু বলেছিলেন, "আমি জানতাম তিনি একদিন আমাকে স্বীকার করবেন। তিনি তো আমার রাম, তিনি দেশসেবার মতো মহান কাজ করছেন। আমি তাঁর স্ত্রী, এর চেয়ে বড় গৌরব আমার জীবনে আর কী হতে পারে!"
যশোদাবেনের এই নিঃস্বার্থ প্রেম আমাদের শেখায় —কাউকে ভালোবাসার মানে শুধু তাকে সারাজীবন আগলে রাখা নয়, বরং তাকে মুক্ত করে দিয়ে দূর থেকে তার মঙ্গলের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়া।
তিনি প্রথাগত সংসারের সুখ পাননি ঠিকই, কিন্তু নিজের আত্মমর্যাদা, পড়াশোনার জোর আর ভালোবাসার পবিত্রতায় তিনি আজ কোটি কোটি ভারতীয় মানুষের চোখে এক পরম পূজনীয় নাম।
আজকের যুগে দাঁড়িয়ে যেখানে সম্পর্কের সমীকরণ এত দ্রুত বদলে যায়, সেখানে যশোদাবেনের এই নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার লড়াই আমাদের সব্বাইকে অনুপ্রাণিত করে।
আপনার কি মতামত !!
#সংগৃহীত
রাণা দাস
#অনুপ্রেরণা