03/10/2026
জিতা পরব: মাটিমায়ের উৎসব
জিতা পরব এসে গেল। প্রশ্ন ওঠে, জিতা মানে কী? জিতা ঠাকুর কাকে বলে? কেউ কেউ একে জিমূতবাহন ব্রাহ্মণের পূজা বলেন, সেটাই বা কী?
জিতা শব্দের অর্থ
জিতা মানে জয়ী হওয়া। লড়াইয়ে যেমন কেউ জেতে আর জয়ের চিহ্ন নিয়ে ফেরে, তেমনি বিয়ের পর নতুন বধূ যখন সন্তানের মা হয়, তখনই সে "জিতে"। মা হতে না পারলে সে "হারে"। আমাদের সমাজে তখন বরের আবার বিয়ে দেওয়ার রীতি ছিল। সংসারজীবনে তাই জিতা মানেই সন্তানের মা হওয়া।
জিতা ঠাকুর কে
জিতা ঠাকুর বা জিতা মা হলেন সৃষ্টিমা, অর্থাৎ সমস্ত জীবজগতের মা। আমার মা, আমার বাবার মা, আমার ভাইয়ের মা, তোমার মা, পৃথিবীর সব প্রাণীর মা। ইনিই ধরিত্রী, ইনিই বসুমতী। তাই জিতা পরব আসলে সৃষ্টিমায়ের পরব, আর সৃষ্টিমা মানে এই মাটি।
মা ও মাটির সম্পর্ক
আমার মা আমাকে দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধরেছিলেন। জন্মের পর একুশ দিন পর্যন্ত কোলে-কাঁখে রাখেন, মাটিতে নামান না, কারণ মাটি ছুঁতে নেই। একুশ দিন পরে শিশুকে প্রথম মাটিতে ছোঁয়ানো হয়। সেদিন সৃষ্টিমাকে স্মরণ করে বটতলায় বা গাছের ডালের নিচে পূজা করা হয়। জন্মদাত্রী মা তখন বলেন, "হে সৃষ্টিমা, আমি দশ মাস দশ দিন একে গর্ভে রেখেছি, একুশ দিন কোলে-কাঁখে রেখেছি। এর পর আর আমি রাখতে বা খাওয়াতে পারব না। এবার তুমি এর খাবারের জোগান দাও, তোমার কোলে ঠাঁই দাও। দুঃখে-বিপদে রক্ষা কোরো। সারাজীবন আমার সন্তানের ভার নিয়ো। একটা লাউয়ের কাঁটাও যেন ওর গায়ে না ফোটে।" এ কথা মা সন্তানের মঙ্গলের জন্যই বলেন।
মায়ের ক্ষমা, মাটির ক্ষমা
আমরা যখন মায়ের কোলে আসি, মা হাজার যন্ত্রণায় ছটফট করেন, রক্ত ঝরিয়ে আমাদের জন্ম দেন। আমরা তাঁর কোলে প্রস্রাব-পায়খানা করি, কামড়াই, আঁচড়াই। তবু মা আমাদের আদর করেন, চুমু খান, ভালোবাসেন, ঘেন্না করেন না।
ঠিক তেমনি এই মাটি, এই বসুমতী আমাদের জল দেয়, খাবার দেয়, দিনরাত নিজের কোলে ঠাঁই দেয়। আমরা তার বুকেই প্রস্রাব-পায়খানা করি, তবু সে আমাদের ওপর রাগ করে না, ঘৃণাও করে না। নীরবে আমাদের লালনপালন করে।
সৃষ্টিমাকে না মানার পরিণাম
যারা সৃষ্টিমাকে মানে না, তাঁর পূজা করে না, অহংকার করে, তারা দেখবে এক পলকেই মায়ের গ্রাসে চলে যায়। তাই সৃষ্টিমাকে মানা উচিত, তাঁর পূজা করা উচিত, তাঁর অবদান বোঝা উচিত।
আমাদের একটি রীতিও আছে। ছোট শিশু খাট থেকে বা কোথাও পড়ে গেলে আমরা বলি, "সৃষ্টিমা লুফে নিয়েছেন।" অর্থাৎ জাগ্রত সৃষ্টিমা নিজেই কোলে তুলে নেন, তাই শিশু পড়ে গেলেও তার কিছু হয় না।
জোহার সৃষ্টিমা,
জোহার জিতা মা,
জোহার আমাদের মা।
তোদের জন্যই আজ দেশদেশান্তরে ঘুরে বেড়াই। দুঃখে-বিপদে তুমিই আমাদের তরিয়ে দিয়ো, মা।