11/08/2026
১১ আগস্ট ফাঁসির দিন ঠিক হল।
(প্রত্যক্ষদর্শী উপেন্দ্র নাথ বসুর লেখা থেকে সংগৃহীত)
আমরা দরখাস্ত দিলাম যে ফাঁসির সময় উপস্থিত থাকব। উডম্যান সাহেব আদেশ দিলেন মাত্র দুজন বাঙালি ফাঁসির সময় থাকতে পারবে। আর শব বইতে ১২ জন এবং শবের সঙ্গে যেতে ১২ জন থাকতে পারবে। এরা কর্তৃপক্ষের ঠিক করে দেওয়া রাস্তা দিয়ে শ্মশানে যাবে। ফাঁসির সময় উপস্থিত থাকার জন্য আমি আর ক্ষেত্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় উকিলের অনুমতি পেলাম। আমি তখন বেঙ্গলি কাগজের স্থানীয় সংবাদদাতা। ভোর ছটায় ফাঁসি হবে। পাঁচটার সময় আমি গাড়ির মাথায় খাটিয়া আর সৎকারের দরকারি কাপড়-চোপড় নিয়ে জেলের ফটকে পৌঁছলাম। দেখলাম কাছের রাস্তা লোকে লোকারণ্য। সহজেই আমরা জেলের ভেতরে ঢুকলাম।
ঢুকতেই একজন পুলিশ কর্মচারী জিজ্ঞেস করলেন, বেঙ্গলি কাগজের সংবাদদাতা কে?
আমি উত্তর দিলে হেসে বললেন, আচ্ছা ভেতরে যান।
দ্বিতীয় লোহার দরজা খুললে আমরা জেলের আঙিনায় ঢুকলাম। দেখলাম ডান দিকে একটু দূরে প্রায় ১৫ ফুট উঁচুতে ফাঁসির মঞ্চ। দুই দিকে দুটো খুঁটি আর একটা মোটা লোহার রড আড়াআড়ি জোড়া। তার মাঝখানে মোটা একটা দড়ি ঝুলছে। তার শেষ মাথায় একটা ফাঁস।
একটু এগিয়ে দেখলাম ক্ষুদিরামকে নিয়ে আসছে চারজন পুলিশ। কথাটা ঠিক হল না। ক্ষুদিরামই আগে আগে এগিয়ে যাচ্ছে, যেন সিপাইদেরই টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেখে একটু হাসল। স্নান সেরে এসেছিল। মঞ্চে ওঠার পর ওর দুই হাত পেছনে এনে দড়ি দিয়ে বাঁধা হল। একটা সবুজ রঙের টুপি দিয়ে ওর ঘাড় পর্যন্ত ঢেকে দিয়ে ফাঁস পরিয়ে দেওয়া হল। ক্ষুদিরাম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এদিক-ওদিক একটুও নড়ল না।
উডম্যান সাহেব ঘড়ি দেখে একটা রুমাল ওড়ালেন।
একজন প্রহরী মঞ্চের এক প্রান্তে থাকা একটা হ্যান্ডেল টেনে দিল।
ক্ষুদিরাম নীচে অদৃশ্য হয়ে গেল।
শুধু কয়েক সেকেন্ড ওপরের দড়িটা একটু নড়ল।
তারপর সব স্থির।
কর্তৃপক্ষের আদেশে আমরা ঠিক করা রাস্তা দিয়ে শ্মশানের দিকে চলতে লাগলাম। রাস্তার দুপাশে কিছু দূর পরপর পুলিশ পাহারা দাঁড়িয়ে আছে। তাদের পেছনে শহরের অসংখ্য লোক ভিড় করে আছে। অনেকে শবের ওপর ফুল দিল। শ্মশানেও অনেক ফুল আসতে লাগল। চিতায় তোলার আগে স্নান করাতে মৃতদেহ বসাতে গিয়ে দেখি মাথাটা মেরুদণ্ড থেকে আলাদা হয়ে বুকের ওপর ঝুলে পড়েছে। দুঃখে, বেদনায়, রাগে ভারী হয়ে যাওয়া মন নিয়ে মাথাটা ধরে রাখলাম। বন্ধুরা স্নান শেষ করাল। তারপর চিতায় শোয়ানো হলে রাশি রাশি ফুল দিয়ে মৃতদেহটা পুরো ঢেকে দেওয়া হল। শুধু ওর হাসি-হাসি মুখটা খোলা রইল।
দেহটা পুড়তে বেশি সময় লাগল না। চিতার আগুন নেভাতে গিয়ে প্রথম কলসির জল ঢালতেই গরম ছাইয়ের কিছুটা আমার বুকের ওপর এসে পড়ল। তখন মনের এমন অবস্থা ছিল না যে জ্বালা-যন্ত্রণা বুঝব।
আমরা শ্মশানের বন্ধুরা স্নান করতে নদীতে নামলে পুলিশরা চলে গেল। আর আমরা একসঙ্গে বন্দেমাতরম বলে মনের ভারটা একটু হালকা করে যে যার বাড়ি ফিরে এলাম। সঙ্গে একটা টিনের কৌটোয় কিছুটা চিতাভস্ম নিয়ে এলাম, কালিদাসবাবুর জন্য। ভূমিকম্পের তাণ্ডবে সেই পবিত্র ভস্মের কৌটোটা কোথায় হারিয়ে গেছে।
"ক্ষুদিরাম হওয়া"......সহজ নয়।