গল্পের আসর

গল্পের আসর

Share

বাংলা গল্পের ভান্ডার

08/05/2020

স্ত্রীর পত্র

শ্রীচরণকমলেষু

আজ পনেরো বছর আমাদের বিবাহ হয়েছে, আজ পর্যন্ত তোমাকে চিঠি লিখি নি। চিরদিন কাছেই পড়ে আছি— মুখের কথা অনেক শুনেছ, আমিও শুনেছি, চিঠি লেখবার মতো ফাঁকটুকু পাওয়া যায় নি।

আজ আমি এসেছি তীর্থ করতে শ্রীক্ষেত্রে, তুমি আছ তোমার আপিসের কাজে। শামুকের সঙ্গে খোলসের যে সম্বন্ধ কলকাতার সঙ্গে তোমার তাই, সে তোমার দেহমনের সঙ্গে এঁটে গিয়েছে; তাই তুমি আপিসে ছুটির দরখাস্ত করলে না। বিধাতার তাই অভিপ্রায় ছিল; তিনি আমার ছুটির দরখাস্ত মঞ্জুর করেছেন।

আমি তোমাদের মেজোবউ। আজ পনেরো বছরের পরে এই সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে জানতে পেরেছি, আমার জগৎ এবং জগদীশ্বরের সঙ্গে আমার অন্য সম্বন্ধও আছে। তাই আজ সাহস করে এই চিঠিখানি লিখছি, এ তোমাদের মেজোবউয়ের চিঠি নয়।

তোমাদের সঙ্গে আমার সম্বন্ধ কপালে যিনি লিখেছিলেন তিনি ছাড়া যখন সেই সম্ভাবনার কথা আর কেউ জানত না, সেই শিশুবয়সে আমি আর আমার ভাই একসঙ্গেই সান্নিপাতিক জ্বরে পড়ি। আমার ভাইটি মারা গেল, আমি বেঁচে উঠলুম। পাড়ার সব মেয়েরাই বলতে লাগল, “মৃণাল মেয়ে কি না, তাই ও বাঁচল,বেটাছেলে হলে কি আর রক্ষা পেত?” চুরিবিদ্যাতে যম পাকা, দামি জিনিসের ’পরেই তার লোভ।

আমার মরণ নেই। সেই কথাটাই ভালো করে বুঝিয়ে বলবার জন্যে এই চিঠিখানি লিখতে বসেছি।

যেদিন তোমাদের দূরসম্পর্কের মামা তোমার বন্ধু নীরদকে নিয়ে কনে দেখতে এলেন তখন আমার বয়স বারো। দুর্গম পাড়াগাঁয়ে আমাদের বাড়ি, সেখানে দিনের বেলা শেয়াল ডাকে। স্টেশন থেকে সাত ক্রোশ স্যক্‌রা গাড়িতে এসে বাকি তিন মাইল কাঁচা রাস্তায় পালকি করে তবে আমাদের গাঁয়ে পৌঁছনো যায়। সেদিন তোমাদের কী হয়রানি। তার উপরে আমাদের বাঙাল দেশের রান্না— সেই রান্নার প্রহসন আজও মামা ভোলেন নি।

তোমাদের বড়োবউয়ের রূপের অভাব মেজবউকে দিয়ে পূরণ করবার জন্যে তোমার মায়ের একান্ত জিদ ছিল। নইলে এত কষ্ট করে আমাদের সে গাঁয়ে তোমরা যাবে কেন? বাংলা দেশে পিলে যকৃত অম্লশূল এবং ক’নের জন্যে তো কাউকে খোঁজ করতে হয় না- তারা আপনি এসে চেপে ধরে, কিছুতে ছাড়তে চায় না।

বাবার বুক দুর্‌‌‍দুর্ করতে লাগল, মা দুর্গানাম জপ করতে লাগলেন। শহরের দেবতাকে পাড়াগাঁয়ের পূজারি কী দিয়ে সন্তুষ্ট করবে। মেয়ের রূপের উপর ভরসা; কিন্তু, সেই রূপের গুমর তো মেয়ের মধ্যে নেই, যে ব্যক্তি দেখতে এসেছে সে তাকে যে-দামই দেবে সেই তার দাম। তাই তো হাজার রূপে গুণেও মেয়েমানুষের সংকোচ কিছুতে ঘোচে না।

সমস্ত বাড়ির, এমন-কি সমস্ত পাড়ার এই আতঙ্ক আমার বুকের মধ্যে পাথরের মতো চেপে বসল। সেদিনকার আকাশের যত আলো এবং জগতের সকল শক্তি যেন বারো বছরের একটি পাড়াগেঁয়ে মেয়েকে দুইজন পরীক্ষকের দুইজোড়া চোখের সামনে শক্ত করে তুলে ধরবার জন্যে পেয়াদাগিরি করছিল— আমার কোথাও লুকোবার জায়গা ছিল না।

সমস্ত আকাশকে কাঁদিয়ে দিয়ে বাঁশি বাজাতে লাগল— তোমাদের বাড়িতে এসে উঠলুম। আমার খুঁতগুলি সবিস্তারে খতিয়ে দেখেও গিন্নির দল সকলে স্বীকার করলেন, মোটের উপরে আমি সুন্দরী বটে। সে কথা শুনে আমার বড়ো জায়ের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। কিন্তু, আমার রূপের দরকার কী ছিল তাই ভাবি। রূপ-জিনিসটাকে যদি কোনো সেকেলে পন্ডিত গঙ্গামৃত্তিকা দিয়ে গড়তেন

21/04/2020

"রক্তের সম্পর্ক ""রক্তের সম্পর্ক " ★★★★★

© Hena Mahato

Classics Inspirational

বিপিন রিক্সা চালিয়ে দিনান্তে যেটুকু টাকা পায় তাতে সংসার চলে। বিপিনের বৌ জয়া ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা চালানোর জন্য পরিচারিকার কাজ করে।

হঠাৎ লকডাউন ঘোষনা হওয়ায় বিপিনের মাথায় বাজ পড়ে। রুজি রোজগার বন্ধ হয়ে গেল। ছোঁয়াচে রোগের কারনের বাড়ি মালিক জয়াকে কাজে আসতে নিষেধ করে।

বিপিন মেয়ের লক্ষীর ভাঁড়টা ভেঙে খুচরো পয়সা দিয়ে একটু চাল আনে। দু মুঠো ভাতে রাতে পেটের জ্বালা মেটাতে পারল। এরপর দুদিন অনাহারে কাটল।

সুজাতাদেবীর ছেলে দীর্ঘদিন রোগে ভুগছে। হঠাৎ শারীরিক অবনতি শুরু । স্বামী লকডাউনে আটকে আছে ভিনরাজ্যে। কাঁদতে কাঁদতে বিপিনের দরজায় এসে হাজির। হাতজোড় করে বলেন 'ভাই আমার ছেলেটিকে হসপিটালে নিয়ে চলো। ''

বিপিন রিক্সা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। হসপিটালে ব্লাড ব্যাঙ্কে বি নেগেটিভ রক্ত নেই। লকডাউনের জন্য ডোনারা আসতে পারছে না। সুজাতাদেবী কেঁদে আকুল। দিদিমনিকে কাঁদতে দেখে বিপিন এগিয়ে এসে ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করে 'কি হয়েছে খোকার'?

ডাক্তার বললেন 'থ্যালাসেমিয়া, সময়ে রক্ত না দিলে বাঁচানো যাবে না।'

ডাক্তার এসে সুজাতাদেবীকে বললেন 'আপনার ভাগ্য ভালো ডোনার পাওয়া গেছে। '

সুজাতাদেবী দেখছেন বিপিন আর ছেলে পাশাপাশি শুয়ে আছে। বিপিনের রক্ত চ্যানেল দিয়ে বইছে খোকনের শরীরে।

সুজাতাদেবী বিপিনের হাত ধরে বললেন' আজ থেকে তোমার সাথে রক্তের সম্পর্ক হল ভাই। '

সুজাতাদেবী বিপিনের পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন।

বিপিন ছলছল নয়নে প্রনাম করে বলছে -

'তুমি স্বয়ং অন্নপূর্ণা'

20/04/2020

#কী_জ্বালা
#শর্মিষ্ঠা_KC

-----আরে কোথায় গেলে!!...কখন থেকে বলছি আমার চিরুনী টা পাচ্ছি না তো চিরুনী তল্লাশি চালিয়েও...!! ..দয়া করে রান্নাঘর থেকে এসে একটু বের করে দিয়ে যাও....

বাবা, মুখে "দয়া" বললেও বেশ অসন্তুষ্ট হয়ে আছেন বোঝা যাচ্ছে। আসলে এর আগেও বার তিনেক এমন করে স্বগতক্তি করেছেন যাতে অন্য লোকেরও কর্ণ কুহরে প্রবেশ করে । ভেবেছিলেন তাতেই কাজ হবে অন্য দিনের মতন... কিন্তু বিধি বাম!...অগত্যা প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য না চেয়ে উপায় যখন নেই বুঝলেন , তখনই এমন ভাব গম্ভীর ডাক পারলেন সহ ধর্মিনীর উদ্দেশ্যে।
রান্নাঘরে এই সময়ে মায়ের রীতিমত যুদ্ধ চলে। আমি , বাবা দুজনেই প্রায় একই সময় বেরোই। তাই মায়েরও এমন চোটপাটে মেজাজ যথারীতি তিরিক্ষী!
----নিজের ভুলো মনের জন্য সব্বাইকে সকাল থেকে বাঁদর নাচ করিয়ে ছাড়ে ,তাঁর আবার এত মেজাজ!....যত জ্বালা আমার!! আসছি দাঁড়াও.....

-----তুমি আসতে আসতে আমার চুল গুলোই তো সব দাঁড়িয়ে যাবে, তখন?

-----ইইইই....ওই তো "হেড অফিসের বড়বাবু"র মতন দুদিকে দু গাছী করে চুল....তার আবার দাঁড়ানো আর শোয়া!....ল্যাঙ্গটের আবার বুক পকেট!আর ওই এক পুচকে চিরুনী , দেখো বালিশের ফাঁক ফোকরে আছে হয়তো!

বুঝতে পারছি হাওয়া গরম । তাই অগত্যা আমিই ডাইভ মারলাম দুজনের কথার সমুদ্রের মাঝে। মা কী একটা যেন বিড়বিড় করে ইশারায় বোঝাতে চাইলেন। ঠিক বুঝলাম না সেই মূহুর্তে। তবে এটা বুঝলাম রান্নাঘরের সামনে বেশিক্ষণ থাকলে এই যুদ্ধ আরো চলবে । তাই তাড়াতাড়ি বললাম,
----চলো, বাবা.... আমি দেখছি। ঘরে এস।

ঘরে এসে তন্নতন্ন করে আমিও খুঁজে যখন পেলাম না, হঠাৎ মনে পড়লো মায়ের ইশারা আর স্নান করে এসে বাবাও তো কাকে যেন ফোন করলেন না?...হঠাৎ মাথায় বাল্ব জ্বলার মতন কিছু একটা ক্লিক করে যেতেই হাতের সামনে চশমার বাক্সটা তাড়াহুড়োয় খুলতেই টিকটিকির মতন লাফ দিয়ে চিরুণীটি খাটে পড়লো। বাবার দিকে তাকাতেই বাবা স্বগতক্তির মতন বললেন,
----হে হে হে...আসলে চুল আঁচড়াতে এলাম যখন তখন একটা জরুরী ফোন করার কথা মনে পড়লো ....
ট্রাফিক পুলিশের মতন হাত দিয়ে থামিয়ে দিলাম; অচিরেই বুঝে গেলাম চশমা চোখে উঠতেই ফাঁকা বাক্সে শূন্য স্থানে চিরুনী অর্পণ করা হয়েছে!

আমি, বাবা আর মা ...এই তিনজনের সংসার। কোনো ঝুটঝামেলা থাকার কথাও নয়; নেইও। কিন্তু বাবার ভুলো মনের জন্য বাড়ী আমাদের সরগরম।
রোজ সকালে নচিকেতার নীলাঞ্জনার মতন পাক্কা একটা নির্দিষ্ট সময়ে আমাদের বাড়ীতে দুধওয়ালা আসে, যার বেল বাজানো শুনে ঠিক বুঝে যাই সকাল ছ'টা বাজে। বেল বাজানো আর দরজা খোলার আওয়াজের মধ্যে যে গ্যাপ টা রোজ হয়, তার তারতম্য বুঝিয়ে দেয় আগের দিন আমাদের মধ্যে কে রাতে দরজা দিয়েছি! কারণটা নিশ্চই বোঝা যাচ্ছে...হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন ; বেশী সময় পরে খোলার আওয়াজ মানেই বাবা চাবিটি যে কোথায় রেখেছেন তা খুঁজে বের করা ওই ঘুমঘুম চোখে বেশ দুরূহ ব্যাপার।

বাবা যে কলেজে অধ্যাপনা করেন , সেই কলেজেই, বাবার বিষয় নিয়েই আমার পড়াশুনা। হামেশা দেখতাম ক্লাস ভুল করতেন। ফার্স্ট ইয়ারে, সেকেন্ড ইয়ারের পড়া পড়াতে শুরু করলেন হয় তো, আবার থার্ড ইয়ারে ফার্স্ট ইয়ারের সিলেবাস। কিন্তু অগাধ পান্ডিত্যর সাথেসাথে পড়ানোর ধরণ এত অসাধারণ ছিল যে কাউকে বাবাকে নিয়ে কোনদিন মজা করতে শুনি নি; ছাত্র-ছাত্রীরা খুব বিনয়ের সঙ্গে মনে করিয়ে দিতেন উনি কোন ইয়ারে পড়াচ্ছেন আর বাবাও ছোট্ট করে জিভ কেটে সঠিক সিলেবাসে হাত দিতেন।

ঠাম্মির মুখে শুনেছি , বাবা নাকি নতুন বিয়ের পর মাকে মণ্ডপে রেখে বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে চলে গেছিলেন। শুধু তাই নয়, বাড়িতে ফিরে মাকে দেখেও নাকি ওনার মনে পড়ে নি যে পুজো মণ্ডপে কী কান্ডটাই না ঘটিয়েছেন!বরং বলেছিলেন
----কি অসাধারণ সব দেবী প্রতিমা দেখে এলাম জানো?....পরেরবার তোমায় নিয়ে যাবো...
ঠাম্মি "এ সবের অর্থ কী" জিজ্ঞেস করতে উনি নাকি আকাশ থেকে পড়েছিলেন।
মা নাকি নিরুত্তর ছিলেন। কোনো ঝগড়া, কথা কাটাকাটি কিছুই করেন নি। তবে মান অভিমানের পালা হয়তো চলছিল রাতের অবকাশে দরজার ওপারে, সেটা ঠাম্মি ঠিক জানেন না।
অবশ্য কিছুদিন আগেও প্রায় একই কান্ড ঘটিয়েছিলেন। দুজনে মিলে বাজার করতে গেছেন। ফোন আসতে বাইরে বেরিয়ে কথা বলতে বলতে ফিরতি পথের বাস ধরে সটান বাড়িতে। বাড়িতে একা আসতেই মায়ের কথা জিজ্ঞেস করতেই লম্বা একটা জিভ বের করা ছাড়া আর বিশেষ কিছুই ওনার বহিঃপ্রকাশ ছিল না।

সব থেকে চূড়ান্ত হয়েছে আজকে দুপুরে। বাবা আর আমি দুজনে গেছি একটা সিনেমা দেখতে নন্দনে। ডায়বেটিসের রুগী, যখন তখন হিসু পায়। এখানেও অন্যথা হয় নি। সিনেমা শেষে বেরিয়ে সটান সুলভমুখী। বেশ কিছুক্ষণ পরেও ফিরছেন না দেখে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লাম। কী জানি বাবা,এই পঞ্চাশোর্ধ বয়সটা বেশ চাপের! দরজায় বসা ভদ্র মহিলাকে বলতে উনি বেশ ভাল করে জরিপ করে বললেন,
--- পুরো ঢুকবেন না....এখান থেকে হাঁক পাড়ুন।

অগত্যা!! তবে স্বস্তি দিয়ে এক ডাকেই বাবা সাড়া দিলেন। জিজ্ঞেস করলাম,
----টয়লেট করতে দেরী কেন , কোনো অসুবিধা হয়েছে কী?
----কী করতেএএ!?
গলা তুলে বাবার প্রশ্ন ভিতর থেকে....

আবার বললাম কী করতে গেছেন! শুনে মিনিট খানেকের মধ্যেই বাইরে এসে যা বললেন, শুনে আমার আক্কেল গুরুম, চক্ষু চড়কগাছ!....
------বলবি তো টয়লেট করতে গেছি।আমি ভাবলাম বোধহয় বড় টা.... তাই আর কি একটু....
আমার বড় বড় চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের দোষ খন্ডন করার জন্য মিনমিন করে স্বগতক্তি করে বললেন,
----আসলে তুই এত ভাল একটা সিনেমা দেখালি যে....মানে... সেটাই মাথায় এমন ঘুরছিল....
যাই হোক। বাড়িতে এসে মাকে খাবার টেবিলে সেই কথা বলতেই মা হাসবেন না কাঁদবেন বুঝতে পারছেন না। শেষে থাকতে না পেরে বলেই বসলেন,
---ভগবান কি জ্বালায় পড়েছি!! কোনদিন না তুমি নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যাও!

ব্যাস , আর যায় কোথায়?...কথায় বলে না চোরের মায়ের বড় গলা!...বাবাও বলতে লাগলেন,
-----কীইইই, তুমি চাও বুঝি আমি এই মূহুর্তে এমন করে বিদায় নি?.....মানে তুমি আমার মৃত্যু আগাম বলে দিচ্ছ?আমি জ্বালাই তোমায়???

------বাজে কথা কম বলো....নিজে ভাব একবার কী করেছ আজকে?
-----যাই করি....
ব্যাস শুরু হয়ে গেল আবার অহি নকুল। যথারীতি দুজনকে তখনকার মত চুপ করিয়ে ঘরে পাঠালাম শুতে। লাইট অফ হয়ে গেছে। তাও, পাশের ঘর থেকে যুযুধান মার্জারের মতন দুজনের গলা বেশ শুনতে পাচ্ছি। এমন সময় ধুপ করে আওয়াজ শুনে আমি দৌড়ে যাই, মা ও লাফ দিয়ে উঠে বেড সুইচ জ্বালিয়ে ফেলেছেন তৎক্ষণাৎ। দেখি, বাবা একটা পা মায়ের সায়ার মধ্যে ঢুকিয়ে হতভম্ব হয়ে মাটিতে বসে গজগজ করে বলে চলেছেন
----আলনার ওপরের তাকে আমার পা-জামা থাকে, এখানে সায়া এল কী করে?

বুঝলাম আবারো ক্যালকুলেশনে ভুল করেছেন। বরাবর আলনার ওপরের তাকে মায়ের পোশাক থাকে, আর নীচের দিকে থাকে বাবারগুলো।
বাবাকে তুলে জিজ্ঞেস করলাম ,
---তা , এই রাত বিরেতে চলছিলে কোথায়?
চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ কেমন যেন একটু ক্ষেপে গিয়ে বললেন,
----বিবাগী হয়ে যাচ্ছিলাম... শা* , সারাক্ষণ এই ভুলো মনের জন্য , তোর মায়ের থেকে লাল পিঁপড়ের মতন কুটুস কুটুস করে কথা শোনার থেকে, পিঁপড়ের ঢিবিতে উলঙ্গ হয়ে বসে ধ্যান করলে এত দিনে মুক্তি পেয়ে যেতাম।সবার জ্বালা জুড়াতো!!

মা চট করে কি-রিং এর জায়গাটা একবার দেখে নিয়ে ভারী নিষ্পৃহ স্বরে নিজের বালিশটা হাত দিয়ে একটু থাবড়ে থুবড়ে বললেন,
----তা , যাও না দেখি কত দূর যাবে!...আর খোকা, তুইই বাবু শুতে যা নিশ্চিন্ত মনে....
------সেইই তো!...একবার বেরিয়ে যাই , দেখ কেমন লাগে!!
------তাই বুঝি!!?...এটাও ভুলে গেছ লাস্টে গেট টা তুমিই দিয়েছ আর সেই চাবিটা আমায় তুমি হ্যান্ড ওভার করো নি ।
----অ'...(সেই বিশেষ মিনমিনে স্বরে)

মা পাশ ফিরে শুয়ে পড়লেন ।
বুঝলাম বাবা এবার রণে ভঙ্গ দেবেন। আর মাও ব্যপারটা ঠিক ট্যাকল করে নেবেন ।

আসলে বাবামায়ের মধ্যে সারাদিন যতই খিটিরমিটির লেগে থাকুক না কেন, দুজনের ভিতরে যে একটা একে অপরকে বোঝার , ভালবাসার চোরা স্রোত বইতে থাকে ফল্গু ধারার মতন সেটা আমি ভালোই টের পাই। কিন্তু,এঁরা দুজনেই সেটা কিছুতেই একে অপরকে বুঝতে দিতে না চেয়ে, কেন যে গুপ্তধনের মতন আগলে রেখে দিয়েছেন, কে জানে? প্রকাশ্যে আনলেই যেন সব লুটপাট হয়ে যাবে!!

আমিও নকল যুদ্ধক্ষেত্র তখনকার মত ত্যাগ করে নিজ শয়নক্ষেত্র অভিমুখে পা বাড়ালাম।

p.c. Google

20/04/2020

# স্বার্থপর
# তমসা চক্রবর্তী

অভ্র আর শাশুড়ি মায়ের কথা কাটাকাটির আওয়াজে সকাল সকাল ঘুমটা ভেঙে গেল পৌলমীর। বিয়ের পর থেকেই অভ্র আর পৌলমী প্রতি মাসে দুটো করে শুক্রবার অফিস করেই চলে আসে দূর্গাপুরে অভ্রর বাবা মায়ের কাছে। দু'দিন কাটিয়ে রবিবার আবার ফিরে যায় কলকাতায়। প্রথম দিকে মাঝেমাঝে অল্প কিছু মনোমালিন্য হত অভ্র আর ওর মায়ের মধ্যে কিন্তু এখন এটা প্রায় প্রতিবারের ঘটনায় দাঁড়িয়ে গেছে।একটা রবিবারও পৌলমী একটু বেশিক্ষন ঘুমাতে পারে না মা ছেলের ঝগড়ার জ্বালায়।আজ আবার কি নিয়ে শুরু হল কে জানে।বিছানা থেকে নেমে আস্তে আস্তে শাশুড়ির ঘরের দিকে পা বাড়ালে অভ্রর গলা পায় পৌলমী,"শোনো মা,এর থেকে বেশী কর্তব্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়"।
-"তা সম্ভব হবে কেন! অকৃতজ্ঞ সব", শাশুড়ির গলা চড়ছে আস্তে আস্তে। ঘরে ঢুকে পৌলমী দেখে অভ্র উত্তেজিত হয়ে মাকে বলছে,"তোমার যদি মনে হয় দিদার প্রতি আমার আরো কর্তব্য পালন করা উচিত তাহলে আগে দিদাকে এখানে এনে রাখো, তারপর দেখো আমি কর্তব্য করি কি না! কিন্তু বারবার মামার বাড়ি যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না"। শাশুড়ি মা ভীষন রেগে গিয়ে বললেন, "বোকাবোকা কথা বলিস না অভ্র, মা কখনো মেয়ের বাড়িতে থাকে! যাদের ছেলে নেই তাদের কথা আলাদা, কিন্তু যাদের ছেলে আছে,তারা প্রথমে স্বামীর কাছে,আর স্বামীর অবর্তমানে ছেলের কাছেই থাকে,এটাই নিয়ম।আর মেয়ের বাড়িতে থাকাটা মায়ের কাছে খুব একটা সম্মানজনকও নয়"।
-"কোন যুগে পড়ে আছো তুমি মা, মায়ের দায়িত্ব শুধু ছেলেদের! মেয়েদের কোনো দায়িত্ব নেই! আসলে তোমার মত কিছু স্বার্থপর মেয়ে বাবা মায়ের দায়িত্ব নেওয়া থেকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্যেই আজকের দিনে দাঁড়িয়েও এইসব নিয়মের অজুহাত দেখিয়ে যাচ্ছে"।
অভ্রর কথা শুনে পৌলমির শাশুড়ি মা রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,"আমি স্বার্থপর,বাবা মায়ের দায়িত্ব নেওয়া থেকে এড়িয়ে গেছি!মেয়ে হিসেবে আমি কোন কর্তব্যটা করিনি শুনি"!
-"গোটা বিশ্ব যখন চিৎকার করে বলছে ছেলে মেয়ে সবাই সমান,তখন তোমার মুখে এই 'মেয়ে হিসেবে কর্তব্য' শুনে হাসবো না কাঁদবো বুঝে উঠতে পারছি না মা",প্রচন্ড বিস্মিত হলেও একটা বিদ্রূপের হাসি হেসে মাকে কথাগুলো বলল অভ্র।
-"তোমার এইসব জ্ঞানের বাণী অন্য কাউকে শুনিও।ভুলে যেও না তুমি নিজের মায়ের সাথে কথা বলছো",রাগে ফুঁসতে থাকা অভ্রর মা ওখান থেকে বেরিয়ে যেতে গেলে অভ্র চিৎকার করে ওঠে,"এটাই তো প্রবলেম মা, সত্যি কথা শোনার সৎ সাহস নেই তোমার"।
-"আমার সাহস নেই সত্যি কথা শোনার!এটাই শোনা বাকি ছিল। বেশ আজ আমিও শুনতে চাই,এমন কি সত্যি আছে যেটা শোনার সৎ সাহস নেই আমার"!মা ছেলে কেউ থামছে না দেখে পৌলমী অভ্রকে চুপ করানোর চেষ্টা করলে অভ্র ওকে থামিয়ে দিয়ে মাকে বলে,"কোনো দিন ভেবে দেখেছো, মামার উপর তুমি আর মাসি কি পরিমান মানসিক অত্যাচার করে আসছো প্রথম থেকে"।
-"তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে,যা নয় তাই বলে যাচ্ছিস।আমরা ভাইয়ের উপর মানসিক অত্যাচার করছি",
-"হ্যাঁ করছো।আজ নয়,একযুগ ধরে করে আসছো। শুধু মাত্র তোমাদের জন্য মামা মামী আজ একযুগ ধরে বাড়ির বাইরে একদিনের বেশি কাটাতে পারে না।কেন, কেননা দিদাকে বাড়িতে একা রেখে সাতদিন কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়। ওরা তো সব কর্তব্য করছে, কিন্তু তাই বলে কি ওদের নিজস্ব কোনো জীবন নেই! আমি তো নিজে দেখেছি,আগের বার কত সখ করে বিবাহ বার্ষিকীতে সোনাই মামা মামীকে পুরীর টিকিট কেটে দিয়েছিল, কিন্তু তুমি আর মাসি ভুল ভাল অজুহাত দেখিয়ে দিদার কাছে গিয়ে থাকলে না বলে ওদের যাওয়াটা ক্যানসেল করতে হলো।মুখে কখনো প্রকাশ না করলেও মনে মনে খুব দুঃখ পেয়েছিল ওরা", অভ্রর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ওর মা বলে,"ভুলভাল অজুহাত!নিজের ভাইয়ের পরীক্ষাটা তোর কাছে ভুলভাল অজুহাত"।এই বাকবিতণ্ডার মধ্যে অনেক আগেই ঘুম থেকে উঠে বোকার মত বসেছিল অভ্রর ছোট ভাই শুভ্র। কিন্তু ঝামেলায় তার নাম জড়িয়ে পড়তেই সে মাকে বলে,"আমার পরীক্ষার সাথে তোমার কী সম্পর্ক।আমি কি ছোট বাচ্চা নাকি যে আমার পরীক্ষা বলে তুমি দিদার কাছে গিয়ে থাকতে পারবে না"!পৌলমী দেখলো ওর শাশুড়ি মা যুক্তিতে না পেরে উঠে এবার চিৎকার করতে শুরু করেছেন,"এখন তো এইসবই বলবে, অকৃতজ্ঞ দুটো ছেলের জন্ম দিয়েছি আমি"। অভ্র একটা বাঁকা হাসি হেসে বলল,"এটা কিন্তু তোমার জন্যেও প্রযোজ্য মা"।
-"এত বড় কথা তুই বলতে পারলি আমাকে!আমি অকৃতজ্ঞ"! ছেলের আচরণে সাংঘাতিক কষ্ট পেয়ে বলেন অভ্রর মা।
-"তোমার মনে আছে মা,শুভ্র যখন হয় তখন আমার ক্লাস-V এর অ্যাডমিশন টেস্ট ছিল। আমাকে কত প্রিপারেশন করিয়ে ছিলে তুমি একবছর ধরে, কিন্তু টেস্টের ঠিক পনেরো দিন আগে শুভ্র হওয়ার পরেই দিদার সাথে তুমি কলকাতায় চলে গিয়েছিলে।আমি এখানে একা বাবার কাছে ছিলাম। খুব ভয় পেতাম জানো,যদি পরীক্ষা খারাপ হয়।তারপর পনেরো দিন পর অ্যাডমিশন টেস্ট দিয়ে সোজা কলকাতায় গিয়েছিলাম তোমার কাছে। সেদিন যখন আমার সত্যি তোমাকে প্রয়োজন ছিল তখন কিন্তু তোমার কাছে নিজের ছেলের পরীক্ষার থেকে অনেক বেশী জরুরী নিজের বিশ্রাম আর ছোট ছেলের পরিচর্চা ছিল,যেটা একমাত্র দিদার কাছে থাকলেই সম্ভব হত।কারন মা যেভাবে মেয়ের যত্ন করবে সেটা আর কেউ করবে না। আর আজ যখন দিদার পরিচর্চার দরকার হলো তখন তুমি ছেলের কলেজের পরীক্ষার বাহানা দেখিয়ে দিলে! এবার বল তুমি অকৃতজ্ঞ কিনা"! অভ্রর কথায় মা একেবারে চুপ হয়ে গেল,সবাই চুপচাপ একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছে তখনই অভ্র মায়ের কাছে গিয়ে আবার বলে,"মা আমরা সবাই আসলে স্বার্থপর।নিজেদের জীবনে এত ব্যস্ত আমরা যে বাবা মাকে প্রয়োজন ছাড়া মনেই করি না।এটা ভেবেই খুশি থাকি মাসে মাসে টাকাতো পাঠিয়ে দিচ্ছি,ওরা নিজের বাড়িতে ভালোই আছে। কিন্তু মা কর্তব্যটা তো শুধু আর্থিক নয়, বাবা মাকে বুড়োবাচ্ছার মত আগলে রাখাটাই তো আসল কর্তব্য। ছোটবেলায় বাবা মা যখন তার কোনো সন্তানের মধ্যে বিভেদ করে না, তখন কেন মেয়েরা দায়িত্ব নেওয়ার বেলায় জোর গলায় সমান অধিকারে এগিয়ে আসবে না? তখন কেন সব দায়িত্ব ছেলের উপর গিয়ে বর্তাবে! তোমাকে দুঃখ দেওয়ার উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলি নি মা, এখন যখনই মামার বাড়ি যাই,ওদের সবাইকে এমনকি দিদাকে দেখলেও মনে হয় দায়িত্বের যাঁতাকলে সম্পর্কগুলো আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তাই বললাম তোমায়"।
সেদিন সারাদিন অভ্রর মা তৃপ্তিদেবী আর কারুর সাথে বিশেষ কোনো কথা বলেনি, শুধু বিকেলে অভ্ররা চলে আসার সময় ওদের বলেন সাবধানে যেতে।

বিকেল সাড়ে চারটের সময় পৌলমীর ফোনটা পেয়েই অভ্র করুনাময়ী থেকে দূর্গাপুরের বাস ধরে যখন বাড়ি পৌছাল তখন প্রায় সাড়ে আটটা বাজে। কিন্তু বাড়ি পৌঁছে দেখে বাড়িতে সবাই বার্থডে পার্টির প্রিপারেশন করছে। অভ্র কিছুতেই মনে করতে পারলো না আজ কার জম্মদিন। হঠাৎ ই মায়ের ঘর থেকে মামার গলার আওয়াজ পেয়ে গিয়ে দেখে মামা,মামী,সোনাই আর দিদাকে বসে থাকতে দেখে অভ্র জোর চমকালো।ওর মাথায় কিছুই ঢুকছে না কি হচ্ছে। সেই সময় আচমকাই সোনাই ওকে ওখান থেকে উদ্ধার করে বারান্দায় নিয়ে এসেছে বলে, "ব্যাপারটা কি বলতো দাদাভাই"?
-"আরে আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না,এসব হচ্ছেটা কি",অভ্র সত্যিই কিছু বুঝে উঠতে না পেরে বললো।
-"আরে,আজ সকালে পিসিমনি বৌদিকে নিয়ে হঠাৎ ই আমাদের বাড়িতে হাজির।আর তারপর থেকে একের পর এক বাউন্সার দিয়ে যাচ্ছে"।
-"মা! পৌলমীকে নিয়ে তোদের বাড়ি গিয়েছিল!তারপর"? অভ্রের প্রশ্নের উত্তরে সোনাই বলে,"প্রথমে দেখলাম ঠাম্মীর সাথে কিসব গোপন সলা পরামর্শ করলো,তারপর বাবা মাকে ডেকে বললো,'তোদের সঙ্গে নিজের অজান্তেই অনেক অন্যায় করেছি। মায়ের সব দায়িত্ব তোদের উপর দিয়ে আমরা নিজেদের মত করে জীবনটাকে উপভোগ করেছি এতদিন, কিন্তু ভুলে গিয়েছিলাম তোদেরও একটা নিজস্ব জীবন আছে, কিছু সখ আছে।অথচ তোরা সবসময় হাসি মুখে মায়ের সব দায়িত্ব কর্তব্য পালন করেছিস।আমি মেয়ে হয়ে যা করিনি,মনি বৌমা হয়ে তার থেকে অনেক বেশি করেছে। আজ আমি বড় হয়েও তোর থেকে ক্ষমা চাইছি ভাই,পারলে এই স্বার্থপর দিদিটাকে ক্ষমা করে দিস'। হতভম্বের মত সোনাই এর কথা শুনতে থাকা অভ্র জিজ্ঞেস করল,"তারপর"!
-"তারপর বললো,'মাকে আমি আজ আমার সাথে নিয়ে যেতে চাই ভাই,না করিস না please, অনেক কষ্টে মাকে রাজি করিয়েছি'। তখন বাবা বললো, 'মায়ের যদি আপত্তি না থাকে তাহলে আমাদের কেন বারণ করবো'। পিসিমনি তারপর বৌদির থেকে একটা খাম নিয়ে মায়ের হাতে দিয়ে বলল, আমাদের জন্য আগেরবার তোদের টিকিট ক্যানসেল করতে হয়েছিল, এবার নিশ্চিন্তে ঘুরে আয়, আমি মায়ের খেয়াল রাখবো। কিন্তু তার আগে আজকে মায়ের জম্মদিনটা তোরা সবাই আমাদের সাথে দূর্গাপুরেই সেলিব্রেট করবি',এই বলে আমাদের পুরো কিডন্যাপ করে এখানে নিয়ে এল"। পুরো ঘটনার একটা কাল্পনিক ভিডিও ইন্সট্যান্টলি মাথায় চালিয়ে নিয়ে অভ্র এক ছুটে রান্নাঘরে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে,"I Love You মা, পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও, সেদিন আমি তোমাকে সত্যিই দুঃখ দিতে চাই নি"। অভ্রর মাথায় পরম স্নেহে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তৃপ্তি দেবী বললেন,"তোর কথায় সেদিন খুব রাগ হয়েছিল।কিন্তু তারপর যখন সত্যির আয়নায় নিজের মনটাকে দেখলাম, খুব নোংরা লাগলো জানিস, নিজের আসল রূপটা দেখে নিজেরই ঘেন্না হচ্ছিলো। ভেবে দেখলাম নিজের বাবা মা স্বামী সন্তান কারুর প্রতিই আমি নিজের দায়িত্ব ঠিকমত পালন করতে পারিনি। নিজের ভিতরেই গুমরে ছিলাম, কিন্তু পৌলমী বুঝতে পেরেছিল আমি ভিতরে ভিতরে ভীষন কষ্ট পাচ্ছি,ও ফোন করতে কিভাবে যেন বিনা দ্বিধায় ওকে সব বলে ফেললাম। সব শুনে তোর বৌ বলল,'শোনো মা দোষে গুনেই মানুষ। তাই তোমার একটা ভুল নাই তোমাকে দায়িত্ব কর্তব্যহীন প্রমান করতে পারে না আর নাই সংসারে তোমার অবদানকে অস্বীকার করতে পারে। তাই নিজেকে দোষারোপ করে কষ্ট পাওয়াটা বন্ধ করো।সবাই নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে না মা, কিন্তু তুমি পেরেছো। আর নিজের ভুলটা যখন বুঝতে পেরেছো,তখন কান্নাকাটি না করে ভুলটাকে শুধরে নাও, সমস্যাটা কোথায়'!তারপর ভাইদের বেড়াতে যাওয়ার টিকিট কাটা থেকে শুরু করে আজ গাড়ি পাঠিয়ে আমাকে নিয়ে যাওয়া,তোর দিদাকে এখানে আসার জন্য রাজি করানো, বার্থডে পার্টি সবটাই তোর বৌ একার হাতে সামলেছে। কপাল করে একটা বৌমা পেয়েছি"! অভ্র কপট রাগ দেখিয়ে বলে,"হ্যাঁ এখন তো বৌমাই সব, আমি তো বানের জলে ভেসে এসেছি"।
"ছোটরাও মাঝে মাঝে জীবনের কিছু বড় শিক্ষা দিয়ে যায় আমাদের।তুই না থাকলে তো আমি জীবনের এত বড় ভুলটা বুঝতেই পারতাম না"। মৃদু হেসে ছেলেকে বলেন তৃপ্তি দেবী। ইতিমধ্যেই পৌলমী এসে কেক কাটার জন্য সবাই কে ডেকে নিয়ে গেলে,কেক কাটার পর তৃপ্তিদেবীর মা বলেন,"ছেলে মেয়েরা নিজেদের সংসারে ব্যস্ত হয়ে পড়লে নিজেরাই ভেবে নেয়, মায়ের কোনটা ভালো লাগবে কোনটা খারাপ লাগবে, কিন্তু মা কি চায়,সেটাই জিজ্ঞেস করতে ভুলে যায়।আজ প্রথম বার আমার মেয়ে আমার থেকে জানতে চাইলো যে আমি কি চাই।এর থেকে বড় পাওনা আর কি আছে। একটা বয়সের পর তো বাবা মা শুধুই ছেলেমেয়ে নাতি নাতনী এদের সঙ্গ পেতে চায়। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই সঙ্গটুকু দিতেও ছেলে মেয়েরা অপারক। আমার সৌভাগ্য যে আমরা সন্তানরা মায়ের জীবনের থেকে চাহিদাটা বুঝেছে। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি যাতে ওদের সন্তানরাও ভবিষ্যতে ওদের বুঝতে পারে"।
# সমাপ্ত
© ভিনদেশী তারা-bhindeshi tara-কলমে তমসা চক্রবর্তী

# ভালো লাগলে লেখিকার নাম সহ শেয়ার করুন

20/04/2020

#রবি-ভোজ
#তিথি_বসুদত্ত

আজ রবিবার। যদিও এখন রোজ ই রবিবার। তবুও ষষ্ঠীপদ মিত্তিরের আজ সকালে উঠেই মনটা মাংস মাংস করছে। সারা সপ্তাহ পরে এই একটা দিন মাংস ছাড়া থাকা যায় না। বৌকে ডেকে বললেন, ওগো শুনছো, তুমি পেঁয়াজ,আদা, রসুন বাটো। আমি মাংসটা নিয়েই আসছি। বৌ শুনে বলে, তুমি কি পাগল নাকি! একে লকডাউন তার ওপরে আমাদের এই সালকিয়া অঞ্চলে বেরোনো বন্ধ করে দিয়েছে। বাইরে পুলিশ। তোমার এখন কি মাংস না খেলেই চলছিল না! কিন্তু ষষ্ঠী বাবুর জিভ যে মাংসের জন্য লকলক করছে। কোন ভাবেই তিনি মাংস ছাড়া রবিবার ভাবতেই পারেন না। বৌকে বলেন, অত ভেবো না সাধনা , গত রোববারে ও তো আনলাম। সাধনা তবু বেরোনোর আগে বলল, তুমি যা বোকার হদ্দ, পুলিশ ধরলে বোলো, বৌ এর জন্য প্যাড কিনতে বেরিয়েছ। ষষ্ঠী বাবু লজ্জায় লাল হয়ে বললেন, ইস চোদ্দ বছর বিয়ে হয়েছে কোনদিন দোকান থেকে ওসব কিনলাম না, নাম ও উচ্চারণ করিনি, আমি ওসব বলতে পারবো না। সাধনা বলল, তাহলে যা হোক করো। আমাকে জ্বালিও না। ষষ্ঠীবাবু বললেন, ওগো, অন্য কিছু বুদ্ধি দাও না। সাধনা বলল, তাহলে বোলো, ছেলের জন্য হাগিস কিনতে বেরিয়েছ। ষষ্ঠী বাবু জিভ কেটে বললেন, বলো কি! ছেলে তো আমাদের ক্লাস সেভেনে পড়ে। ওসব কি পরবে? সাধনা মুখ বেঁকিয়ে বলল, ক্যাবলা কার্তিক আমার। পুলিশ যেন বাড়ি এসে মেলাবে তোমার ছেলে হামা দেয় না দাড়ি গোঁফ গজিয়েছে। ষষ্ঠী বাবু বললেন, তাই তো বটে। তবে তোমার ও একটু হলেও পাঁঠার মাংস খাওয়ার সাধ জেগেছে দেখতে পাচ্ছি। বলে হাসতে হাসতে বাইকে স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। রাস্তার মোড়ে দূর থেকে দেখেন পুলিশ টহল দিচ্ছে। বাইক ঘুরিয়ে অলি গলি দিয়ে সালকিয়া পেরিয়ে সোজা অন্য বাজারে। আহা! এই তো পাঁঠা ঝুলছে।মনে মনে ভাবলেন, উফফ, রানগুলো যেন আমার দিকেই তাকিয়ে ডাকছে। আর চর্বিগুলো! আহা! আহা! আজ দুপুর টা জাস্ট জমে যাবে। মাংস নিয়ে বাইক বাগিয়ে আবার গলি গলি ঘুরে সবে একটা গলি দিয়ে আর একটা গলিতে ঢুকবেন, মাঝে একটা বড় রাস্তা একটু পেরোতে হয়। পড়বি তো পড় মালির ঘাড়েই। সে ছিল গাছের আড়েই। বাইক দাঁড় করালো পুলিশ। তারপর শুরু হল সাঁড়াশি আক্রমণ। আক্রমণের মুখে পড়ে ষষ্ঠী বাবুর ঘামে জামা ভিজে গেছে। তোতলাতে শুরু করেছেন। পুলিশ চোখ রাঙিয়ে জিজ্ঞেস করছে, কেন বেরিয়েছিলেন উত্তর দিন। ষষ্ঠী বাবু ঢোক গিলে বললেন, আজ্ঞে হাগিস কিনতে বৌ এর জন্য। একজন পুলিশ বাইক থেকে নামিয়ে বললেন, ইয়ার্কি হচ্ছে? বৌ এর জন্য হাগিস? ষষ্ঠীবাবু বুঝতেই পারছেন না কি ভুল বলেছেন। তাও এবার বিষয়টা আরো দৃঢ় করার জন্য বললেন, আরো একটা আছে। ছেলের জন্য প্যাড।
এরপর মোটামুটি যা ঘটল। তা পুরোটাই ইতিহাস। থানা থেকে বিধ্বস্ত হয়ে যখন বাড়ি ফিরলেন, তখন সাধনা আর ছেলে প্রায় বের হচ্ছিল খোঁজ করতে।বাড়ি ঢুকতেই প্রথমেই বাড়িতে মোবাইল ফেলে যাওয়ার জন্য একপ্রস্থ গর্জন শুনতে হল। তারপরের কথাটাই বেরোলো , মাংস কোথায়? এবার ষষ্ঠী বাবু কাঁদো কাঁদো হয়ে বলেই ফেললেন, থানায় বসে ছিলাম, তখনো বাইকে ছিল। বেরিয়ে আর নেই।
সাধনার রণচণ্ডী মুর্তি আরো উগ্র হল। বলল, নেই মানে? একে তো নোলা লম্বা, তারপর শিখিয়ে পড়িয়ে পাঠালে ও কেঁচিয়ে আসো। আমার যত জ্বালা!
অগত্যা আজ রবিবার দুপুরে মাংসের জন্য কেটে রাখা আলু সেদ্ধ করে পেঁয়াজ দিয়ে মেখে খাওয়া হল ভাতের সাথে।
#তিথি_বসুদত্ত
অঙ্কন ঋণ - ডাঃ অনির্বাণ দত্ত

20/04/2020

সৃষ্টি
দেবলীনা সেনগুপ্ত


,

সেলফোনটা হাতে নিয়ে অলসপায়ে ব্যলকনিতে এসে দাঁড়ায় তৃষা. সোশাল সাইট গুলো ঘুরে আসে. না, কোন মেসেজ নেই ঋদ্ধির. বাইরে ছড়িয়ে আছে চৈত্রের দুপুর. টবের গাছগুলোতে বসন্তের সতেজ স্পর্শ. চড়ুই দম্পতি গ্রিলের নকশায় বসে খুনসুটিতে মত্ত. কিচিরমিচির করেই চলেছে. অস্পষ্ট ভেসে আসছে মনউদাসী ঘুঘুর ডাক. পাখি, রোদ, বসন্ত... ওদের কোথাও কোন লকডাউন নেই. এই মুহূর্তে মানুষের চেয়ে বেশি পরাধীন আর কোণঠাসা আর কেউই নয়. ভাবে ছড়ানো ছিটানো আবাসনের চারতলায় গৃহবন্দী তৃষা . সময় কত অস্থির.. অথচ পৃথিবীটা যেন কোন মন্ত্রবলে স্থির হয়ে গেছে. মন্ত্রে, নাকি ভয় আতংক ও শংকায়.! কেঁপে ওঠে তৃষা.
গুয়াহাটি শহরে এপ্রিল মাসে সচরাচর গরম তেমন থাকে না. বসন্ত বড় স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয় তার সম্পদ নিয়ে. কালবৈশাখির দাপটে গরমের পারদ খুব বেশি চড়তে পারে না. অন্যান্য বছর এই সময়টা চারদিক ব্যস্ত মুখর হয়ে থাকে. বাতাস ভরে থাকে ঢোলের তালে আর বিহুগানের সুরে. নিজের অজান্তেই শরীরে জাগে বিহুনাচের ছন্দ. এইবার সব শুনসান.
ব্যলকনি লাগোয়া ডাইনিংএ এসে বসে তৃষা. চঞ্চল হয়ে আরো একবার মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপে উঁকি মারে. জমা মেসেজ আছে অনেক কিন্তু সেগুলো দেখতে মন চায় না. ঋদ্ধির অভিপ্রেত মেসেজটা নেই দেখে অধৈর্য লাগে.
একহাজার স্কোয়ার ফিটের টু বি এইচ কে ফ্ল্যাটে এই মুহূর্তে তৃষার সংগী তৃষা একাই.
টিভি, সেলফোন, বই, গান এসবের সংগেই যা কিছু মিতালি তার. একটা ভারিক্কিগোছের চাকরিও রয়েছে. সেটা তার রুচির সংগে খুব বেশি না মিললেও মন দিয়েই সেটা করে তৃষা. ব্যস্তও থাকতে হয়. ফলে সময় কাটানো বা একা লাগা.. এসব সমস্যায় সে ভোগে না খুব একটা. তার প্রাণভোমরা তার একমাত্র মেয়ে ঋদ্ধি.
গত আটচল্লিশ ঘণ্টা ধরে তার সংগে কোন যোগাযোগ করতে পারছে না. তৃষার উদ্বেগ বাড়ে.
টিভি অন করে তৃষা. চ্যানেল সার্ফ করে অানমনে. নিউজ দেখতে ভালো লাগে না. স্থানীয় একটা চ্যনেলে পুরনো বিহু অনুষ্ঠানের রেকর্ডিং দেখাচ্ছে. কম আওয়াজে সেটাই চালু রাখে.
ডাইনিংয়ের একধারে তার বই রাখার জায়গা. সেখানেই রাখা থাকে পুরনো ছবির অ্যালবাম. একটা টেনে নেয় তৃষা. অন্যমনস্ক পাতা ওল্টায়...চোখ আটকায় পাতাজোড়া তার ও অতনুর ছবিতে. ছবি কতকিছু মনে করিয়ে দেয়. ব্রাইট ও ব্রিলিয়ান্ট অতনুর সংগে আলাপ হয়েছিল য়ুনিভার্সিটির দিনেই. চাকরীতে যোগ দেওয়ার পর দুবাড়ির সন্মতিতে বিয়েও হয়েছিল. কিন্তু বছর পাঁচেক পরেও যখন সে মা হতে পারল না, সমস্যার সূত্রপাত তখন থেকেই. শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ছিল তৃষারই. এবং তা জটিল. মানসিক ধাক্কা অবশ্য সামলে নিয়েছিল সে, অন্তরের শক্তিতেই. কিন্তু ক্রমশ‌‌: পরিবর্তন দেখছিল অতনুর মধ্যে. তৃষা অবশ্য দোষ দেখেনি তাতে. বিকল্প অনেক প্রস্তাব দিয়েছিল তৃষা. মন: পূত হয়নি অতনুর. শেষপর্যন্ত বিবাহবিচ্ছেদই অতনুর কাছে একমাত্র সমাধান বলে মনে হয়. তৃষাও আপত্তি করে নি. প্রত্যেকেরই তো একটাই জীবন. যে যেভাবে স্বস্তিতে থাকে, তাকে সেভাবেই থাকতে দিতে হয়. অতনু তার নতুন সংসারে দুটি সন্তানের জনক, জানে তৃষা.
ভালো থাকুক অতনু.. এই দুর্দিনে সবাই ভালো থাকুক.
পাতা ওল্টায় তৃষা. তৃষার কোলে একেবারে ছোট্ট ঋদ্ধি. অতনু ছেড়ে যাওয়ার পর নিজের জন্যে এই সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল তৃষা. ছয়মাসের ঋদ্ধিকে নিয়ে এসেছিল. অবশ্যই যথাযথ নিয়মকানুন মেনে. তারপর প্রতিদিন অন্তরের মাধুরী মিশিয়ে তাকে বড় করেছে. সেই ঋদ্ধি এখন সফল ডাক্তার. এই দুর্যোগের দিনে ফ্রন্টলাইন ওয়ারিওর. প্রথমসারির যোদ্ধা. মুম্বইয়ের হসপিটালে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছে মেয়েটা. তবে প্রতিদিন একবার অন্তত: যোগাযোগ করে মায়ের সংগে. কিন্তু কখন করবে ঠিক নেই. তৃষা তো এখন ওয়াশরুমে গেলেও ফোন সংগে রাখে. একবার মিস হলে মুশকিল. কিন্তু গত দুদিন ধরে তার কোন খবর নেই.মেসেজ করেও উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না. তৃষার কপালে ভাঁজ পড়ে.
ঋদ্ধির ডাক্তারির চূড়ান্ত পরীক্ষার ফল যেদিন বেরোয়, সেদিন ওর মনমতো রেস্টোরাঁয় মা মেয়ের পার্টি হয়েছিল. আর রাতে দুরু দুরু বুকে তৃষা মেয়েকে জানিয়েছিল... সে তার জন্মদাত্রী নয়.. আর অপেক্ষা করেছিল ঋদ্ধির প্রতিক্রিয়ার. ঋদ্ধি নির্বিকার বলেছিল.. "জানি"
---মানে.!
---মানে আর কি.! ডায়রিটাতো যেখানে সেখানে ফেলে রেখে যাও..
---অসভ্য মেয়ে. আমার ডাইরি পড়েছিস‌.!
--পড়তাম না. নিজের নামটা চোখে পড়ায় কৌতূহল হয়েছিল. আর, মায়ের সব সম্পত্তি মেয়েরই হয়. ডাইরিও.. এবার যাও ঘুমোও গিয়ে. নাহলে সন্ধের বিরিয়ানি হজম হবে না.. আর কাল সকালে আমার ডাক্তারির হাতেখড়ি তোমার ওপরেই করতে হবে.
--- পাজি মেয়ে.. মাথায় হাল্কা চাটি মেরে ততোধিক হাল্কা মন নিয়ে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়িয়েছিল তৃষা.
. টুং.. সেলফোনের শব্দে চমকালো তৃষা. এই তো, এই তো ঋদ্ধির মেসেজ.. "দশমিনিট পরে ভিডিও কল করছি, রেডি থেকো"
কাঁপা হাতে "ওকে " লিখেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে তৃষা. যে মেয়ে দু মিনিট ও ফোন করার সময় পায় না, শুধু মেসেজ দিয়ে রেখে দেয়.. আজ একেবারে ভিডিও কল.!! দশ মিনিট যেন কাটে না আর..
ঠিক বারো মিনিটের মাথায় কলটা এলো. আপাদমস্তক বর্মাবৃত ঋদ্ধি.. চোখটাই যা দেখা যাচ্ছে... আর ঋদ্ধি বুকে আগলে ধরে রেখেছে একটা শিশুকে.. বোধহয় মাস তিনেকের
--- হাই মা
--কিরে কেমন আছিস?
--- একদম ঝক্কাস.. তুমিও তো আরো সুন্দরী হয়েছ.. লকডাউন বেশ ভালোই কাজে লাগাচ্ছ.
--‌চুপ কর ফাজিল মেয়ে. কোলে কে?
---. আরে ওকে দেখাব বলেই তো সুপারের স্পেশাল পারমিসন নিয়ে তোমাকে ভিডিও কল করলাম. এখন তুমিই ঠিক কর ও কে?
‌--- মানে.!!!
--- মানে, এর মা ও বাবা আর নেই ‌.
অনেক চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারলাম না.. এখন তুমি যদি ওর দিম্মা হতে রাজি থাকো, আমি তবে ওর মা হতে পারি.. বিনা ঝঞ্ঝাটে নাতনী পেয়ে যাবে কিন্তু..
---ঋদ্ধি...
---আরে, কোই জল্দিবাজি নেই. ভেবে জানাও.
পুরনো আ্যালবামের পাতা দোল খায় তৃষার চোখে..
---কাগজপত্র সব ঠিক করে তৈরি করে নিস.. আমি নাতনীর নাম রাখলাম... সৃষ্টি়.
গ্লাভস ঢাকা বুড়ো আঙুল দেখায় ঋদ্ধি.. ছুঁড়ে দেয় উড়ন্ত চুমু.. তারপর স্ক্রীন থেকে ঝাপসা হয়ে যায় তার চেহারা.
তৃষা জানে,... তার মেয়ের মুখে এখন উজ্জ্বল হাসি.
ব্যলকনির চড়ুই হঠাৎ উড়ে গেল.. খড়কুটো ঠোঁটে ধরে.. বোধহয় বাসা বাঁধবে.
সৃষ্টি আর সম্পর্কে লকডাউন হয় না কখনও.. চলতেই থাকে...

20/04/2020

#হিয়ার_মাঝে
#বিদিশা_মন্ডল

-"আমি তোমার কোনো কথা শুনব না মা, তোমাকে আজ সুন্দর করে সাজতেই হবে!"
-"কি ছেলেমানুষি করছিস অনিক ?এই বয়সে এইসব কি মানায় !!?"
-"আমি অতো সতো বুঝি না মা,দাঁড়াও! আমি তোমার জন্য শাড়ি বেছে দিচ্ছি,আর গয়না দিয়ে সাজিয়েও দেবো তোমাকে!!"
-"ছিঃ ছিঃ বাবু! ওসব করতে যাসনা,লোকে কি বলবে?"
-"লোকে কি বলবে সেটা তোমাকে ভাবতে হবে না, লাল টিপ পরবে কেমন!দেখবে বাবা আজ তোমার দিক থেকে চোখ ফেরাতে'ই পারবে না..."

ছেলের কথা শুনে ৪৮ বয়সি সুতপাদেবীর মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল!! অনিল আর সুতপার বিয়ে হয়েছিল আজ থেকে ২৫ বছর আগে। বাড়ি থেকে দেখাশুনা করেই সুপাত্র অনিলের হাতে মেয়েকে সম্প্রদান করেন সুতপার বাবা। প্রতিটা মেয়ের মতো সুতপাও অনেক স্বপ্ন নিয়ে ঘর বাঁধতে আসে কিন্তু ফুলসজ্জার রাতেই সব স্বপ্ন,আশা কাঁচের চুরির মতো ভেঙে খন্ড খন্ড হয়ে যায়।!মদের নেশায় বুঁদ হয়ে অনিল সেদিন সুতপার ওপর যৌন,পাশবিক অত্যাচার চালায়! নারীর অসহয়তা সেদিন হার মানে নির্মমতার কাছে!!

বিয়ের একবছরের মধ্যেই জন্ম নিলো অনিক!অনিকের মুখ চেয়ে সবকিছু মুখ বুজে মেনে নেয় সুতপা!মেনে নেয় যে এই তার নিয়তি, এই তার পরিণতি! সে এমন একটা নদী যার কপালে এই অতল, কালো, গভীর সাগরে মেশায় লেখা আছে,তার আলাদা কোনো রাস্তা নেই,গতি নেই, পালানোর কোন পথই নেই! দিন যত যায় অনিলের অত্যাচারের মাত্রা বাড়তেই থাকে। ছোট্ট অনিক রোজ রাতে ফ্যালফ্যালিয়ে অমানুষ বাবার জ্বলন্ত চোখের দিকে তাকিয়ে ভয়ে কুঁকড়ে থাকত,সেই চোখে ছিল শুধুই প্রতিহিংসার আগুন, পেটে ছিল রঙিন অ্যালকোহলের উন্মাদনা!মায়ের ওপর হওয়া আক্রমণ থামাতে অক্ষম ছিল এই ছোট্ট প্রাণ তাই নিজের খেয়ালেই দু'চোখ দিয়ে বয়ে যেত নোনতা জলের ঢেউ। সেই ঢেউ'র স্রোত থামানোর কেউ ছিল না! এরপর ধীরে ধীরে অনিক বড়ো হতে থাকল প্রকৃতির অবধারিত নিয়মে...

বরাবরের ভালো ছাত্র অনিক এখন ইঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্ট। সুতপার দম বন্ধ করা জীবনে একমুঠো বাতাস ছিল তার এই সুপুত্রটি!!এখন বাবার আক্রমণ থামাতে সে আর অক্ষম নয়। কিন্তু মায়ের কষ্ট কমাতে এখনো সে অক্ষম। অনিক ভাবে তার মা তো সারাজীবনে নিজের জন্য কিছুই পেল না, শুধুমাত্র অন্যদের সুখের জন্যই বেঁচে এলো, অথচ মায়ের কষ্টটা সে অনুভব করতে পারলেও সে কিছুই করতে পারছে না, এই অপরাধবোধ তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে শুরু করল! কিন্তু এই কালো মেঘের অন্ধকার কেটে যাবে,এটা তার বিশ্বাস ছিলো! মায়ের সুখের জন্য সে সব করতে পারে, একটু একটু কর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় অনিক!

একদিন সকালবেলা অনিক বাড়িতেই ছিল। কলিংবেজের আওয়াজে দরজা খুলেই দেখল একজন প্রায় ৫০ বছর বয়সি পাঞ্জাবী পরিহিত ভদ্রলোক উশকোখুশকো চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে! অনিককে প্রশ্ন করলেন-
-"বলছিলাম যে এটা কি সুতপার বাড়ি?"
-"হ্যাঁ, আমি ওনার ছেলে, আপনি?"
-" ওকে বলো শোভনদা এসেছে।"

ভদ্রলোককে ভেতরে আসতে বলে রান্নাঘরে গেলো মাকে খবর দিতে। শোভনদা নামটা শুনেই সুতপার হাত থেকে জলের গ্লাসটা পড়েই গেল!
মন ডুব দিলো সেই সদ্য কৈশোর পার করা যুবতী বয়সে। এক মন কেমনের বসন্তের বিকেলে একই গ্রামের যুবক শোভন যুবতী সুতপাকে একগোছা কৃষ্ণচূড়া দিয়ে বলেছিল-
-"তোর ওই কালো ঝড় তোলা চোখে আমার একটু জায়গা দিবি,তোর ওই ঠোঁটের ওপর হালকা বাদামি তিলে আঁকিবুঁকি করার সুযোগ দিবি আমায়,তোর সারাজীবনের সাথী করবি আমাকে নাকি পথিক হয়ে বসে রব তোর পথ চেয়ে!!"...

সুতপা কৃষ্ণচূড়া হাতে নিয়ে চিবুক নামিয়ে বলে-
-" সুযোগ দেবো শুধু তোমায়..." বলেই লজ্জায় পালিয়ে গিয়েছিল,মিশে গিয়েছিল গাঁয়ের আলপথ ধরে।
কিন্তু ভাগ্য হয়তো অন্য কিছু লিখে রেখেছিল দুজনের কপালে!!তখন বেকার শোভনের হাতে মেয়েকে তুলে দিতে চাননি সুতপার বাবা। রক্ষণশীল পরিবারের সুতপাও বাবা মুখের ওপর কথা বলার সাহস জোটাতে পারেনি!
সুতপার বিয়ের খবরটা পেয়েই শোভন শহরে চলে যায় অভিমান করে!!তারপর সুতপার সাথে অনিলের বিয়ে হয়ে যায়।
কেটে যায় ২৫টা বছর। আজ এতোদিন পর শোভনদা কোথা থেকে এলো,তার ঠিকানায় বা কি করে পেল,শোভনদা কি বিয়ে করেছে ?- মনের ভেতরে গুচ্ছের প্রশ্নের ভান্ডার নিয়ে বসার ঘরে শোভনদাকে দেখে সুতপা বিস্মিত হয়ে গেলো - একি চেহারা হয়েছে!!!লম্বা, ফর্সা সুপুরুষ মানুষটির চোখে মুখে বার্দ্ধক্য হানা দিয়েছে পরিপাটি ভাবে!!সুতপাকে দেখেই শোভনদা বলে উঠল-
-"সুতপা চিনতে পারছিস আমায় !!!?গ্রামে গিয়েছিলাম রে,ওখান থেকেই তোর ঠিকানা পেলাম, তাই ভাবলাম দেখে আসি তুই কেমন গুছিয়ে সংসার করছিস!"
-"তুমি কেমন আছো, এতোদিন কোথায় ছিলে, কি করছিলে!!?"
-"এই তো নিরুদ্দেশের পথে যাত্রা করেছিলাম। এখন একটা প্রকাশক সংস্থার কাজ করি। লেখা,গল্প,কবিতা এইসবই আমার সংসার বুঝলি!"
-"বিয়ে করোনি ?"
-"বিয়ে তো এক বসন্তের বিকালে করে ফেলেছি কিন্ত কি করব বৌটা ধোঁকা দিয়ে অন্য কারোর সাথে ঘর বাঁধল।হাঃহাঃ হাঃ...."

অনিকের সামনে এই কথা শুনে চরম অস্বস্তিতে পড়ে যায় সুতপা। এই বিদ্রুপের মানে কি!!? সে কি ইচ্ছে করে অন্য কারোর সাথে ঘর বেঁধে ছিল !!?
ভাগ্যের নির্মম প্রহসনের স্বীকার সে!! অনিক যদি কিছু বুঝতে পারে তাহলে ও লজ্জায় মুখ দেখাবে কি করে!!?

-"কি রে, কি ভাবতে বসলি আবার ? আমি তো মজা করেছিলাম,বল কেমন আছিস?"
-"ভালো, খুব ভালো..."
-" কিন্তু আমার মন যে বলছে তুই ভালো নেই, ভালো থাকার অভিনয় করছিস!"
-" জীবনটা তো একটা মঞ্চ'ই গো,আর তাতে আমরা সবাই অভিনয়ই করে চলেছি..."
-" বাঃ! ভালো কথা বলা শিখে গেছিস তো, অবশ্য শিখবি না'ই বা কেন, বয়স তো কম হলো না,এতো বড় ছেলের মা হয়েছিস, তা ভালো! সুখে থাক!"

অনিক দূরে দাঁড়িয়ে দুজনের কথোপকথন শুনছিল চুপচাপ। শোভনদা সেদিনকার মতো চলে গেলে সুতপা আর একটাও কথা না বলে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা আটকে দেয়! অনিকও মাকে বিরক্ত করেনি,ভেবেছিল মায়ের হয়তো একটু একান্ত সময় দরকার ।তারপর না হয় সব ঘটনা জানবে। নিজেকে ঘরে বন্দি করে সুতপা আর নিজেকে আটকে রাখতে পারে না। ভেতরে কুন্ডলী পাকানো কষ্টটা চোখের জলে পরিণত হতে বেশি সময় নেয় না!!এই বদ্ধ চার দেওয়ালের ভেতর কেউ তাকে দেখছে না, সমাজের তীক্ষ্ণ নজরদারিও নেই সেখানে, সবাই কি বলবে যে- এই বয়সে আবার পুরনো প্রেমিক ফিরে এসেছে,তার তাকে দেখে সে নিজেও দূর্বল হয়ে পড়েছে, কি জবাব দেবে অনিককে, এতোদিন স্বামীর ঘর করে আজ এইসব ভাবনা তো অমূলক!এ'সব ভাবনা আসাও যে পাপ! তাই চোখের জল মুছে চিরকালের মতো চোখে দীপ্ততা নিয়ে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে!ওদিকে সুতপার স্বামী অনিল আবার মদ খেয়ে সুতপাকে মারধর শুরু করে।
শোভনের আসার ব্যাপারটা জানতে পেরে সুতপাকে "দুশ্চরিত্রা,বেহায়া..." আখ্যা দিয়ে মারতে থাকে। অনিক সেদিন আর নিজেকে স্থির রাখতে পারেনি, রাগ করে বাবাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। মা ওদিকে কান্নাকাটি করে দেয়! সেদিন আর সুতপা চুপ থাকতে পারেনি, আবেগের বশে অনিককে তার অতীতের সব কথা জানায়!

অনিক সিদ্ধান্ত নেয় আর নয়,তার অমানুষ বাবার হাত থেকে এবার সে মাকে মুক্ত করবেই, সে জন্য ডিভোর্সের মামলা শুরু করে নিজের বাবার বিরুদ্ধে। ছেলের বয়ান অনুযায়ী ডিভোর্স পেতে বেশি অসুবিধা হয়নি। দীর্ঘ দিনের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয় সুতপা। আর এই সব কিছুতে তার পাশে ছিল অনিক আর শোভনদা।অনিক তার মাকে নিয়ে এখন একটা ভাড়া বাড়িতে উঠে এরপর।
মা ছেলে দুজনে মিলে ছোট্ট সংসার শুরু করে। শোভনদার সাথে খুব মিশে গিয়েছিল অনিক। একজন পিতার মতো গাইড করতে থাকে সে। এতোদিনে অনিক তার পিতার শূন্যতা কিছুটা হলেও ভরাট হতে থাকে একটু একটু করে। মা যেন অনেকটাই পাল্টে গিয়েছে, প্রাণবন্ত, হাসিখুশি হয়ে গেছে। শোভনের সাথে থাকার সময় যেন সুতপা আরো বেশি প্রাণঞ্চল থাকে, এই সবই অনিকের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে না । তাই সে নিয়ে নেয় একটা কঠিন সিদ্ধান্ত। ছেলে হয়ে সে মায়ের আবার বিয়ে দেবে, তার মাকে ফিরিয়ে দেবে তার সব পাওনাটুকু। সমাজ হয়তো মেনে নেবে না তার সিদ্ধান্তকে কিন্তু মায়ের সুখের জন্য ছেলের এই অনন্য পদক্ষেপ চিরকাল একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। প্রথমে শোভন আর সুতপা দুজনেই রাজি হয়নি। অনেক সাধ্যসাধনার পর দুজনকে মানানো গিয়েছে।

অবশেষে এসেছে সেই শুভদিন। মাকে সাজিয়ে গুছিয়ে রেজেষ্ট্রি অফিস নিয়ে যাবে অনিক। জোরকদমে চলছে তারই প্রস্তুতি। ওদিকে অপেক্ষা করছে যে তার নতুন বাবা। যাওয়ার পথে অনিক গাড়িতে গান চালায়-

“আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে
দেখতে আমি পাইনি তোমায়
দেখতে আমি পাইনি...”

-সমাপ্ত-

Want your business to be the top-listed Government Service in KOLKATA?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Category

Website

Address


Kolkata
Kolkata