17/01/2021
স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
(শ্রী অমিতাভ প্রামানিকের লেখা থেকে উদ্ধৃত)
আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগের কথা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তখন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। পরবর্তীতে তাঁকে লোক চিনেছে ‘বাংলার বাঘ’ স্যার আশুতোষ মুখুজ্জে হিসাবে। কে এই বাংলার বাঘ? অধুনা রাজনৈতিক কারণে তাঁর পুত্রের নাম কর্ণগোচর হয় মাঝেমধ্যে। পিতাটির মাহাত্ম্য তাহলে কোথায়?
এর উত্তর স্বল্প পরিসরে দেওয়া সম্ভব নয়, এ নিয়ে প্রমাণ দৈর্ঘ্যের প্রবন্ধ লেখা দরকার। আমি এখানে সামান্য কয়েকটা ঘটনা অল্পকথায় বলে রাখি, যা আপনাদের কারও কারও নাও জানা থাকতে পারে।
স্যার আশুতোষ বয়সে রবীন্দ্রনাথ বা আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের চেয়ে বছর তিনেকের আর বিবেকানন্দের চেয়ে বছর দেড়েকের ছোট। পনেরো বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় সেকেন্ড হন। সতেরো বছর বয়সে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ এ (ফার্স্ট আর্টস, এখনকার বারো ক্লাশ) পরীক্ষায় থার্ড, কুড়ি বছরে বি এ পরীক্ষায় ফার্স্ট, একুশ বছর বয়সে গণিতে এম এ পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়ে হরিশচন্দ্র পুরস্কার পান, বাইশ বছর বয়সে ফের ন্যাচারাল সায়েন্সে এম এ পরীক্ষা দিয়ে প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ স্কলারশিপ লাভ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম ডবল মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন ও এই অসামান্য কৃতিত্বের জন্যে রয়াল সোসাইটি অভ এডিনবরার ফেলো পদে সম্মানিত হন।
ভাবছেন তো, এবার পড়াশুনা শেষ? আরে দাঁড়ান। চব্বিশ বছর বয়সে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো নির্বাচিত হন এবং ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অভ সায়েন্সে গণিতের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। পরের বছর পাব্লিক ইনস্ট্রাকশন ডিপার্টমেন্টে চাকরির অফার ছেড়ে দেন, কেননা তাঁর মায়ের ইচ্ছে ছেলে উকিল হবে। সুতরাং গণিতে অধ্যাপনার পাশাপাশি সে বছরই তিনি আইনের পরীক্ষা দেন ও পাশ করে কলকাতা হাইকোর্টের উকিল হয়ে যান। এই সামান্য আইনের পড়াশুনায় তিনি সন্তুষ্ট হননি, তাই গণিতে অধ্যাপনা ও হাইকোর্টের উকিলগিরি করার পাশাপাশি তিনি আইন নিয়ে গবেষণার কাজ চালিয়ে যান এবং তিরিশ বছর বয়সে আইনে থিসিস লিখে ডক্টরেট অভ ল’ডিগ্রি লাভ করেন। তার আগেই পঁচিশ বছর বয়সে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরবর্তী ষোল বছর সেনেট ও সিন্ডিকেটের উচ্চপদে আসীন ছিলেন। এর মধ্যে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেগোর প্রফেসর অফ ল’(দ্বারকানাথ ঠাকুরের নামে) ও পরে হাইকোর্টের চিফ জাস্টিসও হয়েছেন।
আরে দাঁড়ান, লোকে তাঁকে আইনজ্ঞ হিসাবে ভাবছে বটে, কিন্তু তার আগে তিনি কিঞ্চিৎ অঙ্কও কষেছেন। কতটা? কলেজে ফার্স্ট ইয়ার পড়তে পড়তেই ষোড়শবর্ষীয় আশুতোষ মেসেঞ্জার অভ ম্যাথমেটিক্স নামে গণিতের আন্তর্জাতিক জার্নালে তাঁর প্রথম গবেষণাপত্রটি ছাপিয়ে ফেলেছেন, বিষয় – ইউক্লিডের পঁচিশ নম্বর উপপাদ্যের আর একটি প্রমাণ। উনিশ বছর বয়সে তাঁর দ্বিতীয় গবেষণাপত্রটিও ছাপা হয় ঐ একই জার্নালে। ডবল এম এ পাশ করার কিছুদিন পরে তাঁর বিয়ে হয় যোগমায়া দেবীর সঙ্গে এবং তার কিছুদিন পরেই তিনি তাঁর তিন নম্বর গবেষণাপত্রও ছাপিয়ে ফেলেন, এবার জার্নাল অভ পিওর অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড ম্যাথমেটিক্সে, বিষয় এলিপটিক ফাংশন।
তেইশ থেকে আঠাশ বছরের মধ্যে তিনি যখন জোরদার আইন নিয়ে পড়াশুনা ও গবেষণা করছেন এবং পাশাপাশি করছেন সেনেট ও সিন্ডিকেটের কাজ, তখন তিনি ষোলোখানা গণিতের গবেষণা-প্রবন্ধ ছাপিয়েছেন – সব তাঁর একার গবেষণা। শতাব্দী শেষ হওয়ার আগেই, অর্থাৎ তাঁর ছত্রিশ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁকে ফ্রান্স, পালেরমো, আয়ারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, আমেরিকা ইত্যাদি বিশ্বের তাবড় দেশের ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত করা হয়। তিনি নিজে ইন্ডিয়ান ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটি স্থাপন করেন এবং যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন তার প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
কিন্তু এই সব তাঁর প্রকৃত পরিচয় নয়। অন্যসব বাদ দিয়ে শুধু অঙ্ক কষে গেলে তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা গণিতবিদ হিসাবে নাম করতেন, কিন্তু তাঁর বিচিত্র উৎসাহ তাঁকে নিয়ে গেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে। এবং জহুরীর চোখ দিয়ে তিনি একে একে তুলে আনলেন এক একটা জহর। সে ব্যাপারে যত বিরোধিতা এসেছে, সেগুলো তাঁর বিশাল ব্যক্তিত্বের কাছে দাঁড়াতে পারেনি। অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফটাফট যোগ করেছেন নতুন নতুন ডিপার্টমেন্ট – কম্প্যারেটিভ লিটারেচর, অ্যানথ্রোপলজি, অ্যাপ্লায়েড সাইকোলজি, ইন্ডাস্ট্রিয়াল কেমিস্ট্রি, প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ইসলামি সংস্কৃতি, ইত্যাদি। খুঁজে খুঁজে ধরে এনেছেন সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণের মত দক্ষিণীকে অধ্যাপক হিসাবে।
তাঁর যাবতীয় কৃতিত্বের ক্যাটালগ পেশ করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। একটা সামান্য ঘটনা পেশ করি।
সবাই জানেন মেঘনাদ সাহা আর সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন সহপাঠী। দুজনেই প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে গণিত অনার্স নিয়ে ব্যাচেলর্স আর মিক্সড ম্যাথমেটিক্স নিয়ে মাস্টার্স পাশ করেছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথ দুটোতেই ফার্স্ট হয়েছিলেন, মেঘনাদ সেকেন্ড। দুজনকেই স্যার আশুতোষ তুলে নিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স কলেজে গণিতের অধ্যাপক হিসাবে। এদিকে তখন গণিত ডিপার্টমেন্টের হেড প্রফেসর গণেশ প্রসাদ তে-এঁটে ধরনের। তার সঙ্গে দুজনেরই ঝামেলা শুরু হল। বসু আর সাহা দুজনেই তরুণ, প্রবীণ অধ্যাপকের ব্যবহারে তাঁরা তিতিবিরক্ত হয়ে গেল।
টের পেয়ে স্যার আশুতোষ যেটা করলেন, সে এক অত্যাশ্চর্য দাবার চাল ছাড়া কিছু না। তিনি দুজনকেই ট্রান্সফার করে দিলেন ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে। মনে রাখতে হবে এঁরা দুজনেই ফিজিক্স পড়েছেন ব্যাচেলর্সের পাশ কোর্স অবধি মাত্র, তার পরে আর নয়। আচার্য জগদীশচন্দ্রের ভাইপো দেবেন্দ্রমোহন বসু তখন ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের ঘোষ প্রফেসর, কিন্তু তিনি তখন জার্মানিতে। ফলে মেঘনাদ-সত্যেন ছাত্রজীবনের মতই একত্রে উচ্চতর ফিজিক্স পড়তে ও পড়াতে শুরু করলেন। পরের বছর কাল্টিভেশনের সি ভি রামনকেও স্যার আশুতোষ ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের পালিত প্রফেসরের পদে বহাল করলেন।
যে বছর এঁরা তিনজন ফিজিক্সে অধ্যাপনা শুরু করলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স কলেজে, তার মাত্র তিন বছর পরে মেঘনাদ সাহা আবিষ্কার করলেন তাঁর বিখ্যাত থার্মাল আয়োনাইজেশন থিওরি যা প্রয়োগ করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের তারামণ্ডলের এলিমেন্টাল কম্পোজিশন জানা গেল, তার পাঁচ বছর পরে সত্যেন্দ্রনাথ বসু তাঁর আইনস্টাইনের চিত্তজয়ী বোস স্ট্যাটিসটিক্স পেশ করলেন এবং তার তিন বছর পরে রামন প্রকাশ করলেন তাঁর নোবেলজয়ী রামন এফেক্ট!
এবং তিনজনই স্যার আশুতোষ মুখার্জির একান্ত গুণমুগ্ধ ছিলেন।
* * *
স্যার আশুতোষ মুখার্জিকে নিয়ে আগে যে ছোট্ট লেখাটা লিখলাম, তাতে তাঁর জহুরীর চোখ জহর তুলে আনার উদাহরণ হিসাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় যে ক’জনের নাম দিলাম, তার মধ্যে সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণের নাম নিয়ে পরে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। সে ব্যাপারটা নিয়ে অন্যত্র লিখেছি, এখানে তার পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। রাধাকৃষ্ণাণ যে পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। সেই চাঁদে কলঙ্কের পরিমাণটাও কম নয়, তবে তাতে স্যার আশুতোষের কোনো ভূমিকা ছিল না। একইভাবে আর একজনের নামও এ ক্ষেত্রে বলে ফেলা যায়, তিনি চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন – ভারতবর্ষের একমাত্র ভারতীয় নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী। অবিভক্ত ভারতবর্ষে জন্মে একাধিক জন পরে অভারতীয় হিসাবে বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন অবশ্য।
বিজ্ঞানী হিসাবে রামনের প্রতিভা ও বিজ্ঞানে তাঁর অবদান নিয়ে কারও বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকার কথা নয়। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকাও নেহাৎ ক্ষুদ্র নয়। রামন এফেক্টের গবেষণায় তিনি তাঁর সহকর্মী কে এস কৃষ্ণাণের ভূমিকাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেননি। নোবেল পুরস্কার পেয়ে তাঁর পায়াভারি হয়েছিল, তিনি ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের মুখের-রক্ত-তোলা স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি কাল্টিভেশন অভ সায়েন্স-এর নাম বদলে রামন রিসার্চ ইনস্টিট্যুট করতে চেয়েছিলেন। এর কিছুদিন পরে প্রথম ভারতীয় ডিরেক্টর হিসাবে ইন্ডিয়ান ইনস্টিট্যুট অভ সায়েন্সের পদে অধিষ্ঠান হন, সেখানে ডিরেক্টর থাকাকালীন একইভাবে রাজনীতি করতে গিয়ে সেই প্রেস্টিজিয়াস পদ থেকে বরখাস্ত হয়েছিলেন।
কিন্তু বাঙালিরা এর চেয়েও বেশি যে কারণে রামনের ওপর ক্ষুব্ধ, তা হচ্ছে তিনি সজ্ঞানে তাঁর সহকর্মী দুই অতি যোগ্য বাঙালি বিজ্ঞানীকে নোবেল পুরস্কারে মনোনয়নের উপযুক্তও মনে করেননি। রামনের নামে শোনা যায় তিনি নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করতে স্টকহোমের (সেখানে যোগদানের জন্যে জাহাজের টিকিট তিনি নোবেল পুরস্কার ঘোষণার আগেই নাকি কেটে রেখেছিলেন!) হলঘরে তাঁর নাম ডাকার পর ইউনিয়ন জ্যাক দেখে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিলেন এইজন্যে, যে তিনি এক পরাধীন দেশের অধিবাসী, যার নিজস্ব পতাকাও নেই। রামন সংক্রান্ত একাধিক ডকুমেন্টারিতে এর উল্লেখ আছে, যেটা হয়ত একটা গল্পই!
যদিও রামন তাঁর কেরিয়ারের শুরুতে ভারতীয় বাদ্যযন্ত্র নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন এবং সেই সংক্রান্ত পেপারে প্রায় লিখে ফেলেছিলেন – ভারতীয় মৃদঙ্গের আওয়াজ ‘মিউজিক’ আর ইওরোপিয়ান ড্রামের আওয়াজ ‘নয়েজ’! কিন্তু কিছুকাল পরেই অনুভব করেছিলেন, বিদেশী বিজ্ঞানীদের ভজনা ছাড়া গতি নেই। বস্তুত তাঁর রামন এফেক্টের নোবেল নমিনেশনের জন্যে তিনি সে কালের সমস্ত নামজাদা বিজ্ঞানীদের চিঠি দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেছিলেন। রামন এফেক্টের গবেষণার ফল যাতে তড়িঘড়ি প্রকাশ পায়, সে জন্যে রাতারাতি তাঁর প্রতিষ্ঠান আইএসিএসেরই জার্নাল ইন্ডিয়ান জার্নাল অভ ফিজিক্সের এক বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে তার প্রাথমিক ফল ছাপা হয়। সেই পেপার তিনি পরের দিনই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন বিদেশী বিজ্ঞানীদের কাছে। সঙ্গে অনুরোধ, আমাকে নমিনেট করুন। ১৯২৮ সালের রামন এফেক্ট আবিষ্কার পরের বছরই এ কারণে তাঁর নাম নোবেল পুরস্কারের জন্যে নমিনেট করেছিলন দুজন – ফ্রান্সের চার্লস ফ্যাব্রি ও ডেনমার্কের নিল্স্ বোর। সে বার পুরস্কার পাননি। সেটা আসে পরের বছর, নমিনেট করেছিলেন দশজন, যাঁদের মধ্যে নিল্স্ বোরও ছিলেন। সম্ভবত রামনের পত্রাঘাতে তিনি সত্যিই বোর হয়ে গেছিলেন।
এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, ১৯২৯ সালে বোর রামনকে যেমন নমিনেট করেছিলেন, তেমনি করেছিলেন আরও তিনজনকে, অর্থাৎ রামনের ওপর তাঁর ভরসা নিরঙ্কুশ ছিল না। সেই তিনজন হলেন ওয়েন রিচার্ডসন, আরভিং ল্যাংমুইর এবং রবার্ট উড। ১৯৩০ সালেও তিনি শুধু রামনকে নয়, তাঁর সঙ্গে নমিনেট করেছিলেন রবার্ট উডকেও। উড নোবেল পুরস্কার পাননি। ওয়েন রিচার্ডসন ১৯২৮ সালেই ফিজিক্সে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরের বছরও নোমিনেটেড হয়েছিলেন, ফিজিক্সেই, করেছিলেন শুধু বোরই নয়, আরও তিনজন, যাঁদের মধ্যে রাদারফোর্ডও ছিলেন। ল্যাংমুইরকে ১৯২৯ সালে বোর ফিজিক্সের জন্যে নোমিনেট করলেও লাভ হয়নি, তিনি পরে ১৯৩২ সালে কেমিস্ট্রিতে নোবেল পুরস্কার পান।
নোবেল পুরস্কার পাওয়ার এই একটাই উপায় – নোমিনেশন। যে-কেউ নোমিনেট করতে পারে না, তার শর্ত আছে। প্রতিষ্ঠিত দেশীয় বিজ্ঞান-সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ব্যক্তিরা ছাড়া পূর্ববর্তী নোবেল লরিয়েটরা নোবেল পুরস্কারের মনোনয়ন করতে পারেন। রামন ১৯৩০ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর বেঁচে ছিলেন আরও চল্লিশ বছর। এই চল্লিশ বছরে তিনি মনোনয়ন করেছিলেন মাত্র পাঁচ জনকে। এবং যতই তিনি ইউনিয়ন জ্যাক দেখে কেঁদে ফেলুন না কেন, এই পাঁচ জনের চারজন বিদেশী তার মধ্যে একজনকে তিনি দু-বার নোমিনেট করেছিলেন এবং একজন তাঁর নিজের ভাইপো হওয়া সত্ত্বেও বিদেশী। একমাত্র একজনই পাক্কা দিশি, তিনি ইন্ডিয়ান ইনস্টিট্যুট অভ সায়েন্সের জি এন রামচন্দ্রন, যাঁর রামচন্দ্রন প্লট প্রোটিন বায়োকেমিস্ট্রিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা, যার কিঞ্চিৎ উল্লেখ করেছি আমার নিজের পাতায় ডাল-সংক্রান্ত অন্য এক পোস্টে।
রামনের এই পাঁচবার নোমিনেশন ছিল এই রকম –
১৯৩৪ – অটো স্টার্ন। তিনি ১৯৪৩ সালে নোবেল পুরস্কার পান।
১৯৩৮ – এনরিকো ফার্মি ও আর্নেস্ট লরেন্স। ফার্মি ১৯৩৮ সালে ও লরেন্স ১৯৩৯ সালে নোবেল পুরস্কার পান।
১৯৩৯ – আর্নেস্ট লরেন্স। রামন এঁকে আগের বছরও নোমিনেট করেছিলেন। সেবার তিনি পুরস্কার পাননি বলে পরের বছর আবার করেন, এবার তিনি নোবেল পুরস্কার পান।
১৯৫৭ –সুব্রহ্মণ্যম চন্দ্রশেখর। ইনি রামনের দাদার ছেলে। পুরস্কার পেয়েছিলেন অনেক বছর পরে, ১৯৮৩ সালে। তখন তিনি আমেরিকান।
১৯৬৪ – জি এন রামচন্দ্রন। ইনি রামনের আই আই এস সি-র সহকর্মী ছিলেন। ইনিই একমাত্র যাঁকে রামন নোমিনেট করেছিলেন অথচ যিনি নোবেল পুরস্কার পাননি।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, রামনের নোমিনেশনের হিট-রেট খারাপ ছিল না। যে পাঁচজনকে তিনি নোমিনেট করেছিলেন, তাঁদের চারজনই নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। দু-জন পেয়েছিলেন সেই বছরই।
অথচ সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও মেঘনাদ সাহাকে তিনি এই পুরস্কারের যোগ্য বলে মনে করেননি। নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় এই পুরস্কার নিয়ে ইওরোপীয় বিজ্ঞানীদের এক বিপুল উৎসাহ ছিল। একে অন্যকে বছরের পর বছর নোমিনেট করে যেতেন। ফিজিক্সের লোককে কেমিস্ট্রিতেও। এমনকি একবার পুরস্কার পাওয়ার পরও। এক্স নোমিনেট করছেন ওয়াইকে, ওয়াই জেডকে, জেড এক্সকে।
এর মানে এই নয় যে সত্যেন্দ্রনাথ বা মেঘনাদ একবারও নোমিনেটেড হননি। সাহা ছ-বার মনোনয়ন পেয়েছিলেন। ১৯৩০ সালে আচার্য জগদীশচন্দ্রের ভাইপো দেবেন্দ্রনাথ বসু ও শিশির মিত্র তাঁকে নোমিনেট করেছিলেন, ১৯৩৭ সালে আর্থার কম্পটন, ১৯৩৯ সালে শিশির মিত্র, ১৯৪০ সালে আর্থার কম্পটন আবার এবং ১৯৫১ ও ১৯৫৫ সালে আবারও শিশির মিত্র। আর্থার কম্পটন আমেরিকান, তিনি ১৯২৭ সালে ফিজিক্সে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তেমনি সত্যেন্দ্রনাথ বসু মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনবার। দুর্ভাগ্যক্রমে তাঁর প্রিয় অ্যালবার্ট আইনস্টাইন তাঁকে মনোনীত করেননি। করেছিলেন ১৯৫৬ সালে কেদারেশ্বর ব্যানার্জি, ১৯৫৯ সালে দৌলত সিং কোঠারি, ১৯৬২ সালে সুবোধনাথ বাগচি এবং এ কে দত্ত।
দুর্ভাগ্যক্রমে যাঁদের স্বদেশীয় পুরস্কৃত বিজ্ঞানীই তাঁদের তুলে ধরার চেষ্টা করেননি, তাঁদের পুরস্কার পাওয়া এক রকম অসম্ভব ছিল। রামনের পক্ষে এ কথা বলা যেতে পারে যে তিনি হয়তো সত্যেন বোসের স্ট্যাটিসটিক্সের গুরুত্ব - যে ব্রহ্মাণ্ডের অর্ধেক 'পার্টিকল' এই বোসন তথা বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান মেনে চলে - নিজে অনুধাবন করেননি, কাজেই মনোনয়ন করার মতো অবস্থায় ছিলেন না। আফটার অল, বোস তাঁর অঙ্ক নিজে বোর্ডে কষে দেখাতে পারতেন, শোনা যায় নিল্স্ বোর কলকাতায় ভাষণ দিতে এলে সত্যেন বোস সেই ভাষণের চেয়ারম্যান ছিলেন এবং বোরের অনুরোধে তিনি নিজে বোর্ডে কিছু ডিডাকশন কষে দেখিয়েছিলেন। রামনের সহকর্মী কৃষ্ণাণের মত কাউকে প্রয়োজন হয়নি তাঁর।
তার মানে এই নয় যে রামন শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী ছিলেন না। অমিত প্রতিভার অধিকারী ছিলেন চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন এবং তাঁর রামন এফেক্টের ব্যবহারিক তাৎপর্য অসীম। সে নিয়ে কোনও সন্দেহই থাকার কথা নয়।
এবং তার সঙ্গে ছিল তাঁর প্রবল একগুঁয়েমি যে জন্যে সে সময় তাঁর বিশেষ বন্ধু-টন্ধু ছিল না। তার কিছু কিছু কথা পরে বলা যাবে এক সময়।